ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনজোছনা

পর্ব 17

লেখক: বিনতে ফিরোজ

#বনজোছনা
১৭.

বিলাল—এলাকায় পরিচিত বিলু নামে। কঠোর অনুশাসনের মাঝেও কিছু মানুষ থাকে—যাদের কোনোভাবেই বিচারের আওতায় আনা যায় না। মনুষ্যসমাজ কর্তৃক প্রণীত সেই আইনের ফাঁক গলে তারা দিব্যি হেসে-খেলে বেড়ায় বছরকে বছর। যেন মনে হয়—এ শহরে ন্যায় বলে কিচ্ছু নেই। বিলু এবং তার দল ঠিক সে দলের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।

চাঁদাবাজি, মাদকের চোরাকারবার, ছিনতাইসহ হেন কোনো কাজ নেই—যা তাদের দল করতে বাকি রেখেছে। মা-ম-লাও কিছু কম হয়নি। কিন্তু প্রতিবারই থানার দেয়ালের সৌন্দর্য দেখে তারা আপন ডেরায় ফিরে আসে। ওই চোদ্দ শিকের হাওয়া আজও তাদের খাওয়া হয়নি। এই একটা কাজই তাদের দ্বারা এখনো বাকি রয়ে গেছে।

এই অবধি যত পুলিশ অফিসার এসেছে কেউই তাদের বিরুদ্ধে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ওপরে দেখতে পাতি মাস্তান হলেও ভেতরে ভেতরে তাদের হাত এলাকার এমপি পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে মামলার জমাট বাঁধা হাওয়া জমে জমে চারপাশে পাক খায়, কোথাও খাঁটি গাড়ার সুযোগ পায় না।

জুবায়ের নিজেও ভেবেছিল এ দলের সাথে পাঙ্গা নেবে না। শুধু শুধু নিজের জীবনে ঝামেলা জড়ানো। কাজের কাজ কিছুই হবে না। অন্তত দুটো একটাকেও যদি ফেলতে পারত—তবু জান ঠান্ডা হতো। কিন্তু ওদের বিরুদ্ধে যাওয়ার অর্থ হলো প্রাথমিকভাবে দূরবর্তী জায়গায় বদলির ব্যবস্থা এবং চূড়ান্তভাবে পত্রপাঠ চাকরি থেকে বিদায়। তার আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ আরেক কুখ্যাত ব্যক্তি ছিল বলে তাদের সাথে টক্কর দিতে পেরেছে। তার পক্ষে সেসব সম্ভব হবে না।

কিন্তু জীবনের অধিকাংশ বিষয়ই নিজেদের পরিকল্পনা মাফিক হয় না। জুবায়েরের ক্ষেত্রেও হলো না।

সে জানে নিজে লড়াই করে খুব বেশি দূর এদের কার্যোদ্ধার করতে পারবে না। কিন্তু একজনকে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিলেই সে কাজটা সহজ হয়ে যাবে। 'আপনি বাঁচলে বাপের নাম'—এ সূত্র ধরে সবাইই নিজের আখের গোছাতে চাইবে এবং গড়গড় করে অপরের বিরুদ্ধে যা যা জমা আছে—সেসব বলে দেবে। এই বুদ্ধিটাই কাজে লাগাল সে।

পাপড়ি যে ফাইল দিয়েছে—তাতে বিলুর সাথে আকরাম খানের চুক্তির একটা আভাস আছে। এসব দলের চুক্তির লিখিত দলিলপত্র থাকে না। তবে আকরাম খান আইনজীবী মানুষ, তিনি সম্ভবত একটু প্রমাণ রাখতে চেয়েছিলেন। সেটা জুবায়েরের জন্য সুবিধাজনক হয়েছে বই কি!

ফাইলটা মূলত বিলুর দলের যাবতীয় কেসের। যেগুলো এখনও খালাস হয়নি। এদিকের মানুষ বিলুকে মোটেই দেখতে পারে না বলে নাম খোয়ানোর ভয়ে কেউই তার মামলা নিতে চায় না। জানে এখন পকেট ভারী হলেও দুদিন পর আর ক্লায়েন্ট পাবে না। তাই ওদের নিরাপত্তার সাথে পাশ কাটিয়ে চলে এদিককার আইনজীবীরা। আকরাম খান কালো মেষ হয়ে স্বজাতির এ প্রথা ভাঙতে উদ্যত হয়েছিলেন। নিশ্চয়ই এর মাঝে তিনি কেসের ব্যাপারে মুখ খুলতে চাননি। সুবিধাজনক সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন। সময়ের হিসেব-নিকেশ মিস ম্যাচ হয়ে গেছে। করেছে তারই কন্যা—পাপড়ি।

জুবায়ের ঝটপট একটা কাজ করে ফেলল। সোজা ফোন দিলো বিলুর কাছে। কল কেটে যাওয়ার একটু আগে রিসিভ হলো। গম্ভীর একটা কন্ঠ ভেসে এল, “কে!”

“বিলাল ভাই? আমি জুবায়ের।” বিগলিত কন্ঠে বলল জুবায়ের।

“কোন জুবায়ের?”

“আপনাদের থানার ইনচার্জ।”

কিছুক্ষণের নীরবতা। তারপরই শোনা গেলো, “কী দরকার?”

জুবায়ের কণ্ঠ কিছুটা নিচু করল। বলল, “ভাই, আমি এই এলাকায় নতুন। আপনাদের ছায়া না থাকলে তো চলা কষ্ট। সেজন্যই একটু যোগাযোগ করতে চেয়েছিলাম। তাছাড়া…” একটু থামলো জুবায়ের। কণ্ঠ আরেক ধাপ নিচু করে বলল, “গতকালই আমার হাতে একটা ফাইল এসেছে। ইয়ে মানে…ফাইলে আপনাদের নামে কিছু রেকর্ড আছে। আসল নিশ্চয়ই নয়?”

বিলাল বলল, “কার থেকে এসেছে এই ফাইল?”

“ব্যারিস্টার আকরাম খান দিয়ে গেলেন। বললেন—টপ সিক্রেট সব খবর এখান থেকে পাওয়া যাবে। আমি তো ভাই মনে মনে দুই হাত ঝাড়া দিয়ে বসে আছি। মুখে কিছু বলিনি। এই ব্যাটা কতদূর যায় তাই দেখতে চেয়েছিলাম। ফাইলটা কি ভাই আসল?”

বিলাল মিনিট খানেক কোনো উত্তর দিলো না। জুবায়ের ভাবলো কল বোধহয় কেটে দিয়েছে। কান থেকে ফোন নামালো। টাইমার দেখাচ্ছে। ছয় মিনিট সাঁইত্রিশ সেকেন্ড।

“হ্যালো ভাই!”

“ফাইল আপনার কাছে রাখেন। ব্যবস্থা আমি করছি।”

“ঠিকাছে ভাই। আকরাম খানকে আবার এসব বলে দিয়েন না। তাহলে আমার থেকেও সে সাবধান হয়ে যাবে। যা করার একটু তাড়াতাড়ি করবেন, হ্যাঁ?”

কোনো উত্তর না দিয়ে কল কেটে দিলো বিলাল। জুবায়ের মিনিট খানেক অপেক্ষা করল। তার একান্ত ব্যক্তিগত সিম থেকে আকরাম খানকে ফোন দিয়ে পেশাদার ভঙ্গিতে বলল, “আকরাম সাহেব কি ব্যস্ত?”

বলা বাহুল্য আকরাম খান জুবায়েরের কণ্ঠে শুনে চরম বিরক্ত হয়েছেন। সে বিরক্তি চাপা দিয়ে বললেন, “বলুন।”

“বিলুর সাথে কথা হলো। ঘটনা তো সাংঘাতিক!”

বিলুর নাম শুনেই পিঠ সোজা করে বসলেন আকরাম, “কী হয়েছে?”

“আপনার ফাইল পাচার হয়েছে নাকি? খবরটা কিন্তু সে পেয়ে গেছে। আমাকে ফোন দিয়েছিল আপনার বিরুদ্ধে কিছু গোপন তথ্য দিতে। আপনি আমি দুজনেই আইনের মানুষ। স্বজাতির উপকার না করার মতো অকৃতজ্ঞ আমি না। ঘটনা এখনও প্যাঁচ খায়নি বলে আপনাকে জানালাম। সাবধানে থাকবেন।”

আকরাম কুলকুল করে ঘামতে লাগলেন। বিলু মুখোশধারী শয়তান। ও যদি মুখ খোলে তাহলে আকরামের সম্মান তো দূর কি বাত, জীবন থাকবে কি না সন্দেহ। কিন্তু এই নাফরমানি ও করবে কেন! নিজের ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে ফেলে একমাত্র তিনিই ওর কেসটা নিয়েছেন। বিলু যদি উনিশ বিশ কিছু করে তিনিও বসে থাকবেন না। যা জানেন তা তো বলবেনই, যা জানেন না সেটাও বলতে ছাড়বেন না। ডুবলে ওকে নিয়েই ডুববেন।

“রাখছি।” কল কেটে মাথার পেছনে দুহাত দিয়ে হেলান দিলো জুবায়ের। উচ্ছল কণ্ঠে হাঁক ছেড়ে বলল, “জসিম! দুই কাপ দুধ চা নিয়ে আসো!”

“স্যার তো আজকে সকলেই দুটো এন্টাসিড খেলেন!” মিনমিন করে বলল কনস্ট্যাবল।

“আরে ব্যাটা তুই আন তো! দরকার হয় আরও দুটো খাবো! যাহ!”

চায়ে চুমুক দিয়ে স্ত্রীর কাছে ফোন দিলো জুবায়ের।

“কী করছ ডার্লিং?” কোনো উত্তর এলো না। স্ত্রীর ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখটা বেশ দেখতে পেলো সে। আকরামের মুখটাও দেখতে পাচ্ছে। আহা! বিলুর চেহারাটাই কেবল দেখা গেলো না।

—

গতকাল থানায় বসেই সাবিহাকে ফোন দিয়েছিল সাকিন। বলে দিয়েছিল যেন আপাতত ওর কাছে বা মামা বাড়িতে কারো কাছে কল না দেয়। কণ্ঠ শুনেই সম্ভবত সাবিহাকে কিছু একটা আঁচ করে ফেলেছে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বারবার জিজ্ঞেস করছিল, “কী হয়েছে সত্যি করে বল ভাইয়া! তুই নিশ্চয়ই কোনো বিপদে পড়েছিস!”

মিথ্যে বলায় অপটু সাকিন বুঝতে পারছিল না পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেবে। কোনরকম বুঝ দেয়ার জন্য বলেছে, “একটা ঘটনা ঘটেছে। তেমন কিছু না। তুই চিন্তা করিস না। আমি একটু ব্যস্ত থাকব বলে ফোন দিতে নিষেধ করলাম। ফ্রি হয়েই তোর সাথে যোগাযোগ করব ইনশাআল্লাহ্। চিন্তা করিস না, ঠিকাছে?”

সাবিহা কিন্তু সে নিষেধ অমান্য করে চিন্তায় মুখ শুকিয়ে ফেলল। সাকিনকে কড়া কণ্ঠে বলল, “ঝামেলা শেষ করেই তুই আমার কাছে আসবি ভাইয়া!”

“আসবো ইনশাআল্লাহ্। রাখছি।”

তারপর টানা সাতটা দিন পুরোপুরি নেটওয়ার্কের বাইরে রইলো সাকিন। দোতলা একটা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় তাকে রাখা হয়েছে। সাধারণ একটা মেস। ভেতরে সাবলেটে তিন সদস্যের একটা পরিবারও থাকে। সে মেসেই খুব স্বাভাবিক ভাবে এক সপ্তাহ কাটলো। সে কে, কোত্থেকে এসেছে, কোথায় যাবে, কী করে—একটা প্রশ্নও কেউ জিজ্ঞেস করল না। যেন তার এখানে থাকাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়।

সাতদিন পর এক সকালে জুবায়ের এলো। দুগাল ছড়ানো হাসি হেসে বলল, “সাকিন ভাই, ঘটনা একটা ঘটে গেছে।”

সম্বোধন শুনেই অবাক হয়ে গেলো সাকিন। তার জীবনে দেখা সবচেয়ে অদ্ভুত পুলিশ এই ছেলে। বয়স হয়তো তারচে বড়জোর দু বছরের ছোট হবে। কিন্তু এই সাত দিনে যোগাযোগের সময় এমনভাবে কথা বলেছে যেন কত বছরেরই না ছোট, যেন কত আপন!

“কী ঘটনা?”

“একটা গেরিলা যুদ্ধ হব হব করছে। যেকোনো সময় হুইসেল বেজে যাবে।”

“একটু ভেঙে বলুন।”

“আপনার মামা বিলু পার্টির একটা কেস লড়তে চেয়েছিল। এই বছরে অবশ্য না। খুব সম্ভবত আগামী বছর। বিলুর প্ল্যান ছিল একটা এতিমখানা লঞ্চ করবে। তার পর এই কেস সামনে আনার কথা। মানুষও আর ক্ষেপলো না। কিন্তু ঘটনায় প্যাঁচ দিয়ে দিয়েছেন আপনি।”

“আমি!” সাকিন বিস্ময়ের চূড়ায় অবস্থান করছে।

“জি। আপনার মামা আপনাকে দিয়ে একটা ফাইল আনিয়েছিল, মনে আছে?”

“জি।”

“সেটা বিশেষ কিছু না হলেও অনেক কিছু। এবং সেদিনই বিলুর দলের একজন আপনার পকেটে হিরোইন গুঁজে দিয়েছিল। কপাল করে সেটা চুরি করল পকেটমার। আপনার মামা দোতলা করার আশায় হিরোইন হোল্ডার হতে চেয়েছিল। বুঝলেন!”

সাকিন স্তব্ধ হয়ে গেল।

“বিলুকে ধরা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আবার আপনার মামা বিরুদ্ধেও শক্ত প্রমাণ নেই। তাই ওদের ভেতর একটু বাজনা বাজিয়ে দিলাম আর কি। এদিকে আবার ফার্মেসির কেলেঙ্করিতে আপনি যে জড়িত নন—তারও প্রমাণ নেই। নাজিম গায়েব হয়ে গিয়েছিল।”

“ফার্মেসির কেলেঙ্করিতে আমি জড়িত না এটা আপনি জানলেন কীভাবে? তাছাড়া আপনি তো আমাকে কোনো জিজ্ঞাসাবাদও করেননি।”

জুবায়ের হাসল, “মাঝে মাঝেই যে রক্ত দেয়, সে নেশাদ্রব্য গ্রহণ করে—এ যুক্তি খাটে না। গত দুই বছরে কোনো চুক্তিতে আপনাকে সাইন করতে দেয়া হয়নি। হঠাৎ করে এটায় কেন দেয়া হলো সেটা সন্দেহজনক। আকরাম খানের বিরুদ্ধে চার্জের কথা শুনে নাজিম উদ্দিন ভূতের মতো হাজির হয়েছেন এবং এও জানিয়েছেন চুক্তির মূল হোতা আপনার মামা, আপনি শুধু কলম ছিলেন—যেটা দিয়ে বিরল সব সাইন করা হয়। তার মাধ্যমেই সেই ভুয়া কোম্পানি পর্যন্ত আমরা রিচ করতে পেরেছি। আর সর্বশেষ, পাপড়ি,সে নিজেই বলেছে ওকে আপনি টাচ পর্যন্ত করেননি। কাজেই আপনি বেকসুর খালাস।”

“বেকসুর খালাস!” ফিসফিস করে বলল সাকিন।

“একটা সাক্ষ্য অবশ্য দিতে হবে। মা-ম-লা আগে কোর্টে উঠুক। ফাইলের বাহক হিসেবে এই ড্রামায় আপনার একটা ছোট্ট পার্ট আছে। ফোন দিলে চট করে এসে রোলটা প্লে করে যাবেন। দ্যাটস অল!”

সাকিনের মনে হচ্ছিল সে ঘোরগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। জলিম রাজার অবাধ্যতা, রাতের আঁধারে পলায়ন, একটা লম্বা সময়ের আইসোলেশন এবং তারপরই সম্পূর্ণ বিপরীত পাশার দান। জীবনের নাম এই মুহূর্তে কাহাফ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সে ঝিম মেরে বসে ছিল। জুবায়ের উঠে দাঁড়ালো।

“কিছুদিনের মধ্যেই গ্যাজেট প্রকাশ হয়ে যাবে। আপনার হিস্ট্রি নিট অ্যান্ড ক্লিন। খুব ভালো শিক্ষক হবেন—এই কামনা করি।”

ছলছলে চোখে ছেলেটার দিকে তাকালো সাকিন। উঠে দাঁড়িয়ে ওকে জড়িয়ে ধরতেই জুবায়ের হেসে ফেলল। পিঠে চাপড় দিয়ে বলল, “নরম মনটা বুকের ভেতরেই রাখেন, সাকিন ভাই। মানুষকে দেখালে ওরা পিষতে সময় নেবে না।”

দূরে দাঁড়াতেই জুবায়ের বলল, “আগামী দুই মাস এখানেই থাকেন। আমি বলে দিচ্ছি। ট্রান্সফার হলে চলে যাওয়ার আগে ভাড়া পরিশোধ করে দেবেন।”

“এত দ্রুত ট্রান্সফার হবে?”

“লাঠির আগায় ভূত পালায়, আর এ তো ট্রান্সফার! আপনার জিনিসপত্র ওই বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বিকেলের মাঝে পেয়ে যাবেন। ভালো থাকবেন ভাই। আসি। আসসালামু আলাইকুম।”

জুবায়ের চলে গেলো। সাকিনের মনে হলো একটা দমকা হাওয়া তার জীবনে ঝট করে বয়ে গেলো। পলকের মাঝে সব ওলট-পালট করে বিদায় নিলো। সে ওলট-পালট অবস্থা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, একটা নতুন শুরুর জন্য।

*****

ফরিদ আহমেদ কেবল এক লোকমা ভাত মুখে দিয়েছেন। তখনই সিঁড়িঘরের দরজায় ঠকঠক শব্দ হলো। সিমি তড়বড় করে ছুটে গেলো দরজা খুলতে। এ কাজটা তার বিশেষ পছন্দের।

দরজা খুলতেই বাড়িওয়ালার গম্ভীর চেহারা দেখা গেলো। গমগমে কণ্ঠে তিনি বললেন, “ফরিদ ভাই বাড়ি আছেন?”

কথা শুনে এঁটো হাতে উঠে এলেন ফরিদ। সিমি সরে দাঁড়ালো। সৌজন্য হেসে সালাম দিয়ে ফরিদ বললেন, “ভেতরে আসেন ভাই!”

“না। ভেতরে যাওয়ার দরকার নেই। আপনাকে কয়েকটা কথা বলতে এসেছি। বলে চলে যাব।”

তার বলার ধরণেই ফরিদ আহমেদ বুঝতে পারছিলেন খুশির কোনো সংবা অবশ্যই নয়। আবার দুঃসংবাদ!

ফ্যাসফেসে কণ্ঠে বললেন, “বলুন।”

“আপনারা অনেক বছরে ধরে এখানে আছেন। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনাদের এত অধঃপতন হবে—জীবনেও চিন্তা করিনি। মেয়েকে নিয়ে একটা খেলা তো খেললেনই। সেও অবশ্য কম যায় না। চোদ্দ ঘাটের পানি…যাক! এত দুর্নাম যে প্রতিবেশীর আছে তার সাথে টিকে থাকা যায় না। এটাও কম ছিল। আপনারা খান কী বলেন তো! নয় লাখ টাকা দিয়ে কী উদ্ধার করেছেন?” লোকটার চোখমুখ কুঁচকে এলো। ফরিদ একটা কথাও বলতে পারলেন না।

উপর থেকে বাড়িওয়ালার স্ত্রী চেঁচিয়ে উঠলেন, “এত ভদ্রভাবে আলাপের দরকার কী! ঘাড় ধরে বের করে দিতে পারছ না!”

“আহ! চুপ করো তো!”

বলে ফরিদের দিকে তাকালেন তিনি।
“আপনি মনে হয় জানেন না রোজ সকালে আপনার ফ্ল্যাটে কি নাটক চলছে। প্রত্যেকটা দিন দুই চারজন পাওনাদার এসে যে বাজার বসায়—সেখানে কোনো ভদ্রলোক থাকতে পারে না। মহিলাদের যে ভাষা! ছি ছি!”

ফরিদ আহমেদ মাথা নিচু করে থাকলেন। ফাবিহা আর সহ্য করতে পারল না। ভাত ঝেড়ে উঠে এলো। বাবার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “আপনি কী বলতে চাচ্ছেন নির্দ্বিধায় বলে ফেলুন আঙ্কেল। আমাদের দূরাবস্থার কথা চিন্তা করে আপনাকে প্রেশার বাড়াতে হবে না।”

বাড়িওয়ালা মুখ খোলার আগেই উপর থেকে বিকট আওয়াজে একটা গালি ভেসে এলো। যে ভাষায় মহিলা গালি দিলেন—তা ভদ্র সমাজে উল্লেখ করার মতো নয়।

ফরিদ আহমেদ এই পর্যায়ে কথা বললেন, “ভাষার পাঠ আপনি নিজের বাড়িতেই দিয়েন।”

বাড়িওয়ালা চরম ক্ষেপে গেলেন। চোখমুখ উল্টে বললেন, “ভুল বলেছে নাকি! এই নাকি আবার টিচারের মেয়ে! ভার্সিটিতে কী করে বেড়ায় আল্লাহ জানে। শোনেন ফরিদ ভাই, আগামী মাসের ভেতরে ঘর ফাঁকা করে দেবেন। মানুষ ভাড়া দিয়েছিলাম, জন্তু-জানোয়ার রাখব না।” বলে দাঁড়ালেন না তিনি। ধুপধাপ করে চলে গেলেন।

তারপর উপর থেকে গালির বর্ষণ শুরু হলো। খাওয়ার টেবিলে চারটে প্রাণ দম আটকে বসে রইলো। কিন্তু কান দুটো আটকাতে পারল না।

মাস শেষ হওয়ার তখন কেবল সাতদিন বাকি। পকেটের অবস্থা করুন। অন্ধকার বারান্দায় বসে সামনে তাকাতে চাইলেন ফরিদ। কিছুই দেখতে পেলেন না।

ফাবিহা পাশে এসে দাঁড়াল। নূরজাহান সে সাহসটুকুও কুলিয়ে উঠতে পারলেন না।

ফাবিহা নরম কণ্ঠে বলল, “চিন্তা করো না বাবা। কালকে থেকেই বাসা খোঁজা শুরু করব ইনশাআল্লাহ।”

“ভাড়া কী করব, মা? আমি যে কোনো দিশা পাচ্ছি না।”

“আমি টিউশনির চেষ্টা করছি বাবা। হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।” যদিও সে আশার টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না—তবু বাবার শুকনো মুখটা দেখে চুপ থাকতে পারল না ফাবিহা।

ফরিদের কষ্ট আরও খানিকটা বাড়ল। এখন, এই বয়সে মেয়েটাকেও রাস্তায় নামতে হবে! নিজেকে বড় ব্যর্থ মনে হলো।

“যা মা, শুয়ে পড়। আমি একটু বসি।”

ফাবিহা থাকতে চাইলেও নূরজাহানের ইশারায় চলে যেতে হলো। নূরজাহান নিচু কণ্ঠে বললেন, “দুই রুমের বাড়ি খুঁজিস ফাবিহা। যত কম ভাড়ায় হয়। ঘরের জিনিস কিছু বিক্রি করে দিলেও দুটো টাকা আসবে।”
ফাবিহা কোনো উত্তর দিয়ে পারল না। সিমি অন্ধকারে সবটা শুনল। সহসাই তার বুকের ভেতর একটা ভয় জন্ম নিলো।

বহুদিন পর ফরিদ নিজের পেইজে ঢুকলেন। ‘নওরোজ’ এর সাতটা পর্বের পর পেইজে আর কিছু পোস্ট করা হয়নি। অনেকেই গল্প চেয়ে কমেন্ট করেছে। দুই একজন মেসেজও পাঠিয়েছে। এর মাঝে একজনের কমেন্টে খুব চোখে লাগল।

“মরে-টরে গেলো নাকি? আল্লাহ রানিং গল্প শেষ করার আগে কারো মরণ দিও না।”

কমেন্টটা অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন ফরিদ। যে ব্যক্তি এটা লিখেছে—তার আইডি এই প্রথম দেখলেন তিনি। আগে কখনও রিয়্যাক্ট, কমেন্ট করেনি।

ব্যাক বাটনে ক্লিক করার সাথে সাথে কয়েকজন লেখকের পেইজ এলো। বেশিরভাগ লেখিকা, কিছু লেখকও আছে। তাদের রিয়্যাক্ট দেখে অবাক হলেন তিনি। ভেবেছিলেন এখন বোধহয় পাঠক তেমন নেই। কিন্তু এই যে পাঠক! পাঁচ সাত হাজার রিয়্যাক্ট! অথচ পাঁচ সাতটা কমেন্টও তার কপালে জোটে না। আগ্রহবশত কিছু লাইন পড়লেন। কোনোটাতেই আগাতে পারলেন না। বাক্য বিন্যাস দেখেই বোঝা যায় পরিপক্কতা আসেনি। এদের লেখা এত মানুষ পড়ে!

তাকে আরও অবাক করে দিলো পরের পোস্ট। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে ফলো না দেয়ায় লেখালেখি সংক্রান্ত সব পোস্ট আসে। ই-বুক বিষয়টা সম্পর্কে ফাবিহা একদিন বলেছিল। বিস্মিত হয়ে দেখলেন মানুষের পাঁচ সাত হাজার কপি ই-বুক সেল হচ্ছে। এদেশে পাঠকও আছে, তাদের টাকাও আছে। তবে তার কপালটা কেন গড়ের মাঠ?

প্রশ্নটা অন্ধকারেই হারিয়ে গেলো।

—

পরেরদিন যখন ক্লাসের সব মেয়েদের কাছে হন্যে হয়ে একটা টিউশনির খোঁজ করছে ফাবিহা, তখন আচমকা একটা মেয়ে প্রস্তাব দিলো, “ভয়েস আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করবে, ফাবিহা?”

চলমান~

(এই গল্প রানিং থাকা অবস্থায় কি ৫০০ রিয়্যাক্ট পাব 🥹)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 17 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন