#বনজোছনা
১৮.
ফাবিহা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো, “ভয়েস আর্টিস্ট মানে?”
মিলি খলবলিয়ে উঠল, “আমরা কয়েকজন মিলে একটা ইউটিউব চ্যানেল চালাই। ক্লাসিক গল্প, উপন্যাস এগুলো ভয়েস ওভার করে ভিডিও দেয়া হয়। ওখানে কাজ করবে? আমাদের চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার কিন্তু দুই লাখ তেত্রিশ হাজার। মোটেও ফ্যালনা নয়!”
ফাবিহা বলল, “কাজটা আসলে কী?”
“কঠিন কিছুই না। নাটকে যেমন একটা চরিত্রের রোল প্লে করতে হয়। এখানে তেমন সেই চরিত্রের ভয়েস দিতে হবে। একটা উদাহরন দিই। ধরো, আমরা পরিণীতা উপন্যাস নিয়ে কাজ করছি। তোমাকে ললিতার রোল দেয়া হলো। পুরো ভিডিওতে তুমি নিজেকে ওর জায়গায় রেখে কথা বলবে। সোজা বাংলায়—রিডিং পড়বে। বুঝতে পেরেছ?
এই এতক্ষণে বিষয়টা পরিষ্কার হলো। ফাবিহা জানে তার কন্ঠ ভালো, বাচনভঙ্গি পরিষ্কার। এজন্যই বোধহয় এই অফার। সে বলল, “ডিউটি টাইম কতক্ষণ?”
“আরে আমাদের তো ধরা-বাধা কিছু না। সপ্তাহে একটা করে উপন্যাস আপলোড করা হয়। দুদিনে হয়ে গেলে বাকি চারদিন ছুটি। এ কি আর দশটা পাঁচটা অফিস ভাবছো নাকি!”
“তোমাদের কি কোনো স্টুডিও আছে?”
এই পর্যায়ে মিলির চেহারায় একটু ভাবালুতা খেলে গেল।
“না রে! স্টুডিও এখন নিতে পারিনি। আপাতত একেকদিন একেকজনের বাড়িতে বসে রেকর্ডিং চলে। তবে সৌমিক ভাই খুব চেষ্টা করছে একটা স্টুডিও নেবার। তুমি রাজি থাকলে তার সাথে আলাপ করিয়ে দেব। বাকি কথা ভাইয়ার সাথেই সাড়তে পারবে।”
“আচ্ছা, স্যালারি সম্পর্কে একটা ধারনা দাও।”
“তুমি কতটুকু সময় দিচ্ছ তার উপরে নির্ভর করে। তাছাড়া শুরুতে একটু কম হলেও দু তিন মাসের ভেতর বেড়ে যাবে। মোটামুটি সাইজের উপন্যাসে পাঁচ থেকে সাত হাজার পেতে পারো।”
ফাবিহা খানিকক্ষণ ভেবে বলল, “আমি তোমাকে জানাব।”
সে সারারাত চিন্তা করল। ক্ষণে ক্ষণে দেয়ালের ওপাশ থেকে ভেসে এলো ফরিদ আহমেদের বুক চেরা দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ। আধার ঘন হলেও কারো চোখেই ঘুম ধরা দিলো না।
ফাবিহা একবার ভাবল বাবার সাথে একটু পরামর্শ করে। পরক্ষণেই ভাবনাটা বাদ দিল সে। বাবা সেদিন টিউশনির কথা শুনেই কেমন মুখ শুকনো করেছিলেন। আজও নিশ্চয়ই খুব খুশি হবেন না। অথচ এখন টাকার বড় দরকার। ওদিকে আবার বাড়িও পাওয়া যাচ্ছে না। ধারে–কাছে সকলেই আট নয় হাজার ভাড়া চায়। অথচ তাদের পকেটের অবস্থা বর্ণনা করার পর্যায়ে নেই। আজ বুকশেলফ বিক্রি করার প্রস্তাবটা আড়ে-ঠাড়ে দিয়েছিলেন নূরজাহান। ফাবিহা হলুদ ডিমলাইটের আলোয় সোজা ঘরের উত্তর দিকের দেয়ালে তাকালো। অর্ধেক অংশ জুড়ে রয়েছে বার বছর পুরোনো একটা বুকশেলফ। অটবির ঐ ফার্নিচারের গায়ে যতটুকু না ধুলো জমে আছে, তারচে বেশি জমে আছে স্মৃতি। বুকশেলফটা বিক্রি করে দিলে তারা বেশ কিছু টাকা পাবে। কিন্তু স্মৃতিগুলো তখন অনাথ হয়ে যাবে। নতুন মালিক নিশ্চয়ই পুরোনো আসবাবের সাথে স্মৃতির দায়ভার গ্রহণ করবেন না! ফাবিহা টের পাচ্ছিল তার চোখ জ্বলছে। চোখ বন্ধ করে সে তিনটে সিদ্ধান্ত নিলো—বুকশেলফ বিক্রির প্রস্তাবে মত দেবে, পাঁচশ সাতষট্টিটা বইয়ের সবগুলো বিক্রি করে দেবে এবং মিলির প্রস্তাবে রাজি হবে।
সকালে উঠেই সে নূরজাহানের কাছে গেল, “আম্মু, বুকশেলফটা বিক্রি করে দিও।” স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে এক গ্লাস পানি খেলে সে। দাঁত ব্রাশ করার পর পানি খেলে মুখের ভেতর কেমন একটা শিরশিরানি ঠান্ডা লাগে। এই গরমেও শীত শীত একটা ভাব গায়ে কাঁটা দিয়ে গেলো। শীত আসতে আর কত দেরি? কেউ যেন ফিসফিসিয়ে বলে গেল, Winter is coming, spring isn’t far behind...
নূরজাহান ফ্রিজ থেকে যে শুকনো দুটো পটল বের করেছিলেন সেগুলো একপাশে রেখে আলগোছে মেয়ের পাশে দাঁড়ালেন।
“আমার উপরে রাগ রাখিস না মা।” তার কণ্ঠের কম্পন বহু চেষ্টা করেও লুকাতে পারলেন না। বুকশেলফটা যে ফাবিহার কত শখের—এটা কে না জানে! প্রতি শুক্রবারে সবগুলো বই পরিষ্কার করা, পুরো বুকশেলফ ধোয়া-মোছা করা, মাসে একবার বইগুলো রোদে শুকনো — মেয়েটার সে ভালোবাসার প্রমাণ বহন করে।
ফাবিহা ক্ষীণ হেসে মায়ের দিকে তাকালো। চট করে একটা কবিতা মাথায় এলো,
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়,
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি!”
বইগুলো বিক্রি করে সে কিছু টাকা পাবে, সেগুলো দিয়ে তাদের উদরপূর্তির জন্য রুটি কেনা হবে। খালি পড়ে রইবে মনটা। তার ক্ষুধার চিন্তা এ ধরণীতে খুব কম মানুষই করেছে।
“রাগ কীসের? মানুষের জীবনে বিপদ আসে না!” চোখ সরিয়ে নিলো ফাবিহা। আশ্চর্য! মায়ের চেহারার দিকে তাকিয়ে তার চোখের জ্বলুনি আবার ফিরে এসেছে।
তড়িঘড়ি সে উঠে পড়ল। ফরিদ আহমেদ মসজিদের উদ্দেশ্যে বের হচ্ছিলেন। ফাবিহা বলল, “বাবা, আজকে ভার্সিটিতে যাওয়ার আগে এক পাক বাড়ি খুঁজে যাব।”
“তুই যাবি কেন?”
“তোমার এক যাওয়া চলবে না। ইদানীং যে রোদ পড়ছে! অসুস্থ হয়ে যাবা। কোনোভাবেই একা যাবা না বাবা!” অগত্যা ফরিদকে সে কথা মেনে নিতে হলো। আজকাল আর কোনো কিছুতেই জোর করতে পারেন না তিনি।
নামাজ পড়ে, ভোরের নরম আলোয় বইগুলোর ছবি তুললো ফাবিহা। ঘণ্টাখানেক সময় লেগে গেলো। গ্যালারির হাজারখানেক ছবি দেখতে দেখতে তার দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
নতুন বইয়ের পাতায় একটা আনকোরা গন্ধ থাকে। নতুন গল্পের ভাঁজ করা রহস্য প্রতি পাতায় পাতায় গন্ধ ছড়িয়ে রাখে। পুরোনো হয়ে গেলে সে গন্ধ ফিকে হয়ে যায়। থাকে কেবল একটা পুরোনো, মলিন, ছড়ানো কালির—স্মৃতিগন্ধ।
ফাবিহা বিভিন্ন রিসাইকেল গ্রুপে বইগুলোর সেল পোস্ট দিলো। স্মৃতিগন্ধও বিক্রি করতে পারলে তার বুকের ভার কিছুটা কমতো।
ক্লাসের জন্য একেবার গুছিয়ে ফরিদের সাথে বের হলো ফাবিহা।
এ পাড়ায় তারা থাকছে আজ প্রায় পনের বছর যাবত। আশেপাশের সব বাড়িঘরই মোটামুটি পরিচিত। এবং এই পরিচয় তাদের সুবিধা দিতে পারেনি। বরং পরিচিত বলেই তারা এমন ঋণী পরিবার, গোঁজামিল চরিত্রের মেয়েকে ঘর ভাড়া দেবে না। সেজন্য ফাবিহা প্রথমেই বলল, “বাবা, আমরা একটু দূরের পাড়ায় যাই চলো।”
কারণটা ফরিদের অজানা ছিল না। তিনি কোনো প্রতিউত্তর দিতে পারলেন না। মেয়ের সাথে হাঁটতে থাকলেন। কিন্তু দীর্ঘ তিন ঘণ্টায় তেরটা বাড়ির মালিকের সাথে যোগাযোগ করেও একটা দিশা পাওয়া গেলো না। সকলের ভাড়াই বাজেট পেরিয়ে বিপদ সীমার ওপাড়ে চলে গেছে। দু রুমের বাড়ি হলেও কেউই ছয়ের নিচে নামতে চান না। ফাবিহার মনে হলো—দুনিয়ার সবাই উঁচুর দিকে ছুটছে। ছুটতে ছুটতে বুর্জ খলিফা থেকে চাঁদ, চাঁদ থেকে মঙ্গলে চলে যাচ্ছে। কেবল তারাই ক্রমে ক্রমে নিচ থেকে আরও নিচে যাচ্ছে। খুঁজছে পাতালপুরী—যেখানে কেউ তাদের ঠিকানা পাবে না।
ক্লান্ত হয়ে ফরিদ বাস স্ট্যান্ডের ছাউনিতে বসলেন। ফাবিহা বলল, “একটু গলির ভেতর যেতে হবে বাবা। রাস্তার ধারের বাড়িতে কম হবে না।” তাদের বর্তমান বাড়ির ভাড়া পাঁচ হাজার। বহু পুরোনো মানুষ বলে বাড়িওয়ালা ভাড়া তেমন বাড়াননি। এ পর্যন্ত তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করেছেন—সেটাও বলা যায় না। কেবল এই কদিনেই…ফাবিহার বুক চিরে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিশে গেলো।
“আজকে থাক। তোর ক্লাস কখন?”
“আর আধা ঘণ্টা পর।”
“তাহলে তুই যা।”
“বাবা।”
“বল।”
“একটা কথা বলব।”
“বল, মা!” মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন ফরিদ।
ফাবিহা বলল, “একটা কাজ পেয়েছি বাবা। ভয়েস আর্টিস্টের কাজ। বিভিন্ন ভিডিওতে ভয়েস দিতে হয়।”
“টিভিতে?”
“না না! ইউটিউব চ্যানেলে।”
“করতে চাচ্ছিস?”
“তুমি যদি অনুমতি দাও।”
ফরিদ সহসাই নিষেধ করতে পারলেন না।
“কাদের মাধ্যমে খোঁজ পেয়েছিস?”
“আমার ক্লাসের এক মেয়ে। বিস্তারিত এখনও জানি না। তুমি বললে খোঁজ নেব। নেব বাবা?”
ফরিদ মাথা নিচু করলেন। রাস্তা ক্রমেই মানুষের পদচারণায় জেগে উঠছে। সকালের শিশির মুছে যাচ্ছে ব্যস্ত বাতাসের আঘাতে।
অনেকক্ষণ পর তিনি বললেন, “তোর জীবনটা কঠিন হয়ে গেল মা রে!”
ফাবিহা বাবার কাঁধে হাত রাখল, “একেক জন জীবনে একেক ভাবে পরীক্ষায় পড়ে বাবা। আমাদের পরীক্ষা এভাবে হচ্ছে। আফসোস করলে সেটায় উত্তীর্ণ হওয়া যাবে না। তুমি আমার জন্য দোয়া করো।”
ফরিদের গলা ভারী হয়ে এসেছে। তিনি কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। বাবাকে রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে ফাবিহাও ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।
ক্লাসে যেয়েই মিলিকে সম্মতি জানালো ফাবিহা। লাঞ্চ ব্রেকে ক্যান্টিনে চ্যানেলের বাকিদের সাথে তাকে আলাপ করিয়ে দিলো মিলি। ফাবিহা জানতে পারল অ্যাডমিন সকলেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী। সবচেয়ে সিনিয়র—সৌমিক—এই গতমাসেই মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছে। ফাবিহাকে নিয়ে তিনজন মেয়ে এবং চারজন ছেলে—এত সাতজনের দলের নাম—খসড়া। ইউটিউবে তাদের সবচেয়ে ভিউ পাওয়া ভিডিও সিরিজ—দেবদাস। এগারো মাসের মাথায় ওটা নয় মিলিয়ন হিট করেছে। চ্যানেলের বয়স সতেরমাস হলেও এর যাত্রা মূলত দেবদাস দিয়েই শুরু। ঠিক এগার মাস আগে। তারপর থেকে ইনকাম একেবারেই মন্দ হচ্ছে না।
সৌমিক বলল, “তোমার একটা ভয়েস রেকর্ড দরকার হবে ফাবিহা। অনেকের কণ্ঠ এমনি ভালো হলেও রেকর্ডিংয়ে ক্লিয়ার আসে না।” বিল দিয়ে কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে টেবিলে চাপড় দিলো সৌমিক। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, “গাইজ! তোমাদের একটা গুড নিউজ দেয়া হয়নি!”
সৌমিকের পাশের ছেলেটা ফাবিহার ব্যাচমেট। সে বলল, “কী নিউজ, ভাই?”
“এক্কেবারে পানির দামে একটা স্টুডিও পেয়ে গেছি!” কথাটা শোনার সাথে সাথেই ছয় জনের মাঝে একটা গুঞ্জন উঠে গেলো। ক্যান্টিনের সমস্ত কোলাহল যেন ঐ দক্ষিণের কোণায় যেয়ে জমা হলো।
ফাবিহা চুপচাপ কেবল তাদের উচ্ছ্বাস দেখছিল।
তাদের শান্ত করে সৌমিক বলল, “সাইলেন্স!” কলকাকলি কমে এলো।
সৌমিক গলা ঝেড়ে স্পষ্ট ভঙ্গিতে বলল, “শোনো মেটস, স্টুডিও মূলত একটা ঘর। মানুষের স্পর্শেই সেটা মামুলি ঘর থেকে স্টুডিও হয়ে ওঠে। আমরা যে জায়গাটা নিচ্ছি, সেটাও স্রেফ ইট সিমেন্টের একটা ঘর। কোনো ম্যাটেরিয়ালস, সাউন্ড সিস্টেম, মাইক্রোফোন, এটসেট্রা কিচ্ছু নেই। ঘরটা আমাদের নিজেদের গুছিয়ে নিয়েই স্টুডিওতে রূপ দিতে হবে। অ্যাম আই ক্লিয়ার!”
“ইয়েস বস!” বলেই সবাই হেসে ফেলল। এদের কমান্ডো স্টাইলের ঘোষণা শুনে ফাবিহা একটু অবাক হলেও বুঝল এ দলে সৌমিকের প্রভাব কতখানি। পাশাপাশি এরা সকলেই যে তার ভক্ত সেটাও স্পষ্ট। কারণটাও ঝাপসা নয়। এটুকুতে সৌমিককে যতখানি দেখেছে—ব্যক্তিত্ববান বলেই মনে হয়েছে ফাবিহার। কথা বলার ভঙ্গিতে আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠেছে। এমন না হলেই বরং একটা দল চালানো কঠিন।
সৌমিক ফাবিহার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার ছোট্ট একটা রেকর্ডিং দাও।”
“এখনই?”
“কোনো প্রবলেম?”
“না।” মাথা নাড়ল ফাবিহা।
মিলি ফোন থেকে দুটো লাইন দেখালো। সৌমিক ফোন এগিয়ে ধরতেই ফাবিহা স্পষ্ট কণ্ঠে বলল, “এই যে মন খারাপের বেলা, তার ধূসর রঙের মেঘ আর রংহীন বৃষ্টি—এই সমস্তটাই কাকে নির্দেশ করে জানো? জীবনের শ্রাবণকে।”
রেকর্ডিং বন্ধ করেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল সৌমিক, “ফ্যাবুলাস! তুমি এর আগেও কোথাও কাজ করেছ নাকি?”
“না।”
“মিলি! এতদিন লাগলো ওকে আবিষ্কার করতে?” মিলির দিকে তাকিয়ে বলল সৌমিক। দৃষ্টি ফাবিহার দিকে ঘুরিয়ে বলল, “আমাদের পরবর্তী প্রজেক্ট—অপেক্ষা, হুমায়ূন আহমেদ। ইদানীং খুব হাইপে আছে। তুমি মিতুর রোলে থাকবে, ওই চরিত্রের জন্য একটু রাফ-টাফ কথা দরকার। তুমি পারবে। আর মিলি, তুমি সুপ্রভা। বাকিদেরটা গ্রুপে জানিয়ে দেব। ফাবিহা আমাকে এক দেড় পৃষ্ঠা পড়ে ভয়েস দিও। আজকে উঠছি।”
ফাবিহার কাছে এ সবটাই নতুন। নতুন জিনিস আবিষ্কারের মাঝে অন্যরকম আনন্দ আছে। মাথায় আর্থিক কালবোশেখীর ভয়টা না থাকলে এই নতুন অভিজ্ঞতার আনন্দ ঝুলি ভরে নিজের করে নিতে পারত সে। কিন্তু এই মুহূর্তে একটা কথা ছাড়া আর কিছুই তার মাথায় আসছে না—কত টাকা দেবে!
সেদিন বাড়ি ফিরতে মেসেজ চেক করতেই দেখল বইয়ের জন্য বেশ অনেকেই মেসেজ দিয়েছে। একে একে পনের জনকে রিপ্লাই দিলো সে। এর মাঝে ভূতের মতো উদয় হলো সিমি। ফাবিহা মুখ না উঠিয়েই ছড়ানো পা সরিয়ে দিল। সিমি কিন্তু বসল না। প্রায় পাঁচ মিনিট পর ফোন লক করে মাথা ওঠাতেই ফাবিহা দেখল সিমি ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
“কী হয়েছে সিমি?” উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ফাবিহা।
সিমি যেন এই প্রশ্নে অপেক্ষাতেই ছিল। ফাবিহার পায়ের উপর আছড়ে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল।
ফাবিহা তাজ্জব কণ্ঠ বলল, “এই সিমি! আল্লাহ! কাঁদছিস কেন? সিমি!”
কাঁদতে কাঁদতেই সিমি অনেককিছু বলল। ফাবিহা কিছুই বুঝতে পারল না। জোর করে সিমিকে উঠিয়ে বসালো সে। চোখ মুছে বলল, “আস্তে আস্তে বল তো। কী হয়েছে?”
কান্না শুনে নূরজাহান ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন। বিরক্ত ভঙ্গিতে তিনি বললেন, “এমন করছে কেন ও? কোনোদিন মনে হচ্ছে কেউ কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেয়নি!” অথচ তার কণ্ঠের ভেজা বাতাস মুহূর্তের মাঝে পুরো ঘরকে আর্দ্র করে ফেলল।
ফাবিহা নরম চোখে তাকালো সিমির দিকে। সে দৃষ্টিতে সিমির ভেতরটা ভেঙে চুরে এলো। মিনতি করে সে বলল, “আমাকে আপনাদের সাথে রাখবেন না, ছোট আপা?”
“তোকে খাওয়াব কী আর টাকাই দেব কী! আমাদের অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছিস।” নূরজাহান বললেন।
“আপনারা যা খাবেন, তাই খাবো খালাম্মা। আমার টাকা দেয়া লাগবে না।”
ফাবিহা ওর অবুঝ কথায় হেসে ফেলল, “কাজ করবি আর টাকা নিবি না?”
সিমি চোখ মুছে আশ্বিনের প্রবল বর্ষণে ঠেকিয়ে রাখার একটি বৃথা চেষ্টা করল।
নাক টেনে বলল, “ধরেন আমি আপনাদের বাড়িতে ভাড়া থাকছি, সেই ভাড়া শোধ হবে আমার কাজের টাকা দিয়ে। কাটাকাটি।”
নূরজাহান ক্লান্ত ভঙ্গিতে বললেন, “তোকে সত্যিই রাখার সাধ্য নেই সিমি।” বলে তিনি দাঁড়ালেন না। ব্যর্থতার ভারে তার পা ভেঙে আসছে।
ফাবিহা সিমির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “কত জায়গায় কাজ করেছিস! এখন বড় হয়ে এমন করলে হয়?”
“বড় হয়েছি বলেই তো এমন করছি। সবাই তো ছোট আপা না।” মনে মনে বলল সিমি। ফাবিহার দু’পা আঁকড়ে ধরে বলল, “ছোট আপা! দয়া করে আমাকে রাখেন। এক বেলা দরকার হয় খাবো না। যত কম খাওয়া যায় তাই খাবো। বড় আপা বেঁচে থাকলে কি তাকে ফেলে দিতেন?” বলেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল সে। ওর মাথায় বুলিয়ে দেয়া ফাবিহার হাতটা সহসাই থমকে গেলো।
গভীর রাতে ফাবিহা বসার ঘরে এলো। টর্চের ক্ষীণ আলো তাকে ঘুমুতে দেয়নি। ঘর থেকে বের হতেই দেখা গেলো নূরজাহান টর্চ জ্বেলে কাঁথা সেলাই করছেন। এটা পৌঁছে দিতে পারলেই নগদে তিন হাজার টাকা পাবেন। অন্তত আগামী এক সপ্তাহের বাজারের চিন্তা করতে হবে না।
“আম্মু!” আচমকা ডাকে কেঁপে উঠলেন নূরজাহান।
বুকে হাত দিয়ে দম ছাড়লেন। ফের কাঁথায় মনযোগ দিয়ে বললেন, “ঘুমাসনি কেন?”
ফাবিহা মায়ের পাশে বসল, “তুমি ঘুমাওনি কেন?”
“অপরাধের শাস্তি ভোগ করছি।”
ফাবিহা ছোট্ট করে নিশ্বাস ছাড়ল।
“আম্মু, এই দুনিয়ায় একেক মানুষের একেক রকম ভুল। ভুলের ঊর্ধ্বে কেউ নেই। কারো ভুলের ওজন বেশি, কারো কম। তোমারটার ওজন হয়তো একটু বেশি। কিন্তু এই পঁচিশ বছরের সংসারের যুদ্ধে তুমি যে রক্ত দিয়েছ—তার সামনে এই ভুল কিচ্ছু না!”
নূরজাহান ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। মাকে বুকে টেনে নিল ফাবিহা। স্বান্তনা দিয়ে নদীর গতিপথ পাল্টে দিল না। বরং কাঁদতে দিয়ে তাকে বইতে দিলো নিজের মতো করে। পিঠে হাত বুলিয়ে বোঝালো—ভুল হলেও তাকে কখনো বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়া হবে না।
নূরজাহান অস্পষ্ট কণ্ঠে বললেন, “তোর বাবা আমার সাথে আগের মতো কথা বলে না, ডাকে না। মনে হয় অচেনা একটা লোকের সাথে বাস করছি।”
“তুমি এত বড় একটা কথা লুকিয়েছ—বাবা খুব কষ্ট পেয়েছে আম্মু। তাছাড়া ঝড়ের বেশিরভাগ তার উপর দিয়েই যাচ্ছে। বাবার জায়গা থেকে একটু ভাববা না?”
নূরজাহান চোখ মুছলেন, “যা, ঘুমাতে যা।”
“একটা কথা বলি আম্মু।”
“বল।” ঝাপসা চোখের আধার টর্চের দুর্বল আলো কাটাতে পারল না।
“সিমি থাকুক?”
নূরজাহান মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, “একটা মানুষকে রাখা কি চাট্টিখানি কথা?”
ফাবিহা ফ্যাসফেসে কণ্ঠে বলল, “যতদিন আমরা খাচ্ছি—ততদিন অন্তত থাকুক।”
ফাবিহার মুখের দিকে তাকিয়ে নিষেধ করতে পারলেন না নূরজাহান।
পরেরদিন ভার্সিটি শেষে অপেক্ষার প্রথম অর্ধেকের রেকর্ডিং শেষ করে আসতে দু’ঘণ্টা দেরি হলো। বলা বাহুল্য, তার ভয়েস ওভার সৌমিক অসম্ভব পছন্দ করেছে। খুব তাড়াতাড়ি হাতে কিছু টাকা আসবে ভেবে ফাবিহাও নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছে। ফলাফল এই যে—প্রথম দিনেই ‘খসড়া’য় তার অবস্থান বেশ পাকাপোক্ত হয়ে গেছে।
বাড়ি এসেই সোজা খেতে বসে পড়ল সে। ক্ষুধায় মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। সে সময় শুধু জলপাইয়ের আচার দিয়ে ডাল মাখা ভাতটুকুই মনে হলো অমৃত।
মেয়েকে খেতে দিয়ে নূরজাহান গজগজ করে বললেন, “থাকতে দিয়েছি বলে কি ওর নাটক দেখতে হবে এখন!”
ফাবিহা কপাল কুচকে তাকালো, “কী হয়েছে?”
“সিমি সকালেও খায়নি, দুপুরেও খায়নি। এসব কিন্তু আমার একদম ভালো লাগে না!” বলে হনহন করে নিজের ঘরে চলে গেলেন তিনি। ফাবিহা গতকালকের কথা মনে করল। সিমি বলেছিল যতটুকু কম খাওয়া যায় তাই খাবে। আধখাওয়া ভাতের প্লেট নিয়েই সিমির ঘরে চলে গেল সে।
সিমি নূরজাহানের সদ্য সেলাই করা কাঁথা ভাঁজ করছিল। ফাবিহা তার চকিতে বসে বলল, “খাসনি নাকি?”
সিমি অস্বস্তি ভরে তাকালো। উত্তর দিলো না।
ফাবিহা এক লোকমা ওর মুখের সামনে ধরে বলল, “খা সিমি। আমার বড় আপা হলে আমার প্লেট থেকেই খেত।”
সিমি ঝাপসা চোখে মুখ খুলল। এ মানুষগুলোর সাথে মাটি কামড়ে পড়ে থাকার সিদ্ধান্তটা একেবারেই ভুল মনে হলো না।
খাওয়া শেষে, আসরের পরপর ফরিদের সাথে আবার বাড়ি খুঁজতে বের হলো ফাবিহা। রিকশা করে আধা ঘণ্টার দূরত্বে, বেশ ভেতরের দিকে একটা পাড়ায় ঢুকল। এত বছর থাকলেও এদিকে কখনও তাদের আসা হয়নি। সবার কর্মক্ষেত্র থেকে একেবারেই উল্টো দিক।
তবে লাভের লাভ কিছু হলো না। এদিকে কোনো টু-লেটই দেখা যাচ্ছে না। দুজন যখন ব্যর্থ মনোরথে ফিরছে, তখন দিনের নিভে যাওয়া আলোয় একটা টু-লেট দেখল ফাবিহা। উচ্ছ্বসিত হয়ে বাবার হাত টান দিলো, “ওই যে বাবা!”
পুরোনো ধাঁচের দোতলা বাড়ি। রক্তবর্ণ দেয়ালের গায়ে জায়গায় জায়গায় শ্যাওলা জমে গাঢ় সবুজ হয়ে গেছে। সদর দরজা পেরিয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে ফরিদ হাঁক ছাড়লেন, “কেউ বাড়িতে আছেন!”
অল্প বয়সী একটা মেয়ে বাচ্চা কোলে বেরিয়ে এলো। জানা গেলো এই মুহূর্তে আলাপ করার মতো বাড়িতে কেউ নেই। নাম্বার লেনাদেনার পর ফিরতি পথে বাড়ির নামটা ফাবিহার নজর কাড়ল। কুন্দকলি।
চলমান~
(ভীষণ দুঃখিত পাঠক! আমি সাধারণত জিবোর্ড ব্যবহার করে অভ্যস্ত। কিন্তু কয়েকদিন ধরেই ফোনে এই কী বোর্ড কাজ করছে না। বাধ্য হয়ে অভ্র ব্যবহার করছি। এটাতে একেবারেই অভ্যস্ত নই বলে প্রচুর বানান ভুল থেকে যাচ্ছে। উপায়ান্তর হয়ে বান্ধবীর ফোন ধার করে লিখছি। তাতেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত দেরি। আশা করছি বিষয়টা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।)