ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনজোছনা

পর্ব 20

লেখক: বিনতে ফিরোজ

#বনজোছনা
২০.

ফারদিন মিনিটখানেক ঘটনাটা দেখল। তারপর আস্তে করে এগিয়ে এলো। ছেলেটার হাত থেকে ওড়না ছাড়িয়ে নিতেই ফাবিহার চোখ জ্বলে উঠল। ছেলে দুটো তাকে দেখে স্পষ্ট থতমত খেলো। ফারদিন এতক্ষণ এখানে ছিল না। হুট করে উদয় হবে বুঝতে পারেনি। সে এক পলক তাকাতেই ছেলে দুটো হেসে বলল, “ভাই চলে আসছেন! সিগারেট আনছেন না?” ফারদিন সিগারেটের একটা প্যাকেট এগিয়ে দিলে সেটা নিয়ে সুড়সুড় করে সরে পড়ল দুজনে।

ওরা চলে যেতেই ঝটকা মেরে ওড়নাটা সরিয়ে নিলো ফাবিহা। ফারদিনের দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, “ওদের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছিস এখন! এগুলো করতে মজা লাগছে তোর!”

“ওদের সাথে ঘুরিনি। দেখা হলো, তাই কথা বলছিলাম।”

“কোথায় কথা বলছিলি! চামচামী করছিলি এটা বলতে লজ্জা লাগছে? পড়াশোনা করার চাইতে আরেকজনের সিগারেট কিনে দিয়ে তোর জীবন ধন্য হচ্ছে তো?”

ফারদিন কোনো উত্তর দিলো না। ফাবিহার ক্রোধ সীমা ছাড়ালো। তার কণ্ঠ বেঁধে আসছিল। চূড়ান্ত অস্থির হয়ে সে বলল, “তোর কী ক্ষতি করেছি আমরা? কীসের প্রতিশোধ নিচ্ছিস। তোর উপস্থিতিতে, তোর সামনে আরেকজন আমাকে হ্যারাস করার সাহস পেয়ে গেলো। একদিন হয়তো সিগারেটের বদলে আমাকে এনে দিতে বললে তুই চোখ বন্ধ করে সেটাই শুনবি!”

“ফাবিহা!” ধমকে উঠল ফারদিন।

মুয়াজ্জিনের আজানের প্রতিধ্বনি ততক্ষণে পশ্চিমাকাশে মিলিয়ে গেছে। ফাবিহা ভেজা কণ্ঠে বলল, “তুই পড়াশোনা ছেড়েছিস, নেশা করতে শুরু করেছিস—তারপরেও তোকে ভাই বলতে আমি দুবার ভাবিনি। আজকে আমার কাজ সহজ করে দিলি। এরপর থেকে ভাবতে সুবিধা হবে—আমার কোনো ভাই নেই। বোনের উত্যক্তকারীদের সাথে আড্ডা দেয়া, তাদের গোলামী করা কোনো মানুষকে আমি নিজের ভাই বলে মনে করি না।”

কথা শেষ করেই বাড়ির পথ ধরল ফাবিহা। পুরোটা রাস্তা চোখ দুটো অবাধ্যতা করল। ফারদিন যদি আজ একটু দায়িত্ববান হতো—তাহলে কি ছেলে দুটো তার ওড়নার দিকে তাকানোর সাহস পেতো? আর্থিক কষ্ট কোনো রকমে সহ্য করা যায়। কিন্তু এসব কীভাবে সহ্য করবে সে!

বাসায় ঢুকে জামাকাপড় পাল্টালো না ফাবিহা। ওভাবেই ওযু করে নামাজ পড়ে নিলো। নূরজাহানকে বলল, “চলো, টাকাগুলো দিয়ে আসি।”

নূরজাহান অবাক হয়ে মেয়ের শক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “টাকা জোগাড় হয়ে গেছে?”

“হ্যাঁ।”

“কোথায় পেলি!”

“বাবার ছাত্র বুকশেলফ নিয়েছে। সেটার দাম অগ্রিম পাঠিয়ে দিয়েছে। কাল-পরশু এসে নিয়ে যাবে।”

“কত দিলো?”

“সতের হাজার।”

“বাকি টাকা?”

উঠে দাঁড়ালো ফাবিহা, “বই বিক্রি করেছি।” জায়নামাজ ভাঁজ করতে করতে উত্তর দিলো সে।
নূরজাহান মূক হয়ে গেলেন। কোনো কথা বলতে পারলেন না।

বের হওয়ার সময় বললেন, “ফারদিনকে নিয়ে যাই। একা যাব?”

“কেন? আমাকে তোমার মানুষ মনে হচ্ছে না?”

“না, তাই বললাম নাকি! সন্ধ্যা হয়ে গেছে…দুটো মেয়ে মানুষ। আচ্ছা চল।” নূরজাহানের মনে হলো মেয়েকে তিনি একটু নয় বেশ অনেকখানি ভয় পাচ্ছেন।

রাস্তায় বের হতেই বললেন, “তোর চোখ এমন লাল লাগছে কেন? পোকা কামড় দিয়েছে নাকি?”

“না। আজকে অভূতপূর্ব একটা দৃশ্য দেখেছি। চোখ দুটো সহ্য করতে পারেনি।”

নূরজাহান ঠাহর করতে পারলেন না মেয়ে মশকরা করছে কি না। কিন্তু দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করে উঠতে পারলেন না। ওকে আজ বড় প্রস্তরকঠিন দেখাচ্ছে।

প্রায় আধা ঘণ্টা হাঁটার পর মহিলার বাড়ির সামনে এসে পৌঁছালো তারা। নূরজাহান কলিং বেল চাপার প্রায় পনের মিনিট পর সে তিন তলা থেকে নেমে এল। অথচ ফাবিহা দেখেছিল কলিং বেলের শব্দ পেয়েই সে বারান্দা থেকে রাস্তায় উঁকি দিয়েছে। সেটা আর মাকে জানাল না।

মহিলা তাদের দেখেই খেঁকিয়ে উঠল, “কখন আসার কথা! এই আপনাদের বিকেল?”

ফাবিহা ঠান্ডা কণ্ঠে বলল, “টাকা কি নিতে চান?”

“নিতে চান মানে! টাকার দায় কার? আমার নাকি তোমার?”

“দেখাই যাচ্ছে।” ছোট করে বলল ফাবিহা। “টাকা নিতে চাইলে ভেতরে ঢুকতে দিন।”

মহিলা একটু ভয় পেলো বলে মনে হলো নূরজাহানের। পেটের মেয়ের ভাব ভঙ্গি দেখে তিনি নিজেও ভয় পাচ্ছেন।

“কেন?”

“বাকি টাকার বিষয়ে আলাপ আলোচনা করতে হবে।”

“কোনো ঢোকাঢুকি হবে না। টাকা দিয়ে বিদায় হও!”

“অসম্ভব! কোনো সাক্ষী ছাড়া আমি টাকা দেব আর দুইদিন পরে যেয়ে আপনি আবার টাকার দাবি করবেন—সেটা হবে না।”

মহিলা বিষম চমকালো। এ যাবৎ মহাজনী করে খুব একটা লাভ করতে পারেনি সে। বিগত এক বছর যাবত এই পন্থা অবলম্বন করছে। টাকা সে সবাইকে দেয় না। দেয় বোকার হদ্দ, একেবারেই গরীব মহিলাদের। এই শ্রেণীর মাথায় বুদ্ধির অবশিষ্টাংশ বলে আর কিছু বাকি থাকে না। ফলে টাকা দেয়া বা নেয়ার সময় যে একজন সাক্ষীর দরকার থাকতে পারে—তা তাদের ফাঁপা মস্তিষ্কে খেলে ওঠে না। এই সুযোগটাই মোক্ষমভাবে ব্যবহার করে সে। কোনো সাক্ষী রাখতে চাইলেও কথার তোড়ে তা ধামাচাপা দিয়ে দেয়। তারপর যতবার টাকার দরকার ততবার পুলিশের ভয় দেখালেই কেল্লা ফতে।

“কোনো সাক্ষীর নাটক হবে না। এসব ধান্দা বুঝি না ভেবেছ! লোক জড়ো করে ভয় দেখাবা—সেসব হবে না!”

ফাবিহা একটু এগিয়ে এলো। মহিলার মাথা তার কাঁধের কাছে এসে থেমেছে। গলা বাড়িয়ে উঁচু হওয়ার একটা আপ্রাণ চেষ্টা তার মাঝে লক্ষণীয়। এতে লাভের লাভ হয়েছে এই যে, কাঁধ ছড়িয়ে থাকায় দেহে একটা অস্বাভাবিক ভাব চোখে বাঁধে। সেটা অনেক সময় পঙ্গুত্ব বলে ভ্রম হয়।

মাথা নিচু করে, চাপা কণ্ঠে সে বলল, “পুলিশ কি আপনার একার? যাদের থেকে টাকা মেরেছেন তাদের নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়ালেই নিজের ইজ্জতটা রাস্তায় দেখতে পাবেন। কিন্তু ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করতে চাই না বলেই আপনাকে সুযোগ দিচ্ছি।” বলে ভেতরে ঢুকে পড়ল ফাবিহা। ঢিলটা একেবারেই আন্দাজে মেরেছে। মহিলার মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছিল লোক ঠকানোর স্বভাব এর কাছে নতুন নয়।

অথচ তার ফাঁপা হু-ম-কিতে ভয় পেয়ে গেলো মহিলা। তাড়াতাড়ি গেট আটকে ভেতরে ঢুকল। নূরজাহান ফ্যালফ্যাল করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। ও কী করতে চাইছে কিছুই বুঝতে পারছেন না।

ফাবিহা দোতলায় যেয়ে থামল। দক্ষিণের ফ্ল্যাটে নক করতেই এক ভদ্রলোক দরজা খুললেন। বয়সে পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ হবেন। এই ভদ্রলোক সরকারি চাকরি পাওয়ার আগ অবধি ফরিদের সহকর্মী ছিলেন। সেই সূত্র ধরেই তাকে চেনে ফাবিহা।

বিনয়ী ভঙ্গিতে সে সালাম দিয়ে বলল, “কেমন আছেন স্যার?”

ভদ্রলোক চোখের চশমা ঠেলে সালামের উত্তর নিলেন। হেসে বললেন, “ফাবিহা নাকি?”

“জি স্যার।”

“এদিকে যে?”

“স্যার আপনাদের বাড়িওয়ালার সাথে আমাদের কিছু লেনদেন হয়েছিল। তার একটা অংশ আজকে পরিশোধ করতে এসেছি। কিন্তু ঝামেলা হলো দুপক্ষের মধ্যবর্তী হিসেবে কেউ নেই। আপনি পূর্ব পরিচিত, তারচেয়ে বড় কথা সত্যবাদী, সেজন্য আপনার দ্বারস্থ হয়েছি। আশা করছি আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না।”

লোকটা দরজা ছেড়ে এগিয়ে এলেন। তার মুখের হাসি মুছে গিয়ে একটু চিন্তা জড়ো হয়েছে। ফাবিহার পেছনে দুজনকে দেখা যাচ্ছে। তার মাঝে একজন তাদের বাড়িওয়ালা।

“ঘটনাটা কী?”

“তেমন কিছুই না স্যার। আমার মা উনার থেকে কিছু টাকা ধার নিয়েছিলেন। সুদ বেড়ে সেটা ষাট হাজারে পৌঁছেছে। আজ সেটার অর্ধেক, অর্থাৎ ত্রিশ হাজার পরিশোধ করব। আপনি শুধু ঘটনাটার সাক্ষী থাকবেন। ব্যস!”

ফাবিহা গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি যতখানি না পরিচিত, তারচেয়ে বেশি জনপ্রিয় তার স্বভাব-চরিত্রের জন্য। এ পাড়ায় আছেন আজ প্রায় নয় বছর যাবৎ। লোকটা নিষেধ করলে ফাবিহার কিছু বলার থাকবে না। কেউই আগ বাড়িয়ে এসব ঝামেলায় জড়াতে চায় না।

ভদ্রলোক বললেন, “বেশ, আছি। ভেতরে এসো। তবে ফরিদ স্যার সুদের পাল্লায় পড়লেন কীভাবে?”

ফাবিহা সে প্রশ্নের উত্তর দেবার সাহস করতে পারল না। ইতোমধ্যেই নূরজাহানের মুখ শুকিয়ে গেছে।

“সমস্যা নেই স্যার। জাস্ট একটা সিগনেচার হলেই কাজ শেষ।”

মেয়ের ইশারা বুঝে নূরজাহান ব্যাগ থেকে টাকা বের করলেন। তার বুক শুকিয়ে গেছে। এই ছেলেকে তিনি চেনেন। ফাবিহার বাবা খুব পছন্দ করত। ঐ কলেজে যখন চাকরি করতো তখন এক-আধবার বাড়িতেও গেছে। আজ তারই সামনে নিজের দুঃখছবি নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ায় কুণ্ঠায় সংকুচিত হয়ে পড়লেন তিনি।

নূরজাহান খেয়াল করেননি ফাবিহা ক্যামেরা ধরেছে। মহিলার হাতে টাকা তুলে দেয়ার পুরো দৃশ্য সে ক্যামেরা বন্দী করল। কাঁধ ব্যাগ থেকে ডায়েরির পৃষ্ঠা বের করে মহিলার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “রশিদ লিখে দিন।”

“আবার রশিদ কেন!” মহিলা অবাক হয়ে তাকালো। “কী লেখা আছে এই কাগজে?”

“আজকের তারিখে আমার আম্মু যে ত্রিশ হাজার টাকা পরিশোধ করেছে সেটাই লেখা আছে। আর বাকি থাকল ত্রিশ হাজার তিনশ তিপ্পান্ন টাকা। সই করে দিন।”

মহিলা সই করতে করতে বিড়বিড় করে বলল, “সপ্তাহ গড়ালেই সুদ যোগ হবে। দশ হাজারে এক হাজার…!”

“সেটাও লেখা আছে।” মহিলার জবান বন্ধ করে দিল ফাবিহা।

পরপর তাতে নূরজাহান এবং ভদ্রলোক সই করলেন। একই কাগজের দুটো কপি করেছিল ফাবিহা। একটা মহিলার কাছে দিয়ে আরেকটা নিজের কাছে রাখল। সালাম দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসতেই নূরজাহান খপ করে মেয়ের হাত ধরলেন।

“এত বুদ্ধি তোর মাথায় আসলো কীভাবে?”

ফাবিহা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, “সবাই বোকা হলে চলবে কীভাবে, আম্মু? টাকা-পয়সা লেনদেন খুব সাংঘাতিক বিষয়। যেকোনো ক্ষেত্রেই লেনদেনের সময় সাক্ষী রাখতে হয়। আর এখানে তো সুদের বিষ আছে। তোমার কোনো রশিদ নেই, কোনো সাক্ষী নেই। আমরা টাকা দিলেই ওরা মানবে?” ফাবিহা বলতে চেয়েছিল—একবার আমাকে অন্তত বলতে পারতে! কথাটা গিলে ফেলল সে। ফেলে আসা সময়ে চোখ ঘুরিয়ে তাকালেই দেখতে পায় নূরজাহানের তৃষ্ণার্ত চোখের কাতর দৃষ্টি। মাকে বোঝার চেষ্টা সেও তো করেনি। তার নিজের কি কোনোই দোষ নেই?

নূরজাহানের হাঁটার গতি কমে এসেছিল। আশঙ্কায় বুকে চাপ অনুভব করছিলেন তিনি। সে সময় অনুভব করলেন একটা মসৃণ হাত তার দূর্বল হাতটাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে। যেভাবে তিনি ধরেছিলেন অপারেশন টেবিলে শুয়ে, ঠিক নাড়ি ছেঁড়ার পরপর।

—

‘অপেক্ষা’ উপন্যাসের ভয়েস ওভার হয়ে গেছে গত পরশু। সব এডিটিংয়ের পর গতকাল রাত আটটায় ওটা ‘খসড়া’র অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা হয়েছে। ফাবিহা দুটো কারণে উত্তেজিত ছিল—কাজটা ভালো হলে টাকাটা দ্রুত পাবে সাথে পাবে পরবর্তী কাজের নিশ্চয়তা এবং এভাবে তার কণ্ঠ কেমন শোনা যায় সেটা নিজ কানে শোনার উদগ্রীবতা। ফাবিহা বেশ অবাক হয়েছিল এটা চিন্তা করে যে এই ঘূর্ণিপাকের মাঝেও তার হৃদয়ের চপলতার সবটুকু মুছে যায়নি। নয়তো কেন কমেন্ট সেকশনে মানুষের প্রশংসা শুনে বুকে ঢাক ঢাক গুড়গুড় শব্দ হবে! কেন বারবার টেনে টেনে মিতুর কথাগুলো শুনবে সে!

গল্প কথকের কণ্ঠ দিয়েছে সৌমিক। বলা বাহুল্য তার কণ্ঠ মার্জিত ধরনের ভারী। বেশি নয়, আবার কমও নয়। শুনতে ভালো লাগে। সে যখন সৌমিকের রেকর্ডিং শুনে প্রশংসা করছিল তখন বাকিদের মুখে শুনেছে—সৌমিক প্রায় ছয় বছর ধরে এই লাইনে কাজ করছে। চার বছর ধরে সে কেবল ফাইভার, আপওয়ার্কের মতো প্ল্যাটফর্মে ভয়েস ওভারের কাজই করেছে। সেখান থেকেই নিজের চ্যানেল খোলার ইচ্ছে এবং তারপরের যাত্রা সবার সামনেই। অথচ বড়াই করার ভাব তার ভেতরে নেই।

মেসেঞ্জার গ্রুপে টুংটাং শব্দে মেসেজ আসছিল। নতুন হয়েও সুন্দরভাবে কাজ শেষ করার জন্য সকলেই তাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। ফাবিহা একবার ধন্যবাদ বলে বেরিয়ে এলো। তারপর অনেকগুলো মেসেজ এলেও সিন করল না। এদের সাথে এখনও অতটা মিশে উঠতে পারেনি সে। তাই আড্ডাটা ঠিক জমে না।

এর মাঝেই সৌমিক তাকে মেনশন করে নাম্বার চাইলো, যেটায় টাকা পাঠাতে পারবে। ফাবিহার বুকের ভেতর দ্রিম দ্রিম করে আওয়াজ হলো! আরও পঞ্চাশটা বইয়ের অর্ডার কনফার্ম হয়ে গেছে। সস্তায় পেয়ে মানুষ লুফে নিচ্ছে। তার ভেতরে অনেকগুলো বই আবার স্টক আউট। আর কোনোদিন সেগুলোর নতুন প্রিন্ট আসবে কি না তাও জানা নেই। কাজেই বই পড়ুয়ারা ভালো মূল্য দিয়েই বইগুলো নিচ্ছে। সে সুযোগের পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করছে ফাবিহা। যেসব বইয়ের দাম বাড়ানো সম্ভব সবগুলোর বাড়িয়েছে। তার ইচ্ছে আছে এই বইয়ের টাকা আর রেকর্ডিংয়ের টাকা মিলিয়ে বাকি ত্রিশ হাজার এই বাড়ি ছাড়ার আগে মহিলাকে বুঝিয়ে দিয়ে আসবে। একটা ফেউ অন্তত পিছু ছাড়ুক।

কিন্তু সে দ্বিধায় পড়ে গেলো। এই অবধি অসংখ্য মেসেজ জমা হয়ে গেছে। সেগুলোর একটাও সিন করেনি সে। এখন হুট করে টাকার মেসেজে সিন করলে ওরা নিশ্চয়ই ছ্যাঁচড়া ভাববে! আরও আধা ঘণ্টা পর মেসেজ সিন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সে ফোন রেখে দিলো। টেবিল থেকে টেনে নিলো নিজের ডায়েরিটা। অনেকদিন ওখানে কিছু লেখা হয়নি। আজ এই আনন্দ, কষ্ট, মানসিক চাপ, নিকট ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা মাখানো সন্ধ্যায় বুকের ভেতর চাপিয়ে রাখা দীর্ঘশ্বাসগুলো নিংড়ে দিতে ওখানে কলম চালালো সে।

“ফাবিহা,

জীবনকে এই অবধি বসন্তই ভেবে এসেছ। মনে করেছ শান্তি, নিরাপত্তা এগুলো তোমার জন্য সুনিশ্চিত। কোনোদিন তাপদাহ গ্রীষ্ম আসতে পারে, রুক্ষ শীত সব রস শুষে নিতে পারে—এও কী ভেবেছিলে?

ভাবোনি। মুখে ষড়ঋতু বলে ফ্যানা তুললেও বিশ্বাস করোনি জীবনের অপর নামই ষড়ঋতু। সেখানে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত সব থাকবে! থাকতেই হবে। মনের অবচেতনে কষ্টের গ্রীষ্ম, দুঃখের শীত আর যুদ্ধের ঝোড়ো বর্ষাকে ডিলিট করে দিয়ে সংগোপনে সাজিয়ে রেখেছিলে কেবল শরৎ, হেমন্ত, বসন্তকে। তাই আজ—অবহেলিত তিনটে ঋতু তোমার কাছে প্রতিশোধ নিচ্ছে। চরম প্রতিশোধ! সাজিয়ে রাখা বাকি তিনটে ঋতু শোপিস হয়ে বিকট শব্দে হাসছে।

থাক, ঋতুদের খলনায়ক বানিয়ে লাভ কী! জীবনটাকে তুমি বরং পর্বতমালা ভাবো। দুঃখের চূড়া যেমন আছে তেমনি সুখের চূড়াও থাকবে। থাকতেই হবে। এই সংকটের কালবৈশাখী, টানাপোড়েনের চূড়া পেরিয়ে একদিন তোমার জীবনে বসন্ত আসবে। আসবে সুখের চূড়া। ততদিনে দাঁতে দাঁত চেপে এই রোলার কোস্টারটা সহ্য করে নেয়া যাক।

ডিয়ারেস্ট! যদি বসন্ত না-ই বা আসে, যদি এই জীবনটা কালবৈশাখীর ঘূর্ণিতে পাক খেতে খেতেই থেমে যায়, তবুও কষ্ট নেই। মালিক আশ্বাস দিয়েছেন, শরীরে ছোট্ট একটা কাটা ফুটলেও মুমিনের পাপমোচন হয়। এই কৃষ্ণ কঠিন ঝড়ের বিনিময়ে আমার জীবনখাতাটা যদি শুভ্র সফেদ মেঘের মতো হয়ে যায়, তবে তার চেয়ে উত্তম শরৎ আর কী হতে পারে?”

ডায়েরিটা অনেকক্ষণ বুকে চেপে বসে রইলো ফাবিহা। মহিলার কথাগুলো থেকে থেকে কানে বাজছে। রাস্তায় নামিয়ে ইজ্জত দেখিয়ে ছাড়ব…!

তার বিরুদ্ধে বদদোয়া করে শাস্তির পরিমাণ নির্ধারণ করল না সে। বরং আকুতি করে বলল, “আমার ইজ্জত তোমার হাতে মালিক! সেই ইজ্জত যে রাস্তায় নামাতে চেয়েছে, তার বিচার তুমিই কোরো।”

এর ভেতরে বাড়ি ছাড়ার দিন ঘনিয়ে এলো। সব কিছু গোছগাছ চলছে এরই মাঝে আচমকা ফাবিহার সেমিস্টার ফাইনালের ডেট দিয়ে দিলো। দিন জেগে ঘর গুছিয়ে রাত জেগে নিজেকে গোছালো ফাবিহা। টানা পরিশ্রমে তার শরীর ভেঙে আসছিল। সাথে সদ্য যুক্ত হওয়া অপুষ্টির আঘাত। কে কার বিরুদ্ধে জয়ী হবে সেটা তখনও নির্ধারিত হয়নি। ফলে যুঝতে থাকা ফাবিহার চোখে-মুখে ভেতরের ক্ষয় প্রকট হয়ে ফুটে উঠল।

বাড়ি পাল্টানোর দিন ফাবিহার দ্বিতীয় পরীক্ষা। সে সকাল সকালই বেরিয়ে যায়। বাড়ির বদ্ধ বাতাসে বইয়ে মনোযোগ দেয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। একটু আগে আগে যেয়ে লাইব্রেরিতে বসে ঘন্টাখানেক খাতায় চোখ বুলিয়ে নেয়। এদিনও তাই করল।

দশটার দিকে বড় বড় ফার্নিচারগুলো পাঠিয়ে দেয়া হলো একটা পিকআপে। সেটা আড়ালে যাওয়ার পর ফরিদ বাড়িতে ঢুকতেও পারেননি। এরই মাঝে আচমকা একগাদা লোক এসে তাকে ঘিরে ধরল। গলা ফাটিয়ে সে লোকগুলো শোনাতে লাগলো তাদের পাওনা হিসেবের ফিরিস্তি। সাথে ফ্রিতে বিলি হলো ফাবিহার চরিত্রের সার্টিফিকেট। তাদের গ্যাঞ্জাম শুনে আশপাশ থেকে বেশ কিছু লোক জড়ো হয়ে গেল। এই ভরা রাস্তায় মেয়ের নামে এসব শুনে সহ্য করতে পারলেন না ফরিদ। তিনিও উল্টো দুকথা শুনিয়ে দিলেন। গড়বড়টা সেখানেই হলো। ঠিক আধা ঘণ্টার মাঝে পুলিশ আসতে দেখা গেল। এতক্ষণ বুকের ব্যাথা যা-ও বা চাপিয়ে রেখেছিলেন—পুলিশ দেখে আর সেটা পারলেন না। চোখের পলকে দ্বিতীয় স্ট্রোক করে রাস্তায় লুটিয়ে পড়লেন ফরিদ।

*****

সাকিনের জয়েনিংয়ের তারিখ দিয়ে দিয়েছে। এত দ্রুত দেখে সে নিজেও অবাক হয়েছিল। পরবর্তীতে জেনেছে, কিছু পোস্ট বেশ অনেকদিন ধরে খালি পড়ে আছে। তাতে তৈরি হয়েছে শিক্ষক সংকট। সে সংকট এড়াতেই তাদের দ্রুত যোগদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে চাকরিপ্রার্থীদের সুবিধা হয়েছে বৈ কি! দুটো বছর এই দিনের আশায় বুভুক্ষের মতো চেয়েছিল কত হাজার হাজার মানুষ। আজ তাদের জীবনের নতুন দরজা খুলল।

সেদিনের জন্য সাকিন নিজেও কম উত্তেজিত ছিল না। এমন একটা জীবন শুরু হবে যেটা কেবলই তার নিজের। ফিটফাট হয়ে সে একটু আগে আগেই বেরিয়ে গেল। তখনও কলেজের ক্লাস শুরু হওয়ার ঘন্টাখানেক বাকি।

গেটের সামনে রিকশা থেকে নামতেই তাকে থমকে দাঁড়াতে হলো। সে এগিয়ে আসতে চাইলেও ফেলে আসা জীবনের বিবমিষা তখনও তাকে ছাড়েনি। আদিলের কাষ্ঠ মুখ দেখা যাচ্ছে ঠিক গেটের পাশে।

সাকিন এগিয়ে যেতেই সে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল। অস্থির হয়ে বলল, “ভাইয়া, আমরা খুবই বিপদে আছি! আব্বুকে রিমান্ডে নিয়েছে। তুমি আব্বুকে ছাড়াতে একটু হেল্প করবানা?”

সাকিন শক্ত কন্ঠে বলল, “মামার বিষয়ে আমার কিছুই করার নেই আদিল।” বলে সে দাঁড়ালো না। হনহন করে ভেতরে ঢুকে পড়ল।

বউনী ক্লাসের উত্তেজনা সাকিনকে আর ছুঁতে পারল না। থেকে থেকেই কানে ভেসে আসছিল আদিলের শুকনো কন্ঠ, “আমরা খুবই বিপদে আছি ভাইয়া!”

এমন ছায়াহীন হয়ে পোড়া রোদ্দুরে সে-ও পুড়েছে। কে যেন কানে কানে বলে গেল—এতিমকে এমন ব্যাবহার ফিরিয়ে দিতে পারলে সাকিন! কেবল বাবা মরে গেলেই তো এতিম হয় না। বেঁচে থেকেও হয়। জীবন তোমাকে এইই শেখালো!

সকালের শক্ত সাকিন আর শক্ত থাকতে পারল না। দুপুরের আগেই ছুটে গেলো আদিলের কাছে।

চলমান~

(গল্পটা কত পর্ব হলে খুশি হবেন?)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 20 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন