ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনজোছনা

পর্ব 21

লেখক: বিনতে ফিরোজ

#বনজোছনা
২১.

ক্লান্ত হয়ে ফাবিহা যখন বাড়ি ফিরল, তখন কি সে ভেবেছিল তার জন্য এমন চমক অপেক্ষা করছে!

পাঁচ টাকা বাঁচানোর জন্য মোড়ের সামনেই রিকশা থেকে নেমে গেছে ফাবিহা। পাঁচ মিনিটের এই রাস্তাটুকু পেরোতে আজ পাক্কা তেরো মিনিট লাগলো। পা চলছিল না মোটে। নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই খেয়াল করল তার বিশাল ঘেরের লম্বা জামার ডান পাশটা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। কিন্তু জামাটা তো এত বড়ও নয়। কপাল কুচকে দেখতে দেখতে কারণ উদঘাটন করে ফেলল সে। কাঁধের ব্যাগের ভারে সে ডান দিকে খানিকটা নুইয়ে হাঁটছিল। তাতেই সবুজ জামার নিচের সাদা ঘেরের অংশ ধুলোয় লুটোপুটি খেয়ে নিয়েছে।

বাড়ির দরজা চোখের সামনে আসতেই গলার কাছে স্কার্ফের সেফটিপিন খুলে ফেলল ফাবিহা। এক মুঠো দমকা হাওয়া কান স্পর্শ করতেই শরীরটা হালকা লাগল। বাম হাতের গাঢ় খয়েরি ঘড়িটা ওর গোল ডায়ালে সময় দেখাচ্ছে একটা পঁয়তাল্লিশ। চিকন ফিতেটা আষ্টেপৃষ্টে হাতে এঁটে থাকায় হাতটা আরও চিকন দেখাচ্ছে। ফাবিহা বেশ বিরক্ত হলো। দৃষ্টিভ্রম, এত চিকন তো সে নয়।

কেচিগেট হা করে খোলা। বারান্দায় স্যান্ডেল খুলে ভেতরে ঢুকতেই সিমিকে দেখা গেলো। অগোছালো ভঙ্গিতে মেঝেতে বসে আছে। হাঁটু সমান ফ্রকে নিশ্চিত কিছু একটা ভরিয়েছে। ফাবিহা একটা ধমক দেয়ার জন্য মুখ খুলল।

“তোর আক্কেলটা কী সিমি! দরজা খুলে রেখে এখানে ধ্যান করতে বসেছিস?”

সিমি হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে ছিল। ফাবিহার গলার আওয়াজ পেয়েই প্রায় উড়ে এসে ওর বুকে আছড়ে পড়ল। যেন তীর থেকে ধনুক মুক্তি পেয়েছে।

ফাবিহা হকচকিয়ে গেল, “কী হয়েছে?”

বহু চেষ্টা করেও কান্না রোধ করতে পারল না সিমি।
“খালু অসুস্থ হয়ে গেছে ছোট আপা!”

এই এতক্ষণে ফাবিহা আশেপাশে তাকালো। বাড়িটা কেমন শুনশান হয়ে আছে।

কপাল কুচকে সে বলল, “কী হয়েছে? প্রেশার ফল করেছে? কই বাবা?”

সে ভেতরে যেতে গেলে সিমি আটকালো, “হাসপাতালে নিয়ে গেছে সেই এগারোটার সময়। কেমন আছে, কী করছে কিছুই জানি না।”

ফাবিহার মাথায় যেন বাজ পড়ল, “কী!” এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল সে, “কী হয়েছিল?”

সিমি গড়গড় করে সব উগড়ে দিলো। খালি বাড়িতে একলা বসে সে এতক্ষণ ওসব ঘটনাই জাবর কাটছিল। এ বেলায় তার বুকের ভারটা একটু কমল।

“কেউ আমাকে একটা খবর দিল না!” হতভম্ব কণ্ঠে বলল ফাবিহা।

“আপনার পরীক্ষা যে…”

“বাবার চেয়ে আমার পরীক্ষা বড়?”

সিমি সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না।

ব্যাগ থেকে ফোন বের করতে করতে ফাবিহা বলল, “এখন কেমন আছে? কোন হাসপাতালে নিয়েছে?” তার বুক ধড়ফড় করছে। তিন ঘণ্টা হয়ে গেছে। একটা মেসেজ তো কেউ অন্তত করতে পারতো। ফাবিহা প্রাণপণে দোয়া করল, বাবার যেন কিছু না হয়!

“আমার ফোনে টাকা নেই ছোট আপা। ফোন দিতে পারি নাই।” সিমির ছোট্ট একটা বাটন ফোন আছে। সেটায় কালে ভদ্রে কেউ ফোন দেয়। ওটা খুব কমই কাজে লাগে। চাকরি চলে গেলে নতুন চাকরি খোঁজার জন্য কিছু মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে হয়।

ফাবিহা ফোন দেয়ার সাথে সাথেই নূরজাহান ধরলেন। তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এসেছে।

“বাসায় গেছিস মা?”

“বাবা কেমন আছে?”

“আলহামদুলিল্লাহ্ এখন ভালো আছে।”

“কোন হাসপাতালে আছো তোমরা? আমাকে একবার জানাতে হয় না?”

“সদরে আছি। তুই আস্তে-ধীরে আয়। তাড়াহুড়া করিস না।”

ফাবিহা তক্ষুণি আবার বের হতে গেলে সিমি তার হাত টেনে ধরল, “আমাকেও নিয়ে যান না ছোট আপা!”

ফাবিহা এক মুহূর্ত চিন্তা করল। কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে বলল, “সকালের খাবার যা আছে ঝটপট গুছিয়ে ফেল। দরজা জানালা সব আটকা। আমি নামাজটা পড়ে নেই।”

বিশ মিনিটের মাঝে ওরা বাড়ি থেকে বের হলো। ঘরে যৎসামান্য খাবার ছিল। তা দিয়ে পাঁচটা মানুষের পেট চলে না। রাস্তা থেকে আরও কিছু কিনে নিলো ফাবিহা। তার মাথায় একটা অঙ্ক ঘুরঘুর করতে শুরু করে দিয়েছে। কেবিন ভাড়া কত কে জানে! ফরিদকে কতদিন ওখানে রাখতে হবে? অসুস্থতা ঠিক কেমন সে বিষয়ে কোনো খোলাসা করেননি নূরজাহান। সিমিও বলতে পারেনি। শুধু বলছে—মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেছে। ওষুধ লাগবে নিশ্চয়ই। ফাবিহা রিকশায় বসেই ঝটপট ফোন বের করল। সকালে সৌমিক মেসেজ দিয়েছিল, পথের পাঁচালী এবং অপরাজিত—দুটোতেই কাজ করার জন্য ফাবিহাকে প্রস্তাব দিয়েছে। এই পরীক্ষার মাঝে অত লম্বা কাজের দায়িত্ব নিতে চাচ্ছিল না সে। এজন্য মেসেজ সিন করেনি। তৎক্ষণাৎ তাকে রিপ্লাই দিলো,
“করব ভাইয়া। সকালে আমার পরীক্ষা থাকে। বিকেলের শিডিউল দিলে ভালো হয়।”

মনে আরেকটা অঙ্ক উঁকি দিলো। দুটো ঢাউস উপন্যাস। পনের হাজার কি পাবে এটায়?

হাসপাতালে পৌঁছুতে আধা ঘণ্টা লেগে গেলো। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে দোতলার জেনারেল ওয়ার্ডে চলে গেল ফাবিহা। চারদিকের রোগের ভারী নিশ্বাস বইছে। এদিক ওদিক তাকাতেই ফরিদকে দেখা গেল। বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছেন। তাকে দেখেই ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলেন। ফাবিহার মনে হলো তার বুকের উপর থেকে জগদ্দল পাথরের বোঝা নেমে গেছে। ছুটে সে বাবার কাছে চলে গেলো। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “কেমন আছো বাবা?”

ফরিদ সুন্দর করে হাসলেন। তবে তার হাসিতে কিছু একটা বেঠিক লাগছিল।

“ভালো আছি মা। আলহামদুলিল্লাহ্।”
ফাবিহা বিকট চোখে দেখল কথা বলতে যেয়ে বাবার মুখ বেঁকে যাচ্ছে। মায়ের দিকে তাকালে নূরজাহান করুন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। ফারদিন পাশেই টুলে বসে ছিল। সে হালকা কণ্ঠে বলল, “মিনি স্ট্রোক। আফটার ইফেক্ট।”

ফাবিহা হতভম্ব হয়ে গেল। মিনিট খানেক কোনো কথা বলতে পারল না। বহু কষ্টে গলা ঠেলে বের করল, “কতদিনে ঠিক হবে?” মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল।

“মিনি স্ট্রোকের প্রভাব নাকি চব্বিশ ঘন্টার ভেতরেই সেরে যায়। তাই তো বলল ডাক্তার।” ফারদিনই উত্তর দিলো।

ফাবিহা বাবার পাশে বসে নরম কণ্ঠে বলল, “কী এত চিন্তা করো বাবা! একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।”

ফরিদ ফের হাসলেন। বাবার এই হাসি সহ্য করতে পারল না ফাবিহা। চোখ ঘুরিয়ে সিমিকে ইশারা করল খাবার দিতে।

নিজেও একটু খেয়ে বলল, “ফুপিদের বলা হয়েছে?”

নূরজাহান বিরক্ত হলেন, “ওদের বলে লাভ কী?”

“সব কিছুতে লাভ লসের হিসাব আসবে কেন আম্মু? চাচা ফুপি সবাইকে জানাতে হবে।”

নূরজাহান বিড়বিড় করে বললেন, “বুকে পাড়া দিয়ে মরণের দুয়ারে ঠেলে দিয়েছে, ওদের আমি জানাতে পারব না।”

ফাবিহার নিজেরও ইচ্ছে ছিল না চাচাদের সাথে যোগাযোগ করার। কিন্তু যতই হোক, তারা আপন ভাই। কী মনে করে সে ফুপিয়ে কাছেই আগে ফোন দিলো। এই মানুষটা তাকে স্নেহ করে। সেই স্নেহের মান সে রাখতে পারেনি।

মনিরা ফোন ধরেই বললেন, “সূর্য উঠেছে কোনদিক রে! ফাবিহা বুড়ি আমাকে ফোন দিয়েছে!”

ফাবিহা বেশ লজ্জা পেলো। ছয় মাসে এই মানুষটার কাছে একবারও ফোন দেয়া হয় না। লজ্জা পাওয়াই উচিত।

“কেমন আছো ফুপি?”

“আছি ভালো। তোদের কী খবর?”

ফাবিহা উঠে ওয়ার্ডের বারান্দায় গেল। সূর্যটা একদম কোনাকুনি হয়ে রোদ পাঠাচ্ছে। সেই রোদে চোখ খুলে রাখা দায়। চোখের উপর আড়াআড়ি হাত রেখে ফাবিহা বলল, “ফুপি?”

“হ্যাঁ, শুনছি বল।”

“বাবা স্ট্রোক করেছে।”

“আল্লাহ!” আর্তনাদ করে উঠলেন মনিরা। “কখন? কেমন আছে এখন?” হাউমাউ করে উঠলেন তিনি। ফাবিহার অপরাধবোধ বাড়ল এই মানুষটাকে তারা খবর দিতে চাইছিল না।

“সিভিয়ার কিছু না। আজকে সকালে মিনি স্ট্রোক হয়েছিল। এখন আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছে।”

“হায় আল্লাহ! এর আগেও তো একবার মিনি স্ট্রোক করল! তোরা খবর না দিলেও আমি জানি। পরপর দুইবার স্ট্রোকের ধকল কীভাবে সামলাবে।” নিজের মতো করে বলতে থাকলেন তিনি। ফাবিহা চুপ করে শুনল।

“ফাবিহা রে! স্ট্রোক করলে নাকি হাত, পা কাজ করে না! এমন কিছু হয়েছে নাকি?”

“হাতে পায়ে সমস্যা নেই আলহামদুলিল্লাহ্। কিন্তু মুখে মনে হচ্ছে একটু জড়তা দেখা যাচ্ছে।” মলিন থাই গ্লাসের অদূরে বসে থাকা বাবার দিকে তাকালো ফাবিহা। খাওয়া শেষে তিনি ঘুমের আয়োজন করছেন। স্ট্রোকের ধাক্কায় মানুষটা কি একটু নড়বড়ে হয়ে গেছে? কেমন যেন লাগে ফাবিহার।

মনিরার আর্তনাদ কমে না। কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করার পর তিনি বললেন, “কতদিন হাসপাতালে থাকা লাগবে রে? আমি দেখি আজকে না পারলেও কালকে যাবোই ইনশাআল্লাহ্।”

“এখনও তো জানি না। ডাক্তারদের সাথে কথা হয়নি।”

“বলে আমাকে একটু জানাস ফাবিহা।” তার কণ্ঠে অস্থিরতা।

“জানাবো ফুপি। তুমি টেনশন কোরো না।”

কল কেটে ভেতরে যেয়ে দেখল ফরিদ তখনও চোখ মেলে তাকিয়ে আছেন। ফাবিহা মাথার কাছে বসে বলল, “ঘুমাওনি?”

“ঘুম আসছে না রে মা! কতক্ষণ ধরে ঘুমিয়েছি!” ফরিদের কণ্ঠে কেমন বাচ্চামি ভাব।

ফাবিহা বলল, “তাহলে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকো। আমি মাথা টিপে দেই।”

ফরিদ বাধ্য ছেলের মতো চোখ বন্ধ করলেন। ফাবিহা নূরজাহানকে বলল, “তোমরা বাড়ি যাও। গোসল করে তারপরে আসো। ওদিকে কি মালপত্র সব নেয়া হয়ে গেছে?”

এই এতক্ষণে যেন বিষয়টা নূরজাহানের মাথায় এলো। আঁতকে উঠে তিনি বললেন, “একটা ট্রাক গেছে কেবল! অর্ধেক জিনিস তো বাড়িতেই! ওদেরকেও কিছু জানানো হয়নি।”

ফাবিহা চুপ করে রইলো।

নূরজাহান বললেন, “ফারদিন, চল জিনিসগুলো তুলে দিয়ে আসি। ওই বাড়িতে যেয়ে একটু ঠিকঠাক করে তারপরে আবার আসব।”

সিমিকেও পাঠিয়ে দিলো ফাবিহা। ফারদিনের উপর তার বিন্দুমাত্র ভরসা নেই। সেদিনের পর তার সাথে কথাও বলেনি সে। নূরজাহান সম্ভবত এটা খেয়াল করেননি। করলে অসংখ্য প্রশ্ন করে উত্তর পেতে মরিয়া হয়ে উঠতেন। তখন কী জবাব দিত ফাবিহা? দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বারান্দার দিকে তাকালো। সূর্য আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামছে।

আচমকা ফরিদ বললেন, “পরীক্ষার ভেতর তোকে খুব কষ্ট দিলাম মা রে!”

ফাবিহা অবাক হয়ে তাকালো। আধা ঘণ্টা হয়ে গেছে। ফরিদ তবু ঘুমাননি।

“কষ্ট কার হলো? তুমি উত্তেজিত হয়েছিলে কেন বলো তো বাবা!”

ফরিদ সে প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। আগ্রহ সহকারে বললেন, “কী রেকর্ডিং করেছিস, তা তো শোনালি না!”

“এখন শুনবে তুমি?”

“শোনাতে পারবি না তুই?”

“পারব।”

ইয়ারফোন সেট করে ডাউনলোড করে রাখা ভিডিওটা চালু করে দিলো ফাবিহা। ফরিদের কানে ঢোকাতেই তিনি উৎসুক চোখে মোবাইলে তাকালেন। ফাবিহা বলল, “দেখার কিছু নেই বাবা। শুধু শুনবে।”

“একটু ধর তো, উঠে বসি।”

খুব সহজ একটা কাজ। বাবাকে ধরিয়ে উঠে বসানোতে কোনো কাঠিন্য নেই। কিন্তু এই ছোট্ট কাজটা করতেই ফাবিহার বুক ভেঙেচুরে এলো। এর আগে কোনোদিন ফরিদ এমন সাহায্য চাননি। আচমকা ফাবিহা বুঝতে পারল গোলমালটা ঠিক কোথায় বেঁধেছে। ফরিদ বার্ধক্যের সিঁড়িতে আরেক ধাপ উপরে উঠে গেছেন। খুব কষ্টে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকালো সে। ফরিদ সমস্ত মনোযোগ ফোনে দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু ক্রমেই তার মনোযোগ বিরক্তিতে রূপ নিলো। আধা ঘণ্টা অতিক্রম হবার পরও ফাবিহার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। তবু তিনি ধৈর্য ধরে শুনে গেলেন। এই এই তো! এই যে ফাবিহা কথা বলছে! প্রথম কথাটাই চরম বিরক্তি নিয়ে বলেছে, “আগে বানানো হোক তারপর দেখবি। তুই যা চট করে রান্নাঘর থেকে ধনে পাতা নিয়ে আয়। অল্প ধনে পাতা কচলে দিয়ে দি।”

ফরিদ তন্ময় হয়ে শুনে গেলেন। মনে হলো চোখ বন্ধ করে মেয়ের সব মুখভঙ্গি তিনি স্পষ্ট দেখতে পারছেন।

দু’ঘন্টা পর যখন ভিডিও শেষ হলো, তখন দুপুরের রোদ্দুর ঝিমিয়ে পড়েছে। পাশে তাকাতেই দেখলেন ফাবিহা টুলে বসে বিছানায় মাথা রেখে বেকায়দা ভঙ্গিতে ঘুমুচ্ছে। ফরিদ মেয়ের মাথা হাত রাখলেন। কীভাবে ঘুমিয়েছে! যখন তখন একটা ব্যথা পাবে।

“মা রে! দেখি আমার পাশে এসে শো।”

এক ডাকেই ধড়মড় করে উঠে বসল ফাবিহা। উঠতে যেয়ে পেটে মোচড় দিয়ে উঠল। এলোমেলো হয়ে শোয়ার ফল। লাল চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “কী হয়েছে বাবা? খারাপ লাগছে?”

“না, তুই বিছানায় উঠে শো।”

“না আর ঘুমাব না। যথেষ্ট ঘুম হয়েছে। তোমার ভিডিও শোনা শেষ?”

“হ্যাঁ। মা রে! এখানে যে একটু পরপর বাজনা বাজছে।”

জিনিসটা ফাবিহাও খেয়াল করেছে। বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে খানিক পরপর ব্যাকগ্রাউন্ডে মিউজিক বাজে। পানির কথা এলে পানির কলকল ধ্বনি, পাখির কথা উঠলে তার কলকাকলি। তেমনই একটা বেদনাদায়ক পরিস্থিতির বর্ণনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফুঁটিয়ে তুলতে পেছনে বেজে ওঠে করুন সুর।

“হ্যাঁ।”

ফরিদ ইতস্তত করে বললেন, “কিন্তু মা, বাজনা তো ঠিক না।”

ফাবিহা বলল, “কী করার আছে বাবা? মিউজিক ছাড়া ভিডিও মানুষ আজকাল শোনে না।”

ফরিদ খানিকক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “তোকে কত টাকা দিয়েছে?”

“ছয় হাজার।”

আর কোনো কথা বললেন না ফরিদ। এক জীবনে যেটা খুব কষ্টে ছেড়েছিলেন, আজ কষ্টের দিনেই আবার সে জিনিস জীবনে ফিরে আসতে দেখে মূক হয়ে গেলেন। তার আদর্শের ভিত কি আর্থিক অসচ্ছলতার কুঠারাঘাতে খানিকটা নড়বড়ে হয়ে গেছে? নয়তো কেন মেয়েকে তিনি জোর গলায় বলতে পারলেন না—বাজনা-বাদ্য সংযুক্ত কোনো কাজ তুই করবি না!

ডাক্তার ফরিদকে দুদিন অবজার্ভেশন রাখার পরামর্শ দিলেন। পুরুষ ওয়ার্ডে মহিলাদের রাত্রি যাপনের উপায় ছিল না। কাজেই ফারদিনকে এসে রাতে থাকতে হলো। এই গোলযোগের মাঝেই কুন্দকলিতে প্রথম রাত কাটালো ফাবিহা। পরদিন হাসপাতালে আসতেই দেখল মনিরা ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছেন। নূরজাহান আগে এসেছিলেন। তার সাথে চিৎকার চেঁচামেচি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন মনিরা। ফাবিহা এলে তাকেও কয়েক দফা ধমকালেন। তারপরই মেজ ভাইয়ের কাছে ফোন দিলেন।

অপর পক্ষকে কোনো কথা বলতে না দিয়ে ঝড়ের বেগে তিনি বললেন, “ভাইজান যে স্ট্রোক করেছে এই খবরটা শোনার জন্য হলেও তো মানুষ ফোন ধরে! কতবার ফোন দিয়েছি তোদের কালকে? অমানুষের ঘরের অমানুষ! তোদের অত্যাচারে আজ ভাইজানের এই অবস্থা! শোন, একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ! আমি তোদের নামে মা-ম-লা করব। ভাইয়ের সম্পত্তি খেয়েছিস এই মা-ম-লা তো করবই, ভাইকে খু-ন করতে চেয়েছিস এটাও বলব!”

“এসব কেন বলবা আপা! আমরা কী করেছি?”

“সকাল সকাল মুখ দিয়ে গালি বের করিস না। জোচ্চরের দল! খালি দেখ কী করি! ফাঁকা আওয়াজ দিচ্ছি মনে করিস না। আমার ভাসুরের ছেলে পুলিশের এসআই। পাছায় লাঠির বারি পড়লেই বাপ বাপ করে পা ধরতে আসবি, তখন তোদের মুখে উষ্টা মেরে কলিজা ঠান্ডা করব। সম্পত্তি তোর পিছন দিয়ে ঢুকাবো অমানুষ!” খট করে ফোন কেটে দিলেন মনিরা।

ফাবিহা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। কোনো রকমে বলল, “সত্যি সত্যি মা-ম-লা করবা ফুপি?”

মনিরা চরম বিরক্ত হলেন, “বাপের মতো গাধা হয়েছিস কেন! নিজের ভাইদের নামে মা-ম-লা করব? একটা টোটকা দিলাম। মেজটার মেয়ের জন্য বড় ঘরের সম্বন্ধ এসেছে। এখন যদি এই ঘণ্টা বাজাই এখানে কেন! আশেপাশের পাঁচ গ্রামে বিয়ে হবে কি না সন্দেহ। এই ওষুধে কাজ না হলে সত্যি সত্যিই মা-ম-লা করব ভাই টাই আর মানব না।”

ফুপির বুদ্ধি শুনে অবাক হয়ে গেলো ফাবিহা। নিচু কণ্ঠে বলল, “সকালে এসেই নাকি চিৎকার করছিলে?”

“চিৎকার করব না তো তোর মা কে মাথায় তুলে নাচবো? এমন একটা কাজ কীভাবে করতে পারে তোর বুদ্ধিমতী মা? একবার ঋণ নিয়েছে ঠিকাছে, বুঝলাম। দেখছে ঐটা দিতে পারছে না তাহলে আবার কোন দুঃখে ঋণ নিতে গেল? মাথায় পচা গোবর না থাকলে কেউ এসব করতে পারে না। হ্যাঁ রে! আমি কি মরে গেছি? একটাবার আমার কাছে বলতে পারত না? তোর মা আমাদের গোনায়ই ধরে না। ঠিক করছি চিল্লাচিল্লি করছি! আরও করব!”

ফাবিহা ফুপিকে জাপটে ধরল। এই অবেলায় মনিরার ধমকগুলোও বড় অসাধারণ লাগছিল তার কাছে।

টোটকায় একেবারে তাৎক্ষণিক কাজ হলো। দুপুরের আগেই দুভাই এসে হাজির। ফরিদের কাছে যেয়ে হাতে পায়ে ধরল মেজ জন। মিনতি করে বলল,

“মেয়েটার বিয়ের সম্বন্ধ চলছে ভাইজান। আপনি এর ভেতরে মা-ম-লা করলে সব নষ্ট হয়ে যাবে। পাঁচ গ্রামের মানুষ নাক সিটকাবে। তার চেয়ে আমরা একটা আপোষে আসি। আপনার ঘর তো সত্যিই আমরা দেখে শুনে রেখেছি। মেরামতও করেছি। না হলেও চার পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বিক্রি বাট্টা যা গেছে, গেছে। আপনাকে চার লাখ টাকা দেই। হবে না ভাইজান?”

ফরিদ আহমেদ আগে পিছে কিছুই জানেন না। এই ভরা ওয়ার্ডে ভাইকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন তিনি। তার বক্তব্য শুনে প্রথম কথা যেটা বললেন তা হলো—তোমার মেয়ে তো একেবারে ছোট! এসএসসি পাশ করেছে? ওকে এখনই বিয়ে দিবা কেন?”

নূরজাহান চূড়ান্ত বিরক্ত হয়ে ফাবিহার উপরে রাগ ঝাড়লেন, “তোর বাপের কাজটা খালি দেখি! ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, এই লোক হাসপাতালে মুখ বাঁকা করেও জ্ঞান দিয়ে যাচ্ছে!”

মনিরা বিরক্ত হয়ে বললেন, “তার মেয়ে যা ইচ্ছা করুক। তোমার এত চিন্তা কীসের? আর যেই মেয়ে মাসে তিনবার বাড়ি ছেড়ে পালানোর উদ্যোগ নেয় তার বিয়ের জন্য বয়স লাগে না।”

ফরিদ কথা বলতেই ভুলে গেলেন।

মেজ ভাই আবার হাত ঝাঁকালো, “বলেন ভাইজান, হবে না?”

ফরিদ বিব্রত কণ্ঠে বললেন, “মা-ম-লা করব কেন? এসব কী কথা! নিজের ভাইদের নামে কেউ কেস করে?”

মনিরা স্বামীকে পেছনে ফেলে ভাইয়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ওয়ার্ড বলে গলাটা চড়াতে পারছেন না। নইলে ইচ্ছে তো করছিল এই দুজনার গাল চড়িয়ে লাল করে দিতে।

চাপা কণ্ঠে চিবিয়ে চিবিয়ে তিনি বললেন, “ভাইজানের ঘর আড়াই শতকের উপরে। আধা শতক তোর সাথে জোড়া। সেটা বাদ দিলেও দুই শতক থাকে। ওখানে জমির দাম এখন শতকে সাত লাখ। চৌদ্দ লাখের হিসাব তুই চার দিয়ে করবি কোন আক্কেলে?”

নূরজাহানের বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠল। চৌদ্দ না হলেও দশ! তাহলেই তো সব ঝামেলা মিটে যায়!

ফরিদ আহমেদ হাত উঁচু করে বললেন, “থামো তো তোমরা!”

মুহূর্তেই সবাই চুপ করে গেল। অনেকটা সময় ঝিম মেরে বসে রইলেন ফরিদ। মনিরা অধৈর্য হয়ে বললেন, “কিছু বলো ভাইজান!”

ফরিদ ছোট ভাই দুজনার শশব্যস্ত চেহারার দিকে তাকালেন। মালিকের কি অদ্ভুত নিয়ম! এমন হৈন্য হয়ে একদিন তাদের দ্বারেই ঘুরেছেন ফরিদ।

শান্ত কণ্ঠে তিনি বললেন, “জমির দাম চৌদ্দ হলেও সব ঝামেলা মিটিয়ে বিক্রি করলে আমি মনে হয় দশ লাখের বেশি টাকা পেতাম না। মনিকেও তোমরা কিছুই দাওনি। একটা মাত্র বোন আমাদের। তার সাথে এমন না করলেও পারতে। আমার দশ লাখের অর্ধেক মনিকে দিবা।বাকি অর্ধেক আমাকে।” ভাইদের মুখ সাদা হয়ে গেল।

মনিরা তাজ্জব কণ্ঠে বললেন, “আমি এর মধ্যে..”

“চুপ করো। আমার কথা কি বুঝতে পেরেছ?” ভাইদের উদ্দেশ্যে বললেন তিনি।

“আরেকটু কমান ভাইজান। আপাকে তিন লাখ আর আপনাকে পাঁচ লাখ দেই? আপার টাকাটাও এখন দিতে পারব না। আপনার যেহেতু বেশি দরকার আপনারটাই আগে দেই।”

ফরিদ দর কষাকষি করলেন না। ওতে তিনি অভ্যস্তও নন। এই মিনি স্ট্রোক যে তার জীবনে শাপে বর হয়ে আসবে তা কে জানত! এই যে রাতারাতি পাঁচ লাখের ব্যবস্থা হয়ে গেল—তা কি তিনি কোনোদিন কল্পনাও করেছিলেন?

সেদিনই দু’লাখ টাকা দিয়ে দিলো তারা। টাকা হাতে রাখলেন না ফরিদ। সাথে সাথেই একটা ঋণ পরিশোধ করে ফেললেন। তার দু’দিন পর তাকে হাসপাতালে থেকে ছাড়ল বটে তবে পইপই করে সাবধান করে দিল—কোনোভাবেই চাপ নেয়া যাবে না। ফরিদ সেসব শুনে হাসেন, চাপের সমুদ্রে যার বাস, তাকে কি আলাদা করে আর চাপ নিতে হয়?

পাঁচ লাখের ঋণ মিটিয়ে দূর্বল বাবাকে আঁকড়ে ধরে কুন্দকলিতে পা রাখল ফাবিহা। ফরিদ আহমেদের সবকিছুই ভালো লাগছিল। এই যে ঘরটা ম্যাড়মেড়ে, আলো ঝলমল করছে না, অন্ধকারের মাঝেই একটা যুগ পুরোনো উপন্যাস ভ্যাপসা বাতাসে পাক খেয়ে বেড়াচ্ছে, দক্ষিণে জানালায় দৈত্যাকার নারিকেল গাছ খানিক পরপর মাথা দুলিয়ে হেসে বাতাসটা রোধ করে দিচ্ছে—এ সবই তার ভালো লাগছিল। মনে হলো জীবনের চমৎকার একটা অধ্যায় প্রবেশ করেছেন তিনি।

বহু বহু দিন পর স্ত্রীকে ডেকে বললেন, “এক কাপ ঠান্ডা ঠান্ডা চা আনো তো নূরজাহান!” খুশিতে নূরজাহানের চোখে পানি চলে এল।

*****

সাকিন ছুটে গেল সেই পুরোনো আবাসে। মনটা হু হু করে উঠল। দরজা ধাক্কাতেই আলগোছে সেটা খুলে গেল। বাড়ির ভেতরের পরিবেশ বাইরে থেকেই ঠাহর করা যায়। বসার ঘরে পাপড়ির মলিন মুখ নজরে এলো। তাকে দেখে ঝট করে দাঁড়িয়ে পড়েছে সে। সাকিন বলল, “আদিল কই?”

“ভেতরে। তুমি বসো সাকিন ভাই! কেমন আছো?” উত্তেজনায় তার ভেতরটা কাঁপছে। সে কি ঝট করে সাকিন ভাইয়ের পা ধরে মাফ চাইবে?

“ওকে একটু ডাক দে।”

পাপড়ি দৌড়ে গেলো। আদিলের সাথে সাথে পাপিয়াও এলেন।

আদিল সাকিনকে দেখে খুশি হয়ে গেলো। এগিয়ে এসে বলল, “বসো ভাই। বসো!” হাত ধরে তাকে বসাতে গেলে সাকিন নিষেধ করতে পারল না।

আদিল বলল, “বিলু মস্তান আব্বুর নামে কী কী মিথ্যা কেস যে করছে, শুনলে তুমি ঘেন্নায় মরে যাবা! এখন কী করব বলো না!”

সাকিন খানিকটা সময় নিলো। দম ছেড়ে বলল, “আদিল, যার যার আমলনামা তাকে তাকেই ভুগতে হয়। মামা সলতেয় আগুন দিয়েছে, বো-মা-টা ফাটবেই। দূরে থাকলেই রক্ষে হবে না। তার বিষয়ে আমি ভালো-মন্দ কিছুই বলব না। আমি এসেছি তোর আর পাপড়ির জন্য।”

পাপড়ি ফ্যাসফেসে কণ্ঠে বলল, “আমার জন্য!” সেই আওয়াজ সে নিজেই শুনতে পেলো না।

আদিল নির্বোধের মতো তাকিয়ে আছে। তার ঘাড়ে হাত রেখে সাকিন বলল, “মামা যেমনই হোক, আমার বিপদের সময় মাথায় ছায়া দিয়েছে। কাজেই, তোদের বিপদে আমি মুখ ঘুরিয়ে রাখতে পারি না। তোর, পাপড়ির কারো কোনো দোষ এখানে নেই। কিন্তু আগুন ধরালে তো শুধু সে জায়গা পোড়ে না, আশেপাশেও আঁচ লাগে। সাপের লেজে পা দেয়ার সময় মামা এসব ভুলে গিয়েছিল। যাই হোক, তোরা ছোটাছুটি করেও বেশি কিছু করতে পারবি না। তবে চেষ্টা করতে দোষ নেই। কিন্তু আদিল, একটা কথা মনে রাখিস। আমি যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন তোরা অভিভাবকহীন হবি না। যেকোনো বিপদে আমাকে মনে করবি। তোরা না মানলেও আমি তোদের বড় ভাই। সেই দাবি থেকে অন্তত আমাকে মনে করিস। আসি।”

মামীর সাথে একটি কথাও না বলে সাকিন চলে এলো। এবার কিছুটা স্বস্তি লাগছে।

প্রথম মাসের বেতন পেয়েই আদিলের কলেজের আর পাপড়ির স্কুলের বেতন পরিশোধ করল সে। টিউশনির টাকাও দিয়ে দিল। সাবিহার জন্য চমৎকার একটা জামদানি আর মাটির এক সেট থালা-বাসন কিনল।

জুবায়েরের কাছে শুনেছে, আকরামের ফার্মেসির লাইসেন্স তো গেছেই, ব্যারিস্টার লাইসেন্স নিয়েও নাকি টানাটানি হচ্ছে। ওটাও যেকোনো সময় চলে যাবে বলে তার ধারণা। হয়তো দু-চার বছরের জেল আর কিছু জরিমানাও হতে পারে। সাকিন এর মাঝে কদিন পরপর আদিলের সাথে দেখা করলেও মামা-মামী কারো সাথেই দেখা করেনি। আদিলও আর কিছু বলেনি। সম্ভবত সে মাথার উপরে একটা মানুষ পেয়েই কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করছে।

ট্রান্সফার হয়ে যাওয়ার আগে আদিলের সাথে যেদিন দেখা করল, সেদিন পাপড়িও সাথে এলো। দুজনকে ঝালমুড়ি, ফুচকা খাইয়ে বিদায় দেয়ার সময় হাজার পাঁচেক টাকা হাতে গুঁজে দিলো। আদিল অবাক হয়ে বলল, “এই মাসের বেতন তো দেয়া হয়ে গেছে ভাইয়া!”

সাকিন অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, “মামীর শরীরটা খারাপ শুনলাম। হেলাফেলা করিস না। মা হারিয়ে গেলে কোথায় পাবি?”

আদিল কোনো উত্তর দেয়ার আগেই পাপড়ি হুমড়ি খেয়ে সাকিনের পা ধরতে যাচ্ছিল। ভাবগতিক বুঝে আগেই ওকে খপ করে ধরে ফেলল সাকিন। ভরা রাস্তায় কী একটা অবস্থা হতো!

পাপড়ি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল, “আমাকে মাফ করে দাও, সাকিন ভাই! অন্তত একটা থাপ্পড় দিয়ে যাও!”

আদিল বোনের কাণ্ডে হতভম্ব হয়ে গেছে। এজন্যই নাছোড়বান্দা হয়ে আসতে চাইছিল! তার আগেই খটকা লেগেছিল সাকিন ভাই কস্মিনকালেও পাপড়িকে হেনস্থা করতে পারে না। আর না পারে হিরোইন খেতে। যেদিন জানতে পেরেছে ওটা বাবার পরিকল্পনা ছিল সেদিন থেকেই সে ছোটাছুটি বন্ধ করে পড়াশোনায় মন দিয়েছে। আর তারপর থেকেই সাকিনের সে বিষয়ে নির্লিপ্ত ভাব মোটেই স্বার্থপরতা বলে মনে হয়নি। নিজের রক্তের সাথে বেইমানি করার শাস্তি আকরামের একটু হলেও পাওয়া উচিত।

সাকিন চারপাশে তাকালো। অনেকেই উৎসুক চোখে এদিকে দেখছে। সে একটু ধমক দিয়েই বলল, “কান্না বন্ধ কর!”

পাপড়ি ঠোঁট চেপে ধরল। বোজা কণ্ঠে বলল, “যাওয়ার আগে মাফ করে দিয়ে যাও, সাকিন ভাই।”

সাকিন ছোট করে নিশ্বাস ছেড়ে বলল, “তুই আমাকে ভাই মনে করিসনি পাপড়ি, কিন্তু আমি তোকে আজীবনই বোন ভেবে এসেছি। চোখ মোছ। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। যা, বাড়ি যা।”

পাপড়ি চোখ মুছে বলল, “আমি কি সাবিহা আপার কাছে মাঝে মাঝে যেতে পারি?”

সাকিন কপাল কুচকে বলল, “দুটো চড় থাপ্পড় সহ্য করতে পারলে যাবি। সমস্যা কী!”

ফিরতি পথে আদিল বোনকে জেঁকে ধরল, “ওইদিন রাতে কী হয়েছিল রে?”

পাপড়ি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। অস্পষ্ট কণ্ঠে বলল, “আমি কোনোদিন বলতে পারব না! কোনোদিন বলতে পারব না!” সে বুঝতে পারল না এই অনুশোচনার অনলে পুড়ে তৈরি হওয়া লজ্জার মাধ্যমেই তার মাঝে প্রকৃত নারীত্বের বীজ স্থায়ীভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে।

পরদিন সকাল সকাল রওনা দিলো সাকিন। এদিকে সব লেনাদেনা চুকিয়ে ফেলেছে সে। সাবিহার ওখানে ট্রান্সফার হচ্ছে এটা ওকে জানালেও আজই যে যাচ্ছে সেটা বলেনি। থাক কিছু সারপ্রাইজ!

সাকিন যখন কুন্দকলির সামনে থামল তখন ঘড়িতে দশটা আঠের। রিকশার ভাড়া মিটিয়ে ভেতরে ঢুকতেই একটা অন্যমনস্ক নারী চেহারা চোখে পড়ল। কুন্দকলি থেকেই বেরুচ্ছে। আগে তো দেখেনি, নতুন ভাড়াটিয়া বোধহয়। সাকিন পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলেও মেয়েটা কোথায় যেন চোখ রেখে হাঁটছে! তাকে যে দেখেনি এটা বোঝাই যাচ্ছে। কোনদিকে যাচ্ছে তাও নিশ্চিত নয়। ফলে যা হবার তাই হলো। পড়ে থাকা একটা ইটের টুকরোর সাথে বেঁধে পড়ে গেলো মেয়েটা। সাকিন একবার ভাবল এগিয়ে যাবে। পরক্ষণেই মত পাল্টে ভেতরে ঢুকে গেলো। তাকে দেখলে বরং উল্টো লজ্জা পেতে পারে।

চলমান~

(বিঃদ্রঃ ১— বাস্তবের ফাবিহার জন্যে দোয়া চাই। সেও নতুন ইনিশিয়েটিভ নিচ্ছে আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ যেন তার প্রচেষ্টা কবুল করেন।

বিঃদ্রঃ ২— #বনজোছনা-র সবচেয়ে বড় পর্ব। সবচেয়ে বেশি রিয়্যাক্ট আসা উচিত নয়?)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 21 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন