#বনজোছনা
২৩.
অভ্যস্ত ভঙ্গিতে ঢুকলেও বাড়ির সামনে এসে থমকে দাঁড়াতে হলো। নিচ তলায় তো এখন ভাড়াটে আছে। অথচ ওদের বারান্দার দরজা না খুললে সিড়িঁঘরে ঢোকার আলাদা কোনো রাস্তা নেই। খানিকক্ষণ উশখুশ করে সাবিহাকে ডাক দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো সাকিন। ঘরে যেয়ে আর সারপ্রাইজ দেয়া হলো না।
ফোন হাতে নিয়েছে এমন সময় একটা মেয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। তার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে মোটা কন্ঠে বলল, “আপনি কে? ভেতরে ঢুকেছেন কেন? একটা মানুষের বাড়িতে না বলে ঢুকতে হয়!”
সাকিন বেশ মজা পেলো। ছোট্ট একটা মেয়ে। চোদ্দ পনের বছর হবে। গোল ফ্রকের ঘের পেরিয়ে বয়সটা বাইরে বেরুতে পারেনি। ডান কাধে মোটা একটা বিনুনি ঝুলছে আর বাম কাধে ঝুলছে রিফাত। কন্ঠ মোটা করতে চাইলেও সুবিধে করতে পারেনি সে। ওর বালিকা গলা থেকে মধ্যবয়সী আওয়াজে বেরুনো সম্ভব নয়। ফলে হয়েছে তার উল্টো, ধমকের রেশ উড়ে গিয়ে একটা অসম ঝগড়ার কৌতুক তৈরি হয়ে গেছে।
তাকে দেখেই রিফাত দরজার গ্রিলের ভেতর দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। আধো আধো কন্ঠে ডাকলো, “মামা মামা!”
সাকিন রিফাতের দিকে ইশারা করে বলল, “আমি রিফাতের মামা।”
সিমি জিহ্বায় কামড় দিল। তড়িৎ দরজা খুলে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে বলল, “আসসালামু আলাইকুম। সরি..ইয়ে আপনার নামটা কী? সাবিহা আপা তো বলল না আজকে যে আপনি আসবেন।” শেষটুকু বিড়বিড় করে নিজেকেই শোনালো সিমি।
সাকিন উঠে আসতে আসতে বলল, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আমি সাকিন। তোমার নাম কী?”
“সিমি। আমরা এখানে নতুন আসছি।” বলতে বলতেই রিফাত ঝাপ দিয়ে মামার কোলে চলে গেল।
সাকিন উপরে ওঠার সময় ঠিক পেলো সিমি বিড়াল পায়ে তার পিছু নিয়েছে। সে তাকালে শুকনো মুখে বলল, “আমি তো জানি না আসলেই আপনি সাবিহা আপার ভাই কি না। তাই একটু নিশ্চিত হতে যাচ্ছি। আপা ঘরে একদম একা।”
সাকিন খুশি হলো। হেসে বলল, “এসো। তোমার আপা জানে না আজকে যে আমি আসব।”
“সারপ্রাইজ দিবেন?”
সাকিন উপর নিচে মাথা নাড়ল।
সে সময় সাবিহার কন্ঠ ভেসে এলো।
“সিমি! রিফাতকে নিয়ে আয়! গোসল করানো লাগবে!” চুলা থেকে তরকারি নামিয়ে খুন্তি হাতে হন্তদন্ত হয়ে সে ডাইনিংয়ে এলো। লাউ ডালে লবন দিতে এক্কেবারে ভুলে গেছে। ওদিকে লবনের কৌটা খালি পড়ে আছে। গতকাল হীরা চৌধুরী বাজার করলেও সেগুলো গোছানো হয়নি। সে বাজারের ব্যাগ থেকেই লবণের প্যাকেট নিতে ছুটতে যেয়ে তাকে থমকে দাঁড়াতে হলো। দরজার সামনে সাকিন রিফাতকে কোলে নিয়ে হাসি হাসি চেহারায় তাকিয়ে আছে। সাবিহা বিস্মিত কন্ঠে বলল, “ভাইয়া!” উল্কার বেগে ছুটে এসে সাকিনের বুকে আছড়ে পড়ল সে।
এতদিনের জমানো অভিমান ঢালতে থাকলো অক্লান্ত ভঙ্গিতে।
“তুই একটা মানুষ নাকি কলাগাছ! একটা মেসেজ দিয়ে কী ভেবেছিস? দুনিয়া কিনে নিয়েছিস? শোন, ওইসব খুচরা মেসেজে কিছুই হয় না।” সাবিহার চোখ টলমল করছে। ঝরঝর করে কেদেঁ ফেলল সে। অস্পষ্ট কন্ঠে বলল, “আমি কীভাবে সেই সুখে তোকে দুঃখের গল্প শোনাই—তাই না? আমি তো রানী! রানী এলিজাবেথ! খুন্তি হাতে রানীগিরি করছি। তুই কেন এসেছিস এখানে?”
সিমি চলে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করল। যাবার আগে আস্তে করে সাবিহার হাত থেকে খুন্তিটা টেনে টেবিলে রেখে গেলো। মেজাজ যে অবস্থায় আছে, যখন তখন এক ঘা বসিয়ে দিতে পারে।
সাবিহা তার মশলার গন্ধমাখা হাতটা ভাইয়ের মাথায় বুলিয়ে দিলো। ছোটখাটো মেয়েটাকে একটু বেগ পেতে হলো বৈ কি! ভেজা কন্ঠে সে বলল, “চুল কাটিস না কেন? বাউল হওয়ার শখ জেগেছে নাকি?”
“সন্ন্যাসী হলে কেমন হয় বল তো!” বহুদিন পর এমন ফুরফুরে কন্ঠে কথা বলল সাকিন। বোনটাকে কাছে পেতেই দুশ্চিন্তার দল পালিয়ে গেছে।
সাবিহা চোখ রাঙিয়ে বলল, “হওয়াচ্ছি তোমাকে সন্ন্যাসী! আমার কাছে এসেছিস না, এবার একদম ধরে-বেধে বিয়ে দিয়ে দেব!”
“আমি কি পালিয়ে যাচ্ছি নাকি? ধরাধরি করতে হবে কেন?”
সাবিহা কোমরে হাত দিলো, “আমি পালিয়ে যাচ্ছিলাম, হ্যাঁ! আমাকে তো একদম ধরো তক্তা মারো পেরেকের মতো বিয়ে দিয়ে দিলি! আমি একা সহ্য করব কেন! তোকেও এভাবেই বিয়ে দেব দেখিস!”
“আচ্ছা। এসব আপাতত বাদ দে। এগুলো রাখ।”
এই এতক্ষণে সাকিনের হাতের দিকে চোখ গেল সাবিহার। বিরক্ত মুখে ব্যাগ খুলে বলল, “আবার মাটি এনেছিস! আমাকে মাটি দিতে পারছিস না বলে আমার ঘর মাটি দিয়ে ভরিয়ে ফেলছিস?”
সাকিন মোটেই রাগ করল না সে কথা শুনে। বরং হাসল। সাবিহার মুখে বিরক্তির ভাজঁ থাকলেও দুচোখ ঝলমল করছে। ঠিক আশ্বিনের ঝলমলে এক ফালি সকালের মতো।
টেবিলে জিনিসগুলো সাজিয়ে রেখে কিছু বলার আগেই পোড়া গন্ধ নাকে লাগল। সাবিহা আর্তনাদ করতে করতে ঝড়ের বেগে ছুটে গেলো।
“আল্লাহ! আমার লাউ ডাল শেষ! তোর জন্য এমন হয়েছে ভাইয়া! তোকেই এই শুকনা খটখটে ডাল খাওয়াবো আমি!”
কোলের শান্ত বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে সাকিন মায়া মায়া কন্ঠে বলল, “মামা কেমন আছে?”
রিফাত সে প্রশ্ন বুঝল না। খুশি হয়ে সাকিনের দাড়ি ধরে আরো জোরে টান দিলো, “মামা! মামা!”
সাবিহা কিছু আচার রোদে দিয়েছিল। যোহরের আজান পড়লে সেগুলো ওকে দিতে এলো সিমি। প্রথম যেদিন তাকে এবাড়ির কাজ করার জন্য প্রস্তাব দেয়া হয় তখন সে ভীষন ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিল তাকে বোধহয় এবার পাঠিয়েই দেয়া হবে। দূরে তো নয়—এই উসিলা দিলে তার আর নিষেধ করার কিছু থাকবে না। কিন্তু ছোট আপা তার সামনেই বলল, “এইটুকু একটা মানুষ! এত জায়গায় কাজ করবে কীভাবে? হয় এখানে থাকবে, না হয় ওখানে।”
নূরজাহান আর তাকে জোর করেননি। সিমির উসিলাতেই যে গত মাসে তিনটে কাথাঁ সেলাই হয়ে গেল এটা তার সহসাই ভুলে যাবার কথা নয়।
ফলে তারপর সাবিহার অনুরোধে নিয়মটা এমন হলো— ফাবিহা, ফরিদ বেরিয়ে যাবার পর থেকে সাবিহার দুপুরের রান্না শেষ হয়ে যাওয়ার মধ্যবর্তী এই সময়টুকু সে রিফাতকে রাখবে। বদলে তাকে অবশ্যই কিছু বেতন দেয়া হবে এবং এরই সাথে দুপুরের খাবারটা এখানেই খাবে সিমি। দুরন্ত ওই বাচ্চাটাকে সামাল দিতে পারলেই সাবিহার অর্ধেক মুশকিল আসান হয়ে যায়। ফলে, ইতোমধ্যে দোতলায়ও সিমির বেশ ভাব হয়ে গেছে।
আচারের বয়াম হাতে নিয়ে সিমি যখন সিঁড়িতে পা দিলো, ধা করে খুব পুরনো খেলাটার ছন্দ মনে পড়ে গেল, “এলন্টি লন্ঠন, ঘড়ি বাজে টনটন, এক দুই তিন!”
আরও একটা ছন্দ ছিল। কী যেন! কী যেন!
দরজার কাছে এসে মনে পড়ল।
“চড়ুই পাখি বারোটা, ডিম পেড়েছে তেরোটা, একটা ডিম নষ্ট, চড়ুই পাখির কষ্ট!”
একজনকে দুহাত ছড়িয়ে বসিয়ে না ছুঁয়ে তার হাতের উপর দিয়ে লাফিয়ে পড়তে পারলেই মনে হতো এই দুনিয়াটা তার। একটা দীর্ঘশ্বাস সিমির বুক চিরে বের হলো। এই তের বছরেই সে বুঝে গেছে এ দুনিয়ার কিচ্ছু তার নয়। একটা কিচ্ছু না!
এই যে এখন এখানে আছে, কদিন পরে কোথায় থাকবে কে জানে! সে থাকতে চাইলেই তো তাকে রাখা হবে না। একদিন না একদিন নিজের রাস্তা নিজেকেই মাপতে হবে। সেদিন কোথায় যাবে সিমি? এই রাক্ষসে ভরা দুনিয়ায় তাকে একা করে দিয়ে কেন বাপ-মা দুজনেই নিরস্ত হলো? প্রশ্নটা বড় পোড়ায় অথচ কোনো উত্তর আসে না।
“আপা! আপনার আচার রেখে গেলাম।”
সাবিহা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বলল, “গোসল করে এসে খেয়ে যা।”
সিমি মাথা নেড়ে চলে যাচ্ছিল। ওর শুকনো মুখ দেখে সাবিহা বলল, “কী হয়েছে তোর?”
“কিছু না।” ছোট করে বলল সিমি।
“বুঝতেই পারছি কিছু। কী হয়েছে? তোর ছোট আপা বকা দিয়েছে?”
“আমার ছোট আপা আমাকে বকে না।”
সাবিহার মনে হলো সিমি রেগে গেছে। কেমন কোনা চোখে তাকিয়ে আছে!
“রাগ করছিস কেন? ও মা! শোন সিমি, তুই আমার কাছে একেবারে চলে আয়। তোকে ওদের চেয়ে বেশি টাকা দেব।”
সিমি বিরক্ত হয়ে গেল। এই কথাটা রোজ একবার করে বলবে সাবিহা। গুরুতর ভঙ্গিতে নয়। স্রেফ খোঁচানোর জন্য। প্রথমদিন বলে যে দেখেছিল এ কথা শুনলে সিমি খুব রেগে যায়—সেই থেকে পেয়েছে এক হাতিয়ার। কিছু হলেই এক কথা—একেবারে চলে আয়, সিমি! ওদের চেয়ে বেশি টাকা দেব।” এক বাচ্চার মা হলে কী হবে! এই মেয়ের হাড়ে-মজ্জায় ছেলেমানুষী।
আজ আর সহ্য করতে না পেরে সিমি বলে ফেলল, “আপনার কি আমাকে লোভী মনে হয়?”
“লোভী মনে হবে কেন? মানুষ বেশি টাকা কামাতে চায় না?”
“চায়। আমি চাই না।”
“কেন? তুই চাস না কেন?” সাবিহার চোখে কৌতুক।
“আমি শুধু ছোট আপার সাথে থাকতে চাই।”
“তোর ছোট আপা তো মনে হয় না তোকে এত ভালোবাসে!”
“আমি বাসি, তাই থাকব। আপা বাসলে বাসুক, না বাসলে না বাসুক।”
সাবিহা ফ্যান ছেড়ে বসল। আঁচল দিয়ে গলার ঘাম মুছে আলস্য ভরা কন্ঠে বলল, “একদিন তোর ছোট আপার বিয়ে হয়ে যাবে, সেদিন তুই কী করবি?”
এ বেলায় সিমিকে খানিকটা বিপন্ন দেখাল। তা সে কিছু মুহূর্তের জন্যই। তারপরই সে বলল, “আগের যুগে মানুষ বউয়ের সাথে দাসী পাঠাতো না? আমি ছোট আপার ওইরকম দাসী হবো!” কথাটা বলতে পেরে তার চোখমুখ চকচক করে উঠল। সে প্রায় লাফাতে লাফাতে নিচে নেমে গেল। ওঠার সময় চিন্তিত ছিল এই ভেবে যে ভবিষ্যতে কোথায় যাবে। সাবিহার খোঁচায় সে উত্তর মাটি খুঁড়ে বেরিয়ে এলো। মনে মনে হাজারবার তাকে ধন্যবাদ জানালো সিমি। আর চিন্তা নেই। যা হয় হোক!
ওদিকে হতভম্বের মতো বসে রইলো সাবিহা। সে সিমিকে একটুখানি খোঁচাতেই চেয়েছিল। ওর মনে যে মায়ার জল গড়িয়ে এতদূর চলে গেছে তা সে কল্পনাও করেনি। মেয়েটার জন্য মনে মনে অপরিসীম মায়া অনুভব করল সাবিহা। বেচারী, অল্প বয়সে জীবন নদীতে ভাসমান নৌকো হয়ে গেছে।
*****
ফাবিহা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে দুটো ক্লাস করে হাপিয়ে উঠল। একটা কথাও কানে ঢুকছে না। মাথায় শুধু আহযাবের বত্রিশ নম্বর আয়াত পেন্ডুলামের মতো ঢং ঢং করে বেজে যাচ্ছে। এই অস্থিরতা সহ্য করতে না পেরে সে ফ্যাকাল্টির পশ্চিমের পুকুর ঘাটে চলে গেল। চারপাশে সিমেন্ট দিয়ে বাধাঁই করা বেঞ্চ। জারুল গাছের নিচের বেঞ্চটায় বসতেই এক ফালি দমকা হাওয়া কোত্থেকে ছুটে এলো। যেন তাকে ছুঁয়ে দেয়ার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
পুকুর ঘাটটা বড় শুনশান হয়ে আছে। আশেপাশে তেমন একটা মানুষ নেই। সবাই ক্লাসে ব্যস্ত। সে-ই কেবল দৌড় থেকে ছিটকে গেছে। চোখ বন্ধ করে বেঞ্চে হেলান দিলো ফাবিহা। কাল রাতের ঘুমটাও গভীর হয়নি। ডুব দিতে গেলেই উপর থেকে কে যেন টেনে ধরছিল। কে? আহযাব? আহযাব অর্থ যেন কী ছিল? দল, অনেকগুলো দল, অনেকগুলো বাহিনী । কীসের বাহিনী ওগুলো? পাপ, পুন্যের, চিন্তার, দুশ্চিন্তার। কতগুলো দল ফাবিহার দিকে ধেয়ে আসছে! কোনটাকে বরণ করে নেবে সে?
আমলের দিক দিয়ে নিজেকে বহু পেছনে দেখতে পায় ফাবিহা। তার ধারনা—এই পৃথিবীতে বিদ্যমান মুসলিমদের তালিকা করলে তার নামটা সবার শেষে আসবে। আক্ষরিক অর্থে সমর্পিত বলতে যা বোঝায়—তার চেয়ে বহু দূরে তার অবস্থান। রোজার মাস ছাড়া খুব একটা রোজা রাখা হয় না, মাঝে মাঝেই নামাজ মিস হয়ে যায়। শালীনতার সূক্ষ্ম বোধ থাকলেও সে যে পুরোপুরি পর্দা করতে পারে না— এটাও সে মানে। কাজেই, নিজেকে শেষ কাতারের সর্বশেষ মুসলিম হিসেবেই সে দেখে। তবু, তবু মুসলিমের কাতারে নামটা আছে— এটাই তার জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি। আজীবন চুড়ান্ত ধার্মিক হিসেবে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে মরণের পর যদি নিজের নাম মুসলিম খাতাতেই না পাওয়া যায়— তবে এরচেয়ে বড় ব্যর্থতা আর দুটো হতে পারে না। অন্তত ফাবিহার কাছে।
ব্যক্তিগত পাপের বিষয়টা ভিন্ন। তাতে সমাজের কোনো ক্ষতি নেই, কারো পথভ্রষ্ট হওয়ার আশংকা নেই, কেউ ভুল মেসেজও পায় না। কিন্তু যখনই কাজটা বৃহত্তর পরিসরে করা হয়, আর চারটা মানুষকে জানানো হয় তখনই এর বাহ্যিক রূপ বদলে যায়। উপস্থাপনের ধরনই একটা কাজকে ভালো অথবা খারাপ হিসেবে সাব্যস্ত করে। ভালোর বেশ ধরে একটা নিষিদ্ধ কাজকে চালিয়ে দেয়ার পরও কি ফাবিহা মুসলিম থাকবে? প্রশ্নটা তার মনে কাটার মতো ফুটে থাকে।
তার জন্য আরো চারটা মানুষ এই কাজে অগ্রসর হচ্ছে। রোজ নিয়ম করে ফরিদ এবং নূরজাহান তার রেকর্ডিং শোনেন। সিমিও বাদ পড়ে না। ফরিদের ফোন কোনো এক ফাঁকে নিয়ে ঠিক ঠিক সেগুলো শুনে নেয়। তাও একবার নয়, কয়েকবার। তার জন্যেই তো এই মানুষগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে থাকা ওই সূক্ষ্ম মিউজিক শুনছে। তার কিছু বান্ধবী কেবল সে ভয়েস ওভার করে বলেই ওই অডিওগুলো শুনতে শুরু করেছে। তাদের কাছে ফাবিহার মাধ্যমে মেসেজ যাচ্ছে— কাজটা খারাপ তো নয়ই, বরং কিছু ক্ষেত্রে ভালোও বটে!
এই সব যুক্তির উর্ধ্বে যে একটা আদেশ তা হলো— আল্লাহ নিষেধ করেছেন। ক্ষুদ্র পরিসরে হলে হয়তো এই বিষয়টা এতখানি গায়ে লাগতো না। এখন পুরো বিশ্বের কাছে তার কন্ঠ পৌছে গেছে। খুব আয়োজন করে ফাবিহা পরম করুণাময়ের আদেশ অমান্য করে তা ছড়িয়ে দিয়েছে দুনিয়াব্যাপী। ব্যক্তিগত গুনাহ আর ব্যক্তিগত নেই, তা জনমানসের সামনে নগ্নভাবে উন্মুক্ত হয়ে গেছে। তার বিনিময়েই অর্থোপার্জন করছে সে এবং আশা করছে এই অর্থে সেই করুণাময় অঢেল বরকত দিয়ে তাদের সুদের বংশ নির্বংশ করে দেবেন।
নিজের গুনাহ তো হচ্ছেই, সাথে সাথে অন্যকেও ডেকে আনা হচ্ছে, সকলের কাছে ছড়িয়ে দিয়ে এ গুনাহের ভার কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। ধপ করে চোখ খুলল ফাবিহা। এমন পাহাড় সমান চাপ বুকে নিয়ে তার পক্ষে বেচেঁ থাকা সম্ভব নয়। এই পুরো চিন্তার ঘূর্ণিঝড়ের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা নিতে তার সময় লাগল মাত্র এক সেকেন্ড।
সেদিন তার রেকর্ডিং ছিল না। তবু লাঞ্চ ব্রেকের পরপরই স্টুডিওতে চলে গেল ফাবিহা।
সৌমিক ছিল না। তার আসতে আরো ঘন্টাখানেক লাগল। এটুকু সময় একদম চুপচাপ বসে বাকিদের কাজ দেখতে থাকল সে।
সৌমিক এসে ফাবিহাকে দেখতেই একটু থমকে গেল। সে ভাবেনি ফাবিহা ওরকম সেন্টিমেন্টাল মেয়ে। জানলে এসব কিছু করতই না। আজ ওকে দেখে বরং স্বস্তি পেলো। ফাবিহা এগিয়ে এসে বলল, “ভাইয়া, আপনার সাথে কিছু কথা ছিল।”
বাকিদের ইশারা দিয়ে ফাবিহাকে নিয়ে নিরিবিলি বসল সৌমিক। আগের দিনের প্রসঙ্গ উঠিয়ে বলল, “সরি ফাবিহা! কাল তুমি…”
“কালকের আলাপ থাক ভাইয়া। আজকের কথাটা শুনুন।”
“বলো।” দম ছেড়ে বলল সৌমিক।
“আমি কাজটা আর কন্টিনিউ করতে চাচ্ছি না।”
ফাবিহার শান্ত ভঙ্গির কথাটা শুনে বিকট চোখে তাকালো সৌমিক। হতভম্ব কন্ঠে বলল, “কী বললে!”
“আমি ভয়েস ওভারের কাজটা আর করতে চাচ্ছি না।” ফাবিহার কথায় কোনো তাড়া নেই। যেন হাতে অফুরন্ত সময় নিয়ে এসেছে সে।
সৌমিক অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলল, “কালকের ওই সিলি ঘটনার জন্য তুমি এমন একটা ডিসিশান নিলে! আই কান্ট বিলিভ ইট!”
ফাবিহা এক নজর সৌমিকের দিকে তাকালো। ইচ্ছেটা যে কাল হয়নি এমন নয়, তবে আজকের কারণটা তো ভিন্ন।
“তোমাকে প্রচন্ড ইগোইস্টিক একটা মেয়ে মনে হচ্ছে ফাবিহা! হাউ কুড ইউ ডু দিস!”
ফাবিহা মুখ গোল করে বাতাস বের করে বলল, “ভাইয়া, রিল্যাক্স! আমার কথাটা একবার মনযোগ দিয়ে শুনুন।”
সৌমিক আহত চোখে তাকিয়ে আছে। ফাবিহার কাজ ছাড়াটা এখন কেবল তার সাথে নয়, পুরো ‘খসড়া’'র সাথে জড়িয়ে আছে। এর প্রভাব কেমন হতে পারে আন্দাজ করেই তার মেজাজ বিগড়ে এলো।
ফাবিহা অনুরোধ করল, “আমার কথাটা একবার শুনবেন ভাইয়া? প্লিজ!”
“বলো!” গমগমে গলায় বলল সৌমিক।
“আমি অনেক ধার্মিক শ্রেণির মেয়ে নই। আমার নিজের গুনাহের শেষ নেই। তবে আমি অন্যের দায়ভার নিতে নারাজ।” সৌমিকের কপালে ভাঁজ পড়ল। এই কথার সাথে তাদের আলোচনার কোনো সূত্র আছে কি না সে বুঝতে পারছে না।
ফাবিহা ফের বলল, “বাইরে, পুরুষদের সামনে যে মেয়েদের কন্ঠ কোমল করতে হয় না— এই বিষয়ে আমার একেবারেই ধারনা ছিল না। এটা মাত্র গতকাল জানতে পেরেছি। তারপরেও যদি কাজটা ছোট গন্ডির ভেতরে হতো, নিজের ছাড়া অন্য কারো পাপের ভাগিদার আমাকে না হতে হতো, তাহলে বোধহয় আমি কাজটা ছাড়তে পারতাম না। কিন্তু একটা নিষিদ্ধ কাজের সূত্র ধরে ইনকাম করাটা আমার কাছে অসম্মানজনক। সাথে, আমার জন্য অন্য কেউ এ বিষয়ে সফট হার্টেড হয়ে যাচ্ছে সেটাও লং রানে আমার জন্য ক্ষতিকর। এসব কারণেই আমি কাজটা ছাড়তে চাইছি।”
লম্বা করে দম ছাড়ল ফাবিহা।
সৌমিক তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলল, “আমাকে যা খুশি একটা বোগাস বুঝিয়ে দিলেই আমি বুঝে যাব? আমাকে কি তোমার গাধা মনে হয় ফাবিহা?” তার তাচ্ছিল্যের হাসির মাঝেই ফাবিহা ব্যাগ থেকে ফোন বের করল।
জিমেইলে ঢুকে একটা মেইল টাইপ করে তৎক্ষণাৎ সেন্ড করে মোবাইলটা সৌমিকের দিকে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “বেশ কিছুদিন আগে এই টেক্সটাইল কোম্পানি থেকে আমাকে বিজ্ঞাপনের জন্য অফার দেয়া হয়েছিল। আপনার সাথে রাগ থাকলে নিশ্চয়ই তাদের নিষেধ করতাম না? এরপরেও বিশ্বাস না করলে আমার আর কিছু বলার নেই ভাইয়া।” ফাবিহা উঠে দাঁড়াল।
সৌমিক তাজ্জব কন্ঠে বলল, “তুমি কি পাগল!”
“এখনও হইনি। নিজের পাপের শেষ নেই, মানুষের পাপ নেয়ার মতো পাগল আমি নই। আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন ভাইয়া। সে জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আসছি, আসসালামু আলাইকুম।”
রিকশায় উঠে মনে হলো, দৃষ্টিসীমার মাঝে যতখানি পথ দেখা যায় তার সবটুকু ঘন অন্ধকারে ঢেকে আছে। ফাবিহা কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছে না, কিচ্ছু ঠাহর করতে পারছে না। অথচ মাথার উপরে বসে থাকা দৈত্যটা বিকট আওয়াজে হাসছে।
—
ফরিদ ইদানীং দ্রুত বাড়ি ফেরেন। কোচিংয়ের ঝামেলা নেই। কলেজের সময়টুকু ছাড়া সারাটাদিনই একপ্রকার অবসর। এই অবসরে তার সঙ্গী হয়েছে বাড়ির আঙিনায় ঘুরঘুর করে বেড়ানো একটা বিড়াল। কারো পোষা নয়, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। শখ করে ওটাকে একদিন খেতে দিয়েছিলেন তিনি। তাতে সেই যে পিছু ধরেছে, আর ছাড়ার নাম নেই। বাড়িতে ঢুকে তাকে দেখলেই হয়েছে, কিছু খেতে না দেয়া অবধি সে মোটেই নড়ার লক্ষণ দেখায় না। এ পর্যন্ত তবু মানা যায়। মাঝে মাঝে আবার ঘরে ঢোকার বাহানা করে সে। বসতে দিলে খাইতে দাও, খাইতে দিলে শুইতে দাও ভাব। বাংলা অঞ্চলের বিড়ালগুলোও বাঙালিদের স্বভাব ভালো মতো রপ্ত করে নিয়েছে।
কিন্তু তাতে ফরিদের একেবারেই সায় দেয়া চলে না। এটাকে এক দরজা দিয়ে ঢোকালে তাকে আরেক দরজা দিয়ে বের হতে হবে। নূরজাহান এসব পোষাপুষি একদম পছন্দ করে না। তার বক্তব্য হলো—আদর, আপ্যায়ন যা করার সব ঘরের বাইরে। প্রথমে ঘরে ঢোকানো হবে, তারপর খাটে ওঠানো হবে এবং চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে তার মলমূত্র পরিষ্কার করতে হবে। এসব কস্মিনকালেও পারবেন না তিনি! দরকার হয় সংসার ছেড়ে বনবাসে যেয়ে থাকবেন। তবু এসব নয়!
কাজেই বিড়ালের জন্য যাবতীয় মায়া উঠানে এসে দেখাতে হয়।
সিমি দুপুরের এটোঁ খাবার এনে ফরিদের হাতে দিয়ে বলল, “খালু, বিড়ালের নাম কী রাখছেন?”
প্লেটটা সামনে রাখতেই বিড়ালটা প্রায় হামলে পড়ল। কটমট করে কাটাঁ চিবিয়ে খাচ্ছে। ফরিদ হেসে বললেন, “নাম রাখা কি অনেক জরুরি নাকি?”
“জরুরি না! নাহলে আপনি এটাকে ডাকবেন কী বলে? মিউ মিউ করলে তো অন্য বিড়ালও চলে আসতে পারে।”
“কী নাম দেয়া যায় বল তো!”
“এটার যোগ্য নাম খালু, টিকটিকি।”
“কী! টিকটিকি কেন!” অবাক হয়ে তাকালেন ফরিদ।
“জাতে বিড়াল হলেও এর স্বভাব টিকটিকির মতো। মানুষ দেখলেই শুধু চিপকাচিপকি করতে চায়।”
“তোর সাথেও করেছে নাকি?”
“করতে চাইছিল। আমি সু্যোগ দেই নাই।” নাক-মুখ কুচকে বলল সিমি। ফরিদ হো হো করে হেসে ফেললেন। বহুদিন পর এমন প্রানখোলা হাসি হাসলেন তিনি।
সে হাসির মাঝেই বাড়িতে ঢুকলো ফাবিহা। বাবাকে এভাবে হাসতে দেখে তার মনের মেঘ এক নিমিষে তার মনের মেঘ কেটে গেলো। প্রানভরে হাসিটা দেখল ফাবিহা। বিড়বিড় করে বলল, “এই হাসিটা অটুট রাখার জন্য যা করতে হয়, আমি তাই করব মাবুদ! তুমি একটা উপায় করে দাও!”
“কী নিয়ে এত হাসাহাসি হচ্ছে?” ফাবিহা এগিয়ে এলো।
ফরিদ উচ্ছল কন্ঠে বললেন, “মা রে! বিড়ালটা নাকি সিমিকে অনেক জ্বালাতন করে। তাই সিমি ওর নাম দিয়েছে টিকটিকি!”
ফাবিহা অবাক হিয়ে বলল, “ইভ টিজার নাকি!”
সিমি চোখমুখ লাল করে বলল, “লাফ দিয়ে শুধু কোলে ওঠার ধান্দা! এমন নোংরা গায়ে ঘেষাঘেষি করলে কেমন লাগে বলেন দেখি!”
“আসলেই তো টিকটিকি!” বলতেই সে মিউ মিউ করে উঠল।
ফাবিহা একবার ভাবল বাবাকে সবটা বলে। পরক্ষণেই মত পাল্টালো। এই হাসিটা থাকুক। কোনো কিছু বলেই বাবার উচ্ছল চেহারাটা মুছে দিতে পারবে না সে।
তারপর একে একে দুটো দিন গত হলো। ফাবিহা ভেবেছিল, সে এমন একটা ত্যাগ করেছে, এর বিনিময়ে আল্লাহ নিশ্চয়ই একটা না একটা ব্যবস্থা করে দেবেন। দুদিন অতিক্রম হওয়ার পর সে বুঝলো—এটা কোনো ত্যাগই নয়। বরং তার করণীয় ছিল। গুনাহ করা বা না করার সিদ্ধান্ত একান্তই তার নিজের। সে পাপ ছেড়ে দিলে যেমন মালিকের কোনো লাভ নেই, তেমন অনবরত পাপ করতে থাকলেও তাঁর কোনো ক্ষতি নেই। বরং মেনে নেয়াটা কেবল তার নিজের জন্যই দরকার। দাস হিসেবে এটাই তার কর্তব্য।
ফাবিহার বুকটা ভারী ভারী লাগে। সপ্তাহ পেরিয়ে যাচ্ছে। কারো টাকা দেয়া হয়নি। মূক হয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের এই বিপদটা কি ওই আকাশের চেয়েও বড়?
চলমান~
(আপনারা তো লোক ভালো না! ফু না দিলে রিয়্যাক্ট ওঠে না 😒)