ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনজোছনা

পর্ব 24

লেখক: বিনতে ফিরোজ

#বনজোছনা
২৪.

ফাবিহার জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। এনেছে তাদের আগের প্রতিবেশী। সেই প্রস্তাব শোনার পর থেকেই নূরজাহানের মুখ কালো হয়ে আছে। ছেলের আগে বিয়ে হয়েছিল—এটা যতখানি না রাগিয়েছে তার চেয়ে বেশি দুঃখ দিয়েছে এটা জেনে যে ছেলে পরিচিত নেশারু। এ কথা বলাতে মহিলা যে উত্তর দিয়েছে সেটা বহুদিন ভুলতে পারবেন না তিনি।

“মেয়েকে এখন নিজের কাছে রাখা মানে আরো বেশি খরচ। বিয়ে দিয়ে পার করে দিতে পারলেই তো আপনাদের লাভ! তাছাড়া, নেশা আপনাদের ঘরের ছেলেও করে। এ আর এমন কী! চার ঘাটে ঘুরে বেড়ানো মেয়ের জন্য এর চাইতে ভালো প্রস্তাব আর পাবেন না। ভেবে দেখবেন, আপনাদের অবস্থা শুনে ওরা কোনো যৌতুকও দাবি করেনি।”

আরো দুঃখের কথা হলো এটা ফরিদকে বলার সময় ফাবিহা শুনে ফেলেছে। ওর মুখ দেখে অবশ্য কোনোকালেই ভাবগতিক তেমন একটা বোঝা যায় না। তবে নিশ্চয়ই সে কষ্ট পেয়েছে! নূরজাহানের বুকটা ভেঙেচুরে আসতে চায়। এই বিয়ের কথা নিয়েই মনিরার সাথে সম্পর্ক খারাপ হলো। পরকীয়া করে সংসার ভাঙা দুই বাচ্চার বাবার জন্যে মনিরা যখন শুধু সরকারি চাকরি আছে এই সূত্র ধরে ঘটকালি করল তখন তার মাথায় বাজ পড়ার দশা। এক কথায় নিষেধ করে তিনি ননদের সাথে মুখ দেখাদেখিও বন্ধ করে দিলেন। পরে অবশ্য মনিরা বারবার বলেছিল পরকীয়ার বিষয়ে সে কিছুই জানত না। কিন্তু সে সময় গায়ের রক্ত গরম ছিল। পান থেকে চুন খসলেই সবকিছু কাটছাট করে দেয়া যেত। আজ ঠান্ডা হতে হতে অনুভূতি এমন ভোঁতাই হয়েছে যে মানুষ বাড়ি বয়ে এসে চার কথা শুনিয়ে গেলেও সেটা দিব্যি ভুলে রাতে ঘুমুতে পারেন। সময় কী অবিশ্বাস্য ভাবেই না মানুষের ভোল পাল্টে দেয়!

শেলীর মেয়েটার এসএসসির রেজাল্ট দিয়েছে। ভালো রেজাল্ট করেছে বলে আত্মীয়-স্বজন সবার বাড়িতে মিষ্টি বিলি করা হয়েছে। বাদ পড়েছেন কেবলমাত্র নূরজাহান। ধারে-দেনায় গলা অবধি ডুবে আছেন বলে তার ঘরের চৌকাঠ সে মিষ্টি পেরোতে পারেনি। সেলাই মেশিনে চালানো তার পা জোড়া মুহূর্তেই শক্তি হারিয়ে ফেলে। মেশিনের কাঠে মাথা ঠেকিয়ে চুপ করে বসে থাকেন তিনি।

এ বাড়িতে আসার পর জামা-কাপড়ের অর্ডার আর আগের মতো আসে না। এদিকের কেউ তো তাদের সেভাবে চেনেই না। কাঁথা আগের গুলোই এখনো শেষ করে উঠতে পারেননি। কাজের চাপ কমতে কমতে নাই হয়ে যাচ্ছে। আসছে দিন কেমন হবে ভাবতেই তার গা শিউরে ওঠে। গত দুদিন ধরে শুধু আলু ভর্তা আর ডাল দিয়েই তিন বেলার খাবার চলছে। সেই ডালও জ্বাল দিতে দিতে শুকিয়ে খটখটে হয়ে গেছে। খাবার সময় সবাই এমন ভাব করে যেন কেউ কাউকে চেনে না। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। আজকাল আবার বুকের ব্যাথাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে চায়। মেয়েটার বিয়ের কী ব্যবস্থা হবে, ছেলেটার কবে বুদ্ধি হবে, দেনাগুলো কবে সব চুকিয়ে ফেলতে পারবেন—এই একেকটা পাহাড় সমান চিন্তা তাকে ডুবিয়ে রাখে সারাটা বেলা। মাঝে মাঝেই মনে হয় তার আয়ু বোধহয় ফুরিয়ে এসেছে। খুব পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে এসব কিছু থেকে।

হাতের জামাটা সেলাই করে তিনি মেয়ের ঘরে এলেন। ফাবিহা ক্লাসে যাওয়ার জন্য গোছগাছ করছে। ওর ঘরটাও খালি হয়ে গেছে। বুকশেলফটা নেই। বইগুলো সব বিক্রি হয়ে গেছে। এখন কেবল একটা খাট আর ছোট্ট একটা টেবিলই এ ঘরের সম্বল।

“খাবি না মা?” সমস্ত দুঃখ, কষ্ট, পরাজয়ের গ্লানি, অপমানের যন্ত্রণা মিলেমিশে যে করুন স্বর তৈরি করল তা এড়িয়ে যাওয়ার সাধ্যি কোনোকালেই ফাবিহার ছিল না। সে ব্যাগটা ঘাড়ে নিয়ে এগিয়ে এসে বলল, “রোজা আছি আম্মু।”

“কীসের রোজা?” অবাক হয়ে বললেন নূরজাহান।

“ভাঙা রোজাগুলো তো রাখা হয়নি। ভাবলাম রেখে ফেলি।” সত্যিটা পাশ কাটিয়ে গেলো সে। গত দুটো দিন ধরে তাদের সামনে আলু ভর্তা পরিবেশন করার সময় নূরজাহান যে অপরাধীর মুখ করে থাকেন তা সহ্য করা ফাবিহার জন্য দুষ্কর। খাবারে মাছ, মাংস যোগ করার সামর্থ্য যেহেতু তার নেই কাজেই এক প্রকার পালিয়েই অন্তত আত্মগ্লানিটুকু কমানোর ক্ষুদ্র চেষ্টা করে চলেছে সে।

“রোজা যে রাখবি এটা বলা লাগে না? সেহরি করেছিস?”

“হঠাৎ ভাবলাম। সেহরি করিনি।”

“সেহরি না করলে রোজা হয় নাকি!”

“হয় আম্মু। সেহরি করা ভালো, কিন্তু জরুরী না। আমি যাই হ্যাঁ? থাকো।”
এক প্রকার পালিয়ে বাচঁলো ফাবিহা। সে কীভাবে বলবে এক বেলার খাবার বাঁচানোর জন্য, এক বেলা মায়ের শুকনো মুখটা দেখার শাস্তি থেকে বাচাঁর জন্য তার এই উদ্যোগ। সে ভেবেছে এখন থেকে সোম, বৃহস্পতির রোজাগুলোও নিয়মিত থাকবে। খাবারের অভ্যাসটা কমানো দরকার।

ক্লাসে মিলির হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দেখে বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। নিশ্চিত ইনকামের রাস্তাটা চোখের সামনে আরেকবার হাতছানি দিয়ে ডেকে গেলো। ‘খসড়া’র গ্রুপ থেকে লিভ নেবার পরপরই সবাই আলাদা আলাদা ভাবে মেসেজ দিয়েছিল। দেয়নি কেবল সৌমিক। কাউকেই বিষয়টা ভেঙে বলেনি সে। কেবল কাজটা আর করবে না—এটাই ছিল তার একমাত্র কথা।

বুকের ভেতর দুশ্চিন্তার ঝড় যখন সবকিছু ভেঙেচুরে লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে তখন ব্যাগ থেকে সন্তপর্নে ডায়েরিটা বের করল ফাবিহা। স্যার আসার আরও দশ মিনিট বাকি। এই ফাঁকে ওখানে কলম চালালো।

“ফাবিহা,

অনবরত তোমার কানে কেউ ফিসফিসিয়ে যাচ্ছে—কাজটা ছাড়লি কেন বোকা! এতগুলো টাকা পাচ্ছিলি! বাবা-আম্মুর শান্তিটা দেখতে ইচ্ছা করে না? একটা ব্যবস্থা বলে তারপর না হয় এটা ছাড়তি। এখন ভুগছে কে?

ভুগছে সবাই। আমি একভাবে ভুগছি, আমার পাশের ডেস্কের মেয়েটা অন্যভাবে। এই দুনিয়াটা আরাম করার জায়গা কেবল নির্বোধদের জন্য। একটুখানি বোধও যাদের আছে, তাদের সবাইকেই এখানে ভুগতে হবে।

বোকামি অবশ্যই করেছি। আগপাশতলা বিবেচনা না করেই একটা কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। এটা বোকামি বৈ কি! কাজটা শুরু না করলে ফিরে আসার ব্যাপারটাই থাকত না। না থাকত এত ঝামেলা।

তবু ফিরে যাওয়া যাবে না ফাবিহা। বাবা-আম্মুর হাসি মুখ অবশ্যই দেখতে চাই। তবে যেনতেনভাবে না। যে হাসিতে কেবল পয়সা থাকে এমন হাসি আমার দরকার নেই। যেই হাসিতে বরকতের ছোঁয়া আছে, আমি সেটাই আমার বাবা-আম্মুর ঠোঁটে দেখতে চাই।

ফাবিহা, মনটা বারবার পিছলে যেতে চাইছে? ভুল করে কাদায় পিছলে যাওয়া আর স্থায়ীভাবে কাদায় ঘর বানিয়ে নেয়া কি একই কথা, ডিয়ারেস্ট? একটা জীবন তুমি অবলীলায় কর্দমাক্ত হয়ে কাটিয়ে দিতে চাও?”

ডায়েরিটা বন্ধ করতেই পাশের ডেস্কের মেয়েটা বলল, “ফাবিহা, তোমার ডায়েরিটা একটু দেখব?”

ফাবিহার চোখ ছলছল করছিল। মুহূর্তেই তারা সচেতন হয়ে গেল। অস্বস্তি নেমে এলো তার চোখে-মুখে। তার অবস্থা বুঝেই মেয়েটা বলল, “আরে ভেতরে দেখব না! উপরটা দেখব শুধু!”

ফাবিহা ডায়েরি এগিয়ে দিলো।

মেয়েটা ফটাফট বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তুলে ফেলল। অনুরোধ করে বলল, “ভেতরের পৃষ্ঠা কেমন? লেখা নেই এমন একটা পেইজ দেখাবে? তোমার হাত থেকে দেখলেই হবে।”

ফাবিহা পেছনের দিকের পৃষ্ঠাগুলো খুলে দেখালো। সেটারও ছবি তুলল মেয়েটা। বোঝাই যাচ্ছে কাউকে পাঠাচ্ছে। মেসেজ টাইপ করতে করতে ফাবিহাকে বলল, “কোত্থেকে নিয়েছ বলো তো? জিনিসটা তো পুরাই অ্যাস্থেটিক!”

“আমিই বানিয়েছিলাম।” ফাবিহা ক্ষীণ কণ্ঠে বলল।

“কী!” ভূত দেখার মতো করে লাফিয়ে উঠল মেয়েটা। আচমকা ওর হাত ধরে বলল, “মাই গড! সত্যিই তুমি বানিয়েছ? আরেকবার দেখি?”

“দেখো।” সে কোনো উৎসাহ পাচ্ছিল না। রাতে কোনোরকমে দুটো খাওয়া হয়েছে। তারপর না খেয়েছে সেহরি, না-ই বা সকালের খাবার। মনের সাথে সাথে শরীরটাও নেতিয়ে আসছে। বাকি দিনটা কীভাবে কাটাবে কে জানে। আস্তে করে ডেস্কে মাথা এলিয়ে দিলো সে।

মেয়েটা বিস্মিত চোখে ডায়েরিটা দেখল। তার বিস্ময় যেন কমেই না। সেভাবেই সে বলল, “এতদিন এমন ডায়েরি শুধু ফোনে দেখেছি! কী সুন্দর আল্লাহ!” ফাবিহা বুঝতে পারছিল না মামুলি একটা ডায়েরি দেখে এত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার কী আছে! ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো মেয়েটার পরবর্তী কথায়।

এবার সে অনুরোধ নয় একেবারে অধিকার নিয়ে বলল, “আমার জন্য একটা বানিয়ে দিতে হবে, ফাবিহা!”

ফাবিহা নিষেধ করবে কীভাবে বুঝতে পারছিল না। কতগুলো পৃষ্ঠা লাগে! এত পৃষ্ঠা কেনার মতো টাকাও তার হাতে নেই। আমতা আমতা করছে তখনই মেয়েটা ফোনের দিকে তাকিয়ে চাপা কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল।

“ফাবিহা!”

“কী হলো!” ওর প্রতিক্রিয়া দেখে ধড়ফড়িয়ে বসল সে। “কী হয়েছে?”

চেয়ারটা ফাবিহার দিকে আরেকটু এগিয়ে এনে মেয়েটা একটা ফেইসবুক প্রোফাইল বের করে দেখালো।

“এই যে, এই আপু আমার রুমমেট। এবার ফাইনাল ইয়ারে। সামনেই ওঁদের বিদায় অনুষ্ঠান। হলে এবার আপুরা নিজেদের মতো করে একটা অনুষ্ঠান করবে। সেখানে ব্যাচের চল্লিশ জন মেয়ের সবাই কমন কিছু একটা নিজেদের কাছে স্মৃতি হিসেবে রাখতে চাচ্ছিল। তোমার ডায়েরিটা আপুকে দেখলাম, আপুর খুব পছন্দ হয়েছে!”

ফাবিহা কথার সারমর্ম বুঝতে পারল না। বিভ্রান্ত কণ্ঠে বলল, “ও আচ্ছা।”

মেয়েটা উত্তেজিত হয়ে বলল, “আরে! আচ্ছা কী? তোমাকে বানিয়ে দিতে হবে!”

“হ্যাঁ?”

“এমন ডায়েরি, তোমারটা তো নীল, আপুদের থিম সবুজ। সবুজ রঙের চল্লিশ পিস ডায়েরি বানাতে কতদিন লাগবে, ফাবিহা?”

ফাবিহার চোখের পলক পড়ছিল না। সে ফ্যাসফেসে কণ্ঠে বলল, “বলতে পারছি না।”

মেয়েটা একটু চিন্তিত হলো, “আপুদের ফাংশন পরের উইকে। এর মাঝে হবে না?”

ফাবিহা নিজের বুকের ঢোল পেটানোর শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। ভয় পাচ্ছিল এক হাতের মাঝে বসে থাকা মেয়েটাও সেটা শুনে ফেলে নাকি।

টুং করে আবার শব্দ হলে মেসেজ দেখে মেয়েটা বলল, “ওহ! খরচ কেমন হবে? আগে থেকে তো কিছু দিতে হবে না? এতগুলো ডায়েরি বানাতে তো তোমার অনেক জিনিস কিনতে হবে।”

এমন সময় স্যার চলে এলে সবাইকে থামতে হলো। থামতে পারল না ফাবিহার চিন্তার ঘূর্ণি। কী থেকে কী হচ্ছে সে এখনও বুঝে উঠতে পারছে না।

খাতা বের করতে করতে মেয়েটা নিচু কণ্ঠে বলল, “আমাকে একটা রাফ হিসাব দিতে পারবে? আপুকে জানানো দরকার।”

ক্লাসের পড়ায় আর কোনোভাবেই মন দিতে পারল না ফাবিহা। এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলো তার নীল ডায়েরির দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তার চোখের তারায় ঘনঘোর বর্ষা দেখা গেলো। সুযোগের অভাবে কেবল তারা ঝাঁপিয়ে পড়তে পারল না। আস্তে করে বুকে হাত রাখল সে। চল্লিশটা ডায়েরি, কত টাকা হবে?

কলম নিয়ে সাথে সাথেই হিসাব করতে শুরু করল সে। এমন ডায়েরি আগেও দুটো বানিয়েছে। শখ করে বানালেও কাজটা সে ভালো পারে। যদিও দু’বছর আগে বানিয়েছে কিন্তু ডায়েরির বাইন্ডিং এখনও বেশ মজবুত।

প্রতি ডায়েরিতে মোটামুটি তিনশ টাকা খরচ হবে। ফাবিহা মেয়েটাকে জানালো, “ডায়েরি প্রতি চারশ পড়বে।”

ঝটপট ডেস্কের নিচে মোবাইল রেখে মেসেজটা পাঠিয়ে দিল সে। মিনিট খানেকের মাঝেই বলল, “তোমার বিকাশ নাকি নগদ?”

ফাবিহার হার্টবিট বেড়েই চলেছে। বাড়তে বাড়তে তারা পাহাড় ডিঙাতে চায়, আকাশ ছুঁতে চায়। অবিশ্বাস্য কণ্ঠেই সে বলল, “নগদ।”

“নাম্বারটা দাও। এখন কত দিতে হবে আপু জানতে চাইছে।”

তড়িৎ হিসাবে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিল ফাবিহা।
“পাঁচ হাজার দিলেই হবে ইনশাআল্লাহ্।”

তার ঠিক এক মিনিটের মাথায় ফাবিহার ফোনে মেসেজ এলো। সাত হাজার টাকা এসেছে। মেয়েটা দাঁত বের করে বলল, “আপু ভুল করে পাঁচের জায়গায় সাত দিয়ে দিয়েছে। কী সুইট ভুল!”

ফাবিহার মনে হলো সে যেকোনো সময় পড়ে যাবে। শরীরটা স্থির থাকতে চাইছে না। ভেতরের উত্তেজনা ফেঁটে বেরিয়ে পড়তে চাইছে।

বোকা ফাবিহা! গল্পের একটা পিঠই সে জানল। দাসের কর্তব্য মালিকের আদেশ মান্য করা—এটা যেমন সত্যি। সেই সাথে এটাও সত্যি—সে মালিক নিজেই আশ্বাস দিয়েছেন—কেউ তাঁর দিকে এক বিঘত এগিয়ে গেলে তিনি নিজ দায়িত্বে আরও দশ বিঘত এগিয়ে আসবেন। কেউ যদি তাঁর দিকে হাঁটতে শুরু করে, তবে তিনি দৌঁড়াতে শুরু করবেন।

আচমকা সে সৌভাগ্যের দৌঁড়ে আসাটা সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল এসবই ভ্রম! কেবল একটা সুখ স্বপ্ন।

ফাবিহা জানে না, চোখে হারামের ভারী পর্দা পড়ে গেলে খুব নিকটে থাকা হালালও তখন আর দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। অথচ মালিক পৃথিবীটা হালাল দিয়েই সাজিয়েছেন। অজস্র সব জিনিসের সবকিছুই হালাল, কেবল হাতে গোনা কয়েকটা জিনিস ব্যতীত। সেই কয়েকটা জিনিসের বিষাক্ততা এতখানি তীব্র যে সমস্ত হালালকে অনস্তিত্বের দিকে ঠেলে দিয়ে মুহূর্তেই মুমিনের পৃথিবীকে সংকুচিত করে ফেলে। অথচ আসমান থেকে আগত প্রতিটি সমস্যার সমাধানই হালালের মাঝে লুকিয়ে আছে। বোকা মানুষ, সবকিছুর তাৎক্ষণিক ফল পেতে চায়। কাজের শর্টকার্ট করতে যেয়ে নিজের জীবনটাই শর্টকার্ট করে ফেলে।

দুপুরের ক্লাস শেষ করেই ফাবিহা টাকাটা তুলে ফেলল। প্রথম দফায় একশ কার্টিস পেপার কিনল। শ্যাওলা সবুজ কাপড়ের পুরো থানার অর্ধেকটা নিয়ে নিলো। সাথে নিলো সাদা রঙের লেইস। আঠা কিনল সবচেয়ে ভালোটা। তার পা দুটো পারছিল না শুধু দৌঁড়াতে।

*****

সাকিনের মনে হচ্ছিল সে বছর পাঁচেকের বাচ্চা। আজ জীবনে প্রথমবারের মতো স্কুলে যাবে বলে তার মায়ের উত্তেজনার শেষ নেই। পার্থক্য কেবল এটুকু, তার বয়স আঠাশ পেরিয়ে ঊনত্রিশ ছুঁই ছুঁই করছে। স্কুলের বদলে সে যাচ্ছে কলেজে, তাও পড়তে নয়, পড়াতে। আর মায়ের ভূমিকা পালন করছে সাবিহা, তার ছোট্ট বোনটি।

সাকিন বিরক্ত হয়ে বলল, “তুই থামবি সাবিহা?”

সাবিহা চোখ রাঙিয়ে ঠোঁট কামড়ে তাকালো। যেন তার কথা না শুনলে এক্ষুনি ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে কামড়ে খামচে একাকার করে দেবে, ঠিক ছোট্ট বেলার মতো।

সাকিন অধৈর্য হয়ে বলল, “এই গরমের ভেতর কেউ এসব পরে?” শরীরের অ্যাশ কালারের স্যুটের দিকে আরেকবার তাকালো সে। মনে হচ্ছে ধূসর খাঁচায় শরীরটা আটকে দিয়েছে। গরমে এখনই অবস্থা খারাপ। বাকি দিন সিদ্ধ হতে হবে ভেবে প্রমাদ গুনল সে।

সাবিহা আরেকবার শার্টের ইন ঠিক করে দিলো। পালিশ করা জুতো জোড়া এনে সাকিনের পায়ের কাছে বসতে গেলেই সাকিন এবার একটা ধমক দিলো।

“ওঠ তো তুই! আমি কি জুতা পরতে পারি না? ওঠ!”

সাবিহা উল্টো চোখ রাঙালো। মোটা কণ্ঠে বলল, “তুই কি মনে করেছিস? আমি জুতা পরাতে পারি না? একদম আন্ডারএস্টিমেট করবি না! এক বাচ্চার মা আমি। তুই কী? তুই কচু! পা ওঠা!”

সাবিহার ধমকে সাকিন তব্দা খেয়ে গেলো। বিরক্ত ভঙ্গিতে চেয়ারে বসল সে। সাবিহা বড় যত্ন করে জুতো জোড়া পরিয়ে দিলো। পরাতে পরাতে তার চোখ ভিজে এলো। একটা জুতো পরিয়েই ভাইয়ের দুহাত টেনে নিজের মুখে চেপে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল সে।

সাকিন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। এই তো চেঁচামেচি করছিল, এর মাঝেই কী হয়ে গেল!

“সাবিহা! এই! কাঁদছিস কেন! কী আশ্চর্য! একেকটা আনপ্রেডিক্টেবল কাজ করে আমাকে হার্ট অ্যাটাক করানোর ধান্দা করেছিস। এই সাবিহা!”

সাবিহা হাত ছেড়ে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছল। বাম পায়ের জুতো পরাতে পরাতে মাথা নিচু করে ভেজা কণ্ঠে বলল, “দুনিয়ার সব সুখ আল্লাহ তোকে দিক ভাইয়া। সুখ ভাগ করে নেয়ার মতো যোগ্য একটা মানুষ দিক। যা যা তুই সহ্য করেছিস তার সবকিছুর উত্তম বদলা দিক।” বলেই সে ছুটে চলে গেল। সাকিন থম মেরে বসে রইলো। গতকাল পাপড়ি তার কাছে ফোন দিয়েছিল। সাবিহার সাথেও বেশ খানিকক্ষণ কথা বলেছে। ওর কাছে কি সবকিছু বলে দিয়েছে? সাকিন প্রচণ্ড বিব্রত বোধ করল।

শরীরের স্যুট-কোর্টের এই সেট থেকে হাতের ঘড়ি, পায়ের জুতো সবকিছুই সাবিহার কেনা। সে নিজের মন মতো আজ ভাইকে সাজিয়ে দিয়েছে। প্রচণ্ড গরমের মাঝেও এক পশলা শীতল বাতাস সাকিনকে ছুঁয়ে গেলো। ধীর গতিতে হীরা চৌধুরীর ঘরে গেলো সে। ভদ্রলোক কোন একটা প্রবন্ধ পড়ছিলেন।

সাকিন বলল, “আসছি চাচা, দোয়া করবেন।”

হীরা চৌধুরী চকচকে চোখে তাকালেন বটে। কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “হ্যাঁ যাও। জীবনটা তো গল্প-উপন্যাস না যে যা মনে হবে সেভাবে চালাবে। জীবনের একটা গতিপথ থাকা দরকার, কোর জিনিস থাকা দরকার। ঠিক প্রবন্ধের মতো। যাও, নামের শিক্ষক না হয়ে কামের শিক্ষক হও।”

সাকিন বেরিয়ে সিঁড়িঘরে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করল। সাবিহার সাড়াশব্দ নেই। সে কণ্ঠ উঁচু করে ডাকল, “সাবিহা!”

সাবিহা রিফাতকে কোলে নিয়ে বের হলো। তার চোখমুখ দেখে কেউ বলতে পারবে না এই একটু আগেই সে কেঁদে ভাসিয়েছিল। চোখা চোখে সে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।

সাকিন আস্তে করে বলল, “আসি।”

সাবিহা ভারী কণ্ঠে ছেলেকে বলল, “মামাকে সালাম দাও তো রিফু! বলো, মামা তোমাকে মামীধরা হিসেবে পাঠাচ্ছি। সফল হয়ে আসো।”

সাকিন তাজ্জব কণ্ঠে তাকালো, “মামীধরা আবার কী!”

“রিফুর মামী ধরার জন্যই তোকে এই সাজ সাজিয়েছি। কী ভাবছিস? ভালোবাসার ঠেলায় দিয়েছি? জীবনেও না। যে আমাকে ধরে-বেঁধে বিয়ে দেয় তার সাথে আমার কোনো ভালোবাসা নেই! সাজগোজ যা করার করে দিয়েছি, এরপরেও যদি কোনো মেয়ে পছন্দ না করে ভাববি তোর কপাল খারাপ।”

সাকিন মনে মনে স্বীকার করল তার কপাল খারাপ কি না সে বিষয়ে কনফিউশন থাকলেও সাবিহার যে মাথা খারাপ হয়ে গেছে এটা নিশ্চিত।

*****

ফাবিহা হিসেব করেছিল মোট দু’শ চল্লিশটা কার্টিস পেপার লাগবে। একটা পেপার ছয়টা ভাগে ভাগ করেছিল সে। কিন্তু দেখা গেলো একেকটা কাগজ এত মোটা যে চল্লিশটা কাগজ একটা ডায়েরিতে দিলে সেটা দৈর্ঘ্যের তুলনায় বেশি ফুলে থাকছে। তাই কাগজ কমিয়ে ত্রিশটা দিলো। তাতে এপিঠ ওপিঠ করে ষাট পৃষ্ঠা হয়।

কার্টিস পেপারের রং মলিন হলুদ বলে একটা স্মৃতিকাতর ভাব এর সাথে লেগে থাকে। সেগুলো সুতো দিয়ে সেলাই করে কিনে আনা বক্সবোর্ড পেপার গুলো নির্দিষ্ট মাপে কাটতে লাগলো।

নূরজাহান মেয়ের এত আয়োজন দেখে বললেন, “কী রে! কত ডায়েরি বানাচ্ছিস!”

ফাবিহা বাচ্চাদের মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “চল্লিশটা ডায়েরির অর্ডার পেয়েছি আম্মু!”

“চল্লিশটা! তোর তো অনেক কষ্ট হয়ে যাবে!” নূরজাহান চিন্তিত কণ্ঠে বললেন।

“হোক! কতগুলো টাকা পাবো ভাবো!”

নূরজাহান কাতর চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন। অর্থকষ্টের ছাপ ফাবিহার চোখেমুখে স্পষ্ট।

“তোর রেকর্ডিং কেমন চলছে? নতুন কিছু করিসনি? শোনালি না তো!”

এক মুহূর্তের জন্য ফাবিহার কাজ থেমে গেলো। সে বলল, “কাজটা ছেড়ে দিয়েছি আম্মু।”

“কেন!” নূরজাহান প্রচণ্ড অবাক হলেন।

সংক্ষেপে কারণ বিশ্লেষণ করল সে। নূরজাহান আপ্লুত হলেন। তার জ্ঞানের পরিধি কম। মাঝে মাঝে মনে হয় শূন্যের কোঠায়। সেই তার পেট থেকে বের হওয়া মেয়েটা এমন করে চিন্তা করছে দেখে বুকটা ভরে গেলো। মেয়ের মাথায় চুমু খেয়ে বললেন, “খুব ভালো করেছিস মা! আল্লাহর পথে নামলে আল্লাহ তাকে এতিম করে ফেলে রাখেন না। নিজেও সাথে থাকেন। আমরাই বুঝি না।”

ফাবিহা শক্ত করে ঢোক গিলে মাথা নাড়ল। আসলেই ও বোঝেনি। মেয়েটা যখন বলল— চল্লিশটা ডায়েরি লাগবে ফাবিহা— তখনও সে বোঝেনি যে তার রিজিকের দরজা খুলে সেদিক দিয়ে দখিনা বাতাস বইতে শুরু করেছে। শরতের গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘ জীবনের সবটুকু উচ্ছ্বাস কাখে চেপে তারা ফাবিহার জীবনের দখিন দুয়ারে পৌঁছে গেছে।

বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে গেলেও থামল না সে। ইফতারিতে এক গ্লাস পানি আর একটা বিস্কুট খেয়ে এসেই আবার বসল। মাত্র দশটা ডায়েরি সেলাই হয়েছে। আঠা দিয়ে এগুলো রাতভর চাপা দিয়ে রাখতে হবে। এ বেলায় একটু চিন্তিত হলো সে। এগুলো চাপা দেয়ার জন্য বিশেষ এক ধরনের যন্ত্র আছে। তার তো সেসব নেই। কী দেবে?

খুঁজতে খুঁজতে সিমির ট্রাঙ্ক পেলো খাটের নিচে। টান দিতেই বোঝা গেলো এর ওজন কম হলেও দশ কেজি হবেই। চমৎকার জিনিস!

—

‘নওরোজ’ শেষ হয়েছে বারোটি পর্বের মাধ্যমে। শেষ হওয়ার পর বেশ কিছু গ্রুপে তিনি লিংকগুলো শেয়ার করলেন। কিন্তু তেমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না। কেউ কেউ গল্প চাইলে তিনি যখন নিজের গল্পের লিংক কমেন্টে দিলেন, অনেকেই বলল— “এত ছ্যাঁচড়া কেন! নিজের লেখা কেউ দিবেন না।”

এত লজ্জা পান ফরিদ! তার লেখা তো কেউ পড়ে না। তিনি শেয়ার না করলে প্রচার হবে কীভাবে? ত্রিশটা রিয়্যাক্ট নিয়ে ‘নওরোজ’ শেষ হয়েছে। এমন হলে এভাবেই পড়ে থাকবে। অথচ তিনি কিছু বলেনওনি। কেবল লিংকটা দিয়েছেন। ফরিদ মনে মনে তওবা করলেন, আর কাউকে নিজের লেখা দেবেন না।

এমন সময় নূরজাহান এসে ঘটনা জানালে ফরিদের বুকটা ঠান্ডা হয়ে গেলো। মনে হলো নিজের যৌবনটাই ফিরে ফিরে দেখছেন। তবে ফাবিহার মনোবল অনেক বেশি। তাকে তো কোনো টাকা-পয়সা ছাড়তে হয়নি। কেবল শখ দূরে সরিয়েছেন। মেয়েটাকে এক নজর চোখে দেখার প্রয়োজন অনুভব করলেন তিনি। দেরি করলেন না, তৎক্ষণাৎ উঠে চলে গেলেন।

ফাবিহা একটা সুতোয় গিট দিতে পারছিল না। কেউ একজন ধরলে ভালো হতো। অথচ এতক্ষণ বেশ অনায়াসে সবগুলোর কাজ করেছে। বিরক্ত হয়ে যেই না রেখে দিতে যাবে এমন সময় সেই গিটে ফরিদ আঙুল দিলেন। বাবাকে দেখে এক ফালি হাসি উপহার দিয়ে ফাবিহা বলল, “জানো বাবা! চল্লিশটা ডায়েরির অর্ডার পেয়েছি! একেকটার দাম চারশ। সাত হাজার টাকা এর মধ্যে দিয়েও দিয়েছে!”

ফরিদের চোখ ভিজে এলো। স্ট্রোকের পর শরীরের সাথে মনটাও খানিক দুর্বল হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্বল হয়েছে অশ্রুগ্রন্থি। একদম নিয়ন্ত্রণ মানে না।

“শুনলাম মা রে! তোর আম্মু বলল।”

“খুব খুব দোয়া করে দাও তো বাবা! এই কাজটায় যেন আল্লাহ ভরে ভরে বরকত দেন!”

ফরিদ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। নিজের ছোট্ট নোটপ্যাডে লিখলেন,

“ফাবিহা, মা রে!
আমার দোয়া তোকে জড়িয়ে থাকুক
যখন আমি পারি না।”

সিমি এই এতক্ষণে একটু সুযোগ পেলো। একবার খালাম্মা আসছে আরেকবার খালু। বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল সে। সেই কখন থেকে দরজার বাইরে ঘুরঘুর করছে! ছোট আপাকে একটু একা পাওয়াই যাচ্ছে না। সুযোগ পেতেই চোরা পায়ে ঢুকে পড়ল।

উপরের তলায় আজকে বিশাল আয়োজন। সাবিহা আপার ভাইয়ের চাকরির প্রথম দিন আবার আপার বর অনেকদিন পরে বাড়ি এসেছে। সব মিলিয়ে এলাহী কারবার। পোলাও, রোস্ট, গরু, খাসি— কী নেই!

আজ সারাদিনই সিমির ওখানে দাওয়াত ছিল। দুপুরের খাবার তো ধরা। রাতেরটাও সাবিহা ওখানে খেতে বলেছে। দুপুরে এবাড়িতে এক বাটি খাবার পাঠালেও ফাবিহা খেতে পারেনি। রোজা তো ছিলই, ইফতারিতেও সে ভারী খাবার খায় না। ওদিকে গরমে খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে বাকিদের খেয়ে নিতে হলো।

রাতেও সাবিহা তাকে প্লেট ভরে খেতে দিয়েছে। কোনো কিছু নিয়েই তার কার্পণ্য নেই। এমনভাবে খেতে দেয় যে ওই এক প্লেট খাবার দিয়ে সিমির মতো মেয়ে দুবার খেতে পারবে। আজ আরো বেশি দিয়েছে।

অথচ ছোট আপা খায়নি ভেবে সিমির গলা দিয়ে খাবার নামছিল না। দুপুরে তো ভেবেছিল ছোট আপা রাতে খাবে। রাতেও খেলো না। সিমি নিজের প্লেট নিয়ে সাবিহাকে বলল, “আপা, আমার ঘরে যেয়ে খাই? এখানে এত মানুষ! কেমন কেমন লাগে!”

সাবিহা কোনো প্রশ্ন না করেই সায় দিয়েছে। ছাড়া পেতেই ছুটে এসেছে সিমি। অথচ ফাবিহাকে একা পাওয়াই দায়।

মুখের সামনে ছোট্ট একটা হাত দেখে ফাবিহা অবাক হয়ে মাথা তুলল। সিমি লোকমা ধরে রেখেছে।

“এসব কী?”

“এগুলো ছোট আপা খাবারের জিনিস। মুখে নিয়ে খেতে হয়। হা করেন।”

ফাবিহা বলল, “এগুলো খেলে এখন গ্যাস বাড়বে। খাবো না…” না বলতেই তার মুখে খাবার ঠুসে দিলো সিমি। দাঁত বের করে বলল, “গ্যাস হলে ওষুধ খাবেন। ফার্মেসির মানুষের রিজিক মারার চিন্তা করেন কেন? মনে মায়া দয়া নাই?”

ফাবিহা বিরক্ত ভঙ্গিতে সেলাই করতে থাকল।

সিমি বলল, “ছোট আপা, জানেন! সাবিহা আপার ভাই আসছে। কী যে অদ্ভুত একটা নাম!”

“কী নাম?”

মুখ খুলতেই সিমি খেয়াল করল নামটা একেবারেই মনে পড়ছে না। এই যাহ! অথচ এমন অদ্ভুত লেগেছিল যে সারাদিন নামটা মাথায় ঘুরঘুর করছিল। আরেক লোকমা ফাবিহার মুখে দিয়ে বলল, “কী জানি একটা নাম! যবর, যের, পেশ এমন কিছু।”

“পাগল! যবর, যের, পেশ মানুষের নাম হয়!”

“না আপা! এগুলো না! যজম, সাবিহা আপার ভাইয়ের নাম যজম!”

ফাবিহা বলল, “ভালো। তোর পছন্দ হলে তোর ছেলের নাম রাখিস।”

“ইছ! দুনিয়ায় নামের অভাব পড়ছে? যজম রাখব কোন দুঃখে? তাও আবার একা পড়া যায় না। একেবারে গরীব নাম!”

ফাবিহা খেতে খেতেই বলল, “সিমি, আম্মুর চাকরি ছেড়ে দিয়ে একদিনের জন্য আমার অ্যাসিটেন্ট হ। হবি?”

“কীসের অ্যাসিটেন্ট, ছোট আপা?”

ফাবিহা উচ্ছল ভঙ্গিতে সবটা বর্ণনা করল। সিমি দুচোখ ভরে তার ছোট আপাকে দেখে। গত দুটো রাত আপা যে ঘুমের ভেতরেও কেমন ছটফট করেছে এটা তো খালু, খালাম্মা কেউ জানে না। জানে শুধু সিমি। সে সকালে চোখ খুলেই দোয়া করেছে আল্লাহ যেন ছোট আপার বুকে শান্তি দেয়। রিফাতকে কোলে নিয়ে বলেছে ছোট আপার চিন্তা যেন কমিয়ে দেয়। মুয়াজ্জিন যখন মাগরিবের আজান দিচ্ছিল, তখন আপাকে শুকনো একটা বিস্কুট খেতে দেখে তার চোখে পানি চলে এসেছিল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছিল আল্লাহ যেন আপার পেটটা ভালো খাবার দিয়ে, সুন্দর করে ভরিয়ে দেয়।

নিজের হাতের খাবার আর ফাবিহার হাতের ডায়েরি দেখে সিমি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। তার মতো একটা কাজের মানুষের দোয়াও এভাবে কবুল হয়!

চলমান~

(প্রিয় পাঠক, ধরুন আপনি এই গল্পটি বইয়ে পড়ছেন। তাহলে বইটা কিনে আপনার অনুভূতি কেমন হতো? লস প্রজেক্ট? নাকি ওয়ার্থ ইট?)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 24 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন