#বনজোছনা
২৫.
বন্দরে বন্দরে রফিকের কাজ। জাহাজে করে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানির ব্যবসায় সে নিযুক্ত। চাইলেই বছরের বারো মাস স্ত্রী-পুত্র নিয়ে আয়েশ করতে পারে না। ছুটে বেড়ানোটাই তার পেশা। হীরা চৌধুরী বলেন, ওটা মূলত নেশা। বিয়ের পর পায়ে শেকল পড়বে ভেবেছিলেন। কিন্তু তাতে ছাই ঢেলে ছেলে এমন ব্যবসা বেছে নিলো যাতে সবসময় উড়ে বেড়ানো যায়।
প্রথম প্রথম সাবিহার প্রচণ্ড খারাপ লাগত। তবে তখন শাশুড়ি ছিলেন। মন খারাপ হলে তার সাথে দু’দণ্ড কথা বলা যেত। তিনি মারা গেলেন রিফাত হবার কিছুদিন আগে। সেসময় সাবিহার মনে হয়েছিল, স্বামী ছাড়া যদিও বা সে থেকেছে, শাশুড়ি ছাড়া মোটেই থাকতে পারবে না। কারণ সেই ছোট্টবেলার পর মা বলতে মূলত এই মানুষটাকেই কাছে পেয়েছিল। দোষ-গুণ সবারই থাকে, তারও ছিল। কিন্তু দুই কথা বললেও কখনও সাবিহাকে দূর-ছাই করেননি। ফলে আনাড়ি হাতে রিফাতকে নিয়ে দিকভ্রান্ত অবস্থায় সাবিহার মনে হয়েছিল— এবার আর সে বাঁচবে না। জীবনের কঠিনতম পরীক্ষায় লেটার মার্ক পেয়ে নরমালে রিফাতকে জন্ম দিতে পারলেও, ওকে একা হাতে মানুষ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
রফিক তখন ছুটে বেড়ানো কিছুটা কমালো। কিন্তু যার ঘাঁটি অন্য জায়গায় বসানো সে চাইলেই ঘরে থিতু হতে পারে না। রফিকও পারেনি। বিশ দিন থাকলে আবার পঁচিশ দিনের জন্য পাড়ি জমাতে হতো চোখের আড়ালে। তখন এই গম্ভীর, কাঠখোট্টা মানুষটাই পুত্রবধূ এবং নাতি— দুজনকে একা হাতে সামলে রেখেছেন। তাই সকলের কাছে রগচটা হলে সাবিহার কাছে তার শ্বশুর প্রকৃত পক্ষেই হীরা। শক্ত হলেও সলিড।
মাঝে মাঝে এমনও হতো, বাবুর কান্না থামাতে না পেরে সাবিহা নিজেও হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে শুরু করেছে। সেই মাঝ রাতেই হীরা দৌঁড়ে আসতেন। অস্থির হয়ে বলতেন, “কী ব্যাপার বৌমা! তুমি কাঁদছো কেন?”
সাবিহা অধৈর্য হয়ে বলত, “আমি আর বাচ্চাকাচ্চা পালতে পারছি না বাবা! কোনোদিন যেন বেরিয়ে যাবো! দুই চোখ যেদিকে যায় সেদিকে চলে যাব। ও এত কান্নাকাটি করে কেন? আমার অসহ্য লাগছে!” রাগ মেটাতে ব্যর্থ হয়ে সে নিজেই ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলত।
হীরা চৌধুরী পটু না হলেও আনাড়ি নন। এক ছেলে মানুষ করেছেন। ছেলেমানুষ ভেবে তাকে সরিয়ে দিতে চাইলেও রফিকের জন্মের পর নিজে থেকেই ওর কাছে কাছে থেকেছেন। দুনিয়ার নিয়মে আলাদা করে মা হওয়ার চেষ্টা করতে হয় না। কিন্তু বাবা হওয়ার চেষ্টা করতে হয়। অথচ ছেলে মানুষ আবার বাচ্চাকাচ্চার কী বোঝে— বলে সমাজ পুরুষদের সাথে সেই জন্ম থেকেই সন্তানের সম্পর্ক ঢিল করে দেয়। কন্যার সাথে সময় পরিক্রমায় সে সুতো কিছুটা জোড়া লাগলেও জড়তার কারণে পুত্রের সাথে সম্পর্কটা হয় প্রতিবেশীর মতো। পাশাপাশি বাস, অথচ যোজন যোজন দূরত্ব।
হীরা চৌধুরীর সাথে রফিকের সম্পর্ক তেমন নয়। বরং কৈশোরের অবাধ কৌতূহল এবং তারুণ্যের বেপরোয়া সময়ে বাবাই ছিল তার নিকটতম বন্ধু। সেই হীরা চৌধুরী একইভাবে নাতিকেও আগলে রাখেন। সাবিহার প্রতি ভালোবাসাটা প্রকাশ করতে একটু অস্বস্তি বোধ করেন ভদ্রলোক। জীবনের বায়ান্ন বছর কন্যাসম কারো সংস্পর্শে না থাকার ফলও হতে পারে।
এ সবকিছুই সাবিহা টের পায়। কোনোকিছু নিয়েই তার জবরদস্তি নেই। শ্বশুর যেভাবে ভালোবাসেন সেভাবেই সে দুহাত বাড়িয়ে দেয়। সে চায় তার ছেলেটা বাপের মতো উড়নচণ্ডী না হয়ে দাদার মতো হোক। তাতে একটু রগচটা হলেও ক্ষতি নেই।
তাই ছেলেকে বেশিরভাগ সময় শ্বশুরের কাছেই রেখে দেয়। রফিক এ নিয়ে খুব হম্বিতম্বি করল।
“ছেলে আমাকে চিনছে না কেন সাবিহা? হাত বাড়ালেই গলা ফাটিয়ে কাঁদছে! ও কি আমাকে ছেলে ধরা ভাবছে নাকি?”
রফিকের অস্থির ভঙ্গির প্রতি বিন্দুমাত্র নজর দিলো না সাবিহা। আয়েশ করে হাড়ি পরিষ্কার করতে থাকল। পাঁচবারের জায়গায় দশ বার ঘষা দিলো। তবুও তার ধোয়া শেষ হয় না।
রফিক বলল, “কথা বলছ না কেন?”
“কী বলব? অচেনা মানুষের সাথে বাচ্চারা আবার কেমন আচরণ করে? দুই তিন মাস পরপর বাড়িতে উঁকি দিবা আর তোমার ছেলে ‘ও আমার বাপধন’ বলে তোমার কোলে উঠে নাচবে— এই শখ করো কীভাবে?”
রফিক শুকনো মুখ বলল, “দুই তিন মাস কোথায়? এবার দেড় মাস পরে এলাম। কিন্তু সাকিন যে বছরে দুই বছরে একবার আসে, ওকে তো খুব মনে রেখেছে! কোল থেকে উঠতেই চায় না!”
সাবিহা বেসিনের কল ছাড়ল। একটু জোরে ছাড়লেই এক নিমিষে পরিষ্কার হয়ে যায়। তা না করে গতি একেবারে কমিয়ে দিলো। তিরতির করে পানি পড়ছে। সেই পানিতে হাড়ি ধুতে ধুতে বলল, “এগুলো হলো টান, বুঝেছ? তুমি ছেলের মনে সেই টান তৈরি করতে পারনি। আমার ভাইয়া পেরেছে।”
“কিন্তু আমার তো অন্য সন্দেহ হয়।”
“কী সন্দেহ?” সাবিহা ভুরু কুচকে তাকালো।
“তুমি নিশ্চয়ই ওকে আমার ছবি দেখিয়ে বলো— এটা একটা রাক্ষস, ছেলে ধরা। কোলে নিলেই মারবে। আমি নিশ্চিত এসব বলো! নাহলে দুইদিন ধরে আছি, বান্দা আমাকে দেখলেই সাইরেন বাজানো শুরু করবে কেন!” রফিকের কণ্ঠে একইসাথে বিস্ময়, বিরক্তি এবং অস্থিরতা।
সাবিহা উদাস কণ্ঠে বলল, “সন্দেহ তো আমারও হয়।”
“তোমার আবার কী সন্দেহ হয়?”
“বন্দরে বন্দরে একটা করে বউ রেখে দিয়েছ। সেজন্যই বাড়ির প্রতি কোনো টান নেই।” কল বন্ধ করে রান্নাঘরের বাতি বন্ধ করে সাবিহা হেলেদুলে ঘরে চলে গেল। অন্ধকারের ভেতর রেখে গেলো তাজ্জব রফিককে।
হীরা চৌধুরীর ঘরে বিশাল আসর বসেছে। আসর জমিয়ে রেখেছে রিফাত। একবার দাদার কোলে উঠছে। সেখানে বসে মামাকে দেখেই তার মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে মামার কোলে না গেলে সে বাঁচবে না। কাজেই ঝাঁপিয়ে মামার কাছে চলে যাচ্ছে। সেখানে যেয়ে দাদাকে একা বসে থাকতে দেখেও তার কষ্ট হচ্ছে। সে কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আবার দাদার দিকে উড়াল দিচ্ছে। এভাবেই তার বিগত এক ঘণ্টা কেটেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে হীরা এবং সাকিন রিফাতকে দিয়ে বালিশ বদল খেলছে।
রফিক বাবার পাশে বসে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “বাবা, রিফাত আমার কাছে আসে না কেন?”
হীরা চৌধুরী তার চেয়েও অধিক গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “তুমি ওর কাছে আসো?”
রফিক থতমত খেয়ে গেলো। সে একটা সিরিয়াস ঝগড়া করবে বলে মোটামুটি প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল। কিন্তু সিলেবাসের বাইরের প্রশ্ন করে হীরা তাকে আটকে দিয়েছেন। শিক্ষক মানুষের কাজই এই। কাউকে শায়েস্তা করতে চাও? দিয়ে দাও সিলেবাসের বাইরের প্রশ্ন!
রফিক বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল, “কাজ কাম করার জন্য মানুষ বিদেশেও থাকে, তাই বলে তাদের ছেলেমেয়ে এমন করে?”
“জানি না, আমি কোনোদিন থাকিনি। আমার ছেলের সাথে সম্পর্ক যথেষ্ট ভালো রেখেছি।” রিফাতের মুখে লেগে থাকা বিস্কুটের গুঁড়ো মুছে দিলেন তিনি।
রফিক ফোঁস করে দম ছাড়ল। বাবার সাথে তর্ক করা তার কম্ম নয়। ওটা সাবিহা ভালো পারে। কারণ তখন বাবা আগেই দু’হাত তুলে সারেন্ডারের ভঙ্গিতে বসে থাকেন।
সে এবার সাকিনের দিকে নজর দিলো, “কী ব্যাপার সাকিন মিয়া! তোমার খবর কী? শুনলাম তুমিও মাষ্টার হয়ে গিয়েছ!”
“সবাই তো আর উড়নচণ্ডী না!” আস্তে করে বললেও হীরা চৌধুরীর কণ্ঠ সবাইই শুনতে পেলো। সাবিহা সে সময় চা নিয়ে ঘরে ঢুকল। তার মেজাজ চূড়ান্ত খারাপ। আজকে সে একটা রানী গোলাপি রঙের শাড়ি পরেছে। সিমি বলেছে এই শাড়িতে তাকে রানির মতোই লাগছে। কিন্তু যার জন্য পরেছে তার তো সাবিহার দিকে তাকানোর সময় নেই। তিনি ব্যস্ত ছেলের সাইরেন বাজানো নিয়ে। চোখ দুটো আসামানে তুলে হেঁটে নজরের হেফাজত করছেন! ওকে একটা কঠিন থার্ড ডিগ্রি দেয়ার শপথ নিলো সাবিহা। এক যুগ পরপর বাড়ি আসবে এসব নাটক দেখানোর জন্য! সাবিহাও তাহলে সিনেমা দেখিয়ে ছাড়বে। থ্রিলার সিনেমা!
সাকিন হেসে বলল, “জি ভাই। কপালে ছিল।”
“বাড়িটা তো মাষ্টারে ভরে গেলো। নিচের তলার ভদ্রলোকও শুনলাম কলেজের টিচার। বাড়ি আর বাড়ি থাকলো না, স্কুল-কলেজ হয়ে গেলো।” আয়েশ করে চায় চুমুক দিল রফিক। “তা বিয়ে-শাদী করছ কবে? চাকরি হয়েছে এবার তো করবে নাকি!”
সাকিন ছোট্ট করে চায় চুমুক দিয়ে বলল, “ভাগ্যে থাকলে হবে। এত তাড়াহুড়ো কীসের!”
“নাকি পছন্দ আছে? থাকলে বলে দাও। আমরা কি আর ভিলেন হব নাকি!”
সাবিহা বিরক্ত হয়ে বলল, “ভাইয়ার বিয়ে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না! তুমি নিজের বিয়ে নিয়ে ভাবো!”
রফিক চা গিলতে যেয়ে কেশে ফেলল। কোনোরকমে বলল, “আবার একটা করতে বলছ নাকি!” সাবিহা কটমট করে তার দিকে তাকালো। যেন চোখ দিয়েই পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।
চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “শুনুন বাবা! চার মাসে একবার বাড়ি আসে, এমন লোকের সাথে আমি সংসার করতে পারব না। একদিন তো দেখা যাবে সে এসেছে ঠিকই, আমি চিনতে পারছি না। মরে পড়ে থাকলেও আমাকে কেউ দেখতে আসবে না!”
ঘরের তিন পুরুষই সাবিহার শেষ কথায় বিরক্ত হলো। কিন্তু ওকে ধমক দেবে এ সাধ্য কার! উল্টো ধমক খেয়ে স্পিকটি নট হয়ে যেতে হবে।
হীরা বললেন, “এমন ছেলে আমিও রাখব না! অবসর নিয়েছি আরাম করার জন্য। আর ইনি নিজে উড়াল দিয়ে সংসারের সব কাজ আমাকে দিয়ে করাচ্ছে। ফাঁকিবাজি যে কোন পর্যায়ের করছে এটা চিন্তা করেই আমি হতভম্ব!”
রফিক দিশেহারা হয়ে বলল, “তাহলে কী করব আমি? কাজ-টাজ ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে থাকব?”
“কেন বাড়ি থেকে মানুষ কাজ করে না?” সাবিহা বলল।
“ওইরকম কাজ করতে পারলে করবি, নাহলে আর বাড়ি এসে ডিউটি করার দরকার নেই। যেখানে থাকিস সেখানেই থাকবি।”
এই তর্কে-বিতর্কেই সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলো।
ঘুমানোর ভান করে রফিক সাবিহার অপেক্ষায় ছিল। যেই সাবিহা লাইট বন্ধ করে বিছানায় এসেছে, ওমনি তাকে খপ করে ধরে ফেলতেই সে চিৎকার করতে গেলো। তার মুখটাও চেপে ধরল রফিক। বাঁকা কণ্ঠে বলল, “কে যেন সংসার করবে না!”
তার হাতে জোরে কামড় দিয়ে সাবিহা জোর দিয়ে বলল, “করবোই তো না! দম আটকে আবার মেরে ফেলতে চায়!”
“সংসার করবে না, না? দেখাচ্ছি কীভাবে করাতে হয়!”
“আমিও দেখাচ্ছি কীভাবে না করতে হয়!”
*****
টানা দু’দিন নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে একাধারে কাজ করল ফাবিহা। এবং তিন দিনের দিন চল্লিশটা ডায়েরি যখন বানানো শেষ হলো—তখন তার দু’চোখ গর্তে ঢুকে গেছে। চোখের উঠোনে নির্ঘুম রাত্রিরা জড়ো হয়ে সুখ-দুঃখের আলাপ করছে। গালের দিকে দু-চারটে ব্রণও উঁকি দিতে শুরু করেছে। কিন্তু তার দৃষ্টি স্বচ্ছ। চকচকে চোখে সে ডায়েরিগুলো দেখছে।
সিমি ঢুলতে ঢুলতে পঞ্চমবারের মতো হাই তুললো। ঘুম ঘুম কণ্ঠে বলল, “চল্লিশটা হয়েছে ছোট আপা? এবার আমি ঘুমাই?”
ধমক দিলো ফাবিহা, “ঘুম ঘুম করছিস কেন! সারারাতই তো ঘুমিয়েছিস। এগুলো এখন প্যাকিং করতে হবে। নে একেকটা পলিতে ভর। আমি কার্টন নিয়ে আসছি।”
সিমি কিছু বলতে পারল না। মুখ লটকে কাজ করতে থাকল। গতকাল রাত্তির একটা পর্যন্ত এসব করেছে সে। তারপর আবার পাঁচটার সময় ছোট আপা তাকে টেনে তুলেছে। শুধুমাত্র একটু ভালোবাসে দেখে কিছু বলতে পারেনি সিমি। কিন্তু দিন তারও আসবে। সেও ছোট আপাকে একদিন ভোর সক্কালে ঘুম থেকে টেনে উঠিয়ে ঠিক তার মতো করেই বলবে, “নামাজ বাদ দিয়ে ঘুম কীসের ছোট আপা? উঠবেন নাকি মুখে পানি ঢালব?”
এর মাঝে ফাবিহা বুদ্ধি করে একটা কাজ করে ফেলেছে। ফেইসবুকে আর টিকটকে ‘খেরোখাতা’ নামে আইডি খুলেছে। টিকটক প্ল্যাটফর্মটা যদিও তার তেমন একটা পছন্দ নয়, কিন্তু ওখানে অল্প পরিশ্রমে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায় বলে অপছন্দটা আপাতত একপাশে সরিয়ে রেখেছে। শুরুতে গুগল থেকে পাওয়া সুন্দর কিছু হাতে বানানো ডায়েরির ছবি দিয়ে ভিডিও দিয়েছে। ফলোয়ার যেহেতু নেই কাজেই রেসপন্সও আশা করে না সে। কিন্তু ভিডিও জিনিসটাই এমন যে ফলো না করলেও তার কাছে পৌঁছে যাবে। ফলে ইতোমধ্যেই টিকটকের তিনটে ভিডিওতে মোট মিলিয়ে পাঁচ হাজার ভিউ হয়ে গেছে। সে তুলনায় ফেইসবুকে কম। তিনটে মিলিয়ে টেনেটুনে দু হাজার।
এরপরই প্রচারের আসল কাজটা শুরু করেছে ফাবিহা। বাড়ির আঙিনায় নিজে বানানো ডায়েরিগুলো নিয়ে ঘাসের উপর রেখে বেশ সুন্দর কিছু ফটোগ্রাফি করেছে। সেগুলো দিয়ে ভিডিও পোস্ট করার পর ভিউ বেড়েছে দ্বিগুণ। টিকটকে আট হাজার আর ফেইসবুকে তিন। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাতাসের শো শো শব্দ আর পাখির কলকাকলি মিশিয়ে একটা সাউন্ড যোগ করার কারণে ভিডিওর আবহটাই বদলে গেছে। ফলোয়ার একটু একটু করে হচ্ছে। এতেই সে খুশি।
প্যাকিং যখন শেষ হলো তখন আটটা বেজে গেছে।
ফাবিহা না খেয়ে যাবার পাঁয়তারা করলেই ফরিদ ভাঙা কণ্ঠে বললেন, “মা রে! তুই নিজের যত্ন না নিলে আমার যত্ন কে নেবে?”
তারপর আর না খেয়ে বেরুনো যায় না। কিন্তু খাবারের ব্যবস্থাও খুবই দুর্বল। ভাত আর ডিম ভাজি। এমন শুকনো খাবার গিলতেই পারে না ফাবিহা। ডিমটা চার ভাগ করে একটা ভাগ নিজের জন্য রেখে বাকিটা উঠিয়ে রাখল সে। ভাতে অল্প একটু পানি ঢেলে ঝটপট খাওয়া শেষ করল। এই দৃশ্য দূর থেকে দেখে আর কাছে যাওয়ার সাহস করলেন না নূরজাহান।
কার্টনটা অসম্ভব ভারী হয়ে গেছে। বাবাকে বলার প্রশ্নই ওঠে না। ফারদিনকে বলার চাইতে নিজের পিঠে করে হলেও নিয়ে যাবে ফাবিহা। শেষমেশ সিমিকেই ডাকল। শুকনো মুখে বলল, “একটু ধরবি শুধু!”
সিমি প্রকৃতই ভয় পেলো। এত ভারী জিনিস নিয়ে গেলে তার হাড়-হাড্ডি আর জায়গা মতো থাকবে কি না সন্দেহ। তবুও দুরু দুরু বুকে বলল, “চলেন।”
কিন্তু দুকদম হেঁটে ফাবিহা নিজেই আর ভার বহন করতে পারল না। সিমির মুখ লাল হয়ে গেছে। দ্রুত ওটা উঠানে রেখে হাঁফ ছাড়ল ফাবিহা। শ্বাস টেনে বলল, “রিকশা বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসি। তোর আসা লাগবে না।”
ফরিদ মেয়ের সাথে রিকশা খুঁজতে যেয়ে নিজেই হারিয়ে গেলেন। মোড় পেরিয়ে কোথায় যে চলে গেলেন ফাবিহা ঠিক পেলো না। এরই মাঝে একটা রিকশা পেয়ে গেলে হাত উঁচিয়ে ডাকল সে, “মামা! মামা! এদিকে আসেন!”
অথচ রিকশাওয়ালার এদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি মনের সুখে মোড় পেরিয়ে চলে যাচ্ছেন। চেষ্টা করেও এর চেয়ে বেশি উঁচু কণ্ঠে ডাকতে পারল না ফাবিহা। হতাশ হয়ে তাকিয়ে ছিল, এমন সময় পেছন থেকে একটা ভারী কণ্ঠ হাঁক ছাড়ল, “মামা! এই যে! এদিকে!”
চমকে পেছনে তাকালো ফাবিহা। লোকটাকে চেনে না। তবে বাড়ির ভেতর থেকে যেহেতু এসেছে সাবিহার বরই হবে। সিমি তো বলল তিনি নাকি এসেছেন। বাবার সাথে দেখা হলেও তার সাথে আলাপ হয়নি। সে হড়বড় করে বলল, “আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।”
সাকিন এক পলক তাকিয়ে সালাম নিয়ে ভেতরে চলে গেলো।
রিকশা বাড়ির ভেতরে ঢুকিয়েছে, তখন সাবিহাও রিফাতকে নিয়ে নিচে নেমেছে। তাকে দেখে বলল, “এই ফাবিহা! তোমার ভাইয়ার সাথে দেখা হয়েছে? এই যে রিফাতের আব্বু!” বলে পাশে যে লোকটাকে ইশারা করল তিনি একটু আগের সেই লোকটা না। ফাবিহা বুঝল তারই বুঝতে ভুল হয়েছে। ওটা বোধহয় সাবিহার ভাই। সে রিফাতের বাবাকেও সালাম দিল।
সাবিহা বলল, “এগুলো কী গো?”
“ডায়েরি আপু।”
“এতগুলো!”
“সিনিয়র আপুরা অর্ডার দিয়েছিলেন।”
“তুমি অর্ডার নাও নাকি! আমাকে একটা দিও তো! থানায় ডায়েরি করতে না পারি, ঘরেই করব।” রফিকের দিকে তাকিয়ে বাঁকা কণ্ঠে বলল সাবিহা।
ফাবিহা সায় জানিয়ে চলে গেলো।
রফিক বলল, “সব এত মিল মিল কেন? উপরে স্কুলের মাষ্টার, নিচে কলেজের মাষ্টার। উপরে সাবিহা, নিচে ফাবিহা। কী গোলমাল!”
সাবিহা এগিয়ে যেতে যেতে বলল, “তোমার কীসের গোলমাল? বাড়ি থাকো না একমাস, আবার গোলমাল দেখাতে এসেছে!”
রফিক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্ত্রীর পিছু নিলো। বাড়িতে এলেই তাকে সকালে হাঁটতে বেরুতে হবে। অবশ্যম্ভাবীভাবে সাথে নিতে হবে সাবিহাকে। কিন্তু সে মোটেই হাঁটাহাঁটি করতে চায় না। বাড়িতেই তাকে দৌড়ের উপর থাকতে হয়, তাই আলাদা করে আর হাঁটাহাঁটির শখ তার জাগে না। কিন্তু রফিকের যন্ত্রণায় টেকা মুশকিল! ফলে তাকে হাঁটতে যেতেই হলো।
ফরিদ ফিরে এসে সিমির কাছে শুনলেন রিকশা পেয়ে ফাবিহা চলে গেছে। উঠানে হাঁটাহাঁটির সময় ছেলেটার সাথে দ্বিতীয়বারের মতো দেখা হলো। সাবিহার ভাই, নামটা মনে পড়ছে না।
এগিয়ে যেয়ে বললেন, “কেমন আছো বাবা?”
সাকিন বলল, “আলহামদুলিল্লাহ্, ভালো আছি চাচা। আপনি কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ্ আলহামদুলিল্লাহ্! ভালো আছি। বাবা, তোমার নামটা যেন কী?”
“সাকিন।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ! মনে পড়েছে! কলেজে যাচ্ছ তো বাবা?” ফরিদ চকচকে চোখে তাকিয়ে আছেন। ভদ্রলোকের মুখের ভাষা খুব স্পষ্ট। যে কেউ বুঝে ফেলতে পারবে। সাকিনেরও কষ্ট হলো না।
সে শুনেছে, ফরিদের বড় ছেলেটা নাকি পড়াশোনা করে না। ফাইনাল ইয়ারে এসে ছেড়ে দিয়েছে। সিমির ভাষ্য অনুযায়ী সারাদিন মহিষের মতো ঘুমায়। নেশাপানি যে করে তার কোনো প্রমাণ নেই। চেহারা-সুরতও ভাঙেনি। ছেলের ব্যর্থতা বুকে নিয়ে চোখের সামনে তার বয়সী আরেকজনকে প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় দেখলে বাবা মাত্রই বুকে আফসোস জন্মাবে। ফরিদও তার ব্যতিক্রম নন। তবে অধিকাংশ মানুষ অন্যের সফলতায় হিংসা করে। কিন্তু ভদ্রলোকের চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি ভীষণ খুশি হয়েছেন।
“যাচ্ছি চাচা।”
“আজকে যাবা না?”
“প্রথম পিরিয়ডে ক্লাস নেই। একটু দেরিতে যাবো।”
“কেমন লাগছে বলো তো? আমার তো বেসরকারি কলেজ। সরকারির মতো না। ওখানে নিশ্চয়ই রকম-ধরন আলাদা?”
ফরিদের সরল চোখ জোড়ার দিকে তাকিয়ে সাকিনের মায়া লাগল। সে বলল, “আসুন চাচা, পেছনে বসি।”
আঙিনায় যেয়ে সাকিন বলল, “বেসরকারি হলেও আপনাদের কলেজ অনেক পুরোনো। এখন আশেপাশে অনেক কলেজ হয়েছে বলে ছাত্র কমছে। তাই বলে অভিজ্ঞ শিক্ষকের দাম কমবে কেন?”
ফরিদ মলিন হাসলেন। ছেলেটার চোখ-মুখ কী সুন্দর! তার ফারদিনের চোখ-মুখ তো আরও সুন্দর। ফারদিনের কথা মনে হতেই বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
“দামের কথা বললে তো বাবা কত কথাই উঠে আসে! দাম আর অভিজ্ঞতা দিয়ে হয় না গো! হলে আমার কোচিংটা বন্ধ হতো না।” শ্বাস ছাড়লেন তিনি। “যুগ বদলেছে। ছেলেমেয়েরা কী পছন্দ করে তেমন বুঝি-টুঝি না! এরচেয়ে বন্ধ হয়েছে, ভালোই হয়েছে।”
সাকিন কোনো উত্তর দিতে পারল না।
তার হাতের বইয়ের দিকে তাকিয়ে ফরিদ বললেন, “বই-টই পড় নাকি বাবা?”
“জি চাচা। মাঝে মাঝে পড়ি।”
“খুব ভালো! খুব ভালো! তা এই বাড়িতে এসে প্রবন্ধ ছাড়া অন্য কিছু পড়তে পারো তো? শেষটুকু নিচু কণ্ঠে বললেন।
সাকিন হেসে ফেলল।
“লুকিয়ে পড়ি।”
ফরিদ আমতা আমতা করে বললেন, “ফেসবুকে লেখা-টেখা পড় নাকি?”
“আইডি অনেকদিন ধরে ডিঅ্যাকটিভ। বইয়ের বাইরে তেমন কিছু পড়া হয় না।”
ফরিদের উৎসাহ একটু নিভে এলো। শুকনো কণ্ঠে তিনি বললেন, “ওহ! আমি ফেসবুকে ঐ টুকটাক লিখি আর কি!” তার কথার ভাঁজে লজ্জা। যেন ওখানে লেখা বড় ধরনের কোনো পাপ।
সাকিন অবাক হলো, “তাই নাকি! কী লেখেন চাচা?”
ছেলেটার উৎসাহে ফরিদ সাহস পেলেন, “এই গল্প উপন্যাস আর কি! তোমার চাচাকে বলেছিলাম। তা প্রবন্ধ চৌধুরী যে ধমকটাই দিলেন!”
সাকিন আবার হাসল।
“উনি প্রবন্ধ চৌধুরী হলে আপনি তো চাচা উপন্যাস আহমেদ।”
ফরিদ অবাক হয়ে বললেন, “নামটা কিন্তু ভালো শোনা যাচ্ছে।”
“ফেইসবুক ছাড়া আপনার লেখা পড়ার উপায় নেই?”
“আমার ডায়েরিতে অবশ্য লেখা আছে।”
“তাহলে একদিন দিয়েন চাচা।” নিচু কণ্ঠে বলল, “আমার প্রবন্ধের চেয়ে উপন্যাসই বেশি পছন্দ!” ফরিদ আহমেদ যারপরনাই আনন্দিত হলেন।
আমুদে কণ্ঠে বললেন, “এখনই আনছি দাঁড়াও!” প্রায় ছুটে যেয়ে নিজের ডায়েরিটা নিয়ে এলেন তিনি। তৃপ্ত ভঙ্গিতে সাকিনের হাতে তুলে দিলেন।
*****
সব হিসাব-কিতাবের পর ফাবিহা দেখল তার লাভ থাকছে সাড়ে পাঁচ হাজারের কিছু বেশি। প্রথমবার হিসেবে মোটেই কম নয়। কিন্তু হাড়ভাঙা খাটুনির পর টাকাটা বড় অল্প মনে হলো।
সাথে সাথেই মনকে শাসালো সে। ছয় হাজারের কাছাকাছি এই টাকাটা দিয়ে আজই বাজার করে ভালো-মন্দ কিছু খাবে। থার্ড ইয়ারে ওঠার পর কিছু ফিস জমা হয়েছে, সেগুলো দেবে। তারপর বাকিটা দিয়ে বাবা-আম্মুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। কম বলে সে আফসোস করছে, না থাকলে কেমন হতো? প্রশ্নটা করে নিজেকে ধিক্কার জানালো ফাবিহা।
সফলভাবে এখানে ডায়েরি দেয়ার ফলে সবচেয়ে লাভ যেটা হলো, পুরো হলের অধিকাংশ মেয়েরা তার ডায়েরি সম্পর্কে অবগত হলো। সিনিয়রদের পোস্টে তার পেইজের মেনশন থেকে কিছু ফলোয়ারও বাড়ল। বারবার শুকরিয়া আদায় করল ফাবিহা। এভাবেই হবে। একদিন সব হবে। বিশ্বাসটা তাকে ভেতর থেকে শক্তি জোগালো।
বিকেলের ক্লাসটা করেই বাজার করল সে। মনে মনে ভাবল আজ রাতে কী খাবে। রোস্ট করবে, সাথে পোলাও। সিমির জন্য দুটো জিলাপি নিয়ে নিলো। আর আম্মুর জন্য একটা কচি লাউ। বাবা গত সপ্তাহে বুটের ডাল খেতে চেয়েছিল ভেবে সেটাও কিনে ফেলল।
সব বাজার করে রিকশায় ওঠার আগে সে আবার ঘুরে গেলো। কিনবে না কিনবে না করেও হাজারবার বকাবকি করে এক বাটি দই নিলো। বকাটা সে কাকে দিলো বোঝা গেলো না। দই পছন্দকারী ফারদিনকে নাকি দই ক্রয়কারী নিজেকে?
কিন্তু ফাবিহা জানত না তার জন্য কুন্দকলিতে কী অপেক্ষা করছে।
রিকশা বাড়ির কাছাকাছি এলেই দেখতে পেলো ফরিদ কিছু লোকের সাথে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। চোখ কুচকে তাকিয়ে তাদের চেনার চেষ্টা করল। যা দেখল তাতে তার বুক কেঁপে উঠল। যে পাঁচজন পাওনাদার জোট বেঁধে এসেছে তাদের একটা টাকাও গত একমাসে দেয়া হয়নি। ফাবিহার ফুরফুরে ভাবটা মুহূর্তেই উবে গেল। সে বুঝতে পারছিল একটা ভয়ও তাকে ঠান্ডা সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরছে। ও পাড়ায় তো মান সম্মানের আর কিছু অবশিষ্ট ছিল না। এখানে এমন হাঙ্গামা হলে কি বাড়িওয়ালা ওদের থাকতে দেবে? নাকি এখান থেকেও বিদায় নিতে হবে?
নানা আশঙ্কার চিন্তা করতে করতে সে যখন নামলো তখনই লোকগুলো তাকে মাছির মতো জেঁকে ধরল।
ফরিদ অস্থির কণ্ঠে বললেন, “মেয়েকে যেতে দিন ভাই! মেয়েকে যেতে দিন!” কেউ তার কথা শুনল না।
একেকজন চারপাশ থেকে তীক্ষ্ণ বাণ ছুড়তে থাকলো।
“এই যে এসেছেন মহারানী! আপনি নাকি কোথায় নাটক সিনেমা করছেন? তা আমাদের টাকাগুলো কই?” ফাবিহা বেশ বুঝতে পারল ওরা যে ভয়েস ওভারের কথা বলছে।
সে বলল, “সবার টাকাই দেয়া হবে। একসাথে এতজনের টাকা দেয়া তো আমাদের পক্ষে সম্ভব না। আস্তে আস্তে সবাইকেই দিয়ে দেব।”
একজন বাঁকা কণ্ঠে বলল, “নেয়ার সময় তো একসাথেই নিছিলা! দেয়ার বেলায় একসাথে পারবা না কেন?”
ফাবিহা বারবার পেছনে, বাড়ির ভেতর তাকাচ্ছিল। খুব করে চাচ্ছিল বাড়িওয়ালা শ্রেণির কেউ যেন এই গ্যাঞ্জাম না দেখে।
ফরিদ বললেন, “আপনারা দয়া করে শান্ত হন ভাই! কারো টাকা মারার নিয়ত থাকলে আমরা কি আর এই এলাকায় থাকতাম? কবেই তো চলে যেতাম!”
“এলাকা তো বদল করে ফেলছেন! কবে চম্পট দিবেন কে জানে!”
ফাবিহার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সে শক্ত কণ্ঠে বলল, “বললাম তো আপনাদের সবার টাকা দিয়ে দিব! এভাবে চিৎকার করছেন কেন!”
একজন পেছন থেকে সামনে এসে বলল, “গলা উঁচু করলে একদম জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলব নির্লজ্জ, মিথ্যাবাদী! তোমাদের অবস্থা খুব করুন না? এইজন্যে ড্যাং ড্যাং করে মুরগি নিয়ে আসছ! আর কী আছে দেখি! উরি বাবা! পোলাওয়ের চাল দেখা যায়! দইও আছে, দেখেন! ভোজন করছে রাজা-বাদশার মতো আর টাকা চাইলেই ফকিরিগিরি দেখায়!” সকলের মাঝেই একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। পারলে তারা ফাবিহার হাতের ব্যাগ টেনে ছিঁড়ে ফেলে। ফাবিহা শক্ত করে ব্যাগটা ধরে রাখল।
একজন চিৎকার করে বলল, “কোনদিক দিয়ে টাকা আসছে আমরা জানি না নাকি? ছেলে নেশাখোর, বাপের কলেজে বেতন নাই। সংসার যে কীভাবে চলছে এইটা দুনিয়ার সবাই জানে। তা ফরিদ ভাই, মেয়ে দিয়ে যে ব্যবসা করেন, এইটা কলেজের ছেলেপেলে জানে তো?”
ফাবিহার মনে হলো তার গায়ে হাজারটা বর্শা গেঁথে দিয়েছে কেউ। তার আঘাতে সমগ্র শরীর রক্তাক্ত হয়ে গেছে!
মুখ উঠিয়ে কিছু বলতে যাবে, জটলার পেছনে সাবিহার ভাইকে দেখে তার চেহারার রক্ত সরে গেলো। সে চোখ-মুখ কুচকে এদিকেই আসছে।
যোগ্য জবাব দেয়ার কথা ভুলে যেয়ে ফাবিহা অনুরোধ করল, “আল্লাহর দোহাই লাগে আপনারা এমন করবেন না! আমরা কোথায় যাব বলেন? টাকা দিয়ে হোক, না দিয়ে হোক, এই শহর ছাড়া আমাদের গতি নেই। দয়া করে আজকের মতো আসেন। খুব তাড়াতাড়িই আপনাদের টাকা দিয়ে দিব। অল্প হলেও দিব।”
“অল্প দিয়ে কী করব? লাখ লাখ টাকা নেয়ার সময় মনে থাকে না যে দিতে পারব না? যত্তোসব ফকিরের দল! মেয়ে রাস্তায় নামায়ে সাধু সাজতে আসে!”
কথাগুলো স্পষ্ট শুনল সাকিন। গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “কী সমস্যা?”
ফরিদ ফ্যাকাশে চেহারায় সাকিনের দিকে তাকালেন। ওদের কথা যদি ছেলেটা বিশ্বাস করে ফেলে! তিনি সাকিনের হাত ধরে বললেন, “আমার কাছে আসছে বাবা। তেমন কিছু না! তুমি যাও, ভেতরে যাও!”
সাকিন লোকগুলোর দিকে এক পলক দেখে কেবল বলল, “ভদ্রলোকের বাড়ির সামনে ভদ্রলোকের মতো আচরণ করবেন।”
সে ভেতরে চলে যেতেই একজন উচ্চকণ্ঠে বলল, “ভদ্রলোক কে? ফরিদ কোনোদিন ভদ্রলোক না! লাখ লাখ টাকা সুদের ঋণ! মেয়ে দিয়ে ব্যবসা করে সেই ঋণ যে শোধ দেয় তারে ভদ্রলোক বলে না!”
ফাবিহার ইচ্ছে হচ্ছিল মাটির ভেতরে ঢুকে যেতে। হুট করে সেই মহিলার কথাটা মনে পড়ল, “রাস্তায় নামিয়ে ইজ্জত দেখিয়ে ছাড়ব!” অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল!
লোকগুলো আল্টিমেটাম দিয়ে বিদায় নিলো। কিন্তু ফেলে রেখে গেলো ঝড় পরবর্তী নীরবতা। ফাবিহা বুঝতে পারছে না ঘটনা দোতলা অবধি পৌঁছেছে কি না। কেউ এখনও কিছু বলতে আসেনি। কিন্তু একজন যেহেতু জেনেছে, সবার জানতে আর সময় লাগবে না। তারপর কী হবে? ভাবনাটা মাথায় আসতেই পুরো মাথা ফাঁকা হয়ে গেলো। মুরগি, পোলাওয়ের চাল, জিলাপি, দই সব পড়ে রইলো অবহেলায়।
তখন রাতের অন্ধকার চারপাশে রাজ করছে। ফাবিহা চুপ করে নিজে ঘরে বসে ছিল। নূরজাহান মেয়ের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, “বাজার যে করলি, খাওয়া লাগবে না?”
বিছানায় মাথা এলিয়ে মেঝেতে বসে ছিল ফাবিহা। হাতে মুখ ঢেকে বলল, “খাবো না।”
নূরজাহানের মেজাজ চটে গেলো। আজ ছেলেকে বোঝাতে গেছিলেন। না পড়লি, একটা কাজ অন্তত কর! কিন্তু ওর কথা-বার্তা শুনে খুব কষ্টে হাতটা সংযত করে বেরিয়ে এসেছেন। বিকেলের ওই ঘটনার পর ফরিদ, ফাবিহা দুজনেই মূর্তির মতো বসে আছে। জীবন কি এভাবে চলবে? না খেয়ে বসে থাকলে কার কিস্তি মাফ হবে?
ক্রোধান্বিত কণ্ঠে তিনি বললেন, “একদম নাটক করবি না! ওগুলো কিনে এনেছিস কি সং সাজানোর জন্য!”
বহুদিন পর ফাবিহাও উল্টো ক্ষেপে গেলো। ধমক দিয়ে বলে উঠল, “হ্যাঁ সং সাজানোর জন্যই কিনেছি! যাও সং সাজাও। না পারলে ফেলে দাও!”
নূরজাহান মেয়ের এহেন ব্যবহারে দৃশ্যত কেঁপে উঠলেন। ফাবিহা বলেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। নূরজাহান খানিকক্ষণ স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে থেকে শরীরটা টেনে-হিচঁড়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন। সে ঘরটাও ফাঁকা। ফরিদ এই রাতে বাড়ির আঙিনায় যেয়ে বসে আছে।
মিনিট গড়াতেই ফাবিহা টের পেলো সে কী করেছে। কষে নিজেকে একটা চড় দিয়ে তৎক্ষণাৎ মায়ের কাছে ছুটল। নূরজাহান বিছানায় পা ঝুলিয়ে জানালার অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছেন। জানালার পাল্লা আটকালেই কি তার জীবনে অন্ধকারের আক্রমণ বন্ধ হবে?
ফাবিহা ছুটে এসে মায়ের পায়ের কাছে বসে পড়ল। দু’পা জড়িয়ে ধরে মুখ গুঁজে ডাকল, “আম্মু!”
নূরজাহান উত্তর নিলেন না।
ফাবিহা রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, “সরি আম্মু!”
বহুদিন মেয়ের এমন কণ্ঠ শোনেননি নূরজাহান। মুখটা ওঠাতে গেলেও পারলেন না। জোঁকের মতো পা এঁটে আছে। অসহায় ভঙ্গিতে ফাবিহার মাথায় হাত রাখতেই তার ভেতরে জমিয়ে রাখা জলোচ্ছ্বাস বুকের জমিনে আছড়ে পড়ল। হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল সে। কানে অনবরত বাজতে থাকল, “কোনদিক দিয়ে টাকা আসছে আমরা জানি না নাকি!
মেয়ে দিয়ে যে ব্যবসা করেন, এইটা কলেজের ছেলেপেলে জানে তো?
মেয়ে দিয়ে ব্যবসা করে সেই ঋণ যে শোধ দেয় তারে ভদ্রলোক বলে না!
রাস্তায় নামিয়ে ইজ্জত দেখিয়ে ছাড়ব!”
শক্ত করে কান চেপে ধরেও সেসব বিষবাক্য বন্ধ করতে পারল না ফাবিহা। বোকা ফাবিহা! কচ্ছপ খোলসের ভেতরে ঢুকলেই কি পৃথিবীতে রাত নামে!
ফরিদ বিমূঢ় হয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার পরিবারে এই মেয়েটাই সবচেয়ে শক্ত। খুব কঠোর হয়ে থাকে। হাসিটা সহজে এলেও কাঁদে খুব হিসেব করে। শেষ করে ওকে কাঁদতে দেখেছিলেন ফরিদ? মনে করতে পারলেন না। তার মনে হলো স্ট্রোকে প্যারালাইজড না হলেও মেয়ের এই বুক ভাঙা কান্না আর এক মুহূর্ত দেখলেই তিনি প্যারালাইজড হয়ে যাবেন। এক প্রকার পালিয়ে এলেন খাবার ঘরে। অথচ ফাবিহার কান্নার শব্দ এখান থেকেও শোনা যাচ্ছে।
নিঃসহায়ের মতো টেবিলে বসে পড়লেন। তার বাজারের হিসেবের নোটবুকটা পড়ে আছে। সন্তপর্নে ওটা টেনে নিলেন ফরিদ। বুকের ভাঙনের বাঁধ ছেড়ে দিয়ে লিখলেন,
“অপূর্ণতা পূর্ণভাবে ছেয়ে যায়
দূর্বলতা শক্তি বৃদ্ধি করে
দুঃখেরা হেসে-খেলে ঘুরে বেড়ায় মন উঠানে।
মরণ তখনও জীবিত হয়নি
অথচ জীবন সেখানে মৃত।”
লিখতে লিখতে ফরিদের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। মনে হলো বুকে কেউ এক মণের পাথর চাপা দিয়েছে। খুব কষ্টে নিঃশ্বাসটা চালু রাখলেন তিনি।
চলমান~
(২১ তম পর্বের রেকর্ড ব্রেক! #বনজোছনা-র সবচেয়ে বড় পর্ব এটা। দোয়া করে যান, যেন বাকিটাও এভাবে শেষ করতে পারি 🥹
আর হ্যাঁ! প্রিয় পাঠক! আগামীকাল কিন্তু #আবর্তন-এর #রিভিউ_প্রতিযোগিতা-র শেষ দিন! আপনি অংশ নিয়েছেন তো? নাকি পুরস্কারগুলো মিস করে ফেলছেন!)