#বনজোছনা
২৬.
হীরা চৌধুরীর মেজাজ দেখেই সাবিহা বুঝতে পারছে ওখানে কালবোশেখীর ঘন কালো মেঘ জমা হয়েছে। থেকে থেকে বিদুৎ চমকে উঠলেও এখনো মেঘের তর্জন-গর্জন শোনা যায়নি। কিন্তু যে কোনো সময় শুরু হবে। আগে-ভাগে প্রস্তুতি নিয়ে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। সাবিহা আস্তে করে রিফাতকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “ওকে একটু রাখুন তো বাবা!”
হীরা হাত বাড়িয়ে নাতিকে নিলেন বটে। তবে তার তিরিক্ষি মেজাজ শান্ত হলো না। ভদ্র-সভ্য পরিবার দেখে ভাড়া দিয়েছিলেন। দোষ-গুণ কিছু থাকতেই পারে। কিন্তু এদের তো পুরো জল ঘোলা। ছেলে ভ্যাগাবন্ড, মেয়ের নামে কুৎসা রটে আছে, বাপের ঘাড়ে সুদের দেনা— তামাশার এক শেষ! মড়ার উপর খাড়ার ঘায়ের মতো হাজির হয়েছে পাওনাদারেরা। তার বাড়ির সামনে এসে নাকি টাকা আদায়ের জন্য লোকজন হট্টগোল করছে। ছি ছি! কী লজ্জার ব্যাপার!
হীরা চৌধুরী হুংকার ছেড়ে ডাকলেন, “রফিক! ফরিদকে ডেকে নিয়ে আসো!”
তার হুংকারে রিফাত কেঁপে উঠেই কেঁদে দিলো। তিনি এক পলক নাতিকে দেখে সাবিহাকে ডাকলেন, “বৌমা! রিফাতকে একটু নিয়ে যাও।”
রফিক চাপা কন্ঠে সাবিহাকে বলল, “অসম্ভব! তোমার শ্বশুর এখন বাঘ হয়ে আছে। যেয়ে আমি নিজের প্রাণ হারাতে চাই না। তুমি যাও, বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। এখন কথা বলার কী দরকার? সকালে ডাকলেই তো হয়!”
সাবিহা ঠোঁট কামড়ে এক মুহূর্ত ভাবল। রফিকের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলল, “বাপের সামনে যেতে ভয় পাও, লজ্জা লাগে না!”
“না লাগে না! আপনি বাঁচলে বাপের নাম!” বলে রফিক শুট করে নিজের ঘরে চলে গেল।
সাবিহা রান্নাঘরে গেলো। বরফকুচি দিয়ে এক গ্লাস লেবুর শরবত বানিয়ে তারপর শ্বশুরের ঘরে গেলো।
গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “একটু চেখে দেখুন তো বাবা, লবণ ঠিক আছে কি না!”
বিনা বাক্য ব্যায় অর্ধেক গ্লাস খালি করে ফেললেন হীরা। সাবিহা আস্তে করে বলল, “পুরোটাই খান বাবা।”
গ্লাস ফিরিয়ে দিলেন হীরা।
“রফিক কই? ওকে বলো ফরিদকে ডেকে আনতে।”
সাবিহা বিছানার আরেক মাথায় বসল। নরম কন্ঠে বলল, “বাবা, কথা কালকে সকালে বললে হয় না?”
হীরার গলা তীক্ষ্ণ হয়ে এলো, “না! ওদের জবাব দিতে হবে, কেন আমাকে মিথ্যা বলে বাড়ি ভাড়া নিয়েছে!”
“কী মিথ্যা বলেছে?” সাবিহার কন্ঠ খুব নিচু। তার সামনে শ্বশুরের এমন মেজাজ দেখানোর ঘটনা বিরল। কাজেই খুব বুঝে-শুনে পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
“মিথ্যা শুধু বলাই যায় না! করাও যায়! ওরা মুখে বলেনি, কাজে করে দেখিয়েছে। ভদ্র-সভ্য, নির্ঝঞ্জাট ফ্যামিলি দেখে ভাড়া দিলাম। এরা তো দুনিয়ায়ার গোঁজামিল!”
“নির্ঝঞ্জাট কি বাবা দুনিয়ার জীবন হয়? সবার জীবনেই কিছু না কিছু সমস্যা আছেই।”
“তাহলে তুমি আমাকে কী করতে বলো? ওদের এভাবেই রেখে দেব! অসম্ভব!”
সাবিহা ভীষণ বিনয়ী কন্ঠে বলল, “আমি কিছুই বলতে চাই না বাবা। আপনি আমার মুরুব্বী, যা করবেন ভেবে-চিন্তেই করবেন। একটু আগে শুনলাম চাচী কান্নাকাটি করছিলেন, চাচা মনে হয় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আচ্ছা, আমি যাই ওর বাবাকে নিচে পাঠাই।” বলে দাঁড়াতেই হীরা তাকে থামিয়ে দিলেন।
গমগমে কন্ঠে বললেন, “থাক। কাল সকালে ডেকো।”
“আচ্ছা বাবা।” বাধ্য মেয়ের মতো ঘাড় কাত করে চলে গেলো সাবিহা। রিফাত কান্নাকাটি থামিয়ে বায়না ধরেছে রাতে তার দাদার কাছে ঘুমুবে। কাজেই ওকে টেনে তোলা গেলো না।
বাইরে বেরুতেই রফিক চোখ কপালে তুলে বলল, “মাইরি! কী বাঘা কুটনীতি জানো তুমি!”
সাবিহা এক নজর পেছনে ঘুরে শ্বশুরকে দেখে নিলো। রফিকের হাত টেনে সামনে এগিয়ে বলল, “এখানে কী করছ তুমি?”
“খেলাটা কীভাবে ঘোরালে তাই দেখলাম। তোমার তো পলিটিক্স করা উচিত ছিল সাবিহা! ভুল করে হাউজওয়াইফ হয়ে গেলে। ইশ!”
“হাউজ পলিটিক্স করছি। এত আফসোস করার কী আছে?” মশারি টাঙাতে টাঙাতে বলল সাবিহা।
“কিন্তু তুমি ওদের পক্ষ নিচ্ছো কেন? কাজটা তো আসলেই ঠিক করেনি। মান-সম্মানের প্রশ্ন।”
“খালি চোখে কতকিছুই দেখা যায়। কেউ লোভে পড়ে সুদ নেয়, কেউ যাতাকলে পিষে। ওদের ঘটনা কী সেটা তো আমরা জানি না। না জেনে একটা মানুষকে ঘাড় ধরে বের করে দিলে আল্লাহ আমাদেরও একদিন সেসব সুদে-আসলে ফিরিয়ে দেবে। ঘটনা কতখানি সত্য আগে যাচাই করি। তারপর দেখা যাবে।”
রফিক অবাক কন্ঠে বলল, “তুমি তো অস্থির কুটনৈতিক!”
“তুমি কিন্তু আমাকে বারবাত কুটনী বলছ!” ক্ষেপে গেলো সাবিহা।
রফিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, “আরে! কুটনৈতিক বললাম। খারাপভাবে নিচ্ছ কেন?”
“খারাপ কথা বললে খারাপভাবে নেব না?”
হার মেনে রফিক বলল, “তুমি একজম অতি উচ্চ পর্যায়ের ডিপ্লোম্যাট। হয়েছে এবার?”
সাবিহা মনে মনে ঘাটতে শুরু করল ডিপ্লোম্যাট শব্দের অর্থ তার জানা আছে কি না। বেশিদূর এগোতে পারল না। রফিক অন্য আলাপ করতে শুরু করে দিয়েছে।
—
নির্ঘুম রাত্রির পর সকালটা শুরু হলো কাঠবিড়ালির ডাকে। ফজরের ওয়াক্ত শেষ হবো হবো করছে। সে সময় ছাতিম গাছের ভাঙা ডালে একটা কাঠবিড়ালি বসে নিচের দিকে তাকিয়ে অনবরত ডাকতে থাকল। ফজরী হাওয়ার সাথে ভেসে ভেসে এলো ছাতিম ফুলের গন্ধ। এক বিষাদের কর্পূর বাতাসে উড়িয়ে দিলো সে। বিষন্নতার করুন সুরে সুর মেলালো কাঠবিড়ালিটাও। সুবিহে সাদিকের লালাভ রঙ দেখে মনে হলো কারো হৃদয় চেরা রক্ত। সমস্ত সকালটা এক ঝলকেই থমথমে দিনের সারসংক্ষেপ দেখিয়ে দিলো। জানালার পাল্লা ছেড়ে সরে দাঁড়ালো ফাবিহা। সিমিকে দিয়ে সাবিহা ডাক পাঠিয়েছে। ফাবিহা খুব কৃতজ্ঞ বোধ করল ফরিদকে না ডাকার জন্য। মানুষটা পুরো রাত ছটফট করে এই একটু আগে ঘুমিয়েছে। মুখে-চোখে আজলা ভরে পানি ছিটিয়ে মাথায় ওড়না চাপালো সে। সিড়িঁতে ওঠার সময় খেয়াল করল সিমি তার পিছু পিছু আসছে। পিছিয়ে গিয়ে ওর হাতটা শক্ত করে ধরে নিজের হাতে একটু শক্তি জোগানোর বৃথা চেষ্টা করল ফাবিহা।
সিমি আগে ভেতরে ঢুকল। সাবিহা তার ঘরে ছিল। সিমি কিন্নর কণ্ঠে ডাকতেই বেরিয়ে এলো। ভুরু উঁচিয়ে বলল, “ফাবিহা এসেছে?”
“জি।” মাথা নাড়ল সিমি।
“নিয়ে আয় ওকে।” বসার ঘরের দিকে ইশারা করে সাবিহা ওদিকে গেলো। সিমির ডাকে ফাবিহা ধীর পায়ে এলো।
সাবিহা দাঁড়িয়ে ছিল। ফাবিহা ঢুকলে নরম কণ্ঠে বলল, “বসো।”
ফাবিহা আজকে সালাম দিতেও ভুলে গেলো।
“শরীরটা অসুস্থ মনে হচ্ছে?” সাবিহা এক দৃষ্টে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার হাত দুটো অল্পবিস্তর কাঁপছে।
ফাবিহা ঠোঁট ভিজিয়ে বলল, “না, অসুস্থ না।”
সিমির দিকে এক ঝলক তাকিয়ে সাবিহা বলল, “কালকে কী হয়েছিল বলো তো? ভাইয়ার কাছে জিজ্ঞেস করলাম, কিছুই বলতে পারল না।”
কিছুই কেন বলতে পারল না? ফাবিহাকে ওরা কী কী শুনিয়েছে তার অর্ধেক তো ভদ্রলোক শুনেছে। তবু বলেনি কেন? নাকি সাবিহাই তার কাছে শুনতে চাইছে। ফাবিহা নিজেকে প্রস্তুত করল। অপরাধ না করেও অপরাধের স্বীকারোক্তি দেয়ার জন্য।
“এই বছরের শুরুর দিকে আমাদের ত্রিশ হাজার টাকা ধার করতে হয়েছিল। দিয়েছিলেন এক মহাজন, কিন্তু বাবার সাথে কথা হয়েছিল ঋণটা বিনা সুদে থাকবে। কিন্তু ফেরত নেয়ার সময় উনি বললেন আমাদের নাকি আসলের চেয়েও বেশি সুদ হয়েছে। বাবা কোনোভাবেই সুদ দেবেন না, উনি সুদ ছাড়বেন না।” দম ছাড়ল ফাবিহা।
“কোনো লিখিত চুক্তি ছিল না? বা সাক্ষী?”
“সাক্ষী ছিল। তিনি এই ঘটনার মাঝেই মারা গেলেন।” মাথা নিচু করল ফাবিহা। “সেই টাকা পরিশোধ করার জন্য তাৎক্ষণিক আরেকটা সুদভিত্তিক ঋণ নেয়াটাই ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। প্রথম ঋণ শোধ হলো। দ্বিতীয় ঋণের সুদ বাড়তে শুরু করল। সেটা থামানোর জন্য আরেকটা ঋণ, আরেকটা সুদ। এভাবে বাড়তে বাড়তে নয় লাখে যেয়ে থামল।”
“ত্রিশ হাজার থেকে নয় লাখ!” সাবিহার মনে হলো তার দম আটকে আসছে। চোখ বড়বড় করে সে সামনের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলো।
সিমি বিড়াল পায়ে ফাবিহার পেছনে এসে দাঁড়ালো। ছোট আপার যে এগুলো বলতে কেমন কষ্ট হচ্ছে সে ঠিক জানে। এটাও বুঝতে পারছে খালাম্মা, খালু কারো কথা না বলেই ছোট আপা কথাগুলো এমনভাবে বলছে যেন ভুলটা সবার, কারো একার না।
“এই ঋণের কথা ছড়িয়ে যাবার পনের দিনের ভেতর আমার বিয়ে ভেঙে গেলো।”
“তোমার বিয়ে ঠিক ছিল?” আরও অবাক হলো সাবিহা।
“জি। প্রায় তিন বছর আগে এঙ্গেজমেন্ট হয়েছিল। তারা পিছিয়ে গেলো। সবার কাছে বলল তাদের ছেলেকে আমি ধোঁকা দিয়েছি, তার বন্ধুর সাথে…” বৃদ্ধাঙ্গুল এবং শাহাদত আঙুল দিয়ে দুচোখ চেপে ধরল ফাবিহা। তাতে তার হাতের কাঁপুনি স্পষ্টভাবে দেখতে পেলো সাবিহা। বিপরীতের সোফা থেকে তড়িৎ গতিতে উঠে এসে ফাবিহার পাশে বসল। তার পিঠে হাত রাখতে গিয়ে দেখল ওখানে আগে দেখেই দুটো ছোট ছোট হাত তার ক্ষুদ্র আয়তন দিয়ে ফাবিহার শরীরে মাখানো সবটুকু দুঃখ শুষে নিতে চাইছে।
“আমি…” ফাবিহার গলা কেঁপে উঠল। ঢোক গিলে বলল, “ওরা বলে বাবা আমাকে নিয়ে…ব্যবসা…” শেষ করতে পারল না ফাবিহা। দুপাটি দাঁত শক্ত করে চেপে ধরল বাঁধনছাড়া কান্নাটা থামানোর জন্য। তাতে চক্ষুবর্ষণের গতি রোধ করা গেলো না। আশ্বিনের শেষে সমস্ত নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফাবিহার বন্ধ চোখের ফাঁক গলে আষাঢ়ে বর্ষা নামলো। বুকের কাছের ওড়নাটা ভিজে গেলো প্রবল বর্ষার দাপটে।
সাবিহা চোখ মুছে ভেজা কণ্ঠে বলল, “আর বলতে হবে না।”
তার ভেজা কণ্ঠ শুনে অবাক হয়ে তাকালো ফাবিহা। তার লাল চোখজোড়া দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারল না সাবিহা। চট করে ওকে বুকে টেনে নিলো। স্বান্তনা ঠিক কার দরকার সিমি বুঝতে পারল না।
সাবিহা নিরবচ্ছিন্ন ভঙ্গিতে ফাবিহার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। যেমন করে দেয় রিফাতের পিঠে, তার প্রচণ্ড জ্বরের সময়।
“কিছু কি শোধ হয়েছে?”
“জি, আর তিন লাখের মতো আছে।”
সাবিহার মনে হলো বোঝাটা তার নিজের বুক থেকে নেমে গেছে। ঝলমল করে উঠল তার চেহারা।
“আলহামদুলিল্লাহ্ আলহামদুলিল্লাহ্! তাহলে তো আর বেশি নেই!”
ফাবিহা ছোট করে নিশ্বাস নিয়ে বলল, “গত এক মাসে কোনো কিস্তি দেয়া হয়নি। সপ্তাহে দশ হাজারে এক হাজার করে সুদ বাড়ে। এখন বোধহয় বেড়ে তিন লাখ পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে।”
সাবিহার হাসিতে ভাটা পড়ল। চিন্তিত কণ্ঠে বলল, “তোমার ভাইটা বসে আছে কেন? ওকে কোনো একটা কাজে ঢুকিয়ে দাও!”
পরিবারের বাইরের কারো থেকে এমন কথা শুনতে পছন্দ করে না ফাবিহা। সে মানে তার ভাই বিগড়ে যাচ্ছে অথবা ইতোমধ্যেই গেছে। কিন্তু বাইরের মানুষের তাতে এত মাথাব্যথা কেন!
কিন্তু এই ক্ষণে সাবিহার কথাটা একটুও বিরক্ত লাগল না। মনে হলো বড় আপা তার শ্বশুরবাড়ি থেকে ধমকা-ধমকি করছে, “হ্যাঁ রে! ফারদিন কি কোনোদিনই মানুষ হবে না? আমার হাতের থাপ্পড় খেতে না চাইলে ওকে সোজা হয়ে যেতে বল!” সাবিহার ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে ঠিক তাই মনে হলো। কী আশ্চর্য! দু’ফোঁটা স্বচ্ছ চোখের জলের কী অসীম ক্ষমতা!
“ওর যে কী হয়েছে! পড়াশোনা করে না, কাজ করে না। জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলে না।” ফাবিহা চোখ মুছল। আজ কতগুলো দিন সে ফারদিনের সাথে কথা বলে না! তাতে তার বিন্দুমাত্র বিকার নেই। দিব্যি নিজের মতো দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে।
সাবিহার মেজাজটা বেজায় খারাপ হলো। দুটো কঠিন কথা মুখে এলেও মেয়েটার চেহারার দিকে তাকিয়ে গিলে নিলো। কিছু মনে পড়ে ভঙ্গিতে বলল, “এজন্যই ডায়েরির বিজনেস করছ!”
ফাবিহা একটু বিব্রত হলো, “এখনও সেভাবে হয়নি। ঐ টুকটাক…”
সাবিহার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ফরিদ চাচার কলেজের বেতন নাকি অনিয়মিত, শ্বশুরের কাছে শুনেছিল। তার মানে তো ঝড়ের পুরোটা এই মেয়ের উপর দিয়ে যায়।
ফাবিহা ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, “আমাদের কি বাড়ি ছাড়তে হবে আপু?”
সাবিহার বুকটা হু হু করে উঠল। ঝট করে তার মাথায় হাত রেখে বলল, “না না! বাড়ি কেন ছাড়তে হবে?”
“এরপরে যেন বাড়িতে কোনো ঝামেলা না হয় সেই বিষয়ে চেষ্টা করব আপু।”
“আচ্ছা।” সাবিহার মনে হলো তার কাছে যদি কোনো জাদুর কাঠি থাকত! এক নিমিষেই সেটা দিয়ে ফাবিহার সমস্ত দুঃখ উধাও করে দিত সে।
“যাও। নিশ্চিন্তে থাকো। বাড়িঘর নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হবে না।”
ফাবিহা কৃতজ্ঞ চোখে তাকালো। খুব ইচ্ছে করল সাবিহাকে তার মতোই ঝাপটে ধরতে। পারল না। একটা অলীক অপরাধের অদৃশ্য জাল তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে রইলো।
চট করে ঘরে ঢুকে পড়ল সাকিন। বেরিয়েছিল কিছু একটু খাওয়ার উদ্দেশে। গতকাল রাতে খায়নি। ফলে আজ সকাল সকালই ক্ষুধা লেগে অবস্থা খারাপ। হাঁটতে বেরুনোর আগে কিছু মুখে দেয়ার জন্যই সাবিহাকে ডাকতে এসেছিল। ডাইনিংয়ে আসতেই তার নাক টানার শব্দ কানে এলো। এই সকালে কান্নাকাটি করছে কেন সেটা জানার জন্য এগোলেও জানলো অন্য কিছু। দ্রুত সরে পড়ল সাকিন। লুকিয়ে কথা শোনার জন্য খারাপ লাগা উচিত কি না সে চিন্তা ছাপিয়ে মনে ফরিদ আহমেদের সরল মুখটা ভেসে উঠল। কী কঠিন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে পরিবারটা যাচ্ছে সে কথা চিন্তা করেই শিউরে উঠল সে।
যে মাইক্রোক্রেডিট থিওরির জন্য তার জনককে নোবেল দেয়া হয় সেই থিওরির জন্যই পুরো একটা জনগোষ্ঠীর জীবন খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। সে খাদ থেকে উত্তোরণের কোনো বিকল্প পথ নেই। ছোট সুদের ঋণ মেটানোর জন্য বড় সুদ নিতে হবে। বড় সুদের ঋণ পরিশোধের জন্য নিজের জীবনটা দিয়ে দিতে হবে। হয় আজ, নয়তো কাল। কিন্তু অনিবার্যভাবে সে অন্ধকার গর্তে ঝাপ দিতেই হবে। এই পুরো প্রক্রিয়ার জন্য বিশ্ব মোড়লরা শান্তির সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘নোবেল’ ধার্য করেছে। সে শান্তিগুলো বিনা সুদে নিয়ে যাওয়া হয় এসব ছোট্ট কুটির থেকে। যাদের নিজের বলতে কেবল ওই শান্তিটুকুই ছিল।
সিঁড়িঘরে নামতেই সিমির ঘাড় জড়িয়ে ধরল ফাবিহা। বলল, “তুই কাঁদছিস কেন?”
এ কথায় সিমি বরং আরেকটু ফুঁপিয়ে উঠল।
“কী হলো! কান্নাকাটি কেন?”
সিমি উল্টো বলল, “কেন? কানতে খালি আপনারাই পারবেন? আমি কানলে দোষ কেন?”
ফাবিহা আদুরে কণ্ঠে বলল, “না না! দোষ কীসের! আমাদের সিমি ইচ্ছে হলেই কাঁদবে, কেঁদে কেঁদে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়িয়ে দেবে। সেই পানিতে আমরা সবাই আনন্দ করে ভেসে যাবো। কোনো দোষ নেই!”
—
নয়টা বাজতে না বাজতেই হীরা চৌধুরী বললেন, “ফরিদকে ডাক দাও।”
স্ত্রীর চোখের ইশারায় রফিক চুপ রইলো। সাবিহা শ্বশুরের সামনে এক কাপ চা রেখে বলল, “একটা আবদার আছে বাবা!”
হীরা চৌধুরীর মন-মেজাজ গত রাতের তুলনায় বেশ ভালো। চায়ে চুমুক দিয়ে আগ্রহী কন্ঠে বললেন, “বলো বৌমা।”
“আমার এক বান্ধবী খুব বিপদে পড়েছে। সুদের উপর ধার-দেনা করে এখন তখন অবস্থা। এসব করে বিয়েটাও ভেঙে গেছে। ওর বাবার ইনকাম তেমন একটা না। কীভাবে কী করবে বুঝতে পারছে না।”
রফিক বিড়বিড় করে বলল, “এই বান্ধবী এলো কই থেকে?”
হীরা সন্তর্পণে কাপ রেখে দিলেন। শান্ত কন্ঠে বললেন, “তুমি কি ফরিদের মেয়ের কথা বলছ মা?”
সাবিহা মাথা নিচু করল।
হীরা চৌধুরী নিশ্বাস ছেড়ে বললেন, “তুমি যদি চাও ওরা এখানে থাকবে, তাহলে থাকবে। কিন্তু বৌমা, বাইরের মানুষ আমার বাড়িতে এসে অসভ্য আচরণ করবে, গালিগালাজ করবে এসব আমি সহ্য করতে পারব না। তুমি তাদেরকে বলে দেবে, এই জাতীয় কাজগুলো যেন এড়িয়ে চলে। বাকি তারা তাদের মতো থাকবে, আমার কোনো আপত্তি নেই।”
চা শেষ করে উঠে পড়লেন হীরা। সাবিহা কৃতজ্ঞ চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
*****
কুন্দকলি থেকে সাকিনের কলেজে পৌছতে সময় লাগে মোটেমাটে আধা ঘন্টা। সে লেগুনায় যাওয়া আসা করে। রিকশায় সময়টা আরেকটু বেশি লাগে।
প্রতিদিন একই সময়ে যাওয়া হয় বলে বেশ কিছু মুখ পরিচিত হয়ে গেছে। তারাও সে সময় তাদের কাজের উদ্দেশে ছোটে।
এই চেনামুখের মাঝে এক অদ্ভুত ভদ্রলোক আছেন। সাকিনের পরে ওঠেন এবং আগে নামেন। মধ্যবর্তী এই সময়টুকুর পুরোটা সময় তিনি ফোনে কথা বলে কাটান। কথা বলেন তার মেয়ের সাথে। ধরন শুনেই বোঝা যায়।
“আমার আম্মা কী করে? খাইছো মা? খাও নাই কেন! তুমি না খাইলে তো আব্বুর পেটের খাওয়া হজম হবে না মা! দেখি খাও তো! আমার সামনেই খাও। আম্মু তোমার নামে নালিশ দেয়? ঠিক আছে! বাড়ি আসি আমি, তোমার আম্মুর বিচার হবে! এখন খাও তো আম্মা! হ্যাঁ, এইত্তো! বেশি দুষ্টুমি করবা না, আচ্ছা? হ্যাঁ, অল্প করতে পারবা। একদম অল্প, এই ধরো এক মুঠ।”
এক মুঠ দুষ্টুমি কীভাবে করা যায় সাকিন জানে না। কিন্তু প্রতিদিনই এক কথা শুনতে হয়। যেন কেউ রেডিও ছেড়ে দেয়। সেই একই চ্যানেলে, একই কন্ঠে, একই সুরে পুরোনো কথাগুলো বারংবার পুনরাবৃত্তি হয়ে চলে। দাঁড়ি, কমা কোনোকিছুর পরিবর্তন নেই। যে কজন নিয়মিত যাতায়াত করে, সাকিনের ধারনা তার মতো তাদেরও ভদ্রলোকের কথাগুলো মুখস্থ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে যে বিরক্ত লাগে না তা নয়। তবে লোকটা এমন তন্ময় হয়ে কথা বলে যে, সেখানে কোনো অভিযোগ উত্থাপনের সুযোগ থাকে না।
সাকিনের আজ পরপর দুটো ক্লাস ছিল। নতুন বলে তাকে সরাসরি থিওরি ক্লাসে পাঠানো হয়নি। আপাতত সে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস নেয়। একেকটা ক্লাস করাতেই দু’ঘন্টা শেষ। দুটো ব্যাচের প্র্যাকটিক্যাল করাতে করাতে দুপুরের আজান দিয়ে দিলো। কলেজের মসজিদেই নামাজ সাড়ল সে।
নামাজ শেষে বেরিয়ে আসবে, সে সময় ডিপার্টমেন্ট হেড ডাকলেন। তিনি যে পেছনের কাতারে ছিলেন সাকিন খেয়াল করেনি।
কাছে এসে বললেন, “বাড়ি চলে যাচ্ছ নাকি?”
“জি স্যার, কাজ তো শেষ।”
মাথা নাড়লেন তিনি। বললেন, “কাজ শেষ হলেও কলেজ ছুটি হওয়া পর্যন্ত থাকবে। তোমার কোন স্টুডেন্টের কখন তোমার প্রয়োজন পড়বে তুমি তো জানো না।”
সাকিন একটু লজ্জা পেলো। ছোট করে বলল, “জি স্যার। শেষ পর্যন্ত থাকব ইনশাআল্লাহ্।”
ঘাড় চাপড়ে তিনি বললেন, “আজকে থাক। চলো এক জায়গা থেকে ঘুরে আসি।”
“কোথায় স্যার?”
“এই রাস্তার পাশেই। আমার ভাগ্নি এক কম্পিউটার সেন্টার খুলেছে। হাবিজাবি কী শেখায় তাই দেখতে যাওয়ার জন্য জোরাজুরি করছে অনেক দিন ধরে। চলো দেখে আসি।” সাকিন আগ্রহ করেই গেলো।
কলেজে আসার রাস্তায় একটা বিশাল রেস্টুরেন্ট পড়ে। তার ঠিক ওপর তলাতেই তিনটে রুমের সমান জায়গা জুড়ে মোটামুটি ধরনের একটা কম্পিউটার সেন্টার। আসতে আসতে সে জানলো, স্যারের ভাগ্নি মাস্টার্সে পড়ছে। পার্ট টাইম জব হিসেবে মেয়েদের কম্পিউটারের বেসিক জিনিস শেখানোর ছোটখাট এই কোর্স চালু করেছে। সেন্টারের ভেতরে ঝামেলা এড়ানোর জন্য শুধু মেয়েদের ব্যবস্থাই রাখা হয়েছে। এখানকার অধিকাংশই স্কুল, কলেজ পড়ুয়া ।
সেন্টার ঘুরে বেশ লাগল। গোছানো, পরিপাটি আয়োজন। স্যারের ভাগ্নিও আন্তরিক ভঙ্গিতে তাদের আপ্যায়ন করল। কলেজে এ পর্যন্ত কিছু মুখ চেনা হয়েছে। তার মাঝে দু’একজনকে এখানে দেখল সাকিন। তাকে দেখতেই তারা সালাম দিয়ে তটস্থ হয়ে গেলো।
মেয়েটা বলল, “মামা! আমাকে একটা চটপটে মেয়ে খুঁজে দিতে পারবা? যাকে হায়ার করেছিলাম সে গত সপ্তাহে চলে গেছে। আমি একা সামাল দিতে পারছি না।” জনা বিশেক মেয়ে। একা সামাল দেয় কষ্টই বটে। এ তো মুখে বলে দিলেই হয় না। প্রত্যেককে হাতে ধরিয়ে শেখাতে হয়।
স্যার বললেন, “খুঁজে দেখতে হবে। কলেজে মেয়ের তো অভাব নেই। কিন্তু কাজ করার মতো অ্যাক্টিভ মেয়ের অভাব। মেয়েগুলো দিনদিন কচ্ছপ হয়ে যাচ্ছে। ধাক্কা না খেলে আগাতে চায় না।”
সাকিন চুপচাপ বসে ছিল। হঠাৎ কী মনে হতেই বলল, “আপনার এখানে জয়েন করতে কেমন কোয়ালিটি লাগে?”
মেয়েটা উত্তর দেয়ার বদলে একটা লিফলেট ধরনের কাগজ হাতে ধরিয়ে দিলো। মনোযোগ দিয়ে পড়ল সাকিন। সিমি একদিন কথার ছলে বলেছিল ফাবিহা কম্পিউটারের কাজে বেশ দক্ষ। তার নাকি নিজের একটা ডেস্কটপও ছিল। বাড়ি পাল্টানোর সময় ওটা বিক্রি করে একটা কিস্তি শোধ করে তারপর এলাকা ছেড়েছে। সিমির ভাষ্য অনুযায়ী, আশেপাশের অনেকেই ফাবিহার কাছে কম্পিউটার সংবলিত বিভিন্ন কাজ করতে আসতো। কী মনে করে কাগজটা পকেটে রাখল সে।
“কিছু জায়গায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। কিন্তু দশ হাজার সবার কাছে কম লাগে। আরে ভাই! বিশটা মেয়ে মোটে এনরোল করেছে। ফ্ল্যাটের ভাড়া, কারেন্ট বিল, এই কম্পিউটারের ব্যবস্থা করতে যেয়ে তো মাঝে মাঝে আমার নিজের পকেট থেকেই টাকা দিতে হয়। এখন আমার লিফলেটের বিলও গচ্চা!”
দুপুরে স্যারের সাথে খেয়ে সাকিন বাড়ি ফিরল। দরজা খোলার সময় সিমিকে জিজ্ঞেস করল, “ফরিদ চাচা বাড়িতে আছে?”
সিমি বলল, “আছে। খালুর শরীর দূর্বল তাই ছোট আপা কলেজে যেতে দেয়নি।”
“তোমার ছোট আপাও আছে নাকি?”
“না। ছোট আপা ভার্সিটিতে।”
“চাচাকে যেয়ে বলো আমি একটু তার সাথে কথা বলব।”
সিমি চলে গেলে সাকিন পকেট থেকে ভাঁজ করা লিফলেটটা বের করল। এটা ফাবিহাকে সরাসরিই দেয়া যেত। কিন্তু তার সাহায্য ফাবিহা কীভাবে নেবে সাকিন বুঝতে পারছে না। এখানে তার কোনো কৃতিত্ব নেই। সে স্রেফ মাধ্যম। তার উপস্থিতি অনুপস্থিতি কোনো মানেই রাখে না। ভাবতে ভাবতে সোফার উপর একটা পেপার পেলো সে। চট করে লিফলেটটা পেপারের ভাঁজে ঢুকিয়ে দিলো। অর্ধেক বাইরে বের করে রাখল যেন তাকালেই দেখা যায়।
সিমি এসে বলল, “ভাইয়া, আসেন।”
সাকিন এগিয়ে গেলে সে কাচুমাচু করে বলল, “ভাইয়া, আপনার নামটা কী যেন? ভুলে গেছি।”
“তোমার নাম কিন্তু আমি মনে রেখেছি, সিমি!” সাকিন হেসে বলল।
“আপনার নামটা নতুন, আগে শুনি নাই তো। এজন্য মনে থাকে না।” কাচুমাচু করে বলল সিমি।
“সাকিন।”
“আমি তো ছোট আপার কাছে জযম বলে ফেলছি।” জিভে কামড় দিল সে।
সাকিন তাজ্জব হয়ে তাকালো, “জযম!”
“ঐ যে পড়ে না? আলিফ লাম যবর আল, লামের উপরে যে জযম থাকে তার আরেক নাম তো সাকিন। তাই এলোমেলো করে ফেলেছি।” শুকনো মুখে বলল সিমি।
সাকিন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। নিজের নামের এমন সমার্থক সে জীবনে চিন্তা করেনি।
“তোমার নতুন একটা জিনিস শিখলাম সিমি। ধন্যবাদ।” বলে সে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। সিমি বুঝতে পারল না সাকিন রেগে গেলো নাকি মজা করল।
ফরিদ আহমেদ মলিন চেহারায় বসে আছেন। সাকিন শুরুতেই বলল, “চাচা! আপনার লেখা যে এমন ভালো, আমি কিন্তু চিন্তাও করিনি!”
ফরিদের চেহারার মেঘ এক নিমিষে কেটে গেলো। অবাক কণ্ঠে তিনি বললেন, “কী বললে?”
সাকিন বিছানার পাশে রাখা চেয়ারে বসল।
“আমি তো এক বসায় শেষ করে ফেলেছি। আপনি চাইলেই কিন্তু বড় বড় উপন্যাস লিখতে পারেন চাচা!”
“কী করব লিখে বাবা? আমার লেখা পড়বে কে?”
“কেন! পড়ার লোকের তো অভাব নেই। যেকোনো প্রকাশনী দেখলেই লুফে নেবে।”
ফরিদ ক্লিষ্ট হাসি হাসলেন।
“পড়ার লোকের অভাব নেই এই কথা সত্যি। এটাও সত্যি পড়ুয়া মানুষের অভাব না থাকলেও আমার লেখার জন্য পাঠকের খুব অভাব। এখনকার ছেলেমেয়েদের চাহিদা মতো লিখতে পারি না মনে হয়।”
“আপনার লেখার ধরন স্মুথ। যে কেউ পড়ে মজা পাবে। তবে ব্যক্তিবিশেষে পছন্দের ভিন্নতা থাকে। তাই বলে আপনার লেখা খারাপ হবে কেন? একটা বড় গল্প লিখুন চাচা! আমার জন্য হলেও লিখুন!”
সাকিনের অনুরোধে বড় আপ্লুত হলেন ফরিদ। সপ্তাহখানেক ধরে পেইজের কাজ বন্ধ। নতুন কোনো পোস্ট দেয়া হয়নি। তাতেই ফলোয়ার কমে গেছে তেত্রিশজন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুশো বারো লেখা সংখ্যাটা খানিকক্ষণ দেখে ফরিদ ফোন রেখে দিয়েছেন। সেই তাকেই একজন কলেজের শিক্ষক এভাবে অনুরোধ করছে! কি সৌভাগ্য তার!
আবেগী কণ্ঠে তিনি বললেন, “ইনশাআল্লাহ্ লিখব বাবা।”
“আমি কিন্তু গরম গরম পড়ব! লেখার সাথে সাথেই।”
“আচ্ছা।” হেসে মাথা নাড়লেন ফরিদ।
“আপনার শরীরটা এখন কেমন চাচা? অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন শুনলাম।”
মুহূর্তেই গতকাল বিকেলের স্থির চিত্র চোখে ভাসল। সাকিন তো সে বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করল না! বিব্রত কণ্ঠে তিনি বললেন, “বয়স হয়েছে তো! তেমন কিছু না। এখন আলহামদুলিল্লাহ্ অনেক ভালো আছি।”
কথা আসলেই সত্যি। ঘরে ঢোকার সময় তার যে চেহারা সাকিন দেখেছিল, এখন তার মানচিত্র বদলে গেছে। দুঃখ থাকলেও হতাশা নেই। সে উঠে দাঁড়ালো। বাবার বয়সী একটা মানুষকে স্বান্তনা দেয়া ঠিক হবে কি না বুঝতে পারল না। উল্টো সে সব জানে এটা শুনে তিনি লজ্জা পেতে পারেন।
সালাম দিয়ে সে বিদায় নিলো।
—
একটা শাড়ির পেইজের সাথে কোলাবরেশন করেছে ফাবিহা। বুদ্ধিটা আচমকা মাথায় এলো। তারপর আর দেরি করল না সে।
কয়েকটা বড় বড় শাড়ির পেইজে মেসেজ পাঠালো। প্রস্তাব দিলো তাদের শাড়ির ডিজাইনের সাথে মিলিয়ে সে ডায়েরি বানাবে। স্বাভাবিকভেবেই এসব কম্বো অফার মানুষ বেশ পছন্দ করে। নিজের বেশ কিছু কাজ দেখালো সে। বিভিন্ন থিমে ডায়েরি বানানোর অভিজ্ঞতা যে তার আছে সেটাও জানালো।
তিনটে পেইজ মেসেজ দেখে রেখে দিলো। কোনো উত্তর এলো না। একজন উত্তর দিলো, তারা আগ্রহী নয়। ফাবিহা যখন হাল ছেড়েই দিচ্ছিল তখন সবচেয়ে কম ফলোয়ারের পেইজটা সাড়া দিলো। তাদের ফলোয়ার ষোলো হাজার। যেখানে বাকিগুলোর ছিল চল্লিশ, পঞ্চাশ এমনকি এক লাখ। এই পেইজের অ্যাডমিন আগে এক কপি ডায়েরি নিজে নিয়ে দেখতে চাইলেন। কোয়ালিটি ভালো হলে তবেই অফার নিয়ে ভাববেন বলে জানালেন। চারটা প্রত্যাখ্যানের পর এটা ছিল ফাবিহার শেষ সুযোগ। সে মরণ কামড় দিল। তাদের পেইজের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত গোলাপী এবং মাটি রঙা শাড়ির সাথে মিলিয়ে দুটো ডায়েরি বানানোর সিদ্ধান্ত নিলো।
ভার্সিটি থেকে এসে রাত পর্যন্ত এসবই করল সে। পেইজ চেক করল। নতুন কোনো অর্ডার আসেনি। সবাই মেসেজে দাম জিজ্ঞেস করে চুপ করে যায়। ফাবিহার খুব ইচ্ছে হয় বলতে, কিছু কম সে রাখবে, তবুও যেন তারা অর্ডার দেয়। কিন্তু জিনিসটা নিতান্তই ছ্যাঁচড়ামি দেখায় বলে চুপ করে থাকতে হয়।
ডায়েরির কাজ শেষ করে রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত সে অ্যাসাইনমেন্ট করল। তখন সবাই ঘুমিয়ে কাদা। বাবার সাথেও আজ ভালো করে কথা বলতে পারেনি সে। মনটা খুব অস্থির লাগছিল ফাবিহার। কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল। অথচ কোথাও কেউ নেই। রান্নাঘরে খোলা জানালা দিয়ে বাইরের ঘন অন্ধকার উঁকি দিচ্ছে। ভেসে আসছে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ক্লান্তিহীন ডাক।
পুরো ঘর জুড়ে খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটির পর আঙিনায় জোরে বাতাসের শব্দ পাওয়া গেলো। ঝড় হবে বোধহয়। ফাবিহার গা একটু ছমছম কর উঠল। একবার পড়েছিল, রাতে আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমুলে পুরো রাত একজন ফেরেশতা পাহারা দেন। সে দ্রুত দোয়ার বইটা টেনে নিলো আয়াতুল কুরসি পড়ার জন্য। মুখস্থ যদিও আছে কিন্তু মাঝে মাঝে দুই এক জায়গায় টান ভুল হয়।
পড়ে বইটা রেখে দেবে, সে সময় অর্থের দিকে চোখ গেলো। বাংলা উচ্চারণের নিচে গুটি গুটি অক্ষরে অর্থ লেখা। পড়তে শুরু করল সে। দোয়াগুলো সবসময় গড়গড় করে বলে যায়। অন্তর্নিহিত অর্থটা অধরাই থেকে যায়।
পুরো অর্থটা একবার পড়ার পর বাক্যটা তার চোখে পড়ল।
“তাঁকে তন্দ্রা বা ঘুম স্পর্শ করতে পারে না।”
ফাবিহার বুকটা ধ্বক করে উঠল। মনে হলো, এই বাক্যটা কেবল তাকে উদ্দেশ্য করেই বলা। গত আধা ঘণ্টা যাবৎ সে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে একটা মানুষের সাথে কথা না বলতে পারার অস্থিরতায়। সবাই ঘুমে বিভোর। ঠিক সে সময় তাকে কেউ জানালো, একজন সত্ত্বা আছেন, যিনি কক্ষনো ঘুমান না। এমনকি ঘুম তাঁকে স্পর্শ অবধি করে না। মুহূর্তখানেক সময়ের জন্যও তিনি ঝিমিয়ে পড়েন না। বেখেয়াল হন না কক্ষনো।
এর মানে কী দাঁড়ালো?
এর মানে, ফাবিহা যখন খুশি তাঁর সাথে কথা বলতে পারে। তিনি সদা জাগ্রত, বড় যত্ন নিয়ে তিনি পাপী বান্দার আকুতি শোনেন
ফাবিহার মনে হলো এর চেয়ে কাকতালীয় ঘটনা এই দুনিয়ায় দুটো হতে পারে না।
খানিকক্ষণ ঝিম মেরে বসে থেকে সে যখন উঠতে যাবে, তখন পত্রিকাটা তার নজরে পড়ল। হীরা চৌধুরী নিয়মিত পত্রিকা নেন। নিচতলা থেকে উপর তলায় এটা সরবরাহের কাজ সিমি করে। আজ বোধহয় ভুলে গেছে। কাগজটা ভাঁজ করে রাখতে যেয়ে ছোট্ট একটা লিফলেট মেঝেতে পড়ে গেল। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন কোচিং সেন্টার, হাসপাতাল, শপিং মলে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে এভাবে। বেখেয়ালে তুলে রাখতে গিয়েই লেখাটা চোখে পড়ল। ‘Learn Basic Computer’
মনোযোগ দিয়ে কাগজটা পড়ল ফাবিহা।
এর পরের কাজগুলো খুব দ্রুত করল সে। উচ্চ-মাধ্যমিক পরবর্তী সময়ে যে কম্পিউটার কোর্স করেছিল সেটার সার্টিফিকেট এবং টাইপিং কম্পিটিশনে ফার্স্ট প্রাইস জেতার সার্টিফিকেটের সফট কপি করে ঝটপট তাদের মেইল অ্যাড্রেসে পদটার জন্য দরখাস্ত করে ফেলল। তার কাজের গতিতে মনে হচ্ছিল কেউ তাকে তাড়া করছে। প্রকৃতপক্ষেই তাই। ঠিক বিশ মিনিটে মাথায়, ঘড়িতে যখন বারোটা এগার, তখন ফাবিহাকে পাওয়া গেলো জায়নামাজে। মাত্র দু’রাকাত নামাজ পড়ল সে। এই দু’রাকাতে কত অসংখ্যবার যে আয়াতুল কুরসি পড়ল তার ইয়ত্তা নেই!
কথা বলার অস্থিরতা, তার পরেই জানা— একজন সদা সর্বদা তার কথা শোনার জন্য প্রস্তুত। সে বিস্ময় সামলে ওঠার আগেই কাগজের ভাঁজে রিজিকের এমন পথ খুঁজে পাওয়া— যার চিন্তা ফাবিহার সীমাবদ্ধ মস্তিষ্ক কোনোদিন করে উঠতে পারেনি। মোনাজাতে তখন ফাবিহার দুঃখ শ্লোকের চোখ থেকে শ্রাবণের প্রথম বর্ষণের সতেজ বৃষ্টি ঝরছে। সে জানতেও পারল না, জীবন উপাখ্যানের বেশিরভাগ মোড় সবসময় মাঝ রাত্তিরেই ঘোরে।
পরদিনই ডায়েরির সরঞ্জাম কিনে এনে কাজে লেগে পড়ল ফাবিহা। দুটো ডায়েরি বানিয়ে যখন শেষ হলো, তখন সে নিজের মনে স্বীকার করল, এর আগে এত সুন্দর ডায়েরি সে কক্ষনো বানায়নি। ছবি পাঠানোর জন্য ফোন হাতে নিতেই চোখে পড়ল ফিরতি মেইল। তাকে দেখা করতে যেয়ে বলা হয়েছে। ফাবিহা ছোট্ট বাচ্চার মতো খুশিতে খলবল করতে করতে ফরিদকে সেটা জানাতেই তিনি ফিরতি একটা খবর দিলেন। সে খবরের বিস্ময় এ যাবৎকালের যে কোনো সংবাদের চেয়ে কয়েকশত গুণ বেশি।
‘ময়ূখমালা’র ইনবক্স থেকে একটা মেসেজ বের করে কম্পনরত হাতে মেয়ের সামনে ধরলেন ফরিদ। সাকিনের কথাটা এত দ্রুত সত্য হয়ে যাবে তা কস্মিনকালেও চিন্তা করেননি তিনি।
“সম্মানিত লেখক, ‘লি’ প্রকাশনী থেকে বলছি। আপনার চমৎকার সাহিত্যকর্ম ‘নওরোজ’ আমাদের নজরে এসেছে। আপনার অসাধারণ এই কাজটি নিয়ে আমরা পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে আগ্রহী। বাংলা সাহিত্যের ঝুড়িকে সমৃদ্ধ করতে আপনি কি আমাদের সাহায্য করবেন?”
ফাবিহা স্তব্ধ হয়ে বাবার ছলছল চোখের দিকে তাকালো।
চলমান~
(পাঠক! শব্দসংখ্যায় কালকের রেকর্ড ব্রেক। আপনাদের কি মনে হয় না আমি দিন দিন বাঁচাল হয়ে যাচ্ছি? 🙂)