#বনজোছনা
২৭.
ফাবিহা সাথে সাথেই ওই প্রকাশনীর ফেইসবুক পেইজে ঢুকল। দেড় বছর আগে খোলা হয়েছে। ইতামধ্যে বেশ কিছু বই প্রকাশও হয়ে গেছে। পেইজের ফলোয়ার চব্বিশ হাজার। ফেইক মনে হচ্ছিল না। নিশ্চিত হওয়ার জন্য ফাবিহা বইগুলো রকমারিসহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে খুঁজে দেখল। বিক্রি নেহায়েত কম নয়। ফরিদ আহমেদ উদগ্রীব হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন।
“কী খুঁজছিস মা?”
“দেখলাম এরা আবার ফ্রড নাকি।”
“ফ্রড?”
“নাহ। আগে থেকেই অনেক বইটই আছে। মোটামুটি ভালোই পরিচিত।” রিভিউগুলো ঘেটে ঘেটে দেখছিল ফাবিহা। এত ভালো বিক্রি! তার মনটা কেমন খচখচ করছিল।
“ওরা আমাকে নক দিলো কেন বল তো!”
ফাবিহার মনেও যে এই প্রশ্নটা আসেনি এমন নয়। তবে সে বাবাকে বলল, “কেন দেবে না! ভালো লেখকদের খুঁজে বের করাই তো প্রকাশনীর কাজ!”
“ভালো খারাপের আলাপ পরে। আমাকে চেনে কে? বইই বা কিনবে কে?”
“আহা! সব চিন্তা তুমি করলে হবে কীভাবে! তোমার কাজ লেখা, তুমি লিখতে থাকো। প্রকাশনীর কাজ বিক্রি করা, তারা সেটা করবে।”
ফরিদ আহমেদ তখনো বিভ্রান্ত।
“ওদের কী উত্তর দেব?”
“তুমি বই আনতে চাও না?”
চকচকে চোখে তিনি বললেন, “তা তো চাইই!”
“তাহলে আর এত চিন্তা কীসের! আমি ওদের বইটই নিয়ে একটু খোঁজ নিয়ে দেখি কেমন বই ছাপায়। তারপর তুমি জানিও কী করতে চাও।”
ফরিদ আহমেদ আবার মেসেজটায় ডুবে গেলেন, সম্মানিত লেখক… কে কবে তাকে এভাবে সম্বোধন করেছিল!
ততৎক্ষনাৎ উত্তর দেয়ার জন্য বললেন, “আমি ভেবে জানাবো।”
ফোন বন্ধ করার আগেই ওদের রিপ্লাই এলো।
“এ পর্যন্ত আমাদের প্রকাশিত বইয়ের তালিকা দেখার অনুরোধ রইলো। আমরা সর্বক্ষেত্রে মানসম্পন্ন বইকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি। চব্বিশ হাজার পাঠকের মনেও আমরা স্থান করে নিতে পেরেছি।”
এ মেসেজ পড়ে শেষ করার আগেই আরেকটা মেসেজ।
“নিজেকে নবীন ভেবে হীনম্মন্যতায় ভুগবেন না, সম্মানিত লেখক! নবীন লেখকদের বই যেন সর্বোচ্চ বিক্রি হয় আমরা সেভাবেই ব্যাবস্থা নিয়ে থাকি। আমরা আপনার ইতিবাচক উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম। শুভকামনা।”
ফরিদ কোথায় যেন তলিয়ে যাচ্ছিলেন। এরা তাকে এত তোয়াজ করছে কেন! বিস্ময়ে খাবি খেয়ে মেয়েকে বললেন, “এরা এমন উঠে পড়ে লেগেছে কেন বল তো!”
মনের খচখচানিটা মনে চেপেই সে রহস্য করে বলল, “তুমি যেন হাত ফস্কে বেরিয়ে না যাও এজন্য!”
মেয়ের হাসিমুখ দেখে এই প্রথম খানিকটা লজ্জা পেলেন ফরিদ।
তার চিন্তায় তালা ঝুলিয়ে ফাবিহা বলল, “আচ্ছা, আপাতত এটা ছাড়ো। আজকে আমার ভাইভা আছে। তুমি যাবে না আমার সাথে?”
“কীসের ভাইভা?”
ফাবিহা জিভে কামড় দিল। বাবাকে তো বলাই হয়নি! তৎক্ষণাৎ সেই লিফলেটটা নিয়ে এলো সে। পাশে বসে হাত জড়িয়ে ধরে বলল, “এখানে অ্যাপ্লাই করেছি।”
ফরিদ আহমেদ ক্লান্ত চোখে কাগজটা পড়লেন। ভেতর থেকে তাগিদ অনুভব করলেন, এভাবে আর বসে থাকা যাবে না। অনেক হয়েছে। মেয়েটা নিজের উপর সবকিছু উঠিয়ে নিয়েছে। এভাবে চলতে দেয়া যায় না।
“কোথায় পেলি?”
“পেপারের ভাঁজে ছিল।”
“পেপারের ভাঁজে? আমি যে পড়ার সময় দেখলাম না!” বিড়বিড় করে বললেন ফরিদ। ফাবিহা সে কথা শুনতে পেলো না। মেইল বের করে দেখিয়ে বলল “ওদের সাথে যোগাযোগ করেছি দেখো।” স্ক্রল করে দেখাল সে। ওরা যে রিপ্লাই দিয়েছে সেটাও দেখালো। সে এক মনে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে।
ফরিদ আহমেদ সেদিকে কেবল একবারই দেখেছেন। তার চোখ আটকে গেছে ফাবিহার ভাঙা গেলে, জ্বলজ্বলে চোখে। গলার হাড় বেরিয়ে গেছে। শরীরটাও মনে হচ্ছে খুব পাতলা হয়ে গেছে। মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন তিনি। ওর চুল কি আগেও এমন পাতলা ছিল? বেনিটা বেশ চিকন লাগছে। সবশেষে দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো ওর চোখের কোলে। যেন কাজল ছড়িয়ে শ্রাবণের রং মাখিয়েছে। শুকনো সে শ্রাবণে আছে কেবল চোখের জ্বলজ্বলে তারা। তার উপস্থিতিতে ফাবিহাকে এই দিনও দেখতে হলো!
“ও বাবা!” ফরিদের হাত ঝাঁকালো ফাবিহা। “যাবে না আমার সাথে?”
“যাবো মা।”
“তাহলে কথা বলছিলে না কেন? কী চিন্তা করছিলে?”
“কিছু না।”
“বইয়ের চিন্তা করছ? সব ভালো হবে ইনশাআল্লাহ। একদিন তোমার অনেক বই বিক্রি হবে। তারপর সবাইকে আমি বলব, আমি লেখক ফরিদ আহমেদের মেয়ে!” দুহাত জড়ো করে স্বপ্নালু কণ্ঠে বলল ফাবিহা। তারপরই ঘন ঘন মাথা নাড়ল, “ওহ হো! তুমি তো ছদ্মনামে লেখো। বইও কি বাবা ছদ্মনামেই আনবে?”
স্বপ্নের রোগ বড় ছোঁয়াচে। বাহিত হতে বাতাস লাগে না। কেবল জ্বলজ্বলে চোখে তাকালেই সে রোগের জীবাণু অপর পাশের মানুষটাকে আয়ত্ত্বে নিয়ে নেয়। যেমন নিয়েছে ফাবিহাকে।
“তুই কী করতে বলিস?”
“তোমার যেমন ইচ্ছে হবে তাই। আমার নিজের কোনো কথা নেই বাবা। তোমার স্বপ্ন পূরণ হলেই আমি খুশি! আমাকে অটোগ্রাফ দেবে তো?” ফাবিহা চোখের স্বপ্নের হাতছানি ফরিদের তৃষ্ণার্ত বুকে ঘাই মেরে গেল।
ফরিদের গলার কাছে একটা দলা পাকানো দুঃখ পথরোধ করে বসে থাকে। না নিচে নামে নাই বা বেরিয়ে আসে। কেবল ভেতরটা অস্থির করে তোলে। এ সবই সত্যি! এমন স্বপ্ন স্বপ্ন বাস্তবে তিনি বাস করছেন! বিশ্বাস হতে চায় না!
—
পরিসরে ছোট, তবে চমৎকার সাজানো গোছানো জায়গা। মেয়েটা তাকে দেখে এমন খুশি হয়েছে যে ফাবিহার এখন লজ্জাই লাগছে। তার চেয়ে তিন বছরের সিনিয়র। তাকে বলল, “তুমি খোঁজ পেলে কোত্থেকে বলো তো?”
ফাবিহা বলল, “পেপারের সাথে একটা লিফলেট পেয়েছিলাম আপু।”
মেয়েটার ভুরু কুঁচকে এলো, “পেপারের সাথে তো দিইনি! আচ্ছা যাক, যেভাবেই পেয়েছ, পেয়েছ তো! তুমি কিন্তু ওদের টাইপিং শিখিয়ে একেবারে ঝানু বানিয়ে ফেলবে। ঠিকাছে?”
ফাবিহা উপর নিচে মাথা নাড়ল। তার টাইপিং স্পিড শেষ রেকর্ড অনুযায়ী ছিল মিনিটে একশ এক শব্দ। মাঝে অনেকগুলো দিন কেটে গেছে, কম্পিউটার ছোঁয়ার সুযোগ, প্রয়োজন কোনোটাই হয়নি। এখন কী অবস্থা কে জানে!
ফরিদ পাশ থেকে বললেন, “কেমন সময় দিতে হবে মা?”
তাদের চা পরিবেশন করা হয়েছিল। এ যাত্রায় দুটো প্যাটিস এনে মেয়েটা বসল। ফাবিহার দিকে তাকিয়ে বলল, “তিন ঘণ্টা সময় দিতে পারবে না?”
“ইনশাআল্লাহ, পারব আপু।”
“কখন হলে সুবিধা হয় তোমার?”
“তিনটার ভেতর সব ক্লাস শেষ হয়ে যায়। এরপর হলে ভালো হয়।”
“আচ্ছা। তাই হবে। ওদের টাইম অবশ্য আরেকটু আগে। আমি পিছিয়ে দেব, সমস্যা নেই।” তার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হলো ফাবিহা।
ফরিদ আস্তে করে বললেন, “বাড়ি যেতে যেতে সাড়ে ছয়টা বেজে যাবে। এখন তো ছয়টার সময়ই সন্ধ্যা নেমে যায়!”
ফাবিহাও তার মতো নিচু কণ্ঠেই বলল, “চিন্তা কীসের! তুমি নিতে আসবা। আমি একা যেতে পারব না।”
ফরিদ ভাবলেন সেই ভালো হবে। তিনি নিজেও ঘরে বসে থেকে থেকে বিরক্ত।
টুকটাক আলাপ শেষে তার টাইপিং দেখল মেয়েটা। স্পিড একটু কমেছে, মিনিটে সাতানব্বই শব্দ। মাইক্রোসফটের কাজ কতটুকু পারে সেটাও দেখল। ফাবিহা নিজেও বহুদিন পর নিজেকে আবিষ্কার করছিল। মন্দ লাগছিল না তার। পাশেই মেয়েটার ঝলমলে মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল সে যতখানি চেয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশিই পেয়েছ।
চাকরি নিশ্চিত করে তারা ফিরতি পথ ধরল। কেবল একটা সিঁড়ি পেরিয়েছে সে সময় মেয়েটা প্রায় ছুটে এসে ফাবিহার হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিল, “তোমার অ্যাডভান্স অনারিয়াম। আশা করছি তোমাকে অনেক সিনসিয়ার হিসেবেই পাবো।”
“ইনশাআল্লাহ আপু!” ফাবিহার গলা কাঁপছিল। বাবার দিকে তাকাতেই দেখল বাবা কেমন হাসি হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। খুশিতে ফাবিহার কাঁদতে ইচ্ছে হলো। শক্ত করে ফরিদের হাত জড়িয়ে ধরল সে। মনে পড়ল, দুদিন আগে মায়ের পা জড়িয়ে ধরে সে হাউমাউ করে কেঁদেছিল। ওরকম বুক ফাঁটানো কান্না বহুদিন কাঁদেনি সে। অথচ আজকের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত!
বিকেলের রোদ মরে আসছে। ফাবিহার ইচ্ছে করছিল বাবার সাথে কিছু টাকা খরচ করতে। রেস্টুরেন্টে খাওয়ার চিন্তা মাথায় এলেও বাদ দিয়ে দিলো সে। সাথে আম্মু নেই। তারচেয়ে অন্য কিছু করে যাক। ভাবতে ভাবতে চোখ পড়ল বাবার চশমায়। ফ্রেমের একপাশে যে ছোট্ট করে সুতো বাঁধা এটা ভালো করে খেয়াল না করলে বোঝা যায় না। তৎক্ষণাৎ কার্যকরণ ঠিক করে ফেলল সে।
ফরিদ রিকশা নিতে গেলে সে আটকে ফেলল।
“কতদিন একটু ঘুরি না বাবা! চলো একটু ঘুরে আসি!”
“এখন কোথায় ঘুরতে যাবি?”
“এই এখানেই। আসো না!”
কলেজের বিপরীত দিকেই অসংখ্য চশমার দোকান। ফাবিহা সেদিকেই গেলো। ফরিদের চোখ গেলো কলেজ গেটে। হুড়মুড় করে ছাত্রছাত্রী ঢুকছে, বেরুচ্ছে। ওদের ছুটোছুটি করতে দেখে ঝট করেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন তিনি। সংবিৎ ফিরতেই দেখলেন ফাবিহা তাকে নিয়ে ঝকঝকে চশমার দোকানে দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি অবাক হয়ে বললেন, “এটা আবার কেমন ঘোরার জায়গা!”
“এমনই!” ঝকঝকে হাসল ফাবিহা। ডিসপ্লেতে সাজানো একটা চশমার ফ্রেম দেখিয়ে বলল, “দেখো বাবা, এটা সুন্দর না?”
তিনি চিন্তিত হয়ে বললেন, “তোর এখনই চশমা কেন লাগবে? রাতে না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এই অকাজটা করেছিস। কোনো কথা শুনবি না, নিয়ম মানবি না! গেলো তো চোখ দুটো! দেখি এদিকে দেখ তো! আমার কপালের কাটা দাগটা দেখতে পাচ্ছিস?”
ফাবিহা মিটমিট করে হাসল। দোকানিকে ওটা বের করার ইশারা দিয়ে চোখমুখ কুঁচকে এমনভাবে তাকালো, যেন সে মোটেই কোনো কাটা দাগ-টাগ খুঁজে পাচ্ছে না। চোখ খানিকক্ষণ মোছামুছি করে হতাশ কণ্ঠে বলল, “থাক বাদ দাও বাবা। বয়স হয়ে গেছে!”
ফরিদ আহমেদ চোখ কপালে তুলে বললেন, “বয়স হয়েছে মানে কী! তোর বিয়ে দিলাম না, নানা হলাম না, বয়স আমারই হলো না আর তোর হয়ে গেছে? চোখে সমস্যা হয়েছে ডাক্তারের কাছে না যাবি! ঠাস করে দোকানে চলে আসলি কী মনে করে? ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া কই থেকে শিখেছিস?”
তার অনবরত কথার মাঝেই ফাবিহা তার চশমা খুলে নিল। সেটা দোকানিকে হস্তান্তর করতেই তিনি ফ্রেম পরিবর্তনের কাজে লেগে পড়লেন। ফরিদ আহমেদ বললেন, “আমারটা নিয়ে টানাটানি কেন…” বলতে বলতেই ঘটনা বুঝে স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি। মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলেন সে ঠিক নূরজাহানের মতো করে হাসছে। চোখ দুটো ছোট ছোট করে দুনিয়া ভোলানো হাসি।
খানিক আগে ফরিদ আহমেদের নেয়া সিদ্ধান্ত আরও পাকাপোক্ত হলো।
রিমলেস চশমা পরে বের হয়ে প্রথমেই আবার কলেজটা দেখলেন তিনি। মেয়েকে বললেন, “সাকিন এখানকার টিচার জানিস?”
“সাকিন কে?” ভুরু কুঁচকে বলল ফাবিহা।
“সাবিহার ভাই। চিনিস না?”
ফাবিহার কপালের ভাঁজ আরও গাঢ় হলো, “সিমি যে বলল তার নাম নাকি যজম?” বলতে বলতেই ঘটনা বুঝে তারা দুজনেই হেসে ফেললো।
বাড়ি ফিরে ফোন অন করতেই দেখল প্রায় দুই ঘণ্টা আগে সেই শাড়ির পেইজ থেকে মেসেজ এসেছে। ভদ্রমহিলা ডায়েরি হতে পেয়েছেন এবং তার অসম্ভব পছন্দও হয়েছে। পেমেন্ট করার নাম্বার চেয়ে তিনি কী অফার দেবেন সেটার একটা ডেমো পোস্টও দেখালেন। ফাবিহা আর অবাক হলো না। সে জীবনের প্যাটার্ন খানিকটা হলেও বুঝে ফেলেছে। ধীর-স্থির ভঙ্গিতে জবাব দিল। ডায়েরির দাম জানালো পাঁচশ। মহিলা তর্কে গেলেন না, হাতে তৈরি জিনিসের দাম যে বেশি এটা তার চেয়ে ভালো আর কে জানতে পারে!
তৎক্ষণাৎ কম্বো অফার পোস্ট দিয়ে দিলেন তিনি। সেটার লিংক ফাবিহাকে দিতে দিতেই একটা অর্ডার কনফার্ম হয়ে গেলো। অথচ তখনও পোস্টে একটাও রিয়্যাক্ট পড়েনি। পরবর্তী দুই ঘণ্টার মাঝে পোস্টটা মোটামুটি ভাইরাল হয়ে গেলো। রিয়্যাক্ট এলো দুই হাজার দুশো, রিচ পেলো এক লাখ ছেচল্লিশ হাজার। বিকেলের রক্ত রঙের রোদের মাঝে তার পেইজের সর্বাধিক বিক্রিত গোলাপী শাড়িটা স্বর্গীয় রং ধারণ করেছিল। শাড়ির আঁচলে বিছিয়ে দেয়া ডায়েরিটা সে সবটুকু রং নিজের করে দশ বাই বারো ইঞ্চির মাঝেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হলো। ফলাফল হলো এই যে, সে রাত ফুরোনোর আগে দু হাজার টাকার কম্বো অফার চল্লিশটা কনফার্ম হয়ে গেলো। মেসেজটা দেখে বহুক্ষণ চুপ করে শুয়ে থাকল ফাবিহা। যে চল্লিশ দিয়ে শুরু, সেই চল্লিশেই আবার ফেরত। নিজের ডায়েরিটা সে টেনে নিল খুব যত্ন করে। এশার আজান শেষ হতেই কলম ধরল।
“ফাবিহা,
জীবনের কবিতার মাত্রাকে যে চিনতে পেরেছে, তার কাছে দুঃখ একটা শ্লোক ব্যতীত আর কিছুই নয়। জাহির করার জন্য নয়, স্বীকার করার জন্য বলি, আমি বোধহয় সে মাত্রার ধরন কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারছি।
জীবন নামক এই কবিতাকে বরং স্বরবৃত্ত মাত্রার দলভুক্ত করা যেতে পারে। যেখানে মুক্ত দলের মাত্রাও এক, বদ্ধ দলের মাত্রাও এক। মুক্তকে যদি সুখ ধরি আর বদ্ধকে ধরি দুঃখ, তবে এই সমান সমান হিসেবটা মূলত সুখ-দুঃখের। একটার পর আরেকটা আসবে, আসতেই হবে। সমান মাত্রা নিয়ে, সমান হিসেব নিয়ে। সূরা আল ইনশিরাহ পড়েছিলাম যখন, সেখানেও আল্লাহ বলেছিলেন নিশ্চয়ই কষ্টের পরই আছে স্বস্তি। খুব অবাক হয়েছিলাম একই আয়াত পরপর দুইবার দেখে। আল্লাহ তো অকারণ কোনো কিছু বলেন না। দুবার যেহেতু একই আয়াত বলেছেন, তার গুরুত্ব কতখানি বুঝতে কষ্ট হয়নি।
ফাবিহা, এই যে তোমার জীবনে নিত্য নতুন ভিন্ন ঘটনা ঘটছে এটা সেই স্বরবৃত্ত কবিতারই একেকটা ছন্দ, একেকটা মাত্রা। তাতে উদ্বেলিত হলে বরং নিজেকে ভুলে যাওয়া হবে। তার চেয়ে একটা পূর্বাভাস নেয়া যেতে পারে। জীবনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস। আজ ঝলমলে রোদ মানেই কাছেপিঠে ঘনঘোর বর্ষা আছে। সে বর্ষার শেষে যে আবার সূর্য হাসবে এটাও আল্লাহ নিশ্চিত করেছেন। কাজেই, হতাশ বা অহংকারী—কোনোটাই হওয়া চলে না।
পুনশ্চ: উপর একটা ভুল করেছি। সুখকে মুক্ত দল ধরা উচিত হয়নি। এটা দুঃখের প্রাপ্য। দুঃখ পেলেই মানুষ মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারে। সুখের এসব মানুষকে একটা বদ্ধ গণ্ডিতে আটকে দেয়। কাজেই, স্বরবৃত্ত মাত্রার এ জীবন কবিতায় দুঃখকে আমি মুক্ত মাত্রায় ফেললাম, আর সুখকে দিলাম বদ্ধ মাত্রা।”
সেদিন এশার নামাজে ফাবিহা পুরো ছয় রাকাতই সূরা আল ইনশিরাহ দিয়ে পড়ল, শুধু এক রাকাত পড়ল ইখলাসের সথে। দুঃখ-সুখের নাগরদোলায় ভাসতে থাকা মেয়েটা কবিতার শ্লোক পড়েই বুকে স্বর্গ অনুভব করল। সে জানত না সেই শ্লোকের কিছু পাদটীকাও ছিল। পরপর দুবার এই একই আয়াত আসার আরও একটি অসাধারণ কারণ আছে।
আরবি ব্যাকরণের চমৎকার নিয়মের একটি হলো, অনির্দিষ্ট শব্দ পরপর দুবার ব্যবহৃত হলে তা দুটি ভিন্ন ভিন্ন বস্তুকে বোঝায়। কিন্তু পরপর দুটি নির্দিষ্ট শব্দ কেবল একটি জিনিসের দিকেই ইঙ্গিত করে।
সূরা আল ইনশিরাহের পাঁচ এবং ছয় নম্বর আয়াতে ঠিক এই ঘটনাটাই ঘটেছে। দুঃখের আরবী শব্দ উসরি’র সাথে দুবারই আল ব্যবহার করে দুঃখকে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ দুঃখ কেবল একটিই। অথচ সুখের আরবী ইউসরন এসেছে আল ছাড়া, অনির্দিষ্টভাবে। ফলাফল দাঁড়ায়, একটি নির্দিষ্ট কষ্টের সাথে প্রতিবারই দুটি অনির্দিষ্ট সুখ থাকবে। থাকতেই হবে। নির্দিষ্ট দুঃখটা আয়াতে আগে এসেছে, পেছনে এনেছে অনির্দিষ্ট উৎস থেকে দু দুটি সুখের আগাম বার্তা।
এই নিয়মের ওপর ভিত্তি করেই রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন:
“একটি কষ্ট কখনোই দুটি স্বস্তির ওপর প্রবল হতে পারবে না।” (তাফসির ইবনে কাসীর)
একটি দুঃখের ভাটা দুটি সুখের জোয়ারে স্তিমিত হয়ে যায় চির সত্য সে নিয়মে।
ইবনে কাসীর একই আয়াতের তাফসিরে ইবনে মাসউদ (রা.)-এর একটি বিখ্যাত উক্তি উল্লেখ করেছেন:
“কষ্ট বা বিপদ যদি কোনো গুঁই সাপের গর্তের মতো চরম সংকীর্ণ জায়গাআরও ভেতরেও ঢুকে বসে থাকে, তবে স্বস্তি বা সহজতাও তার পিছু পিছু সেই গর্তে গিয়ে প্রবেশ করবে এবং তাকে বের করে নিয়ে আসবে। কারণ আল্লাহ বলেছেন— নিশ্চয় কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে...।”
ফাবিহা যদি আয়াতের এই মারপ্যাঁচ উদ্ধার করতে পারত, তবে বোধহয় তার বুকের ঢাক ঢাক গুড় গুড় এই আনন্দটা কোনোভাবেই সংযত করতে পারত না। তার বুকের স্বর্গ নেমে আসতো ধুলো মাটির এই পৃথিবীতে।
*****
বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাকিনের সন্ধ্যা হলো। দূর থেকেই সিমিকে দেখে চিনতে পারল। রিকশা থেকে কী যেন নিয়ে ছোটাছুটি করছে। সে ভেতরে যেতেই সম্ভবত ফাবিহা এলো। ওকে সামনাসামনি তেমন একটা দেখেনি বলে মুখটা চেনা নয়। তারপর আবার সিমি। আরেকজনের ঘরের বিষয়াদি নিয়ে বিরক্ত লাগা উচিত নয়, তবুও সাকিনের বিরক্ত লাগে। একটা সুস্থ-সবল ছেলে ঘরে বসে থেকে শরীরে জং ধরাচ্ছে আর পরিবারের বাকি সদস্যরা শরীর খুঁইয়ে জীবনটা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছে। সে কাছাকাছি যাওয়ার আগেই তাদের মালামাল নামানো হয়ে গেলো।
ধীরে-সুস্থে উপরে উঠল সাকিন। এক গ্লাস পানি খেলো। পকেট থেকে পাঁচ হাজার টাকা বের করে সাবিহাকে খুঁজল। সে ছাদে জেনে ওদিকেই গেলো। রিফাত ছাদে ছুটোছুটি করছে, আর তার পেছনে সাবিহা।
“সাবিহা, এদিকে আয়।”
সাবিহা এগিয়ে আসতেই তার হাতের মুঠিতে পাঁচ হাজার টাকা গুঁজে দিল সাকিন। সাবিহা অবাক হয়ে বলল, “কীসের টাকা?”
“রাখ।”
“রাখব, আগে বল কীসের টাকা।”
“আমি দিলাম এজন্যই রাখ। এত প্রশ্ন করছিস কেন?”
ধীরে ধীরে সাবিহার মুখটা লাল হয়ে এলো। রুদ্ধ কণ্ঠে সে বলল, “তুই কি বাড়ি ভাড়া দিচ্ছিস?”
সাকিন একটুও বিব্রত না হয়ে বনের মাথায় হাত রাখল। আদুরে কণ্ঠে বলল, “সাবিহা বুড়ি রেগে যাচ্ছ কেন?”
“ঢং করবি না!” হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিলো সাবিহা। “বাড়ি ভাড়া দিয়েছিস কি না সেটা বল!”
“সাবিহা, সব কিছুর একটা সৌন্দর্য আছে। মেহমানের সৌন্দর্য অল্প বেড়ানোয়। তার বেড়ানোটা দীর্ঘস্থায়ী হলে সেটা সৌন্দর্য হারায়। না চাইতেও মনে কিছু তিক্ততা জন্ম নেয়া অস্বাভাবিক কিছু না। বরং এটাই হয়, নয়তো ভাব, বিয়ের পর মেয়েরা বাপের বাড়ি বেশি থাকলে সেটা দেখতে এবং আসলেই খারাপ দেখায় কেন?”
“ক্লাস তো নিস কেমিস্ট্রি, আমাকে ভূগোল বোঝাচ্ছিস কেন!” সাবিহা খেঁকিয়ে উঠল।
সাকিন হেসে বলল, “রাগ করিস না। আমি চাই আমাদের মাঝে যেন ভুল করেও কখনও তিক্ততা না আসে। সুযোগ দিলে সে আসবেই, সেই সুযোগটাই আমরা দেব কেন? তুই এটা রাখ। নয়তো আমাকে সফর ছোট করতে হবে।”
সাবিহা আগুন চোখে তাকালো। পারলে চোখ দিয়েই ভাইকে ভস্ম করে দিত। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “এই জারিজুরি বউয়ের কাছে কীভাবে খতম হয়ে যায় সেটা আমিও দেখবে। দেখে দেখে শোনাবো, সফর ছোট করতে হবে!” মুখ ভেংচি দিয়ে বলল সাবিহা। সাকিন হেসে ফেলল।
সে সময় নিচ থেকে চিৎকার ভেসে এলো, “সিমি! ভালো মানুষের মতো আয়, নাহলে তোর হাড্ডি কিন্তু এর আস্ত থাকবে না!” নূরজাহানের কণ্ঠ।
সাবিহা এগিয়ে যেতে দেখল সিমি বাড়ির পেছনে টিকটিকির সাথে ছুটে বেড়াচ্ছে। টিকটিকি নামটা রেখেই সে ক্ষান্ত হয়নি, প্রতিষ্ঠিতও করেছে। অদ্ভুতভাবে বাড়ির সকলেই এই বিড়ালকে টিকটিকি বলে ডাকে, এমনকি হীরা চৌধুরীও।
সাবিহা রিফাতকে কোলে নিয়ে ভুরু কুঁচকে বলল, “মেয়েটার সাথে চাচী মাঝে মাঝেই এমন করে।”
সেই ক্ষণে নূরজাহানকে বের হতে দেখে সিমি ছুট্টে ঘরে ঢুকে গেলো।
সাকিন শান্ত কন্ঠে বলল, “সিমি যদি চাচীর নিজের মেয়ে হতো, তাহলে কিন্তু তুই এভাবে ভাবতি না।”
“মানে?”
“এই ধমকটা খুব স্বাভাবিকভাবে নিতি।”
“কাজের মেয়েকে যখন তখন বকাঝকা করে, এটা স্বাভাবিকভাবে নেয়ার বিষয়?”
“শ্রেণীভেদটা করছিস বলে বিষয়টা গায়ে লাগছে। সিমি কিন্তু করে না, আর করে না বলেই তোর বেশি টাকার অফারের দিকে ভ্রুক্ষেপও না করে ওই বকাঝকা শোনার জন্যই ওখানে থেকে গেছে।”
সাবিহা তবুও ভুরু কুঁচকে নিচে টিকটিকির দিকে তাকিয়ে রইলো।
সাকিন বলল, “প্রতিদিনই সিমি এই সন্ধ্যা বেলায় টিকটিকির সাথে খেলতে বের হয়। চাচী প্রতিদিনই বকাঝকা করেন, কেন এই সন্ধ্যা করে বের হয়। নিজের মেয়ে হলে এটা হতো চিন্তা, পরের মেয়ে বলে সেটা হয়ে গেল অত্যাচার।”
সাবিহার কপালের ভাঁজ এক নিমিষে সমান হয়ে গেলো। সে অবাক হলো, তার নির্লিপ্ত ভাই চুপ থেকেও সবকিছু এভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে দেখে।
—
ফাবিহার খোঁজ খবর নেয়া শেষ হলে দুরুদুরু বুকে লি প্রকাশনীকে উত্তর দিলেন ফরিদ। জানালেন তিনি পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। জানানোর ঘণ্টাখানেকের মাথাতেই উত্তর এলো, তারা ফরিদ আহমেদের সাথে সশরীরে দেখা করতে চায়। ‘নওরোজ’ এর ডায়েরিটা বুকে চেপে সায় দিলেন ফরিদ। এই দুঃখ-ক্লেশের সাগরেও কীভাবে এমন সুখের ঢেউ বইছে তিনি বুঝে উঠতে পারেন না।
চলমান~
(ভেবেছিলাম ত্রিশ পর্বের মাঝে শেষ হবে। কিন্তু কোনো নাম-নিশানাই তো দেখছি না 🙂)