#বনজোছনা
২৮.
ভোরের আলো তখনও ফোঁটেনি। আকাশ থেকে ক্রমেই আধারের চাদর সরে সরে যাচ্ছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে রাত ফুরোনোর ঘ্রাণ। খুব কাছেই কোথাও বৃষ্টি হয়েছিল। তার জোলো হাওয়া বয়ে নিয়ে এসেছে সজীবতার সুর। সিমি ঘড়ি দেখল। আর পনের মিনিট যাক।
পনের মিনিট গেলো আরো দুবার। কিন্তু ছোট আপার মুখের সামনে থেকে এসে ঘুরে যাচ্ছে সে। গায়ে হাত দিচ্ছে, মনে মনে বলছে, ছোট আপা! উঠুন! উঠুন! কিন্তু ওই রাত জাগা ক্লান্তি লেপ্টে থাকা চেহারার দিকে তাকিয়ে সে আওয়াজ গলা থেকে বের করতে পারছে না।
গতকাল সারারাত ধরে ডায়েরির কাজ করেছে ফাবিহা। বিশটা ডায়েরির কাজ গুছিয়ে একেবারে ফজর পড়ে সাড়ে চারটার পর ঘুমিয়েছে। মাত্র দেড় ঘণ্টা হলো। অথচ সিমির মাথার কাছে চিরকুটে স্পষ্ট লিখে রেখেছে, “ঠিক ছয়টায় ডাক দিবি সিমি! এক মিনিট এদিক ওদিক হলে তোর খবর খারাপ আছে!”
নামাজ পড়ার পর সিমি এই চিরকুট দেখেছে। খবর খারাপ নিয়ে তার মনে কোনো ভয় নেই। ছোট আপা কোনোদিন কারো খবর খারাপ করতে পারে না। খারাপ হয় কেবল তার নিজের খবর।
সিমি আর কোনো চিন্তা করল না। দেড় ঘন্টা ঘুমিয়ে কেউ বাঁচতে পারে না। আপনি বাঁচলেই বাপের নাম। কাজেই ছোট আপার উচিত আরো এক ঘন্টা ঘুমানো। সিদ্ধান্ত নিয়ে সে ছুটে বাইরে উঠানে চলে এলো। পুরো উঠান জুড়ে ছোট ছোট ঘাস। সে ঘাস শিশির জমিয়েছে জীবনের একমাত্র সম্বলের মতো, পাতার সবটুকু দিয়ে। অথচ নিষ্ঠুর শিশির, এক পল থেকেই সে বিদায় নিচ্ছে। টুপ টুপ করে ঝরে পড়ছে মাটির গায়ে। হারিয়ে যাচ্ছে এমনভাবে, যেন কখনো ছিলই না। মাটিতে বসে হাতে একটু শিশির নিলো সে। ভোরের গায়ে কুয়াশার ছাপ মাখানো। শীতের আর দেরি নেই। মিনিটের মাথায় কোত্থেকে টিকটিকি ছুটে এলো। দূর ছাই করলেও এটা সিমির গায়ে ঘেঁষে থাকে। বেশি ঘেঁষাঘেঁষি করে খালুর সাথে। খালু আশকারা দিয়ে দিয়ে এই অবস্থা করেছে। একটা ধাক্কা দিতে যাবে সিমি—ঠিক সেই ক্ষণে দরজায় শব্দ হলো। সাকিন বাড়িতে ঢুকছে। সিমি হাত গুটিয়ে নিলো।
সাকিন এগিয়ে এসে বলল, “কেমন আছো, সিমি?”
“ভালো আছি ভাইয়া। আপনি কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছি।”
“ফরিদ চাচা কেমন আছে?”
“খালু তো এখন অনেক ভালো আছে!” উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল সিমি।
“কেন?”
“খালুর বই বের হবে!”
“তাই নাকি!” সাকিন অবাক হলো।
“জি। আপনি জানেন না?”
“না, জানি না তো।”
সিমির টনক নড়ল। বিষয়টা কি গোপন ছিল? সে ফাঁস করে দিল!
আমতা আমতা করে বলল, “খালু মনে হয় আপনাকে বলবে। আমি মজাটা নষ্ট করে দিলাম। আপনি কিন্তু বইলেন না আমি যে বলে দিয়েছি। খালুর কাছে শুনে এমন ভাব করবেন যেন এই প্রথম শুনলেন। এখন যেমন করলেন তেমন। করবেন ভাইয়া?” সিমি কাতর চোখে তাকালো।
সাকিন হেসে বলল, “কেন? এটা মিথ্যা হবে না?”
“মিথ্যা হবে কেন? খালুর কাছে তো প্রথমই শুনবেন। একটা মানুষের মন ভালো করার জন্য একটু অবাক হতে পারবেন না?”
সাকিন একটু এগিয়ে এসে টিকটিকির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। বলল, “আমি খুশি হলেই চাচা খুশি হয়ে যাবে?”
সিমি টিকটিকির দিকে তাকালো। সে তার পায়ে মাথা ঘষছে। ওটাকে সরিয়ে দিতে দিতে বলল, “খালু যাদের ভালোবাসে তাদের নিজের কথা বলতে খুব আনন্দ পায়। ওরা যদি একটু খুশি হয় তাহলে খালু আরও খুশি হয়। সাকিন ভাই, খালুর মতো মানুষ দুনিয়ায় খুব কম আছে। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, গাছ থেকে যদি একটা পাতা ছিঁড়ে এনে বলি— খালু, এটা আপনার জন্য এনেছি— তাহলেই খালু খুশি হয়ে যাবে। ছোট বাচ্চাদের মতো একটু কিছু পেলেই খুশি। এই জন্যই মনে হয় এই মানুষটার জীবনে খুশির ঘটনা খুব কম। বেশি খুশি আবার সহ্য হয় কি না…” সিমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার দিকে গাঢ় চোখে তাকালো সাকিন। অজান্তেই ভেতরে একটা শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নিল।
শান্ত কণ্ঠে সে বলল, “তোমার খালু আমাকে ভালোবাসে?”
“খালু সবাইকেই ভালোবাসতে চায়। কিন্তু সবাই তো খালুর ভালোবাসা চায় না। সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে ছোট আপাকে, চাচীকে, ফারদিন ভাইকে। আমাকেও ভালোবাসে। কিন্তু দেখেন, আমি একটা কাজের মানুষ, আমাকে যেই লোকটা ভালোবাসে তার ভালোবাসাটা নিজের ছেলে, ফারদিন ভাইই বোঝে না। মাঝে মাঝে মনটা চায়, এক কেজি শুকনা মরিচ দিয়ে তরকারি রান্না করে ফারদিন ভাইকে খাওয়ায় দেই!” দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বলেই তার হুশ ফিরল। মাথা উঁচু করে দেখল সাকিন হাসছে।
বিব্রত কণ্ঠে সে বলল, “মনেই হয় শুধু। করব না তাই বলে।”
সাকিন সিঁড়িঘরে ঢুকে পড়ল। যেতে যেতে বলল, “চাচার সামনে আমি বইয়ের কথাটা নতুন করেই শুনব সিমি। চিন্তা নেই।”
সাতটার দিকে ঘরে ঢুকে সিমি আস্তে করে ফাবিহাকে ডাকল। ফাবিহা দুচোখ টেনে খুলতে পারছিল না। সিমি ফিসফিস করে বলল, “ছোট আপা, খবরটা খারাপ করতে আসছি।”
ঘুম ঘুম কণ্ঠে ফাবিহা বলল, “কী বলিস সিমি!”
“উঠবেন না ছোট আপা! সাতটা পনের বাজে।”
ফাবিহা তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে বসল। বসতেই মাথাটা জোরে চক্কর দিয়ে উঠল। সিমি বিরক্ত হয়ে বলল, “এমন লাফালাফি করেন কেন?”
“তোকে ছয়টায় ডাক দিতে বলেছিলাম না!” ফাবিহা দুর্বল কণ্ঠে বলল।
“কতবার ডাক দিলাম! আপনি শুনলে তো!” মনে মনে কম ডাক তো দেয়নি— ভাবল সিমি।
ফাবিহা আস্তে-ধীরে উঠে ঘণ্টাখানেক একটু পড়াশোনা করল। পড়তে পড়তে হঠাৎ করে মনে হলো শুধু ডায়েরি দিয়ে বেশিদিন চলা যাবে না। কী করা যায়? কী করা যায়?
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করে জার্নালের কথা মাথায় এলো। ইদানীং মানুষ খুব জার্নালের ফ্যান হয়েছে। যেকোনো বিষয় উপভোগ করার চাইতে তার স্মৃতি তৈরিতে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠেছে। সে কি উপরের কভারের ধরন কিছু বদলে জার্নাল লঞ্চ করতে পারে না? ভাবনাটা খাতার এক কোণে টুকে রাখল।
টেবিলের পুরোটা ডায়েরির বানানোর সরঞ্জাম দিয়ে ভরে গেছে। শুরুতে এটা সেটা দিয়ে কাজ করলেও বড় পরিসরের কাজগুলো আর যেভাবে সেভাবে করা যাচ্ছিল না। ফলে অনেককিছু নতুন করে কিনতে হয়েছে। টাকার কথা মনে হতে ঝট করে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকালো সে। কোন মাসের দুই তারিখ হয়ে গেছে! বাড়ি ভাড়ার কথা তো বেমালুম ভুলে বসে ছিল! অথচ ছয় হাজার টাকা রেখেছিলে একটা কিস্তি দেয়ার জন্য। কী করবে বুঝতে পারছিল না সে।
এ বাড়িতে তারা নতুন এসেছে। শুরুতেই ভাড়া দিতে দেরি হলে ইমেজ খারাপ হয়ে যাবে। অবশ্য ইতোমধ্যেই যে কিছু হয়নি তা নয়। তবে ভাড়া দিতে অনিয়ম করলে সাবিহা আপাও আর কতদিন সহ্য করবে! আর ওসব কিস্তিতে তো আগে-পরে কথা শুনতেই হচ্ছে। ফাবিহা সিদ্ধান্ত নিলো, বাড়ি ভাড়াটাই আগে দেবে।
ভার্সিটিতে যাওয়ার আগে গত মাসের ভাড়াটা বুঝিয়ে দিলো সে। সাবিহা নিজে অবশ্য নিলো না। কোনো এক বিচিত্র কারণে হীরা চৌধুরীর কাছে পাঠিয়ে দিল। লোকটাকে একটু ভয়ই পায় ফাবিহা। চোখ-মুখ সবসময় কেমন কঠিন করে থাকে। চেহারার এমন আবহাওয়া দেখে ফাবিহা অভ্যস্ত নয়। ফরিদ আজীবনই তরল মানুষ। দুরুদুরু বুকে টাকাটা দিয়েই চলে এলো সে। যাবার সময় ভাবল বাবাকে একবার বলে যায়, কিস্তির লোকগুলোর সাথে যেন একটু ফোনে কথা বলে। ওদের আসারও মাস পেরুতে চলল। কোনো টাকা দেয়া হলো না। ঋণ বোধহয় বেড়ে-টেড়ে আবার চার লাখ হয়ে গেছে।
কিন্তু ফরিদ আহমেদের ঝলমলে মুখটা দেখে কথাটা বলতে পারল না ফাবিহা। তিনি উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে মেয়েকে প্রুফ দেখাচ্ছেন। ঘষামাজা করে কী যোগ-বিয়োগ করলেন সেসব দেখাচ্ছেন। ফাবিহা হাড়ে হাড়ে টের পেলো নূরজাহান কেন সুদের পর সুদে ঋণ নিয়েছেন, কেন সে কথাগুলো দিনে পর দিন চেপে রেখেছেন, কাউকে বলার সাহস করতে পারেননি। ফাবিহা দুশ্চিন্তা করতে করতে ভার্সিটিতে চলে গেল।
*****
ঘড়ির দিকে তাকালো সাকিন। আর চার মিনিট পর লেগুনা পরবর্তী স্ট্যান্ডে থামবে। সেখানেই সেই ভদ্রলোক উঠবেন, যার অনবরত বকবকানি শুনতে শুনতে পুরো লেগুনার মানুষ অতিষ্ট হয়ে যায়। সেদিন তো একজন ধমক দিয়েই ফেললেন, “কী সমস্যা ভাই! কথা শুরু করছেন তো করছেনই! থামার নামই নাই। গাড়িতে তো লোকজন আরও আছে! একটু পর কথা বললে কী সমস্যা?”
ভদ্রলোক বিব্রত চেহারায় ফোন রেখেছিলেন বটে। তবে পরদিন আবার যেই কে সেই। ফের সে একই রেকর্ড। বিরক্ত হয়ে কেউ আর কিছু বলেইনি।
নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডে লেগুনা থামার পর তিনি উঠলেন, বসলেন ঠিক সাকিনের পাশে। তবে অবাক করা কান্ড, আজ তার কানে ফোন নেই। সাকিন ভাবল একটু পরই বোধহয় ফোন বের করবে।
তার ধারণাকে সত্যি করে দিয়ে লোকটা ফোন বের করল। কিন্তু সাকিন স্পষ্ট দেখতে পেল, কাউকে ফোন না দিয়েই কানে ধরে সে বলতে শুরু করেছে, “আমার আম্মা কী করে? খাইছো মা? আম্মু বকা দিছে? আচ্ছা দাঁড়াও, আমি আসি বাড়ি! তার হচ্ছে!”
সাকিন লোকটার দিকে তাকালো। চোখ দুটো ভয়াবহ রকমের লাল। একবার জিজ্ঞেস করতে চাইলো অসুস্থ কি না। কিন্তু তার কথার তোড়ে সে সুযোগ পেলো না।
নেমে যাওয়ার একটু আগে, লোকটা হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। পুরো লেগুনার সবাই বিস্মিত হয়ে তাকালো তার দিকে। এমন কি সামনে থেকে চালক লোকটাও বার দুই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছে। কৌতূহল নিবারণ করতে পারেনি।
সাকিন বলল, “কী হয়েছে ভাই?”
লোকটা অস্পষ্ট কণ্ঠে বলল, “আপনাদের অনেক বিরক্ত করছি। কিছু মনে নিয়েন না। কালকে থেকে আর বিরক্ত করব না।”
যে লোকটা সেদিন ধমক দিয়েছিলেন, তিনি বললেন, “বদলি হইছেন? কান্নাকাটির কী আছে?”
ভদ্রলোক চোখ মোছার ব্যর্থ চেষ্টা করল। বর্ষণ তার মতো ঝরে গেলো। ধরা কণ্ঠে বলল, “বদলি আমি হই নাই। আমার ছোট মেয়েটা হইছে। আল্লাহ তারে এই দুনিয়া থেকে ঐ দুনিয়ায় বদলি করে দিছে।”
পুরো লেগুনায় এক গুমোট নীরবতা নেমে এলো। চালক একবার তাকিয়ে আর তাকাল না। কিছুক্ষণের মাঝেই তার গন্তব্য চলে এলে সে নেমে গেল। সাকিনের কী যে হলো! সে নিজেও লোকটার পিছু পিছু নেমে পড়ল। অথচ তার কলেজে যেতে আরও বিশ মিনিট দরকার।
লোকটা হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে হেঁটে চলেছে। সাকিন পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “মেয়েটার কী হয়েছিল ভাই?”
কে জিজ্ঞেস করছে তাতে তার কোনো বিকার নেই। তার ছোট আম্মার কথা বলতে পেরেই সে সুযোগটা লুফে নিলো।
“ডেঙ্গু হইছিল ভাই। হাসপাতালে নিলাম। আমার তিন বছরের মেয়েটা! বাঁচল না।”
“কবে?” ক্ষীণ কণ্ঠে বলল সাকিন।
“আধা ঘণ্টা আগে চলে গেল। আমার বউটা পাগল হয়ে গেছে।”
ইতস্তত করে সাকিন বলেই ফেলল, “আপনি বাড়ি গেলেন না?”
“এই মাসে এক সপ্তাহ ছুটি এর আগেই কাটায় ফেলছি। দুইবার বাড়ি গেছিলাম! আহারে! আমার মেয়েটা যদি তখনই মরতো! মরল না। এখন গেলে আমারে চাকরি থেকে বের করে দিবে। স্যারের কাছে ফোন দিছিলাম। স্যার আমার মেয়ের খবর চায় না, ফাইল চায়। এক মেয়ের শরীরে মাটি দিতে যেয়ে আর তিনজনের পেটে কেমনে মাটি দিব ভাই?” দুই হাতে চোখ মুছলেন তিনি। কিন্তু হায়! চোখ আজ সমুদ্দুর নিয়ে বসেছে। তাতে পানির কমতি নেই, স্রোতের বিরাম নেই।
সাকিনের ইচ্ছে করছিল লোকটার সাথে একটু থাকে। কিন্তু তারও উপায় নেই। কলেজের সময় হয়ে আসছে। পাশে হাঁটতে হাঁটতেই সে বলল,
“ভাইজান, ছোট বেলায় আমরা আগে আগে স্কুলে যেয়ে সামনের বেঞ্চে সিট ধরতাম। মনে আছে?”
লোকটা অদ্ভুত চোখে তাকালো।
সাকিন বলে গেল, “সিট ধরার সিস্টেম কিন্তু ঐ দুনিয়াতেও আছে। কাউকে কাউকে আগে নিয়ে আল্লাহ কারো কারো জন্য সিট ধরার ব্যবস্থা করে দেন। এই যে আপনার মেয়েটাকে আল্লাহ নিয়ে গেলেন, ছোট্ট নিষ্পাপ বাচ্চা, সে এখন থাকবে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কাছে। তাঁর সাথে হাসবে, খেলবে। তাকে নিয়ে যেয়ে আল্লাহ জান্নাতে আপনার আর আপনার স্ত্রীর জন্য সিট ধরার ব্যবস্থা করে দিলেন। আল্লাহ যদি চান, এই কষ্টের বিনিময়েই আপনাদের জান্নাতের বেঞ্চে আগে বসার সুযোগ করে দিতে পারেন।”
লোকটার চোখের বর্ষণ থেমে গেছে। সে দাঁড়িয়ে পড়েছে মূর্তির মতো।
সাকিন একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বলল, “আপনার কষ্ট কমানোর কোনো উপায় আমার জানা নেই ভাইজান। আমি দোয়া করব, আল্লাহ যেন আপনাদের বুকটা ঠান্ডা করে দেন।”
লোকটা রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, “ভাই সাহেব, আমি কি আপনাকে একটু জড়ায় ধরতে পারি?”
সাকিন এগিয়ে গেলো, “অবশ্যই!”
পাহাড়ি ঢলের মতো সাকিনের বুকে ভেঙে পড়ল লোকটা। তাকে জাপটে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। পাশের মহাসড়কে অসংখ্য গাড়ি ছুটে চলেছে অস্থির বেগে। আকাশে শরতের আগমনী মেঘ তার জন্য ময়দান তৈরি করছে। দশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কদম গাছে ফুঁটে আছে অসময়ী কদম। একটু দূরেই সারি সারি দোকান। কতক লোক তাকিয়ে আছে অদূরে দুজনার দিকে। একজন বুক পেতে দিয়েছে আরেকটা মানুষের কান্না দুহাতে আগলে নেয়ার জন্য।
দেশের অপরিচিত এক জায়গায় অক্টোবর শুরু হলো তুচ্ছ একজন মানুষের কান্নার বর্ষণের মধ্য দিয়ে।
*****
বিশটা ডায়েরি প্রথম লটে পাঠিয়ে দিল ফাবিহা। তখন বাকি বিশটা আঠা দিয়ে চাপা দেয়া হয়েছে সিমির ট্রাঙ্কের নিচে। ওগুলোর মলাট তৈরি করতে হবে। এই একটা কাজই কেবল বাকি।
কম্পিউটার সেন্টার থেকে যখন ফরিদ তাকে নিয়ে এলেন তখন মাগরিবের আজান শেষ হয়েছে। নামাজ পড়ে সেই যে বসেছে, আর একবারও ওঠেনি। সিমি মাঝে এসে একবার তাড়া দিয়ে গেছে, “ছোট আপা! একটু নড়াচড়া করেন! নামাজটা পড়ে নেন। মনে তো হচ্ছে কাপড়ের সাথে আপনার শরীরটাও ডায়েরির সাথে আটকায় গেছে।”
ফাবিহা সে কথা কানে নিলো না। দশটা মলাট বানিয়ে তারপর নামাজ পড়ল। এসে দেখল সিমি মনোযোগ দিয়ে ডায়েরি নাড়াচাড়া করছে। সে বসতেই বলল, “ছোট আপা, এগুলো যে আপনি বানালেন তার প্রমাণ কই?”
ফাবিহা ভুরু কুঁচকে তাকালো, “মানে?”
“থাকে না, কোম্পানির চিহ্ন, দোকানের নাম? এখানে তো আপনার কিছুই নাই।”
ফাবিহার কপালের ভাঁজ সমান হলো, “তাই তো!”
“আপনার পেজটার নাম যেন কী?”
“খেরোখাতা।”
“এই নামটাই ছোট করে এক কোনায় সেলাই করে দেন।”
বুদ্ধিটা মন্দ লাগলো না ফাবিহার। কিন্তু আবার সেলাইয়ের ঝামেলায় গেলে অনেক সময় দরকার। সে বলল, “থাকুক! সেলাই করতে গেলে আরো অনেক সময়ের কাজ। পরে দেখা যাবে।”
সিমি রাগ করে বলল, “আপনি যে আমার সেলাইয়ের গুণ নিয়ে সন্দেহ করেন এটা বললেই হয়!”
“তাই কখন বললাম!” ফাবিহা অবাক হয়ে তাকালো।
“তাহলে আমাকে দেন না কেন! সেলাই করে দেই।”
ফাবিহা আপ্লুত চোখে তাকালো। এই মেয়েটা তাকে কেন এত ভালোবাসে? এমন স্বচ্ছ ভালোবাসার প্রতিদান দেয়ার সামর্থ্য যে তার নেই! ভেজা কণ্ঠে সে বলল, “সেলাই কি হাওয়ায় করবি? সুই সুতা লাগবে না?”
সিমি বাতাসের বেগে সরঞ্জাম আনতে ছুটল।
দশটা ডায়েরির মলাট হয়ে গিয়েছিল। বাকি দশটায় ‘খেরোখাতা’র জলছাপ সেলাই করে সিমি প্রমাণ করে দিলো সেলাইয়ে সে মোটেই ফেলনা নয়।
ফাবিহা কাজ শেষ করে সিমির পাশে এলো। সে তখন মনোযোগ দিয়ে সেলাই করছে। তাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরতেই বিরক্ত হয়ে বলল, “ছোট আপা! নড়ান কেন?”
ফাবিহা তরল কণ্ঠে বলল, “আমার কাছে কিছু চা তো সিমি! যদিও কবে দিতে পারব জানি না, তাও চা।”
সিমি চকচকে চোখে তাকিয়ে বলল, “আমার একটা লেহেঙ্গার অনেক শখ!”
সিমির কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে ফাবিহা বলল, “একদিন দিব ইনশাআল্লাহ। সেই একদিন কবে আসবে জানি না। কিন্তু আসবে, আসবেই।”
সিমি চেয়ে চেয়ে ছোট আপাকে দেখে গেল! সে যদি বুকটা খুলে দেখতে পারতো! একটা বাকি লেহেঙ্গার সুতো ধরে সে আরও অনেকদিন ছোট আপার পেছনে থাকতে চায়! আরও অসংখ্য দিন, অসংখ্য মাস এই মুখটা দেখতে চায়, কেবল দেখেই যেতে চায়!
পরদিন বিকেলে ফাবিহা কার্টন গুছিয়ে নিলো। আজ সেন্টার ছুটি ছিল। ভাবল এই ফাঁকে কুরিয়ারের কাজটা সেড়ে ফেলবে। অর্ডার আরও এসেছে। তার সরঞ্জামও কিনতে হবে। কিন্তু বিধি বাম! ঠিক বেরুবার মুহূর্তেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো।
অসহায়ের মতো দরজার সামনে বসে রইলো ফাবিহা। আজ সকালে ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় লোহার দরজার সাথে পায়ে বেশ ভালো মতো গুতো খেয়েছে। তখন আঘাতটা অত না পোড়ালেও সময় গড়াতেই পা ফুলে ঢোল। এই পা নিয়ে কোনো ভাবেই বৃষ্টির ভেতর যাওয়া সম্ভব না। অথচ ডায়েরিগুলোও পৌঁছানো দরকার।
সিমি এসে বলল, “ফারদিন ভাইয়ের কাছে দেন না! সে তো ঘরেই!”
ফাবিহা কিছু না বললেও নূরজাহান ছুটে গেলেন। ফারদিন তৎক্ষণাৎ জানালো সে এই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যেতে পারবে না। নূরজাহান বহুদিন পর শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে চিৎকার করলেন,
“অমানুষ! কী শুরু করছিস তুই এসব? কী চাস? হয় আমি মরব নাহলে তোকে মারব! আল্লাহ! এই ছেলে ক্যান পেটে ধরছিলাম আমি! কী পাপ করছিলাম!” ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন নূরজাহান।
ফাবিহা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট শুনল সেসব। অপলক তাকিয়ে রইলো আকাশের দিকে। মহানন্দে সে বর্ষে চলেছে।
ঠিক সে সময় সাকিনকে সিঁড়িঘরে দেখা গেল। ছাতা নিয়ে সে নামছে। সিমিকে ইশারা করতেই সে এগিয়ে এলো। সিমি বলল, “এই বৃষ্টির মধ্যে কোথায় যান?”
“রিফাতের খুব জ্বর! ওষুধ আনতে যাচ্ছি। তোমার ছোট আপার কী হয়েছে?”
“আপার জিনিসপত্র ডেলিভারি করতে হবে। কিন্তু এই বৃষ্টির ভেতর যাবে কীভাবে? পা কেটে ভয়াবহ অবস্থা। কিন্তু আজকেই ডায়েরি পাঠানোর কথা।”
সাকিন এগিয়ে গেলো। তাকে দেখে খানিকটা পিছিয়ে এলো ফাবিহা।
সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে জুতো পরতে পরতে সাকিন বলল, “ফাবিহা, আপনি চাইলে জিনিসগুলো আমার কাছে দিতে পারেন। রিফাতের জন্য ওষুধ আনতে ওদিকেই যাচ্ছি।”
ফাবিহা অবাক হয়ে তাকালো। সাকিন প্যান্ট গোটাতে ব্যস্ত। উঠানে তিন ইঞ্চি পানি জমে গেছে। ভাড়াটে না ওঠার অন্যতম কারণ।
সাকিন আরেকবার ডাকল, “ফাবিহা?”
সিমি এগিয়ে এসে ছোট আপার হাত ধরে বলল, “দিয়ে দেন আপা! কী চিন্তা করেন!”
“কিন্তু! এটা অনেক ভারী।” ক্ষীণ কণ্ঠে বলল সে। এমন আচমকা প্রস্তাবে সে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়েছে বৈ কি!
“রিকশা ডেকে আনছি। দিলে উপরে ভালো করে পলিথিন পেঁচিয়ে দিন। নাহলে কার্টন ভিজে ডায়েরিও ভিজে যাবে।”
ফাবিহাকে কিছু করতে হলো না। যা করার সিমিই করল। ফাবিহা ভাড়া বের করতে গেলে সিমি চোখ বড় বড় করে বলল, “একটা মানুষ উপকার করতে চাচ্ছে! আপনি তাকে টাকা কেন দিবেন!”
“গাড়ি ভাড়াটা দিব না?”
“না। সাকিন ভাই ওষুধ আনতে কি উড়ে উড়ে যেত? ভাড়া দিবেন না। এটা কিন্তু খুব খারাপ দেখা যাবে ছোট আপা!” ফাবিহা নিভে গেলো।
সাকিন এসে কার্টন নিলো। তাকে রিকশা পর্যন্ত ছাতা নিয়ে এগিয়ে দিলো সিমি। ফাবিহা সে দৃশ্য তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল।
সেদিন ফরিদ বেশ রাত করে বাড়িতে ফিরলেন। ঘুমিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে তাকে ফোন দিলেন আগের এক প্রতিবেশী। জানালেন, আগামীকাল তাদের সালিশে ডাকা হয়েছে। ডেকেছে স্বয়ং চেয়ারম্যান।
চলমান~
(এবং এই পর্বের মাধ্যমেই #বনজোছনা-র শব্দসংখ্যা #আবর্তন-কে ছাড়িয়ে গেলো 🙂)