#বনজোছনা
৩০.
কলেজে পৌছে প্রথম ক্লাস নিয়ে সাকিন যখন অফিস রুমে গেল, তখনই ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারল। তাদের ডিপার্টমেন্টের এক সিনিয়র প্রফেসর মারাত্মক অসুস্থ। এখন তখন অবস্থা। তার উপরে সে প্রফেসর চেয়ারম্যানের ভাই। একে তো মানবতা পাশাপাশি নিরাপত্তা— দুটো রক্ষার জন্য হলেও এই মুহূর্তে সকলের রওনা করা উচিত। শুধুমাত্র চেয়ারম্যান বলেই নন, সে ভদ্রলোক এই কলেজের ট্রাস্টি বোর্ডের বহু পুরোনো সদস্য। কাজেই দ্বিতীয় ঘন্টার সকল ক্লাস স্থগিত ঘোষণা করে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে সাতজন রওনা হলেন। সাকিনের যাবার যদিও দরকার ছিল না কিন্তু ডিপার্টমেন্ট হেড তাকে ছাড়লেন না।
সাক্ষাতের মাঝে ফোনকল আসায় সাকিন যখন বারান্দায় এলো, সে সময় ছোট্ট জটলাটা চোখে পড়ল। ফরিদ চাচাকে চিনতে কোনো কষ্ট হলো না। মুহুর্তেই ঘটনা আন্দাজ করে ফেলল সে। ফরিদ যখন এক লোকের পায়ে পড়ে গেল তখন হতভম্ব হয়ে গেল সাকিন। পেছনেই জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মহিলাকে দেখে আন্দাজ করে নিল তারা কারা হতে পারে।
নিজেকে বড় অসহায় মনে হচ্ছিল তার। চোখ মেলে এই নিষ্ঠুর দৃশ্য দেখা ছাড়া তার হাতে আর কিছুই ছিল না। অথচ এ দৃশ্য দেখাও শাস্তি। সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘরে চলে গেল। দেখা গেল, সকলে তখনই চলে যাওয়ার জন্য উঠে পড়েছেন। তৎক্ষণাৎ হিসেব করে ফেলল সে। এঁরা তো ওই সদর দরজা দিয়েই বের হবেন, যেখানে সালিশ বসানো হয়েছে। সাকিন ওই পরিবারটার জন্য কিছু করতে না পারলেও, দুজন মানুষের সামনে তাদের অপমানটুকু যদি আটকাতে পারে তবে সেটুকুই করবে।
সে শিক্ষকদের জানালো বাড়ির সামনে বেশ ভিড়, গুরুত্বপূর্ণ কোনো মিটিং চলছে। তারা পেছন দিক দিয়ে বের হলে ভালো হয়। সকলে এক বাক্যে সে কথায় রাজি হয়ে গেল। সাকিন নিজেও বেরিয়ে আসছিল। কিন্তু অসুস্থ সে শিক্ষক তাকে ডেকে পাঠালেন। আরজি জানালেন নিজের ছেলেটাকে একটু পড়ানোর জন্য। এক মুহূর্ত ভাবল সে। তারপরেই বলল,
“বেয়াদবি মাফ করবেন স্যার, আমি মাত্র জয়েন করেছি। ছাত্র-ছাত্রীদের পালস এখনো খুব একটা বুঝে উঠতে পারিনি। আমার মনে হয়, এখন না পড়ানোটাই ভালো হবে।”
দূর্বল কন্ঠে তিনি বললেন, “পড়াতে পড়াতেই না বুঝবে!”
“জি স্যার। তবে আপনার ছেলে এবারই এইচএসসি দেবে। ওকে দিয়ে আমার শেখার এক্সপেরিমেন্ট চালু করলে সেটা ওর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। একজন অভিজ্ঞ টিচার দিয়ে ওকে পড়ালে ভালো হবে বলে আমি মনে করি।”
ভদ্রলোক ছোট করে নিশ্বাস ছাড়লেন।
“তেমন টিচার কোথায় পাবো? আমি নিজেই মানুষের ছেলেপিলে পড়াই। আর আমার ছেলেই আমার কাছে পড়ে না। এত অস্থির! ওকে দুদন্ড স্থির হয়ে পড়ানো আজকালকার ছেলেদের কাজ না।”
“এক্ষেত্রে একটু বয়স্ক, অভিজ্ঞ কাউকে আ্যপয়েন্ট করতে পারেন।” আস্তে-ধীরে বলল সাকিন।
“তেমন টিচার আমার ছেলেকে পড়াবে কেন?”
“আপনি বললে নিশ্চয়ই পড়াবে।”
“তোমার চেনা-জানা কেউ আছে?”
এটুকু সুযোগের অপেক্ষাতেই সে ছিল। বলল, “সেভাবে পরিচিত নেই। তবে ফরিদ স্যারের কথা খুব শুনেছি।” তার কোচিংয়ের রেকর্ড যে ভালো এতে কোনো মিথ্যে নেই। ভদ্রলোক পড়ানও বেশ যত্ন নিয়ে। তার কিছু ছাত্রের কাছেই জেনেছে সাকিন।
“কোন ফরিদ? পুষ্পদামের?”
“জি।”
তার কপাল কুচকে এলো।
“সে তো বিশাল ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছে। এমন লোককে দিয়ে..”
“আমার মনে হয় উনাকে সুযোগ দিলে বরং অন্য যে কারো থেকে আপনার ছেলেকে বেশি যত্ন নিয়ে পড়াবেন। আপনি নিজেই সিনিয়র শিক্ষক, এ বিষয়ে ভালো জানবেন স্যার। আমি শুধু আমার ধারণা বললাম।”
তার জানার কথা নয় সাকিন যে ফরিদ আহমেদের সাথে একই বাড়িতে বাস করে। তিনি উল্টো ভাবলেন ফরিদের সুনাম এতদূর ছড়িয়েছে যে শহরে নবাগত এক জুনিয়র শিক্ষক ইতোমধ্যেই তাকে চিনে ফেলেছে এবং সুপারিশ করছে।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “আমাদের পাশের এলাকাতেই বহুদিন থেকেছে। সজ্জন মানুষ। কিন্তু এই শেষ বয়সে এসে এমন ঝামেলায় কীভাবে পড়ল আল্লাহ জানেন। আচ্ছা, আমি ওর সাথে কথা বলে দেখব।”
এসব নিয়ে আলাপ করতে করতেই সাকিন পিছে পড়ে গেল। যখন বের হলো, দেখল আসর ভেঙে গেছে। তিনজন ফিরতি পথ ধরেছে।
এই মুহূর্তে তাদের সামনে যাওয়া মানে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেয়া। সাকিন কোনোরকম স্বান্তনা দেয়ার কথা চিন্তা করল না। এ জাতীয় স্বান্তনা কষ্ট কমানোর বদলে উল্টো সেগুলো আরও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এক বেলার করুনার বদলে তাদের দরকার স্থায়ী সমাধান। সেটুকু করতে পারলে সে করবে, নয়তো দূরেই থাকবে। চিন্তা করতে করতে ভিন্ন পথ দিয়ে বেরিয়ে গেল সে। জানতেও পারল না, তাকে দেখে বিদ্ধস্থ একজনের নিশ্বাস আটকে যাবার উপক্রম হয়েছে।
—
মেয়েটা মূর্তির মতো বসে আছে। ফরিদ ভগ্ন কন্ঠে বললেন, “তোর আসা উচিত হয়নি মা রে!”
নূরজাহান ছলছল চোখে জ্বলে উঠলেন, “আমি আগেই বলেছিলাম! সবসময় এত মাতব্বরি করিস কেন তুই!”
অটো রিকশার ঝাঁকুনি থেকে বাচঁতেই কি ওকে আঁকড়ে ধরলেন নূরজাহান? কে জানে! ফাবিহা নিবিষ্ট মনে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলো। হায়! যদি সে সজীবের সাথে কোথাও না যেত! যদি তার বিয়েটা ঠিক না হতো! একটা শুভ্র পায়রা হতে চেয়েছিল ফাবিহা। কিন্তু ভুলেই গিয়েছিল নিজের হাতে কালো পালক লাগানোর কাজটা সে-ই করেছে।
বাড়ি ফিরে অনেকটা সময় চুপচাপ শুয়ে থাকল ফাবিহা। চোখ বন্ধ করলে ভেসে ওঠে ফরিদের পায়ে পড়ার দৃশ্য। সাত তাড়াতাড়ি চোখ খুলে ফেলে। শুনতে পায় কেউ তার দিকে তাকিয়ে জগতের সবচেয়ে বিশ্রী কথাটা বলছে। খুব কষ্ট করে একটা ঢোক গেলে। সারা দিনে কুড়িয়ে আনা তিক্ত স্মৃতি ঠেলে সরিয়ে দিতে চায় দূর থেকে বহু দূরে। কিন্তু হায়! তারা ফাবিহার শরীরের গন্ডি পেরিয়ে কোথাও যেতে নারাজ। মন থেকে মস্তিষ্ক, মস্তিষ্ক থেকে মন— এই চক্রেই তারা বারবার, বারবার ঘুরপাক খায়।
হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে ফোনটা নিলো সে। সাতদিনের অফারের সময় ফুরিয়েছে। এর মাঝে কম্বো প্যাকের অর্ডার এসেছে একশ তিপ্পান্নটা। ভদ্রমহিলা ফাবিহাকে অনুরোধ করেছেন সময় আর তিনদিন বাড়ানোর জন্য। তাতে বরং ফাবিহারই সুবিধে। কিন্তু সে হুশ হারায়নি। বলেছে ভেবে জানাবে। গত রাতে সময় নিয়েছিল। এ বেলায় উত্তর দিতে যেয়ে দেখল লাখখানেক ফলোয়ার দেখে যে পেইজে মেসেজ দিয়েছিল সেই প্রথমে, ওরা সিন করে রেখে দিয়েছিল। কোনো উত্তর পাঠায়নি। আজ তারাই ইয়া বড় একটা মেসেজ পাঠিয়েছে। যার মূল কথা হলো, তারা ‘খেরোখাতা’র সাথে কোলাবোরেশান করে কাজ করতে চায়। একটা ত্যাড়ছা হাসি খেলে গেল ফাবিহার ঠোঁটে। একটা পেইজের সাথে কাজ করে তার বেশ একটু নাম হয়েছে। পেইজের ফলোয়ার হয়েছে সাড়ে চার হাজার। টিকটকেও ভিউ আসছে বেশ। প্রতি পোস্টে শ’খানেক রিয়্যাক্ট। অর্থাৎ, তার সাথে কাজ করায় আর ঝুঁকি নেই। এখন তো লোকে আসবেই!
ইগোকে প্রাধান্য দিয়ে ফাবিহা বোকামি করল না। তার টাকার দরকার। যে কাজে নিতে চাইবে, সে তার সাথেই কাজ করবে। তবে কোনোভাবেই নিজের সম্মান খুইয়ে নয়। মেসেজটা ফেলে রাখল তিন ঘন্টার জন্য। তারপর বিশাল সে প্রস্তাবের বিপরীতে ছোট্ট করে লিখল, “ভেবে জানাচ্ছি আপু।”
এই ফাঁকে নিজের পেইজ এবং টিকটক আইডি থেকে কিছু অর্ডার কনফার্ম করল। এক্ষেত্রে অগ্রিম পেমেন্ট নিয়ে থাকে সে। জিনিস হাতে পেয়ে মানুষের মন ঘুরে যাওয়ার বহু নজির দেখেছে। তাই এই সাবধানতা। টাকা দিলে প্রোডাক্ট নিতেই হবে। নয়তো ডেলিভারি ম্যানের কল পেলেই কিছু মানুষের অসুস্থতা, বিপদ-আপদ লাইন ধরে ঘরে ঢোকে। ঢুকতে পারে না কেবল নির্ধারিত পন্য।
এদিন আর অন্য কোনো কাজে হাত দিলো না ফাবিহা। একটা বাটিতে ঘন করে কফি গুলিয়ে নিলো। এ-ফোর সাইজের অফসেট পেপারগুলোতে তুলি দিয়ে সেই কফির রঙ করল। শুকিয়ে যাবার পর যে রঙটা ফুঁটে উঠল তাতে কেবল স্মৃতিরাই থাকতে পারে। সে মলিন হলুদাভ রঙটা দেখলে মুহূর্তেই স্মৃতিকাতর হয়ে যেতে হয়। খুব যত্ন করে ডায়েরিটা বানালো সে। লেদার তখনও কেনা হয়নি বলে পুরনো মলাটই দিলো। কিন্তু এটাকে বিশেষ করল ছোট্ট এক টুকরো ফিতে। দুপাশ থেকে তার বাধন খুললেই কেবল ডায়েরিটা খোলা যায়।
সিমি দেখে উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে বলল, “কী সুন্দর! কী সুন্দর! কী সুন্দর! এর দাম ভুল করেও হাজারের নিচে রাখবেন না ছোট আপা!”
ফাবিহা নিজেও তাই ভেবেছিল। আট বাই ছয় ইঞ্চির এ ডায়েরির দাম হাজারের নিচে রাখলে তার আসলই উঠে আসবে না। লাভ তো পরের বিষয়!
উপরে যত্ন করে ‘ময়ূখমালা’ লিখে প্রথম ডায়েরিটা সে দিলো বাবাকে । ফরিদ আহমেদ অবাক হয়ে বললেন, “আমি কার কাছে বিক্রি করব!”
ফাবিহা উল্টো অবাক হলো, “তুমি বিক্রি করবে কোন দুঃখে?”
“দুঃখের কি শেষ আছে রে মা?” ক্লান্তির হাসি হেসে বললেন ফরিদ।
ফাবিহা পাশে বসে বলল, “এটা তোমার জন্য বাবা। তুমি লেখালেখি করবে।”
শিশুর মতো জিনিসটার গায়ে হাত বোলালেন ফরিদ। স্বপ্নালু কন্ঠে বললেন, “আমার জন্য!”
“হ্যাঁ। চমৎকার সব গল্পগুলো এটায় লিখবে!”
“চমৎকার হবে?”
“হবে না কেন! আমার বাবা কলম দিয়ে যা-ই লিখবে তাই চমৎকার হবে!”
ফরিদ প্রশ্রয়ের হাসি হাসলেন। ডায়েরি থেকে হাত সরাতেই পারলেন না তিনি। বললেন, “হ্যাঁ রে মা! রঙটা এমন করলি কীভাবে? মনে হচ্ছে সেই ছোটবেলায় চলে গেছি। মনে হচ্ছে তিন পয়সার মালাইয়ের ঘ্রাণ আসছে!”
বাবার ছেলেমানুষী কথায় হেসে ফেলল ফাবিহা।
“তাহলে তো আমি সার্থক!”
“একটা কলম নিয়ে আয় তো!”
ফাবিহা ভাবল বাবা বোধহয় এখুনি কিছু লিখবেন। ঝটপট কলম আনতেই ফরিদ ডায়েরি এগিয়ে দিয়ে বললেন, “প্রথম পাতায় কিছু লিখে দে।”
“আমি লিখব কেন?”
“ডায়েরিটা তুই দিলি না! উপহারদাতার একটা বক্তব্য থাকা লাগে। দে দে! যেন পাতাটা খুললেই মনে পড়ে তুই দিয়েছিস!”
“আমি যে দিয়েছি এটা তোমার এমনিতেই মনে থাকবে। লিখতে হবে না বাবা।”
“আহা! দে না রে মা!”
অনেকক্ষণ ভেবে-চিন্তে ফাবিহা লিখল,
“বাবা,
তুমি আমাকে পুরো পৃথিবীটা উপহার দিয়েছ। অথচ আমি এতই অধম যে তোমাকে দুটো পৃষ্ঠা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারলাম না!
এই দু পাতায় তুমি দুঃখ গাঁথা লিখো না বাবা। একদিন এ সময় ফুরিয়ে যাবে। তুমি বরং লিখে রাখো, দুঃখ-নদীতে বেড়াতে এসেও আমরা কত রঙ-বেরঙের স্মৃতি কুঁড়ালাম! তুমি তো বাবা লেখক মানুষ, কষ্টের সৌন্দর্যটা লিখো এমনভাবে যেন তা সুখের আনন্দকেও হার মানায়।
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা ফরিদ আহমেদকে
তার দুই মাত্র কন্যা ফাবিহা ফরিদের তরফ থেকে
কফি মাখানো কাগজের ভালোবাসা”
দু লাইনের বদলে ফাবিহা আস্ত একটা চিঠি লিখে ফেলল। বাবার হাতে দিতেই তিনি চশমা টেনে পড়তে শুরু করলেন। একবার, দুবার। তিনবারের বার আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলেন না। ফাবিহার মাথাটা বুকে টেনে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। বড় আফসোস হলো, যদি তিনি একটু শক্ত হয়ে সজীবকে বলতেন— বিয়ের আগে আমার মেয়েকে নিয়ে কোত্থাও যাওয়া যাবে না! আর কিচ্ছু না হোক— আজ ওই লোকটার মুখে অন্তত একটা থাপ্পড় দিয়ে আসতে পারতেন। মেয়ের মাথাটা এই ব্যর্থ বুকে চেপে রাখতে বড় কুন্ঠা বোধ করলেন তিনি। ভেতর থেকে কেউ তাকে বারংবার ধিক্কার দিয়ে গেল!
ফাবিহা প্রাণপণে নিজেকে আটকে রাখল। নিজের ভুলে ফাঁদে পড়েছে— কার ওপর দোষ দেবে? তার চোখ ভিজলে আজ আর ফরিদকে কেউ থামাতে পারবে না। বাবার ফতুয়া মুঠোয় ভরে সে ফিসফিস করে বলল, “আমাদের একদিন খুব সুন্দর একটা গল্প হবে, বাবা! সেই গল্পে দুঃখ থাকলেও বিষাদ থাকবে না। কোনো নোংরা ভয় থাকবে না! চোখ বন্ধ করে দেখো বাবা! সেই গল্পটা আর বেশি দূরে নয়। এই আর একটুখানি রাস্তা! তুমি শক্ত করে হাত ধরলে, আমরা ঠিক পেরিয়ে যেতে পারব!”
ফরিদ বুভুক্ষের মতো মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে গেলেন।
পরদিন ফরিদ তখন সেই দুজন ছাত্র পড়ানোয় ব্যস্ত। পড়া বোঝানোর পাশাপাশি তিনি চেষ্টা করছেন এই ছেলে দুজনার মন-মেজাজ বোঝার। মাঝে দুই প্রজন্মের দূরত্ব। ওদের মন পড়তে না পারলে পদার্থ পড়িয়েও লাভ হবে না। মানসিক সে দূরত্বের কারণে ওরা শব্দগুলোই কেবল বুঝবে, অর্থ আর আত্মস্থ করতে পারবে না। ফলে শিক্ষা দ্বিমুখী দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।
এমন সময় ফোন এলো। পড়ানোর সময় তিনি সাধারণত ফোন রিসিভ করেন না বলে দুবার বেজে গেলেও ধরলেন না। উল্টো ভাইব্রেট করে রাখলেন। কিন্তু তৃতীয়বার ফোন এলে তার টনক নড়ল। যদিও আননোন নাম্বার, কিন্তু বাড়ি থেকেও তো হতে পারে।
“আমি একটু ফোনটা রিসিভ করে আসছি।” বলেই ঘরের বাইরে বের হলেন তিনি।
ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একজন বলে উঠলেন, “কী ব্যাপার ফরিদ! তোমাকে তো আজকাল পাওয়াই যায় না। ব্যাপার কী!”
ফরিদ সহসাই স্বরটা চিনতে পারলেন না। বিভ্রান্ত কন্ঠে বললেন, “কে?”
“এখন দেখি চিনতেও পারছো না!” হতাশ কন্ঠে বলল লোকটা। “আমি সরকারি কলেজের বায়লজির প্রফেসর..”
“মাইনুল স্যার!” তাজ্জব কন্ঠে বললেন ফরিদ।
“যাক! চিনতে পারলে তাহলে!”
ফরিদ বুঝতে পারছিলেন না তার সাথে মাইনুলের কী দরকার থাকতে পারে। সূত্র আবিস্কার করতে যেয়ে মনে পড়ল দিন দুই আগেই এই লোকের বাড়িতে জীবনের চূড়ান্ত অপমানটা সহ্য করে এসেছেন। সেই চেয়ারম্যানের ভাই আবার তাকে কেন ফোন দিলেন? শঙ্কায় তার বুকটা কেঁপে উঠল। আবার সালিশ বসাবে নাকি!
ঠোঁট ভিজিয়ে তিনি বললেন, “জী স্যার। শুনেছিলাম আপনার শরীর নাকি অসুস্থ? এখন কেমন আছেন?”
“শরীর অসুস্থ এটা শুনতে পেরেছ, এসে একটু দেখে যেতে পারোনি! মরা মানুষ দেখে কী করবে হে? জ্যান্ত মানুষ দেখায় তোমাদের আগ্রহ নেই।”
“জী জী যাবো স্যার!” তার সাথে এই আলাপের মানে কী? কথার মোড় কোনদিকে ঘুরছে?
মাইনুল দূর্বল কন্ঠে বললেন, “আজই একবার আসো না কেন?”
“জী স্যার! আজকেই?”
“হ্যাঁ। ব্যস্ত না থাকলে আসো।”
“ইয়ে..মানে কোনো দরকার ছিল স্যার?”
“তা একটু ছিল।”
“কী দরকার?” ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
“আমার ছেলেটা এবার ইন্টার দেবে জানো তো নাকি? তা সে বেজায় দুরন্ত। সিলেবাস শেষ করা তো দূরের কথা, কী আছে এটুকুও বলতে পারে না! বুঝলে হে ফরিদ! মানুষের ছেলে পড়িয়ে খাই, কিন্তু নিজের ছেলে পড়াতে পারলাম না। তুমি যদি কয়েকটা দিন ওকে দেখিয়ে দিতে... তোমার সাবজেক্টগুলোই দেখাও। অন্তত সেগুলো নিয়ে আমি নিশ্চিন্ত থাকবো।”
ফরিদ স্তব্ধ হয়ে শুনছিলেন। ঘটনা এদিকে মোড় নেবে তিনি ভুলেও আঁচ করতে পারেননি। হন্যে হয়ে যখন দুটো টিউশনি খুঁজে চলেছেন তখন প্রস্তাব দিয়েছেন স্বয়ং চেয়ারম্যানের ভাইয়ের ছেলে, যে কি না আবার সরকারি কলেজের প্রফেসর! উত্তেজনায় সহসাই কোনো উত্তর দিতে পারলেন না তিনি।
মাইনুল ডাকলেন, “হ্যালো? ফরিদ?”
“জী স্যার!”
“আজকে আসছো তো তাহলে?”
“জী জী ইনশাআল্লাহ! আসছি স্যার!”
“বেশ! এসো!”
ফোন রেখে দীর্ঘক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলেন ফরিদ। তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না এমন একটা প্রস্তাব তিনি পেয়েছেন। ভেতর থেকে ছাত্র দুজন ডাকলে ধ্যান ভেঙে ঢুকতে হলো। ফরিদ মনে মনে একটা খসড়া হিসেব করলেন। তিনটে হাজার টাকা ওরা দেবে না? আর এখানে দেড় হাজার। অবিশ্বাসের কাঁপুনি তার আঙুলকে স্থির থাকতে দিচ্ছিল না। মনে মনে অসংখ্যবার শুকরিয়া আদায় করে ফেললেন তিনি, কিন্তু মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের করতে পারলেন না।
*****
চুলগুলো মরশুম শেষের ঝরা পাতার মতো ঝরে পড়ছে। হাত দিলেই দু তিনটে করে উঠে আসছে। আয়নায় ভালো করে দেখল ফাবিহা। সিথি পাতলা হয়ে মাথার তালু দেখা যাচ্ছে। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ঘুমের একটু অনিয়ম হলেই তার শরীরে সবদিক দিয়ে সে লক্ষণ প্রকাশ পায়। এখন অনিয়ম তো বহু দূরের বিষয়, চোখের পাতা এক করার সময় অবধি পাচ্ছে না। ঘুম পেলেই মনে হয় দুটো অর্ডারের কাজ পিছিয়ে যাবে। পানি খেয়ে, হাটাহাটি করে ঘুম তাড়িয়ে আবার কাজে বসে সে। মাঝখানে পড়াটাও ঠিকমতো চালিয়ে যেতে হচ্ছে। দম ফেলানোর মোটেই সময় নেই।
হাতখোপা করতে যেয়ে আরও ক’টা চুল পড়ল। গা করল না সে। সন্ধ্যা হব হব করছে। তাকে অভিবাদন জানানোর জন্য ঝিঁঝিঁর দল গান গাইতে শুরু করেছে। হাতের ডায়েরিতে মনোযোগ নিবদ্ধ করল ফাবিহা। মাগরিবের আজান দিলো, সিমি এসে একবার তাগাদা দিলো— তবুও উঠল না সে। ভাবল নামাজ পড়ে আবার এটা নিয়ে বসবে! তারচে একেবারে কাজ শেষ করে ওঠা যাক!
কাজ যখন শেষ হলো তখন মাগরিবের আর তিন মিনিট বাকি। ফলে অবধারিতভাবে তার নামাজ কাযা হলো। ঢং করে কেউ যেন ফাবিহার মাথায় ঘন্টা বাজিয়ে গেল! সহসাই চোখের ওপর থেকে একটা পর্দা উড়ে গেল।
এই তো দুদিন আগে, চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে এসে সে রাতে এক ফোঁটা ঘুমায়নি ফাবিহা। পুরোটা রাত জায়নামাজে কাটিয়েছে। যেদিন বাবার স্ট্রোক হলো, সেদিন ছোটাছুটির মাঝে থাকলেও প্রতিটা মুহূর্তে মালিককে স্মরণ করে গেছে। কম্পিউটার সেন্টারে যেদিন ইন্টারভিউ দিতে গেল, সেদিনের সাক্ষী কেবল তার মন। প্রতিটা স্পন্দনে যে হৃদয় কীভাবে আল্লাহকে স্মরণ করেছিল তা আজও স্মৃতিপটে স্পষ্ট। আর আজ যেই না সময় একটু মসৃণ পথ দেখিয়েছে, পেইজটা উঠে দাঁড়িয়েছে, অপমানের ঘা খানিকটা শুকিয়ে গেছে— ওমনিই বেবাক দুঃখের পটভূমি মন সযতনে ভুলে গেছে। কী অসম্ভব স্বার্থপর সে মন! মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে সে কথাই ভেবে গেল ফাবিহা।
আজ চল্লিশটা অর্ডার এলে কি সে ভুলে যেতে পারত? ভুলতে পারত কেউ তাকে চাকরির জন্য ডাকলে? কেউ তাকে ঋণ চুকিয়ে ফেলার উপায় বাতলে দিতে চাইলে সে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারত? অথচ এ সব কিছুর চাবিকাঠি যাঁর হাতে, যিনি ইতোমধ্যেই অসম্ভব সব আশার দরজা খুলে দিয়েছেন তাঁকে বেমালুম ভুলে বসেছে তার স্বার্থপর মন, হিসেবী মস্তিষ্ক।
ওযুর পুরোটা সময় নিজেকে ধিক্কার জানিয়ে গেলো ফাবিহা। জায়নামাজে দাঁড়িয়ে লজ্জায় মাথা ওঠাতে পারল না। তার ইচ্ছে হচ্ছিল মাটি ফাঁক করে ভেতরে ঢুকে যেতে। ছি ছি ছি! এত স্বার্থপর সে? এতখানি!
সিমিকে বগলদাবা করে ফাবিহা উপরে গেলো। সাবিহা আপা অনেকদিন আগে, সেই রফিক ভাই থাকতে একটা ডায়েরি চেয়েছিলেন। কতগুলো দিন হয়ে গেল! অথচ আজও দেয়া হয়নি। কফি ডায়েরির দ্বিতীয়টা তাই সে সাবিহার জন্য নিয়ে এসেছে। কাল এগুলোর ছবি পোস্ট করে অর্ডার নেয়া শুরু করবে।
উঠতে উঠতে সিমি বলল, “আজকে যে আপা এসেছিল, সে আপনার বান্ধবী?”
“কে?” ফাবিহা সাথে সাথেই মনে করতে পারল না।
“দুপুরে আসলো যে?”
“ওহ!” ডায়েরির কাজ স্বচক্ষে দেখতে আজ এক ক্লাসমেট এসেছিল। ফাবিহা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “নাহ! বান্ধবী হবে কেন? এমনি এক ক্লাসে পড়ি। শখ করে ডায়েরি দেখতে এসেছিল। কেন?”
“আগে কোনোদিন দেখিনি। তাই জিজ্ঞেস করলাম।”
ফাবিহা চোখ কুচকে বলল, “এই মেয়ের বিরক্তিকর একটা স্বভাব আছে। রাস্তা-ঘাটে এমন জোরে হাসাহাসি শুরু করে! উফ! এর সাথে হাটলে আশেপাশের দশজন না চাইতেও চোখ ঘুরিয়ে তাকায়। বিরক্তিকর!”
দোতলায় উঠে সিমি সাবিহাকে ডেকে দিয়েই রিফাতের কাছে চলে গেছে। সাবিহা ওড়নায় হাত মুছতে মুছতে বলল, “কেমন আছো ফাবিহা? আপাকে একটু দেখতে আসতেও ইচ্ছে করে না?” তার দুগাল ছড়ানো হাসিতে ফাবিহা লজ্জাই পেলো।
বিব্রত কন্ঠে বলল, “সরি আপা।”
“সরি বললে হবে না! এখন আমার সাথে এক কাপ চা খেতে হবে। স্বামী বিদেশ, আমার বিরহ বোঝ তুমি? বুঝলে একটু শোক প্রকাশ করতে অন্তত আসতে।”
ফাবিহা হেসে বলল, “এরপর থেকে তাহলে শোক শোক ভাব নিয়ে আসব।”
টেনে ওকে বসিয়ে পলকের ভেতর চা নিয়ে এলো সাবিহা। কাছে বসতেই ফাবিহা কাগজে মোড়ানো ডায়েরি এগিয়ে দিলো। ক্ষীণ গলায় বলল, “আপা, আপনার ডায়েরিটা।”
“দেখি দেখি!” চোখেমুখে উৎসাহ খেলে গেল তার। ডায়েরি উল্টে-পাল্টে অবাক কন্ঠে বলল, “পুরোটা তুমি হাতে বানিয়েছো!”
“জী।”
“আল্লাহ! এত্তো সুন্দর!” নাকের কাছে ধরল সে। “কফি কফি ঘ্রাণ আসছে?”
“কফি দিয়ে রঙ করেছি।”
চোখ বড় বড় করে সাবিহা বলল, “এত বুদ্ধি নিয়ে ঘুমাও কীভাবে!” ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে আবার বলল, “কফি দিয়েছ, নষ্ট হয়ে যাবে না?”
“না, রোদে শুকিয়ে নিয়েছি ভালো করে।”
কয়েকবার এপাশ ওপাশ করে দেখল সাবিহা। আপ্লুত কন্ঠে বলল, “খুব খুব সুন্দর হয়েছে!”
“থ্যাংকিউ।” ফাবিহা স্মিত হাসল।
“এটার দাম কেমন বলো তো! আমি কিন্তু সবার চেয়ে বেশি দাম দিয়ে কিনব, কেউ যেন আমাকে টেক্কা দিতে না পারে!” সে উঠতে গেলেই ফাবিহা খপ করে তার হাত ধরে ফেলল।
অনুনয় করে বলল, “আপা, কাইন্ডলি আপনি এটার দাম দেবেন না! প্লিজ!”
সাবিহা অবাক হয়ে গেল, “কেন!”
“এটা আমি আপনাকে উপহার দিলাম। ভালোবেসে দিয়েছি আপা। প্লিজ! এটার টাকা নিয়ে কোনো আলাপ করবেন না!”
সাবিহা হেসে ফেলল, “বাঃ রে মেয়ে! খুব কথা জানো তো! আচ্ছা যাও, এটা নিলাম। এরপর নিলে কিন্তু কিনেই নেব।”
“জী, ইনশাআল্লাহ।”
ফাবিহা দম ছেড়ে বাঁচল। ভয়ে ভয়ে ছিল সেদিনের বিষয়ে সাবিহা কিছু জেনেছে কি না এই নিয়ে। কিছু কিছু মানুষ থাকে যারা মনে ভাব লুকাতে পারে না। সাবিহা সেই শ্রেনীর। তেমন কিছু হলে তার চোখ-মুখ দেখেই বোঝা যেত।
সেই সাথে বাড়ল সাকিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা। লোকটা কিচ্ছু না করেই তাদের জন্য অনেক কিছু করে যাচ্ছে।
নিশ্চিন্ত হয়ে খানিক আলাপের পর ফাবিহা উঠতে যাবে, তক্ষুণি তাকে আটকে দিলো সাবিহা। ডাইনিং থেকে টেনে নিজের ঘরে নিয়ে দরজা এলিয়ে দিলো। ফাবিহার দু’হাত ধরে বলল, “তোমার আবদার আমি রেখেছি, এবার আমারটাও তোমাকে রাখতে হবে!”
তার এমন ব্যাবহারে ভীষণ অবাক হলো ফাবিহা। সেভাবেই বলল, “কী আবদার আপা?”
তাকে বিছানায় বসিয়ে সাবিহা ওয়্যারড্রোব থেকে কাপড়ে পেঁচানো কিছু একটা নিয়ে এলো। ফাবিহার হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে নিচু কন্ঠে হড়বড়িয়ে বলল, “এগুলো একদম আমার নিজের টাকা। প্লিজ তুমি এটা নাও! অবশ্যই ধার হিসেবে। যতগুলো কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হয় করে ফেলো। কোনো সুদ-টুদ কিচ্ছু থাকবে না! আমি তোমার বড় বোনের মতো না বলো? তোমাদের এভাবে দেখা যাচ্ছে না ফাবিহা! চাচার শরীরের কী অবস্থা হয়েছে! নিজের দিকে তাকিয়েছ? তুমি তো কাজ করছই, আমাকে আস্তে-ধীরে শোধ করে দিও। কেউ জানবে না। তুমি অন্তত একটু চাপ মুক্ত থাকতে পারবে। প্লিজ ফাবিহা!”
ফাবিহা বিস্মিত ভঙ্গিতে হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেয়া দুই বান্ডিল টাকার দিকে তাকালো। কাপড়ের ভাঁজ থেকে এক হাজার টাকার অসংখ্য নোট উঁকি দিচ্ছে। কত টাকা হবে এখানে? দুই লাখ? ঋণের অর্ধেকের বেশি! ফাবিহা আস্তে করে হাত দুটো সরিয়ে নিলো।
ফিসফিস করে বলল, “যে ভুল আম্মু একবার করেছে, সেটাই আমাকে রিপিট করতে বলছেন আপা?”
সাবিহা অবুঝের মতো করে বলল, “চাচী? আমাকে তো সুদ দিতে হবে না ফাবিহা!”
“কোনো অভিভাবক ছাড়া টাকার লেনদেন করাটাই ছিল আম্মুর জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ভুল। আমিও তাই করব?”
“তাহলে সাক্ষী রাখি! ভাইয়াকে ডাকি! ও মরে গেলেও কাউকে বলবে না।” সাবিহা উঠতে গেলে ফাবিহা তার হাত ধরে ফেলল।
দূর্বল কন্ঠে বলল, “লোকের সামনে এই লজ্জাটুকু আমাকে দেবেন না প্লিজ!” আবার করুনা! ফাবিহার বুক ভেঙে আসছিল।
“তাহলে?” সাবিহা বুঝতে পারছিল না কোন উপায় অবলম্বন করবে।
ফাবিহা মন্থর গতিতে উঠে দাঁড়াল। দেখে মনে হলো শরীরটা বহু কষ্টে টেনে তুলল।
“আপনি চিন্তা থেকেই এ কাজটা করতে চেয়েছেন আমি বুঝতে পেরেছি আপা। কিন্তু যদি আমার স্বস্তি চান, তবে এই আবদারটা ফিরিয়ে নিন প্লিজ! আর কারো থেকে কোনোরকম ধার করে আমি বোঝা বাড়াতে চাই না!”
“কিন্তু এগুলো দিয়ে তো তুমি বাকিদের টাকা মিটিয়ে দিতে পারবে!” সাবিহা খুব চেষ্টা করল তাকে বোঝানোর।
“সাবিহা আপা, আমরা আপনার ভাড়াটে। দু মাসও হয়নি এসেছি। এর মাঝেই যে আপনি আমাদের এভাবে আপন করে নিয়েছেন সে জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু একটা কথা জানেন কী! টাকার হিসেব এলেই সম্পর্কের হিসেব বদলে যায়। একটা হাতকে উপরে উঠতে হয়, আরেকটা হাতকে নিচে নামতে হয়। মুখে না বললেও তখন আপনি দাতা, আমি গ্রহীতা। ভালোবাসার সমীকরণটা তখন আর এমন থাকবে না আপা! এই নির্মল সম্পর্কে একটা কঠিন হিসেব যুক্ত হবে। একটু এদিক ওদিক হলেই সেটা বিচ্ছিরি মোড় নিতে সময় নেয় না। আমি আপনার সাথে তেমন সম্পর্কে যেতে চাই না আপা। আপনি আমাকে ছোট বোন ভেবে আপন করে নিয়েছেন, সে জায়গা থেকেই আমার জন্য দোয়া করুন। আমার হাতটা যেন জীবনে আর কখনো নিচে না যায়।” ফাবিহার গলা কেঁপে উঠলো।
সাবিহা তড়িঘড়ি করে বলল, “আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি…!”
“জানি আপা। এজন্যই এগুলো বললাম।” বড় করে নিশ্বাস নিয়ে সাবিহার হাত ধরল সে, “আপনি আমার বড় আপা, আপনার চিন্তাটুকু আমি নিলাম, এই দুশ্চিন্তাটুকু আপনাকে ফিরিয়ে দিলাম।” বলে টাকার বান্ডিল তার হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল ফাবিহা। হেসে বলল, “আশা করি বাড়িওয়ালী কিছু মনে করেননি!”
সাবিহা ছলছল চোখে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “আল্লাহ তোমার এই সম্মানটা কোনোদিন যেন ভূলুণ্ঠিত না করেন!”
ফাবিহার বুকটা কেঁপে উঠল। আহা! সে সম্মান তো ইতোমধ্যেই জনসম্মুখে ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে!
যাওয়ার সময় ফাবিহা বলে গেল, “এই কাজটা আর করবেন না আপা। আমাকে বিশ্বাস করেছেন এটা একপাশে। কিন্তু ভাইয়াকে না জানিয়ে এমন ঝুঁকি নেবেন না। সে-ও আপনাকে বিশ্বাস করে।”
ফাবিহা চলে গেলে টাকাগুলো আগের জায়গায় রেখে দিলো সাবিহা। গতকালই সাকিনকে দিয়ে টাকাগুলো তুলে এনেছিল। বরাবরই তার কথা কম বলার অভ্যেস। একবারও জিজ্ঞেস করেনি সাবিহা এই মুহূর্তে এতগুলো টাকা দিয়ে কী করবে। জিজ্ঞেস করলেই বরং বিপদ ছিল। ভাইকে সে না বলতে পারতো সত্যিটা না-ই বা মিথ্যে।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পেছনে ঘুরতেই ভূত দেখার মতো করে চমকে উঠল সে। সাকিন তার বাথরুম থেকে বের হচ্ছে।
সাবিহা চাপা কন্ঠে বলল, “এতক্ষণ তুই বাথরুমে ছিলি!”
“হু।” পাপশে পা মুছতে মুছতে উত্তর দিল সাকিন।
“তোর বাথরুমে কী হয়েছে?”
“সিমি রিফাতকে পরিষ্কার করাচ্ছে।”
রিফাত তার কোলে ছিল। সে অবস্থাতেই বড় কাজ সেড়ে দিয়েছে। তৎক্ষণাৎ ওকে সাকিনের বাথরুমে নিয়ে গেছে সিমি। উপায়ান্তর হয়ে সাবিহার ঘরে এসেছে সাকিন। তার হাতের কাপড় দেখেই সাবিহা বুঝতে পারছে এই রাতে বেচারাকে গোসল করতে হয়েছে।
সাবিহা এগিয়ে এসে বলল, “তুই কি সব শুনে ফেলেছিস?”
এক পলক তাকালো সাকিন।
“হ্যাঁ।”
চোখ কপালে উঠিয়ে সাবিহা বলল, “যখন দেখলি আমরা এসেছি তখন বেরিয়ে যেতে পারলি না?”
“তখন বের হওয়ার মতো অবস্থায় ছিলাম না।”
“পরে বের হলি না কেন?”
“যে মেয়ে ফাঁকা ঘরে তোর প্রস্তাব শুনেই সাইলেন্ট হয়ে যায় সে আমাকে দেখলে স্ট্রোক করে ফেলত।”
“তাও ঠিক! কিন্তু তোর কোনো শব্দও তো পেলাম না!”
“এতক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম, তোর কথা শেষ করার অপেক্ষায়।”
সাকিন চলে গেল। সাবিহা ভাইয়ের মুখ দেখে তার মনোভাব আন্দাজ করতে পারল না।
—
ঘরে যেয়ে সবকিছু ভুলে যেতে চাইলো ফাবিহা। সাহায্য করল আজ দুপুরে ঘুরতে আসা তার বান্ধবী। সে ডায়েরির অসম্ভব সুন্দর কিছু ছবি পোস্ট করেছে, যেগুলোর রেফারেন্সেই পুরো সাতটা অর্ডার কনফার্ম হলো। প্রত্যেকটা অর্ডার কনফার্ম করার সময় মরমে মরে গেল ফাবিহা। এই মেয়েটার বদ অভ্যেস নিয়েই আজ সে সিমির কাছে নাক সিটকেছিল!
—
ঘুমের আগে এক পাতা রোজনামচা লেখার অভ্যাস করেছে সাকিন। অভ্যাসটা বেশ নতুন। এখনও স্বভাবে পরিনত হয়নি। যেন দ্রুতই হয়ে যায় সে চেষ্টা করছিল সে। আজকের ঘটনাবলী লেখার সময় ফাবিহার ঘটনাটা কালির স্রোতে মসৃণভাবে বেরিয়ে এলো।
“এমন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মেয়ে আমি দুটো দেখিনি! কেউ কিছু নেয়ার কথা বললেই মেয়েটা এমনভাবে আঁতকে ওঠে যেন তাকে কেউ কিছু দিতে চায়নি, বরং নিতে চেয়েছে।
জীবনের বড় একটা সময় পরাশ্রয়ীর মতো বাস করার ফলে দানের ফাঁকটা আমি ভালোই বুঝি। আগে দেয়া তারপর সেই দেয়ার নাম ধরে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করা— বহুল প্রচলিত আঘাত। তবু না করতে পারি না। এটা আমার ভয়ংকর দূর্বলতা, কাউকে না বলতে পারি না। এই মেয়ের মাঝে সে গুণটি খুব প্রকটভাবে আছে। কারো মন না ভেঙেও সে মুখের ওপর না বলে দিতে পারে। সম্ভবত এ জন্যই…”
“ভাইয়া!”
সাকিন মাথা ওঠাল। সাবিহা দরজা এসে দাঁড়িয়েছে।
“বল।”
সাবিহা বিড়াল পায়ে এগিয়ে এলো। বিছানার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল, “একটা কথা বলতাম।”
“বল।”
খানিকক্ষণ ইতস্তত করে সাবিহা বলেই ফেলল।
“ফাবিহা মেয়েটাকে তোর কেমন লাগে?”
কথাটা ধরতে পারল না সাকিন। কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, “কী?”
“আমাদের নিচের তলার ফাবিহা, ওকে তোর কেমন লাগে?”
চলমান~
(কষ্ট, ক্লান্তি সবকিছু ছাপিয়ে যায় আপনাদের উচ্ছ্বাস আর ভালোবাসা। যেভাবে দুহাত বাড়িয়ে আমাকে গ্রহণ করেন…! একেকটা পর্বের প্রতিটা অক্ষর চিৎকার করে বলে— আমি সার্থক, সার্থক, সার্থক!
আপনাদের প্রতি এই অধমের কোচড় ভর্তি ভালোবাসা, ভালোবাসা, ভালোবাসা! 🥹)