ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনজোছনা

পর্ব 31

লেখক: বিনতে ফিরোজ

#বনজোছনা
৩১.

ফরিদ আহমেদের খুব ইচ্ছে ছিল চূড়ান্ত কথা-বার্তার সময় মেয়েটাকে সাথে রাখবেন। কিন্তু তার মিডের ডেট দিয়েছে। সকালে দুটো নাকে-মুখে গুঁজে উর্ধ্বশ্বাসে পরীক্ষা দিতে গেছে। এর মাঝে আর এসব বলে দুশ্চিন্তা হাত বদল করতে চাননি ফরিদ। প্রস্তুতি নিয়ে নিজেই এসেছেন। এমন আর কী! দুটো কথাই না হয় বলবে!

এমন আর কী বললেও মনের টগবগে উত্তেজনা দমিয়ে রাখতে পারলেন না তিনি। তার বই কেউ ছাপাতে চায়— ভাবনাটা তাকে স্থির থাকতে দেয় না। একটা সূক্ষ্ম তরঙ্গ তিরতির করে কাঁপতে থাকে অহর্নিশ। একটা স্বপ্নালু সুর থেমে থেমে বাজতে থাকে হৃদয়ের আঙিনায়। নিশ্ছিদ্র নীরবতায় তা টের পান ফরিদ। বুকের রক্ত ছলকে ওঠে।

মনটাকে ব্যস্ত রাখতে মেন্যু কার্ডে চোখ রাখেন। কী অর্ডার দেয়া যায়?

ভাবতে ভাবতেই দুজন হাজির হলো। দুজনেই বয়সে তার চেয়ে অন্তত এক প্রজন্ম পিছিয়ে। তাদের মাঝে একজনের চেহারা তুলনামূলক একটু বেশি গম্ভীর। পাশেরজনের মুখ হাসি হাসি।

গম্ভীর চেহারার ছেলেটা বেশ ভদ্র কন্ঠে সালাম দিয়ে বলল, “আপনিই ফরিদ আহমেদ?”

“জি।”

নাম জানিয়ে ছেলেটা বলল সে-ই প্রকাশক। ফরিদ অবাক হলেন। এইটুকু বয়সেই এতগুলো বই ছাপিয়ে ফেলেছে! চাট্টিখানি কথা তো নয়! লেখকদের সামলানোও তো মুশকিলের কাজ।

পাশের জন সহকারী। প্রকাশক ছেলেটা বসে পেশাদার ভঙ্গিতে আলাপ শুরু করল। সেই ফাঁকে সহকারী তিনটে চা অর্ডার দয়ে দিলো। ফরিদ কেমন চা নেবেন সেটা জিজ্ঞেস করতেও ভুলল না। এই অতি তুচ্ছ গুরুত্বটুকুন পেয়েই তিনি গলে গেলেন। সাথে আফসোস হলো এই ভেবে যে— ফারদিনের বয়স এদের চেয়ে ক’ বছরই বা কম? ছেলেটা চাইলে কি এমন কিছু অথবা এর চেয়েও ভালো কিছু হতে পারত না? একটা ব্যর্থতার ছিন্ন বাতাস বুক চিরে বেরিয়ে এলো।

“স্যার, নবীন লেখকদের প্রথম বইয়ের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত সত্ত্ব নিয়ে নিই। এতে লেখকের সেফটি যেটা থাকে— প্রথম বই ফ্লপ হলেও তার কোনো চিন্তা নেই। নির্ভাবনায় তিনি দ্বিতীয় বইয়ের কাজ করতে পারবেন। যখন তার একটা মোটামুটি ফ্যানবেইজ তৈরি হয়ে যায় তখন আমরা রয়্যালটিতে শিফট করি।”

ছেলেটার চোস্ত ভঙ্গির কথায় ফরিদ একটু খেই হারিয়ে ফেলছিলেন। বিভ্রান্ত কন্ঠে বললেন, “সত্ত্ব নিয়ে নেন বলতে?” হাঁটুর বয়সী হলেও ওর পেশাদার ভঙ্গিটা এতখানি প্রকট যে মুখ দিয়ে আপনাতেই আপনি সম্বোধন বেরিয়ে গেলো।

“বিষয়টা এমন— আমরা আপনার বইটা একটা নির্দিষ্ট আ্যমাউন্টের বিনিময়ে কিনে নেব। এই অনারিয়াম ফর্মার বেসিসে হিসেব করা হয়। ষোলো পৃষ্ঠায় এক ফর্মা। প্রত্যেক লেখককেই আমরা ফ্লোর দিয়ে থাকি। আপনার নিজের ফর্মার দাম আপনি নিজেই ধরবেন। এর আগে কে কত নিয়েছে সে হিসেব আপনাকে করতে হবে না। যদি মনে করেন অন্য কারো থেকে আপনার লেখার মান উন্নত, তাহলে অনারিয়ামের হিসেবে তারচেয়ে নির্দ্বিধায় বেশি নিতে পারেন, যদিও তিনি অনেক সিনিয়র হন।”

“এখানে সেফটি কোথায়?”

“আপনার বই এক কপিও যদি বিক্রি না হয় তবুও আপনি পুরো অনারিয়াম পাবেন।”

চা এসে গেছে। ফরিদ সাথে সাথেই চুমুক দিতে পারলেন না। অনেক কপি যদি বিক্রি হয় তবে? — এই ভাবনাটা তার মনে এলো না। কেননা তিনি নিশ্চিত তার বই তেমন বিকিকিনি হবে না। চেনেই বা কজনা? সেদিক দিয়ে এখানে আর্থিক নিশ্চয়তা বিদ্যমান।

কিন্তু তিনি তো চান তার বই অনেকের হাতে উঠবে। সাহিত্য পড়ুয়ারা তাকে চিনবে। এই উপায়ে কি সেটা সম্ভব হবে?

তিনি বললেন, “দেখুন, আমার লেখা বইয়ে আসবে, মানুষ কিনে পড়বে, আমার নামটা একটু পরিচিতি পাবে— এই এতটুকুই আমার ইচ্ছে। অনেক বই বিক্রি হবে বা বই বিক্রি করে খুব টাকা কামাবো সে রকম চিন্তা আমার নেই। টাকাটাই কি সব!” কথাটা বলেই থমকে গেলেন। ফাবিহা ডাক্তার দেখানোর পর নূরজাহানকে আর ওষুধ কিনে দেয়া হয়নি। খাওয়ার ঘরের ফ্যান নষ্ট হয়ে গেছে, সেটা সারানো হয়নি। কদিন ধরে ফ্রিজ থেকে নাকি সমানে পানি পড়ছে, শুনেও না শোনার ভান করে থাকছেন ফরিদ। টাকাটাই কি সব নয়! একটা পাল্টা প্রশ্ন তার সম্পূর্ণ সত্ত্বাকে দখল করে নিলো।

প্রকাশক ছেলেটা হেসে বলল, “জি স্যার, অবশ্যই টাকা সব নয়। তবে অনেককিছু। আর্থিক সচ্ছলতা আপনাকে পরবর্তী কাজ নিশ্চিন্তে করার সুযোগ দেবে। আপনার তেমন ফ্যানবেইজ এখনও তৈরি হয়নি। এই মুহূর্তে কষ্ট করে লেখার বিনিময়ে যদি একটা মানসম্মত অনারিয়াম আপনি পান সেটুকু আপনাকে ফ্যানবেইজ তৈরি করার শক্তি জোগাবে। সত্ত্ব কিনে নিলে আমরাও ভালোভাবে মার্কেটিং করতে পারি। যেহেতু বই কিনেই নিয়েছি, সেগুলো তো আমাদের সেল করতেই হবে! রয়্যালটিতে বই বিক্রির ভার দুই পক্ষের থাকলেও এই পদ্ধতিতে সিংহভাগ দায়িত্ব থাকে প্রকাশনীর। ফলে মুদ্রণ যে শেষ হবে সে বিষয়ে নিশ্চিত। অন্তত একটা ভালো পরিমাণ মানুষের কাছে আপনি পৌছাতে পারবেন।”

মানুষের কাছে পৌছানোর প্রস্তাবটা ফরিদকে লোভী করে তুলল। পুরো প্রক্রিয়াটাই প্রথম চেষ্টা হিসেবে তার কাছে নিরাপদ এবং যোগ্য বলে মনে হলো।

তিনি সায় দিয়ে বললেন, “বেশ। আমাকে এখন কী করতে হবে?”

সহকারী ছেলেটা মুহূর্তের মাঝেই একটা খসড়া চুক্তিপত্র বের করে ফেলল। তার দিকে এগিয়ে দিয়ে প্রকাশক বলল, “আপনার চুক্তিপত্রও এমন হবে। ফর্মা প্রতি আপনি কত নিতে চান সেটা জানালেই আমরা ফাইনাল কপি বানিয়ে ফেলতে পারব। যদি আপনার সময় থাকে তবে কাজটা আজই সেড়ে যেতে চাচ্ছি। ‘নওরোজ’ প্রিন্টে আনার জন্য আমরা খুবই উদগ্রীব।”

ছেলেটার উদগ্রীবতার স্ফুলিঙ্গ ফরিদকে ছুঁয়ে গেল। চাপা পড়া উত্তেজনা আবার নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে শুরু করল।

ফরিদ হিসেব করলেন। মোট মিলিয়ে নওরোজের শব্দ সংখ্যা একচল্লিশ হাজার হবে।

তিনি বললেন, “একচল্লিশ হাজার শব্দের বই কত পৃষ্ঠা হয়?”

“আ্যরাউন্ড দেড়শ। আট ফর্মা।”

“আপনি একটু ধারণা দিন। আমার তো এই প্রথম কাজ।”

“আমাদের সর্বোচ্চ মূল্যের যে কাজ, তার প্রতি ফর্মায় ছয় হাজার করে গেছে। ছয় হাজারের কাজ ওই একটাই। তাছাড়া আমরা সাধারণত দুই থেকে আড়াই, তিন এই রেঞ্জে বেশি কাজ করে থাকি।”

“আপনি কি আমার লেখাটা পড়েছেন?” বিভ্রান্ত কন্ঠে বললেন ফরিদ। তিনি বুঝতে পারছেন না কত টাকা চাইলে সেটা না বেশি হবে, না কম।

“জি, আমি নিজেই পড়েছি।”

“তাহলে আপনিই বলুন একটা রেঞ্জ।”

“স্যার, এক্ষেত্রে আমরা সবসময় লেখকদের প্রায়োরিটি দিয়ে থাকি।”

“আমিই আপনাকে বলছি। আমার যেহেতু ধারণা নেই আপনি একটু সাহায্য করুন।”

কপাল কুচকে খানিকক্ষণ ভাবল ছেলেটা। তারপর বলল, “আমার মনে হয় তিন হাজার আপনার জন্য ভালো হবে। যদিও এটা অবশ্যই আপনার মেধার মূল্য নয়। তবে ব্যাবসায়িক হিসেবে, আই থিংক এটা কাজ করবে।”

ফরিদ মনে মনে হিসেব করে ফেললেন। তিন আষ্টে চব্বিশ। চব্বিশ হাজার! আর কিছু মিলিয়ে দিলেই তো ওই নর্দমার কীটের মুখে টাকাগুলো ছুঁড়ে দিতে পারবেন, যে ফাবিহাকে জামানত রাখার কথা বলার সাহস করেছিল। উত্তেজনার আগুনে এক ফোঁটা প্রতিশোধের ঘি পড়ে বুকের ভেতর দামামা বেজে উঠল।

ফরিদ বিনয় দেখিয়ে আর নিষেধ করলেন না। বললেন, “বেশ! আপনার যদি মনে হয়, তবে তাই হোক।”

“কাইন্ডলি একটু সময় দিবেন স্যার!”

বলে সহকারীকে কী সব বুঝিয়ে দিয়ে চুক্তিপত্র বানাতে পাঠিয়ে দিলো। তিনি জানিয়ে দিলেন— ফরিদ আহমেদ— এই নামেই বই আনতে চান।

এই ফাঁকে প্রকাশক প্রচ্ছদ কেমন হবে সে বিষয়ে তার থেকে একটা ধারণা নিয়ে নিলো। প্রতি পদে পদেই ফরিদ অবাক হন। টাকা ছাড়া যে বই বের করা যায় তা তিনি কস্মিনকালেও চিন্তা করেননি। সে জন্য প্রথম যখন এই প্রস্তাব দেখেছিলেন, আনন্দে হুশ হারানোর ঠিক আগ মুহূর্তে মনে হয়েছিল স্বপ্ন পূরণ করতে হলেও অনেকগুলো টাকা দরকার। তারপর প্রকাশক আশ্বস্ত করল কোনো টাকা লাগবে না। বইয়ের সব টাকা তাকে বুঝিয়ে দেবে। এখন আবার প্রচ্ছদ তারাই করছে। ফরিদের মনে হলো এরচেয়ে সুন্দরতম স্বপ্ন তিনি জীবনে দেখেননি!

চুক্তিপত্রে সই করলেন দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে। প্রথম পক্ষ হলো প্রকাশনী। সাক্ষী হিসেবে রইলো সহকারী ছেলেটা। সই করার সময় দেখলেন যদিও চব্বিশ হাজার হিসেবে এসেছিল, কিন্তু সেটা পঁচিশ করে রাউন্ড ফিগারে দিয়ে দেয়া হয়েছে। বিদায় নেয়ার জন্য উঠবেন, সে সময় একটা খাম বাড়িয়ে দিলো প্রকাশক।

“এটা আপনার অগ্রিম অনারিয়াম স্যার। চুক্তি করে আমাদের সুযোগ দিয়েছেন সে জন্য আমাদের তরফ থেকে একটা গ্র‍্যাটিফিকেশন। বাকিটা আশা করছি এই সপ্তাহের মাঝেই দিয়ে দেয়া হবে। আপনার ফাইল আজই প্রুফে দিয়ে দেব। কাজ ঠিকমতো এগোলে এই মাসেই বই চলে আসবে।”

একটা স্বপ্ন স্বপ্ন ঘোর থেকে বের হলেন তিনি। বিদায়ের সময় তাদের প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত আটটা বই উপহার হিসেবে ধরিয়ে দিলো ওরা। গাড়িতেই এনে রেখেছিল। শুরুতে দিতে ভুলে গিয়েছিল বলে ক্ষমা চাইলো।

আনন্দের আতিশয্যে দূর্বল বোধ করছিলেন ফরিদ। আশপাশ বুঝতে বুঝতে চেয়ারম্যানের বাড়ি পৌছুলেন। তারা নাকি দুজন পড়বে। সপ্তাহে পাচঁদিন, দশ হাজার টাকা দেবে। চোখ বন্ধ করলেই লোকটার চেহারা দেখতে পাচ্ছিলেন তিনি। ফাবিহার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই মাসেই টাকাটা ওর মুখে ছুড়ে দিতে পারবেন না?

কতরকম হিসেবই না করলেন! ব্যাচ করে যাদের পড়াতে চেয়েছেন সেখানে নতুন দুজন ছাত্র এসেছে। এতে অবশ্য়ি খুব খুশি হওয়া যায় না। ছাত্ররা প্রথম এক-দু সপ্তাহ শিক্ষকদের পরীক্ষা করে থাকে। ভালো লাগলে থাকে, না লাগলে সটকে পড়ে এমনভাবে যে রাস্তায় দেখলেও মুখ ফিরিয়ে তাকায় না। ভাবটা এমন রাস্তায়ই তাদের থেকে টাকা চাইবেন ফরিদ।

তবু কিছু প্রচার তো হচ্ছে। আপাতত ওটাই দরকার।
সাড়ে তিন লাখ ঋণের মাঝে দু লাখ কেনল সুদ। বাকি দেড় লাখ আসল। ফরিদের মাথা ব্যাথা সুদের টাকাটা নিয়ে। তার বিশ্বাস ওটা শোধ করে দিতে পারলে বাকি টাকা দিতে কোনো অসুবিধেই আর হবে না। জীবনের যত শান্তি সব ওই সুদের টাকাটাই ব্ল্যাক হোলের মতো শুষে নিচ্ছে।

*****

“কেমন লাগে মানে?”

সাবিহা আরেক পা এগিয়ে এলো। সন্তর্পণে বিছানায় বসে বলল, “বুঝতে পারছিস না? বিয়ে তো করবি, না কি?”

সাকিনের কপালের ভাঁজ সমান হয়ে এলো। মাথা নিচু করে আবার লিখতে উদ্যত হলো সে।
“এসব কথা থাক সাবিহা।”

সাবিহা তো দমলই না, বরং আরেকটু আশকারা পেলো। গলা খানিকটা চড়িয়ে বলল, “আর কতকাল থাকবে? ঊনত্রিশ বছর কিন্তু তোর হয়ে গেছে ভাইয়া!”

“জানি।”

“জেনে বসেই থাক! বসে বসে আঙুল চোষ! আমার আর ফুপি ডাক শোনা লাগবে না!” কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল সে।

সাকিন হেসে ফেলল।
“তুই টিপিক্যাল মায়েদের মতো করছিস কেন!”

“কারণ আমি একজন ভবিষ্যত টিপিক্যাল মা! তুই বিয়ে করবি কি না বল!”

“করব না কবে বললাম বাবা!”

“করবি তাহলে এমন ভং ধরছিস কেন? ফাবিহাকে তোর পছন্দ না? কেন পছন্দ না? ও কিন্তু একের মেয়ে ভাইয়া! বিপদে পড়েছে বলে নাক সিঁটকাস না!”

সাকিন কলম রেখে ডায়েরি বন্ধ করল।
ছোট করে শ্বাস ছেড়ে বলল, “আমাকে এইই চিনলি?”

“চিনেছি বলেই তো কথাটা পাড়লাম! তুই এমন হেয়ালী করছিস কেন?”

সাকিন দুপাশে মাথা নাড়ল।
“তুই ফাবিহাকে চিনতে পারিস নি!”

সাবিহার কপাল কুচকে এলো, “কেন!”

“একবার ওকে টাকা অফার করে কালার হয়েছিস। ঋণ মেটার আগে যদি আবার এই কথা তুলিস তাহলে নির্ঘাত ও ভাববে এটা তোর সাহায্য করার আরেকটা বুদ্ধি।”

“আশ্চর্য! এজন্য বিয়ের কথা তুলব নাকি!”

“বিষয়টাই এমন হয়ে গেছে। তুই এখন ওর জন্য যেমনই ভাবিস না কেন, ও এটাকে করুনাই ভাববে।”

সাবিহা সে কথা হাওয়ায় উড়িয়ে দিল। বিরক্ত হয়ে বলল, “ফাবিহা কী ভাবছে সে খোঁজ নেয়ার জন্য আমি আছি। তুই তোর মত বল!”

সাকিন চুপ করে কলমের দিকে তাকিয়ে রইলো। একটা নীরব প্রশ্নোত্তর পর্ব তার মাঝে ঝড় তুলে দিতে চাইছে। কিন্তু সে তো ঝড় চায় না! সে চায় জীবনের এই বনঝোপের মাঝে ছোট্ট একটা শান্তির নীড়। সুখের দেয়ালে দুঃখের ছাদে একটা কুটির, যেখানে গেলে জোছনার আলো খিলখিলিয়ে হেসে তার গায়ে লুটিয়ে পড়বে। এই কাটাকুটির জীবনে সে নিজস্ব একটা খেরোখাতা চায়, যেখানে খসড়া করা যাবে নির্দ্বিধায়।

“নীরবতাকেই আমি সম্মতি হিসেবে ধরে নিলাম!” হাসি হাসি মুখে বলল সাবিহা।

সাকিন ক্লান্তির নিশ্বাস ছাড়ল, “এত তাড়াহুড়ো করা ঠিক হচ্ছে না। ওদের বিপদটা অন্তত কাটুক, তারপর চিন্তা করা যাবে।”

সাবিহা ঝট করে উঠে দাঁড়াল। মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, “পাত্র-পাত্রী সামনে রেখে অত চিন্তা করতে পারব না। তুই ঘুমা। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চিন্তা কর!” উত্তরের অপেক্ষা না করে চলে গেলো সে।

ঘরের বাতি বন্ধ করে জানালা খুলে দিলো সাকিন। এক ফালি শীতল বাতাস ঘরে ঢুকে পড়ল বাঁধনছাড়া শিশুদের মতো। বালিশে মাথা রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। বিয়ে? ফাবিহা? সমীকরণটা কি মিলছে?

—

আগে নিয়মিত এলেও মাঝে বেশ কয়েকদিন ছাদে আসেনি সাকিন। শেষ যেদিন এসেছিল, ফাবিহাকে ডায়েরির ছবি তুলতে দেখে সিঁড়িঘর থেকেই চলে গিয়েছিল। অনেকদিন পর আজ আবার এলো। কুন্দকলির সকালটা বড় স্নিগ্ধ। রাতের শরীর থেকে পাপড়ি খসে পড়ার মত করে যখন ভোরের আলো ফোঁটে, নিমের আড়াল থেকে সে দৃশ্য দেখলেই দিনের শুরুটা এক ঝটকায় ফুরফুরে হয়ে যায়। ভোর ফুলের গন্ধ মেখে থাকে তারপরের পুরোটা দিন জুড়ে।

হাঁটতে হাঁটতে ছাদের কিনার ঘেঁষে দাঁড়ালো সে। বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কৃষ্ণচূড়ার কোলজুড়ে যে আবছা কুয়াশা কুন্ডলী পাকিয়েছে তার ভেতরে বসে ডায়েরির ছবি তুলছে ফাবিহা। এই মেয়েটাকে সরাসরি খুব কমই দেখেছে সাকিন। বেশিরভাগ সময় আশপাশ থেকে দেখা। তাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে ফাবিহা কেমন দেখতে— সে হয়তো উত্তর দিতে পারবে না। মানুষের চেহারা মনে রাখার বেলায় তার মস্তিষ্ক বেশ দূর্বল।

এর মাঝেই সিমি প্রায় উড়তে উড়তে এলো। হাতে এক কাপ চা। ফাবিহাকে দেয়ার জন্য জোরাজুরি করলে সে নিষেধ করল। তাদের কন্ঠ শুনতে পাচ্ছিল সাকিন।

“পরে নিচ্ছি সিমি। হাতের কাজটা করে নিই।”

“না, পরে তো বলবেন ঠান্ডা হয়ে গেছে। আবার গরম করতে পারব না আমি! এখনই খান। ছবি কি ফুরিয়ে যাচ্ছে?”

ফাবিহা বিরক্ত হয়ে বলল, “আলোর আ্যঙ্গেলটা এখন সুন্দর আসছে। একটু পর সূর্য সরে যাবে না! সর তো! বিরক্ত করিস না।”

সিমি তবু থামল না। এবং ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে হাত ফসকে সে চায়ের কাপ পড়ে গেল ডায়েরির খোলা কাগজের উপর। অস্বস্তিকর নীরবতার মাঝেই একটা ঘুঘু ডেকে উঠল।

সাকিন তীক্ষ্ণ চোখে পরের প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল।

ফাবিহা বেশ জোরে একটা ধমক দিলো।

“এত্তো অধৈর্য কেন তুই! তখন থেকে বলছি পরে খাব, পরে খাব! এটা আজকে আমাকে ডেলিভারি দিতে হতো। উফফ!” কপালে হাত দিলো সে। পুরো ডায়েরি ভিজে একাকার হয়ে গেছে।

সিমি শুরুতেই চুপসে গিয়েছিল। এ পর্যায়ে মনে হলো সে কেঁদেই দেবে! ফাবিহা আর কিছু বলার আগেই সে এক ছুটে ঘরে চলে গেল। ঘাসের ওপর বিছিয়ে রাখা ডায়েরির পাশে বসে পড়ল ফাবিহা। নেড়েচেড়ে নিজের মনেই বলল, “কী করল জিনিসটা! এত কষ্ট করে বানালাম!”

সিমির শুকনো মুখটা মনে করে দম ছাড়ল সে। সকাল সকাল একটা ধমক দিয়ে দিল। কী এমন হতো রাগটা গিলে ফেললে? বাচ্চা একটা মেয়ে, ভুল নাহয় করেছেই। তাতে কী হয়েছে? চাইলে কি সে ডায়েরির এই ক্ষতিটা পুষিয়ে দিতে পারে না? কাজ করার সময় কত জিনিসই তো নষ্ট হয়ে যায়! এটাও হলো। দুহাতে মুখ ঢেকে বসে রইলো ফাবিহা।

সূর্য যখন রাস্তা পেরিয়ে কাকূড়চূড়ার ওপর যেয়ে থামল, তখন মাথা ওঠালো সে। এবং সামনে তাকাতেই একটা আশ্চর্য জিনিস দেখতে পেলো।

সিমি যে পাতায় চা ফেলেছিল, সে পাতার রঙ একটু বেশি গাঢ় হয়ে গেছে। এবং বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ফাবিহা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে চা দিয়ে আঁকানো একটা চমৎকার জবা ফুলের আকৃতি। ছবি তোলার জন্য কিছু পেন্সিল, কলম এনেছিল। ঝটপট একটা পেন্সিল দিয়ে ফুলটার ওপর হাত ঘোরালো সে। মুহূর্তেই সেটা সুদৃশ্য ফুলে রূপ নিলো। ফাবিহা একা একাই হেসে উঠল। কোথায় যেন একবার পড়েছিল— ভুলগুলো সব ফুল হয়ে যাক। এক্কেবারে সেটাই হয়েছে। তার খারাপ লাগা আরও এক ধাপ বাড়ল। সময় ব্যয় না করে তৎক্ষণাৎ সে ঘরের দিকে গেল সে। গলায় স্নেহ ঢেলে পরম মমতার সাথে ডাকল,

“আমার সিমি রানী কই রে!”

দৃশ্যের যবনিকাপাত ঘটার সাথে সাথেই ছাদ ছাড়ল সাকিন। অর্ধেক ঘটনা দেখে উপসংহার টানা তার আজীবনের অপছন্দের বিষয়। সুন্দর একটা সমাপ্তি তার সুন্দর সকালকে আরও খানিকটা রাঙিয়ে দিলো।

—

ফরিদের এক সহকর্মী ফাবিহার জন্য একটা সম্বন্ধ এনেছে। পাত্রের সবই ভালো কেবল আগে একটা বিয়ে হয়েছিল। তালাকের কারণ জানতে চাইলে তিনি হেয়ালি কন্ঠে বললেন, “পুরুষ মানুষের মেজাজ বোঝেন না ভাই? সে মেয়ে আবার খুব মুখরা ছিল বুঝলেন! তা ছেলের মেজাজ দমিয়ে রাখা কষ্টকর ছিল। ওইরকম মেয়েমানুষকে শাসনের ওপর না রাখলে বিগড়ে যায়।”

আর কিছু শোনার রুচি হলো না ফরিদের। এটুকু শুনেই মুখ তেঁতো হয়ে এসেছিল। মেয়েটার বিয়ে ভেঙেছে বলে মানুষ ওকে খরচের খাতায় ফেলে দিয়েছে। ভেবেছে কোনো রকমে পার করতে পারলেই তিনি বেঁচে যাবেন। ফরিদ লোকটাকে কোনো উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না। তবে তার মন জানে ওরকম জায়গায় বিয়ে দেয়ার চাইতে মেয়েকে তিনি আজীবন অবিবাহিত রাখাটাই বেশি পছন্দ করবেন।

ঘটনাটা ফরিদের মুখ হয়ে নূরজাহানের মাধ্যমে সাবিহা অবধি পৌছে গেলো। সুখ-দুঃখের আলাপ মেয়েটার সাথে করে বেশ আরাম পান তিনি। তাদের কষ্ট যে সাবিহাকেও ছুঁয়ে যায় এটা ওর চোখে-মুখেই স্পষ্ট ।

হতাশ কন্ঠে তিনি বললেন, “নিজের বোকামিতে মেয়েটার এই অবস্থা হয়েছে গো মা! বোনের ওকালতিতে মেয়ের সম্বন্ধ ঠিক করলাম। ছেলে বড় জায়গা থেকে পড়াশোনা করেছে, বড় চাকরি করে। আমাদের চোখের সামনে মানুষ হওয়া! আর কী চিন্তা বলো! কিন্তু চোখের সামনে মানুষ হলেও মানুষ চেনা দায়!” দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি।

ফের বললেন, “ফাবিহা কোনোদিনই পছন্দ করত না এসব ঘুরতে যাওয়া। আমিই জোর করে পাঠিয়েছি। এক জায়গায় সম্পর্ক করার কথা দিয়েছি, তার মান তো রাখতে হবে! সেই মান রাখার জন্য যে মেয়ের জীবনটাই এভাবে ধ্বংস করে দিয়েছি তা তো বুঝতে পারিনি!” নূরজাহানের গলা কেঁপে উঠল। “ওকে মনে হয় দোজবরেই দিতে হবে। আমার মেয়েটা…”

“কেন চাচী! আশেপাশে তাকালেই কত ছেলে পাবেন! একটা ভুল হয়েছে, মানুষকে এভাবে অন্ধবিশ্বাস করা উচিত হয়নি। কিন্তু সেই ভুলের মাশুল ফাবিহার মতো মেয়ে সারাজীবন ধরে দেবে! আপনি ভালো করে খোঁজ লাগান। ওর যোগ্য ছেলে এখনও দুনিয়ায় আছে।” মোক্ষম সুযোগটা হাতছাড়া করল না সাবিহা।

“খুব কঠিন মা! খুব কঠিন!” উদাস চোখে তাকিয়ে বললেন, “তোমার কাছে কোনো ছেলের খোঁজ থাকলে একটু বোলো। আজ না হোক কাল, মেয়েকে তো পরের ঘরে দিতেই হবে। বাকি যেমন-তেমন হোক, অন্তত চরিত্রটা যেন সাফ থাকে।”

“ছেলে তো চাচী রেডিই আছে!”

নূরজাহান অবাক হয়ে বললেন, “কে!”

সুন্দর করে হেসে সাবিহা বলল, “আমার ভাই। চেনেন তো?”

স্তব্ধ নূরজাহান খানিকক্ষণ কোনো কথাই বলতে পারলেন না। সাবিহা আস্তে করে তার গায়ে হাত দিলো, “চাচী?” ফিসফিস করে ডাকল সে।

নূরজাহান চটক কাটার মতো বললেন, “তোমার ভাই!”

“জী। কেন চাচী? তাকে আপনার পছন্দ হয় না? ছেলে হিসেবে আমার ভাই কিন্তু লাখে একটা!”

সে কথা নূরজাহান নিজেও জানেন। অন্তত তাদের এই অবস্থায় সাকিনের মতো ছেলে আশা করা আকাশ-কুসুম চিন্তা করার নামান্তর।

সাবিহা তার হাত ধরে বলল, “কয়েকদিন ধরেই বলব বলছি করে বলাই হয় নি। আপনি চাচার কাছে বলে দেখবেন। আমরা নিজেদের মানুষ, কোনো ঝামেলা হবে না ইনশাআল্লাহ।”

সে রাতে ফরিদের জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছিলেন নূরজাহান। আসতে আসতে তার প্রায় দশটা বাজল। তিনি ভাবলেন খেতে দিয়েই বাকি কথা সাড়বেন। কিন্তু বিধি বাম! তাড়াহুড়ো করতে যেয়ে রান্নাঘরে পিছলে পড়ে কোমরে বেকায়দায় ব্যাথা পেলেন। সারারাত গরম পানির স্যাঁক দেয়া হলো। শেষমেষ না পেরে একটা ব্যাথার ওষুধও খেলেন। কিন্তু কোনোকিছুতেই কোনো লাভ হলো না। শেষরাতে গা কাঁপিয়ে জ্বর আসতেই সকলে ভয় পেয়ে গেলো। সকাল হতে না হতেই ছুটল হাসপাতালে।

মেরুদণ্ডের শিরায় বেশ ভালোমতো টান খেয়েছেন নূরজাহান। সাথে দেয়ালের সাথে মুখে বারি লাগায় গাল কেটে একেবারে ঘা হয়ে গেছে। হাঁটা বন্ধ, কথা বন্ধ— নিজেকে জ্যান্ত লাশ মনে হচ্ছিল তার! হাসপাতাল থেকে ফিরতে পারলেও বিছানা ছাড়তে পারলেন না। সব খাবার বাদ দিয়ে তিন বেলা স্যুপের ওপর থাকতে হলো। সে এক ভয়ংকর দূর্যোগ!

শরীর যখন কিছুটা সুস্থ হলো, হঠাৎ একদিন সাবিহার কথাটা মনে পড়ল তার। মাঝখানে প্রায় বারোদিন গড়িয়ে গেছে। মুখ বন্ধ করেই কাটাতে হয়েছে এক সপ্তাহের বেশি। মাথাটা একটু স্থির হতেই আবার অস্থির হয়ে পড়লেন তিনি। সাবিহার প্রস্তাবটা কি এখনও বহাল আছে? ইশ! ফাবিহার বাবাকে তো বলাই হলো না! দূর্ঘটনা ঘটার আর সময় পেলো না!

নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে নূরজাহান বসে রইলেন— আজ ফরিদের কাছে এই আলাপ পেড়ে তারপরেই শান্ত হবেন।

ফরিদ এসে যখন শুনলেন নূরজাহান কিছুই খায়নি, তখন রাগ দেখিয়ে ঘরে ঢুকলেন।

“তোমার আক্কেল কী বলো তো! এখনও বিছানা ছাড়তে পারোনি অথচ জেদ দেখানো শুরু করে দিয়েছ!”

স্বামীর হাত টেনে নিজের পাশে বসালেন তিনি। চাপা কন্ঠে বললেন, “রাগ পরে করো! আগে কথা শোনো!”

ফরিদ ভুরু কুঁচকে তাকালেন, “কী কথা!”

“ফাবিহার জন্য দারুন একটা প্রস্তাব এসেছে!”

“খবরদার উল্টাপাল্টা কিছু বলবা না!”

“আহ! উল্টাপাল্টা না! আসলেই ভালো!”

“আগেরবারও এভাবেই বলেছিলে। বলো তা, কে ছেলে?”

“সাবিহার ভাই, সাকিন!” উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললেন নূরজাহান।

ফাবিহা ওষুধ নিয়ে এসেছিল মা’কে জোর করে হলেও খাওয়াবে বলে। কিন্তু তার পা দরজার বাইরেই থেমে গেলো। আনন্দিত নূরজাহান এবং স্তব্ধ ফরিদ খেয়াল করলেন না— একটা ছায়ামূর্তি তাদের দরজার সামনে অন্ধকারকে গাঢ় করে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।

চলমান~

(পর্বে কম হলেও #বনজোছনা কিন্তু সে হিসেবে #স্রোতস্বিনী-কে ছাড়িয়ে গেছে! আছেন নাকি #স্রোতস্বিনী-র কোনো পাঠক?)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 31 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন