ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনজোছনা

পর্ব 32

লেখক: বিনতে ফিরোজ

#বনজোছনা
৩২.

ওষুধের খচমচ শব্দ যথাসম্ভব কমিয়ে উল্টো পায়ে ফিরে এলো ফাবিহা। ফরিদের মুখ দেখেই সে বুঝে গেছে ঘটনা কোন দিকে মোড় নিতে পারে। দশ হাতের ভেতর তার ঘর। এই পথটুকু পাড়ি দিতেই ফেলে আসা কয়েক মাসের দৃশ্যগুলো চলচ্চিত্রের মতো তার চোখে ভেসে উঠল।

খুব সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার মাধ্যমে সে জানতে পেরেছে, ক্লাসের কয়েকজন মেয়ে তার পারিবারিক অবস্থা সম্পর্কে বেশ অনেকখানিই জানে। তাদের বর্তমান সংকট, চলমান যুদ্ধের প্রায় সবটাই। সেই সূত্র ধরেই মিলি তাকে কাজের প্রস্তাব দিয়েছিল। কাজ যদিও হয়েছে তার পারদর্শীতার ভিত্তিতেই, তবে পথ হয়েছে অভাবের প্রভাবে।

তারপর সৌমিকের সাথে দেখা, তাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজের সু্যোগ দেয়া, অন্যদের চেয়ে বেশি স্যালারি দেয়া থেকে শুরু করে প্রতি পদক্ষেপে মনে পড়ল একটি করে ঘটনা — যেখানে সবাই তাকে যোগ্য ভেবেছে— করুনা করার জন্য। তাদের জায়গা থেকে তারা হয়তো ঠিক। কেবল ফাবিহার সুখই তারা চেয়েছে— এটুকু তো তার জানা। কিন্তু সে তো তা চায়নি! সে চেয়েছিল স্বস্তি। তা এতই মরিচীকা হয়ে গেল যে ছুঁয়ে দিলেই রূপ বদল করে ফেলত।

এই এত এত অনুগ্রহ, করুনার শতছিন্ন জাল ভেদ করে যে একটি চরিত্র শুরু থেকে এই অবধি ছিল একেবারে চুপচাপ, সে হলো— সাকিন।

প্রথম দেখা হওয়ার দিনের কথা মনে করল ফাবিহা। লোকগুলোকে হালকা শাসানি দিয়ে এমনভাবে পাশ কাটিয়ে গিয়েছিল যেন এসবে তার কিচ্ছু যায় আসে না। সাবিহার কাছেও খোলাসা করেনি কিছুই। চাইলেই বলতে পারত, লোকের ভাষ্য অনুযায়ী এই বাড়িতে তারা একটা নষ্ট-ভ্রষ্ট মেয়েকে ভাড়া দিয়েছে। বলতে পারত, চেয়ারম্যান বাড়িতে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা। মানুষ তো এসব গল্পই করতে চায়! আরেকজনের দুঃখে রঙ মাখিয়ে নিজের বেরঙ অবসরটা রঙিন করতে চায়। অথচ সাকিন টু শব্দটিও করেনি। চেয়ারম্যান বাড়ির চৌহদ্দিতে সে ঘটনা এমনভাবে দাফন করে এসেছে যেন ওই নিগূঢ় সত্য সে কখনও কাউকে জানতে দেবে না। এমনকি নিজের বোন, সাবিহাকেও না!

পট পরিবর্তিত জীবনের এই ক্যানভাসে এই অবধি সাকিনই একমাত্র নীরব চরিত্র, যে অযাচিত মায়া দেখিয়ে বিব্রত করে তোলেনি, করুনার দৃষ্টি দিয়ে কোনো কিছু বিচার করেনি। খুব স্বাভাবিক আচরণ করেছে। এমনভাবে চলেছে যেন মানুষের জীবনে দুটো ঝড়-ঝাপটা আসা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। তাতে হা-হুতাশ করার কিছুই নেই। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।

বিপদ-আপদ, মায়ের অসুখ, বাবার ক্লেশ সব কিছু ছাপিয়ে একটা কথাই মস্তিষ্কে পেন্ডুলামের মতো ঢং ঢং করে বাজতে থাকল। অন্ধকার ঘরেও খুব সহজেই বিছানায় পৌঁছে গেলো সে। শীতল মেঝেতে পা ঠেকানোর সাথে সাথেই তার সমস্ত দেহ কাঁপুনি দিয়ে উঠল।

ফরিদ আহমেদ দরাজ গলায় ডাকছেন, “ফাবিহা! মা রে! দুটো খেতে দে দেখি!”

গুনে গুনে তিন মিনিট পর গেলো ফাবিহা। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বাবাকে খাবার বেড়ে দিলো।

ফরিদ আমুদে কন্ঠে বললেন, “প্রুফ তুই দেখেছিস না? আজকে প্রিন্টে যাবে। প্রচ্ছদটা কি দারুন হয়েছে বল মা!”

“আলহামদুলিল্লাহ! অনেক সুন্দর হয়েছে!”

মেয়ের হাসিমুখের দিকে তাকালেন ফরিদ। বুকটা শীতল হয়ে এলো। মনে করলেন সেদিনের কথা, যেদিন পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা গুনে গুনে ওই লোকটার মুখে আক্ষরিক অর্থেই ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। তবুও জ্বালাটা কমেনি। ওর সুস্থ-সবল মুখটা দেখে চেহারাটা ভেঙে দেয়ার বাসনা খুব কষ্টে দমন করে বেরিয়ে এসেছিলেন। বুঝে উঠতে পারেননি, মেয়ের অপমানের বদলা ঠিক কীভাবে নিলে বুকের জ্বলুনি কমবে।

আজ সেই মেয়েটার জন্যে সাকিনের বোন প্রস্তাব দিয়েছে। এমন প্রস্তাব যেকোনো বাবা মায়ের বহুল আকাঙ্ক্ষিত। ছেলে সরকারি চাকরি করে, আর কী চাই! কিন্তু ফরিদের দূর্বলতা অন্য জায়গায়। ছেলেটা চুপচাপ ধরনের। কথা বললে মন দিয়ে শোনে, জানার আগ্রহ দেখায়, মন পড়ার একটা সূক্ষ্ম চেষ্টা ওর মাঝে আছে।
এদিকে তার মেয়ের চোখে কত শত গল্প প্রতি মুহূর্তে খাবি খেয়ে বেড়ায়! হাতছানি দিয়ে যায় একটা যোগ্য শ্রোতার আশায়। সাকিন কি তার মেয়ের গল্পগুলো শুনবে? ফাবিহার অসম্পূর্ণ কাপলেটের বাকিটুকু হবে? মনে মনে আওড়লানে, “মা রে! তোর জীবনটা শান্তিতে শান্তিতে ভরে উঠুক!”

মুখে বললেন, “খেয়েছিস?”

“না। গ্যাস বেড়েছে মনে হচ্ছে।”

“এত বড় রাত না খেয়ে থাকবি? গ্যাস তো আরও বাড়বে!” চিন্তিত কন্ঠে বললেন তিনি।

ফাবিহা বলল, “সমস্যা নেই। তুমি খাও।”

খাবারের আয়োজন খুব সামান্য। বাসি ডালের সাথে দুপুরে রান্না আলু ভাজি। ফরিদ বললেন, “দুই লোকমা খা। আয় আমি খাইয়ে দেই!”

ফাবিহা হার মেনে বসে পড়ল। জানে সে এখন না খেলে ফরিদ নিজেও আরাম করে খেতে পারবেন না।

“বাবা! সব তো ছড়িয়ে ফেলছ! সুন্দর করে খাওয়াও!” ওড়না পরিস্কার করতে করতে বলল সে।

“সরি মা! আচ্ছা শোন, আমাদের আর তিন লাখ থাকল না?”

“হ্যাঁ।”

“কবে যে এটা শোধ হবে!”

“ইনশাআল্লাহ, হয়ে যাবে। তুমি চিন্তা কোরো না তো!” মুখের খাবারটা গিলে ফাবিহা বলল, “তোমার ইদানিং ফিরতে এত রাত হয় কেন বাবা?”

লজ্জালু কন্ঠে ফরিদ বললেন, “দুটো ছাত্র হয়েছে মা রে! ওদের পড়িয়ে আসি।”

“কোথায়! আমাকে তো কিচ্ছু বললে না!”

“থাকবে কি থাকবে না তাই চিন্তা করতে করতে বলিনি। বিকেলে পড়ে পাঁচজনের একটা ব্যাচ। ওদের একজনের বাড়িতেই পড়াই। সন্ধ্যার পর চেয়ারম্যানের ছেলে আর একজন। আল্লাহ আল্লাহ করে এই দুই জায়গা থেকে পনের হাজার পাবো ইনশাআল্লাহ। দুমাস গেলেই আরেকটা কিস্তি দিয়ে দিতে পারব!”

“বাসার ঠিকানা আমাকে দেবে।”

“আচ্ছা।” পরের লোকমায় ফের ফাবিহার মুখ ভরিয়ে ফেললেন তিনি। চোরা চোখে তাকালেন, যেন খুব বড় অপরাধ করে ফেলেছেন। ফাবিহা মায়া মায়া চোখে বাবাকে দেখে গেল।

কলেজ থেকে তিনি মাসে দু’মাসে যেটুকু বেতন পান সেটুকুই কেবল ঘরের পেছনে খরচ করা হয়। মাসান্তে ফাবিহা যে দশ বারো হাজার পাচ্ছে তার পুরোটাই রেখে দিয়েছে পঞ্চাশ বলে একটা কিস্তি শোধ করার জন্য। ওদিকে বাবাও চেষ্টা করে যাচ্ছেন, বরং তারচেয়ে কিছু বেশি। ফাবিহা সিদ্ধান্ত নিলো, কাজের পরিসর আরও বাড়াবে সে। আগামী মাসে অন্তত বিশ হাজার টাকা লাভ করতে হবে। তাহলে কতগুলো ডায়েরি বিক্রি করতে হবে? অন্তত সত্তরটা!

“ফাবিহা!” মুখ নিচু করে ডাকলেন ফরিদ। ডালের মরিচগুলো গুছিয়ে একপাশে রেখে দিলেন। এই জিনিসটা তার খুব পছন্দের হলেও ফাবিহা মরিচ ডলে দিলে খেতে পারে না।

“বলো বাবা।”

“আমার অনেক শখ, জানালার পাশে একটা বেশ বড়সড় চেয়ার নিব। চেয়ারের সাথেই ছোটখাটো একটা বুকশেলফ থাকবে। তোর যত বই বিক্রি করে দিয়েছিস সব তো আর কিনতে পারব না, অন্তত কয়েকটা কিনে ওখানে রাখব। তারপর ধর মাঘের মৃদু রোদের সকালে, অথবা কার্তিকের ছোট্ট বিকেলে ওখানে তোর ডায়েরিটা নিয়ে বসব। জানালা দিয়ে ধর বিশাল একটা কড়ই গাছ দেখা যাবে। যতক্ষণ না কড়ইয়ের পাতা ঝিমিয়ে পড়ে, আশপাশ নিঃঝুম হয়ে যায়, পাখিরা ঘরে ফিরে আসে— ততক্ষণ শুধু লিখব, লিখব, আর লিখব!”

ফাবিহা তন্ময় হয়ে শুনল। ফরিদের রোদপোড়া, চামড়া ঢিলে হয়ে যাওয়া লোমশ হাতটা ধরে বলল, “আমাদের ঋণ শোধ হয়ে গেলে সবার আগে তোমার এই স্বপ্নটাই পূরণ করব বাবা। ইনশাআল্লাহ, আমিই তোমাকে সুন্দর একটা চেয়ার আর বুকশেলফ কিনে দেব!”

ফরিদ মুখ ওঠান না। মেয়ের কাছে স্বপ্নের আদ্যপান্ত বলে তার ভীষণ লজ্জা লাগছে। কেমন ছেলেমানুষী হয়ে গেল! মেয়েটাকে শুধু শুধু ঝামেলায় ফেলা! ইশ!

—

লেগুনায় যেতে যেতে পাশের সিটে তাকালো সাকিন। তার কাছে সেই ভদ্রলোকের একমাত্র পরিচয়— একজন বাবা। নাম-ধাম, কোথায় কাজ করে, বাড়ি কোথায় কিচ্ছু জানে না সাকিন। কেবল জানে লোকটা একজন বাবা ছিল— যেমন বাবা হওয়ার স্বপ্ন তার পর থেকেই দেখতে শুরু করেছে সে।

সাকিনের বাবা একটু অদ্ভুত কিসিমের ছিলেন। ছেলেকে কঠিন হওয়ার, শক্ত হওয়ার শিক্ষা কোনোদিন দেননি। বলেননি— দুনিয়াটা কঠিন বাপ, এমন নরম থাকিস না। উল্টো বলেছেন, দুনিয়ায় নরম মানুষের খুব অভাব! একটা জাতিকে তুই বিলুপ্ত হতে দিস না। শেষ মানুষ হলেও তাকে টিকিয়ে রাখিস!

সে জন্যই সাকিন আজও শক্ত হতে পারেনি। ওয়ারিশ হিসেবে পাওয়া বাবার এই আদেশী সুরের অনুরোধ তাকে খোলস পরতে দেয়নি।

ফলে নিজের বাবার মতো হওয়া উচিত কি না সে বুঝতে পারে না। তবে খুব ইচ্ছে হয়, সেই ভদ্রলোকের মতো হতে। বড় মায়া করে বলতে, “মা বকা দিয়েছে? আমি বাড়ি আসি আগে! তার হচ্ছে!”

একটা দীর্ঘশ্বাস তার বুক চিরে বেরিয়ে আসে। ভদ্রলোক ওই ঘটনার দুদিন পর সেই যে গায়েব হয়েছেন, আর তার দেখা পাওয়া যায়নি। হয়তো এদিকের পাট চুকিয়ে চলে গেছেন, তার আম্মার কাছে। কবরের পাশে বসে তিনি কি আজও বলেন,

“আমার আম্মা কী করে? খাইছো মা? খাও নাই কেন! তুমি না খাইলে তো আব্বুর পেটের খাওয়া হজম হবে না মা! দেখি খাও তো! আমার সামনেই খাও!”

কলেজে যেতেও আজকাল মন সায় দেয় না। গৎবাঁধা পড়াশোনা। মুখস্থ পড়া আওড়ানো, তোতা পাখির মতো বুলি শিখিয়ে দেয়া। এসব প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসের ওপরে ছাত্র-ছাত্রীরা নির্ভরও করে না। অনলাইন, অফলাইনে তাদের অসংখ্য টিউটর আছে। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর সিলেবাস শেষ। কেবল নিয়ম রক্ষার জন্য আ্যটেন্ডেন্স দিতে আসা।

কোনো নতুনত্ব খুঁজে পায় না সাকিন। না করতে পারছে শিক্ষার্থীদের কোনো উপকার, না-ই বা নিজের। উল্টো তার বরং ক্ষতি হচ্ছে। জীবনিশক্তি ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তার ধারণা এই যান্ত্রিক জীবনে খুব বেশিদিন থাকলে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে।

সে এমন কাউকে পড়াতে চায় যার আসলেই তাকে দরকার। যে জীবন যুদ্ধে যুঝতে যুঝতে ক্ষয়ে ফুরিয়ে যাচ্ছে কর্পূরের মতো। চোখের আড়ালে, ভীষণ শ্লথ গতিতে। সে এমন কোথাও থাকতে চায় যেখানে চোখ খুললেই দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ দেখা যায়। রাশি রাশি গাছের সারি খুব অযতনে যেখানে বনের গোড়াপত্তন করেছে। যেখানে বিকেলের রেশটা থেকে যায় সন্ধ্যের পরও। জোছনায় মাখামাখি হয়ে রাত কাটে। সময়টা ফুরিয়ে যায় না, থেকে যায় গাছের পলকে, রোদের ঝলকে, সকালের কুয়াশায় অথবা সন্ধ্যের লালিমায়।

সেই কল্পিত জায়গাটা সাকিনকে হাতছানি দিয়ে ডেকে যায় অনবরত। কতদিন সে ডাক সাকিন উপেক্ষা করতে পারবে— সে জানে না।

অন্যমনস্ক হয়ে ক্লাসে ঢুকল সাকিন। রোল কল করতে শুরু করল উদাস ভঙ্গিতে,

“এইট্টি থ্রি?”

“ইয়েস স্যার!”

“এইট্টি ফোর?”

“প্রেজেন্ট প্লিজ!”

—

ফরিদ একই সাথে বেজায় অস্থির এবং অসম্ভব উদগ্রীব সময় পার করছেন। এর মূল কারণ দুটি। প্রথম কারণ, আজ রাতে তার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হবে। কোনো অনুষ্ঠান নয়, আয়োজন নয়। স্রেফ একটা পোস্ট। তাই বা কম কীসে? দুজন হলেও তো রেসপন্স করবে? তিনি তাতেই খুশি।

দ্বিতীয় এবং প্রধান কারণ— ফাবিহার বিয়ের প্রস্তাব।
গতকাল রাতে খাওয়ার সময় মেয়েকে কয়েকবার বলার চেষ্টা করেছিলেন, পারেননি। সদ্য ওরকম একটা ধাক্কা খেয়ে বিয়ে জিনিসটার প্রতি ওর বিতৃষ্ণা জন্মানো খুব স্বাভাবিক। সেই বিতৃষ্ণা থেকে যদি ও এই প্রস্তাবে না করে দেয় তবে সেটা হবে চরম বোকামি। ফরিদ চান না তার উপস্থিতিতে মেয়েটা এমন বোকামি করুক। মেয়েকে তিনি বিয়ে দিতে চান বটে, তবে কেবল সংসার করার জন্যই নয়। একটা সুন্দর এবং নিজস্ব পৃথিবী তৈরির জন্য। কুঁড়ির মতো মেয়েটাকে তিনি যত্ন করেছেন, সেই মেয়েটা তার নিজস্ব পৃথিবীতে ফুল হয়ে ফুঁটবে— এই আশায়। সে জন্য একজন যোগ্য মালি দরকার। যে নরম হাতে পাঁপড়ির পোকা যেমন সরাবে তেমনই শক্ত হাতে আগাছা দমন করবে। প্রয়োজনে সার যেমন দেবে ঠিক তেমন করেই জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচাতে পানির জোগানও বন্ধ করে দেবে নির্দিষ্ট সময়ে। অর্থাৎ তাকে একই সাথে হতে হবে নরম এবং শক্ত।

সাকিনের মাঝে এর পুরোটাই দেখতে পান ফরিদ। ওর চেহারা-ছবি নিপাট শান্ত-শিষ্ট হলেও দুচোখের তারায় একটা সুপ্ত সংকল্প থেকে থেকেই ঝিলিক দিয়ে ওঠে। চাকরি পেয়েই সে নিজেকে হনু ভাবে না। বরং নিজের অভিজ্ঞ চোখে তিনি দেখতে পান, ওর চোখ দুটো সবসময় কিছু একটা খুঁজে চলেছে। যেন কোনো কিছুর অপেক্ষায় আছে। একটা পরিকল্পনা, একটা ডাক…

এই ছেলেটার হাতে নিজের মেয়েকে তুলে দিতে পারলে তিনি বড় নিশ্চিন্ত বোধ করবেন। তার বিশ্বাস, সাকিনের দোষগুলো সহজেই ওর গুণের আড়ালে চাপা দিয়ে রাখতে পারবে ফাবিহা। কিন্তু সে কি এ কথা বুঝবে?

রাতে ফাবিহা শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, সে সময় দরজার বাইরে থেকে ফরিদের আওয়াজ পাওয়া গেল।

তিনি বলছেন, “ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হয়। বাতি যে বন্ধ!”

“এত তাড়াতাড়ি ও ঘুমায় না! তুমি ডাক দাও তো! কতদিন ধরে একটা কথা ঝুলে রয়েছে। ওদের একটা উত্তর তো দিতে হবে, না কি?” নূরজাহান বললেন।

“এতদিন যখন দেরি হয়েছে আরেকটু হোক। একেবারে কাল দিনের বেলাই কথা বলব ইনশাআল্লাহ। সবকিছু আলাপ করার একটা সুন্দর সময় আছে। রাত এগারোটার পর বিয়ের আলাপ আর নরম কোমল থাকে না। ওটা ভৌতিক আলাপ হয়ে যায়। যা হবে, কাল হবে। চলো চলো!”

নুরজাহানের বিরক্ত কন্ঠ শোনা গেল, “কী সব আজগুবি কথা বলো তুমি! বইয়েও কি এগুলোই লিখেছ নাকি?”

“তোমাকে এতবার পড়তে দিলাম, তা তুমি তো মুখ ঘুরিয়েও তাকালে না!”

“এসব আবার কী পড়ব...?”

দুজনার কন্ঠ ঝাপসা হতে হতে নীরবতায় মিশে গেল। ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বেলে সন্তর্পণে মশারি থেকে বের হলো ফাবিহা। নিঃশব্দে চেয়ার সরিয়ে দু’পা তুলে আসন গেড়ে বসল। টেবিলের অন্ধকার কোলে মশার দল আস্তানা গেড়েছে। মশারির বাইরে এক দন্ড টেকা মুশকিল!

হাতের কাছে কফি মাখানো একটা কাগজ ছিল। তাতেই লিখতে শুরু করল সে। জীবনে প্রথম নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে চিঠি লেখার উদ্যোগ নিল।

“সাকিন ভাই, আমার সালাম নেবেন।

অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত একটা বিষয়ে ভয়াবহ সাহস দেখাতে চলেছি। ছোট মানুষ ভেবে বেয়াদবি মাফ করে দেবেন— এই বিশ্বাস আমার আছে।

প্রায় তিন মাসের কাছাকাছি সময় ধরে আমরা একই গন্ডিতে বাস করছি। অথচ তিনটে দিনও আমাদের সামনাসামনি আলাপ হয়নি। তবুও আপনার কাছে বার্তা পাঠানোর একটা দুঃসাহস দেখিয়ে ফেলছি। বার্তাটা আপনার কাছে কতখানি জরুরী তা বলতে পারছি না, তবে আমার কাছে জীবন-মরণ প্রশ্ন।

আপনি কোনোভাবেই ফিরিয়ে দেয়ার মতো পাত্র নন। অপর পক্ষের ইতিবাচক উত্তর হাসিল করার সমস্ত যোগ্যতাই আপনার আছে। সমস্যাটা আসলে আর কারো না। সমস্যাটা একান্তই আমার।

আপনি হয়তো শুনে থাকবেন, ইতঃপূর্বে আমার একটা বিয়ে ঠিক হয়েছিল। প্রায় আড়াই বছর পার হওয়ার পর যখন তাদের মনে হয়েছে আমি আসলে তাদের যোগ্য নই, তখন তারা অনস্তিত্বের সে চুক্তিকে অগ্রাহ্য করে আংটি ফেরত নিয়ে খেলা থেকে নাম কাটিয়ে দিয়েছে। দুপক্ষের ভারসাম্য রক্ষার জন্য সব খেলাতেই একজন পেটকাটা থাকতে হয়। এই খেলার সে পেটকাটা হলাম আমি। মাঝখান থেকে খরচা হয়ে গেল আমার সম্মান।

এমন প্রশ্নবোধক চিহ্ন যে মেয়ের মাথায় ঝুলছে তার যোগ্যতার স্তর আরেকটু নিচে নামিয়ে দিল এক পাহাড় ঋণ। বিপদের চূড়া থেকে ঝাঁপ দিয়ে যে ঋণের অথৈ সাগরে পড়লাম, তার কোনো কূল-কিনারা নেই। কবে একটু মুক্ত হতে পারব সেটাও অনিশ্চিত।

প্রতি মুহূর্তে আশঙ্কার অধ্যাদেশ মাথায় নিয়ে ঘুরছি। তাই মানুষ ভেবে নিয়েছে দয়া দেখানোর জন্য এর চেয়ে উত্তম কেউ আর হতেই পারে না!

ভালোবাসার নামে, মায়ার লেবাসে করুণা দেখে দেখে আমি ক্লান্ত। হয়তো তারা তাদের জায়গায় ঠিক। তবে এটাও ঠিক, সে দানগুলো আমার কাছে কেবল বিষকাঁটার মতো মনে হয়। তারা স্বস্তি দিতে চায়, অথচ আমি অস্বস্তির সাগরে ডুবে মরি।

এই এত এত দয়া, এত প্রবঞ্চনার ভিড়ে যার থেকে আদতেই আমি শ্রদ্ধা পেয়েছি— সে আপনি।

প্রথম দিন বাড়ির বাইরের বিশৃঙ্খলাটা আপনি বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেননি। সাবিহা আপা যখন আমার কাছে একটা প্রশ্নও করল না— আমি খুব অবাক হয়েছিলাম! বুঝতে সময় লেগেছিল আপনি চুপ থেকেই আমার সবচেয়ে বড় উপকারটা করেছেন।

চেয়ারম্যানের বাড়ির ঘটনা আপনি চাইলেই জানিয়ে দিতে পারতেন। বরং সেটাই স্বাভাবিক ছিল। ভাড়াটে কেমন তা জানার পুরো অধিকার বাড়িওয়ালার আছে। আপনি সেটাও করেননি। এদিনও চুপ করে থেকে আমাকে ফের বুঝিয়েছেন এই ডুবতে থাকা মানুষটাকে আপনি কতখানি শ্রদ্ধা করেন।

কেউ কিছু না করেই যে এতকিছু করতে পারে— তা আমি আপনার কাছেই শিখলাম।

এই এতখানি সূচনা যে কথার দিকে ইঙ্গিত করছে— সেটা যদি আপনি নিজে জন্য অপমান হিসেবে নেন, তবে তা বরং আমার জন্যই অপমানকর।
সাবিহা আপা যে ইচ্ছের কথা প্রকাশ করেছেন, তাকে অসম্মান করব— সে দুঃসাহস আমার নেই। উল্টো আমি সে ইচ্ছেকে ভয় করি।

যে মায়া দেখিয়েছে, সাহায্য করেছে— তার উদ্দেশ্য আমার কাছে পরিষ্কার। যার চোখে আমি সবসময় করুণা দেখি— তার চোখে আলাদা করে খোঁজার মতো আর কিছুই নেই। যে আমার সাথে দুটো দিন থাকবে সে বরং আমাকে করুণা করতে বাধ্য।

মাথার উপরে ঋণের খাড়া ঝুলছে, সাথে চকচক করছে ভ্রষ্ট চরিত্রের উপাধি। ভাইটা খুঁটির বদলে অযাচিত লাঠি হয়ে গেছে। টানাটানির এ সংসার দেখলে ভেতর থেকে কেবল করুণাই আসে।

যে আমার জীবনসঙ্গী হবে, তার মনেও নিশ্চিতভাবেই এই অনুভূতিই জন্মাবে। সারাটা ক্ষণ এসব দেখতে দেখতে আমার উপরে তার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা অবশিষ্ট থাকবে না— এটাই স্বাভাবিক।

সাকিন ভাই, যে করুণা করে তার সে দয়ার্দ্র চোখ যদিও বা সহ্য করা যায়, কিন্তু যে শ্রদ্ধা করে বলে জানি তার দুচোখের ভাষা বদলে যাওয়া দেখার চাইতে শাস্তি, দুঃসহ অপমান বোধহয় আর কিছুতেই নেই!

আমার ভেতরে সর্বদা চলমান এই অস্থিরতা, এই চাপ আমার জীবনসঙ্গীকেও প্রভাবিত করবে। তিনি সর্বক্ষণ অনুভব করবেন একটা অযাচিত দায়িত্ব তার ঘাড়ে দৈত্যের মতো চেপে বসেছে। না পারবেন সেটাকে ফেলে দিতে, না-ই বা পারবেন হাসি মুখে মেনে নিতে। এই অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলাফল হবে সম্পর্কের তিক্ততা, সম্পর্কের সমীকরণ বদলে যাওয়া। চোখের ভাষা থেকে শ্রদ্ধা উধাও হয়ে যাওয়া।

এই প্রস্তাব যদি এমন কারো পক্ষ থেকে হতো যে আমাকে ইতোমধ্যেই করুণা করে, তাহলে বোধহয় আমি না করতাম না। কারণ তার চোখে বদলানোর আর কিছু নেই।

মাফ করবেন, সাকিন ভাই! আমি শ্রদ্ধার বড় লোভী। সেই লোভের ফাঁদে পা দিয়েই এই অবশ্যম্ভাবী বোকামিটা করছি। অন্তত এটুকু জেনে তৃপ্ত হব— পৃথিবীতে একজন মানুষ হলেও আমাকে আমি হওয়ার জন্য শ্রদ্ধা করে।

তুচ্ছ, অধম এই মানুষটার শ্রদ্ধা নিয়ে বেঁচে থাকার এই ইচ্ছেটুকু ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন বলে আশা করছি।”

চিঠি শেষ করে ওই কাগজেই মাথা ঠেকিয়ে দীর্ঘক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলো ফাবিহা। বেশি অযাচিত কথা লিখে ফেলেছে কি? আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিল। করুণা শব্দটা এতবার লিখেছে যে ওটা বড় চোখে বাঁধছে! তবু কেটে দ্বিতীয় চিঠি লেখার শক্তি হলো না। কাগজটা ভাঁজ করে রেখে ঘুমিয়ে পড়ল সে।

পরদিন সকাল থেকে ভাবল চিঠিটা পাঠাবে কীভাবে। সিমিকে দিয়েই দেয়া যায়। তবে সেটা বড় অস্বস্তিকর দেখায়। ভাবতে ভাবতে উপায় মিলল বিকেল বেলা।

সাকিনের বেশ কিছু কাপড় ধুয়ে উঠানে নেড়ে দেয়া হয়েছিল। সেগুলো গুছিয়ে সিমি যখন যাচ্ছিল, তখন ওকে ডাক দিলো ফাবিহা।
বলল, “কোথায় যাচ্ছিস?”

“সাকিন ভাইয়ের কাপড়গুলো দিয়ে আসি।”

“আজকে রাতে কিন্তু আমার সাথে কাজ করতে হবে!"

সিমি ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। প্রতিদিনই করে, আজ আবার আলাদা করে বলার কী আছে?
খেয়াল করল না তাকে ব্যস্ত রেখে এই ফাঁকে ফাবিহা চিঠিটা সন্তর্পণে সাকিনের শার্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছে।

নিজের জামাকাপড় সাধারণত নিজেই গোছায় সাকিন। সিমি এনে দিলেও তাকে আর কিছু করতে দেয়নি। লন্ড্রিতে দেয়ার জন্য যখন কাপড়গুলো ভাঁজ করছিল, তখন চিঠিটা পেলো সে। কে দিয়েছে বুঝতে এক সেকেন্ডও লাগল না। কিন্তু কী দিয়েছে সেটা ভাবতেই মস্তিষ্ক কৌতুহলী হয়ে পড়ল।

চিঠিটা পড়ে শেষ করতে তার সাকুল্যে লাগল দু মিনিট। আরও একবার পড়ে সেটা চোখের আড়ালে রেখে দিলো। ধীর-স্থির ভঙ্গিতে বাকি কাপড়গুলো ভাঁজ করে সাবিহার কাছে গেল।

তাকে ডেকে শান্ত কণ্ঠে বলল, “সাবিহা, আলাপটা এখানেই থামিয়ে দে।”

কোনো এক কারণে তখন সাবিহা হাসছিল। তার সে হাসিতে ভাটা পড়ল। বিভ্রান্ত কণ্ঠে বলল, “কোন আলাপ?”

“বিয়ের।” সময় নিলো না সাকিন।

“থামিয়ে দেব মানে! আমি প্রস্তাব দিয়ে দিয়েছি।”

“এজন্যই বলছি। আর আগাস না।”

“বললেই হলো! একটা মানুষকে কথা দিয়ে এসেছি, সেই কথার দাম নেই?”

সাকিন দীর্ঘক্ষণ কোনো উত্তর দিলো না। উত্তেজিত সাবিহাকে ঠান্ডা হওয়ার সময় দিলো।

বাতাসের শব্দে বলল, “আলাপটা এই পর্যন্তই থাকুক সাবিহা।” বলে সে থামল না। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চলে গেল নিজের ঘরে। বিস্মিত সাবিহা পলক ফেলতেও ভুলে গেল।

চলমান~

(বলুন, ফাবিহাপুর বক্তব্য সম্পর্কে আপনার মতামত কী?)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 32 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন