#বনজোছনা
৩৩.
ঘরে যেয়ে আজ দ্রুতই শুয়ে পড়ল সাকিন। সাবিহার প্রশ্নবাণ থেকে বাঁচার এই একটাই উপায়। মেয়েটা বিশ্বাস করে তার কাছে নিজেকে খোলা বইয়ের মতো মেলে ধরেছে। সেই বইয়ের পাতা অন্য কাউকে দেখাতে পারে না সে।
অথচ সাবিহার অবস্থা এখন এমন, তাকে ভালো কথা বললেও তার ভালো লাগবে না। এসব বললে উল্টো ফাবিহাকেই দোষারোপ করতে পারে। তারচেয়ে এই গল্পটা আড়ালেই থাক। সাবিহা জানুক— সে নিজেই আগাতে চাচ্ছে না। ফাবিহার সাথে ওর সুন্দর সম্পর্কটা নষ্ট না হোক।
একটা সমীকরণ সাজিয়েছিল সাকিন। তার শেষ নামানো হলো না। আধ খ্যাচড়া সেই সমীকরণ মনের রাফখাতায় ফেলে রেখে সে চোখ বন্ধ করল। আপাতত কিছুদিন চিন্তা থেকে ছুটি।
—
ফরিদ ময়ূখমালায় পোস্ট করা নওরোজের প্রচ্ছদ দেখছিলেন। চল্লিশটা লাইক পড়েছে। ভাবনার চাইতে অনেক বেশি। কিন্তু প্রচ্ছদটা এখনও কিছুটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। লেখকের নামটা লেখা হয়নি। তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন এ বিষয়ে। প্রকাশক জানালো একটা প্রিমিয়াম ফন্ট দিয়ে সেই নাম লেখা হবে। ফন্টটা এখনও কেনা হয়নি বলে এই বিলম্ব। আপাতত যতটুকু কাজ হয়েছে সেটুকু দিয়েই প্রচার চলতে থাকুক। এখন নাকি অনেকেই প্রচ্ছদ ভালো লাগলেই বই নিয়ে নেয়। কে লিখল, কী লিখল সেসব গা করে না। কাজেই প্রচার-প্রসার চলুক, নাম লিখে আবার একটা পোস্ট দেয়া যাবে। এ আর এমন কী!
তার যুক্তির বিপরীতে আর কিছু বলতে পারেননি ফরিদ। এখনকার ছেলেমেয়েদের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে নিজেকে নিরেট মূর্খ ভাবেন তিনি। নয়তো ছেলেটার মন বুঝবেন না কেন!
তবে প্রচ্ছদ দেখেই বই নিয়ে নেয় শুনে কিছুটা অবাক হয়েছেন বৈ কি! চেহারা ভালো হয়ে যদি ভেতরটাই ফাঁপা হয় তবে সে বই দিয়ে কাজ কী? বই তো ঘর সাজানোর জিনিস নয় যে দেখতে ভালো হলেই সাজিয়ে রাখলাম! নাকি আজকাল তাই হয়েছে? কে জানে!
স্বপ্নালু চোখে প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে তিনি ভাবতে থাকলেন, ‘নওরোজ’ লেখাটার নিচে ‘ফরিদ আহমেদ’ লেখাটুকু দেখতে ঠিক কেমন দেখাবে! একটা শীতল শিহরণ তার মেরুদণ্ড বেয়ে সমগ্র দেহকে আয়ত্ত্ব করে ফেলল।
বেশ বড় একটা বেতের ঝুড়িতে গাদাখানেক ডায়েরি এনে বাবার পায়ের কাছে বসল ফাবিহা। রবি তার কুসুম কোমল রোদ্দুর ছড়াতে শুরু করেছে। সে রোদ্দুরের দল ফরিদের পায়ের কাছে হামাগুড়ি দিচ্ছে আধো বুলির শিশুর মতো। তাদের সরিয়ে জায়গাটা নিজের করে নিলো সে। পেপার দিয়ে ডায়েরি প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল, “বাবা, একটু ডায়েরিগুলো র্যাপিং করে দাও তো!”
লুঙ্গি গুছিয়ে ফরিদ নিজেও মেঝেতে বসলেন। মেয়ের কাজের প্রতি তার একটা আগ্রহ আছে। ব্যাবসার জন্য মানুষ কতকিছুই তো খুঁজে নেয়, তার মেয়েটা নিয়েছে ডায়েরি। স্মৃতি জমানোর কাগুজে বাক্স। কত যত্ন নিয়ে যে একেকটা ডায়েরি বানায়, তিনি তা চাক্ষুষ দেখেছেন। বড় ভালো লাগে! মনটা প্রশান্তিতে ছেয়ে যায়। মেয়েটা টাকার চিন্তায় অন্ধ হয়ে যায়নি, টাকাকে প্রয়োজন ভেবেছে, নিশ্চয়তা নয়— ভাবলেই তার পিতৃ-হৃদয় প্রফুল্ল হয়ে ওঠে।
র্যাপিং করতে করতে তিনি বললেন, “মা রে! একটা কথা বলব।”
ফাবিহা দুষ্টুমি করে বলল, “অনুমতি না দিলে বলবে না?”
ফরিদ খানিক বিব্রত কন্ঠে বললেন, “বলতেই হবে মা! অনুমতি দিবি না কেন?”
“মজা করছিলাম বাবা! বলো কী বলবে। আমার কাছে তোমার আবার অনুমতি নিতে হয়! যা মনে হয় বলে ফেলবে, মনে করবে আমি তোমার খেরোখাতা!” চমৎকার ভঙ্গিতে হেসে বাবার চোখ জুড়িয়ে দিলো ফাবিহা।
ফরিদ ছোট করে নিশ্বাস ছেড়ে বললেন, “বিয়ে নিয়ে কী ভাবছিস মা?”
“আপাতত তো কিছুই ভাবছি না বাবা!”
“কবে ভাববি?”
“এই ঝড়টা শেষ হোক। বিয়ে তো হুড়পাড় করে করার জিনিস না। মনে শান্তি নিয়ে না করতে পারলে সেটা আমার জীবনে কতখানি শান্তি বয়ে আনবে বাবা?”
একদিক দিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন ফরিদ। যাক! মেয়েটা বিয়ে সম্পর্কে অন্তত বিরূপ মনোভাব পোষণ করছে না!
টেপ হোল্ডার থেকে এক টুকরো টেপ নিয়ে কাগজে লাগাতে লাগাতে বললেন, “তা ঠিক। কিন্তু ধর যোগ্য কাউকে পেয়ে গেলাম, আসলেই ভালো মানুষ! তাহলে তখন হাত গুটিয়ে বসে থাকাটা বোকামি হবে না?”
ফাবিহা স্মিত হেসে বলল, “বাবা, কোনো কিছু যোগ্য হওয়ার জন্য, সুন্দর হওয়ার জন্য সময় অনেক বড় ফ্যাক্টর। বৃষ্টির কথাই ধরো না! শ্রাবণে সেটা যেমন সুন্দর, যেমন মোহনীয় সেই একই বর্ষা কিন্তু মাঘে খুব অনাকাঙ্ক্ষিত। সময়টা কেবল বদলেছে, বৃষ্টিটা কিন্তু একই আছে! অথচ মাঘের বৃষ্টি দেখে আমরা আনন্দিত হই না। ভাবি, আপদ বিদেয় হলে বাঁচি!” হেসে ফেলল ফাবিহা।
সামনে থেকে ডায়েরি সরিয়ে বাবার দিকে খানিকটা এগিয়ে এলো। নিজের দু’হাটু জড়িয়ে বসে বলল, “যোগ্যতার বিষয়টাও বাবা আপেক্ষিক। একই সময়ে দুজন মানুষ যোগ্য না-ই হতে পারে। যদি তেমন হয়, তাহলে যে এখনও যোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি তাকে যোগ্য মানুষটার ঘাড়ে উঠিয়ে দেয়া কতখানি ঠিক? সেই মানুষটার সাথে তাহলে অন্যায় করা হলো না? তিনিও তো শান্তির জন্যই বিয়ে করতে চাইবেন। কিন্তু তার বদলে পাবেন অশান্তি। ফুলদানিটা হয়তো প্রস্তুত হয়েছে, কিন্তু ফুল তখনও ফোঁটেনি। দৃশ্যটা কি বাবা সুন্দর দেখাবে? তখন কিন্তু তাকালেই চোখে পড়বে ফুলের অযোগ্যতা! অথচ আরেকটু সময় দিলেই সে নিজের সম্পূর্ণ সৌন্দর্য নিয়ে পূর্ণরূপে পরিস্ফুট হতো!”
ফরিদ তন্ময় হয়ে মেয়ের কথা শুনে গেলেন। কথা থামতেই তার তৃষ্ণার্ত হাতটা বুভুক্ষের মতো মেয়ের মাথায় উঠে এলো। মুগ্ধ কন্ঠে তিনি বললেন, “মা রে! বই তো তোর লেখা উচিত ছিল!”
“কেউ দু’লাইন ভালো কথা বলতে পারলেই আস্ত একটা বই লিখতে পারে না বাবা! এর জন্য অনেক ধৈর্য্য দরকার। ওসব আমার কম্ম নয়!”
ফরিদ নরম কন্ঠে বললেন, “তাহলে এখন বিয়েটা করবি না?”
“আমি পুরোপুরি চিন্তামুক্ত হয়ে নতুন জীবন শুরু করতে চাই বাবা। তুমি দোয়া করে দাও।”
ফরিদের বাকি হাতটাও উঠে এলো। মেয়ের মাথায় পাতলা চুলের ফলে দেখা যাওয়া তালু তিনি তার দুহাত দিয়ে ঢেকে দিলেন। যেন একটু খুঁত লুকানোর আপ্রাণ প্রচেষ্টা!
“একটা ভালো ছেলে যে হাতছাড়া হয়ে যায়? পরে যদি তেমন পাওয়া না যায়?”
“ভালো ছেলেটা ভালো থাকুক। শ্রাবণ তার বর্ষা পাক, মাঘ তার কুয়াশা পাক। আল্লাহ যদি আমার ভাগ্যে শিশির বিন্দু লিখে রাখেন তাহলে তো বাবা শ্রাবণ আমার জন্য কল্যাণকর না। তুমুল বর্ষায় আমি ভেসে যেতে পারি!”
“ঠিক! ঠিক বলেছিস মা! খুব দোয়া করি ছেলেটা ভালো থাকুক।”
বাবার ছলছলে চোখের দিকে তাকিয়ে ফাবিহা পরম মমতা নিয়ে বলল, “আমিন!”
কিছু কথা নিজের বুকেই চেপে রাখল ফাবিহা। বিয়ে একটা আলাদা দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালন করতে গেলে বাবা-মাকে ঠিক কতখানি দেখভাল করতে পারবে সেটাও তো সে জানে না। অথচ এখন এমন অবস্থা যে, সে বসে গেলেই পুরো পরিবারটাকে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে। ফরিদের আয় দিয়েই ঘর চলছে। সেখান থেকেও নূরজাহান কিছু বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ঋণ মেটানোর জন্য। ফাবিহা তার ইনকামের পুরোটাই ওখানে দিচ্ছে। এমন সময় বিয়ে হলে এই ঝড় আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
অথচ এটা মুখ ফুটে বলাও যাবে না। দেখা যাবে তাদের দোষে মেয়েকে ভুগতে হচ্ছে ভেবে অপরাধবোধে ভুগবেন ফরিদ-নূরজাহান দুজনেই।
ফাবিহা অন্তরের অন্তস্তল থেকে দোয়া করল। সাকিন ভাই খুব ভালো থাকুক। তার মতো শ্রদ্ধাই তাকে ফিরিয়ে দিতে পারে এমন জীবনসঙ্গীনি আল্লাহ তাকে মিলয়ে দিন।
কলেজে যাওয়ার আগে ফরিদ নূরজাহানকে বললেন, “মেয়েটা এখন বিয়ে করতে চাইছে না। ওকে জোর করার দরকার নেই। আগের বারের ধাক্কা সামলাতেও কিছু সময় দরকার।”
নূরজাহান তাজ্জব হয়ে বললেন, “মেয়ে বিয়ে করতে চাইছে না এটা শুনে তুমি স্থির হয়ে বসে আছো কেন! আশ্চর্য! ওর সুরে কথা বলছ তুমি! এমন প্রস্তাব মাথা কুটে মরে গেলেও আর পাবো?”
ফরিদ ভরসার হাসি হেসে বললেন, “ভাগ্যে যেটা আছে সেটাই হবে নূরজাহান। সবাই রাজি হয়েও আমরা ওদের এক করতে পারব না যদি না এখন ভাগ্যে থাকে। আর যদি আল্লাহ চান, তবে সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে হলেও ওরা এক হবে। হবেই!”
নূরজাহান দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, “ভাগ্যে এমনি এমনি থাকে না। নিজের চেষ্টাও করা লাগে!”
“মেয়েটা নিজেকে ভেঙেচুড়ে আমাদের উজার করে দিচ্ছে। ওর মতামতের এই দামটুকু দেবে না?”
নূরজাহান নিভে এলেন, “তাই বলে…! এমন একটা প্রস্তাব কীভাবে না বলব? ওর জন্য তো এখন সব দোজবরে ঘর আসে। ওকে আমি ওইরকম ঘরে বিয়ে দেব!” তার চোখে পানি চলে এলো।
ফরিদ দূর্বল কন্ঠে বললেন, “যেখানেই হোক, মেয়েটা যেন জীবনের সবটুকু সুখ পায়। তুমি দেইখো আল্লাহ! যে মেয়ে আমাদের জন্য বর্তমান ছেড়ে দিচ্ছে, তার ভবিষ্যতে তুমি বরকত দিও!”
—
সেদিন একবারও নিচে নামল না সাবিহা। এই কদিন নূরজাহান অসুস্থ থাকায় কয়েকবার করে দেখে এসেছে। বিয়ে নিয়ে সরাসরি কিছু না বললেও তাকে দেখলেই যে তিনি তটস্থ হয়ে উঠতেন এটা টের পেত সে। তাই অদরকারেও মাঝে মাঝে যেয়ে বসে থাকত। কিন্তু আজ যেয়ে কী বলবে? তার ভাইকে যে মাঝপথে এসে ভূতে ধরেছে এটা কি বলার মতো কোনো কথা! কাজেই সে দুটো দিন নিচে নামল না।
ওদিকে নূরজাহান নিজেও চিন্তিত। বিয়ের কথাবার্তা খুবই ঝামেলার বিষয়। হলেও ঝামেলা, না হলে আরও বেশি ঝামেলা।
প্রস্তাব নাকচ করার জের ধরে যদি সাবিহা মুখ ফিরিয়ে নেয়? তবে তারা কি আর বহাল তবিয়তে এখানে থাকতে পারবেন? ঠিক তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে যেতে হবে। নানামুখী চিন্তায় জর্জরিত নূরজাহান সিদ্ধান্ত নিলেন যতদিন সাবিহাকে এড়িয়ে চলা যায় ততদিন তাই করবেন। তারপর মুখোমুখি হলে যা হবার একটা কিছু হবে। আর দুশ্চিন্তা নিতে পারেন না তিনি!
এই দ্বিমুখী এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টার ফল হলো এই যে নূরজাহান এবং সাবিহার যখন দুদিন পর দেখা হলো তারা দুজনেই ফাবিহা এবং সাকিন ছাড়া দুনিয়ার সমস্ত বিষয় নিয়ে আলাপ করলেন। গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বেড়ে আকাশ ছুঁয়েছে, কাঁচা বাজারের আগুন অবস্থা— সবকিছু বলে হতাশ নিশ্বাস ছাড়লেন নূরজাহান।
সাবিহা যোগ করল রিফাতের অত্যাচার। ছেলের জ্বালায় সে যে জ্বলে-পুড়ে অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে সে কথা বলে সমাধান চাইলো। নূরজাহান কোনো সমাধান দিতে পারলেন না। তার ছেলে ছোটবেলায় জ্বালাতন করেনি। করছে এখন। উল্টো ওকে সোজা করার উপায় জিজ্ঞেস করলেন। এ বিষয়ে সাবিহা নিরুত্তর রইলো।
আলাপ ভঙ্গের পর দুজনেই পালিয়ে হাঁপ ছাড়ল এই ভেবে যে, অপর পক্ষ আপাতত বিয়ের কথা ভুলে গেছে।
—
ফাবিহা একটা জিনিস বেশ বুঝতে পেরেছে। ব্যবসায় সবসময় নতুনত্ব দরকার। এক জিনিস দিয়ে বেশিদিন কাস্টমার ধরে রাখা সম্ভব না।
প্রথম প্রথম ডায়েরি সাড়া ফেললেও আস্তে-ধীরে সেই উত্তেজনা থিতিয়ে এলো। তখনই জার্নালের আইডিয়া লঞ্চ করল ফাবিহা। লেদারি কভারের ওই ডায়েরির দাম যদিও পনেরশ কিন্তু তার চাহিদা সাধারণ কাপড়ের ডায়েরির চেয়ে বেশি। এই জরিপ তাকে বুঝিয়েছে ইউনিক এবং নতুন জিনিস আনতে পারলে দাম খুব একটা সমস্যা করবে না।
সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার নতুন আরেকটা পরীক্ষা করতে যাচ্ছে সে। কারো দ্বারস্থ হয়ে নয়। সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে সপ্তাহব্যাপী একটা অফার দেয়ার কথা চিন্তা করেছে।
কাজটা এমন, যেসব শাড়ি গ্রাহকদের মাঝে বেশ জনপ্রিয় সে শাড়ির প্রিন্টেই ডায়েরি বানাবে। আগে তো কেবল রঙ এক ছিল। এবার পুরো কাপড়টাই এক থাকবে। নিজের একটা শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে বানিয়েও দেখেছে। জিনিসটা আসলেই সুন্দর। কিন্তু সমস্যা হলো, হুবহু শাড়ির কাপড় সে কোথায় পাবে?
এই চিন্তাটা মাথায় এলো তার শাড়ির সাথে মিলিয়ে বানানো ডায়েরির ছবি পোস্ট করার পর। কিন্তু ততক্ষণে ওটা গ্রাহকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। দুজন দাম জিজ্ঞেস করে মেসেজও দিয়েছে।
সেন্টারে ক্লাস নেয়ার সময়ও ওই চিন্তা করছিল ফাবিহা। একটাই উপায় আছে। নিজেই শাড়ি কিনে তার সাথে মিলিয়ে ডায়েরি বানানো। কিন্তু এক পন্যের হ্যাপাই সে সামলাতে পারছে না। আরেকটা যোগ করলে তার অবস্থা কী হবে সেটা ভাবতেই ঘাম ছুটে গেলো!
বাড়ি ফিরে পোস্ট ডিলিট করে দেয়ার চিন্তা করছে, সে সময় এক শাড়ির পেইজের আ্যডমিন নিজের আইডি থেকে মেসেজ দিলেন। আগামী এক বছরের জন্য তারা চুক্তি করতে চায়। তাদের মূল প্রোডাক্ট হ্যান্ড পেইন্টেড শাড়ি। সে কাপড় তারাই ফাবিহাকে পৌছে দেবে। তার কাজ শুধু ডায়েরি বানানো।
জটিল সমস্যাটা এত সহজে সমাধান হয়ে গেল যে ফাবিহা বিস্ময়ে পলক ফেলতেই ভুলে গেল। কারো কাছে আবার মেসেজ দেয়ার মতো ইচ্ছে তার ছিল না। যদিও পেইজে বেশ ফলোয়ার হয়েছে। কিন্তু একজনের কাছে ধর্না বসে থাকার মতো অস্বস্তি আর পোহাতে চায় না বলে ওই পথের দুয়ার প্রথমেই বন্ধ করে দিয়েছিল সে। কিন্তু মালিকের পরিকল্পনা আঁচ করে— সে সাধ্যি কার! বন্ধ দুয়ারের ফাঁক দিয়েই তিনি আশার রোশনাই পাঠিয়ে পাপী বান্দার অন্ধকার হতাশার জাল ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেন!
রাতে যখন ফাবিহা পড়তে বসেছে তখন সিমি এসে খানিকক্ষণ এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করল। মনোযোগ আকর্ষণ করতে না পেরে শেষমেষ নিজেই টুল টেনে টেবিলের আরেক পাশে বসল। তরল কন্ঠে ডাকল, “ছোট আপা!”
“হু।” লিখতে লিখতেই উত্তর দিল ফাবিহা।
“একটা জিনিস শোনাব।”
“কী?”
“না! এদিকে তাকান! মন দিয়ে শোনা লাগবে!” অস্থির হয়ে বলল সিমি।
“বিরক্ত করিস না সিমি! রাতে ঘুমানোর সময় শুনবো যা।”
“না না! এখনই শোনা লাগবে! প্লিজ ছোট আপা! প্লিজ! প্লিজ!”
ফাবিহা দম ছেড়ে কলম থামালো। মুখ উঠিয়ে বলল, “তিন মিনিটে শেষ কর।”
সিমি নড়েচড়ে বসল। গলা ঝেড়ে, চোখ বন্ধ করে বলতে শুরু করল,
“তাবারকাল্লাজি বিয়াদিহিল মুলকু ওয়াহুয়া আ’লা কুল্লি শাইইং ক্বদির…”
এবং পাক্কা সাত মিনিট পর থামল সে। ফাবিহা তাজ্জব কন্ঠে বলল, “সর্বনাশ! মুলক পুরোটা মুখস্থ করে ফেলেছিস!”
সিমির মুখটা রাঙা হয়ে উঠল। লজ্জা লজ্জা কন্ঠে সে বলল, “কেমন হয়েছে ছোট আপা?”
সিমিকে জাপটে ধরল ফাবিহা। প্রফুল্ল কন্ঠে বলল, “এত্তো সুন্দর! মা শা আল্লাহ! মা শা আল্লাহ! কী চমৎকার যে হয়েছে সিমি!” বলতে বলতে ওর মাথায় দুটো চুমু খেয়ে ফেলল সে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত আদরে সিমির চোখে পানি চলে এল।
“কবে কবে শিখে ফেললি বল তো!”
ভেজা কন্ঠে সিমি বলল, “আপনি যে প্রতিদিন রাত্রে কাগজ কাটাকাটির সময় মোবাইলে এটা ছেড়ে রাখতেন, তখন।”
ডায়েরির কাজ করার সময় ফোনে কোনো অডিও বা ভিডিও চালু করে রাখত ফাবিহা। রাতে কাজ করলে সূরা মুলক শুনত। তবে সে নিজে তো প্রথম আয়াতের পর আর একটা শব্দও বলতে পারবে না!
চমৎকৃত হয়ে সে বলল, “শুধু শুনে শুনেই মুখস্থ করে ফেললি?”
সিমি মাথা নাড়ল।
আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে ফাবিহা বলল, “এর জন্য তোকে কী দিব ময়না? এত সুন্দর একটা কাজ করেছিস, সুন্দর কিছু না দিলে তো মান থাকবে না।”
সিমির মনে হচ্ছিল ফ্রিজ থেকে বের করে রাখা বরফের মতো সে ছোট আপার বুকের ভেতর গলে যাচ্ছে। খুব কষ্টে কান্না দমিয়ে বলল, “কিছুই দিতে হবে না। কারো থেকে কিছু নেয়ার জন্য আমি মুখস্থ করি নাই।”
“তাহলে কেন করেছিস?”
“আমি তো কিছুই জানি না ছোট আপা। কেমন করে চললে আল্লাহ খুশি হবে, কী করলে আল্লাহর মন পাবো কিছুই তো জানি না। সেই কবে মক্তবে পড়া শিখেছিলাম, আর তো কিছু করা হয় নাই। তাই ভাবলাম একটা কিছু অন্তত করি। আল্লাহর কাছে বলব, শুধু তাঁর জন্যেই আমি এই সূরা মুখস্থ করছি। আর কিচ্ছুর জন্যে না।”
ফাবিহা সিমির কপালের চুল গুছিয়ে দিয়ে বলল, “তোর কাজ তুই করেছিস, এবার আমার কাজ আমি করি। কী চাস বল তো সোনা!”
সিমি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। ফাবিহা অবাক হয়ে বলল, “ও মা! কাঁদিস কেন?”
“আমাকে কেউ কোনোদিন এভাবে আদর করে নাই ছোট আপা!”
ফাবিহা হেসে ফেলল। ওর চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলল, “যাহ! সবারটা আমি একাই করে দেব ইনশাআল্লাহ। কী নিবি বল। একটা ডায়েরি নিবি? লেখা টেখা মনে আছে নাকি গুলে খেয়ে ফেলেছিস?”
“আপনি ডায়েরি দিলে আমি আবার নতুন করে লেখা শিখব।” নাক টেনে বলল সিমি।
“আচ্ছা যা! দিলাম একটা ডায়েরি। আর কী দেয়া যায়?”
ভাবতে ভাবতে আলমারি থেকে একটা শাড়ি বের করল সে। সিমির সামনে ধরে বলল, “সিমি, এই শাড়ির প্রতি আমার কোনো আক্রোশ নেই। কিন্তু এটা যেহেতু সজীব ভাই দিয়েছিল তাই এর সাথে কোনো সম্পর্কও নেই। তুই এটা নিবি? ইচ্ছে না হলে নেয়ার দরকার নেই। আমার মন রাখার জন্য বলিস না।”
লাল রঙের এই শাড়িটা সিমির পরিচিত। এটা একবার কেবল ঘরে পরেছিল ফাবিহা। সে বলল, “ছোট আপা, এটা দিয়ে কি লেহেঙ্গা বানানো যাবে?”
“আরে তাই তো! ভালো একটা কথা বলেছিস! আম্মুকে ধরে দেখব। স্কুলে থাকতে একবার আমাকে বানিয়ে দিয়েছিল।”
নূরজাহানকে একবারের বেশি বলতে হলো না। ঘটনা শুনে তিনি নিজেই উদ্যোগী হয়ে শাড়ি কেটে ওটার চেহারা বদলে ফেললেন। কোমর ব্যাথা নিয়েও আধা ঘন্টা ধরে বাটাবাটি করে দুপুরে সিমিকে ওর পছন্দের পটল ভর্তা খাওয়ালেন। এ সবকিছু দেখে সিমির মনে হলো, মুলকের প্রতিদান সে পেয়েই গেছে। আর কী পাওয়া বাদ রইলো?
দুদিনের ভেতর লেহেঙ্গাও প্রস্তুত হয়ে গেল। সেটা পরে প্রজাপতির মতো কুন্দকলিতে উড়ে বেড়াল সিমি। সাবিহাকে সূরাটা শোনাল। সাকিনকে লেহেঙ্গা দেখিয়ে বলল, “অনেক সুন্দর না বলেন সাকিন ভাই?”
ওর সূরা মুখস্থ করার কথা শুনেই সাকিন একটা কলম নিয়ে এসেছিল। সুদৃশ্য সে কলমটা ফিতেয় পেঁচিয়ে সিমির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আমাদের সিমির চেয়ে একটু কম!”
সিমির মনে হলো হাত পা ছড়িয়ে খানিকক্ষণ কাঁদে। ছোট আপা ডায়েরি দিয়েছে, সাকিন ভাই কলম দিলো। এত উপহার! এত ভালোবাসা তার এই ছোট্ট কপালে ছিল! কী অবিশ্বাস্য কথা!
লেহেঙ্গা পরে রিফাতকে কোলে নিয়ে একটা ছবি তুলে সাবিহার কাছে বায়না করে বলল, “এই ছবিটা আমাকে বের করে দিবেন! আমি আমার ঘরের দেয়ালে টাঙিয়ে রাখব!” সাবিহা হাসিমুখে সে আবদার মেনে নিলো।
এই সুখ সুখ আবহের মাঝেই ফরিদ আহমেদের নামে একটা পার্সেল এলো। কার্টন খুলতেই বেরিয়ে এলো নতুন ছাপানো একতাড়া বই। যার চমৎকার প্রচ্ছদে ফুটে উঠেছে ‘নওরোজ’’ লেখাটা। ঠিক সে লেখার নিচেই জ্বলজ্বল করছে তিন অক্ষরের একটা নাম।
‘গাজী শরফুদ্দিন খন্দকার’’
চলমান~
(পাঠক! কালকের দিনটা ছুটি মঞ্জুর করুন! আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে আবার শুক্রবারে আলাপ হবে ইনশাআল্লাহ।)