ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনজোছনা

পর্ব 34

লেখক: বিনতে ফিরোজ

#বনজোছনা
৩৪.

আকরাম খানের ফার্মেসীর লাইসেন্স বাতিল হয়েছে। সাথে গচ্চা গেছে ব্যারিস্টার লাইসেন্সও। হঠাৎ করেই যেভাবে আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়েছিল, সেই আঙুল হঠাৎ করেই আবার ফাঁটা বেলুনের মতো চুপসে গেছে। মাঝখান থেকে মানুষের নজরে এসে গেছে আদিল আর পাপড়ি।

এদেশের আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অপরাধীর শাস্তি হওয়া খুবই দুরূহ বিষয়। তারিখ বদলায়, বদলায় দুনিয়ার সবকিছুই। কেবল বাদী আর বিবাদী পক্ষ একই থেকে যায়, নিয়ম করে নিজেদের চেহারা চিনে যায় প্রত্যেক শুনানির দিন ।

আকরাম খানের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে তার শাস্তির ঘোষণা ঝুলে থাকেনি। কেননা তা তরান্বিত করছে আরেক বাঘা অপরাধী, বিলু। ফলাফলস্বরূপ, এক নিমিষে ধুলিস্যাৎ হয়েছে সব সম্মান। সমাজে নিজের উচ্ছেদ হওয়া সে সম্মান ফিরিয়ে আনার আর কোনো পথ আকরামের জানা নেই। সে কারণেই কি না কে জানে! নিজের আইনজীবীকেও ছাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।

এ কথা শুনেই সাকিন আদিলের কাছে ফোন দিয়েছিল। আশ্চর্য হয়ে বলেছিল, “এসব কী কথা! উকিল না থাকলে কেস লড়বে কে?”

আদিল ঠান্ডা কন্ঠে কেবল বলেছিল, “তিনি নিজেই তো আইনজীবী!”

ওর কথার ধরনে বেশ থতমত খেয়েছিল সাকিন। বোঝার চেষ্টা করেছিল তার মনের ভেতর আদতে কী চলছে।

“এমনিতেই এসব মামলা-টামলার প্রসেস অনেক দীর্ঘ। তার উপরে এমন করলে তো ছাড়া পাওয়ার কোনো ঠিক ঠিকানাই থাকবে না!”

“এসব আলাপ বাদ দাও ভাইয়া। যার যার আমলনামা তার তার। তুমি আমার কথা শোনো। শুনছ?”

সাকিন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কার জন্য পাপের পথে পা বাড়িয়েছিলেন আকরাম? সেই ছেলে-মেয়ের মন থেকেই তো তিনি উঠে গেলেন।

“শুনছি, বল।”

“পাপড়ির এসএসসির পরই ওকে বিয়ে দিয়ে দেয়ার কথা ভাবছিলাম। কিছু ছেলেপেলে লেগেছে। সস্তা টিজিং সাথে ট্রোল। বেশি দিন এসব চললে ওর নাম খারাপ হয়ে যাবে। অলরেডি গেছে, মহান বাবার আশীর্বাদে!” হাঁফ ছাড়ল আদিল।
“ওকে বিয়ে দিতে পারলে আমি আম্মুকে নিয়ে এই এলাকা ছাড়ব। আর থাকতে পারছি না এখানে।”

“আমাকে কী করতে বলিস?”

“পাপড়ির জন্য একটা ছেলে-টেলে দেখো। তোমার তো কিছুই অজানা নেই।”

“আচ্ছা। তোরা মন দিয়ে পড়াশোনা কর।”

“হু।”

সেদিন ওর সাথে এই দু মিনিটের আলাপেই সাকিন বুঝেছিল চোদ্দ শিকের পেছনে পড়াটাই আকরামের জন্য তুলনামূলক কম কষ্টকর হবে। অন্তত পারিবারিক এই বিতৃষ্ণার চাইতে ঢের সহজ।

—

ফরিদ আহমেদ ভাবলেন নামটা বোধহয় ভুল করে ছাপা হয়ে গেছে। কিন্তু পনেরটা বইয়েই কীভাবে ভুল হতে পারে তিনি বুঝলেন না। ভেতরের লেখা পড়লেন, সব তো এক। নামটাই কীভাবে পাল্টে গেল!

বিভ্রান্ত চিত্তে বইগুলো নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন তিনি। দরজার সামনে দাঁড়িয়েই ফাবিহাকে ডাক দিলেন।

“ফাবিহা! মা এদিকে আয় তো!”

ফাবিহা চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে এলো এবং বাবার হাতে বই দেখে প্রায় উড়ে যেয়ে সেগুলো ধরল। অবাক হয়ে বলল, “ছাপা হয়ে গেছে! কই বললে না তো!”

“আমিই তো জানতাম না!” ক্ষীণ কন্ঠে বললেন তিনি। ফাবিহা বোধ করি তা শুনতে পেলো না। “কিন্তু দেখ, নামটা ভুল ছেপেছে।”

ফাবিহা বইয়ের ভেতরে এতখানি ডুবে গেছিল যে সামনে পেছনে দেখতেই ভুলে গিয়েছিল। বই বন্ধ করে লেখকের নাম দেখে তৎক্ষণাৎ ব্যাক কভারে চলে গেল। সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখক পরিচিতি লেখা।

“গাজী শরফুদ্দিন খন্দকার:

ফেসবুকে পরিচিত ‘The Sharf’ নামে। প্রায় দশ বছর ধরে চষে বেড়াচ্ছেন পুরো পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। বিশ্ব দরবারে নাম কুঁড়িয়েছেন ডেঞ্জার ট্রাভেলার হিসেবে। তিবেস্তি পর্বতমালা থেকে ডানাকিন ডিপ্রেশন অথবা স্বালবার্ড থেকে ফারো দ্বীপপুঞ্জ— তিনি চড়ে বেড়িয়েছেন দাপটের সাথে। সাহসী এই পদাতিকের লক্ষ্য বাংলাদেশকে পৃথিবীর সকল জায়গায় উপস্থাপন করা। এই লক্ষ্য অর্জনের পথে ইতোমধ্যেই তইনি চালু করেছেন নিজস্ব ট্রাভেল এজেন্সি ‘Sharf’, যেখানে তাকে সঙ্গ দিয়েছে চার মিলিয়ন মানুষ।

আটত্রিশ বছর বয়সী এই পথিকের মাঝে ছোট থেকেই লুকিয়ে ছিল লেখালেখির প্রতিভা। নামিবিয়ার মরুভূমির বাতাসে এবং বোতসোয়ানার জলের ছোঁয়ায় তা প্রকাশিত হয়েছে তার প্রথম বই ‘নওরোজ’ এর মাধ্যমে। জীবনের সারল্যের মাঝে লুকিয়ে থাকা জটিলতার এমন সহজ উপস্থাপন দেখে বোঝার উপায় নেই, এর লিখিয়ে গ্রাম-গঞ্জের নিভৃতে পড়ে থাকা মানুষ নন।

লেখকের প্রথম বইয়ে আপনাদের স্বাগতম। উপভোগ করুন সে গন্তার লেখা যিনি বিশ্বের বুকে এক টুকরো বাংলাদেশ এবং দেশের মাটিতে বিশ্বের সারমর্ম।”

কয়েকবার লেখাটা পড়ল ফাবিহা। ফরিদ তৃষ্ণার্ত চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন।

“কী লেখা রে? দেখি দেখা তো! ওখানেও ভুল ছেপেছে নাকি?” তার কন্ঠে তুমুল বিরক্তি। নামের এমন ভুল কি সহ্য করা যায়?

ফাবিহা বইটা আঁকড়ে ধরে নিজের ঘরে চলে গেল। সময় নষ্ট না করে ফেইসবুকে ঢুকল। তার বুক ধ্বকধ্বক করছে। কাঁপা হাতে নাম সার্চ দিতেই সামনে এলো চার দশমিক দুই মিলিয়ন ফলোয়ার যুক্ত একটা পেইজ, যেখানে স্বমহিমায় উজ্জ্বল ‘The Sharf’ নামটা।

মাত্র এক ঘন্টা আগে তিনি তার প্রথম বইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। তাতেই যে পুরো তিন হাজার কপির প্রি-অর্ডার কনফার্ম হয়ে গেছে সেটা প্রকাশক আনন্দের সাথে সে পোস্টের কমেন্ট সেকশনে উল্লেখ করেছেন।

চারদিকে প্রশংসার বন্যা বয়ে গেছে। এমন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়েও নিভৃতে নিজের পেইজ চালিয়ে গেছেন। বিখ্যাত ট্রাভেলারের সূত্র ধরে ফুটেজ নিতে চাননি। মাত্র আটশ ফলোয়ার নিয়ে, এই ছোটাছুটির মাঝেই যে এমন নিয়মিত লিখে গেছেন তা দেখে বিস্মিত হয়েছে নেটিজেনরা। ফলে প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই তার পেইজ তিন লাখ ফলোয়ার হিট করে ফেলেছে। ভক্তরা পেইজের নাম দেখেও যারপরনাই অবাক। একটা মানুষের রুচি কত সুন্দর হলে এমন ছদ্মনাম ব্যবহার করতে পারে! মাটিতে বসেও যার আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন তার ছদ্মনাম তো এমনই হওয়া উচিত। ময়ূখমালা, কী সুন্দর! কী সুন্দর!

ফাবিহা সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখল। প্রকাশনীর পেইজ, ফরিদের পেইজ এবং শরফুদ্দিনের পেইজ। কী জমজমাট অবস্থা! অথচ কোথাও তার বাবা নেই!

বসার ঘরে ফেরত আসতেই দেখল ফরিদ আহমেদ পাথর হয়ে বসে আছেন। একটা কপি ফাবিহা নিয়ে গিয়েছিল। বাকি চোদ্দটা তো ফরিদের কাছেই ছিল। আর অসংখ্য কপি ছড়িয়ে আছে সমগ্র দেশব্যাপী।

“মা রে! আমার কপালে এই ছিল?” হেসে বললেন ফরিদ। সে হাসি দেখে ফাবিহার বুক ঠেলে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইলো। তাদের শক্ত হাতে দমিয়ে সে বলল,

“এত সোজা না! ওদের জবাবদিহি করতে হবে! এমন জোচ্চুরি করে বই চালাবে আর আমরা বসে বসে দেখব!” তার উচ্চকণ্ঠ শুনে নূরজাহান, সিমি এদিকে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে রে?”

ফাবিহা সে কথার উত্তর দিলো না। বাবাকে বলল, “তুমি এক্ষুণি পেইজ থেকে পোস্ট দাও।”

নিজের ফোনটা এগিয়ে দিতে খুব কষ্ট হলো ফরিদের।

ফাবিহা ঝটপট ফেইসবুকে ঢুকল। পেইজে যেতেই দেখালো লগ ইন করা নেই। এবং মুহূর্তের মাঝেই সে আবিষ্কার করল পেইজটা হ্যাক হয়ে গেছে। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো সে। তার বোঝা উচিত ছিল, পেইজের এক্সেস ফরিদের হাতে থাকা অবস্থায় প্রকাশনী সেই পেইজকে শরফুদ্দিনের বলে পরিচয় করাবে না।

ঠিক আধা ঘণ্টার মাঝেই শরফুদ্দিন ‘ময়ূখমালা’ থেকে লাইভে এলেন। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানালেন,

“আমি নিতান্তই আনাড়ি লেখক। আপনারা যে এমন উৎসাহ দেখাবেন আমি ভাবতেই পারিনি! কেবল আমার নামটা শুনেই আপনারা বই অর্ডার করে ফেলেছেন!” লোকটার চোখে পানি চলে এলো। সেই পানির দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে ফরিদ বিড়বিড় করে উঠেলেন, “নাম!”

ফাবিহা দেখে যাচ্ছিল তার ফলোয়ারদের উচ্ছ্বাস। একের পর এক কমেন্ট, অনবরত প্রশ্ন, বই অর্ডার দিয়েছে কবে হাতে পাবে — নানারকম প্রশ্নের মধুর বাণে শরফুদ্দিন হাসিমুখে জর্জরিত হয়ে গেলেন। সইতে পারছিল না কেবল সে।

ইতোমধ্যেই লাইভে ছেচল্লিশ হাজার লাইক পড়ে গেছে। বারো হাজার কমেন্টের সথে সাত দশমিক তিন হাজার শেয়ার। তার মনে হলো পুরো শরীরে কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। ধপ করে ভিডিও বন্ধ করে কন্ট্যাক্ট লিস্ট থেকে প্রকাশনীর নাম্বারে কল দিলো। ফরিদ কেবল দেখেই গেলেন।

“কথা বলো বাবা!” ফাবিহা ফোন এগিয়ে দিলো। সেটা হতে নিয়েও ফরিদ বুঝলেন না ঠিক কী প্রশ্ন করলে যথাযথ একটা উত্তর পাবেন। উত্তর হয়তো পাবেন। কিন্তু নাম? তা কি আর পাওয়া হবে?

লোকটা সম্ভবত তার কলের অপেক্ষাতেই ছিল। একবার রিং হতে না হতেই কল রিসিভ করে বলল, “ফরিদ সাহেব, বইগুলো পেয়েছেন তো?”

তার লেখা বই আরেকজনের নামে ছাপিয়ে সেটাই আবার তাকে সুন্দর কাগজে মুড়িয়ে পার্সেল করেছে— কি তাচ্ছিল্যের প্রহসন!

“পেয়েছি ভাই। আপনি যে আমাকে এভাবে সারপ্রাইজ দেবেন তা তো বলেননি।”

“বললে কি আর সারপ্রাইজ থাকত?” হেসে বলল সে। পরক্ষণেই গুরুতর ভঙ্গিতে বলল, “বুঝতে পারছি আপনার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু একটু প্র্যাকটিক্যালি চিন্তা করে দেখুন। আপনার বই কয়জন কিনত? ফেইসবুকে যাদের ফলোয়ার ত্রিশ চল্লিশ হাজার তাদের বই এক দুই হাজার কপি অনায়াসে যায়। সেখানে আপনার এক হাজারও না। সেই পরিসংখ্যান অনুযায়ী আপনার বই বিশ কপির বেশি যেত কি না সন্দেহ! সেখানে এখন ঘরে ঘরে আপনার লেখা থাকবে! একজন শিল্পীর জন্য এরচেয়ে বড় আনন্দের আর কী হতে পারে যে তার শিল্প মানুষের হাতে হাতে ভালোবাসা পাচ্ছে! আপনি কিন্তু ছদ্মনামেই লিখতেন। যদি শরফুদ্দিন নামটাকে নিজের ছদ্মনাম ভাবেন তাহলেই আর কোনো খারাপ লাগা থাকবে না!”

ফরিদ আহমেদ হেসে ফেললেন, “কী চমৎকার বুদ্ধি! এজন্যই আমার মতো একটা মানুষের বই এত আগ্রহ নিয়ে ছাপালেন তাই না? আর আমি ভেবেছিলাম…বামুন হয়ে চাঁদের আশা!” তার কণ্ঠে না হতাশা, না ক্ষোভ, না আফসোস। দুঃখের এই রূপকে ফাবিহা চেনে না। তবে ভীষণ শীতল এ প্রতিক্রিয়া দেখে তার গলা শুকিয়ে আসছে। আজ হঠাৎ করেই বাবাকে বড় ভয় লাগছে তার।

প্রকাশক বলল, “আমরা কিন্তু আপনাকে ঠকাইনি! আপনি যে টাকা দাবি করেছিলেন তারচেয়ে এক হাজার বেশি দিয়েছি। দেশের সবচেয়ে ভালো প্রকাশনীতে গেলেও আপনি এই টাকা পেতেন না। রয়্যালিটি হোক বা সত্ত্ব— কোনোভাবেই এই বই থেকে আপনি পঁচিশ হাজার টাকা পেতেন না।”

“ঠিক!” সাথে সাথেই সায় জানালেন ফরিদ।

প্রকাশক শান্ত কণ্ঠে বললেন, “আপনি চাইলে এই নিয়ে হাঙ্গামা করতে পারেন। তবে খুব একটা লাভ হবে না এটা জেনে রাখবেন। যার নামে বই বের হয়েছে সে কিন্তু খুব জনপ্রিয় মানুষ। পেইজ যে আর আপনার নেই এটা জানেন তো? শুধু শুধু ক্যাওয়াজ করার দরকার নেই। বেহুদা সাইবার মা-মলা টামলা! তার চেয়ে আসুন একটা চুক্তি করি।”

ফরিদ চুপ করে রইলেন।

সে লোক কথা বলে গেল, “আপনি চান আপনার লেখা মানুষের হাতে উঠুক, আমরা চাই বইয়ের মুদ্রণ শেষ হোক। নাম যার হয় হোক, সেটা তো ম্যাটার না, আপনার লেখা মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এটাই ম্যাটার। আপনি ভালো লেখেন, আর কিছু লেখা আমাদের দিন। এবার তো পঁচিশ হাজার দিয়েছি, পরের বার এর ডাবল পাবেন নিশ্চিন্তে। আপনার যা লেখা আছে আমাদের দিন, আমরা যত্ন করেই কাজ করি।”

“আচ্ছা।” মাথা নাড়লেন ফরিদ।

“দেবেন?”

“এখনই নিতে চান?”

থতমত খেয়ে গেল সে, “না, তা বলিনি! আস্তে-ধীরে করুন। তাড়া নেই। আপনি বিষয়টা বুঝেছেন দেখে ভালো লাগল। রাখছি।”

ফাবিহা ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “কী বলল?”

ফরিদ হাসলেন, “কী আর বলবে? কারো কিছু বলার আছে?” ফোন রেখে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।

ফাবিহা ধড়মড় করে দাঁড়িয়ে বলল, “কোথায় যাচ্ছো?”

“কলেজে যেতে হবে না?”

বাবাকে এত স্বাভাবিক দেখে ফাবিহা নিজেই কেঁদে ফেলল। ফরিদের হাত ধরে বলল, “আমরা কি কিছুই করব না বাবা?”

ফরিদ দম ছেড়ে বললেন, “এই দুনিয়াতে সবার কিছু করার থাকে না রে মা! আমার লেখা ছাপিয়েছে— এতেই আমার খুশি থাকা উচিত। কার নাম দিলো— তাতে আর কী যায় আসে!”

ফাবিহা হতভম্ব হয়ে বলল, “তুমি মেনে নিচ্ছ!”

“মেনে না নিয়ে কী করব? কার কাছে বলব? মানুষ চেনে শরফুদ্দিনকে। ফরিদ কোন জায়গার কে! আমি বলব বইটা আমি লিখেছি, তার প্রমাণ কী? চার মিলিয়নওয়ালা শরফুদ্দিন বলবে সে লিখেছে, প্রকাশনী সাক্ষ্য দেবে। আমার সাক্ষী কে? কোনো সাক্ষী নেই মা! টাকা দিয়ে ওরা আমার মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। আমার পেটে বড় ক্ষুধা, ওইটুকু নিয়েই আওয়াজ গিলে ফেলতে হয়েছে!

আর কিছু যদি করি, ওরাও সাইবার আইনে মা-ম-লা করতে পারে। কেস লড়ব সে সাধ্য় আমাদের আছে? পঁচিশ হাজার দিয়েছে। আরও লেখা দিলে আরও টাকার আশ্বাস দিয়েছে। আমার চাহিদা দেখেছিস মা!” ক্লিষ্ট হেসে বললেন ফরিদ। শরীরটা টেনে হিঁচড়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন।

ফাবিহা বলল, “তুমি ওদের আরও লেখা দেবে!” তার কণ্ঠে অবিশ্বাস।

ফরিদ ফিরে তাকালেন না। হাঁটতে হাঁটতেই বললেন, “মা রে! আমি অথর্ব মানুষ, তাই বলে কি আমার সম্মান থাকতে নেই?”

আস্তে করে বাথরুমের দরজা বন্ধ হলো। তারপরই ছরছর করে পানি পড়ার শব্দ। বসার ঘরের গুমোট আবহাওয়ার জাল ছিন্ন করে আরও একটা হৃদয়বিদারক আওয়াজ সকলের মর্মভেদ করে গেল। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনই স্পষ্ট শুনতে পেলো ফরিদের হাউমাউ কান্নার করুন সুর।

ফাবিহা একদৃষ্টে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলো। একটা কালো পিঁপড়া নিরীহ ভঙ্গিতে রোদের রেখা ধরে হেঁটে যাচ্ছে। বিপরীত দিক থেকে একটা বিশালদেহী বিষ পিঁপড়া এগিয়ে এলো। চোখের পলকে কালো পিঁপড়াটাকে দলিত-মথিত করে ফেলল। একবার নাক দিয়ে শুঁকে দেখল। সম্ভবত খাওয়ার অযোগ্য হওয়ায় সেটা এড়িয়ে চলে গেল। তাকে আরও বহুদূর যেতে হবে।

ফাবিহা সেই তুচ্ছ কালো পিঁপড়ার দেহের অবশিষ্টাংশের দিকে তাকিয়েই রইলো।

—

পুরো দিনটা গেল খুব স্বাভাবিকভাবে, যতটা স্বাভাবিকভাবে অন্য দিনগুলো কাটে না। কোনোদিন বাজারের ব্যাগ অবহেলায় পড়ে থাকে তো কোনোদিন রান্নার হাড়ি, মাঝে মাঝে নজরের আড়ালে রাখতে হয় প্রেসক্রিপশনটাও। কখনও-সখনও জামার ছেঁড়া অংশটা না দেখাই নিয়ম। অথচ আজ কোথাও কোনো সমস্যা ছিল না। কমতি ছিল না কোনো প্রয়োজনে। কিন্তু কোথাও যেন মস্ত বড় ছন্দপতন হয়ে গেছে। তাল কেটে গেছে এক বিভোর হয়ে থাকা সুরের মূর্ছনায়।

সাবিহা রিফাতকে নিয়ে উঠানে হাঁটাহাঁটি করছিল। সেসময় ফরিদ বাড়িতে ঢুকলে সে ঘোমটা টেনে এগিয়ে গেল। হাসি মুখে বলল, “আজকে সকালে বিশাল বড় পার্সেল দেখলাম চাচা! আপনার বই এসেছে? আমার কিন্তু একটা চাই!”

ফরিদ হেসে বললেন, “এসেছে মা। এখনই নেবে?”

“দিন। অটোগ্রাফ দেবেন কিন্তু চাচা! ইয়ে আপনার চোখটা একটু ফোলা মনে হচ্ছে? অ্যালার্জি নাকি? লালও হয়ে গেছে তো!”

ফরিদ ঘরের দিকে যেতে যেতে বললেন, “ধুলোর রাস্তায় নেমেছি মা, চোখ তো লাল হবেই!”

সাবিহা শুনল বটে কিন্তু কথার সুরের সাথে শব্দের মিল করাতে পারল না।

ফরিদ বই নিয়ে এসে তাতে লিখলেন, “সাবিহা, খুব ভালো থেকো মা।”

সাবিহা দেখে বলল, “আপনার নামটা লিখে দিলেন না চাচা?”

“পুরো বইটাই তো আমার নাম মা। আলাদা করে আর কী লিখব?” হাসলেন তিনি।

সাবিহা বইটা নেড়েচেড়ে যখন বন্ধ করল তখন তার কপালে ভাঁজ পড়ল। ভ্রুকুটি করে সে বলল, “চাচা, গাজী শরফুদ্দিন কি আপনার ছদ্মনাম? সিমি যে অন্যকিছু বলেছিল। ময়ূখ না কী যেন!”

ফরিদ হাসলেন। কোনো উত্তর দিলেন না।

রাত হতে হতে ঘটনা পুরো কুন্দকলিতে চাউর হয়ে গেল। সিমির সাথে সাকিন এলো আটটা নাগাদ। তখন ফরিদ ছাত্রদের জন্য নোট তৈরি করছেন।

নূরজাহান সাকিনকে পথ দেখিয়ে দিলেন। ছেলেটাকে দেখে আজ আর আগের কষ্ট অনুভূত হলো না। বরং সে কষ্ট ছাপিয়ে গেছে নতুন আছড়ে পড়া ঢেউয়ের সামনে। কী আশ্চর্য! জীবন দুঃখের এই সিরিজ কখনও একঘেয়ে হয় না। প্রত্যেকটা মোড়েই নতুন টুইস্ট। যখনই মনে হয় দুঃখের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করা হয়ে গেছে— ঠিক তখনই জীবন পৃষ্ঠা উল্টে এমন ঘটনার সম্মুখীন করে যে অজান্তেই মনে হয়— ফেলে আসা দুঃখ সহ্য করা ঢের সহজ ছিল!

নূরজাহানের ঠিক সে সময় চলছে।

বড় মেয়েটা মারা যাবার সময় ফারদিনের বাবা শেষ এভাবে কান্নাকাটি করেছিল। তারপর এই এত বছরে তাকে বহুবার হতাশ হতে দেখেছেন, কষ্ট পেতে দেখেছেন। কিন্তু কখনও ভেঙে গুড়িয়ে যেতে দেখেননি।

কম্পনরত কণ্ঠে তিনি বললেন, “মানুষটা একেবারে ভেতর থেকে ভেঙে গেছে।” ছিটকে আসা কান্নাটা চাপিয়ে রাখার জন্য মুখ মোছার ভান করে দ্রুত সরে গেলেন। সাকিন বড় অসহায় বোধ করল। খানিকক্ষণ ফরিদের দিকে তাকিয়ে থেকে সাহস করে এগিয়ে গেল।

“আসসালামু আলাইকুম চাচা।”

ফরিদ চমকে উঠলেন। সাকিনকে দেখে একগাল হেসে বললেন, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম! কেমন আছো বাবা?”

“আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছি চাচা।” উল্টো জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না।

“বসো বসো!” বিছানা থেকে বই সরিয়ে জায়গা করে দিলেন তিনি।

সাকিন বসল। টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলল, “নোট করছেন?”

“হ্যাঁ। ছেলেগুলো তো এখন শুধু গাইড বই পড়ে, নিজেদের নোট করার কোনো টেনডেন্সিই নেই! তাই ভাবলাম আমি একটু চেষ্টা করি। শেষ সময়ে খুব কাজে লাগে।” আগ্রহ নিয়ে নোটগুলো দেখালেন তিনি।

সাকিন অবাক হয়ে বলল, “খুব সুন্দর নোট হয়েছে! এগুলো দিয়ে তো আপনি লাস্ট মোমেন্ট সাজেশনের বই বের করে ফেলতে পারেন!”

ফরিদ খুব হাসলেন, “আবার বই! শুনেছ ঘটনা? আমার ছদ্মনাম তো গাজী শরফুদ্দিন খন্দকার হয়ে গেছে!”

সাকিন অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। ফরিদ আবার নোটে মন দিয়েছেন।

সাকিন আস্তে করে বলল, “আমাকে একটা বই দেবেন না চাচা?”

ফরিদ নোট সরিয়ে নিচ থেকে একটা বই বের করে দিলেন।

সাকিন বলল, “একটা কিছু লিখে দিন চাচা, স্মৃতি নোট।”

ফরিদ বড় যত্ন নিয়ে লিখলেন,

“শ্রাবণের মতো ছেলে সাকিন!
খুব দোয়া করি—
তুমি তোমার বর্ষা খুঁজে পাও।”

সাকিন লেখাটার দিকে বহুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। নিজেকে মাঝে মাঝেই তার খুব অথর্ব মনে হয়। সামনের মানুষটার কষ্ট কমানোর জন্য তার ভান্ডারে কখনোই কোনো শব্দ থাকে না। সে কেবল পারে চুপ থাকতে, নীরবে সবটা অনুভব করতে।

টেবিলে লাল রঙের একটা কস্টেপ ছিল। সেটা সমান করে কেটে পুরো নামটা ঢেকে দিল সাকিন। উপরের কভারে, ভেতরের মলাটে, বইয়ের পৃষ্ঠায় — সব জায়গায়।

যাওয়ার আগে শুধু বলল, “দুনিয়া আমার হাতে নেই চাচা, তবে আজীবন আমি ময়ূখমালা হিসেবে ফরিদ আহমেদকেই জানব।”

ফরিদ মাথা ওঠালেন না। তার ছলছলে চোখে ঝাপসা হয়ে আসছে বার্জেলিয়াসের সংকেত।

গভীর রাতে তিনি বের হলেন উঠানে খানিকক্ষণ হাঁটার জন্য। রাত সাড়ে এগারোটা হলেও এই গাছের বাড়িতে বৃক্ষের নিস্তব্ধতা সময়কে এক প্রহর এগিয়ে নিয়ে গেছে। উপরে শুধু সাবিহার বারান্দায় টিমটিমে একটা আলো জ্বলছে। সে আলো ছিন্ন-ভিন্ন করে দিচ্ছে কৃষ্ণচূড়ার পাতা।

সেই নিদাঘ নিস্তব্ধতা ভেদ করে খসখসে আওয়াজে এগিয়ে এলো অচেনা পদধ্বনি। তার কাছাকাছি এসে বলল, “ছেলেমেয়েদের ব্রেইন ওয়াশ করার জন্য কী উপন্যাস লিখেছ তা তো দেখানোর প্রয়োজনই বোধ করলে না! ভয় পাচ্ছো? আমি ফাঁক ধরে ফেলব ভেবে?”

ফরিদ হেসে বললেন, “কোনোদিন উপন্যাস পড়েননি ভাইজান, আমারটা পড়ে খামাখা রেকর্ড নষ্ট করবেন কেন?”

হাতটা সামনে আনলেন হীরা। বইটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, “তোমারটা দিয়েই না হয় শুরু করি!”

দরাজ কণ্ঠে তিনি প্রথম লাইন পড়লেন, “আঁধারের বুক চিরে রোজ যে রোশনাই এই ধুলো বালির পৃথিবীতে নেমে আসে—তার নাম নওরোজ।”

সমগ্র দিন নিজেকে আটকে রাখা ফরিদ আবার ভেঙে পড়লেন। হীরা চৌধুরী এগিয়ে যেয়ে তাকে দুহাতে আগলে নিলেন, ঠিক নিজের প্রিয় প্রবন্ধের মতো।

ঝাপসা এই দৃশ্যের সাক্ষী রইলো কেবল সাকিন। জানালা আর সে বন্ধ করল না। জোছনার ভেলায় দুঃখদের ঢুকতে দিলো তার স্তব্ধ পৃথিবীতে।

ঘুমানোর জন্য চোখ বন্ধ করেছে, তখুনি মেসেজের শব্দে আবছা ঘুমটা কেটে গেলো। সাইলেন্ট করার জন্য ফোন সামনে এনে দেখল জুবায়েরের মেসেজ।

“একটা বিপদে পড়েছি সাকিন ভাই! আপনার হেল্প দরকার! জেগে আছেন? ফোন দেই?”

চলমান~

(প্রিয় পাঠক! আমাকে কি আপনাদের মনে আছে? নাকি এক দিনের অদর্শনে ভুলে গেছেন?)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 34 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন