ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনজোছনা

পর্ব 35

লেখক: বিনতে ফিরোজ

#বনজোছনা
৩৫.

গোস্ট রাইটার বা ছায়া লেখকের প্রেক্ষাপট এদেশে খুব অপরিচিত নয়। ছোট-বড় পরিসরে এমন হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইতিহাসের দিকে উত্থাপিত সে প্রশ্নের বিপরীতে পাওয়া গেছে স্রেফ কিছু এলোমেলো গুঞ্জন। স্বেচ্ছায় নিজেকে ছায়া লেখক হিসেবে বরণ করে নেয়া মূল লিখিয়ে অথবা নাম দিয়ে ব্যবসা করা প্রচ্ছদ লেখক— কেউই এ বিষয়ে মুখ খোলেনি।

বাংলাদেশে গোস্ট রাইটিংয়ের সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন শেখ আব্দুল হাকিম। দুহাজার উনিশ সালের জুলাই মাসে তিনি জানান সেবা প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত মাসুদ রানা সিরিজের দুইশ ষাটটি এবং কুয়াশা সিরিজের পঞ্চাশটি বইয়ের লেখক তিনি। অথচ মাসুদ রানার মাত্র একটি এবং কুয়াশার স্রেফ ছয়টি বইয়ের কপিরাইট তার। বাকিগুলো দেদারসে চলেছে কাজী আনোয়ার হোসেনের নামে। তার মামলার ভিত্তিতে তদন্ত, এবং তৎপরবর্তী সময়ে, একুশ সালের ডিসেম্বর মাসে এই মামলায় বিজয়ী হন হাকিম। কিন্তু তা উপভোগ করার জন্য তিনি ততদিনে আর পৃথিবীতেই ছিলেন না। ভাগ্যের কি পরিহাস! বেঁচে থাকতে রয়্যালিটি পেলেন না, রয়্যালিটি ভোগ করার জন্য আর বেঁচেই রইলেন না!

বৈশ্বিক পরিসরেও এ জিনিস একেবারেই নতুন নয়। উল্লেখযোগ্যদের মাঝে আছেন ফ্রান্সের আলেকজান্ডার ডুমা এবং ওগ্যুস্ত মাকে, ফরাসি সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত নারী লেখক কোলেট, যিনি—প্রতারিত হয়েছিলেন তার স্বামী কর্তৃক, খুব শোরগোল ফেলেছিল স্ট্র্যাটেমেয়ার সিন্ডিকেট এবং তাদের অবাস্তব লেখক ক্যারোলিন কিন, অথবা বলা যায় বিখ্যাত জাদুকর হ্যারি হুডিনির ‘Under the Pyramids’ এর কথা, যার মূল লেখক লাভক্রাফট চরম দারিদ্রতার ভেতরেই মৃত্যুবরণ করেছেন বইটির কোটি কোটি কপি বিক্রি হবার পরও।

এসবকিছুই ফরিদের অজানা নয়। যখন পড়তেন, ভাবতেন—এমনও হয়! একটা মানুষের লেখা এভাবে আরেকজনের নামে ছাপিয়ে দেয়া যায়! কেমন গল্প গল্প লাগত! মনে হতো উপন্যাসের বিহাইন্ড দ্যা সিনস!

নিজে খুব অস্বস্তিতে পড়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদের ‘দাঁড়কাকের সংসার কিংবা মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ বইটি পড়ে। বইমেলা থেকে কিনে এনে একবার পড়েই ওটা আলমারিতে চালান করে দিতে হয়েছিল। বহু বছর হুমায়ূন পড়ার সুবাদে তার লেখনীর সাথে গাঢ় সম্পর্ক ছিল। নাম লেখা না থাকলেও চোখ বন্ধ করে লেখককে চিনতে পারতেন। এজন্যই তিনি খুব নিশ্চিত ছিলেন এটা গোস্ট রাইটার দিয়েই লেখানো। ওরকম লেখা হুমায়ূন আহমেদের কলম থেকে আসতেই পারে না!

বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। রূপকথার যে জুজু বুড়িকে রেখেছিলেন বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলের মাঝে— সে জুজু বুড়ি আজ তার কপালে এসে জুটেছে। কিটকিটিয়ে হেসে বলছে— বিশ্বাস করবি না তো? কেমন খেল দেখালাম বল!

অবসরে নিজের পেইজে ঢুকে বসে থাকা তার পুরোনো অভ্যাস। সে পেইজ আর নিজের নেই। অভ্যাসটাও বদ অভ্যাস হয়ে গেছে। তবু ছাড়তে পারছেন না। আনমনেই ওখানে চলে যান। ঘুরে ঘুরে দেখেন ‘নওরোজ’এর চমৎকার বিক্রি-বাট্টা। বইয়ের দু একটা উক্তি মাঝে মাঝে পোস্ট করা হয়। তাতেই অনায়াসে পনের-বিশ হাজার রিয়্যাক্ট পড়ে। অথচ পুরো গল্পটা লিখেও সাকুল্যে পাঁচশ রিয়্যাক্ট পাননি তিনি।

বুকে চাপ লাগার আগেই সাত তাড়াতাড়ি পেইজ থেকে বেরিয়ে যান। লেখালেখি করতেন বলে ওরকম পেইজগুলোই ঘুরে ফিরে সামনে আসে। বেশ জনপ্রিয় কয়েকজনের লেখা পড়েছেন তিনি। তাদের মাঝে দু তিনজন হুবহু হুমায়ূন আহমেদের ধরন নকল করে লেখে। প্রথমে ভেবেছিলেন অনুসরণ, পড়ে বুঝলেন সে অনুসরণ আর নিষ্পাপ পর্যায়ে নেই। অনুকরণ করতে করতে নকল অবধি চলে গেছে। বর্ণনার ভঙ্গি, সংলাপের ধরন কিংবা চরিত্র গঠন— পুরোটাই এক। কেবল লেখক সত্ত্বা ভিন্ন। ফরিদ হাসেন। হুমায়ূন আহমেদের লেখার ধরনটা নকল করা সোজা। তাই বলে জীবনবোধ তো আর নকল করা যায় না! ফলে ওদের লেখাগুলো কেমন ফাঁপা, অন্তঃসারশূন্য। অথচ সে লেখারও কী মূল্য! কতশত বই বেরুচ্ছে! কত লাখ লাখ মানুষের প্রিয় তারা! কেবল তিনিই এতিম রয়ে গেলেন।

অলস অবসরে মনটাকে শক্ত করেন ফরিদ। পরের ক্লাসের ঘণ্টা বাজাচ্ছে দপ্তরী। ছেলেমেয়েদের হুল্লোড় শোনা যাচ্ছে। পরবর্তী শিক্ষক না আসা অবধি একটু কোলাহল করে শক্তি গুছিয়ে নিচ্ছে তারা।

এই পলকের সময়টুকুর মাঝেই কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। আইডি কীভাবে ডিলিট করতে হয় তা তার জানা নেই। তাই ফেইসবুক অ্যাপটাই ডিলিট করে দিলেন, সাথে জীবন থেকে লেখালেখির অধ্যায়।

দীর্ঘ করে দম ছেড়ে ক্লাসের দিকে এগোলেন। খুব মন দিয়ে ছাত্রদের পড়াতে হবে। চেয়াম্যানের ভাতিজা এবং একইসাথে সরকারি কলেজের স্যারের ছেলেকে পড়ানোর সুবাদে তার কিছু পসার হয়েছে। এটা ধরে রাখতে হবে। নতুন চারজন যোগাযোগ করেছে। ফরিদ ভাবলেন আর ঘর ভাড়া নেয়ার ঝামেলার ভেতর যাবেন না। এই চারজনের একজনের বাড়িতেই পড়ানো শুরু করবেন। তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ঋণ শোধ করা। আর কিছু নয়, কিচ্ছু না।

—

কী হতে পারে ভাবতে ভাবতেই সময় কিছুটা গড়িয়ে যাওয়ায় আর ফোন দেয়াটা সমীচীন মনে করল না সাকিন। সকালে ঘুম ভাঙতেই ঠিক পেলো মেসেজটা মাথায় গেড়ে বসেছে। কৌতুহল না মেটা অবধি শান্তি লাগছে না। জুবায়ের কী বিপদে পড়ল তা ভাবতে ভাবতেই সাতটা নাগাদ তাকে ফোন দিলো সে। রিসিভ হলো তিনবার রিং বাজার পর।

জুবায়ের দরাজ কণ্ঠে বলল, “কেমন আছেন সাকিন ভাই?”

“আলহামদুলিল্লাহ্, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”

“নিজের দিক থেকে তো ভালোই আছি। কিন্তু পুলিশ মানুষের কি আর ভালো থাকা যায়? চারদিক থেকে নচ্ছার মানুষের নানান ঘটনা!”

সাকিন অপেক্ষা করল জুবায়েরের কথার আশায়।

“ওইদিকের কলেজ কেমন চলছে ভাই?”

“কলেজে তো ভালো! আমারই ভালো লাগে না।”

“কেন?”

“এরা খুব বেশি গৎবাঁধা! সবকিছুতে বড় তাড়াহুড়ো! তাছাড়া আমাকে বা কলেজের কোনো টিচারকেই তাদের তেমন একটা দরকার নেই। এর মধ্যেই সিলেবাস শেষ করে ফেলেছে। নিয়ম রক্ষার জন্য যাই ভাই! মন টানে না।”

“ছয় মাস হলো না ওদিকে গেলেন, এর মধ্যেই এমন বিতৃষ্ণা হয়ে গেলে তো সমস্যা! চাকরি কি করতে চাচ্ছেন না?”

“না তা না! কিন্তু এমন চাকরি করার মানে কী? মাস শেষে টাকা পাই, সেটাও ইউজলেস মনে হয়!”

“তাহলে কী করতে চাচ্ছেন?”

“এমন কোথাও যদি যেতে পারতাম, যেখানে আসলেই আমার দরকার আছে! একটু নিরিবিলি কোথাও।” ফোস করে নিশ্বাস ছাড়ল সাকিন। সে প্রকৃতই ক্লান্ত। যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ততক্ষণই মনে হয় বেঁচে আছে, বাকি সময়টা কেবল নিশ্বাস নিয়ে পার করা।

জুবায়ের যে ছোটখাট একটা লাফ দিয়ে ফেলল, তা তো সাকিন দেখতে পেল না! সে শুধু খেয়াল করল ওপাশ থেকে কোনো শব্দ আসছে না। বলল, “হ্যালো? আপনার কিছু বলার ছিল মনে হয়।”

জুবায়ের খুশি খুশি গলায় বলল, “প্রথমে একটা আবদার ছিল। ভাবছিলাম অন্যায় আবদার হয়ে যায় কি না! এখন তো দেখছি আবদার না, আসলে আপনার প্রয়োজন ছিল!”

“কী বলুন তো!” সাকিনের ভুরু কুচকে এলো। রিফাত কাঁদতে শুরু করেছে। কথা শুনতে সমস্যা হওয়ায় সে নিচে চলে গেল। এ সময় সিমিদের বারান্দার দরজা বন্ধ থাকে। কাজেই বিপরীতের সদর দরজা খুলতে সমস্যা হয় না।

জুবায়ের বলতে শুরু করল, “এদিকে এক কলেজে বিশাল শিক্ষক সংকট! আসলে টিচার তো আছে, কিন্তু যারা আছে তাদের বেশিরভাগই রিটায়ার্ড হব হব করছে। কারো উন্নতি-অবনতিতে তাদের আর কিছু যায় আসে না। বুড়ো মানুষ, বোঝেন না! আবার নতুন কেউ আসছেও না। না শহর, না গ্রাম। উপশহর ধরনের এলাকা, শহরের মতো সুযোগ সুবিধা নেই বলে লোকজন যেতে চায় না। গেলেও ঘাঁটি গেড়ে বসে না। দুই এক বছরের মধ্যেই উড়াল দেয়। মাঝখান থেকে কলেজটা খরচা হয়ে যাচ্ছে।” বড় করে নিশ্বাস নিলো সে। ভেবেছিল সাকিন কিছু বলবে। কিন্তু কোনো প্রশ্ন না শুনে আবার বলতে শুরু করল।

“পুলিশ বলেই শুধু খুন-খারাপিতে থাকি এমন ভাবার কোনো কারণ নেই ভাই! এই কলেজে আসলে আমি পড়েছি, আমার বাড়ির একেবারে পাশে। ফাও মানুষের পাল্লায় পড়ে কলেজের নাম নিশানা মুছে যাচ্ছে দেখলে কষ্ট লাগে। একটা ভালো টিচার যদি পৌঁছে দিতে পারতাম…!”

হঠাৎ করেই সাকিন বলল, “এত বড় কলেজ! একজন টিচার কি সব সামলাতে পারবে?” তার বুকের ভেতর কেউ ঢোল পেটাচ্ছে। মনে হচ্ছে কাঙ্খিত জায়গাটা নিজের পায়ে তার কাছে হেঁটে এসেছে।

“কলেজ আসলে বেশি বড় না। মোটামুটি তিনশ ছেলেমেয়ে হবে। টিচারও অল্প কিছু আছে। কিন্তু সবই অলস! একটা অ্যাক্টিভ টিচার থাকলে বাকিরা তটস্থ হতে বাধ্য! আর যদি দেখে পুলিশ নিজে এসে অডিট করে যাচ্ছে তাহলে তো কথাই নেই! যদিও নামের অডিট! কিন্তু ড্রেস তো আছে!” বাঁকা কণ্ঠে বলল জুবায়ের।

“আমাকে কী করতে বলছেন?”

জুবায়ের খানিক ইতস্তত করে বলল, “জায়গাটা একটু গ্রাম গ্রাম তো! আমার থানাতেও না। বেশ ভেতরে। জোর দিয়ে বলতেও পারছি না… মানে আমার মাথায় এসেছিল একবার, আপনি কাজের মানুষ, যদি ঐ কলেজে জয়েন করতেন…ইয়ে সাকিন ভাই…”

সাকিন তার কথা শেষ করতে দিলো না, “ছয় মাসের ভেতরেই কী আবার ট্রান্সফার করা যাবে?”

জুবায়ের চমকে উঠল, “আপনি কি রাজি?”

শ্বাস আটকে সাকিন বলল, “আপনার এই প্রস্তাবের জন্যই মনে হয় আমি এতদিন ছটফট করছিলাম! এখানে আমি সত্যিই ক্লান্ত!”

জুবায়ের তার উত্তর পেয়ে গেলো।
“ট্রান্সফারের বিষয় আমি দেখছি ভাই! আপনাকে কোনো চিন্তা করতে হবে না!”

সকালের খাবার খাওয়ার সময় সাবিহাকে একটু আভাস দিয়ে চাইলো সাকিন। রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল, “অনেকদিন হয়ে গেল এখানে!”

সাবিহা চোখমুখ কুঁচকে তাকালো। একে তো রিফাত খাচ্ছে না, তার মাথায় রীতিমত আগুন জ্বলছে। এই ছেলে খাওয়া নিয়ে তাকে এত জ্বালাতন করে! এর মাঝে ভাইয়ের এসব উদাস কথাবার্তা তার আগুনে ঘি ঢেলে দিলো।

ঝাড়ি দিয়ে সে বলল, “অনেকদিন হয়ে গেল মানে কী? তোর মেয়াদ কি উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে?”

সাকিন থতমত খেয়ে গেল। হীরা চৌধুরী ইশারায় বোঝালেন এখন কিছু না বলতে। সাকিন চুপ করে গেল।

রিফাতের খাওয়া শেষ হলে সাবিহা ঠান্ডা মাথায় বলল, “কী বলছিলি এবার বল।”

সাকিন ওর মাথায় হাত দিলো। সরু চোখে তাকিয়ে রইলো।

সাবিহা বলল, “কী সমস্যা?”

“ভিসুভিয়াস এখনও উত্তপ্ত আছে কি না তাই দেখলাম।”

“ভাইয়া!” চোখ রাঙিয়ে তাকালো সাবিহা।

সাকিন হেসে ফেলল, “মাথা এত গরম হলে হয়? অল্প বয়সে চুল পড়ে যাবে তো!”

“বাচ্চা-কাচ্চা তো নেই তো বুঝছিস না! একটা হোক, তোর মাথায় কেমন চুল থাকবে তাই দেখব!” বলেই তার মনটা খারাপ হয়ে গেল। মন মরা কণ্ঠে বলল, “বাচ্চার ভালো একটা মা খুঁজে দিলাম, তোর তো পছন্দ হলো না! কাকে বিয়ে করিস দেখব আমি!”

সাকিন প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলল, “তোর এখানে অনেকদিন থাকা হলো।”

“অনেকদিন এখনও হয়নি। পাঁচ মাস কেবল হয়েছে!”

“কম তো না!”

“তাই তোর কী হয়েছে? মন উড়ু উড়ু করছে?”

সাকিন ফের বোনের মাথায় হাত দিলো। হেসে নরম কণ্ঠে বলল, “আহা! এমন করে কেন! আমি কি সারাজীবন এখানে থাকব?”

“সারাজীবন তো থাকতে বলিনি! একটা বিয়ে কর তারপর নিজের মতো থাক, আমি না করার কে? তার আগ পর্যন্ত অন্তত আমার কাছে থাক!”

“না করার কে মানে কী? ইমোশনাল কথাবার্তা বলিস না তো! বিয়ে কপালে থাকলে হবে। এটি চিন্তার কিছু নেই।”

সাবিহা সরু চোখে তাকালো।
“কী বলবি খোলাসা করে বল তো!”

“তেমন কিছু না। অনেকদিন থাকা হলো এদিকে, এবার অন্য কোথাও যাওয়ার পালা।”

“কোথায় যাচ্ছিস তুই!”

“এখনই যাচ্ছি না। তবে যেতে চাই। যেখানে আমার দরকার আছে, কাজ আছে।”

“এখানে তোর কাজ নেই?”

“আছে, কাগজে-কলমে। এই কাজ করে আমার পোষাচ্ছে না সাবিহা। সবসময় কেমন অস্থির লাগে! মনে হয় জড় পদার্থ হয়ে যাচ্ছি! সেই পুরোনো দিনে ফিরে গেছি, মূর্তির মতো ফার্মেসিতে বসে থাকা!”

সাবিহা একদৃষ্টে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।
স্তিমিত কণ্ঠে বলল, “তুই চলে যাবি?”

সাকিন নরম কণ্ঠে বলল, “তুই এভাবে মন খারাপ করলে হয়তো যেতে পারব না। কিন্তু থাকলেও ভালো থাকব না।”

“আমার কাছে তুই ভালো থাকবি না?” সাবিহার চোখে অভিমান।

“তুই আছিস জন্যই পাঁচটা মাস টিকতে পেরেছি। নাহলে আমার যে কী হতো..!”

“তাহলে এত ঢং করছিস কেন! যেখানে যাবি যা! আমাকে শোনানোর কী আছে?”

“পারমিশন নিচ্ছি। খুশি মনে দে, তাহলে আমিও খুশি মনে আগাতে পারব।”

সাবিহা অপলক ভাইয়ের মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলো। বাবার চেহারা-ছবি স্মৃতিপটে ঝাপসা হয়ে এসেছে। ভাবতে গেলেই এই মুখটা মনে পড়ে। ইচ্ছে করে তাকে বুকের মণিকোঠায় যত্ন করে রেখে দিতে। তবে তা করতে গেলে তাকে তো বন্দী করে ফেলা হয়! হঠাৎ করেই অনুধাবন করল সাবিহা।

চোখ নামিয়ে বলল, “যা, আমাকে একবারে ভুলে যাস না। আমার যে একটা ছেলে আছে, সেই ছেলের যে একটা মামা আছে এটা মনে রাখিস।”

সাকিন চমৎকার ভঙ্গিতে হাসল, “অবশ্যই!”

—

গত মাসে সর্বোচ্চ আয় হয়েছে। তবে তাতে ফাবিহার মাঝে বিন্দুমাত্র উৎফুল্লতা কাজ করছে না। প্রথমত, এই আয়ের জন্য বড় রকম অবদান রেখেছে সেই মেয়েটি— যাকে নিয়ে ফাবিহা অবলীলায় বলে ফেলেছিল— ওর সাথে রাস্তায় চলা যায় না! এমন জোরে জোরে হাসে, সব মানুষ ঘুরে ঘুরে তাকায়!

কথাটা সত্যি ছিল। কিন্তু সেই বাক্যের মাঝে যে অভক্তি লুকিয়ে ছিল তা সিমির সামনে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছিল সে নিজেই। এবং তার পরেই স্বল্প পরিচিত সেই মেয়েটি এমনভাবে তার পেইজের মার্কেটিং করেছে যে কেবল তার সূত্র ধরেই গোটা তেত্রিশটা ডায়েরির অর্ডার কনফার্ম হয়েছে। যতবার একেকটা অর্ডার কনফার্ম হয়েছে, নিজের মনে মরমে মরে গেছে সে। যতবার সেই মেয়েটি তার পোস্ট শেয়ার করেছে, ততবার ফাবিহা ভেবেছে তার কাছে ক্ষমা চায়। বলে— তুমি নিঃস্বার্থভাবে আমাকে সাহায্য করছ, অথচ তোমার তুচ্ছ একটা বিষয় না আমি নজরান্দাজ করতে পেরেছি, না নিজের মাঝে চেপে রাখতে পেরেছি। তুমি কি আমাকে মাফ করবে?

জিনিসটা বড় বেশি অদ্ভুত হয়ে যায় বলে বলা হয়নি।

মাঝে মাঝে এও মনে হয়েছে, সিমিকে বলে— তুই ওইদিনের কথাটা ভুলে যা সিমি! মেয়েটা নিজের সাধ্যমত আমাকে সাহায্য করেছে— শুধু এটুকুই মনে রাখ!

এই চিন্তাটাও বড় হাস্যকর, বড় খেলো! ওর ওই স্বভাবটা তো মুছে যায়নি, কেবল অন্য স্বভাবও যে আছে— সেটাই কেবল ফাবিহার চোখে পড়েছে।

এবং তখনই খুব প্রচলিত, তবে চোখের আড়ালে থেকে যাওয়া একটা আদেশ তার মর্মে যেয়ে আঘাত করেছে।

পরনিন্দা বা গীবত যে খারাপ— এই তত্ত্বকথাটা জানলেও অনুভূতির দুয়ারে কখনও আঘাত করতে পারেনি। বরং অপরের দোষ উন্মোচনের মাধ্যমে তাকে এক শ্রেনী নিচে নামিয়ে দিলে উল্টো নিজেকে খানিকটা বড় মনে হয়। কোনো উন্নতি ছাড়াই নিজের এই বড়ত্ব পৈশাচিক আনন্দ দেয় কথকের মনে। আমিত্বের এই আনন্দের নিচে ঢাকা পড়ে যায় অপরের খুঁত উন্মুক্ত করে তাকে জনসম্মুখে নগ্ন করে দেয়ার নীচতা। গীবতকে তখন মনে হয় প্রয়োজনীয়। সকলের জানা থাকা উচিত ওই মানুষটার মাঝে কী কী বিপদ লুকায়িত আছে!

ফাবিহা হাড়ে হাড়ে টের পায় কেন গীবত কেবল অপছন্দনীয় বা নাজায়েজ নয়, কেন হারাম। কেবল এক খণ্ড বস্ত্রহনন করলেই তো মানুষ নগ্ন হয় না! নগ্ন হয় খায়েশ মেটানো খুঁত বিশ্লেষণেও। আর যেকোনো ধরনের নগ্নতাই যে নিষিদ্ধ— তা কে না মানবে!

তারপর থেকে ফাবিহা ওই মেয়েটি সম্পর্কে সিমির কাছে, মায়ের কাছে এমনকি বাবার কাছেও বহু প্রশংসা করেছে। কিন্তু অসম্ভব আফসোসের সাথে আবিষ্কার করেছে— কথা ফেরত না নিতে পারার ব্যর্থতা!

রাতে খাবার পর পুরো তেইশ হাজার টাকা বাবার হাতে তুলে দিল সে। ফরিদ শান্ত কণ্ঠে বললেন, “কালকেই পঞ্চাশ হাজার শোধ করে দিতে পারব!”

ফাবিহা অবাক হয়ে বলল, “তোমার বেতন দিয়েছে নাকি?”

“চেয়াম্যানের বাড়িতে কয়েকটা ছেলে হয়েছে মা! ওদের তো প্রায় এক মাস ধরে পড়াচ্ছি। ওরা বেতন দিয়েছে। আর দুটো ব্যাচেও কিছু ছেলে হয়েছে মা! আলহামদুলিল্লাহ্, কিছু টাকা হয়েছে হাতে।”

ফাবিহা উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল, “তাহলে আর আড়াই লাখ থাকবে!”

ফরিদ জ্বলজ্বলে চোখে মেয়ের খুশি দেখে গেলেন! টাকাগুলো শোধ করার পরেই মেয়েটার জন্য ভালো পাত্র খুঁজবেন। এই একটা কাজ ঠিকমতো করতে পারলেই আর কোনো চিন্তা নেই!

সে রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে প্রায় দু সপ্তাহ পর প্রকাশকের ফোন পেলেন।

সে উচ্ছ্বাসের সাথে বলছে, “স্যার! আপনার কোনো খোঁজ নেই কেন? আপনি কী ব্যস্ত আছেন? দুটো কথা বলা যাবে?”

“বলুন।” ছোট করে বললেন ফরিদ। স্যার ডাকটা খুব কানে বাজল।

“আপনি জেনে খুশি হবেন আপনার বইটা ইতোমধ্যেই পাঁচ হাজার কপি সেল হয়ে গেছে! আমাদের প্রকাশনীর বেস্টসেলার! রিভিউ কি দেখেছেন? গুডরিডসে তো ধোঁয়া উঠিয়ে ফেলেছে!”

ফরিদ কোনো উত্তর দিলেন না।

“হ্যালো? শুনতে পাচ্ছেন স্যার?”

“হু।”

“স্যার, আপনার মতো এমন সম্ভাবনাময়ী লেখককে হারিয়ে দেয়া যায় না। আপনার লেখা টিকিয়ে রাখা আমাদের কর্তব্য। নেক্সট বইয়ে আপনি দশ পার্সেন্ট রয়্যালিটি পাবেন স্যার! নামটা শুধু শরফুদ্দিন খন্দকারের থাকবে, উনার নামেই বেশি বিক্রি হচ্ছে তো… ওসব কোনো বিষয় না স্যার। চিন্তা করুন, দুশো টাকার বইয়ে আপনি বিশ টাকা করে পাবেন। আর উনার নামে বিক্রি হলে পাঁচ হাজার কপি কনফার্ম। তাহলে চোখ বন্ধ করে এক লাখ!” দম ছাড়ল সে। ফরিদ তখনও নীরবতা বজায় রেখেছেন।

প্রকাশক বলল, “তাহলে নেক্সট লেখাটা কবে পাচ্ছি স্যার?”

“কোনোদিন না।” ফরিদের কণ্ঠে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই।

“সরি? আপনি আমাদের লেখা দিচ্ছেন তো?”

“অসম্ভব!” হাসি মুখে বলে ফোন রেখে দিলেন তিনি। নূরজাহান বিরক্ত হয়ে ঘুম ঘুম কণ্ঠে বললেন, “ঘুমাচ্ছ না কেন!”

লাইট বন্ধ করে শুয়ে পড়লেন ফরিদ। বুকটা বড় ঠান্ডা লাগছে। মনে হচ্ছে ওখানে তার পৌষমাস এসে গেছে। তবে কার আবার সর্বনাশ এলো?

চলমান~

(চল্লিশ পর্বেও এ জিনিস শেষ হবে বলে তো মনে হচ্ছে না 🙂)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 35 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন