#বনজোছনা
৩৬.
পাওনাদারদের সাথে কথা হয়েছিল, ছয় মাসের মাঝে সকলের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। চেয়ারম্যান সাহেবের উপস্থিতিতেই এ কথা দিয়েছিলেন ফরিদ। তবে সাড়ে তিন লাখের সুদ যে মাত্র ছয় মাসে পরিশোধ করা সম্ভব না— এটা তখন যেমন বুঝেছিলেন, এখনও সেভাবেই বুঝতে পারছেন। তবে পার্থক্য হলো মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার কিছু সময় বাকি থাকাবস্থায় এক লাখ টাকা অন্তত শোধ হয়েছে। ফরিদ বেছে বেছে তাদের মুখই বন্ধ করেছেন যেগুলো খুললেই কেবল বিষ ছড়াত।
মহাজন সকলেই রুক্ষ মেজাজী নয়। দুচারজনের কাছে চাইলে যে কিছু সময় বাড়িয়ে দিত না— তেমনও নয়। কিন্তু চেয়াম্যানের বাড়িতে কয়েকজনের মেজাজের আগুন তাদেরও ছুঁয়ে ফেলায় সময় বাড়ানোর কথা মুখেই আনা যায়নি। ফরিদও আগুনে ঘি ঢালেননি। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করেছেন।
গত কয়েকমাসে পঞ্চাশ পঞ্চাশ করে একেকজনের পুরো কিস্তি শোধ করলেও এ মাসে পঞ্চাশ হাজারকেই তিন ভাগ করে তিনজনের কাছে গেলেন। টাকাটা তাদের হাতে উঠিয়ে দিয়ে জানালেন তিনি ঋণ পরিশোধে সক্ষম। কেবল কিছু সময় দরকার। একজন অবশ্য মেনেও নিয়েছে। ফরিদের দুর্বল চেহারা দেখে সম্ভবত তার মন গলেছে। তবে বাকি দুজনার মন পাথর কঠিন। কোনোভাবেই তাদের টলানো গেলো না। ছয় মাস ফুরোতে আর অল্প কিছু দিন বাকি। এর মাঝেই তাদের টাকা শোধ করতে হবে। ফরিদ ভেবেছেন আরও কয়েকবার অনুরোধ করবেন । মান-সম্মানের চিন্তা এখন আর খুব একটা হয় না। খোয়ানোর আর তেমন কিছু বাকি নেই। কাজেই মুখ বন্ধ করে বসে থাকলে নিজেরই ক্ষতি। কারো হাতে পায়ে ধরার কথা ভাবলেই মনে হয়— সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কী ভয়!
ছাত্রদের পরীক্ষার খাতা দেখতে দেখতে এসবই ভাবছিলেন তিনি। সে সময় নূরজাহান এসে ঘরের বাতি জ্বালিয়ে দিলেন। বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, “চোখ দুটো নষ্ট করার ফন্দি করেছ?”
ফরিদ বাইরে তাকালেন। দিনের প্রভা নিভে এসেছে। চিন্তার সমুদ্রে যে সাঁতারু, তার এদিকে খেয়াল থাকলে তো!
“খেয়াল করিনি।” ছোট করে বললেন তিনি।
নূরজাহান কাছে এসে ইতস্তত করে বসলেন। খানিকক্ষণ উশখুশ করে ফরিদের বাম হাতের তালুতে ঝট করে কিছু একটা গুঁজে দিয়ে চলে যেতে চাইলেন। কিন্তু ফরিদ দিলেন না। তাকে আটকে অবাক কণ্ঠে বললেন, “দাঁড়াও! কী এটা?”
নূরজাহান উত্তর দিলেন না।
ফরিদ মোড়ানো কাগজটা খুলতেই দশটা হাজার টাকার মলিন নোট ঝলমল করে উঠল। তিনি আরও অবাক হলেন।
“কীসের টাকা?”
নূরজাহান অস্বস্তি ভরে বললেন, “কাঁথা সেলাই করেছিলাম, তিনটে।”
“সিমিকে কিছু দেবে না?” নরম কণ্ঠে বললেন ফরিদ।
নূরজাহান ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, “এখন থাক। ঋণ মিটে গেলে তখন দেয়া যাবে।”
ফরিদ মাথা নাড়লেন।
নূরজাহান বললেন, “শোনো।”
“হ্যাঁ, বলো।”
“আমার খুব ইচ্ছে হয়…” একটু থামলেন নূরজাহান। “সিমিকে ভালো একটা বিয়ে দেই। ছোট মানুষ, কতদিন আর ভেসে বেড়াবে? একটা ছেলে দেখতে পারো না? অল্প বয়স, কাজ-টাজ করে খায়।”
ফরিদ হেসে ফেললেন, “অনেক বড় স্বপ্ন নূরজাহান! কঠিন স্বপ্ন! তবে স্বপ্ন দেখা ভালো, স্বপ্নই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।” দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি। “কতকিছুই তো ইচ্ছে করে! ছেলেটা যখন হলো, খুব ইচ্ছে করত— ভালো মানুষ হবে, লেখাপড়ায় ভালো করবে! এখন আর সেসব ইচ্ছে করে না, শুধু মনে হয়— একটা কাজ যদি অন্তত করত! ওর তো কোনো ভবিষ্যৎ দেখি না নূরজাহান!” তার কণ্ঠে আশঙ্কা নূরজাহানকে স্পর্শ করল। তিনি উত্তর দিতে পারলেন না। চুপ করে রইলেন।
“বাড়িতে আছে?”
“না, সারাদিন তো বাইরে বাইরে ঘুর বেড়ায়।”
“কোথায় যায় কিছু জানো?”
“না। জিজ্ঞেস করলে বলে না।”
ফরিদ হতাশ নিশ্বাস ছেড়ে বললেন, “আজকে দেখলাম, মসজিদ ছাড়িয়ে আরও আধা কিলো ভেতরে এক পুকুর পাড়ে বসে আছে। সঙ্গে আরও একজন ছিল। সকালে যখন টাকা দিতে গেলাম, তখন দেখি ওখানে। বিকেলে সেই পথ দিয়ে এলাম, তখনও ওখানে ঐভাবেই বসে আছে। জীবনটা কি এভাবে চলবে? এমন অথর্ব হয়ে গেল কেন ও?”
নূরজাহান উত্তর দিতে পারেন না। তার শুধু মনে হয় তার নিজের অবহেলার জন্য ছেলেটা এমন হয়েছে। অথচ আলাদা করে ওর সাথে তো কিছুই করেননি। ফাবিহাকে যেভাবে মানুষ করেছেন, ফারদিনকেও তো সেভাবেই করেছেন। ওর সময় আবেগটা বরং আরও বেশি ছিল। প্রথম সন্তান, মা বলে ডাকলেই বুকের রক্ত ছলকে উঠত। তারপর দুটো মেয়ে হলো। আবেগও সংযত হলো। তবে ফারদিন কেন এমন হয়ে গেল?
“তুমি ওকে একটু বোঝাও না! আজকে রাত্রেই বলো।”
ফরিদ মাথা নাড়লেন। তার এসব আর ভালো লাগে না।
স্ত্রীর কথামত ফারদিনকে তলব করলেন। সে সাধারণত পারিবারিক বৈঠকগুলো এড়িয়ে চলে। খাবারও খায় নিজের মতো, একা একা। আজ সরাসরি ডাক পড়ায় আর এড়িয়ে যেয়ে পারল না।
সে এসে বসতেই ফাবিহা চেয়ার বদলাল। নূরজাহান নীরবে পর্যবেক্ষণ করলেন সেটা।
ফরিদ ভারী কণ্ঠে বললেন, “কী করতে চাচ্ছিস তুই?”
“কী চাচ্ছি বলতে?”
“কী করার কথা ভাবছিস?”
“কিছুই করার কথা ভাবছি না।” নির্বিকার কণ্ঠে বলল ফারদিন।
ফরিদ রাগ সংযত করলেন। আজ মেজাজ হারালে চলবে না।
“কতদিন এভাবে চলবি? বাপের টাকায় খাওয়ার জন্যে তো বাপকে বেঁচে থাকা লাগবে! তুই যা করছিস, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না। তখন কী করবি?”
“তখনের বিষয় তখন দেখা যাবে।”
“ফারদিন!” ধমকে উঠলেন নূরজাহান। বাবার মুখে মৃত্যুর কথা শুনেও ছেলের কোনো অনুভূতি না দেখে নূরজাহান এ বেলায় সত্যিই ভয় পেয়ে গেলেন।
ফরিদ মুখ গোল করে নিশ্বাস নিলেন।
“পড়াশোনা করলি না, ইন্টার পাশের সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি যে পাবি না তা তো জানিস, না কি? আরেকজনের পুকুরে মাছ ধরে কতদিন চলবি? সারাজীবনই কি এইই করবি?”
ফারদিন বিরক্ত হয়ে বলল, “তোমাদের কি বিরক্ত করেছি আমি? নিজেরা যা করছ করো না!”
নূরজাহান নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
“বাড়ি একটা কুকুর পুষলেও সেটা কাজ করে খায়। তোকে পুষে আমাদের কী লাভ হচ্ছে?” উচ্চ কণ্ঠে একটা গালি দিলেন তিনি। সিমি রান্নাঘরের ভেতরে আরেকটু সেঁটে গেলো। খালাম্মাকে এমন রাগতে কখনও দেখেনি সে।
ফাবিহা চাপা কণ্ঠে বলল, “আস্তে আম্মু! উপর থেকে শুনতে পাবে!”
ফারদিন থম মেরে গেল।
ফরিদ শীতল কণ্ঠে বললেন, “কাজ করলে বাড়িতে থাকবি, আর যদি নিয়ত করে থাকিস কাজ করবি না— তাহলে এক্ষণি বের হয়ে যা।”
ফারদিন এক মুহূর্তও দেরি করল না। সোজা বেরিয়ে গেল।
দৃশ্যপট থেকে সে হারিয়ে যেতেই নূরজাহান ডুকরে কেঁদে উঠলেন। অন্ধের মতো হাতড়েও খুঁজে পেলেন না কোন পাপের কারণে ছেলেটা এমন হয়ে গেল!
থমথমে আবহাওয়ায় রাতটা নামল বড় দ্রুত। ফরিদ শুয়ে পড়েছেন। নূরজাহান খানিকক্ষণ উঠানে, খানিকক্ষণ বারান্দায়, শেষমেশ জানালার সামনেও একটু ঘোরাঘুরি করলেন। ফারদিনকে কোথাও দেখা গেল না। অস্থিরচিত্তে ঘুমাতে গেলেন তিনি। পিঠটা কেবল বিছানায় ছোঁয়ানো। চোখদুটো তো আদেশ মানে না! বুক ঠেলে কান্না বের হতে চায়! এই রাত করে কোথায় গেল ছেলেটা? গায়ের চামড়া এমন পাতলা হলে একটা কাজ করতে পারে না কেন!
মুখে আঁচল চেপে কাতর চোখে জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন নূরজাহান। পর্দার অল্প একটুখানি ফাঁক দিয়ে উঠানের এক কোনায় বাতি দেখা যাচ্ছে। সে বাতিতে খা খা করছে সদর দরজা।
ফাবিহা ফোনের ব্রাইটনেস একদম কমিয়ে পড়ছিল। চেয়ারটা বসার ঘরের জানালার পাশে নিয়েছে। এক নবাবজাদা দেমাগ দেখিয়ে বাইরে গিয়েছেন, ফাবিহার দৃঢ় বিশ্বাস মানুষের চমৎকার আপ্যায়ন পেয়ে তিনি ফিরে আসবেন। তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর জন্য একজন মানুষ উপস্থিত থাকা দরকার। সেই দায়িত্ব পালন করার জন্য বসেছে সে।
সিমি অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করে যখন দেখল ফাবিহা আসছে না, তখন আস্তে করে উঠে পড়ল। বসার ঘরে যেতেই ক্ষীণ একটা আলোর রেখা দেখতে পেল ঠিক জানালার পাশে। সেই আলোতে ফাবিহার লম্বাটে মুখটা ঝাপসা দেখা যাচ্ছে। সিমি বিড়াল পায়ে এগিয়ে গেল, “ছোট আপা?”
ফাবিহা চমকে উঠল, “ঘুমাসনি!”
“আপনি যে নাই।”
ফাবিহা দম ছাড়ল।
“শুয়ে পড় যা।”
“আর আপনি?”
ফাবিহা উত্তর দিলো না।
“ফারদিন ভাইয়ের জন্য বসে আছেন?”
তবুও কোনো উত্তর এলো না।
সিমি ফাবিহার পায়ের কাছে আসন গেড়ে বসল সিমি। ভাবুক কণ্ঠে বলল, “সাকিন ভাই নাকি চলে যাবে, জানেন ছোট আপা?”
ফাবিহা বেশ চমকাল। সে ঘটনার পরও সাকিনের সাথে তার চলতি পথে দেখা হয়েছে। আগে যেভাবে সালাম দিত, সেভাবেই দিয়ে গেছে। সাকিনও স্বাভাবিকভাবেই উত্তর নিয়েছে। বোঝার উপায় ছিল না তাদের মাঝে একটা বিয়ের ধোঁয়া উঠে আবার নিভে গেছে। ভদ্রলোকের কাছে এই ব্যবহারের জন্য আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে সে। লোকটা চাইলেই পারত তার চিঠিটা সাবিহাকে দেখাতে। সে প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছিল, বরং তাই ভেবেই লিখেছিল যেন অন্য কেউ দেখলেও কিছু না ভাবে। কিন্তু চিঠির বিষয়টা সামনেই আসেনি। বরঞ্চ অবস্থা এমন হয়েছে যে কেউ জানেই না— ফাবিহা যে সবকিছু জানে!
সে লোকটা হঠাৎ করে চলে যাবে কেন?
ফাবিহা প্রশ্নটা করেই ফেলল, “কেন?”
অন্ধকারে সিমির মুখভঙ্গি বোঝা গেল না। সে বলল, “এই কলেজ নাকি সাকিন ভাইয়ের ভাল্লাগে না। তাই চলে যাবে।”
“ওহ!” ফাবিহা হাঁফ ছাড়ল। যদি এমন হতো তার সামনে অস্বস্তি বোধ করায় সাকিন চলে যাচ্ছে তবে সে ভীষণ অপরাধবোধে ভুগত।
“কোথায় যাবে?” জিজ্ঞেস করল ফাবিহা।
“এখনও জানি না। ছোট আপা?”
“হু।”
“সাকিন ভাই চলে গেলে আমার অনেক কষ্ট হবে।”
“একটা কলম দিয়েই তোকে কিনে নিল দেখছি!” ফাবিহার কণ্ঠে রসিকতা।
সিমির মন আরেকটু খারাপ হলো, “সাকিন ভাই অনেক ভালো মানুষ। মনে কোনো প্যাঁচ নাই, একদম খালুর মতো! এসব মানুষই বেশি প্যাঁচে পড়ে।”
ফাবিহা ফোনের দিকে তাকালো। স্ক্রিনের আলো কমতে কমতে বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে। সাকিন চলে যাবে, লোকটার কাছে অনেক দিক দিয়ে অনেকভাবে ঋণী ফাবিহা। তাকে বিদায়ী উপহার হিসেবে কিছু কি দেয়া উচিত?
সিমি চাপা কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, “ছোট আপা! ফারদিন ভাই আসছে!”
ফাবিহা ঝট করে জানালার দিকে তাকালো। ফারদিন বিরক্ত ভঙ্গিতে বাড়িতে ঢুকছে। সদর দরজায় যদিও তালা দেয়া থাকে, তবে সেই তালাটা সন্তর্পণে খুলে রেখেছিল সে। এই রাতে কাজটা ঠিক হয়নি বলে চেয়ার ছেড়ে দু দণ্ডের জন্য নড়তেও পারেনি।
সিমি দরজার কাছে যেয়ে দাঁড়ালো। ফারদিন ওপাশে এসেছে বুঝতে পেরেই দরজা খুলে দিল। অবাক হয়ে তাকালো ফারদিন। তার হাত উঠে এসেছিল নক করার জন্য।
ভেতরে ঢুকতেই তার বিস্ময় বাড়ল। ফাবিহা ঘরের দিকে যাচ্ছে। ফারদিন বলল, “তুই বসে ছিলি কেন?”
“ছোট আপা বসে ছিল তাই।”
“ও বসে ছিল কেন?” ভুরু কুচকে জিজ্ঞেস করল ফারদিন।
“আপনি আসবেন এটা আপা জানত, তাই বসে ছিল। ফারদিন ভাই, সদর দরজার তালাটা লাগায় দেন। ছোট আপা খুলে রাখছিল। এমন খোলা দেখলে হীরা খালু বকবে।”
এক কথাতেই তাকে রাজি হতে দেখে যারপরনাই অবাক হলো সিমি। সে দেখে এসেছে, ফারদিন ভাইকে কখনোই এক কথা একবার বলে শোনানো যায় না।
—
সেদিন বকাঝকার পর থেকে ফারদিন পারতপক্ষে বাড়িতে থাকে না। কারো সাথে তেমন কথাবার্তাও বলে না। সিমিকে দিয়ে নূরজাহান জানতে পেরেছেন সারাদিন কোথায় কোথায় মাছ ধরে বেড়ায়, সেখানেই এক বেলা খায়। তবুও এই ছেলে একটা কাজ করবে না। তার জেদ দেখে নূরজাহান একইসাথে হতভম্ব, বিরক্ত এবং হতাশ! আর কিছুই বলার নেই তার।
ছয় মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও যখন ঋণ আরও অনেকখানি বাকি রইলো, ফাবিহা চিন্তিত হয়ে বাবার কাছে ছুটে এলো। ভীত কণ্ঠে বলল, “ওরা কি এবার পুলিশ ডাকবে বাবা?” তাহলে তাদের চোদ্দ শিকার পেছনে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
ফরিদ ভরসা দিয়ে বললেন, “চিন্তা করিস না মা। আমি কথা বলেছি। সময় কিছু বাড়িয়েছে ওরা।”
“সত্যিই বাড়িয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
“কতদিন?”
“আহা! এত চিন্তা তোকে করতে হবে না। তুই মন দিয়ে পড়াশোনা কর তো! ব্যবসার কাজও কিছুটা কমা। ফোর্থ ইয়ারে উঠবি কবে মা?”
“পরের মাস থেকে ইয়ার ফাইনাল।”
“আচ্ছা আচ্ছা! মন দিয়ে পড়াশোনা কর। আর কোনো কিছুর চিন্তা করতে হবে না তোকে।”
তবুও ভরসা পায় না ফাবিহা। যে ঝড়ের কবলে জীবনের প্রায় দুটো বছর ছারখার হয়ে গেছে, তাকে ভুলে থাকা যায় না। থেকে থেকেই কেবল মনে পড়ে— মাথায় ঋণের বোঝা চেপে বসে আছে। আর মনে হওয়ার সাথে সাথেই অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের মতো তীক্ষ্ণ, বিরক্তিকর একটা শব্দ মাথায় বাজতে থাকে।
ফাবিহা বা তাদের পরিবারের কাউকেই আর যুক্তি তর্ক দিয়ে বোঝানোর দরকার নেই— সুদ হারাম। এটা তারা জীবন দিয়েই বুঝেছে। কিন্তু যে মাইক্রো ইকোনমিক্সের সিঁড়ি দিয়েই জীবনের চূড়ায় উঠেছে, সেই মহাজন— যারা তাদের মতো চেহারায় মধ্যবিত্ত, কাগজে কলমে নিম্নবিত্ত মানুষের রক্ত চুষে স্বাস্থ্যবান হয়েছে, ঝাপসা ভবিষ্যতের শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে— তাদের অথবা তাদের ছেলেমেয়েদের কখনও যুক্তি দিয়ে বোঝানো যাবে না— সুদ হারাম।
ফাবিহা অনুভব করল বিধানের মাত্রা, বিশ্বাসের মাত্রা। এক শ্রেনী জীবন দিয়ে বিধানের বোঝে, আরেক শ্রেণিকে স্রেফ এই বলে মেনে নিতে হয় যে তা আসমানি আদেশ। এতেই ভারসাম্য বজায় থাকে। নয়তো মহাজনের শ্রেনী এ জীবনে অনুভব করতে পারবে না মাইক্রো ইকোনমিক্সের দরজাটা আসলে মাইক্রো ডিজাস্টারের গর্তে উন্মুক্ত করে দেয়।
—
ফাবিহার দিনের অনেকটা সময় কাটে ফেইসবুকে। পোস্ট করা, কমেন্টের রিপ্লাই দেয়া, অর্ডার কনফার্ম করা— একেকটা কাজ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করতে হয়। না চাইতেও স্ক্রিন টাইম ছয় থেকে সাত, কখনও কখনও আট ঘণ্টাও পেরিয়ে যায়। চোখের ওপর অত্যাচার তো হচ্ছেই, সাথে মাথাটাও দিনকে দিন অস্থির হয়ে যাচ্ছে। কাউকে বলা তো দূর, মুখেও ভুল করে এই ভাব প্রকাশ করা যাবে না। তাহলেই ফরিদ তার ব্যবসা সিলগালা করে দেবেন! অথচ ফাবিহা জানে ঋণ শোধ করার জন্য ফরিদের কেবল গায়ের রক্ত বিক্রি করাটুকুই বাকি আছে।
ফেইসবুকে থাকার সুবাদে না চাইতেও অনেক কিছু দেখতে হয়। যেমন লি প্রকাশনীর পোস্ট। এক সময় ফলো দেয়া ছিল, পরে আনফোলো করে দিলেও পোস্টগুলো ঠিক ঠিক চোখের সামনে এসে খোঁচা দিয়ে যায়। গা করতে না চাইলেও পারে না ফাবিহা। ‘নওরোজ’ নিয়ে কোনো পোস্ট দেখলেই তার ভেতর থেকে লাভার মতো বদ দোয়া বেরিয়ে আসে।
ঠিক এভাবেই একদিন শরফুদ্দিনের দ্বিতীয় বইয়ের ঘোষণা দেখল ফাবিহা। তখন ‘নওরোজ’ প্রকাশের মাত্র দেড় মাস।
দ্বিতীয় বইয়ের নাম ‘আকাশের ডাক, বাতাসের গন্ধ’। এই এত বছরে বিভিন্ন দেশে দেশে ঘুরে যে অভিজ্ঞতা তিনি জমিয়েছেন তার টুকরো অংশ এই বইয়ে গল্পের মাধ্যমে জানাবেন। মোদ্দাকথা, বইটা ভ্রমণকাহিনী হতে যাচ্ছে। কিন্তু সমস্যাটা সেখানে নয়। ফাবিহার চোখ আটকালো বইয়ের ফ্ল্যাপে,
“মানুষ যখন চেনা পরিধির বাইরে পা বাড়ায়, তখন সে কেবল নতুন স্থান দেখে না—মুখোমুখি হয় অজানা অনুভূতি ও জীবনের ভিন্ন রঙের।
‘আকাশের ডাক, বাতাসের গন্ধ’ কেবল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর বিবরণ নয়; এটি পথের বাঁকে জমে থাকা গল্প, স্মৃতিকথা আর অনন্য জীবনবোধের সংকলন। কোথাও পাহাড়ের স্তব্ধতায় হারানো স্মৃতি, কোথাও নদীর ধারে অচেনা মানুষের সাথে ক্ষণিক সখ্য, আবার কোথাও দূরের কোনো শহরে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা।
এখানে পথের গন্তব্যের চেয়েও সুন্দর হয়ে উঠেছে ভ্রমণের প্রতিটি গল্প। ঘরের কোণে বসেই অচেনা পথের হাওয়ায় ভেসে যাওয়ার এক অনবদ্য আমন্ত্রণ এই বই।”
লেখাটা পড়েই একটা কৃত্রিম কৃত্রিম ভাব চোখে লাগে। ফরিদের লেখায় আবেগের প্রভাব বেশ প্রকট ছিল। সামান্য একটা গাছের বর্ণনাও তিনি এভাবে লিখতেন যে বুকে হাহাকার তৈরি হতে বাধ্য। অথচ সেই ভাবের কিছুই এখানে নেই।
প্রথম ফ্ল্যাপে সবাই খুব উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও যখন ধারাবাহিক মার্কেটিংয়ের জন্য বইয়ের একটা গল্প প্রকাশ করা হলো, তখন অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করে বলল এটা শরফুদ্দিনের লেখা নয়! যে লোক ‘নওরোজ’ নামের গল্প লেখে তার কলম থেকে ‘আকাশের ডাক, বাতাসের গন্ধ’ নামটাই তো কেমন বেখাপ্পা শোনায়! তার উপরে গল্পটায় কোনো আবেগ নেই, স্মৃতির রোমন্থন নেই। যেন গুগল ম্যাপ, কেবল নির্দেশনা দেয়া, কোথায় কীভাবে যেতে হবে। ভক্তদের অনেকেই বিরূপ মন্তব্য আর চেপে রাখতে পারেনি।
কী ভেবে জিনিসটা ফরিদকে দেখিয়ে ফেলল ফাবিহা।
ফরিদ অবাক হয়ে বললেন, “একটা বছর ওরা অপেক্ষা করতে পারল না! এদের কপালে দুর্গতি আছে।”
“কেন?”
“যারা পড়ে তারা কি কিছুই বোঝে না? এই দেখ একটা গল্প পড়েই মানুষ সন্দেহ করতে শুরু করে দিয়েছে। পুরো বই পড়লে তো বুঝেই যাবে।”
“কী বুঝে যাবে?”
“দুটো যে এক মানুষের লেখা না।” ফরিদের হাত থেমে গেলো। ফের ব্যস্ত হয়ে গেলেন তিনি। হাজারীর বই এলোমেলো ভঙ্গিতে উল্টে বললেন, “একটা বছর অপেক্ষা করলেই বেশিরভাগ মানুষ ভুলে যেত। কোন জায়গার কোন ‘নওরোজ’, তাকে মনে রাখবে, এই ঠ্যাকা কার?” মলিন হাসলেন তিনি।
ফাবিহার কাছে সে উত্তর ছিল না।
উত্তর দিলো শরফুদ্দিনের ভক্তরা।
ঠিক এক মাস পর যখন ‘আকাশের ডাক, বাতাসের গন্ধ’ বের হলো, তখন প্রি-অর্ডারেই বইটা ভ্রমণ ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রথম স্থান অধিকার করে ফেলেছে। প্রায় পাঁচ হাজার পাঠকের কাছে পৌঁছুতে সময় লাগলো এক সপ্তাহেরও কম। এর মাঝেই দুটো মতে ফেইসবুক ছেয়ে গেল,
“হয় প্রথম বই শরফুদ্দিন লেখেননি, নয়তো দ্বিতীয় বই তিনি লেখেননি।”
“প্রথম বই শরফুদ্দিনই লিখেছেন, কিন্তু দ্বিতীয় বইটা স্রেফ এআই মেরে দিয়েছেন!”
—
ঠিক এক মাসের মাথায় জুবায়ের কীভাবে কীভাবে যেন ট্রান্সফারের ব্যবস্থা করে ফেলল। সাকিন আনন্দিত হয়ে গোছগাছ করলেও সাবিহার মুখটা দেখলেই তার বুক ভেঙে আসে। দূরে ছিল সেই ভালো ছিল। কাছে এসেই ঝামেলাটা বাঁধল।
সাবিহা একটু পরপর নাক টানছে আর তার ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছে। জামা কাপড় ছিল মোটে পাঁচ সেট। কিন্তু কেমন করে যেন ঢাউস একটা ব্যাগেও সেগুলো আটছে না। নিশ্চিত সাবিহা কারসাজি করেছে।
ভয়ের কথা হলো ওই একটা ব্যাগেই শেষ হয়নি। শুকনো খাবার, কয়েক রকম আঁচার আর নাম না জানা পিঠা দিয়ে আরও বিশাল আরেকটা ব্যাগ বানিয়ে দিয়েছে সাবিহা। সেগুলো টানতে যেয়ে তার অবস্থা কী হবে ভাবতেই ঘাম দিয়ে জ্বর ছুটল সাকিনের।
নিচে নেমে ফরিদ আহমেদের কাছে বিদায় নিতে গেলো সে। ফরিদ অবাক হয়ে বললেন, “চলে যেতে চাও এটা শুনেছিলাম, চলে যে যাচ্ছো— এটা তো জানতেই পারলাম না!”
“দুদিন আগে জানতে পারলাম চাচা। দোয়া করবেন।”
ফরিদ হাত বাড়ালেন। সাকিন মাথাটা একটু নিচু করল। আপ্লুত কণ্ঠে তিনি বললেন, “চলে যাচ্ছো বাবা, আর কোনোদিন দেখা হয় কি না হয়!” পরের কথাটা বলার জন্য একটু সময় নিলেন তিনি।
“তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি বাবা! এই বুড়ো চাচাটার কথা ভুলে যেও না! আমরা ভাড়াটে মানুষ, আজ আছি কাল নেই। ফোন নাম্বারটা আছে না বাবা? মাঝে মধ্যে একটু ফোন দিও। দেবে তো?”
সাকিনের গলার কাছে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে রইলো। শব্দ খরচ করতে পারল না সে। কেবল মাথা নেড়ে সায় জানালো।
সিমি চোরা পায়ে এসে একটা ছোট্ট রুমাল দিলো তার দিকে। সাকিন হেসে বলল, “সিমির পটল ভর্তা খাওয়া হলো না!”
হীরা চৌধুরী বিরক্ত হয়ে বললেন, “যাবেই যখন দ্রুত যাও! আর দেরি করার দরকার নেই। যাও আগাও!”
সাকিন থতমত খেয়ে এগিয়ে গেলো। চোখ মুছতে মুছতে সাবিহার চোখ দুটোই লাল হয়ে গেছে। সে বুজে যাওয়া কণ্ঠে বলল, “আমাকে কবে নিয়ে যাবি?”
“দেখি, ওইদিকে থাকার ব্যবস্থা কেমন কী। নিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ। থাক, আসি।”
রিকশায় উঠে পেছনে তাকালো সাকিন। সকলের মুখ ছাপিয়ে ফরিদের কাতর চেহারার দিকেই চোখ জোড়া আটকে গেলো। ক্রমেই তা ঝাপসা হতে হতে অদৃশ্য হয়ে গেল চক্ষুপট থেকে।
ফাবিহা যখন বাড়ি ফিরল তখন আসরের আর বিশ মিনিট বাকি। নামাজ পড়েই সে জানতে পারল সাকিন কুন্দকলির পাঠ চুকিয়ে বিদায় নিয়েছে।
হতভম্ব কণ্ঠে সে সিমিকে বলল, “আমাকে বললি না তো!”
“আমিই জানতাম না ছোট আপা!” বলেই চোখ মুছল সে। সাকিন ভাইয়ের হাসিটাই থেকে থেকে মনে পড়ছে। এমন কষ্ট শেষবার লেগেছিল মা মারা যাওয়ার সময়। সিমি দ্রুত ঘর ছাড়ল। শব্দ করে কাঁদলে আবার কে কী ভাবে!
লেদার দিয়ে বানানো ডায়েরিটা আর আলাদা করে রাখার প্রয়োজন পড়ল না। অন্যান্য ডায়েরির সাথেই সেটা রেখে দিলো ফাবিহা। একটা দীর্ঘশ্বাস তার বুক চিরে ছড়িয়ে পড়ল কুন্দকলির আনাচে-কানাচে। ছাদে যেতে এখন আর দু'বার ভাবতে হবে না।
চলমান~
(এক লেখিকা আপু আজ মারা গেছেন! আল্লাহ তার সকল গুনাহ মাফ করে দিন! একদিন এমন খবর আমার নামেও আসবে পাঠক! তখন আমার জন্য একটু দোয়া কইরেন, আচ্ছা?)