#বনজোছনা
৩৭.
বাস স্ট্যান্ড থেকে জুবায়ের যেয়ে তাকে নিয়ে এসেছে। ঠিক ঠিক তিন ঘণ্টা পর তারা যে জায়গায় এসে নামল সেটা জেলা শহর থেকে বহুদূরে, অখ্যাত এক নদীর ধার ঘেঁষে গড়ে ওঠা এক শান্ত নিস্তরঙ্গ জলধির মতো গ্রাম। মুহুর্মুহু কোলাহল নেই। লোকজনের আধিক্য নেই। আকাশে মেঘের মিছিল, জমিনে বাতাসের দোলা। এক মমতায় ঘেরা অবসন্ন আবহ সাকিনকে চারপাশ থেকে জড়িয়ে ধরলো। ভেতর থেকে কেউ হাঁফ ছেড়ে বলল— অবশেষে এলাম!
সাকিন তৃষ্ণার্তের মতো চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল স্বপ্নের বাস্তব রূপ ঠিক কেমন হয়।
জুবায়ের খানিক বিব্রত কণ্ঠে বলল, “ভাই, যতখানি গ্রাম দেখা যাচ্ছে ততখানি আসলে না। মোবাইল-ইন্টারনেট আসছে, কিন্তু পুরোনো মানুষ তো, এখনও সেভাবে আত্মস্থ করে উঠতে পারেনি!”
সাকিন চমৎকার ভঙ্গিতে হেসে বলল, “কোনো সমস্যা নেই! প্রত্যন্ত অঞ্চল হলেও আমার কোনো সমস্যা ছিল না। বরং আরও ভালো হতো!”
তার প্রফুল্ল কণ্ঠ শুনে জুবায়ের অপরাধবোধের ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি পেলো।
“এগুলো আপাতত একটা দোকানে রাখি। কলেজটা দেখে এসে আপনার থাকার ব্যবস্থা দেখাবো।” ব্যাগগুলোর দিকে ইশারা করে বলল সে।
সাকিন সানন্দে রাজি হলো।
কলেজ দেখে আর কাউকে বলে দিতে হলো না এর দশা যে কতখানি করুন। নিজেই দেখল সাকিন। মাঠ আগাছায় ভরে গেছে। তার মাঝে হাঁটা পথের কোনো চিহ্ন নেই। একপাশে ঈদগাহ ময়দানের কিছু চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। মসজিদের মতো প্রতিকৃতি। তার কোল ঘেঁষেই কিছু ইট এলোমেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এক হাত প্রস্থের পথটুকুন কাদায় মাখামাখি অবস্থা। সেটুকু পেরিয়ে সামনে যেতেই প্রশাসনিক ভবন। আজ এই কর্মদিবসে হেল্প ডেস্ক-বন্ধ থাকার কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে দপ্তরী হেল্প-ডেস্কের ঝাঁপি বন্ধ করে ভেতরে বেশ একটা আষাঢ়ে ঘুম দিয়েছে। তার অগ্রহায়ণ যে আসন্ন, তা বেচারা আঁচ করতে পারেনি।
প্রশাসনিক ভবনের উত্তরে বিজ্ঞান ভবন। ওখানে কিছু মানুষের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। থেকে থেকে একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার, তারপরই সব নিস্তব্ধ। সেই নিস্তব্ধতা চিরে যাচ্ছে বিজ্ঞান ভবনের তিন তলার মাথায় বসে তারস্বরে চেঁচাতে থাকা কাক।
মানবিক ভবন আর লাইব্রেরি একই বিল্ডিংয়ে। সাকিন বলল, “আর কোনো বিভাগ নেই?”
“নাহ! কমার্সের এদিকে চল নেই। সব সাইন্স আর আর্টস।” অভ্যস্ত ভঙ্গিতে কাদা পেরিয়ে গেলো জুবায়ের।
শিক্ষকদের নিজস্ব রুম বলতে যা বোঝায় তা এখানে অনুপস্থিত। দু-চারজনের নেমপ্লেট দেখা গেলেও স্কুলের মতো বিশাল হলঘর নিয়ে একটা কমন টিচার্স রুম দেখেই বোঝা গেল এখানে শিক্ষকদের কেমন অবস্থা। যারা থাকতে চায় না তাদের দোষারোপও করা যায় না। সাকিন বুঝতে পারছিল তাকে এখানে কেবল কাজ করার জন্য আনা হয়নি, সব ঢেলে সাজানোর জন্য আনা হয়েছে। ভেতর থেকে একধরনের উত্তাপ অনুভব করছিল সে। একটা আদিম উত্তেজনা তার বুকের ছাতিতে অনবরত করাঘাত করে যাচ্ছিল। তার উষ্ণ শ্বাসে উত্তপ্ত হয়ে পড়ছিল আশপাশের বায়ুমণ্ডল।
কলেজটা আরও ম্যাড়মেড়ে হয়ে গেছে উচ্চ-মাধ্যমিক পরবর্তী আর কোনো পরিসর না থাকায়। গ্রামের এই একটি কলেজে অনার্স করার সুযোগ নেই। তাই অনেকেই একেবারে সদরের কলেজে যেয়ে ভর্তি হয়, ইন্টার-অনার্সের হ্যাপা এক জায়গা থেকে শেষ করার জন্য।
জুবায়ের অধ্যক্ষের সাথে সাকিনের পরিচয় করিয়ে দিলো। শিক্ষকগণ জানতেন আজ যে নতুন একজনের জয়েন হবার কথা। তারা শুনে অবাক হয়েছেন এ ছেলে দু জায়গা ঘুরে এখানে এসেছে। কেন? প্রশ্নটার উত্তর মেলেনি। মানুষ প্রথম নিয়োগে এখানে এসে পড়িমড়ি করে পালায়। সেখানে কেউ স্বেচ্ছায় এখানে কেন আসতে যাবে! জুবায়েরের উর্দির দিকে তাকিয়ে সে বিস্ময় চেপে যেতে হয়।
অধ্যক্ষও বয়স্ক মানুষ। আর চার-পাঁচ বছরের মাঝেই অবসরে চলে যাবেন। কলেজটার যত্ন করার ইচ্ছে থাকলেও সে শক্তি আর তার মাঝে নেই। কেউ কিছু করতে চায় না বলে তিনিও ঠ্যালা ধাক্কা দিয়ে বেশিদূর চালাতে পারেন না। ফলে মরশুমের পাতা ঝরারও আগে শিক্ষার্থীরা ঝরে যাচ্ছে।
জুবায়ের অধ্যক্ষকে বলার আগে সাকিনকে ফিসফিস করে বলল, “ভাই! মনে-মুখে যা গালি দিতে চান দেন, কিন্তু এই কলেজটা আপনি বাঁচান!”
সাকিন হাসল, “গালি দিচ্ছি না। তবে একটু ভয় পাচ্ছি। এত মানুষের দায়িত্ব! আমি পালন করতে পারব…!”
তাকে শেষ করতে দিলো না জুবায়ের, “আলবৎ পারবেন!”
সাকিন নিজেকে নিজে এতখানি বিশ্বাস করে না যতখানি করছে জুবায়ের। ছেলেটা তার একসময়ের বিপদের বন্ধু। আজ অবস্থাদৃষ্টে যদিও মনে হচ্ছে তার কাছে সে সাহায্য চাইছে, কিন্তু সাকিন নিজেও জানে— এই কলেজ থাকল কী গেল তাতে জুবায়েরের কিছুই যায় আসে না। কলেজ বন্ধ হলে দুদিন খারাপ লাগবে, তিন দিনের দিন তাকে আবার পুরোনো কেসে ডুবে যেতে হবে। এই সব যান্ত্রিক নিয়মের কূটচালের মাঝে তার কাছে জুবায়েরের আবদার মোটেও স্বার্থান্বেষী মনে হয়নি। বরং ছেলেটির চমৎকার এই মমতার সাক্ষী হতে পারে এক অনির্বচনীয় আনন্দে তার বুক ভরে গেছে।
স্মিত হেসে সাকিন বলল, “আল্লাহ সহায় হোন…! খুব কঠিন দায়িত্ব!”
অধ্যক্ষের সাথে তার পরিচয় করিয়ে দিল জুবায়ের। অতীতের ছাত্র এবং বর্তমানের পুলিশ হিসেবে তার আলাদা একটা কদর আছে। যে কেউ তার কথাকে খুব গুরুত্ব সহকারে নেয়।
সে বলল, “সাকিন স্যার আমাদের পক্ষ থেকে অ্যাপয়েন্টেড। কলেজকে এই দুর্গতি থেকে উদ্ধারের জন্য আমরা তার মাধ্যমে কাজ করব। আশা করি আপনিসহ কলেজের বাকি সবাই তাকে সাহায্য করবেন।”
অধ্যক্ষ তটস্থ ভঙ্গিতে সায় দিলেন। তার কক্ষে সিনিয়র যে কজন শিক্ষক ছিলেন তারা বাঁকা চোখে তাকালেও বাঁকা কণ্ঠে কিছু বলতে পারলেন না। এতদিন একটা ধরা-বাধা রুটিনে চলে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। কেউ তাদের সেখান থেকে টেনে বের করতে চাইলে একটা গ্যাঞ্জাম যে বাঁধবে এটা তাদের প্রতিক্রিয়া দেখেই বুঝে ফেলল সাকিন। যুদ্ধের ময়দান প্রস্তুত হচ্ছে, শোনা যাচ্ছে তলোয়ারের ঝংকার— তার শান্ত মনে একটা বৈদ্যুতিক তরঙ্গ খেলে গেলো।
কলেজ থেকে বের হতে হতে জুবায়ের একটু খোঁচা দিয়ে বলল, “গ্রামের কলেজ, সাকিন ভাই! অবিবাহিত শিক্ষক রাখা কি উচিত হচ্ছে?”
সাকিন হেসে ফেলল, “বিয়ে করা দরকার ছিল আগে?”
“করলে তো ভালোই হতো। একটু অজপাড়াগাঁ তো! এদের বাতাসে বাচ্চা হওয়ার রেকর্ড আছে!” চোখ-মুখ কুচকে বলল জুবায়ের।
সাকিনের হাসি কমল না।
“সময় হলেই করে ফেলব ইনশাআল্লাহ্।”
“ততদিন একটু সাবধানে থাকবেন। আপনাকে নিয়ে এখন এক ঘণ্টা টহল দিলেই খবর চাউর হয়ে যাবে যে আপনি পুলিশের পরিচিত। তবুও একটু সাবধানে হ্যাঁ?”
সাকিন মাথা নাড়ল।
জুবায়ের যাওয়ার আগে তাকে উঠিয়ে দিয়ে গেল গ্রামের প্রভাবশালী এক মুরুব্বীর অতিথিশালায়। মূল বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে দু কামরার একটা ছোট্ট বাড়ি। সেখানেই তার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হলো। সাকিন জানালো সে অতি অবশ্যই ভাড়া দিয়ে থাকবে। মুরুব্বী নিতে না চাইলেও সাকিনের অনড় ভঙ্গির সামনে তাকে হার মানতে হলো। সে বাড়িতে প্রথম রাত্রি যাপনের সময়ই সাকিন টের পেলো জুবায়ের তাকে পথে উঠিয়ে দিয়েছে বটে, তবে পথটা তাকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিতে হবে। এ বাড়িতে সে খুব বেশিদিন থাকবে না। স্বপ্ন স্বপ্ন জায়গাটায় যখন এসে পৌঁছেছে, একটা স্বপ্ন স্বপ্ন বাড়িও খুব শীঘ্রই সাজিয়ে ফেলবে।
*****
লোভে পড়লে যে মানুষের বুদ্ধি হারিয়ে যায় তা ফরিদ জানেন। চাক্ষুষ প্রমাণও তার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে কম নেই। তবে এমন একটা সংস্থা যে এমন করতে পারে তা তিনি ভাবতেও পারেননি। আচমকা পাঁচ হাজার বই বিক্রি হতে দেখে নিশ্চিতভাবেই প্রকাশকের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। সেই হ্যাং মারা মাথা রিস্টার্ট করার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে আরেকটা বই দরকার ছিল। তবে দেড় মাসের মাথায় এই কাজটা করা যে কত মস্ত বড় ভুল হয়েছে— এটা তারা হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করেছে।
বেশ জনপ্রিয় এক বুক রিভিউয়ার, প্রায় পঁয়তাল্লিশ হাজার ফলোয়ার তার, ‘নওরোজ’ পড়ে ঘোষণা দিয়েছিল— লেখকের মোটামুটি অন্ধভক্ত হয়ে গেছে সে। তারপর থেকে তাকে প্রায়ই শরফুদ্দিনের ভ্রমণ নিয়ে নানান রকম প্রশংসার বুলি আওড়াতে দেখা যেত। দ্বিতীয় বইয়ের প্রথম কপি যে তাকেই দিতে হবে এটাও সে বেশ ফলাও করে প্রকাশনীর কাছে আবদার করেছে। বলা বাহুল্য, পঁয়তাল্লিশ হাজার ফলোয়ারের যিনি অদার, তার আবদার আর আবদার থাকে না, রীতিমত প্রকাশনীর মহোৎসবে পরিণত হয়। তার বেলাতেও ব্যতিক্রম হয়নি। সে লোক নিজেও সময়ক্ষেপণ না করে তিন ঘণ্টার মাঝেই বইটা পড়ে শেষ করে ফেলেছে। এবং দুই মিলিয়ন ভিউ হয়ে যাওয়া আনবক্সিং পোস্টের ঠিক চার ঘণ্টার মাথায় পোস্ট করেছে— ‘Total disaster!’
ফাবিহা এসবই তাকে দেখিয়েছে। ফরিদও মজা দেখে গেছেন। ক্ষতটা শুকিয়ে এখন থেকে থেকে কেবল চামড়ায় টান লাগে। তেমন ব্যথা আর হয় না। কাজেই মন দিয়ে নাটকটা উপভোগ করতে পারছেন তিনি।
সেদিন সন্ধ্যায় যখন রিভিউয়ার ভিডিও দিলো, ফাবিহার ফোন থেকে চারজন একসাথে দেখেছেন।
ছেলেটা ফারদিনের বয়সী হবে। চোখ-মুখ কুচকে হতাশ ভঙ্গিতে সে কথা শুরু করল,
“পাঠক! আমি দুর্দান্ত হতাশ! এত হতাশ আমি আমার বাবা-মায়ের ডিভোর্সের সময়ও হইনি। শারফের প্রথম বই পড়ে হলাম ফ্যান, আর দ্বিতীয় বই পড়ে হলাম অজ্ঞান!”
এটুকু শুনে সিমি ফিক করে হেসে ফেলল।
ছেলেটা আবার বলতে থাকল, “যারা ক্লাসিক উপন্যাস পড়ে অভ্যস্ত তারা জানবেন ‘নওরোজ’ অবশ্যই পাকা হাতের লেখা ছিল। কোনো নিউ কামারের পক্ষে কখনোই ওরকম বই লেখা সম্ভব না, তা সে যত পুরোনো পাঠকই হোক না কেন! কিন্তু শারফ সেটা লিখে দেখিয়েছেন। এই পর্যায়ে এসে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনাদের জানা মতে— তিনি লিখেছেন। আড়ালের গল্পের উপর থেকে এখনও পর্দা সরেনি।
সে যাক। প্রথম বই হান্ড্রেড অন টেন! ওটা নিয়ে কথা খরচ করার কোনো দরকার নেই। আকাশের ডাকে আসি।”
এই পর্যায়ে বইটা হাতে নিলো সে। বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল, “জাস্ট জেমিনি ছেপে দিয়েছে! লোগোটাও মোছেনি দেখুন! মানে কী আর বলব! এআই ইউজ করারও তো একটা ধরন আছে! বইটা পুরোটাই এআই বেজড! প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে ভেতরের লেখা। লেখক দাবি করেছেন এটা গল্প গ্রন্থ, কিন্তু এটা আমার কাছে অতি নিম্নমানের গাইডবুক মনে হয়েছে। চারটা জায়গা সম্পর্কে মোট তেইশটা ডিরেকশন দেয়া। যেন ভদ্রলোক এখনই আপনাকে সেখানে পার্সেল করতে পারলে বাঁচেন। কিন্তু সেই নির্দেশনা ফলো করলে হয় আপনি সমুদ্রে পড়বেন, নয়তো গর্তে! গুগল ম্যাপ দেখে দিলেও তো এত ভুল ডিরেকশন আসতো না! এই ডিরেকশনের পোস্ট মর্টেম করার জন্য আলাদা একটা ভিডিও লাগবে।
মোদ্দাকথা হলো! ‘আকাশের ডাক, বাতাসের গন্ধ’ এটা জাস্ট ভাঁওতাবাজি! প্রচ্ছদ, ফ্ল্যাপ, কন্টেন্ট— সবকিছু এআই।
আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে— তাহলে ‘নওরোজ’ এর ব্যাকগ্রাউন্ড কী?
লেটস সি!”
বলার সাথে সাথেই স্ক্রিন কালো হয়ে গেলো এবং ভেসে এলো দুটো কণ্ঠস্বর।
“কী ফাত্রামি করেন আপনারা! একটা লোককে কনভিন্স করতে পারেন না আবার বলেন আপনি লিখে দেন! এই! আমার লেখার সময় আছে?” এটা যে শরফুদ্দিনের কণ্ঠ সেটা আর কাউকে বলে দিতে হবে না। এই কদিন শুনে শুনে একেবারে ঠোটস্থ হয়ে গেছে।
ফাবিহা উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে বাবার দিকে তাকালো। তিনি থুতনিতে দুহাত ঠেকিয়ে কালো স্ক্রিনের দিকেই মগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছেন।
এবার শোনা গেল প্রকাশকের কণ্ঠ, “ফরিদ লোকটা যে আর মানবে না এটা আমরা বুঝতে পারিনি স্যার! একটু আঁচ করতে পারলে আগে থেকেই একটা চুক্তির মারপ্যাঁচ রেখে দিতাম। সে প্রথমে তো খুব গলে গলে আমাদের লেখা দিল। বই বের হওয়ার পরও ঠান্ডাই ছিল। যেই আরেকটা লেখা চাইলাম ওমনি সরাসরি বলে দিল কস্মিনকালেও আর লেখা দেবে না। এখন স্যার, আপনি যদি কলম ধরেন তবেই মান রক্ষা হয়!”
“আমি কি কোনোদিন লিখেছি নাকি? লেখার কী বুঝব!”
“কোনো সমস্যা না! আপনি কী লিখবেন সেই কন্টেন্ট দিন, ফরিদের লেখার স্টাইল এআইকে দিয়ে দেব। সেটা ফলো করে আপনার কন্টেন্ট বানিয়ে দেবে।”
“এটা ভালো আইডিয়া। তাহলে তাই করুন। এবার রয়্যালিটি কত দেবেন? এটা তো দ্বিতীয় বই।”
“স্যার প্রথম বইও তো আপনি লেখেননি, দ্বিতীয় বইও লিখবেন না। আপনাকে এককালীন কিছু দিয়ে দিতে…”
“খবরদার! আমার নাম বেঁচে খাবেন আর আমাকে রাখবেন না তা তো হবে না! আমি ফরিদ আহমেদ না যে আপনার পা ধোয়া পানি খাব! এবার আমাকে শার্প পনের পার্সেন্ট দেবেন! একটুও এদিক ওদিক যেন না হয়!”
টুট টুট করে কল কেটে গেল আর তার পরেই শোনা গেল ভদ্র প্রকাশকের অভদ্র গালির বহর।
শান্ত ভঙ্গিতে এই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে স্ক্রিনে আবার সে রিভিউয়ার ফিরে এলো। এক চোখ টিপে উচ্ছল ভঙ্গিতে বলল, “এতক্ষণ আপনারা দেখছিলেন ‘গোস্ট রাইটার’ সিনেমার ট্রেলার! এবার দেখবেন বিস্তারিত!”
তারপর ফেইসবুক জুড়ে যা হলো তাকে এক কথায় প্রকাশ করার জন্য যোগ্য কোনো শব্দ নেই। ভাইরাল তো হলোই, পুরো ঘটনাটা একেবারে টক অফ দা টাউন হয়ে গেলো।
নূরজাহান কেবল বললেন, “চোরের দশ দিন, গৃহস্থের এক দিন!”
এসব নিয়ে ফরিদ আর উদ্বিগ্ন ছিলেন না। যা হয় হোক, তাতে আর গা করতেন না তিনি। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল ঋণ শোধ করা। সেই লক্ষ্যে অটল থেকে টানা একটা বছর তিনি সকাল ছয়টা থেকে আটটা এক ব্যাচ, কলেজ করে দুপুর তিনটে থেকে পাঁচটা এবং রাত আটটা থেকে দশটা অবধি তিনটে ব্যাচে মোট তেতাল্লিশ জন ছাত্র পড়ালেন । হারিয়ে যাওয়া পসার যে এভাবে ফিরে আসবে তা কল্পনাও করেননি ফরিদ। চেয়াম্যানের ছেলে পরীক্ষা দিলো। সে ভালো ছাত্র ছিল, ফরিদের যত্নে তার থিতিয়ে যাওয়া মস্তিষ্কে ধার ফিরে আসতে বেশি সময় লাগল না। তার রেজাল্টটা একেবারে বিজ্ঞাপনের মতো কাজ করল পুরো শহরে। ঝাঁকে ঝাঁকে ছেলেমেয়ে এলো। ফরিদ দ্রবীভূত হলেন না। বেছে বেছে ছাত্র নিলেন। এবং যাদের পড়ালেন তারা কেউই তাকে মাঝপথে ছেড়ে গেল না। ফলস্বরূপ এক বছর পর, ফাবিহার অনার্স যখন শেষের পথে, তখন তাদের সমস্ত ঋণ শোধ হয়ে গেলো।
নূরজাহান নিজেকে অপরাধী ভেবে এসেছেন। কাজেই তার অবদানটা চোখের আড়ালেই থেকে গেছে। দৃষ্টিক্ষয় করে যে তিনি একেকটা কাঁথার আঞ্জাম দিয়েছেন এটা টের পাওয়া যেত কেবল ঘরে বাজার না থাকলে। খাবার না থাকলে সকলেই রান্নাঘরের খোঁজ নিত। কিন্তু কেউ খেয়াল করেনি তার দৃষ্টিশক্তি যে ক্ষীণ হয়ে এসেছে। তার ছোট মাছ বাছতে না চাওয়াকে সিমি ভেবেছে আলস্য, ফাবিহা ভেবেছে বয়সের ভার, ফরিদ ভাবার সময়টুকুও পাননি। নিভৃতেই নূরজাহান ক্ষয়ে গেছেন। ক্ষয়ে যেয়েও দাবি করতে পারেননি— ঋণের অর্ধেক তিনি শোধ করেছেন।
সতের হাজার টাকা যেদিন ফাবিহা বাবার হাতে উঠিয়ে দিল, ফরিদ নির্মল হেসে টাকাটা ফিরিয়ে দিলেন।
ফাবিহা অবাক হয়ে বলল, “কী হলো?”
“এটা তোর কাছেই রাখ। এবার নিজের জন্য একটু জমা কর।”
“জমাবো পরে, আগে ঋণগুলো…”
তার কথা শেষ হলো না। ফরিদ ফিসফিস করে বললেন, “শেষ।”
“কিহ!” ফাবিহা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
“শেষ!” মাথা নাড়লেন ফরিদ। তার চোখ ভিজে আসতে চাইছে।
“শেষ?” নিজের বুকের ঢোল পেটানোর শব্দ শুনতে পাচ্ছিল ফাবিহা।
“হু।”
“শেষ কিস্তির টাকা দিয়ে দিয়েছ?”
“আজকে দেব।”
“আমাকে নিয়ে যাবে বাবা?”
“যাবো মা!”
যে মেয়েটা বিশ্রী সব অপমান সয়েছে, তাকে এক মুহূর্তের জন্য হলেও সম্মান দেয়ার লোভটা সামলাতে পারলেন না তিনি। ছোট্ট বাচ্চার মতো মেয়ের হাত আঁকড়ে শেষ পাওনাদারের কাছে গেলেন। সাতচল্লিশ হাজার দুশো টাকা তুলে দেয়ার সময় যে কাঁপুনি তার হাতে উঠেছিল সেটা বাতাসে বয়ে ফাবিহার অন্তরকে ছুঁয়ে গেল।
রাস্তায় নেমে ফাবিহা আবদার করে বলল, “আজকে পিকনিক করি চলো বাবা!”
ফরিদ মেয়ের তরলতায় সায় দিলেন। আজ বাঁধন হারার দিন। সব হিসেব-নিকেশের পায়ের দড়ি খুলে আজ মুক্ত হয়ে উড়ে বেড়ানোর পালা। একটুখানি খরুচে হলে আজ বোধহয় অন্যায় হবে না!
দুই ব্যাগ ভর্তি বাজার করলেন তিনি। ফাবিহা বাড়ি ফিরেই কোমরে ওড়না বেঁধে নামল। সেন্টার থেকে ছুটি নিলো। সাবিহাদের দাওয়াত দিলো। রোস্ট-পোলাও, গরু-খাসির সাধারণ এবং আকাঙ্ক্ষিত রান্নায় কুন্দকলিতে রাতটা নামল বড় আয়োজন করে। কৃষ্ণচূড়ার পাতায় সূর্যের লালিমা রয়ে গেল গভীর রাতেও।
ছেলেকে সেদিনও খাবার টেবিলে পেলেন না ফরিদ। সেই যে একসাথে খাওয়া ছেড়েছে, তারপর আর মুখ দেখাদেখির ঝামেলায় যায়নি।
রাতে গল্প হলো, আসল জমল। ফাবিহা একবার বলল, “এবার কেসটা করো বাবা? সত্ত্বটা নেবে না?”
ফরিদ হেসেই সে কথা উড়িয়ে দিলেন। কীভাবে কীভাবে যেন তার নাম উদ্ধার হয়ে গেছে। লোকে জেনে গেছে ‘নওরোজ’ এর প্রকৃত লেখক কে। সবাই বলছে একটা কেস করলেই নাকি তিনি সত্ত্ব পেয়ে যাবেন।
তিনি বললেন, “মাত্রই একটা ঝড় থামল। কী দরকার বল তো মা! যার যা ইচ্ছে করুক, আমরা একটু শান্তিতে থাকি!”
ফাবিহা আর জোর করে না। বাবাকে একটু নির্ভার দেখার তার বহুদিনের শখ!
সব গোছগাছ করতে করতে রাত প্রায় একটা বেজে গেল। শোয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে দুটো। ফরিদ হঠাৎ প্রস্তাব দিলেন, “চলো, আমরা সবাই মিলে জামাআতে তাহাজ্জুদ পড়ি!”
সকলে সানন্দে সে প্রস্তাবে রাজি হলো।
বসার ঘরে সবার আগে দাঁড়ালেন ফরিদ। তার ঠিক পেছনেই নূরজাহান, তার দুপাশে ফাবিহা এবং সিমি।
দীর্ঘ দুটো রাকাত, ঠিক দীর্ঘ দু’বছরের সমান— আদায় করলেন ফরিদ। তার মুখস্থ বিদ্যা খুব সমৃদ্ধ নয়। ইখলাস আর নাসর দিয়েই নামাজ শেষ হয়ে গেল। যেন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এ সময়ের সমাপ্তি তার বৃদ্ধ আওয়াজের মলিন সুরে প্রতিধ্বনিত হলো।
নামাজ শেষে মোনাজাত ধরলেন তিনি। ঝড় শেষের বিদায়ী অশ্রু তখনও ফুরিয়ে যায়নি। সেটুকু ঝরিয়ে বিগলিত কণ্ঠে তিনি বললেন,
“মাবুদ গো! তোমার দুনিয়ার সবচেয়ে জঘন্য পাপগুলোর মধ্যে একটা করেছি। সুদ নেয়া মানে তোমার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করা! মাবুদ! না বুঝে সেই গর্তে পা দিয়েছি! এই দুই বছরে তোমার কাছে মাফ চাওয়ার সাহস করে উঠতে পারিনি। পাপের যে কালিমায় হাবুডুবু খাচ্ছি, সে কালিমা হাতে মাখিয়ে মাফ চাওয়াটা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়!
আল্লাহ! চোখের সামনে মানুষকে এই চোরাবালিতে ডুবে মরতে দেখেছি। তুমি রহিম, তাই বলেই তো আমাকে ডুবতে দাওনি। মরতে মরতে আমি বেঁচে গেছি, আমার পুরো পরিবার বেঁচে গেছে! এই শুকরিয়া আমি আরও দশবার জন্ম নিলেও আদায় করে শেষ করতে পারব না!
মাবুদ! আমার স্ত্রী না বুঝে, খুব বোকামি করে ফেলেছে। তুমি তাকে মাফ করে দিও। আমাকে বাঁচানোর জন্যে যে বোকামি সে করেছে সেটাকে তার নির্মল ভালোবাসা ভেবে মাফ করে দিও!”
নূরজাহান ডুকরে কেঁদে মুখে হাত চাপলেন।
ফরিদ বলে গেলেন, “আমার মেয়েটা খুব কষ্ট করেছে মাবুদ! দিন নেই, রাত নেই! নিজেকে ক্ষয়ে আমাদের গড়েছে! ওর জীবনটা তুমি সেভাবেই গড়ে দিও! রব্বুল আলামিন, সিমিকে ওর ভালোবাসা সমান করে ফেরত দেব, এমন কিছু তো আমার নেই! তুমি সামর্থ্য দাও, আমি যেন মেয়েটাকে বুক ভরে দিতে পারি।”
সিমি পাথর হয়ে গেল। তার পনের ছুঁই ছুঁই জীবনে এত বিস্ময় সে কখনও অনুভব করেনি, যা করল আজ এই মধ্যরাতের অন্ধকারে।
ফরিদের মোনাজাত শেষ হলো ছেলেকে দিয়ে।
“ছেলেটার মন পেলাম না মাবুদ! আমার ব্যর্থতা! ওকে তুমি সঠিক পথের দিশা দিও। নিজের পথ যেন নিজে চিনে নিতে পারে।”
দীর্ঘ মোনাজাতের পর সকলের হাতজোড়া ভিজে গেল ঠিক বর্ষার শেষ বর্ষণের মতো।
শুতে শুতে বাজল প্রায় তিনটে
রাত করে ঘুমানোয় ফজরে উঠতেও দেরি হয়ে গেল। নূরজাহান ঠিক পেতেই দেখলেন পর্দার ফাঁক দিয়ে দিনের আলো ঢোকার পাঁয়তারা করছে। লাফ মেরে উঠে বসলেন তিনি। অন্যদিন সাড়ে চারটার সময় উঠে ফরিদ দৌড়াদৌড়ি করেন। আজ পাশে তাকিয়ে দেখলেন তিনি শান্তির ঘুম ঘুমুচ্ছেন। চাপা কণ্ঠে ডাকলেন তাকে, “ফজরের ওয়াক্ত গেল ফারদিনের বাবা! ওঠো! ওঠো!”
বলে তিনি অপেক্ষা করলেন না। ফাবিহার দরজায় কড়া নেড়ে বাথরুমে চলে গেলেন। সিমি, ফাবিহা নাকে-মুখে ফরজটা পড়তে পারল। একবার ডাকার পর ফাবিহা যখন দেখল বাবার ঘুম ভাঙার লক্ষণ নেই তখন ভাবল আরেকটু পরেই ডাকবে। এখন উঠে এমনিতেও আর নামাজ পাবে না।
সালাম ফিরিয়ে যখন বাবাকে ডাকতে গেল তখন নূরজাহান ঝুলে ঝুলে সূরা ইয়াসিন পড়ছেন। ফাবিহা সন্তর্পণে ফরিদের পাশে বসল। মাথায় হাত রেখে নরম কণ্ঠে বলল, “বাবা?”
ফরিদের কোনো সাড়াশব্দ নেই।
ফাবিহা ফের ডাকল, “ও বাবা?”
তবুও ফরিদ অনড়। অথচ তার ঘুম অসম্ভব পাতলা!
ফাবিহা হাতে আলতো করে ধাক্কা দিলো, “বাবা!” আর তখনই তার শরীর স্থির হয়ে গেলো। ভীত হাত দুটো ভালো করে স্পর্শ করতেই অনুভব করল ফরিদের পুরো শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে।
ফাবিহা অবিশ্বাস নিয়ে আবার ডাকল, “বাবা!” বুঝতে পারেনি সেটা চিৎকারে রূপ নিয়েছে।
নূরজাহান ছুটে এলেন, “কী হয়েছে?” কিন্তু উত্তরের আশা করতে পারলেন না। বড্ড স্বাভাবিক দৃশ্যটা তার মস্তিষ্কে খুব সূক্ষ্ম একটা সংকেত পাঠাতে চাইছে। মস্তিষ্কের দুয়ার বন্ধ করে দিলেন তিনি। এগিয়ে যেয়ে স্বামীর কপালে হাত রাখলেন। তার হতভম্ব ডান হাতটা অবচেতনেই চলে গেল ফরিদের হাতের নাড়িতে। সেখানে কোনো স্পন্দন নেই, অস্থিরতা নেই। ফাবিহা খুব সাবধানে বাবার বুকে মাথা রাখল, যেন তার আরামের ঘুমটা না ভাঙে। ঠিক পেলো, বাবার বুকের কুন্দকলি আজ বড় নীরব, সব তৎপরতার অবসান ঘটেছে। কোনো সতর্ক সংকেত নেই, উদ্বেগ নেই, উৎকণ্ঠা নেই। থেকে থেকে কেবল ধাক্কা দিচ্ছে নিস্তব্ধ নীরবতা।
ফাবিহা শেষবারের মতো ডাকল, “ও বাবা!” ডাকটা সে নিজেই শুনতে পেল না।
তার পাঁচ মিনিটের মাথায় সিমির চিৎকারের মাধ্যমে কুন্দকলির আনাচে-কানাচে খবরটা পৌঁছে গেল,
“ফরিদ আহমেদ বাদ ফজর ইহকালের পাঠ চুকিয়ে বিদায় নিয়েছেন।”
চলমান~
(আজকের পর্বটা লিখতে যেয়ে আমার নিজেরই হাত কেঁপে উঠেছে, বুক ধড়ফড় করেছে! 🙂)