#বনজোছনা
৩৮.
সাবিহা রিফাতের জন্য সুজি বানাচ্ছিল। সে এক নাগাড়ে কেঁদে যাচ্ছে। ছেলেকে কোলে নিয়ে কাজ করতে বেশ কষ্ট হলেও আর কোনো উপায় ছিল না। হীরা ঘুমুচ্ছেন। এই ছেলেকে এখন বসিয়ে দিলে গলার রগ যা-ও বা আস্ত আছে সেটাও ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাবে।
হাড়িটা নামাবে, ঠিক সেই ক্ষণে সিমির চিল চিৎকার শুনে সাবিহার আত্মা কেঁপে উঠল। অজানা আশঙ্কায় তার তনুমন ছটফটিয়ে উঠলে সে দ্রুত বেগে শ্বশুরের ঘরের সামনে গেল। ধুপধাপ শব্দ করে তাকে ডাকল, “বাবা! বাবা!”
হীরা এক ডাকেই উঠে পড়েছিলেন। দরজা পর্যন্ত পৌঁছুতে কিছু সময় লাগল। সাবিহার আতঙ্কিত মুখ দেখে বললেন, “কী হয়েছে?”
“বুঝতে পারছি না। রিফুকে একটু রাখুন বাবা। আমি নিচে একটু দেখে আসি। সিমি চিৎকার দিল কেন…!” বলতে বলতে ছেলেকে দাদার কাছে দিয়ে সে ছুট দিলো। দরজা পর্যন্ত যেতে যেতে আবার সুজির কথা মনে হওয়ায় হাওয়ার বেগে এসে চুলা বন্ধ করে সোজা সিঁড়িঘরে চলে গেল।
পুত্রবধূর ভীত চেহারা দেখে হীরা নিজেও চুপ থাকতে পারলেন না। নাতির কান্না থামাতে থামাতে সিঁড়ির কাছে গেলেন।
সাবিহা দরজায় আঘাত করতেই সিমি এসে খুলে দিল। ওর চোখে ঘনঘোর বর্ষা। সাবিহা অস্থির হয়ে বলল, “কী হয়েছে?”
সিমি ফুপিয়ে কেবল এটুকুই বলতে পারল, “খালু!” তার চোখ চলে গেল বসার ঘর পেরিয়ে সোজা বিপরীতে। দরজার পলক পড়েনি, আধবোজা চোখে সে তাকিয়ে আছে সাবিহার দিকে। তার চোখের মণিতে একটা দৃশ্য স্থির হয়ে আছে। ফাবিহা বাবার বুকে শুয়ে আছে, পাশেই নূরজাহান এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছেন।
সাবিহা বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকালো, “কী হয়েছে চাচার? চাচী এভাবে শুয়ে আছে কেন!” উত্তরের অপেক্ষা না করেই ভেতরে ছুটল সে।
নূরজাহানের পা জোড়া খাটের বাইরে ঝুলছে। মুখভঙ্গি অস্বাভাবিক। বন্ধ চোখেও কীসের যেন আতঙ্ক! সাবিহা দ্বিধান্বিত চোখে ফাবিহার দিকে তাকালো। ওর পিঠ খুব ধীর ভঙ্গিতে উঁচু নিচু হচ্ছে। আস্তে করে ডাকল সে, “ফাবিহা? চাচী কি অজ্ঞান হয়ে গেছে? কী হয়েছে!” তার কণ্ঠে অস্থিরতা। কিছুই বুঝতে পারছে না সে।
ফাবিহা আস্তে করে মাথা ওঠালো। খাটের পাশের টেবিলে হাফ লিটারের একটা পানির বোতল ছিল। ফরিদের রাত-বিরেতে তৃষ্ণা পায়। সেজন্য সবসময় বোতলটা ভরে রাখেন নূরজাহান। সেখান থেকে একটু পানি নিয়ে মায়ের মুখে ছিটিয়ে দিলো সে।
এত কিছু হয়ে গেল, তবুও ফরিদ উঠছে না দেখে সাবিহা বলল, “চাচাকে ডাক দাও!” সে ভেবেছে, নূরজাহান অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কারণেই বোধহয় সিমি চিৎকার দিয়েছে। তবে ঘরে ঢুকতেই খালুর কথা কেন বলল?
ফাবিহা নিষ্পাপ কণ্ঠে বলল, “বাবা তো উঠবে না আপা!”
সাবিহা ঝট করে ফরিদের চেহারার দিকে তাকালো। কী এক আশঙ্কায় এগিয়ে গেলো তার কাছে। বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে ফাবিহাকে দেখে তার কপালে হাত রাখতেই বৈদ্যুতিক শকের মতো ছিটকে দূরে চলে গেল।
অস্ফুট কণ্ঠে বলল, “চাচা..!”
ফাবিহা ক্লিষ্ট হাসল, “কীভাবে আমাকে রেখে চলে গেল দেখলেন আপা!”
থরথর করে কেঁপে উঠতেই খাট আঁকড়ে ধরল সাবিহা। নূরজাহানের জ্ঞান ফিরেছে। তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন স্বামীর বুকে। উন্মাদের মতো তার মুখে, মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকতে শুরু করলেন, “ফারদিনের বাবা! এই! তাকাও না! এইটা আবার কেমন ঘুম! ও ফাতেমার বাপ!” ফাবিহা শূন্য চোখে তাকালো। নূরজাহান খুব কম সময়ে বড় মেয়ের নাম ধরে ফরিদকে ডাকেন। ফাবিহা হয়তো সারা জীবনে হাতে গুণে তিনবার শুনেছে। এই চারবার হলো।
সিমি দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল ভেতরে ঢুকলেই তাকে এমন কিছু মেনে নিতে হবে যা সে কস্মিনকালেও মানতে চায় না।
হীরা ঢুকলেন তার পরই। সোজা ফরিদের শিয়রে গেলেন। হাতের নাড়ি দেখলেন, নাকের সামনে আঙুল ধরলেন। বয়স্ক হাতটা রাখলেন তার বুকের বাম পাশে। অনেকক্ষণ, অনেকক্ষণ সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। রিফাত কেঁদে যাচ্ছে। তার কান্নার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে নূরজাহানের আহাজারি।
ফরিদের শান্ত মুখটার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে হীরা শুধু বললেন, “কখন?”
নূরজাহান আর্তনাদ করে উঠলেন, “জানি না ভাই! জানি না! রাত্রে খাওয়া দাওয়া করলাম, গল্প করলাম! ওর বাবা বলল নামাজ পড়ে ঘুমাই! সেই নামাজ পড়তে পড়তে ঘুমাতে দেরি হলো। উঠে দেখি সকাল হয়ে যাচ্ছে! এত বার ডাক দিলাম, মানুষটা উঠল না। প্রতিদিন তো আমার আগেই ওঠে! আমি ভাবলাম এর গাঢ় ঘুম! ঋণ শোধ করে ঘুম মনে হয় গাঢ় হয়েছে! এমন গাঢ়ই হলো আল্লাহ! আর তো ভাঙে না!”
নূরজাহান জোয়ারের ঢেউয়ের মতো স্বামীর বুকে আছড়ে পড়ছিলেন। হীরা আস্তে করে বেরিয়ে গেলেন। ফাবিহা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল বাবার মাথার কাছে। বালিশের নিচ থেকে উঁকি দিচ্ছে লেদারের ডায়েরিটা। কার সাথে লুকোচুরি খেলছে সে? যে জীবন থেকে ছুটি নিয়েছে?
সাবিহা খুব কষ্টে কান্না দমিয়ে রেখেছে। তবুও বারবার চোখ ভিজে আসছে। সিমির কাছে এসে সে বলল, “ফারদিন কই?”
সিমি কথা বলতে পারছিল না। তার মুখে কীসের যেন বাঁধ! মুখ খুললেই সে বাঁধ ভেঙে যাবে। ভেসে যাবে সে নিজেই!
“কই ফারদিন?” সিমির হাত ধরে ঝাঁকি দিলো সাবিহা।
“ঘ..ঘরে।”
“ডাক দে যা!” প্রায় চিৎকার করল সাবিহা। এত কিছু হয়ে গেল, ঐ ছেলে কি কিছুই ঠিক পায়নি!
সিমি শরীরটা টেনে হিঁচড়ে ফারদিনের ঘরের সামনে নিয়ে গেল। দরজা খোলা। ধাক্কা দিতেই চোখের সামনে অন্ধকার রাজ্য উন্মুক্ত হলো। জানালা খোলার শক্তি পেলো না সিমি। বাতি জ্বেলে ফারদিনের পায়ের কাছে দাঁড়ালো। কম্বলের উপর দিয়েই তার পায়ে হাত দিলো।
“ফারদিন ভাই? ফারদিন ভাই!”
শব্দ শুনে উল্টো ঘুরে শুলো ফারদিন। সিমি কাঁদতে কাঁদতে ডাকল, “ওঠেন ফারদিন ভাই! আপনার ঘুম কবে শেষ হবে!”
কান্নার আওয়াজ শুনে ফারদিন কম্বলের নিচ থেকে মাথা বের করল। এক চোখ খুলে ঘুম ঘুম কণ্ঠে বলল, “কী হইছে?”
সিমি হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল, “খালুর কাছে যান ফারদিন ভাই!”
ফারদিন সাথে সাথেই উঠে বসল। কম্বল ছেড়ে দাঁড়িয়ে সিমির দিকে কপাল ভাঁজ করে তাকালো।
“কী হয়েছে বল তো?”
সিমি কীভাবে বলবে খালু মারা গেছে? কোনোদিন বলতে পারবে না সে!
নূরজাহানের কান্নার সুর শুনতেই ফারদিন দৌড়ে চলে গেল। ঘরের সামনে দাঁড়াতেই তার চক্ষু স্থির হয়ে গেল। বুঝতে বেগ পেতে হলো না কী হয়ে গেছে, কিন্তু মানতে বেগ পোহাতে হলো।
নূরজাহানের কাছে যেয়ে দাঁড়ালো সে।
“আম্মু?”
নূরজাহান ছেলের গেঞ্জি টেনে ধরলেন।
“আসলিই তো বাপ! ডাক ছাড়াই আসলি! কার কাছে আসলি ফারদিন! ও ফারদিন! তোর বাপ কেমন করে চলে গেল!” কথা বলছেন আর ফরিদের চোখে মুখে হাত বোলাচ্ছেন তিনি।
ফারদিন অবিশ্বাস্য চোখে ফাবিহার দিকে তাকালো। ফিসফিস করে ডাকল, “ফাবিহা!”
এই এতক্ষণে ফাবিহার চোখের শক্ত বেড়ি পেরিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু কপোল স্পর্শ করল। কোনো স্বর নেই, শব্দ নেই। কেবল নিস্তরঙ্গ হয়ে বয়ে চলা।
ফারদিন পেছন থেকে পড়ে যেতে গেলেই কেউ একজন তাকে আঁকড়ে ধরল। সাবিহা দেখল হীরা জনা কয়েক প্রতিবেশী নিয়ে এসেছেন।
ফারদিনের মনে হচ্ছিল সে শ্বাস নিতে পারছে না। অবিশ্বাস্য চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে সে অক্সিজেন হাতড়ে মরল। কিন্তু আজ তাদের বড় সংকট! ফরিদ ধমক দেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে করুন কণ্ঠে বলছেন না, “একটা কাজ অন্তত কর বাপ!” ফারদিনও অক্সিজেন পাচ্ছে না।
পড়াশোনা পুরোপুরি ছেড়ে দেয়ার পরও মনে হয়নি জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেছে। কিন্তু এখন, এই আলো ফোঁটা সকালে মনে হলো তার জীবনের সকল আলো নিভে গেছে।
হীরা ফাবিহার সামনে যেয়ে নরম কণ্ঠে বললেন, “মাইয়েতকে এভাবে ফেলে রাখা ঠিক না মা!”
ফাবিহা অবুঝ চোখে তাকালো। বিড়বিড় করে বলল, “মাইয়েত?” যার মা ডাক এখনও কান ছুঁয়ে বুক শীতল করে চলেছে, সে এরই মধ্যে মাইয়েত হয়ে গেল?
“কী করবেন?” প্রশ্নটা পুরোপুরি না শুনলেও বুঝতে পারলেন হীরা।
শুকনো কণ্ঠে বললেন, “গোসল করাতে হবে। জানাজার ব্যাবস্থা করতে হবে…তোমার চাচা ফুপুদের বলা হয়েছে?”
ফাবিহার যেন এই ক্ষণে মাথা কাজ করতে শুরু করল। সবাইকে জানাতে হবে। বাবা অবসর নিয়েছেন, তার বিদায়টা বড় সাজিয়ে-গুছিয়ে করতে হবে!
ফরিদের মাথার পাশ থেকে ডায়েরিটা উঠিয়ে বুকে নিল ফাবিহা। নিজের ঘরে যেতে যেতে হীরাকে বলল, “বাবা আরেকটু থাকুক?”
হীরা উত্তর দিতে পারলেন না। কেবল মাথা নাড়লেন।
“ফুপু?”
মনিরা বিরক্ত হয়ে ধমক দিলেন, “ভোর সকালে ফোন করিস কোন আক্কেলে?”
“ফুপু, বাবাকে বিদায় দিবা না!”
মনিরা যেন ভুল শুনলেন, “কী বললি? কী হয়েছে? ভাইজান কই?”
“বাবা যাওয়ার অপেক্ষা করছে ফুপু। তুমি আসো।”
সাবিহা তার পিছু পিছু এসেছিল। ফোনটা এক প্রকার কেড়ে নিয়ে সে যা জানালো তাতে আর স্থির থাকতে পারলেন না মনিরা। পাশে স্বামী না থাকলে উল্টে পড়ে নিশ্চিত একটা অঘটন ঘটাতেন।
তারপরের ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটে গেল। বেলা গড়াতেই মনিরা এলেন, দুই ভাই এলো। যে মামা-খালাদের বহুদিন ফাবিহা দেখেনি— তাদের এই উসিলায় দেখার সৌভাগ্য হলো। সবাই অকৃপণ হয়ে কাঁদল। ফাবিহার ইচ্ছে করছিল সবাইকে থামাতে দিতে। সে তো অশ্রুত সুর দিয়ে বাবাকে বিদায় দিতে চায় না! চায় ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে ক্ষণিকের বিচ্ছেদ উদযাপন করতে! বাবা ক্ষমা চেয়েছেন, পরম ক্ষমাশীল নিশ্চয়ই ওই করুণার ক্রন্দনের বিপরীতে তাকে রিক্ত হস্তে ফিরিয়ে দেননি!
খাটিয়ায় শোয়ানো ফরিদের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো সদ্য হজ করা হাজী, যার কাঁধে কোনো গুনাহ নেই, চোখে কোনো চিন্তা নেই। বুকে শান্তি, আর দেহে ইহরাম। কি নিশ্চিন্তের সফর!
*****
এক বছর এখানে টিকে থাকা মোটেও সহজ ছিল না। মুরুব্বীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাব বললেও যেতে পারেনি সাকিন। কলেজের কাজে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল যে বাড়ি খোঁজার ফুরসত মিলল না। আর বাড়ি না খুঁজে সাবিহাকেও আনা যায় না। সে নিজেই মানুষের বাড়িতে এক প্রকার লজিং থাকছে। সেখানে অতিথি নিয়ে আসা বিলাসিতা।
প্রবীণ ভদ্রলোক যদিও কিছু বলবেন না। উল্টো খুশিই হবেন। লোকটা সাকিনকে নাতির মতো স্নেহ করেন। অবিবাহিত কোনো নাতনি নেই বলেই বুক পেতে সেটা গ্রহণ করতে পারে সে। নয়তো এই অনির্দিষ্ট আশ্রয় এবং অকুণ্ঠ স্নেহ নির্বিঘ্নে গ্রহণ করতে একটা অস্বস্তি দানা বেঁধে উঠত।
প্রথম দিকে ঝড়টা গেল নিজের শরীরের ওপর। নতুন আবহাওয়া, নতুন হাওয়া-মাটি-জলের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে বেশ হিমশিম খেতে হয়েছে সাকিনকে। দূর প্রবাসে, কোনো মমতাময়ীর স্পর্শ ছাড়া মামুলি জ্বরও ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ ঠেকেছে। মাসের মাথায় তাতে ধাতস্ত হয়ে ওঠার পরই সে অনুভব করল চারদিকে কাজের ছড়াছড়ি। দু’দণ্ড বসে থাকার সুযোগ নেই। তারপর থেকেই একেবারে মালকোচা দিয়ে মাঠে নেমে পড়ল সে।
গ্রামের ছেলেরা স্বভাবতই প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর থাকে। সাকিনের কাজ ছিল কেবল ওই নিভে আসা জীবনের সলতেয় একটু আগুন ধরিয়ে দেয়া। স্রেফ হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার নীতি মুখস্থ করালেই যে কাজটা হাসিল হবে না সেটা সে ঢের বুঝেছিল। তাই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ছেলেদের খেলার সঙ্গী হয়ে উঠল।
এলোমেলোভাবে বিভিন্ন খেলাই গ্রামে হতো। নতুন এবং বহিরাগত শিক্ষক হিসেবে তার প্রতি থাকা আগ্রহটা কাজে লাগাল সে। ছাত্রদের সামনে উত্থাপন করল, একটা টুর্নামেন্ট খেলার প্রস্তাব। ছেলেটা সানন্দেই মেনে নিলো। কখনও রেফারি, কখনও আম্পায়ার সাকিন নিশ্চিত করল হার-জিতের আনন্দ যেন সীমা না ছাড়ায়।
খেলায় যখন তারা তাকে বন্ধু ভাবতে শুরু করল, তখনই সাকিন তাদের সাথে পিকনিকের আয়োজন করল। অংশগ্রহণকারী কলেজ ছাত্রদের তিনটে দল নিয়েই বিশাল পিকনিক। আয়োজন খুব সামান্য। খিচুড়ি, ডিম ভাজি আর চালতার আঁচার। তবে মজাটা হলো খাওয়ার আগে, ছুটোছুটি করে নিজেরা রান্না করা আর দাপাদাপি করে পুকুরে গোসল করে কলাপাতার আসনে খেতে বসা। পিকনিকের ধারায় নতুন কিছুই ছিল না। নতুন ছিল কেবল কম কথা বলা একটা মানুষ। যার জ্বলজ্বলে চোখ দেখে ছাত্রদের মনে হয়েছিল— এ লোকটি তাদের বড় আপন!
খেলায়, খাওয়ায় তাদের সারিতে থাকা মানুষটা যখন ক্লাসরুমে ডাক দিলো— তখন তাদের মুখ ফিরিয়ে নেয়ার সাধ্য ছিল না। আর কিছু না হোক! অন্তত স্যার যেন দেখতে পারে সে কলেজে গিয়েছিল, ক্লাস ফাঁকি দেয়নি— এই এটুকুর জন্যই উপস্থিতি বেড়ে গেলো। তবে ছ’মাসের মাথাতেই অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট যে একেবারে আমূল বদলে যাবে সে আশা সাকিন করেনি। তা হয়ওনি। তবে অভূতপূর্ব একটা ব্যাপার ঘটেছে। সরকারি কলেজের কম বয়সী এক স্যারের সাথে ছাত্রদের এমন হৃদ্যতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে— যা এর আগে এই গ্রামবাসী কখনও দেখেনি। ফলে ছাত্রদের অভিভাবকদের মনেও সাকিন সম্মানের সাথে ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। এতে অন্যদের চক্ষুশূল হলেও জুবায়েরের নামকাওয়াস্তে অডিট তার মাথার উপর একটা নিরাপত্তার ছায়া দিয়ে গেছে।
আজ খুব সকাল সকাল উঠেছে সাকিন। ফজর পড়ে অন্যদিন ছেলেদের সাথে হাঁটতে যায়। আজ সরাসরি বাড়ি চলে এসেছে। উপর মহলে থেকে আজ অডিট আসার কথা আছে। এর আগেও নকল অডিট যে কয়েকবার হয়নি, তা নয়। জুবায়ের নিজে তো যখন তখন এসেছেই, মাঝে একবার তার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এক বন্ধুকেও বগলদাবা করে নিয়ে এসেছে। পরিচয়ের সময় অবশ্যি বলেনি সে ভদ্রলোকের নামের আগে যে নির্বাহী আছে। ম্যাজিস্ট্রেট বলে ছাত্র-শিক্ষক সকলের মনেই একটা কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়ে গেছে।
সাকিন বলেছিল, “এসব কি ঠিক হচ্ছে জুবায়ের?” বলা বাহুল্য এই এক বছরের তাদের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বেশ অনেকখানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
জুবায়ের মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলেছিল, “লাঠির আগে ভূত পালায়! আমি দুইদিন আসা বন্ধ করি, তারপর দেখবেন কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল! এদের টাইটে রাখতে হলে কোনো বিকল্প নেই। তাছাড়া আসল অডিট আজকে না হোক, কলকে তো আসবেই। তার প্র্যাকটিস হয় গেল! মন্দ কী?”
মন্দ কিছু হয়েছিল কি না সে জানে না। তবে জুবায়ের আসলেই কাজের কাজ করে দেখিয়েছে। বছরের মাথায় শিক্ষা অধিদপ্তরের নজর আকর্ষণ করা চাট্টিখানি কথা নয়! তারা এলেই খানিক অনুদানের আশা করা যায়। লাইব্রেরির করুন দশা! ওটা ঠিক না করলেই নয়। আরও কিছু বেঞ্চ দরকার আর্টসের বিল্ডিংয়ে। সব তালিকা করে জুবায়েরকে দিয়েছে সাকিন। ছেলেদের ভালো করে শিখিয়ে-পড়িয়ে দিয়েছে। আজ সবাইকে টিপটপ হয়ে আসতে হবে।
সাকিন নিজেও ফিট হয়ে যেতে চায়। বাহ্যিক অবয়বেই যেন তার ভেতরের আত্মবিশ্বাস ফুটে ওঠে। শিক্ষক হীনম্মন্য হলে ছাত্রদের ভেতর তো সংক্রমিত হবে।
এখানে আসার কিছুদিন পরই একটা বাইসাইকেল কিনেছিল সে। সেটা নিয়ে বাজারের দিকে গেল লন্ড্রি করা শার্ট-প্যান্ট নিয়ে আসার জন্য। সেগুলো আনতে আনতে ছয়টা বেজে গেলো। বালতি নিয়ে উঠানে বের হলো সে। এদের কলপাড় একদম প্রাচীর ঘেঁষে, উঠানের শেষ মাথায়। যেতে যেতে তার বুকে সেই পুরোনো আনন্দটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
মগ দিয়ে পানি ঢালতে ঢালতে স্মৃতির রোমন্থন করল সাকিন। অধ্যক্ষ প্রথম প্রথম কাছে ডাকলেও ক্রমেই এড়িয়ে যেতে শুরু করলেন। সিনিয়রদের কখনোই সে স্নেহের পাত্র ছিল না। তারা আরও বেশি অদেখা করে চলল। ঘটনাটা বুঝতে পারছিল না সে। আস্তে-ধীরে পরিষ্কার হলো তার এই জনপ্রিয়তা মেনে নিতে পারছে না সকলে। গ্রামের ছেলে হলে তবুও হয়তো সহ্য করত। আরেক ডেক্স থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা মানুষ, সব ছাত্রদের চোখের মণি হয়ে উঠেছে— এটা মোটেই সহ্য করতে পারছিল না তারা। দু-একজন শিক্ষক তার সহযোগী হলেও বিপরীত দলের সামনে তারা বেশ নাজুক। তবে সামনাসামনি তারা কিছু বলতে পারত না। কেননা পিঠের পিছেই জুবায়ের আছে। তাই তারা উসকানি দিত বাবা-মায়েদের, যেন ছেলেমেয়েকে সাকিনের কাছে না পড়ায়। সকাল, বিকেলে যে দুটো ব্যাচ পড়ায় সাকিন, সেখানে যেন কোনোভাবেই নিজের সন্তানকে না পাঠায় এটা আড়ে-ঠাড়ে বোঝাতে বাদ রাখেনি সেই শিক্ষকগণ। কিন্তু চোখ অভিভাবকদেরও আছে। যে ছেলেরা বই ধরতই না, তারা যার জন্য বইয়ের সাথে একটু হলেও সম্পর্ক করেছে— তাকে তারা বাতিলের খাতায় ফেলতে পারল না। দু-একজন অভিভাবক ছাড়া সকলেই সাকিনকে একইসাথে শ্রদ্ধা এবং স্নেহ করতে লাগল। তার পেছনে তাদের ছেলে ঘুরে বেড়াবে— এটা তাদের কাছে সম্মানের বিষয় হয়ে দাঁড়ালো।
এই অভিভাবককূলের মাঝে ইরফানের মা তাকে একটু বেশিই আদর করে। মাঝে মাঝে তার বাসায় তো যেতে হয়ই, কোনো কারণে সাকিন যদি যেতে না-ই পারে তবে ভালো-মন্দ খাবার তাকে পার্সেল করে পাঠিয়ে দেয়। এই স্বজনহীন প্রান্তরে ওই ওটুকু আদরই বড় আকাঙ্ক্ষিত মনে হয় সাকিনের।
গোসল করে ঘরে যেতেই দেখল সাবিহার তিনটে মিসড কল। আজকে ওর সাথে বেশিক্ষণ কথা বলতে পারবে না। এখনই গুছিয়ে কলেজে চলে যেতে হবে। পরিষ্কারের কাজ কতদূর হয়েছে তা দেখার পাশাপাশি দুপুরের খাবার ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে। গা মুছতে মুছতে ভাবল সাকিন। এর মাঝে সাবিহা আবার ফোন দিলো।
সাকিন ধরেই বলল, “সাবিহা, আজকে অনেক ব্যস্ত থাকব সারাদিন। কী বলবি…”
সাবিহা ফুঁপিয়ে উঠল।
সাকিনা ভয় পেয়ে গেল। গামছা ছুঁড়ে বিছানায় ফেলে দিল। চিন্তিত কণ্ঠে বলল, “কী হয়েছে? রিফাত অসুস্থ?”
“না। ভাইয়া, ফরিদ চাচা…!”
সাকিনের কপাল আরও কুচকে গেলো।
“কী হয়েছে ফরিদ চাচার?”
সাবিহা হেঁচকি তুলে কেঁদে ফেলল।
“কালকে রাত্রে সবাই একসাথে খাওয়া-দাওয়া করলাম! তারপর চাচা ঘুমালো, আর উঠল না!”
“কি!”
সাকিনের মাথায় যেন বাজ পড়ল। গতকাল রাতেই সাবিহা উচ্ছল ভঙ্গিতে বলেছিল ফাবিহাদের সমস্ত ঋণ পরিশোধ হয়ে গেছে। খবরটা শুনে সাকিনের মনে হয়েছিল জগদ্দল পাথরটা তার বুক থেকেই নেমেছে। পরিবারটার জন্য সেভাবে কিছু করতে পারেনি সে। কিন্তু মনের ভেতর একটা দুশ্চিন্তা সবসময়ই জেগে থাকত। কালকে তাকে ঘুম পাড়িয়ে নিজেও ঘুমিয়েছে সে।
কান্নার জন্য সাবিহার কণ্ঠ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। সে বলল, “তুই কখন আসবি ভাইয়া?”
সাকিন যেন দিশেহারা হয়ে পড়ল। ফরিদ চাচা মারা গেছেন! চোখ বন্ধ করতেই ভদ্রলোকের শিশুর মতো সরল মুখটা ভেসে উঠল। তাকে কোনোভাবেই মৃত কল্পনা করতে পারল না সে। কোনো সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও লোকটা যেভাবে ভালোবেসেছিলেন, তার মর্যাদা রক্ষার জন্য হলেও সাকিনকে যেতে হবে। কিন্তু অডিট! আজ ক্যান্সেল করলে এই অর্থবছরে আর অনুদান পাওয়ার সুযোগ নেই। সে চলে গেলে তাদের সুন্দরভাবে তদারকি করবে এমন মানুষও নেই। সাকিন অথৈ জলে পড়ল।
“ভাইয়া?”
“হ্যাঁ.. হ্যাঁ! বল!”
“এখনই বেরিয়ে পড়! সবার অবস্থা যেমন তেমন, ফারদিনের অবস্থা খারাপ! সোজা গিয়ে দাঁড়াতেই পারছে না। এত ভালোইবাসিস অথচ জীবিত বাপের কদর করলি না!” হুহু করে কেঁদে ফেলল সে। রফিককেও আসতে বলেছে। সে ইতোমধ্যেই বেরিয়ে গেছে।
সাকিন বলল, “আমি আসছি সাবিহা। দেরি হলেও আমি আসবই ইনশাআল্লাহ্। চাচাকে একটু রাখিস প্লিজ! আমি আসছি!”
কল কেটেই সাকিন অস্থির ভঙ্গিতে জুবায়েরের কাছে ফোন দিলো। সে-ও আসবে আজ।
“জী, সাকিন ভাই!”
“জুবায়ের, অডিট টিম এসে পৌঁছাবে কখন?”
“এই ধরেন এগারোটা বারোটার দিকে! এসে ঘণ্টাখানেক দেখে-টেখে লাঞ্চ করবে।”
সাকিন ঘড়ি দেখল। সাড়ে ছয়টা বাজে। এর মাঝেই এক পাক ঘুরে আসতে পারবে।
সে বলল, “জুবায়ের, আমার চাচা মারা গেছে। ইমিডিয়েটলি যেতে হবে। এগারোটার ভেতরেই আমি চলে আসব ইনশাআল্লাহ্। এতটুকু সময় তুমি একটু হ্যান্ডেল করতে পারবে না?”
“চাচা মারা গেলে তো যেতেই হবে! কিন্তু আপনার চাচা আছে?”
“আছে। তুমি একটু দেখো, আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসার চেষ্টা করব।”
সাকিন বাতাসের বেগে গুছিয়ে মূল বাড়ির দিকে ছুটল। এ বাড়ির বড় ছেলের একটা মোটরসাইকেল আছে। আজকে দিনের জন্য সেটা ধার করতে হবে।
বাড়ির সদর দরজার সাথেই একটা পুরোনো গরুর গাড়ি। যে বৃদ্ধের বাড়িতে সাকিন থাকছে, তার মা নাকি গরুর গাড়ি ছাড়া কোত্থাও যেতেন না। ভদ্রমহিলা বহু আগে মারা গেলেও তার স্মৃতিস্বরূপ গাড়িটা রেখে দেয়া হয়েছে।
মা মরেছে, গরুটা গেছে, আছে কেবল এই গাড়িটা। ভাঙা বেহালার মতো। শরীরটা আছে, সুরটা নেই।
সাকিনকে একবারের বেশি দুবার বলতে হলো না। তৎক্ষণাৎ বৃদ্ধ ছেলের মোটরসাইকেল বুঝিয়ে দিলেন। আগে-পিছে না দেখেই ছুটল সাকিন। যে ছাইচাপা আনন্দ নিয়ে সকলের ঘুমটা ভেঙেছিল, তা মুহূর্তের মাঝেই বিষাদে রূপ নিয়েছে। কানের পাশ দিয়ে শো শো করে বাতাস বইছে। তার মাঝেই কেউ বলে চলেছে,
“তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি বাবা! এই বুড়ো চাচাটার কথা ভুলে যেও না! আমরা ভাড়াটে মানুষ, আজ আছি কাল নেই। ফোন নাম্বারটা আছে না বাবা? মাঝে মধ্যে একটু ফোন দিও। দেবে তো?”
সাকিন কথা রাখেনি। জীবনের ব্যস্ততায় ডুবে যেয়ে ভুলে গেছে অকৃত্রিম ভালোবাসার সে উৎসকে। আজ যখন মনে পড়েছে তখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে। ভালোবাসার খোলসটা পড়ে আছে, উৎস তো সেই কখন উড়াল দিয়েছে!
*****
ফাবিহার মনে হচ্ছিল, কী চমৎকার পরিকল্পনা! কী সূক্ষ্ম যোগসাজেশ!
কালই বাবা সব ঋণ পরিশোধ করে দায়মুক্ত হলো। ফাবিহা পড়েছে ঋণ মেটানো না অবধি সে জান্নাতে যেতে পারে না। কোনো এক শহীদ সাহাবীর ছেলেকে নবীজি আদেশ দিয়েছিলেন বাবার পক্ষ থেকে অতি সত্বর ঋণ পরিশোধ করে দেয়ার জন্য। নয়তো তিনি জান্নাতে যেতে পারছেন না। তাদের সে ঝামেলায় যেতে হয়নি, ফরিদ নিজের কাজ নিজেই সম্পন্ন করেছেন।
গত রাত্রিটা কেটেছে ফেলে আসা দু বছরের সমস্ত আনন্দ একত্রিত করে। রান্না করতে করতে নূরজাহান যখন ক্লান্ত হয়ে গেলেন, তখন ফরিদ দরাজ কণ্ঠে গান ধরলেন। কোন গানটা যেন ছিল? ফাবিহার মনে পড়ছে না। কিন্তু চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে নূরজাহানের রাঙা চেহারা।
“ইশ! আস্তে বলো না! উপর থেকে সব শোনা যায়!”
তাতে ফরিদ নিভলে তো! উল্টো আরেক কাঠি সরেস হয়ে পরের গান ধরলেন।
তারপর খাওয়া-দাওয়া হলো। হাসি-মজা হলো। শেষ রাত্তিরে ফরিদ নামাজও পড়লেন। বেছে বেছে পড়লেন সূরা নাসর। ফাবিহার মনে ভেতর প্রশ্নের ঢেউ আছড়ে পড়ে। বাবা কি খুব ভেবে চিন্তে এই সূরাটা দিয়ে নামাজ পড়েছিলেন?
নবীজি আল্লাহর বাণী ছড়িয়ে দিলেন, তাঁকে মক্কা থেকে বের করে দেয়া হলো, সময়ের পালা-বদলে বিজয় এক সময় তাঁর ঝুলিতে এলো। বিদায় হজের সময় এই সূরার মাধ্যমেই তাঁর বিজয়কে নিশ্চিত ও চিরস্থায়ী করা হলো।
তাদের যুদ্ধটা নবীজির সংগ্রামের ধারে-কাছেও যায় না। কিন্তু তাদের জায়গা থেকে তো কম নয়! এক অনির্মোচনীয় ভুল, সেই ভুলের পরিক্রমায় বাড়ি ছাড়া, অপমানের বর্ষণ, কলঙ্ক, ঘৃণা, ধোঁকা— কতকিছুই না সইতে হলো! তারপর, ঠিক ঠিক তাদের মুখে ছুঁড়ে দেয়া হলো যোগ্য জবাব। পাপমোচন করে যখন গুনাহের ওপর বিজয় নিশ্চিত হলো— ঠিক সে সময় সিপাহসালার বিদায় নিলেন। কী চমৎকার সে বিদায়! কী আকাঙ্ক্ষিত সে সমাপ্তি!
ফাবিহার ভাঙা বুকটা ভরে আসে। নবুয়তের পরিক্রমা আন-নাসর দিয়ে শেষ হয়েছিল। ফরিদের জীবনও শেষ হলো সেই নাসরে এসেই। এমন বিজয়ী মৃত্যুতে আর্তনাদ করা মানায় না!
বুক থেকে মা-কে সরিয়ে উঠানে গেলো সে। খাটিয়ায় ফরিদ শুয়ে আছেন। বড় আরামের ঘুম! সিপাহসালারের যুদ্ধ শেষ হয়েছে। কাঁধে বিজয় নিয়ে তিনি ইহরাম জড়িয়েছেন পুরো শরীরে। তার এ যাত্রাকে দুহাত ভরে সাজিয়ে দেবে ফাবিহা।
যোহরের আগে আগে জানাজা হয়ে যাবে। মানুষের ভিড় জমে এসেছে। প্রস্তুতি নিয়ে সবাই আবার আসবে। ফাবিহা খাটিয়ার পাশে যেয়ে বসল। কপালে হাত বুলিয়ে মাথায় আলতো করে চুমু খেল। গতকাল বিকেলে কদুর তেল দিয়েছিল বাবার মাথায়। তেলের গন্ধটা এখনও যায়নি, অথচ মানুষটা নাকি চলে গেছে! কী আশ্চর্য!
ফাবিহা নিচু কণ্ঠে ডাকল, “ও বাবা?”
কোথাও কেউ নেই। তবু তার মনে হলো ফরিদ হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলছেন, “মা রে! কান্নাকাটি কীসের!”
“তুমি চলে যাচ্ছ বাবা, কাঁদব না?”
“কাঁদবি না কেন! কিন্তু তুই কাঁদলে তো মা তোর আম্মু পাগল হয়ে যাবে! মা রে, তুই খুব ভালো থাকিস মা!”
“চেষ্টা করব বাবা।”
“তোর ভাইটাকে একটু দেখিস মা! ও কেদিন ঠিক ভুল বুঝতে পারবে দেখিস!”
“দেখব বাবা। বাবা, আমাদের আবার দেখা হবে তো?”
“হবে মা। আল্লাহ চাইলে হয় না এমন কী আছে? আল্লাহ আমাদের আবার জান্নাতে একসাথে করবেন দেখিস! সেখানে আমাদের নিজস্ব একটা কুন্দকলি হবে মা!”
“সত্যিই তো বাবা? হবে তো?”
“হবে মা! তুই ভুল পথে যাস না। মান-সম্মানের চিন্তা করতে করতে অন্ধ হয়ে যাস না! আল্লাহ যদি এক সুযোগ দ্বিতীয়বার দেন, তাহলে সেটা লুফে নিতে ভুলবি না। রিজিক কিন্তু মা আমাদের দোষেই হাতছাড়া হয়!”
কথাগুলো কাল রাতে ফরিদ বলেছিলেন। ফাবিহা গাঢ় চোখে তাকালো।
“চলে যাবে বাবা?”
“যাই মা?”
“যাবেই?”
“যাই। দেখি, বিদায়টা হাসি মুখে দে তো মা!”
ফাবিহা হাসতে পারল না। মুখ নামিয়ে বাবার গায়ের গন্ধটা আরেকবার শুঁকে নিলো।
“ফাবিহা!” সাবিহা আস্তে করে ডাক দিলো। ফাবিহা তাকালে তাকে বলল, “চাচাকে নিয়ে যাবে।”
ফাবিহা সরে এলো। বারান্দায় যেয়ে দাঁড়াতেই ঘরের ভেতর থেকে একে একে কয়েকজন পুরুষ এসে খাটিয়াটা ঘিরে ফেলল। সেখানে সাকিনও ছিল। তবে ফাবিহা কাউকে খেয়াল করেনি। সে শুধু দেখছে ফারদিনকে। বাবা তাকে দায়িত্ব নিতে বলেছিল। সে নিজের কাঁধে দায়িত্ব নিল না, নিল বাবার খাটিয়া।
সবাই চলে গেলে ফাবিহা উঠানে এসে দাঁড়াল। দুপুরের রোদ মাথার ওপরে এসে থেমেছে। সেই খা খা রোদে উঠানে ছিল কেবল একটা মাত্র প্রাণী। ফাবিহা তার দিকে এগিয়ে গেল। খেয়াল করল, টিকটিকি ঠিক খাটিয়ার জায়গায় বসে আছে। তার ঘোলাটে দৃষ্টি দরজার দিকে।
সাকিন থাকতে পারল না। খুব ইচ্ছে ছিল চাচী বা ফাবিহার সাথে একবার দেখা করার। কিন্তু দেখা করে কাজের কথা সে কিছুই বলতে পারবে না। ফারদিনের সাথে দেখা যদিও হলো, ওকেও কিছু বলতে পারল না সে। এমনিতেই বেশ দেরি হয়ে গেছে। ওদিকে অডিট টিম তখনও না পৌঁছালেও আর কিছুক্ষণের মাঝেই পৌঁছে যাবে। সাকিন আর বাড়িতে গেল না। সেভাবেই বিদায় নিলো। বাতাসের দাপটের মাঝেও তার চোখ বারবার ভিজে আসছিল। কেউ খুব কাতর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে যাচ্ছিল, “মাঝে মধ্যে একটু ফোন দিও। দেবে তো?”
ফারদিন বাড়ি ফিরল মাগরিবের পর। নূরজাহানের কাছে গেল। তিনি জ্ঞান-অজ্ঞানের মাঝামাঝি পর্যায়ে আছেন। অর্ধচেতন অবস্থায় তাকে কিছু খাওয়ানো গেলেও ফাবিহা কিচ্ছু মুখে নেয়নি। শুনে সে একটা প্লেট নিয়ে ফাবিহার ঘরে চলে গেল। সে চুপ করে বিছানায় বসে আছে। তার পায়ের কাছে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে আছে সিমি।
ফারদিন পাশে বসে বলল, “একটু খেয়ে নে।” প্লেটটা এগিয়ে দিল সে।
ফাবিহা তাকালোই না। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে জানালার দিকে।
ফারদিন নিজেই ভাতে হাত দিলো। একগাদা বড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফাবিহার মুখের সামনে ধরলে সে নিষেধ করল না। হা করতেই কান্নার দল বেরিয়ে এলো হুড়মুড় করে। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল সে। তবে কোনো শব্দ হলো না। ফারদিন ঝাপসা চোখে ভাত মাখিয়ে গেল। অথচ ডিম ভাজি দিয়ে মাখানোর কিছুই নেই।
বুকে চেপে রাখা ডায়েরিটা খুলল ফাবিহা। ফরিদ কোনো একদিন লিখেছিলেন,
“All those days that came and went
little did I know that they were life!”
ফাবিহা আবার জানালা দিয়ে তাকালো। টিকটিকি ঠিক ওখানেই মূর্তির মতো বসে আছে, যেখানে সকাল থেকে ফরিদের খাটিয়া রাখা ছিল।
চলমান~
(গল্পটা দমবন্ধকর জায়গায় আছে! আপনারা কি ঘণ্টা দুইয়ের মধ্যে তিনশর আশপাশে রিয়্যাক্ট করতে পারবেন? তাহলে আমি আরেকটা পর্ব লেখার চেষ্টা করতাম...)
(৩৯. https://www.facebook.com/share/p/1MQN1S1qbJ/)