ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনজোছনা

পর্ব 39

লেখক: বিনতে ফিরোজ

#বনজোছনা
৩৯.

কাঁদতে কাঁদতে ফাবিহার দম বন্ধ হয়ে এলো। তবু শব্দ করল না সে। আজীবনই তার নিঃশব্দ কান্না। এ বেলায় কান্নাটা দমিয়ে রাখতে চাইছে বাবার জন্য। বাবা তাকে খুব ভালো থাকতে বলেছে। নিরবচ্ছিন্ন ভঙ্গিতে চোখ মুছে চলেছে সে। আবার তারা ভিজে যাচ্ছে, আবার সে মুছে দিচ্ছে। এই চক্রে কখন যে রাত গভীর হলো— ফাবিহা টেরই পেলো না!

ফারদিন তার কাছে আর বেশিক্ষণ থাকেনি। বাবা যে আর নেই, এটা এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে বসার ঘরে গেলেই তিনি বিরক্ত ভঙ্গিতে তাকাবেন। ধমকাধমকি করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু ধমক তার কণ্ঠ ফুঁড়ে বের হবে না। কাতর চেহারায় বলবেন, “একটা কাজ করবি না ফারদিন!”

কিন্তু বসার ঘরে দুনিয়ার সব মানুষ আছে, কেবল বাবা নেই। যার জন্য এই জমায়েত, সে ছাড়া সবাই সেখানে আছে। যখনই এ বিষয়টা মর্মে যেয়ে আঘাত করছে— ফারদিন সহ্য করতে পারছে না। তার মাথায় তীক্ষ্ণ এক ধরনের ব্যথা হচ্ছে। ধীর পায়ে ঘরে চলে গেল সে। আজ সকাল থেকে এ ঘরের জানালা বন্ধ। আর কোনোদিন সে জানালা খুললেও আলো ঢুকবে কি না ফারদিন জানে না। সে অন্ধকারের মাঝেই কোথায় যেন মগ্ন হয়ে তাকিয়ে রইলো। বাইরে কোলাহল, অথচ চারদিকে কী নিঃসীম নিস্তব্ধতা!

আস্তে আস্তে শব্দের যানজট কমে গেলো। ফুরিয়ে এলো মানুষের ভিড়। রাত তখন কয়টা বাজে ফারদিন জানে না। ক্যাচ ক্যাচ করে দরজা খুলে গেল। এক হাত ফাঁক দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বসার ঘরের আলো, ঠিক যেভাবে একসময় ফারদিন ঝাঁপিয়ে পড়ত বাবার বুকে।

“ফারদিন ভাই!”

ফারদিন কেঁপে উঠল। সিমি হাত বাড়িয়ে লাইট জ্বেলে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলো।

চোখ বন্ধ করে ফেলল ফারদিন।

সিমি এগিয়ে এলো। বসার ঘরে কেবল মনিরা আর সাবিহাকে দেখা যাচ্ছে।

ফারদিনের সামনে প্লেট রেখে বলল, “খেয়ে নেন ফারদিন ভাই।”

“নিয়ে যা সিমি।”

“কালকে রাত্রেও তো খান নাই। একটু খান।”

ফারদিন এক দৃষ্টে প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার পুরো শরীর ব্যথা করছে।

সিমি কী মনে করে এক হাত দূরে মেঝেতে বসল। ফারদিন তখনও মাথা ঝুঁকিয়ে বসে আছে।

সিমি চোখ মুছে বলল, “ফারদিন ভাই, কলকে এতবার ডাকলাম। একবার যদি আসতেন!” চোখ মুছল সিমি।

“রাত্রে খালু আমাদের সবাইকে নিয়ে নামাজ পড়ল। আমাদের সবার জন্য দোয়া করেছে। আপনি তো শুনলেন না।”

ফারদিনের গা কাটা দিয়ে উঠল, “আমার জন্যেও দোয়া করেছে?” তার চোখে অবিশ্বাস, কণ্ঠে বিস্ময়।

“জি।” সিমি মাথা নাড়ল।

ফারদিন হঠাৎ করেই উদগ্রীব হয়ে উঠল। যে জীবিত মানুষটার কথা বিরক্ত লাগত, শ্বাস বন্ধ হওয়ার পরই তার কথাগুলো শোনার হরিণ হয়ে গেল। সময়ের কি প্রহসন! হায়াতটা ফুরালেই দামটা ধুম করে বেড়ে যায়!

“কী বলেছে?”

সিমি এক পলক ফারদিনের দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করল। মনিরা দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন। সিমি ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,

“ছেলেটার মন পেলাম না মাবুদ! আমার ব্যর্থতা! ওকে তুমি সঠিক পথের দিশা দিও। নিজের পথ যেন নিজে চিনে নিতে পারে।”

ঠিক ফরিদের মতো করেই বলল সিমি। তবে তার কণ্ঠে আর্জি ছিল, সিমির কণ্ঠে আফসোস। তার সাথে কান্নার সুর মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।

ফারদিন যন্ত্রের মতো বলল, “আবার বল!”

আবার বলল সিমি। আবার…আবার…

একসময় ফারদিনের বদ্ধ মস্তিষ্কে বিস্ফোরণ হলো। সারা বাড়ি যখন থিতিয়ে এসেছে, তখন তার আহাজারিতে কুন্দকলি ফের মৃত্যুপুরীতে পরিণত হলো।

অর্ধচেতন নূরজাহান টলমলে পায়ে দৌড়ে এলেন। ফাবিহা দরজায় এসে থেমে গেলো। ঢুকতে পারল না। মায়ের বুকে আছড়ে পড়ে সমস্ত দিন পর ফারদিন অনুভব করল সে প্রকৃতপক্ষেই এতিম হয়ে গেছে।

—

সাকিন ছুটে এলেও শান্তি পেলো না। গেছে দেরি করে। বাড়ির ভেতরে ঢুকতে পারেনি। বাইরে থেকে জানাজা পড়ে, ফরিদের চেহারাটা দেখেই বিদায় নিতে হয়েছে। ভেতর বাড়ির কী অবস্থা— এটা জিজ্ঞেস করার সুযোগটুকু পায়নি। জুবায়ের যদিও ফোন দেয়নি কিন্তু সে তো জানে আজ কলেজে তার কতখানি দরকার।

পৌঁছে দেখল জুবায়ের তাদের আগে খেতে বসিয়ে দিয়েছে। ছয় জনের টিমের আসতেও বেশ খানিকটা দেরি হওয়ায় সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে সে। সাকিনকে ফিসফিস করে বলল, “আপনি যে ছিলেন না এটা বলতে হবে না। আমি দেখছি কী করা যায়!”

“একজন মারা গেছে এটা বললেও..?”

“মারা যাওয়ার কাহিনী আপনি আমি জানি। তাদের জানালে আগে ভাববে দায়িত্বজ্ঞানহীন। শুধু শুধু কী দরকার? তারচেয়ে কিছু বলার দরকার নেই।”

সাকিন নিজে থেকে কিছুই বলল না। জুবায়েরই তাকে পরিচয় করিয়ে দিলো। অডিট ভালো হলো, সাথে মিটিংও। অনুদান যে তারা পাবে এটা মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেলেও শান্তি পেলো না সে। বুকের ভেতর একটা গুমোট অস্থিরতা দাপাদাপি করছে। ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করছে কুন্দকলি। অথচ সেখানেও তার করার মতো কিছু নেই।

তার সামর্থ্য বরাবরই খুব কম। সেই কম সামর্থ্যের মাঝেই সাকিন কয়েকটা কাজ করল।

ফরিদের পক্ষ থেকে হাজার খানেক টাকা মসজিদের বক্সে দিলো। ছাত্রদের নিয়ে রাস্তার ধারে কিছু ফল গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। সে ফান্ডে কিছু দিলো। মক্তবে কিছু কুরআন কেনার কথা চলছিল, সেখানেও কিছু টাকা দিলো। মনে মনে বলল,

“মাবুদ, তোমার রাস্তায় দান করার মতো কিছু থাকলে অবশ্যই তিনি তা করতেন। তিনি আমাকে অকারণেই ভালোবেসেছেন। সেই ভালোবাসার মর্যাদা আমি রাখতে পারিনি। তুমি এই ক্ষুদ্র দানটুকু আমার পক্ষ থেকে তার জন্য কবুল করে নাও।”

সে রাতে পুরোটা সময় সাকিন জানালার ধারে জেগে বসে রইলো। থেকে থেকে শেয়াল ডেকে উঠল, সমান তালে ডাকল কুকুর। রাতজাগা পাখিরা প্রহর ঘোষণা করল দায়িত্ব মেনে। সাকিন অপলক উঠান দেখে গেলো। ঘুটঘুটে অন্ধকার। তবুও সে দেখতে পাচ্ছিল ফরিদ উবু হয়ে বসে টিকটিকিকে খাবার খাওয়াচ্ছেন। পাশেই ভুরু কুচকে দাঁড়িয়ে আছে সিমি। মুখ লটকে সে বলছে, “বেয়াদ্দব একটা টিকটিকি! এটাকে এত যত্ন করার কী আছে খালু?”

—

জন্মের পর বাবাকে ছাড়া এই প্রথম একটা দিন। ফাবিহা দিন শুরু করতে চাইছিল না। কিন্তু সূর্য থোড়াই তার অনুমতির আশা করে! ঠিক ঠিক ভোর হলো, সকাল নামল, দুপুর গড়াল উঠানের ঘাসে। কেবল নূরজাহান ধাতস্থ হতে পারলেন না।

ফাবিহা তো কোনোদিন ভাবেনি, একটা সকাল সূর্য ছাড়া হতে পারে। ঠিক সেভাবে, কোনোদিন এটাও ভাবেনি, বাবা ছাড়াও একটা পৃথিবী হতে পারে!
কিন্তু হচ্ছে। দখিনা বাতাস বইছে, পাখিরা উড়ে এসে ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে কিচিরমিচির করছে, আকাশে মেঘের মিছিল চলছে থেমে থেমে। সব আছে, সব হচ্ছে। কেবল বাবা নেই, কোথাও নেই!

মনিরা ভীত কণ্ঠে ফাবিহাকে বললেন, “তোর মা তো পাগল হয়ে যাবে রে! কী করবি?”

“কী করব?” অবুঝ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ফাবিহা। এটা তো তাকে কোনোদিন ভাবতে হয়নি!

“ কয়েকদিনের জন্য অন্য কোথাও যেতে পারলে ভালো হতো।”

“কিন্তু আমার তো পরের মাস থেকে ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা।”

“তোর মা-কে নাহয় আমার সাথে দিয়ে দে!”

“আম্মুকে বলে দেখো।”

নূরজাহানের কাছে এ কথা পাড়তেই তিনি আঁতকে উঠলেন। ননদের হাত ধরে বললেন, “তোমার ভাই নাই, তার ছেলে-মেয়ে তো আছে! ওদের থেকে আমাকে দূরে নিও না!” তার কণ্ঠ ভেঙে গেছে। কথা বলতে গেলে কেবল ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ বের হয়। চোখ দুটো এক দিনেই গর্তে ঢুকে গেছে। তার শিরা উপশিরা লাল হয়ে ওখানে যেন রক্তনদী বানানোর পরিকল্পনা করছে। নিজেকে নূরজাহানের জায়গায় রাখতেই শিউরে উঠলেন মনিরা।

“ছেলে-মেয়ে তো আছেই! আমার সাথে কয়টা দিন থাকেন! এভাবে তো অসুস্থ হয়ে যাবেন!”

“না! না! আমি এখানেই থাকব! এখানেই থাকব!”

ফাবিহা নিজেও মায়ের অপ্রকৃতস্থ আচরণ বুঝতে পারছিল। কাছে গেলেই বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদেন। কাছে আছে বলেই তো কাঁদতে পারেন, দূরে গেলে অবলম্বন কে হবে?

সব ভেবে-চিন্তে ফাবিহা বলল, “আপাতত আম্মু থাক। অবস্থা বেশি খারাপ হলে তখন দেখা যাবে।”

মনিরার নিজের সংসার আছে। তিনিও বেশিদিন থাকতে পারলেন না। যাওয়ার আগে ফাবিহার হাত ধরে কেবল বলে গেলেন, “নিজের যত্ন নিস মা! তুই হারিয়ে গেলে আমার ভাইয়ের আর কী থাকবে?”

ধীরে ধীরে কুন্দকলি ফাঁকা হয়ে গেল। নিচ তলায় রইলো কেবল চারটে দুর্বল প্রাণ।

বাস্তবতা ফাবিহাকেই আগে ধাক্কা দিলো। কয়েকদিন খাবার-দাবার নিয়ে একেবারেই চিন্তা করেনি। সাবিহাই সম্ভবত প্রতিদিন খাবার দিয়ে গেছে। আশেপাশের দু-একজন প্রতিবেশীও দিয়েছে। এ বেলায় নিজের পেটের হিসাব নিজেকেই করতে হবে।

ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকে ডেলিভারি ডিলে হওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়ে পোস্ট দিলো। তারপরই অর্ডারের কাজ করতে শুরু করল। কিন্তু সমস্যা হলো কাগজগুলো অক্ষত থাকছে না। সেলাই করতে বসলেই চোখের পানিতে ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। চোখ মুছেও কোনো লাভ হচ্ছে না। ফাবিহা হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে থাকে অস্ফুট কণ্ঠে বলে, “বাবা! ও বাবা!”

একদিন সকালে ক্লাসে যাওয়ার সময় ফাবিহা দেখল ফারদিন তার ঘরের সামনে ঘোরাঘুরি করছে। চুল দাড়ি বড় হয়ে একেবারে এলোমেলো অবস্থা। চোখ দুটো কালো হয়ে গেছে। সে বেরিয়ে এসে বলল, “কিছু বলবি?”

ফারদিন মাথা নিচু করল, “হু।”

“ভেতরে আয়।”

ফারদিন বিছানায় বসে উশখুশ করতে থাকল। ফাবিহা তাকে তাড়া না দিয়ে নিজের কাজ গোছালো।

ফারদিন বলল, “একটা কাপড়ের দোকানে ঢুকেছি।”

ফাবিহার হাত থেমে গেল। কী আফসোস!
তার ভেতর থেকে কেউ চিৎকার করে বলল, “কাজটা এক মাস আগে শুরু করতে পারলি না কেন? বাবার মরার অপেক্ষা করছিলি?”

ফাবিহা সে কথা মুখেও আনল না।

শান্ত কণ্ঠে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ্! ভালো করেছিস।”

ফারদিন উঠে চলে গেল। দরজায় ফিরে এসে নিচু কণ্ঠে বলল, “তুই..বেশি চিন্তা করিস না। আম্মুকে একটু বলিস।”

সে চলে গেলে নিজের মনেই ফাবিহা বলল, “নিজের মাথাটা নিজেই নিচু করলি ভাইয়া!”

এর মাঝে সেই বুক রিভিউয়ার ফাবিহাকে নক দিলো। সে যারপরনাই অবাক হলো এটা ভেবে যে লোকটা তাকে কীভাবে খুঁজে বের করেছে!

ছেলেটা সরাসরিই বলল,

“আমি জানতে পেরেছি লেখক ফরিদ আহমেদ অতি সম্প্রতি ইন্তেকাল করেছেন। তার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। আপনি হয়তো শুনে থাকবেন ‘নওরোজ’ নিয়ে একটা মোকদ্দমা চলছে। আপনারা কেউ একজন যদি অফিসিয়ালি এগিয়ে আসেন, তবে বিষয়টার সুরাহা হবে।”

ফাবিহা বহুক্ষণ ধরে ‘লেখক ফরিদ আহমেদ’ লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইলো। সবই হলো, যার জন্য হলো, সে-ই রইলো না!

বাবার উত্তরটাই দিলো সে।

“আমরা এসব নিয়ে ঝামেলা করতে চাচ্ছি না।”

“আপু! এটা ঝামেলা হবে কেন! আপনার বাবার অধিকার আপনি বুঝে নেবেন না? লেখক হিসেবে তিনি ডিপ্রেসড হয়ে ওরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু তাই বলে আরেকজনের নামে সেটা চালাতে দেবেন? আপনারা জাস্ট একটা মা-ম-লা করলেই কিন্তু সবটা সর্ট-আউট হয়ে যায়! পুরো দেশ এই বিষয়ে জানে!”

ফাবিহার মনে পড়ল বাবার শেষ কথাটা। মান-সম্মানের চিন্তায় অন্ধ হয়ে যাস না! আমাদের দোষেই রিজিক নষ্ট হয়!

সে খোলাখুলি বলল, “কেস চালানোর মতো যথেষ্ট অ্যাবিলিটি আমাদের নেই। আশা করি বিষয়টা বুঝতে পারছেন ভাইয়া।”

ছেলেটা তৎক্ষণাৎ রিপ্লাই দিলো।
“এসব নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না আপু! ফিস একটা আছে। তবে সেগুলো নিয়ে প্যারা নেই। আপনি জাস্ট এগিয়ে আসুন।”

কৌতুহল দমাতে না পেরে ফাবিহা বলেই ফেলল, “আপনি এত আগ্রহী কেন, জানতে পারি?”

অনেকক্ষণ পর এই মেসেজের রিপ্লাই এলো।

“নওরোজ-এ লেখক যে জীবনদর্শনের সন্ধান আমাকে দিয়েছেন, তার জন্য আমি আজীবন তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। সেই কৃতজ্ঞতার জায়গা থেকে যদি তাঁর জন্য আমি খুব ক্ষুদ্র কিছুও করার সুযোগ পাই— সেটা কক্ষনো হাতছাড়া করব না! আর এটা তো তার অধিকারের প্রশ্ন! এখানে আমার স্কোপ আছে, লড়াই করার সুযোগ আছে। বিষয়টা অবহেলায় ছেড়ে দেব এটা অসম্ভব! আপনাকে খুঁজে পেতে দেরি হলো বলেই এতদিন বসে ছিলাম। নয়তো আরও আগেই…”

ফাবিহা পরে জানতে পেরেছে ছেলেটার বাবা আইনজীবী। ছেলের আবদারে তিনিই ফরিদের পক্ষ থেকে লড়বেন। টাকার বিষয়ে জানালে একেবারে নামমাত্র কিছু নিলেন তিনি। ফাবিহা বুঝতেই পারছিল তার মুখ রক্ষা করা হলো। সে-ও আগ বাড়িয়ে আর সাধতে গেল না। ভেতরে সেই স্পৃহাটা আর কেন জানি কাজ করে না।

তার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার পুরোটা সময় জুড়ে এই মোকদ্দমার জন্য লড়তে হলো। লি প্রকাশনী আর কোনো প্যাঁচেই যায়নি। সরাসরি দোষ স্বীকার করে নেয়ায় ঝামেলা অর্ধেক কমে গেছে। ইমেজ যা নষ্ট হয়েছে সেটা কিছু ফেরত পাবার আশাতেই রায় হওয়ার আগেই ফাবিহার হাতে পুরো এক লাখ টাকা তুলে দিয়েছে। বাকিটা রায় হবার পর দেবে বলে ফেইসবুক পোস্টে জানিয়েছে। ফাবিহার কাছে এও শুনে নিয়েছে ‘নওরোজ’-এর সত্ত্ব কার নামে হবে। দুবার না ভেবেই সে বলে দিয়েছে, “আমার আম্মু, নূরজাহান বেগমের নামে।”

থিওরি পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই কলেজ থেকে এককালীন বেশ কিছু টাকা দেয়া হলো। যে কলেজের বেতনই অনিয়মিত ছিল সেখানে এককালীন টাকা আশা করা অবাস্তব। কিন্তু সে অবাস্তব যখন আকৃতি নিয়ে চোখের সামনে দাঁড়ায় তখন তাকে আর অস্বীকার করার উপায় থাকে না। ফাবিহাও করতে পারেনি। সমস্ত টাকাই মায়ের হাতে তুলে দিয়েছে। অথচ নূরজাহান তখন ক্রমেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন। দিনের বেশিরভাগ সময় চুপ করে থাকেন। যেটুকু কথা বলেন তাও অসংলগ্ন।

ফাবিহা একদিন অসহায় ভঙ্গিতে সাবিহার কাছে বলল, “কী করব আপা? আম্মুকে ভালো রাখব কীভাবে?”

সাবিহা শুকনো মুখে বলল, “ডাক্তারের কথা শোনাই উচিত হবে।” সে নিজেও জানে ডাক্তার বলছে জরুরি ভিত্তিতে হাওয়া বদলাতে। স্মৃতি আঁকড়ে ধরে থাকার বাহানায় তিনি স্মৃতির চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছেন। তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা না নিলে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব থাকতে পারে।

“চলে যাব?” ফাবিহার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে এল।

সাবিহা তাকে জাপটে ধরে কেঁদে ফেলল। অস্পষ্ট কণ্ঠে বলল, “যে আছে তাকে জান দিয়ে আগলে রাখো ফাবিহা। আল্লাহ চায় তো আমরা আবার এক হবো!”

সিদ্ধান্ত নিতে টানা এক সপ্তাহ সময় ব্যয় করল ফাবিহা। দিন-রাত এক করে ভাবল। ফারদিনের কাছে জিজ্ঞেস করতে গেলে সে এক কথায় বলল, “তুই যা বলবি তাই করব।”

এই ভরসা ফাবিহার কাঁধের ভার আরও বাড়িয়ে দিলো। ফুপুর সাথে পরামর্শ করল সে। বোর্ড ভাইভার পর সিদ্ধান্ত নিলো, এ শহরের পাঠ এবার চুকিয়ে ফেলতে হবে।

জিনিসপত্র টানা-হেঁচড়া করার মতো অবস্থা ছিল না। তারা আপাতত ভাড়ায় উঠবে ফুপুর বাড়ির পাশেই। সেখানে অবস্থা কেমন কে জানে! যে কটা ফার্নিচার পারল ফাবিহা বিক্রি করে দিল। নূরজাহানের এসব নিয়ে কোনো বিকার নেই। তিনি আছেন নিজের কাল্পনিক জগতে।

চলে যাওয়ার সময় আরেকটা বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল।

ঝাঁকে ঝাঁকে শিক্ষার্থী এসে বেতন দিয়ে গেল। তাদের বেশিরভাগ মুখই ফাবিহার অচেনা। সবাই জানালো— ফরিদ স্যার তাদের দূর্বল আর্থিক অবস্থার কথা শুনে বেতনে ছাড় দিয়েছিলেন। অনেকে আবার গড়িমসি করে, দেব-দিচ্ছি করে দেয়নি। যাবার কালে তারা কোচড় ভরে দিয়ে গেল।

ফাবিহার কানের কাছে কেউ গুনগুনিয়ে বলে গেল— “এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট…”

তার মনে হলো, তাদের পরিবারটা বোধহয় কাহাফের সেই এতিম দুই বালকের এক বিংশ শতাব্দীর রূপ! সৎকর্মশীল পিতার পরলোকগমনে তাঁরা চর্মচক্ষুতে এতিম হয়েছিল ঠিক। কিন্তু মাথার ওপরে রহমতের মেঘ ঠিক ছিল উপযুক্ত হওয়া অবধি। কোন সে সুদূর থেকে খিজির আলাইহিস সালাম এসে তাঁদের দেয়াল ঠিক করে দিলেন! বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে তাঁরা তাঁদের মালামাল ঠিক ঠিক পেয়ে গেল!

কবে কোন ছাত্রের বেতন মওকুফ করেছিলেন ফরিদ! তিনি কী ভেবেছিলেন সেই একটি ছাত্র থেকে এমন ঝাঁক বেঁধে ছাত্রের দল এসে তাঁদের কোচড় ভরিয়ে দেবে?

জীবন কাদের কোথায় দাঁড় করায়— কেউ কি তা বলতে পারে?
যে নদীর মোহনা ভেঙে ঘর ভেসে গেছে, সে নদীর পলিতেই যে জীবনের বীজ লুকিয়ে আছে— তা ক’জনই বা বিশ্বাস করে!

রফিক, হীরা হাতে হাতে ফাবিহাদের গুছিয়ে দিল। সাবিহা চাইলেও গুছিয়ে দিতে পারল না। যতবার তার মনে হচ্ছে এরা সবাই এখান থেকে চলে যাচ্ছে— ততবার তার কলিজা ছিঁড়ে আসতে চাইছে। সিমিটাকে খুব অনুরোধ করেছিল থাকার জন্য। সে কোনোভাবেই রাজি হলো না। বাড়িটা আবার ভূতের বাড়ি হয়ে যাবে ভাবতেই তার বুক ভেঙে কান্না আসে। কেবল মনে হয়, ওদের জোর করে রেখে দিক। কিন্তু হায়! সে উপায় কই!

টিকটিকিকে নেয়ার খুব চেষ্টা করেছিল সিমি। সে কোনোভাবেই উঠান ছেড়ে নড়ল না। বেশিরভাগ সময় সে বাইরে থাকে। বাড়িতে ঢুকলে বসে থাকে খাটিয়া রাখার সেই জায়গাটায়।

অবশেষে অসংখ্য স্মৃতির জাল ছিন্ন করে ফাবিহা ট্রেনে উঠল। রাতের স্টেশনে আধারের পর্দায় দূরে সাবিহাকে দেখা যাচ্ছে। সে তাকাতেই রিফাত চমৎকার হেসে হাত নাড়ল।। উঁচু কণ্ঠে বলল, “তা তা!”

ফাবিহা খুব কষ্টে হাত নাড়ল। হুইসেল বাজতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। জানালার পাশে বসে ফাবিহার মনে হলো বাবাকে রেখে বহু দূরে চলে যাচ্ছে সে! বহু দূরে!

চলমান~

(দেরি হয়ে গেছে বলে ভেবেছিলাম একেবারে কালকেই দেব, কিন্তু অনেকেই অপেক্ষা করছেন দেখে দিয়ে দিলাম! রেসপন্স কইরেন প্লিজ!)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 39 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন