#বনজোছনা
৪০.
ঝিক ঝিক শব্দ করে ট্রেন এগিয়ে চলেছে। মৃদু গতির দুলুনি দুলিয়ে যাচ্ছে নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে। সে দুলুনির তোপে ট্রেনের অর্ধেক যাত্রী ইতোমধ্যেই ঘুমিয়ে সার। জেগে আছে কেবল কয়েকটা লাইট।
আন্তঃনগর ট্রেনের পরপর দু-জোড়া সিটে তারা বসেছে। সামনের সিটে জানালায় হেলান দিয়ে আছেন নূরজাহান, তার পাশেই ফারদিন। তাদের পেছনে ফাবিহা আর সিমি। সিমিকে ফাবিহা জিজ্ঞেস করেছিল ও জানালার পাশে বসতে চায় কি না। সে এক বাক্যে নিষেধ করে দিয়েছে। রাতের অন্ধকারে বাইরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। থেকে থেকে শত হাত দূরে ঘরগুলোর বাতি জোনাকির আলোর মতো মিটমিট করে জ্বলছে। ট্রেনের ঝিক ঝিক শব্দ ছাড়া আর কোনো কোলাহল নেই। মাঝে মাঝে কেবল কিছু ফিসফিস কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে।
ফাবিহার বন্ধ চোখের পাতা থেকেই জল গড়িয়ে পড়ল।
“সিমি?” আস্তে করে ডাকল সে। খুব চেষ্টা করল যেন তার কণ্ঠের আর্দ্রতা সিমি টের না পায়।
সিমি বিড়াল ছানার মতো তার গায়ের সাথে লেপ্টে বসল।
ফাবিহা বলল, “ঘুমাচ্ছিস না কেন?”
“কেমন একটা শব্দ। ঘুম আসে না তো ছোট আপা!”
“তোর কি মন খারাপ?”
সিমি চুপ করে রইলো।
“থেকে যেতে বললাম…”
“রিফাতের জন্য বুকটা খালি খালি লাগছে ছোট আপা। সাবিহা আপা, হীরা খালুর কথাও মনে হচ্ছে। আর…ওই বেয়াদ্দব বিড়ালটা! নিয়ে আসতে চাইলাম, কেমন করে থেকে গেল!”
ফাবিহা ক্ষীণ হাসল, “তুই যেমন করে থাকতে চাইলি না, ও তেমন করেই থেকে গেল।”
সিমি উত্তর দিলো না।
“কই থেকে কই ভেসে বেড়াচ্ছি সিমি! আমাদের সাথে এমন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঝাপ দিচ্ছিস কেন? সাবিহা আপা ভালো মানুষ। সে তো তোর যত্ন করত।”
সিমির কোনো আওয়াজ পাওয়া গেলো না। খানিক পর তার ঝাপসা হেঁচকি আর নাক টানার শব্দ পেয়ে হুশ ফিরল ফাবিহার। ভালোবাসাকে বারংবার প্রশ্নবিদ্ধ করা অনুচিত। তাতে নিজের মনের হীনম্মন্যতা যেমন প্রকট হয় তেমনি বিপরীতের মানুষটাকে অবিশ্বাসের জালে ঠেলে দেয়া হয়। তাদের এমন কথার মাধ্যমে সিমিকে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে সে এখানে অনাহুত। তার বা ফারদিনের ক্ষেত্রে যেখানে এই প্রশ্ন উঠছে না— তারা যাবে নাকি থাকবে। কিন্তু সিমির গলায় সে জিজ্ঞাসাবাদ চিহ্ন বারবার ঝুলিয়ে দেয়া হচ্ছে। বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে তার জায়গাটা।
ফাবিহা হাত বাড়িয়ে সিমিকে নিজের দিকে টেনে আনল। সে তো টিকটিকিকে কোনোদিন কোলে নেয়নি। জানে না কেমন লাগে। সিমিকে সে জড়িয়ে নিলো নিজের খুব পুরোনো একটা পুতুলের মতো।
“সরি সোনা!” ফিসফিস করে বলল ফাবিহা।
সিমি ফুঁপিয়ে উঠল। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফাবিহা বলল, “বুকের ভেতর কেমন যে লাগছে সিমি! মনটা চাচ্ছে দৌড়ে বাবার কাছে চলে যাই! অথচ একজনের কবরের পাশে যেয়ে আরেকজনের কবরের বন্দোবস্ত করার অধিকার আমার নেই! আম্মুকে একটু যত্ন করিস সিমি! আমার নিজেকে কেমন এলোমেলো লাগে। মনে হয় একটা দীর্ঘ রচনা লিখতে বসেছিলাম, সূচনা শেষ না হতেই উপসংহার শেষ হয়ে গেল। আর কিছু বলার নেই! আর কিচ্ছু লেখার নেই!”
সিমি টের পেলো তার মাথার পাতলা ওড়নাটা ভিজে যাচ্ছে। ভিজে যাচ্ছে এমন এক বর্ষণে যার মরশুম ফুরিয়েছে, মেঘ বিদায় নিয়েছে, রয়ে গেছে কেবল জলটুকুন। কবে রোদ উঠবে! কবেই বা তারা শুকাবে!
সামনের সিট থেকে ফারদিন সবটাই শুনল। অন্ধকার তো শব্দদের আটকাতে পারে না!
সেদিন ফরিদ আহমেদ তাকে বলেছিলেন— আমি মরে গেলে তুই কী করবি!
সে উত্তর দিয়েছিল— তখন দেখা যাবে।
অথচ ফারদিন এখন চেষ্টা করেও কিচ্ছু দেখতে পারছে না। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। হন্যে হয়ে খুঁজেও নিজের ছায়াটা পেলো না সে।
তারা স্টেশনে নামল তিনটে নাগাদ। দশটার ট্রেনে উঠে এত দেরি হবার কথা ছিল না। কিন্তু মাঝে দু-দুটো ক্রসিং হওয়ায় রাতের দ্বিপ্রহর হয়ে গেল। তবু ভালো, মালামালগুলো আগেই পিকাপে করে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ওদের সাথে একজন যাবার দরকার হলেও সেই একজন বলে কেউ ছিল না। রফিকের বিশ্বস্ত লোক, তাদের উপর নির্ভর করেই জিনিসগুলো ছেড়ে দেয়া হলো। সেই তারা এগারোটার সময়ই নাকি পৌঁছে গেছে।
স্টেশনে নামতেই ফুপাকে দেখা গেল। এক জীবনে খুব দাপুটে ছিলেন। তার সামনে দুটো কথা বলা যেত না। এজন্যই কি না কে জানে, ফরিদ বোনের বাড়িতে খুব একটা যেতেন না। তিনি নিজে নিরীহ মানুষ। তাই বলে কারো খবরদারি পছন্দ করবেন, তেমন ছিলেন না।
সেই ফুপা স্ট্রোক করে একেবারে নিরীহ লোকটি হয়ে গেছেন। কথা বললে কান পেঁতে শুনতে হয়। চোখের ভাষায় কেমন একটা ভীত ভাব। কীসের প্রতি ভীত? মৃত্যুর প্রতি?
ফুপা গাড়ি ঠিক করেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারা নামতেই সকলে ভ্যানে উঠে পড়ল। এদিকে অটো রিকশার চল না থাকলেও রিকশা আছে। তবে পাঁচটা মানুষের জন্য ভ্যানই সুবিধার।
এবড়ো-থেবড়ো মাটির রাস্তা ভেঙে পৌঁছুতে প্রায় আধা ঘণ্টা লাগল। অন্ধকারে খুব পরিষ্কার না দেখলেও বোঝা গেলো এ অঞ্চলে বিস্তৃত মাঠ জমিনের বুকে খণ্ড খণ্ড নকশি কাঁথা তৈরি করেছে। কোনো মাঠ থেকে ভেসে আসছে সরিষা ফুলের ঘ্রাণ, কোনো মাঠের ঝোপ ইশারা দিচ্ছে পাট চাষের দিকে। ফরিদ থাকলে নিশ্চয়ই বলে ফেলতেন, “দারুণ একটা প্লট মাথায় এসেছে!”
নূরজাহান কাঁদতে চাইলেন না। কিন্তু চোখ কারো শাসন-বারণের ঊর্ধ্বে চলে গেছে। তিনি জানেন ছেলেমেয়ে দুটো তার জন্যে দেশান্তরী হচ্ছে। তিনি বুঝতে পারেন। তবে সবসময় সেই বুঝটা ধরে রাখতে পারেন না। মাঝে মাঝেই মাথায় কেমন জট পাকিয়ে যায়। মনে হয়, ফারদিনের বাবা শাক খেতে চেয়েছিল। তিনি ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে রাখলেন। শাকের গন্ধ শুনলেই যার পেটে অম্বল হয় সে কীভাবে এসব খাওয়ার সাধ করে?
মনে হতেই নূরজাহান অস্থির হয়ে পড়েন। মনে হয়, এই এক্ষুণি শাক রান্না না করলে তিনি মরেই যাবেন। মনে হয়, ফারদিনের বাবার খদ্দরের পাঞ্জাবিটা ধুয়ে ইস্ত্রি করা হয়নি, সাদা শার্টে কোত্থেকে ময়লা ভরিয়ে এনেছে— সেটা ধুয়ে নীল দিতে হবে, লিখতে যেয়ে সেদিন কলমের নিপ ভেঙে কালিতে মাখামাখি হয়ে বসে ছিল— সেই টেবিল ক্লথ, স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গিটা ধুতে হবে। কতকিছুই না মনে হয়! তিনি তো এসবের কিছুই করেন না! কেবল রাত হলে হাফ লিটারের পানির বোতলটা ভরে মাথার কাছে রাখেন। ওদের বাবার ঘুমের মধ্যে এত্ত কাশি হয়! কাশতে কাশতে চোখ-মুখ লাল হয়ে যায়। হাতের কাছে পানি না রাখলে চলে? পানি খুঁজতে খুঁজতেই তো লোকটার দম আটকে যাবে! ওরা সেসব শুনতে চায় না। কেবল অদ্ভুত চোখে ভরা পানির বোতলটা দেখে আর দেখে নূরজাহানকে। তারা তো জানে না, পানির বোতলটা যতদিন তিনি ভরতে পারবেন ততদিনই তিনি বাঁচবেন। বোতল ফেলে দেয়ার সাথে সাথেই তার জীবন সায়াহ্নের সূর্য ঢলে পড়বে অস্তাচলে।
সে রাতে নতুন বাড়ি গোছানোর মতো পরিবেশ বা সময় কোনোটাই ছিল না। মনিরা খুব সাধাসাধি করলেও একজনও কিচ্ছু খেলো না। হাতমুখ ধুয়েই তারা শুয়ে পড়ল। ফারদিন থাকল তার ফুপাতো ভাইয়ের সাথে। আরেক ঘরে ঘুমালো বাকি তিনজন। নূরজাহানকে মাঝে রেখে দুপাশ থেকে ফাবিহা আর সিমি তাকে জড়িয়ে রইলো। যেন সযতনে পাহারা দিচ্ছে কারো রেখে যাওয়া আমানত।
দুজন ঘুমিয়ে গেলে নূরজাহান সন্তর্পণে উঠে হাফ লিটারের এক বোতল পানি এনে মাথার কাছে রাখলেন। ফাবিহা সব টের পেলো। বাঁধা দিলো না। নাকি দিতে পারল না?
*****
দেড় বছর হতে আরও কয়েক মাস বাকি আছে। সাকিন ভেবেছিল নিজের বাড়িতে বোধহয় খুব শীঘ্রই ওঠা হচ্ছে না। তবে তার ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে ঠিক ঠিক একটা ঠিকানা জোগাড় হয়ে গেল।
উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে তার এক ছাত্র শহরে চলে যাচ্ছে। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। কাজেই তাকে একা ছাড়া হলো না। প্রথমে তার বাবা ব্যবসা স্থানান্তর করলেন তারপর পরিবার। সে ছাত্র যাওয়ার আগে তাকে অনুরোধ করে গেল, সে যেন ওই বাড়িতে থাকে।
সাকিন এক বাক্যে নিষেধ করে দিল। ছাত্রদের থেকে কোনো ধরনের সুযোগ সুবিধা নেয়া তার একেবারেই পছন্দ নয়। তাছাড়া এরা দুদিন পর ফিরে এলে তাকে আবার বাক্স-প্যাটরা নিয়ে অন্য জায়গা খুঁজতে হবে। বারবার বালিশ বদলের মতো জায়গা পাল্টানো মুখের কথা নয়। তার ভালোও লাগে না।
কিন্তু ছাত্র এবং তার বাবা-মা কেউই তার কথা শুনল না। ছাত্রের বক্তব্য সে অনার্স করতে যাচ্ছে। খুব শীঘ্রই আসার সম্ভাবনা নেই। আগামীতেও তার শহরে থিতু হওয়ার ইচ্ছে। যদি গ্রামে আসেও, তাদের আরও একটা বাড়ি আছে। নিশ্চিন্তে সেখানে উঠতে পারবে।
তার এত কাকুতি-মিনতির একটা কারণও আছে। একদিন প্রাইভেট পড়াতে পড়াতে ভাবালুতার বশে সাকিন বলে ফেলেছিল তার যে এই বাড়িতে মন টিকছে না। নিজের একটা ঘর কবে হবে এই নিয়েও দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছিল।
সাকিন তবু গড়িমসি করছিল বলে সে বলল, “আপনি নাহয় ভাড়া দিয়েই থাকবেন? যতদিন নিজের বাড়ি না হচ্ছে ততদিন আমাদের ওখানেই থাকুন স্যার। এখানে আর কতদিন থাকবেন! আপনি ভাড়া না নিলেও অন্য কাউকে ভাড়া দেয়া হবে। প্লিজ স্যার!”
এরপর প্রস্তাব নাকচ করার আর কোনো কারণ থাকে না। ফলে তারা চলে যাওয়ার দুদিনের মাথাতেই সাকিন সে বাড়িতে উঠল। উঠানে দাঁড়িয়ে প্রথম ঝলক বাড়িটা দেখেই তার মনে হলো এটা বোধহয় তার স্বপ্নে দেখা সে বাড়ির চাইতেও হাজার গুণে বেশি সুন্দর!
চারপাশে ইটের দেয়াল। সদর দরজা থেকে উঠানের মাঝখানে টালির রাস্তা। বাড়ির ছাদেও টালি বসানো। বারান্দায় দাঁড়ালেই দমকা হাওয়া এসে গায়ে লাগে। কালো মেঝেতে যেন নিজের মুখটা দেখা যায়। বারান্দার পাশেই বিশাল এক সজনে গাছ। তার ছোট্ট ছোট্ট গোল পাতা ঝরে পড়ছে কুচি কুচি কাগজের মতো। ডালে ঝুলন্ত সজনেগুলো দেখে মনে হচ্ছে মতির পর্দা। সকালের ঘুম ভাঙা রোদ গায়ে মেখে তারা রূপচর্চা করছে।
বাড়ির পেছনের আঙিনাটা ছোট। দৈত্যাকার একটা নিম গাছ পুরোটা আঙিনায় রাজ করছে। উত্তুরে বাতাস নিমের পাতায় পরিশুদ্ধ হয়ে যখন বাড়ির টালিতে ধাক্কা দেয়— এক নিমিষেই পুরো বাড়িটা যেন নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
ভেতরে ঘর তিনটে। আসবাবের বেশিরভাগ তারা নিয়ে গেছে। ছোটখাট দুটো টেবিল আর কিছু চেয়ার রয়ে গেছে। নিজের মতো একটা ঘর সাজানোর উদ্দীপনা, একটা শিশুসুলভ অস্থিরতা সাকিনকে পেয়ে বসল। ঘরটা একটু গোছানো হলেই সাবিহাকে নিয়ে আসবে।
সাবিহার কথা মনে পড়তেই তার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হলো। ফাবিহারা সকলেই নাকি তার ফুপু বাড়িতে চলে গেছে। জায়গাটা এই জেলায় হলেও কোন উপজেলা, কোন থানা কিছুই বলতে পারেনি সাবিহা। বড় অদ্ভুত লাগল তার। যে পরিবারের সাথে একই বাড়িতে এতগুলো দিন থেকে এসেছে, যাদের সাথে বিয়ের কথা অবধি হয়েছিল— তারা এমনভাবেই বিচ্ছিন্ন হলো যে ফের মিলিত হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনাই নেই!
আর কেউ না, আর কিছু না। থেমে থেমে কেবল ফরিদ আহমেদের মুখটাই চোখে ভেসে ওঠে। একদৃষ্টে ঝরে পড়া সজনে পাতার দিকে তাকিয়ে থাকে সাকিন। আহ মানুষ! আহা রে মানুষ!
ফোন অন করতেই টুং করে একটা মেসেজ এলো। সাবিহা ফাইল পাঠিয়েছে দেখেই নিশ্বাস ছাড়ল সাকিন। প্রতি মাসে নিয়ম করে একটা বায়োডাটা সে পাঠাবেই। মাঝে মাঝে একটার বেশিও পাঠায়। কিন্তু তারই মন টানে না।
বিয়ে যে করবে না এমন নয়। কিন্তু তাই বলে যাকে তাকে তো আর নয়। সাবিহা বারংবার জিজ্ঞেস করে, “তুই কেমন মেয়ে বিয়ে করতে চাস বল! আমি সেভাবেই খুঁজব। নাহলে বুঝব কীভাবে তুই কী চাচ্ছিস!”
সাকিন নিজেও বলতে পারে না। তবে বায়োডাটা চেক করার সময় নিজের সম্পর্কে বলা অংশটায় তার আগে চোখ যায়। আগে দেখে বিয়ে করার কারণ সম্পর্কে তার বক্তব্য কী। কিন্তু বেশিরভাগই গৎবাঁধা কথা। আজকাল তো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগ। মনের কথা মুখ দিয়ে বলাটাও মানুষের কাছে কষ্টের। সে মুখপাত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে এআইকে। ওটার মুখ যে যা বের হয় সেটা আর অনুভূতি থাকে না, কেবল কয়েকটা শব্দই থেকে যায়। সেসব পড়ে তার মোটেই ইচ্ছে করে না ওই মানুষটার সাথে সরাসরি দেখা করে।
সাবিহা এসব জেনে অসম্ভব বিরক্ত হয়েছিল।
“তোর সমস্যাটা কী বল তো! সন্ন্যাস নিবি? বায়োডাটা পড়েই নিষেধ করে দিচ্ছিস! বায়োডাটা দিয়ে কি মানুষ চেনা যায়?”
“তা যায় না। কিন্তু অনেক কিছুই জানা যায়। তার রুচি, ব্যক্তিত্বের কিছুটা, বুদ্ধি— অনেক কিছুই চাইলে বোঝা যায়।”
“বুঝে তো তুই উল্টে ফেলছিস অসহ্য! তুই নিজের বউ নিজেই খোঁজ! আমি আর পারব না এসব!”
বললেও সে থামে না। না থামতে দেয় তাকে।
আজকের পাঠানো বায়োডাটা খুলতেই হতাশ হলো সে। পুরোটা ইংরেজিতে লেখা। সেটাও সুন্দর হলে হতো। নিচে বিয়ের উপকারিতা নিয়ে ছোটখাট একটা প্যারাগ্রাফ লিখে ফেলেছে। সাকিন বিরক্ত হয়ে ফোন রেখে দিলো। সে আসলে কী খুঁজছে? নিজেকে প্রশ্ন করলেও উত্তর পেল না।
—
ফাবিহাদের বাড়ি মনিরার দুই বাড়ি পেছনেই। গ্রামে তেমন ইন্ডাস্ট্রি না থাকলে বাড়ি ভাড়া হয় না। এই গ্রামেও তার চল নেই। তবে কিছু পরিবার বিদেশ-বিভুঁইয়ে বা দূর শহরে স্থায়ী নিবাস গড়েছে বলে তাদের বাড়িগুলো একরকম ফাঁকাই পড়ে থাকে। ফাবিহাদের বাড়িটাও তেমনই। এর মালিক ঢাকা শহরে থাকে আজ প্রায় চোদ্দ বছর যাবত। তার ভাই বাড়িটা দেখাশোনা করে। সেই ভাইয়ের মাধ্যমেই মনিরা তাদের ভাড়ায় উঠিয়েছেন।
চারপাশ ঘেরা দেয়া এক ফালি উঠানের ছোট্ট বাড়ি। গাছগাছালির বাহার নেই। আশপাশে কিছু মাচা দেখে আন্দাজ করা যায় আগের ভাড়াটে এদিক দিয়ে বেশ শৌখিন ছিল। পুঁইয়ের মাচায় এখনও কিছু পাতা দেখা যাচ্ছে।
দুই রুমের ছোট্ট বাড়ি। বেশি বড় তাদের দরকারও ছিল না। ভাড়া নাকি মোটে তিন হাজার। চার হাজার চেয়েছিল। মনিরা বলে কয়ে এক হাজার কমিয়েছেন।
ফুপার কসমেটিক্সের বিশাল দোকান আছে। ফারদিন আপাতত সেখানে থাকবে বলে ঠিক হলো। ডায়েরির কাজটা চালাতে তাকে যে বেগ পেতে হবে এটা বেশ বুঝল ফাবিহা। কাঁচামাল যা লাগবে সেগুলো এদিকে পাওয়া যায় না। ছুটে ছুটে সদরে যেতে হবে। তাছাড়া কুরিয়ার সার্ভিস এখানে চালু আছে কি না সেটাও একটা প্রশ্ন।
নানান চিন্তায় জর্জরিত হয়ে পড়ল সে। ইনকামের বড় একটা অংশ বন্ধ হয়েছে সেন্টারের কাজ ছাড়ায়। সমান তালে খরচ কমলেও নিশ্চিন্ত হতে পারছে না ফাবিহা।
একদিন ফুপুর সাথে আলোচনায় বসল সে।
“এদিকে কোন ব্যবসা ভালো হয় ফুপু?”
“মানুষ তো চাষবাস করে বেশি। ব্যবসা বলতে ছোটখাট ওই কাঁচাবাজার, কাপড়, কসমেটিক্স এসব।”
ফাবিহা ঠোঁট কামড়ে বলল, “ভ্যান ভাড়ায় খাটালে কেমন লাভ?”
মনিরা অবাক হয়ে বললেন, “এই কথাটা তো আমার মাথায়ই আসে নাই! এখানে তো গাড়ি বলতে ভ্যানই চলে!”
ফাবিহা একটু স্বস্তি পেল।
মনিরা বলে গেলেন, “একটা কিনে তেমন লাভ নেই রে! কয়েকটা কিনতে পারলে ভালো। তখন মাসে একটা ফিক্সড টাকা পাবি।”
ফাবিহা এক মুহূর্ত চিন্তা করল। আপাতত হাতে দুই লাখের কাছাকাছি ক্যাশ আছে। এটা নিয়ে বসে থাকা যাবে না। যদি এগুলো দিয়ে ভ্যান কিনে ফেলতে পারে তাহলে দুটো দিক রক্ষা হবে।
প্রথমত নূরজাহান অর্থ সংকটের চিন্তা থেকে মুক্তি পাবেন। যেহেতু টাকাগুলো বাবার, কাজেই তার উত্তরাধিকার এই মুহূর্তে মা। ভ্যান ভাড়ায় খাটালে তার টাকাটা সম্পূর্ণভাবে নূরজাহানের অধিকারে থাকবে।
ফাবিহার বিশ্বাস আছে ডায়েরির কাজটা দিয়ে নিজের মতো সে চলতে পারবে। কপালে যদি বিয়ে থাকে তবে আজ না হোক, দুদিন পর হলেও আরেক বাড়িতে চলে যেতে হবে। সেখানে থেকে মা-কে কতটুকু দেখে রাখতে পারবে সে জানে না। এই ব্যবস্থাটা হলে সে নিশ্চিন্তে থাকবে। নূরজাহানকেও ছেলেমেয়ের দিকে তাকিয়ে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে হবে না।
ফারদিন কেবলমাত্র চোখ খুলে দুনিয়া দেখছে। কবে সে নিজের মতো করে কিছু একটা করতে পারে সেটাও তো অনিশ্চিত। এত অনিশ্চয়তার মাঝে মা-কে সে ফেলে রাখতে পারে না। তার একান্ত নিজস্ব কিছু থাকা দরকার।
ফুপুকে সে বলল, “দেড় দুই লাখ দিয়ে কতগুলো কেনা যাবে একটু ফুপাকে খোঁজ নিতে বোলো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কিনে ফেলতে চাই। অন্তত আম্মুকে যেন ভাবতে না হয় বাবা নেই বলে সে ভেসে যাচ্ছে।”
মনিরা আপ্লুত চোখে তাকালেন। গাঢ় কণ্ঠে বললেন, “হ্যাঁ রে! তুই মাস্টার্স করবি না?”
“মাস্টার্স করতে হলে শহরে যেয়ে থাকতে হবে। আপাতত আম্মুকে একা ছাড়া রিস্ক।”
“চাকরি-বাকরি নিয়ে কী ভাবছিস?”
ফাবিহা ছোট করে নিশ্বাস ছাড়ল। ফুপু এক কাপ চা দিয়েছিলেন। তার একটুও খেতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু এভাবে খাবারটা নষ্ট করতেও কষ্ট হচ্ছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও চুমুক দিল সে। ঠান্ডা শরবত হয়ে গেছে! ঠিক যেভাবে ফরিদ খেতে পছন্দ করতেন!
“জানি না। আমি খুব ক্লান্ত ফুপু! নিশ্বাস নিতে গেলেও মনে হয় শক্তিতে কম পড়ছে। মন থেকে জোর পাই না। আম্মুর দিকটা নিশ্চিত করতে পারলে এত চিন্তা থাকবে না। আমি একটু বিশ্রাম নিতে চাই!” বলে চোখ বন্ধ করল সে। প্রকৃতপক্ষেই আজকাল খুব অবসন্ন লাগে। ছুটতে ছুটতে মনে হয়— এবার একটু থামা যাক!
মনিরা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“বিয়ে নিয়ে কী ভাবলি?”
ফাবিহা চোখ খুলল, “আম্মুকে ছেড়ে এখনই দূরে যাওয়া ঠিক হবে না।”
“যদি কাছেই থাকতে পারিস?”
ফুপুর জ্বলজ্বলে চেহারার দিকে তাকালো সে।
“এই গ্রামে?”
“হ্যাঁ।”
এক মুহূর্ত চিন্তা করল সে। এই গ্রামে চাষবাস আর ব্যবসা ছাড়া অন্য কী পেশা আছে? তাছাড়া এখানকার মানুষের মানসিকতাই বা কেমন? সে তো কিছুই জানে না।
“আপাতত এই আলাপ থাক ফুপু!”
“থাকবে কেন! তুই বলে রাখ। ছেলে তো আর আসমান থেকে পড়বে না! তোর মা তো তাল হারা হয়ে গেছে। ছেলে আমাকেই খোঁজা লাগবে। বল দেখি! আগেরবার একটা ছেলের খোঁজ দিলাম। তা তোর মা দুই বাচ্চার বাপ দুই বাচ্চার বাপ করে যে তামাশা করল! আরে যমজ বাচ্চা হতে যেয়েই তো বউটা মরে গেল! বাচ্চাও নানীবাড়ির লোকে নিয়ে নিল। এজন্যই তো বলেছিলাম! ছেলে যে তলে তলে শয়তানি করছে তা কি আর আমি জানতাম? বল তোর কেমন ছেলে পছন্দ!”
ফাবিহা হার মানল। নিজের দিকে তাকালে ভুল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না সে। কাজেই উচ্চ পর্যায়ের কাউকে আশা করা বোকামি।
সে কেবল বলল, “মন-মানসিকতা আমার সাথে মিললেই হবে।”
মনিরা মুখ বাঁকিয়ে বললেন, “এমনভাবে বললি যেন কিছুই না! এই যুগে মানসিকতা মেলানোর চাইতে বাঘের চোখ খুলে আনা সহজ। আচ্ছা যাক! আমি যখন তোর বিয়ের দায়িত্ব নিচ্ছি তখন ঘটনা একটা ঘটাবোই!”
ফুপুর চেহারার মিটি মিটি হাসি দেখে অনেক কিছুই ধারণা করতে ইচ্ছে করছিল তার। কিন্তু সবকিছু ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে সে বিদায় নিলো।
সে মাসেই ছয়টা ভ্যান কেনা হলো। ফাবিহা পরিষ্কার জানিয়ে দিল এই ইনকাম কেবলমাত্র নূরজাহানের। তিনি যেভাবে চান সেভাবে খরচ করবেন। তার বা ফারদিনের কোনো এখতিয়ার থাকবে না সেই টাকা ইচ্ছে মতো খরচ করার।
ফারদিন বুঝতে পারছিল ফাবিহা তাকে বিশ্বাস করছে না। করার কথাও না। ভালো ব্যবহার যে করছে সেটুকুই অনেক। এই ব্যবস্থায় সে বরঞ্চ খুশিই হয়েছে। সে নিজে গতর খেটে কাজ করতে পারবে। নূরজাহানের তো সেই বয়স নেই। তিনি নিরাপদে থাকলেই হলো।
এক বিকেলে বারান্দায় বসে ছিল ফাবিহা। চুলগুলো অবহেলায় পিঠে পড়ে আছে। পাতলা হয়ে এমন অবস্থা হয়েছে যে আর খোপাও করা যায় না। নূরজাহান খুব চিন্তা করেন, এই বয়সেই সব চুল পড়ে যাচ্ছে, আর দিন কী হবে!
এই চিন্তাটাও ফাবিহার ভালো লাগে। নূরজাহান আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হচ্ছেন। স্বাভাবিক চিন্তা করতে পারছেন।
ধা করে তার মনে পড়ল বহুদিন আগে দেখা সেই স্বপ্নের কথা। সে দেখেছিল একটা সুস্থ-সবল বক ঝলমলে নদীর পানিতে ডুবে যাচ্ছে। আজ হঠাৎ করেই মনে হলো বকটা বোধহয় বাবা ছিলেন। ঝলমলে মন নিয়ে, সুস্থ-সবল অবস্থাতেই তিনি বিদায় নিলেন। ঠিক ফাবিহার সামনে।
বাড়ির বাইরের রাস্তা দিয়ে একটা আইস্ক্রিমের ভ্যান যাচ্ছে। নারিকেল মালাই, দুধ মালাই কতরকম আইস্ক্রিম যে বিক্রি করে! সেই ভ্যানের পেছনে সবসময় একটা বিশাল মাইক দেখা যায়।
অন্যান্য দিনের মতো আজও সেখানে গান বেজে উঠল।
“বাবা মানে হাজার বিকেল আমার ছেলেবেলা
বাবা মানে রোজ সকালে পুতুল পুতুল খেলা…”
আরও কতক্ষণ যে গানটা চলল! ফাবিহা তন্ময় হয়ে শুনে গেল। চোখের তারায় ভেসে উঠল বাবার হাত ধরে রাস্তা পার হওয়ার দৃশ্য, বাবার কাছে পড়তে বসার চিত্র। একটা আবছা আলোয় সে দেখতে পেলো ফরিদ তাকে খাইয়ে দিচ্ছেন, চারদিকে ভাত ছড়িয়ে পড়ছে।
তার কান্না নদীর ঢেউ ভাঙল ফোনের আওয়াজে। ধাতস্থ হতে হতে ফোন কেটে গেল। আবার রিং বাজল। আননোন একটা নাম্বার।
রিসিভ করতেই অপরিচিত কণ্ঠে কেউ বলল, “হ্যালো?”
“জি। কে বলছেন?”
সে মেয়ে উত্তরের ধারে-কাছে গেল না। উল্টো জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি সজীবের ফিয়ন্সে ফাবিহা?”
চলমান~
(কালকে দুই ঘণ্টার মধ্যে তিনশ রিয়্যাক্ট করে ফেললেন আপনারা! অসংখ্য ধন্যবাদ প্রিয় পাঠক! চলমান থাকা অবস্থায় পাঁচশ রিয়্যাক্ট হবে কি না ভাবছিলাম, আশা করি কালকের পর্বে হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ্ 🥹🧡)