#বনজোছনা
৪১.
ফোনটা সামনে আনল ফাবিহা। মেজাজটা বিগড়ে গেছে। একবার মাটিতে পড়া বিস্কুট তুলে খেয়ে ফেলেছিল। ওটায় কামড় দিতেই দাঁতের নিচে বালি পড়ে যেমন বিচ্ছিরি লেগেছিল— ‘সজীবের ফিয়ন্সে’ সম্বোধন শুনে ঠিক তেমন লাগল।
নাম্বারটা চিনতে পারল না সে। আগে কোনোদিন ফোন যে আসেনি এটা বোঝা যাচ্ছে।
“আপনি কে বলছেন?” উল্টো প্রশ্ন করল ফাবিহা।
“তার আগে আপনার পরিচয় জানাটা দরকার। আপনি কি সজীবের ফিয়ন্সে সেই ফাবিহা?”
“এক্স। ছিলাম, এখন আর নেই।”
মেয়েটা হাঁফ ছাড়ল, “থ্যাংক গড!”
“এবার বলুন, আপনি কে?”
“আমি তার রানিং ফিয়ন্সে।” যেন বেশ একটা কৌতুক শোনালো— ঠিক সেভাবেই বলল।
ফাবিহার কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো, “আমার কাছে কী দরকার?”
“আপনার কাছেই তো আগে দরকার! পসিবল হলে মিট করতাম। কিন্তু আপনি নাকি শহর ছেড়েছেন? আপাতত একটু কথা বলা জরুরি দরকার। আপনি কি ফ্রি আছেন?”
খোঁজ যে ভালোই নিয়েছে এটা বোঝা যাচ্ছে। ফাবিহা বুঝতে পারল না তার কাছে কী দরকার থাকতে পারে।
সে বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল, “বলুন।”
মেয়েটা সম্ভবত তার বিরক্তি বুঝে গেল।
“আপনি মেইবি বিরক্ত হচ্ছেন। কিন্তু আপনার স্টেটমেন্ট আমার খুবই দরকার। জীবন-মরণ প্রশ্ন!” অস্থির ভঙ্গিতে বলল সে।
“কীসের স্টেটমেন্ট?”
“আপনাদের বিয়ে ভাঙার কারণ।”
“সেটা নিশ্চয়ই আপনার উড বি বলেছে।”
“এজন্যই তো শোনা দরকার! এক পক্ষের স্টেটমেন্ট শুনে কনক্লুশনে আসা যায় না।”
“আমি বললেই কি আপনি বিশ্বাস করবেন? আপনার কাছে নিশ্চয়ই আপনার ফিউচার হাজবেন্ড বেশি বিশ্বস্ত! শুধু শুধু পুরোনো কাসুন্দি ঘাটার কী দরকার!”
মেয়েটা এবার গুরুতর ভঙ্গিতে বলল, “বিয়ে ভাঙার পর আপনি সম্ভবত সজীবের আর কোনো খোঁজ নেননি। নিলে জানতে পারতেন গত বছর ওর একজনের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল। সেটা ভেঙেছে একেবারে আসরে, যাকে বলে ছাদনাতলায়। কবুল বলার জাস্ট কয়েক মিনিট আগে মেয়ে পল্টি নিলো! সেই মেয়েটা বিয়ে করে বাইরে চলে গেছে। ওকে কোনোভাবেই রিচ করতে পারলাম না।”
তার নাটুকে ভঙ্গির চমকপ্রদ তথ্যে ফাবিহা দৃশ্যতই অবাক হলো। চটচটে গাল মুছে বলল, “তার খোঁজ রাখার কোনো কারণ আমার নেই। আপনাকে কীভাবে হেল্প করতে পারি বলুন।”
তার কণ্ঠের বিরক্তি মুছে গেছে দেখে মেয়েটা খুশি হলো।
“তারপর আমার জন্য প্রপোজাল আসে। একমাসের মধ্যে বিয়ে করবে, আমি নিজেই সময় চাইলাম। বললেই তো আর বিয়ে হয়ে গেলো না। দু’চারমাস সময় না নিলে তাকে বুঝব কীভাবে! তারপর না মিললে আবার ডিভোর্সের প্যারা! এরচেয়ে বিয়ে একটু দেরিতে করা ফার বেটার!”
ফাবিহার কানে বাজল সজীবের গমগমে কণ্ঠ, “একটা বোঝাপড়ার বিষয় আছে না? এখন কিছুদিন একসাথে থাকলেই না বুঝতে পারব তোমার আমার জমবে কি না। বিয়ের পর ছাড়াছাড়ির চাইতে বিয়ের আগে আংটি খুলে ফেলা বহুত সোজা।” সেই সোজা কাজটাই কেন সজীব আর পছন্দ করছে না?
মেয়েটা বলে গেল, “আপু, ওর ভালোমানুষী দেখে আমার আব্বু আম্মু পটে গেছে। সামনে থেকে ওর তেমন খুঁত বোঝাও যায় না! কিন্তু আমার এক ফ্রেন্ডকে দিয়ে ওর আইডি হ্যাক করিয়েছি। যা দেখেছি…! বলার মতো না!”
ফাবিহা বলল, “এসব শুনতে চাচ্ছি না আপু। আমি কীভাবে হেল্প করতে পারি এটা কাইন্ডলি বলবেন।”
“আপনি শুধু বলবেন আপনাদের বিয়েটা কেন ভেঙেছে। আব্বু আম্মুকে বোঝাতে একটা কারণ দেখানো দরকার। মেসেঞ্জারের প্রমাণ হাতে এক্সট্রা রাখছি। আপনি জলজ্যান্ত মানুষ। আপনার কথার দাম বেশি।”
“কিন্তু আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই আপু!”
“প্রমাণ বের করা আমার দায়িত্ব। আপনি জাস্ট বলুন!”
ফাবিহা আজ আর রাখ-ঢাক রাখল না। মেয়েটা নিজের জীবনের তাগিদে তার কাছে ছুটে এসেছে। ভেতরে জমানো কষ্ট, ঘৃণা আজ দুই বছরের মাথায় প্রকাশ করতে যেয়ে টের পেলো তাতে একটুও ধুলো জমেনি। ঘৃণার আগুন স্রেফ চোখের আড়ালে ছিল, ছাইচাপাও হয়নি। নিজের কণ্ঠ শুনে নিজেই অবাক হলো সে।
মেয়েটা দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “স্কাউন্ড্রেল! আমি জানতাম জানোয়ারটার নিজের দোষেই ওর বিয়ে ভেঙেছে! অথচ নিজেকে মনে করে দুনিয়ার সবচাইতে এলিজিবল ব্যাচেলর! বুয়েটে পড়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে! ওর বুয়েটের অহংকার যদি না ঘুচিয়েছি…! একটা উচিত শিক্ষা ওকে আমি দিয়েই ছাড়ব!”
ফাবিহা চুপ করে শুনে গেল।
“আপু, সজীবের ওই বন্ধুটার নাম বলতে পারবেন?”
বহু চেষ্টা করেও নামটা মনে করতে পারল না ফাবিহা। কিন্তু চেহারাটা চোখের সামনে জ্বলজ্বলে। সম্ভবত কোনোদিনই ভুলতে পারবে না। কাজেই তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে দিল।
মেয়েটা বলল, “আমি সম্ভবত চিনতে পেরেছি। ঘটনা তো একটা ঘটাবোই! ওকে ভদ্রভাবে ফিরিয়ে দিলে আমাকেও আপনার মতো সাফার করিয়ে ছাড়বে। এবার ওর সাফার করার পালা। ম্যানি ম্যানি থ্যাংকস আপু! রাখছি। খুব শীঘ্রই আবার আপনাকে ফোন দিব!”
তার ফোনের আশায় ফাবিহা রইলো না। জীবনের অবসন্নতা শরীরকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করেছে। সে আর চলতেই চায় না। অথচ কাজ করা দরকার, যতটা না টাকার জন্য তার চেয়ে বেশি নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য। কিন্তু মাস শেষে যখন নূরজাহানের হাতে মোটামুটি ভালো পরিমাণ টাকা এলো তখন তার ভেতর থেকে আর কাজ করার স্পৃহা কাজ করল না। এর মাঝে বইয়ের ঝামেলাও চুকে গেলো। সত্ত্ব নূরজাহানের নামে হলো। কথা ছিল প্রতি ছয় মাসে রয়্যালিটি বুঝিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু মাস না পেরোতেই প্রকাশক নিজ গরজে নূরজাহানের কাছে পুরো বিশ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিলেন। বই যতটা না বিক্রি হলো নিজের গুরুত্বে তারচেয়ে বহুগুণে বেশি এই মা-ম-লা-মোকদ্দমার জন্য। ইতিবাচক প্রতিবিম্ব তৈরি হতে লাগে হাজার বছর, অথচ নেতিবাচক কথাটা পাঁচকান হতে মোটেই সময় নেয় না। কথাটা হাড়ে হাড়ে টের পায় ফাবিহা। তাদের পাড়ায় সে খুব একটা পরিচিত মুখ ছিল না। নিভৃতে চলাফেরা করত। আশপাশের দু’ বাড়ির লোকে চিনত। যেই সজীব রটনা রটালো ওমনি যেন মানুষের মনে হলো — এখানে একটা মেয়ে থাকে! চিড়িয়াখানার প্রাণী দেখার মতো ঔৎসুক্য নিয়ে তাকে এক পলক দেখত লোকে। কী লজ্জার দিনই না গেছে!
এই অবসন্নতার মাঝেই ফুপু জোরে-শোরে বিয়ের ধোঁয়া তুললেন।
ফাবিহা হতাশ কণ্ঠে মা-কে বলে, “ফুপুকে থামাও না আম্মু!”
নূরজাহান বেশ অনেকটা ধাতস্থ হয়েছেন। কষ্টটা সয়ে গেছে। কেবল থেকে থেকে বুকের ভেতর কী যেন একটা ভাঙচুর হয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি যে কষ্টটা হয়— আশপাশে তাকালে ফারদিনের বাবাকে দেখতে পান না। কোথাও সে নেই। তার হাতের ছোঁয়া নেই, গায়ের গন্ধ নেই। আগের বাড়িতে এ সব ছিল। আর তাতেই যে তিনি বেশি করে তলিয়ে যাচ্ছিলেন এটাও এখন ঢের বুঝতে পারেন।
মনিরার মুখচোরা ছেলেটা তার জন্য কী মনে করে এক জোড়া কবুতর এনে দিয়েছে। ছেলেটা বেশ বড় হয়েছে। কলেজে বোধহয় পড়ে। কিন্তু এমন লজ্জা পায়! সামনেই আসতে চায় না। সে ছেলের এমন উপহারে নূরজাহান অবাক হয়েছেন বৈ কি!
ও যখন বলেছিল, “কবুতর পোষেন মামী। কবুতর পুষলে মন অনেক ভালো থাকে।” তখন সে কথাটার মর্মার্থ ধরতে পারেননি। কিন্তু কয়েকদিন পর যখন একটা কবুতর ডিম পাড়ল তখন মনে হলো জীবনের সব আনন্দ এখনও ফুরিয়ে যায়নি। ছোট্ট ওই ডিমটা দেখে মনে হয়েছিল কবুতর জোড়ার জন্য একটা ঘর বানানো দরকার। মুখ ফসকে বলতেই ফারদিন কোত্থেকে বিশাল এক ঘর কিনেই নিয়ে এলো। বাইরের রান্নাঘরের পাশেই খুঁটি গেড়ে সেই ঘর বসানো হলো। কবুতরের বাচ্চা হলো। সেই বাচ্চার পরিচর্যা করতে করতে তার মনে হলো এবার মেয়ের ঘর বসানো দরকার। তার দেহে শক্তি থাকতে থাকতে সে কাজটা করে যেতে চান। ফাবিহার বাচ্চা-কাচ্চা হলে যেন সবটুকু শক্তি খরচা করে ওদের যত্ন-আত্তি করতে পারেন।
কাজেই ফাবিহার হতাশা তাকে স্পর্শ করল না। তিনি উল্টো বললেন, “কেন?”
ফাবিহার কাছে যথাযথ কোনো কারণ ছিল না। ক্লান্তির নিশ্বাস ছেড়ে সে বলল, “কয়েকটা দিন যাক।”
“দিন তো বসে নেই ফাবিহা! যেতে যেতে কতদিন চলে গেল! দুপুর হলো, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যাও ফুরালো। অথচ আমার জীবন ওই ভোরেই আটকে আছে! তুইও কি সেই ভোরেই থাকতে চাস?”
ফাবিহা উত্তর দিতে পারল না।
নূরজাহান মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, “বয়সের দিকেও তো দেখতে হবে। অনার্স শেষ করে ফেললি। চব্বিশ তো কবেই হয়ে গেছে। এবার একটু আগাতে হবে না?”
ফাবিহা মায়ের বুকে মুখ গুঁজল, “আমার যে কিচ্ছু ভালো লাগে না আম্মু!”
“এক জায়গায় থেমে থাকলে ভালো লাগবে কীভাবে?” মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন তিনি।
“বিয়ে করলেই ভালো লাগবে?”
“বিয়ে করবি, সংসার হবে, আল্লাহ দিলে বাচ্চা হবে। জীবনের নতুন নতুন রং না দেখলে বুঝবি কেমন করে ভালো লাগা আসলে কতরকম হয়?”
“তুমি নিজে যে এক জায়গায় থেমে আছো!”
“জীবনের সব রঙই আমার দেখা শেষ মা! এবার তোদের থিতু হতে দেখে বুক জুড়াব। লোকটা আমার বুকেই থাক। কারো একটা স্মৃতিতে তো তাকে থাকতে হবে!” তিনি টের পেলেন তার বুক ভিজে যাচ্ছে। অশ্রু দেখা যায়, বুকের রক্তক্ষরণ তো দেখা যায় না। তাই সকলেই ভাবে সে অনেক ভালো আছে! সেই ভালো!
“তোর ফুপু আমাদের জন্য কম করেনি। নিজে থেকে তোর বিয়ের দায়িত্ব নিয়েছে। আগেরবার ওকে কম কথা শোনাইনি আমি! এবারও নিষেধ করলে যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে আমার সাহারা আর কেউ থাকবে না! ওকে ওর মতো করে খুঁজতে দে। তোর যদি ছেলে পছন্দ না হয় তাহলে তখন বলিস। জোর করে তোকে বিয়ে দিয়ে পার করব তেমন মা আমি বল? তোর ঘর বসানোটা দেখতে দে মা! আর নিষেধ করিস না।”
ফাবিহার না বলার আর উপায় রইলো না। খবর শুনে মনিরা মনে মনে কী আটঘাট বাঁধলেন কেউ জানে না। তবে ফাবিহাকে বলে রাখলেন, “সবসময় প্রস্তুত থাকবি! পাত্রপক্ষ যেকোনো সময় আসতে পারে!”
এমন উদ্ভট পাত্রপক্ষের কথা শুনেও ফাবিহা রা করল না। তার জীবন নদীর স্রোত থেমে গেছে। কেউ তাতে আর ঢেউ খেলাতে পারে না।
এর ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় সেই মেয়েটা আবার ফোন দিলো। ফাবিহা তখন গোসলে। সিমি কয়েকবার ডেকে বলল, “কে যেন ফোন দিয়ে পাগল হয়ে যাচ্ছে ছোট আপা!”
কলপাড় থেকে ফাবিহা বলল, “সেভ করা থাকলে ধরে কথা বল, নাহলে সাইলেন্ট করে রাখ। আমি এসে দেখছি।” প্রোডাক্ট হাতে পেয়ে অনেক কাস্টমারই ফোন দিয়ে থাকে। জিনিস ড্যামেজ হলে জানিয়ে ফেরত দেয়। তেমন কাউকেই ভাবল সে।
গোসল সেড়ে এসে কল ব্যাক করতেই সেই মেয়েটা হড়বড় করে কথা বলে উঠল। এক মুহূর্তও লাগল না তাকে চিনতে।
উত্তেজিত কণ্ঠে সে বলল, “আজকে যে কী হয়েছে আপু আপনি জানলে অসম্ভব খুশি হবেন!”
অসম্ভব খুশি তার জীবনে আর আসবে কি না ফাবিহা জানত না। কিন্তু মেয়েটার এমন আনন্দ থিতিয়ে দিতে মায়া হলো।
কৃত্রিম আগ্রহ দেখিয়ে সে বলল, “কী হয়েছে?”
দাঁড়ি-কমা ছাড়াই ছুটন্ত ট্রেনের মতো বলতে শুরু করল সে,
“সজীবের সেই বন্ধুর সাথে আমি একটু ফ্লার্টিং করেছি। জানি জিনিসটা ঠিক হয়নি কিন্তু ওর মুখোশ সবার সামনে খোলার আর কোনো উপায় আমি পাইনি।
সেই ছেলে দুনিয়ার মেয়েবাজ! আমি একদিন মেসেজ দিতেই সে একেবারে কাত হয়ে গেল। একটু ইনিয়ে বিনিয়ে বললাম সজীব যে একটা টক্সিক মানুষ, ওর সাথে থাকা অসম্ভব। অথচ আমার কাছে এমন প্রমাণও নেই যে বিয়েটা ভেঙে দেব। তখন সেই ছেলে নিজেই একেবারে ত্রাণকর্তা হয়ে হাজির হলো। আমি তো ভেবেছিলাম অন্য মেয়ের মতো আমার সাথেও টাইমপাস করছে। কিন্তু সে ছেলে সোজা আমাকে বিয়ে করতে চায়! এক সপ্তাহের মধ্যে এমন দেখে আমি একটু অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না। বললাম ওকে বিয়ে করতে হলে আগে সজীবকে ফিরিয়ে দিতে হবে। আর ওর কোনো দোষ না দেখিয়ে ফিরিয়ে দিলে সবাই ভাববে আমারই দোষ আছে। তখন সে আসল বো-মা-টা ফাটালো!
নিজে থেকেই আমাকে বলল, আপনার সাথে যে সজীব ওর হেল্প নিয়ে কী কী করেছে। সবচেয়ে মিরাক্যুলাস বিষয় হলো, সজীব আপনাকে হাতে রাখার জন্য ওকে সেদিনের সিসিটিভি ফুটেজ কালেক্ট করতে বলেছিল। ওটা এডিট করে দেখানোর ইন্টেনশন ছিল ফর শিওর! কিন্তু খেলাটা কীভাবে ঘুরে গেলো দেখুন! সেই ফুটেজ সজীব আর চায়নি, ওটার কথা বেমালুম ভুলেই গেছে! আর এদিকে এই ছেলে কী মনে করে ওটা যত্ন করে রেখে দিয়েছে আল্লাহই জানেন! তারপর আর কী! আজকে সজীবের আংটি পরাতে আসার কথা ছিল। হাভাতের দল সাতজনের কথা বলে বিশজন নিয়ে এসেছে! আমারই ভালো হয়েছে। যত মানুষের সামনে ওর মুখোশ খোলা যায় তত ভালো! যখন আংটি পরাবে বলে সবাই জড়ো হলো তখন আমি সেই ফুটেজ সবাইকে দেখালাম। সজীব তো সজীব! ওর আব্বু আম্মু পর্যন্ত নাকাল হয়ে গেছে! বেচারা বুঝতেই পারেনি দুই বছর আগের কাহিনী এখন এসে ওর ইজ্জতের ফালুদা করবে!
আপনি যদি তখন থাকতেন আপু! আমার বাবা যে কী বিশাল এক থাপ্পড় ওকে দিলো! তারপর ওর বড় চাচী, শুরু থেকে সে আমাকে খুব আদর আপ্যায়ন করছিল। সেই মহিলাই যাচ্ছেতাই বলে ওকে একেবারে তেল ছাড়াই ফ্রাই করে দিয়েছে! তখনই জানলাম আপনি উনার রিলেটিভ। ওদের পরিবারে আপনার নামে বাজে কথা সজীব খুব আয়েশ করে রটিয়েছিল। সেগুলো সব উল্টো ওর দিকেই ফিরে গেল। সত্যি কথা বলতে আপু, আমি যেভাবেই হোক বিয়েটা ভাঙতে পারতাম। কিন্তু এভাবে আপনার হিস্ট্রিটা সবার সামনে ক্লিয়ার হয়ে যাওয়ায় বিয়ে ভাঙার চাইতেও বেশি খুশি লাগছে!”
ফাবিহা অনেকক্ষণ ঝিম মেরে বসে ছিল। কানের পাশ দিয়ে কত কথাই না বেজে বেজে গেল! কত কথা! কত তিক্ত বাণ!
“অনেক অনেক ধন্যবাদ আপু!” বলতে যেয়ে টের পেলো তার গলা কাঁপছে, কণ্ঠে দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না।
মেয়েটা মমতামাখা স্বরে বলল, “ধন্যবাদ দেবেন না আপু! আমার কাছের কেউ হলে আমি নিশ্চয়ই তাকে হেল্প করতাম। ইয়ে…আপনি কি বিয়ে করেছেন আপু?”
“না।” বুঝে যাওয়া কণ্ঠে বলল ফাবিহা।
“দোয়া করি, আপনার জীবনসঙ্গী আপনার জন্য খুব খুব ভালো হোক!”
“আমার জন্য যা করলেন আপু, এটার প্রতিদান আল্লাহ আপনাকে খুব যত্ন করে দিন।”
ফোন রেখে অনেকক্ষণ বিছানায় হেলান দিয়ে বসে রইলো সে। নূরজাহান খাওয়ার জন্য ডাকতে এলে মেয়ের এমন অবস্থা দেখে ঘাবড়ে গেলেন। ফাবিহা ভেজা কণ্ঠে সবটা বলতেই তিনি মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিলেন।
মাথায় চুমু দিয়ে বললেন, “আল্লাহর কী পরিকল্পনা ফাবিহা! এমন জায়গায় আমাদের এনেছেন যেখানে কেউ আমাদের বাঁকা চোখে দেখে না। আর যেখানে দেখত সেই তাদের সামনেই পর্দা তুলে দিয়েছেন! আমাদের কোনো দরকারই হয়নি! সম্মান যারা নিলো, তাদের মাধ্যমেই ফেরত এলো! আল্লাহ! আল্লাহ!”
ফাবিহা অনুভব করছিল তার বুক হালকা হয়ে গেছে। যে অপবাদের জালে জড়িয়ে নিজের কপালকে ক্ষণিকের জন্য কলঙ্কিত মনে হচ্ছিল সেই কপালকেই আজ বড় সৌভাগ্যবতী বলে মনে হচ্ছে!
এই অনুভবের সাথেই তার মনে পড়ল, সেই ঘটনার দিন সজীবের কাছে সে কসম করেছিল। এবার সে কসমের কাফফারা দেয়ার পালা!
পরদিন শুক্রবার ছিল। ফাবিহা দেরি করল না। স্থির করল পরেরদিনই ঝুলিয়ে রাখা কাজটা সেড়ে ফেলবে।
মনিরার কাছে অত ভেঙে বলল না সে। ঘটনাটা তো কেউই জানে না! কেবল জানালো সে দশজন মিসকিনকে খাওয়াতে চায়। মনিরা ভাবলেন বাবার জন্য হয়তো এই জুমাবারে মেয়েটা কিছু করতে চাইছে। ছেলের মাধ্যমে তিনি সব বন্দোবস্ত করে দিলেন তিনি।
ফাবিহা নিজের হাতে রান্না করল। পেঁয়াজ কাটার ছলে খুব খানিকটা কেঁদে নিলো। বাবাকে যদি জানানো যেত তার মেয়েকে আল্লাহ কেমন করে সম্মানিত করেছেন!
সিমি ছোট আপার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলল, “যারা ঠিক থাকে, তারা কোনোদিন ফেলনা যায় না ছোট আপা! আমরাই নিজেদের ফেলনা বানিয়ে ফেলি।”
খাওয়ার আয়োজন মনিরার বাড়িতে হলো। তিনটার দিকে সব গুছিয়ে দিয়ে গোসলে গেল ফাবিহা। ঘন্টা ধরে গোসল করে পুরোনো তিক্ততার ধুলো ধুয়ে ফেলল প্রাণপণে। অনেকদিন পর বাইরে পরার একটা পা ছুঁই ছুঁই গোল জামা পরলো সে। নিজেকে ভীষণ সজীব মনে হচ্ছিল। নিজের মনেই হেসে ফেলল ফাবিহা। সজীবের তিক্ততা ধুয়ে যেতেই জীবনে সজীবতা ফিরে এসেছে! সেলুকাস!
ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে নিজে হাতে খাওয়ালো সে। নির্দিষ্ট পরিমাণের বাইরেও ওদের জন্য একটু দই, একটু ক্লেমনের ব্যবস্থা করেছিল। সেগুলো পেয়ে বাচ্চাদের নিষ্পাপ উচ্ছ্বাস দেখে মনে হলো মাসে একবার, অনেকজনকে না পারুক, অন্তত একজনকে হলেও— মন ভরে খাওয়াবে সে!
কাফফারা হিসেবে বিশ জনকে খাওয়াতে হয়। সে ভেবে রাখল পরের শুক্রবারে আর দশজনকে খাওয়াবে।
ওদের খাবার পাঠ চুকিয়ে ফুপুর ঘরে বসে বিশ্রাম করছিল, সে সময় মনিরা হন্তদন্ত ভঙ্গিতে ছুটে এলেন। নিশ্বাস আটকে বললেন, “ফাবিহা! ভদ্র মেয়ের মতো বসে থাক! ছেলে এসেছে!”
ফাবিহা হতবুদ্ধি হয়ে বলল, “কী!”
“তোকে বলেছিলাম না ছেলে যখন তখন আসতে পারে!”
“তাই বলে এভাবে!” নিজের দিকে তাকালো সে। চুল ভেজা থাকায় গামছা পেঁচিয়ে রেখেছিল, তার ওপরে ওড়না জড়ানো। ওড়নার একাংশ গামছার আ-ক্র-ম-ণে ভিজে গেছে। জামাটা বেশ পুরোনো, রং উঠে মলিন অবস্থা। হাত তখনও খানিকটা হলুদ হয়ে আছে।
মনিরা চূড়ান্ত বিরক্ত হলেন, “মাথা কি বিক্রি করে দিয়ে এসেছিস নাকি মনটা মরে গেছে? মুখ দিয়ে কথা বলবি, জামার ছিরি দিয়ে কী হবে?”
কী হবে বললেও একটা মানুষের সামনে তো যেভাবে সেভাবে আর যাওয়া যায় না!
ফাবিহা বলল, “জামাটা পাল্টে আসতে দাও!”
“চুপ! এক পাই নড়বি না তুই!” তার ধমকে ফাবিহা থতমত খেয়ে গেল।
“এই ছেলে যদি তোকে পছন্দ না করে তাহলে চাপকে পিঠের ছাল তুলে ফেলব!” দরজার দিকে ছুটলেন তিনি। বিড়বিড় করে বলতে থাকলেন, “কত কসরত করে ছেলেটাকে বাড়ি পর্যন্ত এনেছি! উনার জামা নিয়ে ঢং শুরু হয়েছে!”
ফাবিহা তাজ্জব হয়ে বসে রইলো। কী আশ্চর্য! ফুপু তাকে হু-ম-কি দিয়ে গেল কেন?
বিয়ের জন্য কারো মুখোমুখি হতে হবে মনে হতেই সজীবের কথা মনে হলো। আর তাতেই বিরক্তিতে মুখটা তেতো হয়ে এলো ফাবিহার। প্রায় পনের মিনিট চলে গেলেও যখন কেউ এলো না সে উঠে জানালার সামনে দাঁড়ালো। পর্দা সরিয়ে পাল্লা দুটো ভালোভাবে খুলে দিতেই শুক্রবারের বিকেলের এক খণ্ড বাতাস ঘরে প্রবেশ করল। সে তন্ময় হয়ে গেল আকাশের রূপে। মেঘগুলো বুদবুদের মতো বেড়ে উঠছে, মনে হচ্ছে মেঘের পাহাড়! কেউ বোধহয় তার গায়ে খুব যত্ন করে এক পোচ গোধূলির রঙ মাখিয়ে দিয়েছে। ফাবিহা অপলক দেখে গেল তাদের।
তার জীবন নদীর স্রোত থেমে গিয়েছিল। নিস্তরঙ্গ সেই জলাধারে মুহুর্মুহু তরঙ্গ সৃষ্টি করল একটা গমগমে কণ্ঠস্বর।
গলা খাঁকারি দিয়ে কেউ বলল, “আসসালামু আলাইকুম!”
ফাবিহা ঝট করে পেছনে ঘুরল। বুঝতে পারেনি শুক্রবারের খণ্ড বাতাসের সাথে মেঘের ভেলায় তার উঠোনে শান্তির আগমন ঘটেছে একটা মানুষের বেশে।
সে দরজার দিকে তাকিয়ে বিস্মিত কণ্ঠে বলল, “সাকিন ভাই!”
চলমান~
(আআআআআ!! আমি এত আনন্দ পাচ্ছি কেনওওওওওও!! 🥹😭
অন্নেক লাভ রিয়্যাক্ট চাই 🥹🧡)