ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনজোছনা

পর্ব 42

লেখক: বিনতে ফিরোজ

#বনজোছনা
৪২.

কলেজে সাকিনের কাজকর্ম অপছন্দ করার মানুষ যেমন আছে তেমনই সেই কাজে আঞ্জাম দেয়ার সহযোগীও আছে। জুবায়েরের নেমপ্লেট ব্যবহার করায় তার সাথে সরাসরি কেউ দ্বন্দ্ব না বাঁধালেও তাকে যারা পছন্দ করে সেই শিক্ষকদের আড়ে-ঠাড়ে অনেকেই খোঁচা দেয়। সে ঠিক পেলেও কিছু বলতে পারে না। একে তো মুরুব্বী দ্বিতীয়ত তার সামনে একেবারে সভ্যটি সেজে থাকে। সে এই বিষয়ে কিছু বলতে চাইলে এক সিনিয়র শিক্ষক বললেন,

“তুমি যদি তাদের চার্জ করো তাহলে তারা তোমার দিকে আঙুল তোলার একটা মোক্ষম সুযোগ পেয়ে যাবে! এমনিতে তাদের আরামের ঘুম হারাম হওয়ায় তোমার ওপর বেজায় চটে আছে। কিন্তু সেগুলোর বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারছে না কারণ ছাত্ররা তোমার পাশে আছে, আর জুবায়ের আছে পেছনে। এখন তুমি সরাসরি ওদের যদি বলো— আপনারা কেন পিঠ পিছে সব কাজে ব্যাঘাত দিতে চাচ্ছেন? তাহলে তারা প্রথমে ছাত্রদের সামনে তোমার ইমেজ খারাপ করবে। তারপর তোমার সব কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
এদেশের মানুষ মাথায় কেমন ওঠাতে পারে তেমন পায়ে পিষতেও সময় নেয় না। তাই তোমাকে খুব সাবধানে থাকতে হবে!”

সাকিন এখানে এসে বুঝেছে অভিজ্ঞতার কী দাম! তার ভেতরে কেবল কাজ করার উদ্দীপনা আর ইচ্ছেই ছিল। কিন্তু অভিজ্ঞতার ঝুলি একেবারে শূন্য। অথচ পদে পদে হোঁচট খেয়ে বুঝতে পারছিল প্রবীণ মাথা ছাড়া দিনকয়েক লাফালাফি হতে পারে ঠিক, কিন্তু কলেজকে তাতে থিতু করা যায় না। তাই ছাত্রদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি সে শিক্ষকদের সাথেও সম্পর্ক জোরদার করে তুলল। যারা অপছন্দ করে তারা এড়িয়ে গেলেও যারা শুরু থেকে মনে মনে তাকে পছন্দ করে আসছিল তারা এ বেলায় সেটা প্রকাশ করার সুযোগ পেলো। সাকিন নিজেও বুঝতে পারল, শুরুতে তাকে শহরের ছেলে বলে দূরে থাকার যে প্রবণতা শিক্ষকদের মাঝে তৈরি হয়েছে সেটা তার নিজের ভুলের কারণেই।

সেই শিক্ষকদেরই একজন, বায়োলজির সিনিয়র টিচার, সাকিনকে গুরুতর ভঙ্গিতে বললেন, “বিয়ে-শাদীর কথা কী চিন্তা করছ?”

সাকিন বেশ অস্বস্তিতে পড়ল। এই বিষয়ে কেউ তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে সে সদুত্তর দিয়ে পারে না।

“ভাবছি।” পাশ কাটানোর জন্য বলল সে।

তিনি ছাড়লেন না। তার বয়স্ক চোখে চিন্তার ছাপ। মাথা নেড়ে বললেন, “বয়স তো পেরিয়ে যাচ্ছে। আর কতদিন ভাববে? এবার ঘটনা ঘটানোর দিকে মন দাও।”

“জি।” সায় জানালো সাকিন।

ভদ্রলোক হাঁটা থামালেন। রাস্তার দুপাশেই বিশাল ক্ষেত। দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে কোথাও গম, কোথাও বোরো ধানের চারাগুলো ডালপালা ছড়িয়ে গজিয়ে উঠছে। বিকেলের হালকা বাতাসে দোল খেয়ে একপাশে শুয়ে পড়তেই মনে হয় শিশুর দল খিলখিলিয়ে হেসে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

বিব্রত কণ্ঠে তিনি বললেন, “মুহতাসিম, আমি তোমার বাবার বয়সী। যাদের নিয়ে আশঙ্কা করছি তারাও তোমার বাবার বয়সী। বড় অস্বস্তি লাগছে বলতে। কিন্তু… তুমি যত দ্রুত সম্ভব বিয়েটা সেড়ে ফেলো। সব কেলেঙ্কারি চাপা দেয়া যায়। কিন্তু নারী…”

সাকিন হতভম্ব কণ্ঠে বলল, “আমি তো…!”

“একবার যদি একটা ফাঁদে তোমাকে ফেলে দেয়, সেখান থেকে জুবায়ের হয়তো নির্দোষ প্রমাণ করতে পারবে, কিন্তু মানুষের মনে যে দাগটা পড়বে সেটা ওঠাতে পারবে না।

এসব যে হবেই তা না! তবে ওদের অনেকদিন ধরে চিনি তো! কোন অলিগলিতে যেতে পারে এটাও আন্দাজ করতে পারি। তুমি টেনশন কোরো না। তার বদলে বিয়েটা করো!” হেসে বললেন তিনি।

তবে সেই হাসিতে সাকিন আর নির্ভার হতে পারল না। বুঝতে পারল সে কেবল অনভিজ্ঞই নয়, আনাড়িও বটে। নয়তো তাকে নিয়ে যে বাকিদের মনে এমন বিদ্বেষ লুকিয়ে আছে এটা একটু হলেও টের পেতো।

অডিটের ঝামেলা, ফরিদের শোক এবং নতুন উদ্ভূত এই চিন্তায় সে বেশ কয়েকদিন অন্যমনস্ক হয়ে রইলো। ধ্যান ফিরল ফার সাবিহার কল্যাণে, আরেক বায়োডাটার ধাক্কায়।

তখন সে কলেজের করিডোরে। নোটিফিকেশন দেখে এই ভেবে রেখে দিল— এবার অন্তত আগাবে।

ক্লাসে যেয়ে একবার চোখ বোলাতেই বুঝতে পারল বেশ কয়েকটা মুখ অনুপস্থিত। নাম ডাকার খাতা খুলল। চারজনের তিনজনই গতকাল এসেছিল। কেবল ইরফান টানা এক সপ্তাহ অনুপস্থিত। নিজের গাফিলতি হাড়ে হাড়ে টের পেলো সে।

ইরফানের বাবার নাম্বার ছিল। তার কাছে ফোন দিয়ে জানা গেলো ইরফানের মামা মারা যাওয়ায় তারা গ্রামের বাইরে রয়েছে। পরের সপ্তাহে চলে আসবে। ইরফানের মায়ের কথা মনে পড়ে একটু খারাপ লাগল তার। মনে হলো পরপর কেবল মৃত্যুর খবরই শুনে যাচ্ছে। প্রথমে ফরিদ চাচা, এরপর আবার ইরফানের মামা।

সেই রাতে বায়োডাটা না দেখেই সাবিহাকে ফোন দিতে চাইলো। আবার মনে হলো, এক পলক দেখেই নেয়া যাক। আর দেখতেই দমটা আবার নিভে গেলো।

“বিয়ে করা ছাড়া তো আর কোনো উপায় নেই। উপায় যেহেতু নেই তাই করতেই হবে।”

বিয়ে করার কারণ হিসেবে এই একটা লাইন কেবল লেখা। যে অভক্তি নিয়ে মেয়েটা লিখেছে সাকিন এখানে বসেই যেন সেটা টের পেলো। ফলে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলল সে। একা থাকা এক বিষয়, অশ্রদ্ধার সম্পর্কে থাকা আরেক বিষয়। প্রথমটা হয়তো সে সহ্য করে নিতে পারবে। কিন্তু দ্বিতীয়টা পারবে কি না তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কাজেই, সে আবার পিছিয়ে গেল। এবং ফলাফলস্বরূপ পেলো সাবিহার ব্লক।

এর মাঝে ইরফানের পরিবার ফিরে এলো। ছেলেটা গ্রামে এসেই তার কাছে হাজিরা দিয়ে গেছে। ইরফান অসম্ভব অন্তর্মুখী। তবুও কীভাবে কীভাবে যেন তার সাথে ভাব জমে গেছে। যতটুকু সময় সুযোগ পায় তার কাছে কাছে থাকতে চায়। ওর মাধ্যমে বেশ কয়েকবার তার মা বাড়িতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেও সে বিনয়ের সাথে এড়িয়ে গেছে। ছাত্রের সাথে একটা গণ্ডি নিয়ন্ত্রণ করে চলতেই সে ভালোবাসে। প্রয়োজন ছাড়া তার বাড়িতে যেয়ে আড্ডা বসানো সে গণ্ডির বাইরের কাজ।

কিন্তু এই নিয়ম আর বেশিদিন ধোপে টিকল না।

শুক্রবার নামাজ শেষে ইরফান তাকে খুব করে ধরল। তাদের বাড়িতে আজ অল্পবিস্তর আয়োজন করা হয়েছে। তার মা খুব আশা করে আছে সে যাবে।

সদ্য ভাইহারা মহিলার মুখের ওপর না বলতে পারছিল না সাকিন। আবার এমন দাওয়াত গ্রহণ করবে সেটাও তার পছন্দ হচ্ছিল না। কাজেই সে জানালো আসরের নামাজের পর যেয়ে ঘুরে আসবে। ইরফান তাই মেনে নিয়েই খুশি মনে চলে গেল।

যাওয়ার সময় বিপাকে পড়ল সে। এ জীবনে শেষ কবে কারো বাড়িতে দাওয়াত খাওয়া হয়েছে তা মনেই নেই। কাজেই কী নেবে বুঝে উঠতে পারল না। দুপুরের দাওয়াত যেহেতু এড়িয়ে গেছে কাজেই ভারী কিছু নেয়া যাচ্ছে না। বহুক্ষণ ভেবে-টেবে একটা বিস্কুট আর চানাচুর নিলো। বাড়ি পৌঁছুতেই ইরফানের মা উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালো।

পেশাদার ভঙ্গিতে সে বলল, “ইরফানের মামা বাড়িটা কোথায় চাচী?”

“আগে বসো মুহতাসিম!” বলে তাকে তাড়া দিলেন তিনি। সাধারণত ছাত্রের মায়েরা স্যার বলে ডাকলেও ইরফানের মা তার ধারে-কাছে যান না। সাকিনের মনে হয় স্যার বলে ডাকলে হয়তো এই সম্পর্কটা তৈরিও হতো না।

ভদ্রমহিলা হড়বড় করে যে ঠিকানা বলে গেল তা সাবিহার বাড়ির কাছাকাছি। নিশ্চিত হওয়ার আগেই তিনি কোথায় হারিয়ে গেলেন। ফিরলেন ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায়। ইরফানকে সাথে নিয়ে।

বিপরীত চেয়ারে বসে ইতস্তত করে বললেন, “একটা কাজ করেছি বাবা। আসলে অকাজই বলতে পারো!”

সাকিন ভুরু কুচকে তাকালো।

ভদ্রমহিলা ইরফানের দিকে তাকিয়ে সম্ভবত একটু সাহস জুগিয়ে নিলেন। ঠোঁট ভিজিয়ে সাকিনের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন, “তুমি তো বলেছিলে মেয়ে খুঁজছ, তা পেয়েছ নাকি?”

সাকিনের মনে একটা আশঙ্কা দেখা দিল। ভদ্রস্থ হয়ে সে বলল, “এখনও না।”

“আমি যদি তোমার জন্য একটা মেয়ে খুঁজি বাবা?”

এই ভয়টাই পাচ্ছিল সাকিন। দুনিয়ার সবাই তার বিয়ে নিয়ে এত আগ্রহী কেন! তবে মায়ের বয়সী এই মহিলার আগ্রহ এক বাক্যে নাকচ করে দিতে পারল না সে।

“সেটা আপনার মায়া চাচী। তবে আমি মোটামুটি চালচুলোহীন ছেলে। আপনি সম্ভবত জানেন না, আমার বাবা-মা কেউ নেই।”

ইরফানের মায়ের চেহারা সাথে সাথেই কালো হয়ে গেল। শুকনো কণ্ঠে তিনি বললেন, “আমার মেয়েটারও বাবা নেই।”

এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সাকিন।

তিনি বললেন, “সবার তো সবকিছু থাকে না বাবা। মেয়েটা আমার বড় ভাইয়ের। অনার্স শেষ করেছে। ফাইনাল পরীক্ষার আগে আগেই ভাইজান মারা গেলেন। তারপর ভাবির অবস্থা খারাপ হওয়ায় এখানে চলে এসেছে। ওর একটাই বড় ভাই, সে ইরফানের আব্বুর সাথে কাজ করছে।”

সাকিন বুঝতে পারছিল না কীভাবে নিষেধ করবে।

তিনি বলে গেলেন, “ওদের আর্থিক অবস্থা অতটা স্বচ্ছল না। তবে নিজেদের চলে যায় আলহামদুলিল্লাহ্। মেয়েটা ছোটখাট কাজ করে মোবাইলে। তুমি ওকে জিজ্ঞেস করলে বিস্তারিত বলবে। একটু দেখা করে যাবে বাবা? ওকে পাশের ঘরেই বসিয়ে রেখে এসেছি। তোমার যদি পছন্দ না হয় তাহলে কেউ জানবে না যে এখানে তুমি মেয়ে দেখতে এসেছিলে!”

তার এলোমেলো কথার ভেতর একটা কথাই সাকিনের বোধগম্য হলো। মেয়েটা পাশের ঘরে এই আশায় বসে আছে যে তাকে এই মুহূর্তে একজন দেখতে আসবে। এখন যদি সে দেখা না করেই চলে যায়— তাহলে সেটা ঠিক কত বড় অপমান হবে? সকলেই ভাববে তাদের অবস্থার বিবরণী শুনে সাকিন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। দেখা করলেও সমস্যা। ওদিকে সাবিহা কিছুই জানে না। উভয়সংকটে পড়ে গেল সে।

ইরফানের মা করুন মুখে জিজ্ঞেস করল, “যাবে না?”

এক পলক তাকালো সাকিন। দেখা করার পর না বললে জিনিসটা বোধহয় ততখানি খারাপ হবে না। দোনামনা করে সে বলল, “যাবো।”

প্রায় লাফ দিয়ে উঠলেন ইরফানের মা। সাকিন থতমত খেয়ে বলল, “চাচী, কাউকে এটা জানাবেন না দয়া করে। আমি এখনি কোনো মত দিতে পারব না। আমার বোন শহরে থাকে, তার সাথে…”

“হ্যাঁ হ্যাঁ! সবার সাথেই আলাপ করবে! কোনো সমস্যা নেই! আসো আসো!”

সাকিনকে আর কোনো সুযোগ না দিয়ে তিনি চলে গেলেন পাশের ঘরের দরজায়। ওকে ঢুকিয়ে দিতেই ইরফান অবাক কণ্ঠে বলল, “তুমি যে কাজটা করলা, এটাকে কী বলে জানো?”

“কী?” ভুরু কুচকে তাকালেন তিনি।

“জিম্মি করে বলে! অ-স্ত্র ছাড়াও যে মানুষকে জিম্মি করা যায় তোমাকে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না!”

মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নাড়লেন তিনি। বিরক্ত হয়ে বললেন, “এগুলো টেকনিক! চুপ করে এখানে দাঁড়িয়ে থাক!”

“স্যারের কথা শুনব?” মুখ চুপসে গেল ইরফানের।

“কানে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাক ছাতা!”

সেই ক্ষণে ইরফানের বাবা হাঁক ছাড়লেন, “মনিরা!”

হন্তদন্ত ভঙ্গিতে ছুটে গেলেন তিনি।

—

সালামের উত্তর পাওয়ার আশা সাকিন করতেও ভুলে গেছে।

ফিসফিস করে সে বলল, “ফাবিহা?”

মুহূর্তেই তার মাথায় সব এলোমেলো অঙ্ক পিটির ভঙ্গিতে এক জোট হয়ে দাঁড়ালো। ইরফানের মামা মারা যাওয়া, সেই ঠিকানা কুন্দকলির আশেপাশে হওয়া, ফাবিহাদের বাড়ি ছাড়া এবং এই গ্রামে চলে আসা। কী সহজ সমীকরণ! কী আশ্চর্য সমীকরণ! ইরফানের মা ফাবিহার ফুপু! পৃথিবীটা এতখানি গোল! এতখানি!

ফাবিহার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল সাকিনই ফুপুর সেই পাত্র। সে এই গ্রামে এসেছে? এজন্যই সাবিহা আপা খুব হা হতাশ করছিলেন? পাত্রের মুখোমুখি হওয়ার যে প্রস্তুতি সে নিয়েছিল তা সাকিনের মুখ দেখে এক নিমিষে এলোমেলো হয়ে গেল।

তবে সাকিন বোধহয় ততখানি এলোমেলো হলো না। বরঞ্চ সে টের পাচ্ছিল এতক্ষণের অস্বস্তি কোথায় যেন দূর হয়ে গেছে! বহুদিন আগে যে প্রস্তাবটা আধখ্যাচড়া অবস্থায় রাফ খাতায় ঢুকিয়ে রেখে দিয়েছিল, কোন এক জাদুবলে সেই রাফ খাতা একাই খুলে নিজের হিসেব মেলাতে ব্যস্ত হয়ে গেছে।

স্বাভাবিক ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো সাকিন।

“কেমন আছেন?” শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে বিছানার বিপরীতে রাখা চেয়ারে বসে পড়ল।

ফাবিহা বুঝতে পারছিল জানালার ধারে আর দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না। আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বিছানায় বসল সে। মৃদু কণ্ঠে বলল, “আপনি এখানকার কলেজে জয়েন করেছেন!”

হেসে মাথা নাড়ল সাকিন।
“ইরফান আপনার ফুপাতো ভাই! কী কো-ইনসিডেন্স!” তার কণ্ঠের বিস্ময় ফাবিহাকেও ছুঁয়ে গেল। এক পলক তার দিকে তাকিয়েই আবার মাথা নিচু করে নিল সে।

সাকিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “কেমন আছেন?”

“আলহামদুলিল্লাহ্। জানেন বোধহয়, বাবা…”

“জানি। আমি ওইদিন গিয়েছিলাম। কিন্তু চাচীর সাথে দেখা করতে পারিনি।” কোনো কারণ দর্শালো না সে। কাজটা করতে পারেনি সেটাই মূল কথা, কেন পারেনি সেটা জরুরি নয়।

তারপর অনেকক্ষণ নীরবতা। ফাবিহাই সে নীরবতা ভাঙল। অপরাধী কণ্ঠে বলল, “ফুপু আপনাকে এভাবে বিপদে ফেলে দিয়েছে…আপনি কিছু মনে করবেন না প্লিজ!”

“আমি রাজি না হলে উনি কিছু করতে পারতেন না।”

ফাবিহা ঝট করে তাকালো।

সাকিনের চোখে কী যেন জ্বলজ্বল করছে। ধরতে পারল না সে।

সাকিন চোখ সরাল না।

“মাথার উপরে ঋণের খাড়া মিটেছে, ভ্রষ্ট চরিত্রের উপাধি মুছে গেছে, ভাইটা খুঁটির হয়েছে। সংসারটা আর টানাটানির নেই। দেখলে ভেতর থেকে ভালো লাগা কাজ করে। এখন আপনি প্রস্তুত তো?” আস্তে-ধীরে বলে গেল সে।

ফাবিহার মনে হলো যে চিঠির জবাব সাকিন দেড় বছর আগে দেয়নি, সেটা এই ক্ষণে সুদে-আসলে মিটিয়ে দিচ্ছে।

উত্তর না পেয়ে সাকিন বলল, “আপনাকে কি জোর করা হয়েছে?”

“না।” ফাবিহা বলল।

“কিন্তু আপনার চোখ-মুখ দেখে সেটা মনে হচ্ছে না।”

একটু হাসল ফাবিহা।
“আমি অনেক ক্লান্ত!” ‘সাকিন ভাই’ কথাটা গিলে ফেলল সে। এই মুহূর্তে ডাকটা বড্ড অদ্ভুত শোনাবে।
বলল, “বিয়ে না করার নিয়ত আমার কখনোই ছিল না। ভেবেছিলাম আরেকটু ধাতস্থ হয়ে তারপর নাহয়…”

আচমকা সাকিন তার সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নটা করে ফেলল, “বিয়ে কেন করতে চান ফাবিহা?”

ফাবিহা চোখ নামিয়ে ভাবল। তাকালো নিজের হলদে হাতের দিকে। সেদিকে তাকিয়েই বলল,

“জীবনে তো একা চলা যায় না। একেক সময় একেক জনের দরকার পড়ে। বিয়ের মাধ্যমে একইসাথে একজন অভিভাবক, একজন বন্ধু পাওয়া যায়। আমার মনে হয় না এরচেয়ে দৃঢ় এবং নিরাপদ অন্য কোনো সম্পর্ক হয়। আর তাছাড়া, জান্নাতে যে সম্পর্কের বীজ বুনে দেয়া হয়েছে সে সম্পর্ক থেকে অকারণে দূরে থাকাটাও আমার পছন্দ নয়।”

সাকিনের মনে হলো এই কয়েকটা লাইনের উত্তরের জন্যই সে প্রায় দুটো বছর ধরে অপেক্ষা করে গেছে। একটা গভীর শ্বাস তার বুক চিরে বেরিয়ে এলো।

ফাবিহা তার প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারছিল না। সাকিনকে সে আগে একবার ফিরিয়ে দিয়েছে। তারপরও সে তার সাথে কথা বলছে মানে চিঠির আলাপটা সে অপমান হিসেবে নেয়নি। এই একটা কারণই যথেষ্ট তার রাজি হওয়ার জন্য।

সাকিন সোজা হয়ে বসে বলল, “কিছু জানার থাকলে বলতে পারেন।”

ফাবিহা অথৈ জলে পড়ে গেল। নিজেকে খুব এলোমেলো লাগছিল। ক্লান্ত কণ্ঠে সে বলল, “কিছু জানার নেই।”

উঠে দাঁড়াল সাকিন।
“আসছি তাহলে।”

ফাবিহাও উঠল। ঘটনা কোন দিকে মোড় নিলো বুঝতে পারল না সে।

যাওয়ার আগে সাকিন বলে গেল, “একটু রেস্ট নিন! মাঝে মাঝে নিজেকে নিয়ে ভাবাও জরুরি।”

বের হতেই দেখা হলো নূরজাহানের সাথে। তিনি তাকে দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন। মনিরার ছেলে সম্পর্কিত বর্ণনা শুনে কেবলই সাকিনের কথা মনে পড়ছিল। তখনও ভাবতে পারেননি ছেলেটা সাকিন হতে পারে! ফরিদের পছন্দ করে রেখে যাওয়া পাত্র!

এবং এর মাধ্যমেই তাদের পূর্ব পরিচয়ের বিষয়টা খোলাসা হলো। কেবল অনুচ্চারিত রইলো অর্ধেক থেমে যাওয়া বিয়ের কথাটা।

মনিরা অবাক হয়ে বললেন, “কী অবস্থা! আল্লাহ মাবুদ! এমনও হয়! তা ভাবি আমি যে এতবার করে মুহতাসিম মুহতাসিম করলাম! আপনি তো একবারও কিছু বললেন না!”

“ওর পুরো নাম তো জানতাম না!”

ফাবিহা নিজেও জানত না। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ভাবল কলেজের মুহতাসিম স্যারের নাম ইরফানের মুখে কতবারই না শুনেছে! ভুল করেও কী ভাবতে পেরেছে এই ছেলেটা সাকিন মুহতাসিম?

সাকিন বিদায় নিলে মনিরা মাথায় হাত দিলেন। ওর মুখটা ভালো করে দেখাও তো হলো না! দেখলেই তিনি বলে দিতে পারতেন সে রাজি কি না। কিন্তু কথার তালে তালে এমন মজে গিয়েছিলেন যে তাকে ভালোভাবে বিদায়ও দিতে পারেননি। কী আশ্চর্য! দুজনেই কুন্দকলিতেই ছিল,তবুও কীভাবে কীভাবে একবারের জন্যও দেখা হলো না! ভাবতে গিয়ে আরও একবার বিস্মিত হলেন মনিরা। যদিও সাকিন-ফাবিহা কারোর মুখই দেখেননি, তবুও তার মন বলছে ঘটনা একটা ঘটবেই। আল্লাহ এমনি এমনি এই দুটোকে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে এক জায়গায় আনেননি।

নূরজাহান ফাবিহার কাছে গেলেন। সে থম মেরে বসে আছে। মা-কে দেখে জিজ্ঞেস করল, “আজকে যে কেউ আসবে, ফুপু তোমাকে বলেছিল?”

“না। তোকে রেখেই আমার কাছে গেল। ছেলে হাঁটার ওপরে এসেছে, আগে থেকে জানবে কীভাবে?” মেয়ের পাশে বসলেন তিনি। বড় আশা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী করবি মা?”

ফাবিহার কানে বেজে উঠল বাবার কণ্ঠস্বর।

“মান-সম্মানের চিন্তা করতে করতে অন্ধ হয়ে যাস না! আল্লাহ যদি এক সুযোগ দ্বিতীয়বার দেন, তাহলে সেটা লুফে নিতে ভুলবি না। রিজিক কিন্তু মা আমাদের দোষেই হাতছাড়া হয়!”

“আমার মনে হয় রাজি হওয়া উচিত আম্মু।” ক্ষীণ কণ্ঠে বলল ফাবিহা।

নূরজাহান ছলছল চোখে বললেন, “আমারও তাই মনে হয়।” আস্তে করে মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন তিনি। এই তিনমাসের মাঝে আজ প্রথমবার এত গাঢ়ভাবে ফরিদের অনুপস্থিতি অনুভব করলেন তিনি।

অথচ ফাবিহার মনে হলো বাবা পাশেই আছে। খুব কাছে!
ডায়েরিতে তিনি লিখেছিলেন,

“ফাবিহা, মা রে!
আমার দোয়া তোকে জড়িয়ে থাকুক
যখন আমি পারি না।”

সে অনুভব করল বাবার দোয়া তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে ঠিক বাতাসের মতো। সেই শুরু থেকেই ছিল, আজ ধাক্কা লাগল বলেই কেবল ঠিক পেলো।

সিমি এ বাড়িতে আসেনি। পুরো বাড়ি খালি করে আসাটা সমীচীন মনে করেননি নূরজাহান।

বাড়ি পৌঁছে তিনি যখন বললেন, “সিমি, তোর ছোট আপার জন্য দোয়া কর।”

“সবসময়ই করি।” বিরক্ত কণ্ঠে বলল সিমি। একটা কবুতর এখনও বাড়ি ফেরেনি। অথচ সূর্য ডুবে যাচ্ছে। তার প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হচ্ছে।

নূরজাহান খুব আগ্রহ করে বললেন, “একটা সম্বন্ধ এসেছে।”

সিমি চোখ বড় বড় করে তাকালো। নূরজাহানের কাছে এসে নিচু কণ্ঠে বলল, “এই গ্রামের?”

“হু।”

“ধুর খালাম্মা! এই গ্রামে ছোট আপার বর হওয়ার মতো কেউ নেই। ছেলে কী করে?”

“কলেজে চাকরি করে।”

“ওহ, তাহলে তো ভালো। সাকিন ভাইও কলেজে চাকরি করত।” অন্যমনস্ক কণ্ঠে বলল সে। কুন্দকলির কথা, রিফাতের কথা মনে পড়তেই বুকটা হু হু করে উঠল।

“ছেলের একটা বোন। বাবা-মা নেই।” বহুদিন পর নূরজাহান এমন কৌতুক করলেন। তার মনে হলো সবচেয়ে মজাটা হবে সিমির প্রতিক্রিয়া দেখে।

সিমি হাহাকার করে বলল, “এতিম ছেলের কাছেই ছোট আপার বিয়ে দিবেন তাহলে তো সাকিন ভাইয়ের সাথেই দিতে পারতেন! তার মতো দুইটা মানুষ হয়? সাকিন যদিও হরফের মাথায় থাকে, কিন্তু সাকিন ভাই কাছের মানুষ নিজের মাথায় করে রাখতে জানে।” দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বলল, “যাক, কী আর করার! ছেলের নাম কী খালাম্মা?” কবুতরটা ফিরে এসেছে দেখে স্বস্তি পেল সে।

নুরজাহান এক গাল হেসে বললেন, “সাকিন।”

ঝট করে তাকালো সিমি, “অ্যা! এখানেও সাকিন!” তার চোখ কপালে উঠে গেছে। কী এক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে সে বলল, “ছেলের বোনের নাম কী?”

“সাবিহা।”

সিমি কম্পনরত কণ্ঠে বলল, “বোনের ছেলের নাম কী রিফাত?”

“হ্যাঁ।”

উত্তরটুকু শুনতে দেরি, সিমির ছুট লাগাতে দেরি হলো না। ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে ঘরে যেয়েই সে ঝাঁপিয়ে পড়ল ছোট আপার গায়ের ওপর। একদমে বলল, “আপনি যদি কোনোদিন আমাকে একটুও, এক ইঞ্চি, এক চিমটিও ভালোবেসে থাকেন তাহলে অবশ্যই অবশ্যই সাকিন ভাইকে বিয়ে করবেন!”

ফাবিহা এই আচমকা আ-ক্র-ম-ণে এমনিতেই হতভম্ব। এই কথা শুনে তার বিস্ময় আরও বাড়ল। সে বলল, “তোকে ভালোবাসি কি না এটা বিয়ে করে প্রমাণ করা লাগবে?”

“লাগবে! মাঝে মাঝে কিছু জিনিস প্রমাণ দিতে হয়!”

“সাকিন ভাইকেই কেন? তুই কাকে বেশি ভালোবাসিস?”

দু’পাটি দাঁত বের করে সিমি বলল, “আমি আমার ছোট আপাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি! ছোট আপাকে যে ভালো রাখতে পারবে তাকে আরও বেশি ভালোবাসি!”

—

বাড়িতে ফিরে আজ প্রথমবার সাকিনের মনে হলো ঘরটা আসলেই খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এতদিন তো খেয়াল হয়নি। আজই কেন!

অস্থির হলেও নিজেকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করল সে। অস্থির কেন হচ্ছে সেটাও বুঝতে পারল না। ফাবিহার সামনে আজ বেশ নার্ভাস হয়ে পড়েছিল। যদিও ওর মুখ দেখে কিছু বোঝার উপায় ছিল না। কিন্তু কেবল সে নিজেই জানে, ভেতরে ভেতরে যে তার ঘাম দিয়ে জ্বর ছুটেছে!

হীরা চৌধুরীর ফোন থেকে সাবিহার সাথে যোগাযোগ করল সাকিন। সে এখনও বোনের ফোনের ব্লক লিস্টে ঝুলছে।

সাবিহা ধমকে উঠল, “কী সমস্যা?”

“ইয়ে…সাবিহা!” গলা খাঁকারি দিলো সে।

“বল, তামাশা না করে কী বলতে চাস বলে ফোন রাখ! তোর চমৎকার সব যুক্তি শুনতে আমি মোটেও আগ্রহী না।”

“সাবিহা..”

“শুনছি।”

“ইয়ে..একটা কাজ করেছি।”

“ইয়ে ইয়ে করছিস কেন? কী করেছিস সত্যি করে বল তো!” সন্দেহী কণ্ঠে বলল সাবিহা।

সাকিন কিছু বলার আগেই সাবিহা বলল, “এই তুই বিয়ে-টিয়ে করে ফেলেছিস নাকি!” তার কণ্ঠে আর্তনাদ।

সাকিনের কী হলো কে জানে! সে বলল, “এখনও না, মেয়ে দেখে এসেছি।”

“কীহ!” সাবিহার মনে হলো তার মাথা ঘুরছে। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না সে।
“আমি একের পর এক মেয়ে দেখাই, এজন্যই এসব নাটক করিস আমার সাথে! ওইদিকে ঠিকই মেয়ে ঠিক করে রেখেছিস! ছিঃ ছিঃ ছিঃ! আমাকে বললে আমি কি তোর বিয়েতে বাগড়া দিতাম? তুই কি ভাই নাকি মীর জাফর? ছিঃ ভাইয়া! আমি অতি অবশ্যই ঘষেটি মার্কা ননদ হবো!”

সাকিন খুব কষ্টে হাসি চাপল।

“আচ্ছা।”

“আচ্ছা? আচ্ছা মানে কী? তুই এখনই বউয়ের দলে চলে গেছিস? আল্লাহ! আমার তো আর কেউ থাকল না!” সাবিহা প্রায় কেঁদেই ফেলল।

সাকিন তড়িঘড়ি করে বলল, “তুই কালকেই একবার আয়।”

“কেন? আমি এসে কী করব?”

“একা ছেলের হাতে তো মেয়ে দেবে না। তুই চাচাকে নিয়ে আয়। আমি রফিক ভাইকে ফোন করছি।”

“তুই কি কালকেই বিয়ে করে নিবি?”

“আর দেরি করে কী করব? বয়স হয়ে যাচ্ছে না!” হেঁয়ালি কণ্ঠে বলল সে।

সাবিহা জ্বলে উঠল, “আমি কালকেই আসছি! তোর বিয়ে দিয়েই ভুলে যাব আমার ভাই বলে কেউ ছিল! কোনো মীর জাফরকে আমি ভাই মানি না! মানি না! মানি না!”

“আচ্ছা।” সাকিন উত্তর দিতেই খট করে কল কেটে দিলো সাবিহা। সজনের গোল পাতার ফাঁক দিয়ে বাঁকা চাঁদের হাসি এসে ছুঁয়ে গেলো সাকিনের আশপাশের বাতাবরণ। সাকিন অনুভব করল তার এত বছরের সংযম, ধৈর্য্য, অপেক্ষা— কোনোটাই বিফলে যায়নি।

চলমান~

(আজকে আরেক পর্ব চাইলে দশটার ভেতরে সাড়ে তিনশ করে ফেলুন পাঠক 😁

লোভী বললে লাভ রিয়্যাক্ট দিয়ে তারপর বলেন 😁)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 42 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন