#বনজোছনা
৪৩.
সাবিহা রেগে আগুন হয়ে সিদ্ধান্ত নিলো কালকে সকালেই সে সাকিনের কাছে যাবে। আজ নারিকেল কুড়েছিল নাড়ু বানানোর জন্য। “খেতাপুড়ি নাড়ুর! তোর বিয়ের শখ মিটিয়ে নিই আগে!”— বিড়বিড় করে বলল সাবিহা।
হীরা চৌধুরী সব শুনে বেশ অবাক হলেন। তারপরই বললেন, “যাক, ভালো হয়েছে। সুবুদ্ধি হয়েছে অবশেষে! বিয়ে করতে দেরি হলে ছেলে মানুষের মাথায় গণ্ডগোল হয়ে যায়। সাকিনের বিয়ে করে নেয়া উচিত!”
সাবিহা চোখ-মুখ কুচকে ভাবল রফিক কত বছর বয়সে বিয়ে করেছিল। নাকি ওটার আগে থেকেই মাথায় গণ্ডগোল? নাহলে মানুষ হয়ে উড়ে বেড়ানো কার ইচ্ছে হয়?
কিন্তু দেখা গেল, ঘণ্টাখানেকের মাথায় সেই ওড়াউড়ি মানবই আগে রেডি। সাবিহাকে ফোন দিয়ে বলল, “তোমরা রেডি তো? আমি কিন্তু সরাসরি ওখানেই যাব!”
“যাবাই তো! জীবনে একটা কাজের কাজ করেছ? আমার ভাই এখন ফাল দিয়ে উঠেছে, সেখানে তো তোমাকে সায় দেয়াই লাগবে! যাও, সকালে কেন যাবা? এখনই যাও!”
রফিক বোল্ড আউট হয়ে বাবার কাছে কল দিলো। ফোনের ভেতরেও ফিসফিস করে বলল, “বাবা, ঘটনা কী?”
“বুঝতে পারছি না। তুইই কিছু করেছিস মনে হয়, তোকে সামনে না পেয়ে নিষ্পাপ মানুষগুলোর উপরে রাগ ঝাড়ছে বেচারি!” তার কণ্ঠে আফসোস ঝরে ঝরে পড়ল।
রফিক ব্যাগ গোছানো বাদ দিয়ে মাথা চুলকে মরল এই ভেবে— যে সে আসলে করেছেটা কী!
রাগে রাগে সাবিহা ব্যাগ গোছালো। ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে শ্বশুরের হাওয়ালা করে সে রান্নাঘরে ঢুকল। ফ্রোজেন কিছু নাগেটস ছিল, আর কিছু বানালো। পাটিসাপটা বানিয়ে কিছু পুলি পিঠাও করল। তিন ঘণ্টার দূরত্বে শিশুর মস্তিষ্ক নিয়ে একটা একত্রিশ বছর বয়সী ছেলে থাকে। সেই ছেলেটার জন্য সাবিহার দিন-রাত এক করে বুক পোড়ে। সেই পোড়া বুকে মলম লাগানোর জন্য সাবিহা রাত জেগে রান্নাঘরে পড়ে রইলো। মেজাজ দেখিয়ে প্রায় ফেলে দেয়া নারিকেল দিয়ে নাড়ু বানালো। পায়েস বানাতে বানাতে যতরকম বকাঝকা করা যায়, সব করল একটা হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবি মনে করে। বিয়েটা যেন ভালোয় ভালোয় মিটে যায়— রাগের মাথায় এই দোয়াটাও কখন করে ফেলল— সাবিহা টেরই পেলো না!
ভোর সকালেই গুছিয়ে নিলো তারা। ফজর পড়েই বেরিয়ে পড়লেন হীরা। যেতে নাকি তিন ঘণ্টা লাগে। বাস সামনে পেয়ে তাতেই উঠে পড়ল। বহুদিন পর কুন্দকলি একেবারে ফাঁকা হলো।
পৌঁছে দেখা গেল রফিক আয়েশ করে স্ট্যান্ডে বসে আছে। সাবিহা ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, “বাবা, আপনার ছেলের ব্যস্ততা দেখেছেন? মেজাজটা কি এমনি এমনি গরম হয়?”
হীরা চৌধুরী ঘন ঘন মাথা নাড়লেন, “চাপকে ওর পিঠের ছাল তুলে ফেলা দরকার!”
“ঠিক সময়ে কাজটা করলে আজকে আমাকে ভুগতে হতো না বাবা!”
“সরি বৌমা! তুমি বললে এখনই একটা থাপ্পড় দিয়ে কাফফারা আদায় করে নিচ্ছি।”
“থাক, লোকের সামনে আর হাঙ্গামার দরকার নেই। তবে আপনি এবার বাড়িতে যেয়ে শুনবেন এই লোকের বাড়ি আসতে কী সমস্যা? বাড়ি ছাড়া সব জায়গায় যাওয়ার জন্য তার সময় থাকে। কী চলছে তার মনে এটা আমি জানতে চাই!”
“অবশ্যই শুনব! একটা সিরিয়াস বিচার এবার হবেই!”
রফিক দুজনের ফিসফিসানি আর চেহারা ছবি দেখেই বুঝেছি তার কপালের দুঃখ আছে। আস্তে করে সম্বন্ধীর পেছনে যেয়ে বলল, “বড় দুজনকে তুমি সামলাও, আমি ছোটটাকে নিয়ে একটু লোপাট হচ্ছি।” বলেই সাই করে রিফাতকে নিয়ে কেটে পড়ল। সাবিহা কিছু বলার সময় অবধি পেলো না।
ব্যাগের বহর দেখে সাকিন বিস্মিত হয়ে বলল, “করেছিস কী! বাড়িতে আর কিছু বাকি আছে?”
“আছে।” অন্যদিকে তাকিয়ে গোমড়া মুখে বলল সাবিহা।
হীরা বললেন, “তুমি তো আমার বৌমাকে মোটেই দাম দাও না! কিন্তু সে সারা রাত ধরে জেগে জেগে তোমার জন্য একগাদা খাবার বানিয়েছে!”
সাকিন আপ্লুত চোখে তাকালো, “তুই না ঘষেটি বেগম হবি?”
“হবো না কে বলেছে! খাবার এনেছি এবার বিষ মিশিয়ে দেব!”
সাকিন বোনের রাগ দেখে হেসে ফেলল। এও ভাবল ফাবিহাকে দেখে ওর প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে।
অসম্ভব রেগে থাকলেও সাকিনের বাড়ি দেখে সাবিহা গলে পানি হয়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিলো। কপট গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “ঘর তো ভালোই পছন্দ করেছিস! এবার ঘরওয়ালি দেখা যাক।” কুন্দকলিতে উঠান থাকলেও কেমন আটকা আটকা ভাব ছিল। সম্ভবত আশপাশে বড় বড় দালান থাকার কারণেই। এখানে তেমন নেই। পাশের বাড়িগুলোও বেশ দূরে দূরে। চারপাশের খোলা আবহাওয়া হেসে-খেলে লুটোপুটি খাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
বিকেল নাগাদ ইরফানের বাবার কাছে ফোন দিলো সে। ফোন হাতবদল হয়ে মনিরার কাছে চলে গেল।
সাকিন বলল, “চাচী, আমার বোন এসেছিল। একটু যদি ফাবিহার সাথে দেখা করার সুযোগ থাকে…”
মনিরা তটস্থ হয়ে গেলেন। ছেলের বাড়ির লোক আচমকা এলে কী ভজঘট অবস্থা হবে ভেবেই অস্থির বোধ করলেন তিনি।
বিব্রত কণ্ঠে বললেন, “বাবা, ওরা তো কেউ জানে না। একটু গোছগাছের বিষয় আছে…!”
“কোনো বিষয় নেই চাচী! আমরা কিন্তু আগে থেকেই পরিচিত। আর সাবিহা, আমার বোন আসলে জানে না কাদের সাথে কথা-বার্তা চলছে। আপনি চাচীকে শুধু বলুন আমি সাবিহাকে নিয়ে আসছি। গোছগাছ নিয়ে কিচ্ছু চিন্তা করা লাগবে না!”
সে যতই বলুক। মনিরা নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। নিজের ঘরে শুকনো খাবার যা ছিল তাই নিয়েই ছুটলেন। কিছু সুঁইয়ের পিঠা ছিল, সেগুলি ভেজে চটপট সেমাই তৈরি করে ফেললেন। শর্ট নোটিশে এরচেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভব ছিল না।
সিমি বেজায় বিরক্ত হয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। মনিরা ফুপু বিজলীর মতো উদয় হয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। বললেন, “রাস্তার মাঝখানে যেয়ে দাঁড়িয়ে থাক।” কেন? সে কি কাকতাড়ুয়া? এই ফুপুটা ভালো মানুষ হলেও ভেজাল আছে। আচমকা মাতুব্বরি করে হাড়-মাংস এক করে ফেলে। শুধু সাকিন ভাইয়ের সাথে বিয়ের ঘটনাটা ঘটিয়েছে বলেই সে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না।
পড়ন্ত রোদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার মনে হলো মনিরা ফুপু আসলে সাবিহা আপার মতো। আচ্ছা, সাবিহা আপা কি বিয়ের কথা জানে? জানলে একটা ফোন দিলো না কেন?
ভাবতে ভাবতেই একটা ভ্যান এসে তার সামনে দাঁড়ালো ঠিক তার সামনে। চোখ ওঠানোর আগেই কেউ তাকে ছো মেরে বুকে জাপটে ধরল। সিমি শুনতে পেলো মমতায় ভেজা একটা কণ্ঠস্বর।
“সিমি! কেমন আছিস? তোরা এখানে থাকিস? আমার ভাইয়াও তো এখানে থাকে! ওকে দেখেছিস?”
সিমির দম আটকে আসছিল। সে কোনো মতে বলল, “আপনি যেভাবে ধরছেন! ইন্নালিল্লাহ হয়ে গেলে কাউকেই আর দেখা লাগবে না!”
সাবিহা ওকে ছেড়ে দিতেই বুকে হাত দিয়ে দম ছাড়ল সে। সাকিনের দিকে তাকিয়ে কী যে খুশি হলো! চাতক পাখির মতো রিফাতের দিকে তাকিয়ে ছিল। ভাবছিল বাচ্চাটা বোধহয় ওকে ভুলেই গেছে। কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণ করে রিফাত ডেকে উঠল, “তিমি! তিমি!” ঝটপট ওকে কোলে নিলো সিমি।
সাকিন এগিয়ে এলো।
“আয়।”
সাবিহা বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো। রফিক বড় বড় পা ফেলে ভেতরে চলে গেছে। হীরা বললেন, “বৌমা! আমি যা ভাবছি তুমিও কি তাই ভাবছ?”
“আমি কিছুই ভাবতে পারছি না বাবা!”
উঠানে পা রাখতেই তার মাথা ঘুরে ওঠার উপক্রম হলো। নূরজাহান বাইরের রান্নাঘরে ছিলেন। ছুটে এসে সাবিহাকে জড়িয়ে ধরলেন। সাবিহা দেখল ঘরের বারান্দায় ফাবিহা দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে মনিরা ফুপু। তার মনে হলো মাথায় ঠিকঠাক নেটওয়ার্ক পাচ্ছে না। দূর্বল কানেকশনের কারণে কেবল গোল গোল ঘুরছে!
“চাচী, আপনি কি মেয়ে পক্ষ?”
নূরজাহান হেসে ফেললেন, “হ্যাঁ।”
“পাত্রী কি ফাবিহা?”
“হ্যাঁ।”
সাবিহা ঝট করে দাঁড়িয়ে আগুন চোখে ভাইকে খুঁজল। সাকিন তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সেই হাসিতে চোখ আটকালে আর তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারল না সে।
“কেমন ফাযিল চাচী! আমাকে কিচ্ছু বলেনি!”
নূরজাহান সংক্ষেপে ঘটনা জানালেন।
সাবিহা ক্ষোভ নিয়ে বলল, “জ্ঞানের কান্ডারী! নিজেই একবার নিষেধ করে নিজেই আবার নিয়ে করতে এসেছে! ওকে বের করে দিচ্ছেন না কেন চাচী!”
নূরজাহান বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন, “সাকিন নিষেধ করেছিল নাকি? নিষেধ তো করেছিল ফাবিহা!”
সাবিহা অবাক হয়ে তাকালো। পরপর দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “কি জোড়া মিলেছে দেখেছেন? দুইজন দুইজনকে রিজেক্ট করে নিজেরাই আবার এক বছর পরে মত দিয়েছে! উচিত হয়েছে! ওদেরই বিয়ে করা উচিত! আমি আরও আপনার থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে থাকছিলাম এই ভয়ে যে আপনাকে বলতে হবে আমার গুণধর ভাই রাজি না।”
“আর আমি ভাবছিলাম আমাকে মেয়ের কথা বলতে হবে!” নূরজাহান হেসে ফেললেন।
“ঘটনা তাহলে দুই দিক থেকেই ঘটেছে!”
“তাই তো দেখছি!” বলে সাবিহা ঘরের দিকে গেলো।
ফাবিহাকে জড়িয়ে ধরতেই তার কণ্ঠ ভিজে এলো। ওর চেহারায় হাত বুলিয়ে বলল, “মুখটার কী অবস্থা হয়েছে! খাওয়া-দাওয়া একদম করো না!”
ফাবিহা ছলছলে চোখে বলল, “কেমন আছেন আপা?”
“এতক্ষণ খুব রাগ রাগ ছিলাম! এখন মনে হচ্ছে এত ভালো কোনোদিন থাকিনি!”
ফাবিহার ভেজা চোখের জ্বলজ্বলে হাসিটাকেই সাবিহার কাছে মনে হলো বিয়ের সবচেয়ে নজরকাড়া অলংকার!
ফারদিন নিজের করার মতো কোনো কাজ খুঁজে পাচ্ছিল না। অবাক হয়ে দেখল তার ভাগে কোনো কাজ নেই। সবাই নিজেদের মাঝে সবকিছু ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছে। যার কাজ না করাটাই ছিল নিয়ম, তার জন্য কাজ রাখাটা প্রহসন নয় কি? নিজেকে বড় অনাহুত মনে হলো তার। মনে হলো সিমির চেয়েও বেশি অনাকাঙ্খিত সে।
ফাবিহা নূরজাহানকে বলেছিল ফারদিনের সাথে বিয়ের বিষয়ে আলোচনা করতে।
নূরজাহান শক্ত কণ্ঠে বলেছেন, “কোনো কিছু আলোচনা করার দরকার নেই! ওর বোঝা দরকার আমাদের ওর কোনো দরকার নেই!”
“আম্মু! তুমি আবার ভাইয়ের ওপরে রাগ দেখিও না! আর এসব ভালো লাগে না! ও নিজের ভুল যখন বুঝেছে এই বোঝাটাই ওর শাস্তি হিসেবে যথেষ্ট। আলাদা করে আর কিছু বলা লাগবে না!”
“কিন্তু…!”
“কোনো কিন্তু না! আম্মু, ভাইয়া ছাড়া আমাদের আর কে আছে বলো? ওকে আর দূরে ঠেলে দিও না। যে কাছে আসতে চাচ্ছে তাকে দূরে ঠেলে দিলে আর যদি ফিরে না আসে?”
নূরজাহান ছেলের কাছে গেলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা সবার আগে ওকেই করলেন।
“বিয়ের তারিখ কবে ফেলব বল তো?”
ফারদিন থতমত খেয়ে গেল। চেষ্টা করেও ভেবে-চিন্তে একটা উত্তর দিতে পারল না।
“তোমরা যেদিন ভালো মনে করো!”
“মেয়ের ওয়ালি তুই। শুধু নামেই না, কাজেও হওয়া লাগবে।”
ফারদিন চুপ করে গেল। খানিকক্ষণ পর বলল, “বড় অনুষ্ঠান করলে একটু সময় দরকার। ছোট হলে এই সপ্তাহেই হয়ে যেতে পারে।”
নূরজাহান ছেলের এটুকু বিচারেই খুশি হলেন।
ওদিকে সাবিহা ধোঁয়া তুলেছে, “আজ রাতেই কাজী ডাকি চাচী!”
নূরজাহান ননদের দিকে তাকালেন।
মনিরা হা হা করে উঠলেন, “তাই আবার হয় নাকি! আয়োজনের একটা বিষয় আছে না?” তার স্বামীও সায় জানালেন।
“আয়োজন আবার কী! ছেলেমেয়ে আছে, তাদের অভিভাবক আছে। ফট করে কাজী ডেকে চট করে কবুল বলে ফেলবে। ব্যস!”
এই এতক্ষণে ভরা মজলিশে ফারদিন কথা বলল।
ইতস্তত কণ্ঠে বলল, “বাকি চাচাদের, খালাদের একটু জানানো লাগবে।”
সাকিন বলল, “মামীকে…” সাবিহার চোখ রাঙানিতে তাকে মুখ বন্ধ করতে হলো।
রফিক বলল, “তাহলে পরের শুক্রবারে হোক? আমার মনে হয় অত আয়োজন-ফায়োজনের দরকার নেই। নিজেদের দু-চারটা লোক হলেই যথেষ্ট!”
মনিরা খুশি হলেন, “হ্যাঁ তাহলে ঠিক আছে!”
সাকিন বিড়বিড় করে বলল, “সোমবারে একটা ছুটি ছিল…”
রফিক বিদ্যুৎবেগে পাশে বসে থাকা সাকিনের নিরীহ মুখটা দেখে নিজের প্রস্তাবেই ভেটো দিলো।
“না! শুক্রবার বেশি দেরি হয়ে যায়! আজকে শনিবার, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে দাওয়াত দিন, কলকে সবাই আসুক, সোমবারে বিয়ে পড়িয়ে দেয়া হোক। ওইদিন সাকিন ভাইয়েরও ছুটি আছে। কী বলো সাকিন?”
সাকিন থতমত খেয়ে তাকালো। রফিক যে তার কথায় শুনে ফেলেছে এটা বুঝেই ভেতরে ভেতরে লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল।
সাবিহা মনে মনে রফিককে একগাদা বকা দিয়ে ফেলেছে। বেয়াক্কেল লোক! শুধু শুধু এক সপ্তাহ দেরি করার কী দরকার!
এই পর্যায়ে এসে তার রফিকের কথা পছন্দ হলো। নিজে কিছু না বলে হীরা চৌধুরীকে খোঁচা দিয়ে বলল, “বাবা! বলুন এটাই সবচেয়ে ভালো! বলুন বলুন! আপনি বললে কেউ ফেলতে পারবে না!”
হীরা বললেন, “শুক্রবারের প্রস্তাবটাই তো ভালো ছিল! তাড়াহুড়া শয়তানের কাজ..!”
সাবিহা নিচু কণ্ঠে বলল, “পায়েস কিন্তু বাবা একটুও পাবেন না!”
হীরা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “সোমবারেই থাকুক! পাত্র-পাত্রী ফাইনাল হয়ে গেলে আর দেরি করা ঠিক না! আজকে থেকেই গোছগাছ করো তোমরা।”
কেউ আর তার কথার ওপরে কিছু বলতে পারল না।
নূরজাহান যদিও চাইছিলেন না শেলী আসুক, কিন্তু মুখ রক্ষা জন্য হলেও বলতে হয়। এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে শেলীই সবার আগে হাজির হলো।
ক্ষোভের সাথে বলে গেল সজীবের কথা।
“খাচ্চরের ঘরের খাচ্চর! এমন বেহায়া ছেলে আমি জীবনে দেখিনি! ফাবিহার নামে যখন কথা বানাচ্ছিল আমি কত করে সবাইকে বললাম এই ছেলে মিথ্যুক, আমার মেয়ে এমন করতে পারে না— একটা মানুষও কানে নিলো না! এখন হয়েছে না? খুব ভালো হয়েছে! ওর একেকটা বিয়ে ভাঙে আর আমার কলিজাটা ঠান্ডা হয়ে যায়!”
কেউ তার কথার গুরুত্ব দিচ্ছিল না। এমনকি নূরজাহান নিজেই সেসব কথায় কান দিলেন না।
ফাবিহা অবাক হয়ে দেখল তার খালা এক ওয়াক্ত নামাজও পড়ছে না। অথচ তিনি নিয়মিত নামাজ পড়তেন। নূরজাহান নামাজের কথা বলতেই অজু করলেন, জায়নামাজ হাতে নিয়ে আবার গল্পে মশগুল হয়ে গেলেন। খালাত বোন কথায় বলল, শেলী নাকি প্রায় দুই বছর ধরে নামাজ তেমন একটা পড়েন না। রোজার সময় দুই এক ওয়াক্ত পড়লেও নিয়মিত না।
ফাবিহার শরীর শিউরে উঠল। গুনাহের পরিণতি বড় ভয়ংকর। পরকালের হিসাব তো পরকালে, দুনিয়ার হিসাবটাই কঠিন। যে বোঝে এটা তার শাস্তি, সে তো বুঝলই। কিন্তু যে বোঝে না— তার অবস্থা আরও ভয়াবহ।
এই যে শেলী, বুঝতেই পারছেন না— তিনি ইচ্ছে করে নামাজ পড়ছেন না বিষয়টা এমন নয়। আল্লাহ তার থেকে আর কোনো সিজদাহ চান না। শেলীর শরীর সুস্থ, মন ভালো অথচ তার কপাল সিজদাহ দিতে পারছে না। তিনি বুঝতেই পারছেন না চাইলেই নামাজ পড়া যায় না। তার থেকে নামাজ পড়ার সামর্থ্যই কেড়ে নেয়া হয়েছে।
সোমবার চোখের পলকে চলে এলো। সাবিহা এর মাঝে শহর থেকে ফাবিহার জন্য শপিং করে এনেছে। সে কথা শুনে মনিরা বলেছেন— “আমরা পিছিয়ে থাকব কেন?” বলে তিনিও স্বামী আর ছেলেকে বগলদাবা করে শহরে ছুটেছেন বিয়ের বাজার করতে।
নূরজাহান ঝাপসা চোখে দেখছিলেন সবকিছু কত সহজভাবে হয়ে যাচ্ছে! তাকে কোনো কষ্টই করতে হলো না। কীভাবে কীভাবে যেন তার মেয়েটা বউ সেজে ফেলল!
বিয়ের বন্দোবস্ত ফাবিহাদের বাড়িতেই হলো। সাবিহার তাড়ায় খাওয়ার আগেই বিয়ে পড়ানোর আয়োজন হলো। ফাবিহা তার ঘরে ছিল। মনিরা কোত্থেকে কিছু মেয়ে ধরে এনেছেন, তারাই ফাবিহার হাতে মেহেদী দিয়ে দিল। তবে মুখে তাদের হাত লাগাতে দিলো না ফাবিহা। টুকটাক সাজগোজ সে নিজেই জানত। সেটুকুই সম্বল করে নিজের মতো করে সাজল। নূরজাহান ছুটে ছুটে এসে মেয়েকে চোখ ভরে দেখে গেলেন। তার গলা শুকিয়ে আসে, তবু তার ঠোঁট থামে না। তারা অচেতনেই আলহামদুলিল্লাহ্ পড়তে থাকে। পড়তেই থাকে…
ফারদিন যখন ফাবিহার মত নিতে এলো তখন সে ভয়ে এইটুকুন হয়ে গেছে। সব পরিচিত মানুষ— অথচ বুক ঢিপঢিপ করছে এমনভাবে মনে হচ্ছে ওখানে পাহাড় ধ্বস হচ্ছে। এক হাতে দোপট্টার এক প্রান্ত, আরেক হাতে সিমির হাত ধরে ছিল সে।
ফারদিন এসে রেজিস্ট্রি খাতা সামনে রাখল। কলম হাতে নিয়ে গিয়ে থরথর করে ফাবিহার হাত কেঁপে উঠল। কী মনে করে তার পাশে বসল ফারদিন।
কেউ ফাবিহাকে তাড়া দিলো না। সাবিহা চুপচাপ তার পেছনে দাঁড়িয়ে রইলো। এক পর্যায়ে সইটা করে ফেলল ফাবিহা। আর তারপরই আস্তে করে ফারদিনের কাঁধে ঢলে পড়ল।
যখন তার জ্ঞান ফিরল তখন রাত বেড়েছে।
খাওয়া-দাওয়ার পাঠ শেষ হতেই নূরজাহানের ভাই বোনেরা বিদায় নিলো। সাবিহা অবাক হয়ে গেল তাদের দেখে। বিয়ে বাড়ি তো মুখের কথা নয়! কতরকম কাজ! একটা বিধবা মহিলাকে এভাবে ফেলে চলে যেতে দেখেই সে বুঝে গেল ফাবিহার নানার বাড়ির লোকজন আসলে কেমন। মনিরাও এই কয়েকদিনের নিরবিচ্ছিন্ন ছোটাছুটিতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এই ঘণ্টাখানেক আগেই প্রেশার ফল করে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন।
ফাবিহার জ্ঞান ফিরতেই পাপিয়া সাবিহাকে তাড়া দিলেন, “ওরা কি আজকে এখানেই থাকবে?” ছেলে-মেয়ে নিয়ে তিনি গতকালই এসেছেন।
“না! ওদিকে তো ঘর সাজানো হয়েছে। ওখানে যাওয়ার কথা আগেই বলে রেখেছি!”
“তাহলে আর দেরি করছিস কেন! চল! আর রাত করার দরকার নেই!”
সাবিহা কথাটা নূরজাহানকে বলতেই তিনি অস্থির হয়ে মেয়েকে গুছিয়ে দিলেন। অথচ সাবিহার মাথায় অন্য চিন্তা ঘুরছে।
নূরজাহান একদম একা। এই শরীরে এত গোছগাছ করতে গেলে তিনি নির্ঘাত অসুস্থ হয়ে যাবেন! সে রফিকের কাছে যেয়ে বলল, “চাচী এখানে একদম একা! আবার ফুপুও অসুস্থ হয়ে গেছে। তুমি সবাইকে নিয়ে চলে যাও। আমি আজকের রাতটা এখানে থাকি। চাচীকে একটু গুছিয়ে দিই। কালকে ফজর পড়ে আমাকে নিয়ে যেও।”
রফিক এক বাক্যে মেনে নিলো।
যাবার সময় দেখা গেলো আরেক চমক।
সাকিনের ছাত্ররা কোত্থেকে একটা গরুর গাড়ি জোগাড় করেছে। ঝালর দিয়ে সেই গাড়ি সাজিয়ে একাকার! তাতেই নাকি বর-বউকে যেতে হবে!
সাকিন সাবিহার কাছে বলল, “ফাবিহার কোনো সমস্যা হবে কি না জিজ্ঞেস কর।”
সাবিহা মুখ মোচড় দিলো, “তুই জিজ্ঞেস কর!”
সাকিন অসহায় চোখে তাকালে মায়া হলো তার। ফাবিহার কাছে গেলে সে জানালো কোনো সমস্যা নেই। বিশাল এক চাদর তার মাথায় দিতেই শরীরের ঊর্ধ্বাংশ ঢেকে গেলো। সেভাবেই গরুর গাড়িতে উঠে পড়ল সে। গাড়িতে সাকিন আর সে ছাড়া আর কেউ রইলো না।
পথ পেরিয়ে গাড়িটা যখন অন্ধকার মাটির রাস্তায় ঢুকেছে, তখন ঝাঁকুনি লাগতে শুরু করল। সাকিন আলগোছে ফাবিহার সামনে এসে বসল।
স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, “এখন কেমন লাগছে?”
“ভালো।” নরম কণ্ঠে বলল ফাবিহা।
চারদিকে ঝিঁঝিঁর কেবল কলতান। থেকে থেকে জড়িয়ে ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ ভেসে আসছে।
ফাবিহা ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, “একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“করো।” সামনে তাকালেও একটা অবয়ব ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলো না সাকিন।
“আপনি এতদিন বিয়ে করেননি কেন?”
“মেয়ে খুঁজে পাচ্ছিলাম না।”
“দেশে কি মেয়ের অভাব!”
“না। আমারই সমস্যা।”
“কী সমস্যা?”
“দেড় বছর আগে স্ট্যান্ডার্ড বেশি হাই হয়ে গিয়েছিল।”
ফাবিহা বুঝতে পারল না, “কীসের স্ট্যান্ডার্ড?”
সাকিন কোনো উত্তর দিলো না। কিন্তু ফাবিহার মনে হলো সে হাসছে।
আর কিছুদূর যেতেই সাকিন বলল, “তুমি কি একটু হাঁটতে পারবে?”
“পারব।” ঘোমটার ভেতর থেকে জায়গাটা দেখার চেষ্টা করল সে। কোনো লাভ হলো না। অন্ধকারে দূর থেকে ভেসে আসা এক বিন্দু আলো কেবল আঁধারকেই গাঢ় করছে।
সাকিন গলা উঁচিয়ে চালককে থামালো, “এখানেই রাখেন চাচা!”
সাকিনের হাত ধরে নামতেই খেয়াল করল সাকিন হাতটা ছাড়েনি। ফাবিহাও আর সে চেষ্টা করল না।
গাড়িটা চলে যেতেই তারা ছোট্ট একটা পথে ঢুকল। ডান পাশে বড় রাস্তাটা অবহেলায় পড়ে রইলো।
সাকিন বলল, “শাড়িটা ধরে নিও, রাস্তাটা একটু উঁচু-নিচু।”
“আমরা নামলাম কেন?”
“এটুকু হেঁটে যাওয়ার জন্য।”
ফাবিহা আশেপাশে তাকালো। দূরে দূরে ছোট ছোট বাড়ি দেখা যাচ্ছে। সেই বাড়িতে টিমটিম করে জ্বলে বিন্দুর মতো হলদে আলোটাকে মনে হচ্ছে এক একটা জোনাকি পোকা। এক পাশে সারি সারি গাছ, আরেক পাশে দিগন্ত বিস্তৃত ধানের মাঠ। পথের ধারে অনেক দূরে দূরে একটা করে হলুদ বাতি জ্বলছে। বর্ষা-শীতের মিলনে কিছু শিশিরের জন্ম হয়েছে। রাত-বিরেতে তারা নবদম্পতিকে ভেজানোর কাজে নিযুক্ত হয়েছে।
“রাস্তাটা কি আপনার পছন্দের?” ফাবিহা জিজ্ঞেস করল। জনশূন্য পথ দেখে ঘোমটা অনেকখানি সরিয়েছে।
“হ্যাঁ। তোমার ভালো লাগছে না?”
“এখন তো দেখতে পারছি না।”
“আরেকটু পরেই দেখতে পাবে।”
বলতে বলতেই তারা আরও অন্ধকার এক রাস্তায় ঢুকল। আশেপাশে কোনো বাতি নেই। কিন্তু সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আকাশের দিকে তাকালো ফাবিহা। পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদ নিজের সমস্ত রূপ নিয়ে আকাশে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। ভরা জোছনা বান ডেকেছে এই ছোট্ট গ্রামের মাঠে।
সে অবাক হয়ে বলল, “কী সুন্দর!” খেয়াল করল তার হাতের বাঁধন শক্ত হচ্ছে।
“একটু আগে এত অন্ধকার লাগছিল কেন?” ফাবিহা জিজ্ঞেস করল।
“ওই রাস্তায় অনেক গাছ, এজন্য।”
আর দু’মিনিট হাঁটতেই তারা বাড়িয়ে দরজার সামনে পৌঁছে গেলো। সকলে ইতোমধ্যেই চলে এসেছে।
ডান হাতে দরজা খুলে একপাশে সরে দাঁড়ালো সাকিন। ফাবিহাকে ঢোকার রাস্তা দেখিয়ে চমৎকার হেসে বলল, “আশা করি, শ্রদ্ধার লোভী সেই মেয়েটার জন্য এই অধমের দু’চোখের ভাষা কখনও বদলাবে না!”
ফাবিহার মনে হলো চাঁদ আকাশে আছে ঠিকই, কিন্তু পূর্ণিমা দ্যুতি ছড়িয়ে দিচ্ছে ঠিক তার সামনে। এই চমৎকার বনজোছনায় দাঁড়িয়ে অনুভব করল, সে ঠিক ঠিক তার শিশিরকে খুঁজে পেয়েছে। এই যে ভিজিয়ে দিচ্ছে সমগ্র দেহ-মন!
চলমান~
(দিয়ে দিয়েছিইইইইইই!
সবাই দুইটা করে কমেন্ট না করলে কাট্টি 😒)