#বনজোছনা
৪৪.
সকালের সোনারঙা রোদটা ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে এসে লুকোচুরি খেলছে ঘরের মেঝেতে। ঘুলঘুলিতে আঁকা কলকের নকশার মনোরম ছাপ ফেলেছে সেখানে। সেই এক ফালি লম্বা রোদ্দুর পথে ধোয়ার মতো উড়ে উড়ে যাচ্ছে অদৃশ্য ধুলোবালির মিছিল। ফাবিহার মাথায় চট করে একটা প্রশ্ন উদয় হলো। নক্ষত্রের নাম ছায়াপথ হয়, রোদ্দুরপথ কেন হয় না? বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে শীতের ঘুম ভাঙানি রোদের রূপ দেখলে নিশ্চয়ই মহাকাশবিদগণ এই নামটা রাখতেন। সে ভেবে রাখল সাকিন এলে এই প্রশ্নটা করবে। গতকাল কবুল বলার পর থেকে সে সম্ভবত লোকটিকে উদ্ভট সব প্রশ্ন করার একটা অধিকার হস্তগত করে ফেলেছে। সেই মানুষটিও বড় গুরুত্বের সাথে তার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। এর বাইরে অবশ্য তার কোনো কথা নেই। সারাক্ষণ মৌনব্রত পালন করাই যেন তার প্রধান কাজ।
ফজর পড়ে সে যে হাঁটতে যাবে এটা ফাবিহাকে বলে গিয়েছিল। সে নিজেও নামাজ পড়ে সাবিহার সাথে দেখা করে এসেছে। রাতে এ বাড়িতে আসার পর জানতে পেরেছিল সাবিহা ও বাড়িতে থেকে গেছে। কেন থেকেছে কারণটা শোনার পর কৃতজ্ঞতায় সে বোবা হয়ে পড়েছিল। খুব দোয়া করেছিল, ভালোবাসার গ্রাফ আর উঁচু না হলেও এটুকু যেন আজীবন বজায় থাকে।
বেচারি অন্য জায়গায় আরাম করে ঘুমুতে পারেনি। তাই এসেই ঘুম দিয়েছে। সে কী করবে বুঝতে না পেরে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছিল। মামী শাশুড়ি বললেন নিজের ঘরে যেয়ে বসে থাকতে। সাবিহা উঠলে তার সাথে থাকলেই হবে। এছাড়া নিয়ম রক্ষার জন্য তেমন কোনো মুরুব্বীস্থানীয় লোক তো নেই। সে আদেশ মান্য করেই ফের ঘরে এসে ঘাটি গেড়েছে ফাবিহা।
একটা খাট, ছোট একটা টেবিল আর তার পাশে একটা আলনা— এই হলো ঘরের মোটামুটি আসবাব। ফলে ফাঁকা জায়গা বেশ অনেকখানি। সানন্দে খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করল ফাবিহা। খেয়াল করল মায়ের জন্য তেমন একটা কষ্ট হচ্ছে না তার। সম্ভবত তিনি খুব কাছে আছেন, চাইলেই ছুটে যাওয়া যাবে, সবচেয়ে বড় কথা বেঁচে আছেন— এটুকুই তাকে শান্তি দিচ্ছে। বড় রকম বিচ্ছেদের ধাক্কায় এই দূরত্বের বিরহটুকু তার কাছে আর কিছুই মনে হচ্ছে না।
বিছানার পাশের দেয়ালে একটা ঝুলন্ত শেলফ। সেখানে থরে থরে বই সাজানো। বেশিরভাগ ‘নওরোজ’। অন্তত বিশ কপি তো হবেই। গত রাতে অবাক হয়ে সে জিজ্ঞেস করেছিল, “একই বই এতগুলো দিয়ে আপনি কী করেন?”
সাকিন বলেছিল, “ছাত্রদের দিই।”
এই যে মানুষটার চুপচাপ, নীরবে সব করে যাওয়া— তাকে এত অবাক করে! ঠিক শান্ত নদীর মতো বয়ে চলেছে। কোনো জাঁকজমক নেই, আড়ম্বর নেই। অবিকল স্নিগ্ধ ভোরের মতো। অধিকাংশ মানুষই যাকে অনুভব করতে পারে না। অথচ দিনের সব সৌন্দর্য ওখানেই লুকিয়ে আছে।
টেবিলের ওপর একটা ডায়েরি আধখোলা অবস্থায় পড়ে আছে। ভোরের দিকে ঘুম পাতলা হয়ে গেলে সাকিনকে এখানে বসে থাকতে দেখেছিল সে। ঘুমের তাড়নায় তখন কিছুই বোঝার অবস্থা ছিল না। সেই ভোর সকালে উঠে লোকটা লেখালেখি করছিল? কৌতূহলবশত ডায়েরিটা খুলে ফেলল ফাবিহা। হঠাৎ করেই মনে হলো, বহুদিন পর এমন আয়েশ করে ডায়েরি পড়তে বসেছে সে। সেই কবে ‘নওরোজ’ লেখা হয়েছিল— তারপর তো ফরিদও আর ডায়েরি লেখেননি, তারও আর পড়া হয়নি।
শাড়ি গুছিয়ে চেয়ারে পা তুলে বসল। আবার উঠে যেয়ে বিছানা থেকে একটা বালিশ এনে কোলে রাখল। ডায়েরি খুলতেই সাকিনের পরিচ্ছন্ন হাতের লেখা দৃষ্টিগোচর হলো। কোথাও কোনো কাটাকাটি নেই। এখনও পুরোপুরি যাকে চেনা হয়নি তার মনছবি জানতে প্রবল উত্তেজনা বোধ করল ফাবিহা।
তারিখ দেখে আজকের লেখার শুরুর পৃষ্ঠা বের করল সে।
“গত শুক্রবার যে সংকটে পড়েছিলাম, এমন সংকটে সম্ভবত এই জীবনে আর কখনও পড়িনি।
সাবিহা বিয়ের কথা-বার্তা তোলার পরই আমি বলে দিয়েছিলাম আগে বায়োডাটা দেখা চাই। সেটা পছন্দ হলে তারপর সামনাসামনি আলাপে যাওয়া যাবে। শুরুতেই পাত্র-পাত্রীর সাক্ষাৎ ব্যক্তিগতভাবে আমার অপছন্দ। এতে আশা যেমন বেড়ে যায়, নিরাশাটাও বড় বেশি প্রকট হয়ে পড়ে। বিয়ে তো কেবল দুটো মানুষের হয় না। দুই পরিবারের সাক্ষাৎ, আপ্যায়নের নামে অর্থ ব্যয়, সময় নষ্ট, সবচেয়ে বড় কথা দু’পক্ষের তৈরি হওয়া কিছু আশা— এসব ইনভেস্টমেন্ট অপচয় হওয়ার চাইতে দূর থেকে একটা বায়োডাটা দেখে আগানো যথেষ্ট নিরাপদ বলে মনে করি।
সেভাবেই সবটা হয়ে আসছিল। তবে সমস্যা হলো, যে কয়েকটা বায়োডাটা দেখার সুযোগ হয়েছে, তাতে কোনো মেয়েকেই তেমন ব্যক্তিত্বের মনে হয়নি যেমনটা আমি আমার স্ত্রীর কাছে আশা করি। আর কিচ্ছু না হোক, অন্তত বিয়ে কেন করতে চাইছে— এই প্রশ্নের বিপরীতে বারবার যে উত্তর পেয়েছি তাতে মনে হয়েছে এরচেয়ে একা থাকাই উত্তম!
তখনও বুঝতে পারিনি, আমার মনে অবচেতনেই একটা স্ট্যান্ডার্ড কনস্ট্যান্ট হয়ে গিয়েছিল। তার সাথে মেলাতে গিয়ে বারংবার হতাশ হয়েছি। গত শুক্রবার রাতে বুঝতে পেরেছি, সমস্যাটা আসলে আমার ছিল। একজনের ছাঁচে ফেলে আরেকজনকে কখনই মাপা যায় না।
ইরফানের মা সেদিন দুপুরে আচমকা দাওয়াত দিলেন। এর আগেও তিনি দাওয়াত দিয়েছেন। কিন্তু তার ভাই মারা গেছে এ কথা শোনার পর মুখের ওপর না করাটা খুব নিষ্ঠুর মনে হয়েছে। এজন্য ইরফানকে বললাম বিকেলে যাবো। যদি জানতাম আমার জন্য ওরকম একটা আয়োজন করা হয়েছে, তাহলে বোধহয় কস্মিনকালেও যেতাম না। নাকি যেতাম? কে জানে!
যেয়ে বসতে না বসতেই ভদ্রমহিলা জানালেন তিনি আমার জন্য মেয়ে দেখেছেন। এই অবধি হলেও একটা কথা ছিল। কিন্তু তিনি রীতিমত মেয়েকে পাশের ঘরে বসিয়ে রেখেছেন! এটুকু শুনে মনে হলো আমার মাথায় বাজ পড়েছে!
মেয়ের বিবরণী যা শুনলাম তাতে তাকে বিচার করা যায় না। কারণ সেটা পুরোপুরি বাহ্যিক অবস্থা। ভেতরের অবস্থার কথা একমাত্র তার মুখে শুনেই তাকে বিচার করা উচিত। (যদিও আমি বিচার করার কেউ নই, তবুও বিয়ের ক্ষেত্রে যেটুকু না করলেই নয়)
কিন্তু এই গ্রামে স্ত্রী তো বহুদূর! তার ধারে-কাছে আছে এমন মানসিকতার মেয়ে যে পাবো না এটা মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম। ক্লাসের ছাত্রীদের দ্বারাই এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, এটা ভালো-খারাপের আলাপ নয়। আলাপটা সাযুজ্যের। এক বিছানার চাদরের সাথে আরেক বালিশের ওয়াড় দিলে ঘুমের কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু রুচিশীল মানুষ মাত্রই সেটা দৃষ্টিকটু। বিয়েটা তো কেবল জীবন কোনোরকমে পার করে দেয়ার বিষয় নয়! একটা ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সফরের জন্য সহযাত্রী বাছাই। কাজেই, সেটা কোনরকম হলেই হয় না। অন্তত আমার কাছে।
ফলে আমার অবস্থা যে কেমন হয়েছিল— সেটা ভাবলে এখনও গায়ে কাটা দিয়ে ওঠে। একদিকে মেয়েটা অপেক্ষায় আছে। তার সাথে দেখা না করেই মুখের ওপর না বলে দেয়া যে অপমান প্রদর্শন করে সেটা আমার পক্ষে করা সম্ভব ছিল না। আবার অপরদিকে যখন আমি আগে থেকেই জানি বিষয়টা কোনোভাবেই আগাবে না, তখন দেখাদেখি করে আশার পারদ বাড়ানোটাও সমীচীন নয়। এই গ্রামের মানুষ আমাকে শিক্ষক হিসেবে সম্মান করে, এমন এলোমেলো প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সেই সম্মানে যে খানিকটা আঁচ আসতে পারে এটা ভেবেও শঙ্কিত হয়েছিলাম। এই বহুমুখী সংঘর্ষের ফলে আমি সহসাই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না।
ইরফানের মায়ের অনুরোধ, অপরদিকে অপরিচিত মেয়েটির অপেক্ষা— শক্ত করে না বললে আমাকে কেউ জোর করতে পারত না। কিন্তু এই অবশ্যম্ভাবী অপমানের মুখে মেয়েটিকে ফেলতে মন সায় দিলো না। শক্তভাবে আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। আমার বড় একটা কমতি, আজীবনই আমি দূর্বল মানুষ। তবে ঘরে ঢোকার পর বুঝলাম, কিছু কমতিও মানুষের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে নামে।
ফাবিহা ছাড়া অন্য কোনো মেয়ে যদি ওখানে থাকত, তবে আমাকে বেশ বিব্রতকর একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো। যখন আমি না বলতাম, নিশ্চিতভাবেই ব্যাপারটা পাঁচ কান হতো। সাবিহার বিষয়ে চিন্তা করছিলাম না। মুখে ধমকা-ধমকি করলেও ওর মনে কী চলে আমি বেশ ভালোই বুঝতে পারি। সমস্যা হতো আশেপাশের মানুষ নিয়ে। একদম একা একা মেয়ে দেখতে গিয়েছি, এটাই তো দৃষ্টিকটু!
তবে এ সব নেতিবাচক চিন্তা করতে আর ভালো লাগছে না। যার মাধ্যমে এই পুরো ঘটনাটা ঘটেছে তিনি এখন আমার ফুপু শাশুড়ি। যে চিন্তা থেকে এই ঘটনাটা লিখতে শুরু করেছিলাম এবার সেটা লিখি।
নবী ইউসুফ আলাইহিস সালামকে যখন তার ভাইয়েরা কূপে ফেলে দিয়েছিল সেটা চর্মচক্ষুতে ছিল নিশ্চিত ধ্বংস। কিন্তু বিহাইন্ড দ্যা সিনে, এটা ছিল ভবিষ্যৎ মন্ত্রিত্বের সর্বপ্রথম ধাপ।
মুসা আলাইহিস সালাম যখন সাগর তীরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন সেটা ছিল আলটিমেট ডেস্টিনেশন। হয় শত্রুর হাতে মরতে হবে, নয়তো পানিতে ঝাঁপ দিতে হবে। পানির বুক চিরেও যে পথ হতে পারে এটা কে কবে ভেবেছিল?
সব ঘটনার মূলে যে বিষয়টা কাজ করে সেটা হলো— নিয়ত। আমি বলছি না আমার নিয়ত খুবই উচ্চ পর্যায়ের কিছু ছিল। আমার নিয়ত ছিল স্রেফ মেয়েটাকে অপমান না করা। তার বিপরীতে আল্লাহ আমার মান বাঁচালেন। এবং এত সুন্দরভাবেই বাঁচালেন…!
ফুপু কী চিন্তা করেছিলেন জানি না। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে কাজটা খুবই কৌশলী হয়ে গেছে। এমনভাবে অ্যাপ্রোচ করাটা জরুরি ছিল না।
আর এটাই মেইন পয়েন্ট! পরিবেশটা হয়তো জটিল, সাধারণ দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অনুকূলে। কিন্তু সেই বিপরীত অবস্থাটাও আমার প্রেক্ষিতে, আল্লাহর না। তিনি চাইলেই পাশার দান দমকা হাওয়ায় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। আর কত চমৎকারভাবেই না ঘুরিয়ে দিতে পারেন! তার চাক্ষুষ প্রমাণ জ্বলজ্বল করছে আমার অতি সাধারণ বিছানায়।
দু’দিন আগেও কি ভেবেছিলাম— স্রেফ একটা ফুলের উপস্থিতিতে আমার রিক্ত উদ্যান এমন ভরপুর বাগানে পরিণত হবে?”
লেখাটা শেষ করে থম মেরে বসে রইলো ফাবিহা। ডায়েরিটা রাখতে গেলেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো এক বছর পুরোনো একটা চিঠি। কালি ছড়িয়ে লেখার সৌন্দর্য যেন আরো বেড়েছে। চিঠিটা চিনতে এক মুহূর্ত লাগল না তার। উত্তেজনা, বিস্ময়, কষ্ট, কৌতুহল এবং খুব নতুন, নাম না জানা এক অনুভূতি মিলেমিশে তার মনাকাশকে পূর্ণভাবে দখল করে ফেলল। সে অনুভব করল তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে। স্পষ্ট সেই ঢিপঢিপ শব্দ শুনতে পাচ্ছে ফাবিহা!
তার দু’হাতের তালু ঘেমে এসেছিল। শাড়িতে মুছে আরেকবার লেখাটা পড়তে যাবে, সে সময় সাকিন শব্দ করে ঘরে ঢুকল। ডায়েরিটা রেখে ধপ করে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। ধরা পড়া চোরের মতো সাকিনের দিকে তাকালো। অনুমতি ছাড়াই পড়েছে, না জানি কী মনে করে! দাম্পত্যের প্রথম সকালেই এমনভাবে ফেঁসে অসম্ভব বিব্রত বোধ করল সে।
সাকিন এক পলক তার দিকে তাকালো। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, “কোনো সমস্যা?”
“ন..না।” ফাবিহার কথা বেঁধে আসছিল। সাকিন লুঙ্গি, গামছা নিয়ে কলপাড়ে চলে গেল। অথচ ফাবিহা স্পষ্ট দেখেছে সাকিন টেবিলের খোলা ডায়েরির দিকে তাকিয়েছে। এমনভাবে তাকিয়েছে যেন ফাবিহা ডায়েরি পড়বে এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়! তার মানে কি সে কিছুই মনে করেনি? ফাবিহার বুকের টর্নেডো আস্তে-ধীরে থেমে এলো। পরপরই মাথায় টং করে একটা কথা বারি মেরে উঠল! তার মানে এর আগে যা লেখা হয়েছে, সামনে যা লেখা হবে— সবকিছু পড়ার নীরব সম্মতি পেয়ে গেল সে! দু’গাল ভরা হাসি তাকে দখল করে ফেলল মুহূর্তেই।
সাকিন তাকে গতকাল রাতে বিশেষ কিছু উপহার দেয়নি, না দিয়েছে আজ সকালে। কিন্তু এই ক্ষণে ফাবিহার মনে হলো, নিজের একান্ত ব্যক্তিগত কোণে তার সময়-অসময়ের পদচারণায় নীরব সম্মতি দিয়ে সাকিন মূলত তার পুরো ব্যক্তিত্বটাই তাকে উপহার দিয়ে দিয়েছে। ফাবিহার চোখ ছলছল করে উঠল। উপহার হিসেবে মানুষ কতকিছুই না দেয়, নিজেকে ক’জনা দিতে পারে?
সে অনুভব করল বড় কঠিন দায়িত্ব তার ঘাড়ে পড়েছে। যে মানুষটা খুব স্বাভাবিকভাবে নিজেকে তার কাছে জমা রাখল, সেই মানুষটাকে যত্নে রাখা তার অবশ্য কর্তব্য! ফিরতি উপহার দেয়ার বদলে সে প্রতিজ্ঞা করল, আজীবন সাকিনের এই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাবে সে।
এসব ভাবতে ভাবতে ভুলেই গেলো সাকিনকে সে একটা প্রশ্ন করতে চেয়েছিল। নক্ষত্রের নাম রোদ্দুরপথ কেন হয় না?
ফাবিহাদের বাড়ির সকলের আজ এ বাড়িতে দাওয়াত। সেই সাথে গ্রামের গণ্যমান্য কিছু মানুষকে আমন্ত্রণের মাধ্যমে ওয়ালিমা সেড়ে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সকলেই ভেবেছিল অল্প কিছু মানুষের আয়োজন। কিন্তু রফিকের কথায় ভুল ভাঙল। সাকিন নাকি তালিকা করতে যেয়ে পুরো দুইশ মানুষকে দাওয়াত দিয়ে ফেলেছে।
সাবিহা চাপা কণ্ঠে চিৎকার দিয়ে বলল, “এটা ছোটখাট আয়োজন? ছোটখাট মানে কী জানো?”
রফিক একটু পিছিয়ে এলো, “ইয়ে…আমি তো কিছু করিনি। সাকিন..!”
“সাকিন না? নিশ্চয়ই তুমি কলকাঠি নেড়েছ! নাহলে আগে সে এসে করেছটা কী শুনি? আল্লাহ গো! দুইশ মানুষ খাওয়াবে তো আয়োজন কই?”
রফিক ভেবে পায় না সব কিছুতেই কেন সাবিহার তার দোষ খুঁজে পায়। শুধু দোষটাই পায়, অবদান আর পায় না। অবশ্য একদিক দিয়ে বাঁচোয়া, মানুষের সামনে কিচ্ছুটি বলে না। একেবারে স্পিকটি নট! বো-মা যা ফাটানোর ঘরের ভেতরে ফাটায়। ফলে মানুষ ভাবে কী বাধ্য স্ত্রী! কেবল রফিকই জানে কে যে বাধ্য!
সাকিন বন্দোবস্ত করেই রেখেছিল। বাবুর্চি আনা হলো, উঠানে প্যান্ডেল হলো। কাজ করার লোকের অভাব হলো না। তার সকল ছাত্রই পাঁচ পায়ে খাড়া! জুবায়ের গতদিন আসতে পারেনি। আজ সপরিবারে হাজির হলো। আয়োজন কম বললেও কম হলো না।
সকলে খেতে গেলে এক ফাঁকে ফুপুকে ডাকল ফাবিহা। মনিরা এসে আগেই জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছিস রে মা?”
“আলহামদুলিল্লাহ্!” হাসল ফাবিহা। মনিরার অভিজ্ঞ চোখ সেই হাসিতেই উত্তর খুঁজে পেলেন।
“তোমার শরীর এখন কেমন?” ফাবিহা জিজ্ঞেস করল।
“তোদের ভালো থাকতে দেখলেই আমি ভালো থাকি!” থুতনি ধরে চুমু খেলেন মনিরা।
ফাবিহা নরম কণ্ঠে বলল, “একটা কথা বলব ফুপু, যদি রাগ না করো।”
“বল! রাগ করব কেন? ও মা!”
ফাবিহা একটু সময় নিলো, “সেদিন ইরফানের স্যারের জায়গায় যদি ইরাফান থাকত, তাহলে তুমি ওর কাছে কেমন বিচার আশা করতে?”
মনিরা বুঝতে পারলেন না, “কবে?”
“যেদিন আমাকে দেখতে এলো।”
মনিরা কোনো কথা বললেন না।
“ফুপু, তুমি আমাদের জন্য চিন্তা করো এটা এক কথা। কিন্তু সেই চিন্তা থেকে উত্তরণের জন্য তো তুমি অন্য কাউকে বিপদে ফেলতে পারো না।”
“বিপদে..!”
“আহা! আগে শোনো। ঠান্ডা মাথায় শোনো। ধরো, ইরফান একজনের বাসায় দাওয়াতে গেছে। মহিলা তাকে খুব আদর আপ্যায়ন করে বলেই গেছে। যেয়ে শোনে সে নাকি দাওয়াত খেতে আসেনি, মেয়ে দেখতে এসেছে, আর এই কথা সে ছাড়া সবাই জানে। এখন বলো, ওর কী করা উচিত? তুমি ওকে কী করতে বলতে?”
মনিরা থমথমে মুখে তাকিয়ে আছেন।
ফাবিহা তাড়া দিলো, “বলো বলো!”
তবুও কোনো কথা বললেন না তিনি।
ফাবিহা নিজেই বলল, “তুমি চাইতে ইরফান চলে আসুক। মেয়ে দেখা কাজটা খারাপ না, কিন্তু যে পদ্ধতিতে যে কাজটা হচ্ছে সেটাকে সোজা বাংলায় ফাঁদ বলে। এমন পদ্ধতির ফলাফল কী ভালো হবে?”
“কী বলতে চাচ্ছিস তুই?” গম্ভীর কণ্ঠে বললেন তিনি। ফাবিহা তাকে জড়িয়ে ধরল।
“বলতে চাচ্ছি, তুমি আমার জন্য বেস্ট পাত্র বাছাই করেছ! কিন্তু বাছাইয়ের রাস্তাটা বাঁকা হয়ে গেছে। যে ফুপু আমাদের জন্য এত কিছু করেছে, তাকে নিয়ে কেউ বাঁকা চিন্তা করুক, সেটা নিশ্চয়ই আমার ভালো লাগবে না? অথচ, ভাগ্যে যেটা আছে সেটা ঠিক ঠিক আমার কাছে পৌঁছে যাবে। অধৈর্য হয়ে অন্য রাস্তা ধরলে আমারই ক্ষতি।”
“সাকিন তোকে কিছু বলেছে?”
“তাকে তোমার এমন মনে হয়? তুমি তো সম্ভবত তার বিষয়ে খুব খোঁজ খবরও নাওনি ফুপু। যাক, যেভাবেই হোক কোনো বিপদ হয়নি। কিন্তু সামনে আর এমন কিছু কোরো না। তোমার নিজের ছেলে আছে। দেখে-শুনে, আস্তে-ধীরে কাজ করবে। ভুল পথের কাজ ভুল করে একবার ঠিক হয়ে গেছে বলে বারবার কিন্তু এমন হবে না!”
মনিরা বুঝলেন কী না বোঝা গেলো না। এরপর যতক্ষণ ছিলেন তাকে বেশ স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল। তবু ফাবিহা অন্তত নিজের মনের অপরাধবোধ থেকে নির্ভার হলো।
অনুষ্ঠান শেষে সবাই চলে যাওয়ার সময় ফাবিহা ভেবেই রেখেছিল সিমি তার কাছে থাকবে। কিন্তু ওকেও যেতে দেখে সে অবাক হয়ে বলল, “কী রে! তুই কোথায় যাচ্ছিস?”
সিমি বিভ্রান্ত কণ্ঠে বলল, “কেন? বাড়ি!”
“আমার সাথে থাকবি না?” বিস্মিত কণ্ঠে বলল ফাবিহা।
সাবিহা তাল দিলো, “কী গো! সিমি রানী! তোমার ছোট আপার কাছে থাকবা না?” ওর খোঁচাটা স্পষ্ট টের পেলো সিমি।
একটু সময় নিয়ে বলল, “ছোট আপা, আপনার কাছে তো সাকিন ভাই আছে। সে বাইরে থাকলেও আপনি জানেন সে আছে। কিন্তু খালাম্মার কাছে কেউ নেই। বাইরেও না, ভেতরেও না। ফারদিন ভাই সারাদিন বাইরে বাইরে থাকে। একা বাড়িতে খালাম্মা টিকতে পারবে না ছোট আপা। আমি খালাম্মার কাছেই থাকি?”
সাবিহা চট করে তাকে জড়িয়ে ধরল। রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, “বিয়ে তো আগে তোর দেয়া দরকার ছিল রে সিমি!”
ফাবিহা বিয়ের দিন যে কান্না কাঁদেনি, আজ এই বেলায় তা উসুল করে নিলো।
সাকিন বোনের কাছে এসে বলল, “ও কি বাসায় যাওয়ার জন্য কাঁদছে?”
“তা তোর বউয়ের কাছেই জিজ্ঞেস কর না!”
সাকিন অসহায় চোখে তাকালে মুখ মোচড় দিলো সে। বিড়বিড় করে বলল, “ঢং দেখলে বাঁচি না! নিজেরাই না বলবে, নিজেরাই হ্যাঁ বলবে! শুধু শুধু আমাকে ঘোড়া নাচ নাচানোর মানে কী!” বলতে বলতে সে ফাবিহার কাছে গেল।
“তুমি কি ওই বাড়ি যাওয়ার জন্য কাঁদছ? ভাইয়া জিজ্ঞেস করছে।” ফাবিহা এক পলক সাকিনের দিকে তাকিয়ে চোখ মুছল। মাথা নেড়ে বলল, “না।”
সাকিন বিব্রত হলো। সে জিজ্ঞেস করেছে এটা আবার বলার কী আছে? আশ্চর্য!
বাড়ি ফাঁকা হলেও সাবিহা দিন কয়েক রয়ে গেল। সে যেতে চাইলেও আটকে দিলো ফাবিহা। অনুরোধ করল তার সংসারটা যেন গুছিয়ে দিয়ে যায়।
সাবিহা বলল, “এসব পারব না আমি! আমাকে কি তুমি শাশুড়ি পেয়েছ?”
“পার্ট টাইম! আমার শাশুড়ির স্থলাভিষিক্ত না আপনি?”
“কথা তো ভালোই জানো! ননদ হলেও আমি তোমার চেয়ে বয়সে বড়! মেপে মেপে কথা বলবে!” কৃত্রিম গাম্ভীর্যের সাথে বলল সাবিহা।
ফাবিহা পেছনে দুই হাত বেঁধে মাথা নিচু করে বলল, “কী দিয়ে মাপব ননদিনী? দাঁড়িপাল্লা নাকি ওয়েট মেশিন?”
সাবিহা চোখ রাঙাতে যেয়ে হেসে ফেলল।
সেদিন বিকেলে একটু আগে আগেই ফিরল সাকিন। ফাবিহা চা খাচ্ছিল। সাকিনকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি চা খাবেন?”
“আনো।” হাতের বইয়ের দিকে তাকিয়েই বলল সে।
সাবিহার কাছে সে জিজ্ঞেস করল সাকিন চায়ে কতটুকু চিনি খায়।
সাবিহা ভুরু কুচকে বলল, “ভাইয়া তো চা-টা খুব একটা খায় না। ঠ্যাকায় পড়লে, ধরো ঠান্ডা, গলা ব্যাথা হলে এমনি চিনি ছাড়া খায়।”
“কিন্তু আমাকে যে নিতে বলল।” বিভ্রান্ত কণ্ঠে বলল ফাবিহা।
“কী জানি?” কাঁধ শ্রাগ করল সাবিহা।
ফাবিহা সরঞ্জাম নিয়ে ঘরে গেলো। টেবিলে সেগুলো রাখতে রাখতে বলল, “আপনি কীভাবে চা খেতে পছন্দ করেন?”
সাকিন বইয়ের ভেতরে ডুবে ছিল। বুঝতে পারেনি ঘোরে থেকে তার মনের কথাটা মুখে চলে এসেছে। আনমনেই সে বলে ফেলল, “তোমার সাথে।”
ফাবিহা ঝট করে তাকালো। বইয়ের পাতায় মগ্ন সাকিন দেখতে পেলো না গোধূলি তার লালিমার সবটুকু দিয়ে বড় যত্ন করে ফাবিহার মুখে রং ছড়িয়েছে।
চলমান~
(পাঠক, সব কাহিনী প্রায় শেষ। আর যেটুকু বাদ আছে চাইলে আগামী পর্বেই শেষ করে ফেলা যাবে। কিন্তু আপনারা যদি চান, এমন টুইস্টবিহীন, আড়ম্বরহীন, সাদামাটা আর কিছু পর্ব চাইলে দিতে পারি। কী বলেন? তাহলে কিন্তু এখন থেকে সামনের সব পর্বে ভরপুর লাভ রিয়্যাক্ট দিতে হবে! এমন সুন্দর সুন্দর পর্বে লাইক দেখলে কিন্তু ভাল্লাগে না একদম 😫)