#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_৩
অহংকার আর অসহায়ত্বের মধ্যে একটা মিল আছে। দুটো সময়েই মানুষের হিতাহিত জ্ঞান পুরোপুরি লোপ পায়। অহংকারী মানুষ ভাবে, সে চাইলে আকাশ থেকে চাঁদ নামিয়ে আনতে পারবে; আর অসহায় মানুষ ভাবে, এই বুঝি আকাশটা তার মাথার ওপর ভেঙে পড়ল। দুটোই আসলে এক ধরনের মানসিক বিভ্রম। কিন্তু এই বিভ্রম যখন বাস্তবে রূপ নেয়, তখন পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে দাঁড়ায়।
ঢাকা শহরের আকাশ আজ সকাল থেকেই মুখ ভার করে আছে। ভাদ্রমাসের এই এক সমস্যা, কখন রোদ উঠবে আর কখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। শ্রাবণকে সেই কবে বিদায় দেওয়ার পরেও কারণে অকারণে তাকে ভেবে মুখ কালো করে থেকে কী মজা পায় কে জানে? বৃষ্টিরও মায়া কাটে না। দুদিন বাদেই ফিরে এসে শ্রাবণকে মনে করাতে চায়। শেহজাদ মূর্তজার চেম্বারের ফ্লোর-টু-সিলিং কাঁচ থাকায় বাইরের মেঘলা আকাশটা এখান থেকে বেশ পরিষ্কার দেখা যায়। শেহজাদের সামনে রাখা আছে নীল রঙের ফাইলটা। রোদসীর বাবা-মায়ের ডিভোর্সের ফাইল। ক্লায়েন্ট: জামিল ব্যাপারী এবং রুমানা। শেহজাদের এখনো বিশ্বাস হতে চাইছে না, সে সত্যি সত্যি একটি ডিভোর্স কেস হাতে নিয়েছে। তার সামনে বসে থাকা মেয়েটা নিজের প্রথম কাজ হিসেবে নিজের বাবা-মায়ের সংসার ভাঙার দায়িত্ব নিয়েছে! শেহজাদ মেয়েটার দিকে আড়চোখে তাকাল। রোদসী একমনে ল্যাপটপে কিছু একটা টাইপ করে যাচ্ছে। তার চোখেমুখে কোনো অপরাধবোধ, দ্বিধা বা সংকোচের ছিটেফোঁটাও নেই। যেন সে খুব সাধারণ কোনো পেপারওয়ার্ক করছে।
শেহজাদ ড্রয়ার থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করতে গিয়েও কী ভেবে আবার রেখে দিল। চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল বিশাল কাঁচের জানালার সামনে। বাইরের ধূসর মেঘে ঢাকা শহরের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় ডাকল, "মিস রোদসী।”
"জি, স্যার," ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই উত্তর দিল রোদসী। কি-বোর্ডে তার আঙুল এখনো চলমান।
শেহজাদ কোনো রকম ভনিতা ছাড়াই সরাসরি বলে ফেলল,
“আপনার বাবাকে আমার খুব একটা সুবিধার লাগেনি। যদি আমি ভুল না হই, তাহলে এই ডিভোর্সটির কারণ ডমেস্টিক ভায়োলেন্স। এ্যাম আই রাইট?”
“রাইট!”
রোদসীর নিরুত্তাপ জবাবে শেহজাদ খানিকটা বিব্রত হলো। পরিবার শব্দটা শেহজাদের নিকট ভীষণ দামী। ছোট্টবেলা থেকে সে একটি গোছালো পরিবার দেখে বড় হয়েছে। তার পরিবারে, কখনোই এমন কিছু হয়নি যার জন্য তাকে পরিবার শব্দে তিক্ততা নিয়ে বাঁচতে হবে। কাজের বাহিরের জীবনটা তার জন্য ভীষণ সহজ। বাহিরের দুনিয়ার কঠোর আইনজীবী ঘরে গিয়েই তার সহজ জীবনযাপনে ফিরে আসে। রাতের খাবার টেবিলে পরদিনের মেন্যু ঠিক করা থেকে শুরু করে সারাদিনে বাবা-মা আজ ঠিক কী কী করেছেন তার সবই আলোচনা হয়। বাসার খাবার সাথে বাবা-মায়ের খুনসুটি এতো চমৎকার গোছালো পরিবেশ দেখে সে বড় হয়েছে, যে কখনোই তাকে আইনের পথকে ঘৃণা করতে হয়নি। মনে হয়েছে, এটা বাকি পাঁচটা সাধারণ কর্পোরেট জবের মতোই কাজ। যদিও কাজে আসার কয়েক বছর পর তার সেই ধারণা বদলেছে। এই কাজে মনুষ্যত্ব কিংবা সততা ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব। রোজ কে সঠিক আর কে ভুল সেই দোটানায় মুষড়ে থাকতে হয়। চার বছর আগের এক কেস শেহজাদের সেই কঠিন কাজকে কয়েক দফায় আরো কঠিন করে দিয়েছে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে কাকতালীয় ভাবে অন্য কারো প্রক্সি দিতে গিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে বাজিমাত করে ফেলে। সেদিন ক্লায়েন্ট ওকালতনামায় সই না করলে কিংবা শেহজাদ কেসটা না জিতলে আজ সে ভিন্ন জায়গায় থাকতো। এখনকার মতো হাই প্রোফাইল কেসে তাকে সবসময়ের জন্য জড়িয়ে যেতে হতো না। রোদসী মেয়েটাও সবে এসেছে। তার চোখেমুখে এখন উপচে পড়া স্বপ্ন থাকা উচিত। অথচ মেয়েটা নির্বিকার। শুরু থেকেই এমন হলে, সে হয়তো কখনোই নিজের পেশাদারিত্ব নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারবে না। শেহজাদ তো ঠেকে শিখেছে। কিন্তু এই মেয়েটি বিনা অভিজ্ঞতায় বাবুর কেসটি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। অথচ মোতালেব সাহেবের কথাতেই এ কথা স্পষ্ট যে, বাবু অপরাধী। তাকে বাঁচানোটা একজন সৎ আইনজীবির জন্য অনুচিত। রোদসী কি সৎ উকিল হতে চায় না? অন্যের জন্য ন্যায়বিচার না এনে নিজের মাকে ন্যায়বিচার এনে দিতে দৃঢ়প্রতৃজ্ঞ হওয়া কি উচিত? শেহজাদ সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব ফেলে জানতে চাইল,
“একটা লোকের বিরুদ্ধে আপনি ফিজিক্যাল বা মেন্টাল অ্যাবিউজের অভিযোগ এনে ডিভোর্স ফাইল করেছেন। আপনার হাতে নিশ্চয়ই পর্যাপ্ত প্রমাণ আছে?”
রোদসী ল্যাপটপের স্ক্রিনে পূর্ণ মনোযোগ রেখে বলল,
"কোনো প্রমাণ নেই, স্যার,"
একটু থেমেই পুনরায় বলল,
"অন্তত এমন কোনো মেডিকেল সার্টিফিকেট বা জিডি এন্ট্রির কপি নেই যা দিয়ে প্রমাণ করা যায় উনি আমার মাকে প্রতিদিন তিলে তিলে মেরে ফেলছেন।”
“ কী বলছেন এসব? প্রমাণ ছাড়াই কেস ফাইল করেছেন?”
“ জি, স্যার! কোনোরকম এভিডেন্স ছাড়াই কেস ফাইল করেছি।”
শেহজাদ বিরক্ত গলায় বলল,
“ আইন আবেগ মানে না, মিস রোদসী। আপনার কিংবা আপনার মায়ের মুখের কথায় এখানে কিছুই প্রমাণ হবে না। তা নিশ্চয়ই জানেন?”
“ জানি।”
শেহজাদ বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এলো। রোদসীর সামনে থেকে ল্যাপটপটা টেনে হতভম্ব গলায় শুধাল,
“আপনি কী হুশ হারিয়েছেন? সামনেই মির্জা কামরুল হাসান কেসের প্রথম হেয়ারিং। এই কেসটা নিয়ে মিডিয়ায় ঠিক কী কী ছড়াচ্ছে তা আপনার অজানা নয়। এই সময়ে এসে আপনার পাগলামিকে প্রশ্রয় দিতে আমি এই কেস হাতে নিয়েছি। ভেবেছিলাম, এই কেসের সমস্ত পেপারওয়ার্ক হয়তোবা আপনার তৈরি করা। কিন্তু এখন আপনি বলছেন কোনো প্রমাণ নেই। কোনোরকম প্রমাণ ছাড়া আমরা কোর্টে কী পেশ করব?”
রোদসী জবাব দিল না। শেহজাদ টেবিলে শব্দ করে হাত রাখল। বলল,
"আপনার আমার মুখের কথায় কোর্ট একটা লোককে ডিভোর্স আর অ্যালিমনি স্যাংশন করবেন না। উল্টে আপনার মাকে মেন্টালি আনস্টেবল বা মানসিক ভারসাম্যহীন প্রমাণের চেষ্টা করার সুযোগ পাবে বিপক্ষ দল। গতকাল আপনার বাবা ঠিক সেই গ্রাউন্ডটাই তৈরি করছিল। খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই?”
"খেয়াল করেছি," রোদসী সোজা হয়ে বসল।
একটু থেমে বলল, "আর সে জন্যই আমি অন্য কোনো ফ্যামিলি ল'ইয়ারের কাছে না গিয়ে আপনার কাছে এসেছি। আপনি ক্রিমিনাল ল'ইয়ার। আপনি জানেন কীভাবে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো একটা অপরাধীর মুখোশ টেনে ছিঁড়তে হয়। আমি চাই আপনি কোর্টে জেরা করার সময় উনাকে এমনভাবে ট্রিগার করবেন, যাতে উনার ওই ভদ্রলোকের মুখোশটা জজ সাহেবের সামনেই খসে পড়ে। উনার ইগোতে আঘাত লাগলে উনি নিজের কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেন।"
শেহজাদ ভ্রূ কুঁচকালো, "ইগোতে আঘাত? উনার ট্রিগার পয়েন্ট?"
রোদসী একটা ডায়েরি এগিয়ে দিল তার দিকে। বলল,
"আমি উনার সাইকোলজিক্যাল প্রোফাইলিং করেছি। উনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা উনার 'সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্স'। উনি মনে করেন উনার চেয়ে বুদ্ধিমান আর কেউ নেই। যদি কোর্টে উনাকে এটা বোঝানো যায় যে উনার সাজানো গল্পটা খুব কাঁচা, বা উনি অত্যন্ত বোকার মতো কোনো কাজ করেছেন, তখনই উনি ডিফেন্স মেকানিজম হিসেবে রেগে যাবেন। দ্বিতীয়ত, আমার মা যদি উনার চোখের দিকে তাকিয়ে কোনো কথার জবাব দেন, সেটা উনি সহ্য করতে পারেন না। কারণ উনার মতে, আমার মায়ের কোনো নিজস্ব সত্তা নেই, তিনি শুধুমাত্র তার স্ত্রী।"
শেহজাদ রোদসীর এগিয়ে দেওয়া ডায়েরির পাতাগুলোর দিকে তাকাল। নিখুঁতভাবে পয়েন্ট করে লেখা আছে জামিল ব্যাপারীর মানসিক দুর্বলতা, তার রাগের ধরণ এবং সম্ভাব্য রিঅ্যাকশন। একটা মেয়ে নিজের বাবাকে কতটা ঘৃণা করলে এত নিখুঁতভাবে তার মনস্তত্ত্বকে ব্যবচ্ছেদ করতে পারে, সেটা ভেবে শেহজাদ মনে মনে শিহরিত হলো।
শেহজাদ বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বলল,
"আমরা কোর্টে এমন একটা সিচুয়েশন তৈরি করব যাতে সে বাধ্য হয় অফেন্সে যেতে। জজ সাহেবের সামনে সে যদি একবার তার আসল রূপটা দেখিয়ে ফেলে, তাহলে আশা করছি আর কোনো এভিডেন্সের দরকার হবে না। আমি আগামী হেয়ারিংয়ের জন্য একটা কোয়েশ্চনেয়ার রেডি করছি। আপনার মাকে মেন্টালি প্রিপেয়ার করার দায়িত্ব আপনার। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যেন একবারের জন্যও মাথা নিচু না করেন। ভয় পেলে কিন্তু চলবে না।”
রোদসী কেমন একটা ইস্পাতকঠিন প্রত্যয় নিয়ে বলল, “মা আর ভয় পাবেন না। তার ভয় পাওয়ার দিন ফুরিয়ে এসেছে।”
শেহজাদ গাঢ় চোখে রোদসীর দিকে তাকিয়ে আছে। রোদসীকে এখন মোটেও সাধারণ কেউ মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে সে অসাধারণ। কিন্তু কেন? নিজের বাবা-মার ডিভোর্স ফাইল করার জন্য? ছোটবেলাকার ট্রমা হয়তো বড় হয়ে তাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। এতে তো অসাধারণ হওয়ার মতো কোনো ব্যাপার নেই। তাহলে রোদসীকে হঠাৎ অসাধারণ মনে হলো কেন? তার চোখের জন্য? শেহজাদ শুরুর দিন থেকে চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই এই মেয়েটির চোখের ভাষা সে বুঝতে পারছে না। কী চায় মেয়েটি? শুধুমাত্র ডিভোর্স তার ড্রিম হলে সে কেন তার ইন্টার্নশিপ কোনো ডিভোর্স স্পেশালিষ্টের আন্ডারে করলো না? এই কাজের জন্য খোঁজ নিয়ে শেহজাদকে বেছে নেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট কারণ আছে কী? শেহজাদ আচমকাই জানতে চাইল,
“এই কেসটিতে আমাকে রাজি করানোর জন্যই কি আপনি আমার আন্ডারে ইন্টার্নশিপ করতে চেয়েছেন?
রোদসী চমকাল না। সে এখনো একভাবে বসে আছে। শেহজাদের প্রশ্নে সে চোখে চোখ রাখল। সহজ গলায় বলল,
“জি।”
“হাউ সেল্ফিশ!”
“আমরা সবাই স্বার্থপর, স্যার। কে তার নিজের স্বার্থ চেনে না বলুন? সবাই চেনে। সবাই শুধু নিজের ভালো চায়। আর বাকি যা তারা দেখায়, তার সবটুকুই মিথ্যে।”
“আমাকেই আপনার স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ব্যবহার করার কারণ?’
“কারণটা আপাতত তোলা থাকুক। অন্য একদিন সময় নিয়ে বলবো।”
শেহজাদ চোখ সরিয়ে নিল। চোখের ভাষা পড়তে না পারলে এভাবে তাকিয়ে থাকার কোনো মানে নেই। আকাশটা হুট করেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। দলে দলে ভিড় জমানো ধূসর মেঘেরা এখন হারিয়েছে। ঝকমকে রোদে তাদের টিকিটিরও সন্ধান মিলছে না। শেহজাদের মনে হচ্ছে, সে এক সমস্যা থেকে বাঁচতে নতুন এক সমস্যা অফিসে তুলেছে। মেয়েটির হেঁয়ালি তার পছন্দ হচ্ছে না। কিন্তু তার কেস স্টাডির প্যাটার্ন শেহজাদের পছন্দ হয়েছে। শতভাগ জয়ের রেকর্ড ধরে রাখতে তাকেও এ পর্যন্ত আইনের বেশ কিছু ফাঁকফোকর কাজে লাগাতে হয়েছে। কখনো কখনো সে নিজে ভুল হয়েও শুধুমাত্র বিপক্ষের প্রমাণে সন্দেহ তৈরি করে তার সুবিধা নিয়ে আসামীকে মুক্তি দিয়েছে। সেসবের জন্য তার কোনো আফসোসও নেই। থাকা উচিতও না, ডাক্তারি আর ওকালতিতে আফসোস রেখে লাভ নেই। যা কিছু ঘটেছে তা বদলানোর সুযোগ কারোই নেই। তাই শুধু শুধু অন্যের জন্য নিজে আফসোসে ভুগে বাকিটা জীবন অন্ধকারে কাটানোর কোনো যুক্তি নেই। রোদসী এই সত্য একটু জলদি ধরে ফেলেছে। জুনিয়ররা এতো জলদি সব ধরে ফেললে, সিনিয়রদের ক্যারিয়ারও অনেক সময় ধ্বসে পড়ে। শেহজাদ তাকে এমন কোনো সুযোগ দেবে না। আইনের আদলে নিজেকে সেরা প্রমাণ করার নেশায় সে জড়িয়ে গেছে। এই নেশায় কেউ একবার জড়ালে, তার আর নিস্তার নেই। নিজের মতো অন্য কাউকে সে এমন জটিল জীবনে অভ্যস্ত হতে দেখতে চায় না। কখনোই না।
চলবে...