#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_৪
শেহজাদ রোদসীর আনা ডায়রিটা ড্রয়ারে তুলে রাখলো। তারপর কী একটা ভেবে রোদসীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
"মিস রোদসী, আপনার বাবা-মার কেসটার জন্য আমি জজ সাহেবের সাথে কথা বলেছি। ফ্যামিলি কোর্ট থেকে ফার্স্ট হিয়ারিংয়ের ডেট পেতে কিছুটা সময় লাগবে। কোর্টের প্রসিডিউর অনুযায়ী নোটিশ সার্ভ হতে এবং ডেট পড়তে অন্তত আরও কয়েক সপ্তাহ বা মাসখানেক সময় তো লাগবেই। তবে তার মানে এই নয় যে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব। কোর্টের হিয়ারিং আসার আগ পর্যন্ত আমরা বরং অন্য কোনো কাজে মন দিই।"
রোদসী কী-বোর্ড থেকে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে বসল। তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত স্থিরতা আছে। শুধুমাত্র এইজন্য শেহজাদ তার মাইন্ড রিড করতে পারে না। এবারো সে খুব স্বাভাবিক ব্যবহার করল, শান্ত গলায় জানতে চাইল, "আপনি ঠিক কী বলতে চাচ্ছেন, স্যার?"
শেহজাদ পিঠ সোজা করে বসল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে,
"আমার হাতে এই মুহূর্তে মির্জা কামরুল হাসানের মার্ডার কেসটা ঝুলছে। পুলিশের চার্জশিট অনুযায়ী কেসটার কোনো মাথা-মুণ্ডু পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এটুকু নিশ্চিত পুলিশ যাকে ধরেছে, সে সম্পূর্ণ নির্দোষ। হয়তো ওপর মহলের চাপেই পুলিশ ওই ভুল লোককে ফাঁসিয়ে কেস ক্লোজ করতে চাইছে। তাই..”
“তাই?”
“তাই আমার মনে হয়, হিয়ারিংয়ের ডেট আসার আগের এই সময়টা আমরা এই খুনের কেস তদন্ত করার কাজে লাগাতে পারি। যা যা করা দরকার, সব এভিডেন্স আমরা গুছিয়ে রাখি। অন্তত প্রিলিমিনারি ওয়ার্কগুলো করে রাখা ভালো।"
রোদসী কয়েক মুহূর্ত শেহজাদের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সাবলীলভাবে মাথা নেড়ে বলল,
"অবশ্যই, স্যার। আপনার প্রথম শর্ত অনুযায়ী আমার ডিভোর্স কেসটা নিয়ে তো আমরা হিয়ারিংয়ে উঠবই। যতদিন না সেই হিয়ারিংয়ের দিন আসছে, ততদিন আমরা এই খুনের কেসটার ক্লু খুঁজতে পারি। আমারও বেশ কৌতূহল হচ্ছে দেখতে, পুলিশ কীভাবে এত বড় একটা মার্ডার মিস্ট্রি ধামাচাপা দিল।"
"এক্সাক্টলি," শেহজাদ সন্তুষ্টির হাসি হাসল। মেয়েটিকে সে মূলত তার কাজের সহযোগিতার জন্য রেখেছে। তাই সেদিকে মনোনিবেশ করতে পেরে তাকে বেশ সহজ হতে দেখা গেল। শেহজাদ জানালার দিকে একবার তাকিয়ে পকেট থেকে লাইটারটা বের করে আঙুলের ফাঁকে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
"এই মুহূর্তে আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হচ্ছে। পার্সোনাল প্রশ্ন নয়, জাস্ট আউট অফ কিউরিওসিটি।"
রোদসী ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, "বলুন।"
"আপনি এত কিছু থাকতে ল' পড়তে এলেন কেন?" শেহজাদ লাইটারটা টেবিলের ওপর রেখে একটু সামনে ঝুঁকল। "যে বয়সে মেয়েদের চোখে এক আকাশ স্বপ্ন থাকার কথা, সেই বয়সে আপনি ডিভোর্স, মার্ডার, আর ক্রাইম সিন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাইছেন।”
“তার মানে আমার বয়সী কেউ ল' নিয়ে পড়ছে না? আমি-ই প্রথম?”
“ আপনিই প্রথম অন্যরকম কেউ, জেদী কেউ, দূর্বোধ্য কেউ।” শেহজাদ কথাগুলো মনে মনে আওড়াল। প্রকাশ্যে বলল,
“প্রথম বলিনি। বলতে চেয়েছি, পরিবার, মায়া আর মনের মাঝে এতো জেদ নিয়ে আইনের মারপ্যাঁচে টিকবেন কী করে?”
“আইনের লোক হয়েই আইনের মারপ্যাঁচকে ভয় পেতে বলছেন?”
শেহজাদ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটার চিন্তাভাবনা এত স্পষ্ট আর রূঢ় যে তার প্রশ্নের বিপরীতে সে একের পর প্রশ্নই পাচ্ছে।
"ভয় পেতে হবে। আইনকে নয়, আইনের মানুষগুলোকে।"
রোদসী হুট করেই হেসে ফেলল। শ্লেষাত্মক হাসি। চোখ তুলে দেখলো সামনে বসে থাকা শেহজাদকে। শেহজাদ এখনো তাকে কোথায় বসতে হবে তা বলে দেয়নি। তাই আপাতত সে এখানে বসেই তার কাজ গোছাচ্ছিলো। লোকটাকে সে এতোদিন দূর থেকে দেখেছে। নানা কথা শুনেছে, এখন সে তার সামনে বসে আছে। শুধু বসে থেকেই ক্ষান্ত নেই, লোকটা প্রাণপণে চেষ্টা করছে রোদসীর মাইন্ড রিড করতে। তাই হয়তোবা এমন প্রসঙ্গ তুললো। রোদসী থেমে থেমে বলল,
“সরি স্যার, আমি আপনাকে ভয় পেতে চেষ্টা করছি। কিন্তু পারছি না। আ'ম রিয়েলি ভেরী সরি।”
শেহজাদ হতবিহ্বল হয়ে গেল। মেয়েটি কি এই মাত্রই তাকে ইচ্ছে করে খোঁচাল? আনবিলিভেবল! অস্বস্তিতে শেহজাদের হাত-পা অসাড় হয়ে আসছে। এভাবে তাকে কেউ কখনো হতবুদ্ধি করতে পারেনি। কিন্তু এই মেয়েটা একেকদিন একেকভাবে তাকে চমকে দিচ্ছে। যদিও এখনকার চমকে দেওয়া তার পছন্দ হয়নি। একদম পছন্দ হয়নি। শেহজাদ কিছু বলে পরিস্থিতি সহজ করার আগেই চেম্বারের ভারী কাঁচের দরজায় টোকা পড়লো। রিসেপশনের জুনিয়র ছেলে, তন্ময়, একটা মোটা ফাইল হাতে সে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটাকে দেখেই শেহজাদের ইচ্ছে করল তাকে ডেকে এনে হাজার টাকা বখশিশ ধরিয়ে দিতে। এই মুহূর্তে সে না এলে শেহজাদকে নিজের কাছে নিজেই লজ্জা পেতে হতো। সদ্য পরিচিত জুনিয়রের কাছে বোকা বনে যাওয়ার মতো লজ্জা। তন্ময় ভেতরে ঢুকেই হড়বড় করে বলল,
"স্যার, মির্জা কামরুলের কেসটার ওপর পুলিশের সাবমিট করা সেকেন্ড সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিটটা এসছে। মর্গ রিপোর্ট আর ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেশনের ফটোকপিগুলো এখানে আছে। ডিবি অফিস থেকে কিছুক্ষণ আগেই এগুলো হাতে এসেছে।" ছেলেটা ফাইলটা ডেস্কের ওপর রেখে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
শেহজাদ ফাইলটা নিজের দিকে টেনে নিল। রোদসীও নিজের চেয়ার ছেড়ে শেহজাদের ডেস্কের কিছুটা কাছাকাছি এসে বসল। ফাইলের পাতা উল্টাতে উল্টাতে শেহজাদের কপালে ভাজ গাঢ় হতে শুরু করল। পুলিশ রিপোর্টে এমন সুনিপুণভাবে সবকিছু গোঁজামিল দেওয়া হয়েছে যে, প্রথম নজরে মনে হবে এর চেয়ে নিখুঁত তদন্ত আর হতেই পারে না। কোথাও কোনো সরাসরি ক্লু নেই, ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই। শেহজাদ কপাল কুঁচকে ফাইলটা ডেস্কে সজোরে নামিয়ে রাখল।
"হাউ রিডিকিউলাস! খুন কখনো এত পরিচ্ছন্ন হতে পারে না। মির্জা সাহেবকে সাতবার স্ট্যাব করা হয়েছে, আর ক্রাইম সিনে এক ফোঁটা রক্ত নেই—এটা সায়েন্টিফিক্যালি ইম্পসিবল। খুনি কি রক্ত সব শুষে নিয়েছিল?"
রোদসী ভিক্টিমের ছবিগুলোর ওপর আঙুল বুলিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
"খুনি যখন খুব বেশি নিখুঁত হতে চায়, স্যার, তখনই সে সবচেয়ে বড় ভুলটা করে।"
শেহজাদ রোদসীর দিকে তাকাল। "কোন ভুলটার কথা বলছেন?"
"ছবিটা দেখুন স্যার। বডির পজিশন দেখুন। কার্পেটের ওপর বডিটা চিৎ হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু ঘাড়ের কাছে আর পিঠের দিকের চামড়ায় লিভোর মর্টিস বা রক্ত জমাট বাঁধার যে দাগ দেখা যাচ্ছে, সেটা বডির বর্তমান পজিশনের সাথে ম্যাচ করছে না।"
শেহজাদ সময় নিয়ে ছবিটার দিকে তাকাল। তার অভিজ্ঞ মস্তিষ্ক সাথে সাথে পুরো সমীকরণটা মিলিয়ে ফেলল। ক্ষুরধার গলায় বলল,
"এক্সাক্টলি! তার মানে বডিটা খুন করার পর বেশ কয়েক ঘণ্টা উপুড় করে বা অন্য কোনো পজিশনে রাখা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, রক্ত না থাকার একটাই কারণ হতে পারে—ভিক্টিমকে এমন কোনো জায়গায় স্ট্যাব করা হয়েছে, যেখানে রক্ত খুব সহজেই ড্রেন আউট করা যায়।”
“লাইক আ বাথটাব। সেখানেই হয়তো বডির সমস্ত রক্ত ধুয়ে ফেলার পর সেটাকে বেডরুমে এনে ড্রপ করা হয়েছে।"
“মেবি অর মে নট বি।”
রোদসী ভুরু কুঁচকে জানতে চাইল,
"কিন্তু পুলিশ এই বেসিক ফরেনসিক এভিডেন্সটা ইগনোর করল কেন?"
শেহজাদ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। শুধু পুলিশ কিংবা ফরেনসিক নয়, চাইলে একটা নিখুঁত খুনকে পরিণয় দিতে একে একে সবগুলো ঘুঁটিকেই কিনে নেওয়া যায়। এ আর নতুন কী? তবু সন্দেহের খাতিরে একবার ফাইলের শেষ পাতাটা উল্টে অফিসার ইনচার্জের সিলমোহরটা দেখল।
"ইন্সপেক্টর মোয়াজ্জেম! এই লোককে আমি খুব ভালো করেই চিনি। তিন বছর আগে গুলশান আর্মস কেসে আমি একে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে এমন জেরা করেছিলাম যে লোকটা তোতলাতে শুরু করেছিল। অত্যন্ত ধুরন্ধর আর বিক্রি হয়ে যাওয়া একজন অফিসার। ওপর মহলের টাকা ছাড়া সে এক পা-ও নড়ে না।"
"আরে! তাহলে তো উনার সাথে মির্জা কামরুলের রাইভাল পলিটিশিয়ানদের গোপন লিয়াজোঁ থাকতে পারে।”
শেহজাদ মাথা নেড়ে বলল,
"তার মানে পুলিশকে বিশ্বাস করা এই মুহূর্তে বোকামি হবে। তারা আমাদের কোনো সঠিক ক্লু দিবে না। তাই আমাদের নিজেদেরই শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। একদম নতুন করে, দরকার হলে আমরা আজই মির্জা কামরুল হাসানের ফার্মহাউসে যাব। ক্রাইম সিন ভিজিট করব।"
"আজই? এই বৃষ্টির মধ্যে?" রোদসী বাইরের মুষলধারে বৃষ্টির দিকে তাকাল।
"বৃষ্টি তো একটা প্রাকৃতিক ব্যাপার, মিস রোদসী। খুনি নিশ্চয়ই খুন করার আগে ওয়েদার ফোরকাস্ট দেখেনি। আমরা কেন দেখব?"
রোদসী বিব্রত হলো। সে কাজ ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলেনি। একটু আগের ঝকমকে রোদ ছাপিয়ে আচমকাই আবার বৃষ্টি হতে শুরু করেছে। এই বৃষ্টির মাঝে ক্রাইম সিনে গিয়ে উল্টো এভিডেন্স সব নষ্ট না হলেই হয়।
শেহজাদ সত্যি সত্যি মিনিট দশেকের মাঝেই গাড়ি বের করল। বাইরে অবিরাম বৃষ্টি পড়ছে। গাড়ি ধানমন্ডির জ্যাম ঠেলে হাইওয়ের দিকে উঠেছে। কালিয়াকৈরের দিকে যতই এগোচ্ছে, রাস্তার দুপাশের ফাঁকা প্রান্তরগুলো বৃষ্টির কারণে ততোই আরও ঘোলাটে মনে হচ্ছে। শেহজাদ নিজেই ড্রাইভ করছে। রোদসী সিটের সাথে মাথা এলিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। বদ্ধ গাড়ির এই স্বল্প পরিসরে দুজন মানুষ বেশিক্ষণ নির্বাক থাকতে পারল না। শেহজাদ খানিকটা আনুষ্ঠানিকতা দেখিয়ে জানতে চাইল,
"এসিতে কি বেশি ঠান্ডা লাগছে?"
রোদসী সংক্ষিপ্ত জবাব দিল, “না, চলবে।”
শেহজাদ খেয়াল করেছে, মেয়েটি হাত দুটো বারবার ঘষছে। জড়তায় হয়তোবা বলতে চাইছে না। তাই কথা না বাড়িয়ে সে এসির টেম্পারেচার কিছুটা বাড়িয়ে দিল। হাইওয়েতে একটা বড় জ্যামে আটকে গাড়িটা মিনিট দুয়েক ধরে একভাবে দাঁড়িয়ে আছে। শেহজাদ বাহিরে কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে বলল,
"এই জ্যাম সহজে ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। আশপাশে কোথাও টং দোকান পেলে ভালো হয়। এট লিস্ট একটু চা খাওয়া যাবে।”
রোদসী জবাব দিলো না। এখানে তার জবাব দেওয়ার মতো কিছু নেই। এক মিনিট, দু'মিনিট করে সময় আগালো বেশ অনেক্ক্ষণ। গাড়ি তবু এক ইঞ্চিও নড়লো না। শেষে বিরক্ত হয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে বসে রইল শেহজাদ। তার মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে। এমন অসহ্য জ্যাম হবে টের পেলে সে আজ বের হবার জেদ ধরতো না। অসহ্য মাথাব্যথায় ত্যক্ত হয়ে শেহজাদ পকেট হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেট খুঁজতে চাইলো। না, সাথে নেই। হয়তো অফিসেই পড়ে আছে। সে চেইন স্মোকার নয়, অতিরিক্ত চাপে কিংবা মাথাব্যথায় টিকতে না পারলে সিগারেট জ্বালে। তাকে অস্থির হতে দেখেও পাশের মানুষটির ভাবাবেগ নেই। শেহজাদ দেখল, মেয়েটি চোখ বুজে শুয়ে আছে। ঘুমিয়ে গেল নাকি? কৌতুহলী হয়ে সে জিজ্ঞেস করেই ফেলল,
“ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি?”
“না, এমনি চোখ বুজলাম।”
“সে কি! মোশন সিকনেস আছে নাকি?”
রোদসী চোখ বন্ধ রেখেই দুদিকে মাথা নাড়ল, বলল, “না, জ্যাম দেখতে ভালো লাগছে না বলে চোখ বুজলাম।”
“ওহ আচ্ছা!” শেহজাদ এতক্ষণে ধাতস্থ হল। একটু আগেই তার মনে হয়েছে, মেয়েটি হুটহাট অসুস্থ হয়ে গাড়ির ভেতর বমি টমি করে ফেললে ভয়ানক ব্যাপার হবে। শেহজাদকে থেমে যেতে দেখে রোদসী জানতে চাইল,
“এই জ্যাম কখন ছাড়বে?”
“সেটা আমি কেন? খোদ ট্রাফিক পুলিশও বলতে পারবেন না।”
রোদসী এবার হেসে ফেলল। চোখ খুলে সোজা হয়ে বসল। বাহিরে একটু একটু করে রোদ উঠছে। অথচ বৃষ্টি বিদায় নিতে চাইছে না। একগুঁয়ের মতো সে ঝরেই চলেছে। সেদিকে একপলক তাকিয়ে বলল,
“স্যার?”
“জি?”
“আপনার কী মনে হয়? গত সপ্তাহে হয়েছে মার্ডার। এতোগুলো দিনে সেখানকার সব প্রমাণ লোপাট হয়ে যায়নি?”
“নিরানব্বই ভাগ হয়েছে।”
“তাহলে আমরা সেখানে কী খুঁজতে যাচ্ছি?”
“ফাঁকফোকরে রয়ে যাওয়া বাকি এক ভাগ।”
জ্যাম ছেড়ে দিয়েছে, শেহজাদ আবারো ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। এবার আর গাড়ির ভেতরের নীরবতাটা আগের মতো গাঢ় লাগছে না। শেহজাদ হাইওয়েতে গাড়ি তুলে জিজ্ঞেস করল। “কেসের ব্যাপারে কতটুকু কী ধারণা করলেন?
"আমি আলীর ব্যাকগ্রাউন্ডটা চেক করছিলাম। লোকটার একটা প্রতিবন্ধী ছেলে আছে। গত মাসে ছেলেটার চিকিৎসার জন্য সে মির্জা সাহেবের কাছে কিছু টাকা ধার চেয়েছিল, কিন্তু মির্জা সাহেব তাকে টাকা দেননি। উল্টে অপমান করেছিলেন।"
"এটা তো পুলিশের তৈরি করা মোটিভ," শেহজাদ বাধ সাধল।
"জানি, কিন্তু পুলিশ যেটা ইগনোর করেছে সেটা হলো, আলী যদি রাগের মাথায় খুন করেই থাকে, তাহলে সে ক্রাইম সিন এতটা নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করবে কীভাবে? একজন বৃদ্ধর একার পক্ষে লিভোর মর্টিসের হিসেব কষে বডির পজিশন চেঞ্জ করা সম্ভব নয়। এটা কোনো প্রফেশনাল কিলারের কাজ।”
শেহজাদ রোদসীর কথায় সায় দিল, বলল, "আর প্রফেশনাল কিলার হায়ার করার সামর্থ্য আলীর নেই,"
"তার মানে খুনি এমন কেউ যে মির্জা সাহেবের মৃত্যুর পর আর্থিকভাবে লাভবান হবে। মির্জা সাহেবের বড় ছেলে কোম্পানির ব্যালেন্স শিট ম্যানিপুলেট করছিল। আর মেজো ছেলে ড্রাগ অ্যাডিক্ট, টাকার জন্য সে যেকোনো কিছু করতে পারে।"
"এদের দুজনকে আমরা লিস্টের ওপরের দিকে রাখছি, তবে আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এই কেসটা ডিফরেন্ট।" শেহজাদ গাড়ির স্পিড আরেকটু বাড়িয়ে দিল। স্টেয়ারিং সামলে একটু থেমেই বলল,
"ফার্মহাউসে পৌঁছে আমাদের সবচেয়ে আগে দেখতে হবে বাথরুমের ড্রেন আর পেছনের দরজাটা। আমার ধারণা, খুনি ওই দরজা দিয়েই পালিয়েছে।"
কালিয়াকৈরের নির্জন ফার্মহাউসটির সীমানায় যখন শেহজাদের গাড়িটা এসে পৌঁছাল, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। বৃষ্টি কিছুটা কমে এলেও আকাশ এখনো মেঘাচ্ছন্ন। এই রোদ-মেঘের লুকোচুরিতে গোটা একটা দিন কেটে গেল। চারপাশের বিশাল গাছপালা আর নির্জনতা জায়গাটাকে বেশ এখন ভৌতিক রূপ দিচ্ছে। পুলিশের হলুদ রঙের 'ডু নট ক্রস' টেপ দিয়ে পুরো ফার্মহাউসটা ঘেরা। শেহজাদ গাড়ি থেকে নেমে একটা বড় কালো ছাতা খুলল। রোদসীও তার পাশে এসে দাঁড়াল ছাতার নিচে। সাবধানী পায়ে ফার্মহাউজের পেছনটা দেখতে শুরু করল প্রথমে। পেছন দিকের দরজাটির কাছে এগুতেই মনে হল, এখানে এর আগেও কেউ এসেছে। চারিদিক বেশ পরিষ্কার, পুলিশি বাঁধা পেরিয়েও কেউ প্রবেশ না করলে এক সপ্তাহ পরেও এদিক এত পরিষ্কার থাকার কথা নয়। দরজার হাতলটিকে কাছ থেকে দেখতে একটু ঝুঁকল। শেহজাদ যন্ত্রের মত বলল, “লাভ নেই, ফিঙ্গারপ্রিন্টস আগেই সরিয়ে ফেলেছে। চারিদিক পরিষ্কার করার মতো পর্যাপ্ত সময় যখন পেয়েছে, ফিঙ্গারপ্রিন্টস গায়েব করা আহামরি কোনো ব্যাপার নয়।” রোদসী নিজেও তা জানে। তবু কিছু একটা ক্লু পেতে সে মন দিয়ে আশপাশে খুঁজতে শুরু করলো। শিশির কণার মতো করে টুপটাপ বৃষ্টি ফোঁটা ঝরছে। রোদসী সেই বৃষ্টির ধার ধারছে না। তার নীলরঙা কূর্তিটি ইতিমধ্যেই জায়গায় জায়গায় ভিজে উঠেছে। সে তবু আঁতিপাঁতি করে চারিদিকে একটা ক্লু খুঁজছে। খুঁজতে খুঁজতে আনমনেই পেছন দিকের শেষ সীমানা দেয়াল অবধি পৌঁছে গেছে রোদসী। ওদিকে দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে। অন্ধকার নামার পর এদিকে আর কিছুই পাওয়া যাবে না। শেহজাদ রোদসীকে ডাকতে গিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে একটা কিছু খেয়াল করল। অস্ফুটে বলে উঠল, “ওটা কী?” রোদসী চমকে উঠল। তড়িৎগতিতে পিছু ফিরতে গিয়ে পা পিছলে গেল। ব্যালেন্স হারিয়ে পড়ে যাওয়ার আগেই শেহজাদ ডান হাত বাড়িয়ে তার হাতটা টেনে ধরলো। হুটহাট ঘটনা ঘটনায় রোদসীও হতবিহ্বল। সে সোজা হয়ে দাঁড়াতেও ভুলে গেল। তাকে একভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে শেহজাদ অপ্রস্তুত হল, জানতে চাইল,
“ঠিক আছেন?”
চলবে…