#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_৬
সন্ধ্যা নামার আগেই ঢাকার আকাশটা আবার কেমন যেন কালচে খাসজমির মতো ভারী হয়ে এল। বৃষ্টি না এলেও মেঘেদের ঠাঁট বেশ চোখে পড়ার মতো। শেহজাদের গাড়িটা দেখতে দেখতেই ধানমন্ডির সাত নম্বর রোডের 'জলনূপুর' বাড়ির সামনে এসে থামল। বাড়িটা শেহজাদদের। ক্যাফে থেকে ফেরার বাকিটা পথে গাড়ির ভেতরে তারা কেউ আর কোনো কথা বলেনি। গোটা ঘটনা শেহজাদকে ভালোই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কিন্তু তার থেকেও বেশী সে ভাবছে রোদসীকে নিয়ে। যে বা যারা তার উপর নজর রাখছিল, তারা তাহলে গাড়িতে দুজনের উপস্থিতি লক্ষ্য করেছে। সেই দ্বিতীয়জন কে, তা বুঝে গেলে সমস্যা। এসব মানুষ কেন যেন সবসময় মেয়েদের ট্রিগার করে কাজ হাসিল করতে চায়। তেমন কিছু হলে আজকের লক্ষ্যচ্যূত গুলিটা কাল রোদসীর মাথায় ঠেকিয়ে শেহজাদকে পিছু হটতে বলা হবে।
শেহজাদ গাড়ি পার্ক করে ইঞ্জিন বন্ধ করল। স্টিয়ারিংয়ের ওপর হাত রেখে বাঁ দিকে বসে থাকা রোদসীর দিকে একপলক তাকাল। রোদসী সিট বেল্ট খুলতে ব্যস্ত। মেয়েটিও নিজ থেকে পুরো রাস্তায় আর কথা বলেনি। ভয় টয় পেয়ে গেল নাকি? শেহজাদকে উশখুশ করতে দেখে রোদসী হঠাৎ জানতে চাইল,
“এখান থেকে অটো নিয়ে অফিস যেতে হবে, তাইতো?”
শেহজাদ চমকে উঠল। সে মোটেও এমন কিছু বলতে চায়নি। সে অপেক্ষা করছিল, “ঠিক আছেন?” টাইপ প্রশ্নের। কিন্তু মেয়েটি তা করেনি। অবশ্য করার কথাও নয়। ঠিক না থাকলে এতদূর সে ড্রাইভ করে আসতে পারত না।
“না, আজ আর অফিস যেতে হবে না।”
“আচ্ছা!”
বলতে বলতেই মেয়েটি গাড়ি থেকে বের হলো। শেহজাদ ইতস্তত করে বলল, “আজ বরং বাড়ি গিয়ে রেস্ট করুন। বাকিটা কাল ভাবব।”
“বাকিটা আমি ভেবে নিয়েছি, স্যার।”
“ভেবে নিয়েছেন বলতে? দেখুন, এই ধরণের কেসে তাড়াহুড়ো করে কোনো ভুল করা যাবে না। মোয়াজ্জেমের মতো পুলিশ অফিসার যখন নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিসিটিভির ফুটেজ এবং ক্যাফের হার্ডডিস্ক গায়েব করে দিচ্ছে, তখন এটা অন্তত পরিষ্কার যে, এই খুনটির পেছনে বড় কোনো কারণ লুকিয়ে আছে। তাই যাই করতে হবে, আমাদের ভেবেচিন্তে করতে হবে।”
রোদসীর চুলগুলো দমকা হাওয়ায় উড়ে যেতে চাইছে। বাঁ হাতে চশমার সামনে আসা এলেমেলো চুলগুলো সে সরিয়ে নিলো। বলল, “বেশী ভাববেন না, স্যার। ভেবে ভেবে সব সময় নষ্ট করে ফেললে, শেষে এভিডেন্স হারিয়ে ফেলতে হবে।”
রোদসী শেহজাদকে আর কিছু বলার সুযোগ দিল না। আসছি বলে বেরিয়ে গেল সেখান থেকে। শেহজাদ বোকার মতো তার গমনপথে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা কি এই মাত্রই তার কাজের গতিকে স্লো বলল? আনবিলিভেবল!
অস্থির হয়ে লিফটের বোতাম চাপছে শেহজাদ। মেয়েটিকে অন্তত অফিসের সামনে অবধি ছেড়ে আসা উচিত ছিল। বাসায় এনে ছুটি দেওয়াতে সে ভাবছে শেহজাদ মূর্তজা সামান্য গুলির শব্দে ভয় পেয়েছ। শেহজাদকে সে সত্যি ভীতু ভাবছে! শেহজাদ বাঁ হাতে কপাল ঘষতে ঘষতেই কলিংবেল বাজাল। দরজা খুললেন শেহজাদের মা ফরিদা বেগম। ভদ্রমহিলা বোধহয় সবেই রান্না করছিলেন। সারা গায়ে ঘাম জপজপ করছে। ছেলেকে দেখতেই তার অধরযুগল প্রশ্বস্ত হলো।
“আজ এতো জলদি?”
“ক্লান্ত লাগছিল, তাই চলে এলাম। কী রাঁধছো বলোতো? সারাঘর তো ম ম করছে।”
“খিচুড়ি রাঁধছি। ফ্রেশ হয়ে খাবি আয়।”
শেহজাদ ঘরের দিকে যেতে যেতে বলে গেল, “একটা ডিমও ভেজে দিও সাথে!”
রোজকার মতো আজ-ও খুব কম সময়েই বেরিয়ে এলো শেহজাদ। ইতিমধ্যেই সে দু'বার রান্নাঘর থেকে ঘুরে এসেছে। খিচুড়ি হয়নি। মিনিট দশেক লাগবে। শেহজাদ খেয়াল করল, আজ তার কেমন অস্থির অস্থির লাগছে। বাসায় এসেও সে স্বাভাবিক হতে পারছে না। তার কারণ কী? ফাঁপা গুলিটা? না, এর আগেও সে এমন বহু অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। কই? কখনো তো এমন লাগেনি। শেহজাদকে একভাবে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাকে ডাক দিলেন ফরিদা।
“কী এত ভাবছিস?”
শেহজাদ চমকে উঠে পিছু ফিরল। হাতে টাওয়াল, অথচ তার চুলগুলো বেয়ে পানি ঝরছে। চুল মোছার কথা ভুলে আনমনে জানলার বাহিরে তাকিয়ে আছে ছেলেটা। কাজের চাপ কি বেশী নাকি? ফরিদা বেগম এগিয়ে এসে ছেলেকে বসালেন। টাওয়াল নিয়ে নিজেই চুল মোছাতে শুরু করলেন। বললেন,
“বললি ক্লান্ত লাগছে, তাই বাড়ি এসেছিস। বাড়ি এসেও কেস নিয়ে ভাবলে ক্লান্তি কাটবে কী করে শুনি?”
শেহজাদ জবাব দিলো না। চোখ দুটো বুজে মায়ের হাতের ছোঁয়াটুকু অনুভব করতে ব্যস্ত হল। দিনশেষে মায়ের একটু আদর পেলেই চোখদুটো আপনা থেকে মুদে আসে। মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিলেই সারা শরীর কেমন অসার হয়ে আসে। বয়স বাড়ছে তাও এই প্রতিক্রিয়া কমছে না। আচ্ছা বয়স বাড়লেও কী মা ছাড়া থাকা যায়? কই? শেহজাদ তো পারে না। বাব-মা দুজনের একজনকে না দেখলে, তাদের কন্ঠ না শুনলেই সে অস্থির হয়ে ওঠে। বাবা প্রকাশ না করলেও মা কিন্তু রোজই সবভাবে উজাড় করে ভালোবাসেন। সুযোগ পেলেই আদরে আদরে মুড়িয়ে দেন শেহজাদকে। লোকে বলে, সন্তানের বয়স বাড়লেও কখনো মায়ের আদর করে না। কমবে কেমন করে? জন্ম থেকে একসূত্রে গাঁথা দুটো প্রাণ, সে মায়া একজীবনে কি ফুরায় নাকি?
একমাত্র মায়ের ছোঁয়াতেই শেহজাদ শিশু হয়ে যায়। দিনরাত দুনিয়াবি সমস্ত কাজ সেরে, বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে অনুনয় করতে হয়, একমুঠো ভাত মেখে খাইয়ে দেওয়ার জন্য। ফরিদা বেগম বোধহয় ছেলের অস্থিরতা টের পেলেন। তাইতো জানতে চাইলেন,
“তেল দিয়ে দিব একটু?”
“দাও! মাথাটা কেমন টনটন করছে।”
ফরিদা বেগম তেলের বোতল এনে গুছিয়ে বসলেন। ছেলেটা বাবার মতো লম্বা হয়েছে। তাই তেল দেওয়াতে বসলেই সে মেঝেতে বসে। নয়তো তিনি কি আর ছেলের মাথা ছুঁতে পারেন? ফরিদা বেগম বিছানায় আয়োজন করে বসেন। শেহজাদ মাথাটা এলিয়ে দেয় মায়ের কোলে। চুলের প্রতিটি গোড়ায় ধীরে ধীরে মায়ের উষ্ণ ছোঁয়া অনুভূত হয়। কী চমৎকার সেই অনুভতি! এই কয়েক মিনিট শেহজাদের কাছে কয়েক ঘন্টার মতো লম্বা আর প্রশান্তিময় লাগে। আজও সে একইভাবে বসেছে। মাও প্রতিবারের মতো যত্ন নিয়েই চুলগুলো নাড়ছেন। শেহজাদ তবু শান্তি পাচ্ছে না। কোথাও কিছু একটা তাকে শান্তি পেতে দিচ্ছে না। কিন্তু কী সেটা?
“শুনলাম, তোর নতুন এসিস্ট্যান্ট নাকি মেয়ে?”
শেহজাদ চমকে উঠল। “তোমায় কে বলল?”
“তন্ময় বলেছে।”
“ওকে তুমি কোথায় পেলে?”
“পেলাম আর কই? বিকেলে কল করে জানতে চাইল, তুই কোথায়। ফোন টোনও নাকি ধরছিলি না। পরে আমি অবশ্য ডিনারে ডেকেছি ওকে। সারাদিন কাজ কাজ করলে হবে? সময়মতো খাবারও তো খেতে হবে বল।”
শেহজাদ ছোট্ট করে শ্বাস ফেলল, উঠে গিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে আবার আগের জায়গায় পা গুটিয়ে বসলো। ফোন সাইলেন্ট করা ছিল, তাই তন্ময়ের কল সে দেখেনি। লক খুলতেই তার সামনে মেসেজের অংশটা এলো। মনে পড়লো, ক্যাফেতে ঘটা একের পর এক ঘটনা। কেন যেন বারবার মনে হচ্ছে, ক্যাফের খুব সূক্ষ্ম কিছু সে অদেখা করছে। অথচ বারবার মনে করেও সেই সূক্ষ্ম কিছু ঠিক কী, তা ধরতে পারছে না। আচমকাই তার ধ্যান ভাঙে মায়ের ডাকে।
“মেয়েটিকে একদিন আমাদের সাথে ডিনার করতে বলিস তো।”
“কাকে?”
“কাকে আবার? তোর নতুন এসিস্ট্যান্টকে। যার জন্য তুই আজকাল ফ্যামিলি কোর্টেও যাস।”
শেহজাদ ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকাল। অবাক গলায় জানতে চাইল, “এসবও কি তন্ময় বলেছে?”
“বললে বলেছে, এখন কী ছেলেটাকে শুধু শুধু ধমকাবি নাকি?”
ফরিদা বেগম রান্নাঘরে ছুটে গেছেন। মনে হচ্ছে, খিচুড়ি হয়ে গেছে। শেহজাদ বাঁ হাতে চুলগুলো নেড়ে ডাইনিং এর দিকে এলো। বাবাকে আজ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বোধহয় তন্ময়কে পেয়েই দাবা নিয়ে বসে গেছেন। মানুষটার এতো দাবা পছন্দ! ছুটির দিনগুলোতে সে শেহজাদকে নিয়ে সারাদিন বসে দাবা খেলেন। রান্নাঘর থেকে টুংটাং শব্দ আসছে, মা বোধহয় ডিম ভাজছেন। গরম গরম ডিম ভাজা আর ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি।শেহজাদ ফোনের জেনারেল মোড অন করে টেবিলে রাখলো। গ্লাসে পানি ঢালতে গিয়েই আচমকা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল একজোড়া সন্দেহজনক চোখ। প্রায় সাথে সাথেই হাত ফসকে বেশ খানিকটা পানি টেবিলে পড়লো। তার অনেকটাই আবার ফোনের উপর পড়েছে। শেহজাদ হাত দিয়ে ফোনের স্ক্রিন মুছতে চাইল। মেসেজ অপশন চালু থাকায়, স্ক্রিনে থাকা পানির বদৌলতে কী-বোর্ডে এর মাঝেই বেশ কিছু উল্টোপাল্টা বর্ণ উঠতে শুরু করেছে। শেহজাদ বিরক্ত হয়ে পরনের টি-শার্টে ঘষে চটজলদি পানিটুকু পরিস্কার করতে চাইল। তাতে বাঁধল আরেক কেলেংকারী। মেসেজ থেকে এবার সোজা কল বাজতে শুরু করল। শেহজাদ বিরক্তিতে ‘চ’ সূচক শব্দ করলো। রিং হওয়ার পর কল কেটে দেওয়া ভীষণ বাজে একটা ব্যাপার হবে। তার চেয়ে বরং কল রিসিভ হলে মাত্র মনে পরা ক্লু নিয়েই কথা বলা যাবে। এতে অন্তত ভুলে কল গিয়েছে বলা থেকে বাঁচা যাবে। তাছাড়া, আজকের ঘটনার পর, মেয়েটা ঠিকঠাক বাড়ি পৌঁছেছে কিনা তা জানতে চাওয়াও একধরনের আনুষ্ঠানিকতা। শেহজাদের ভাবনার মাঝেই কল রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে ভেসে এল নিচু গলার আওয়াজ,
“আমি ঠিক আছি, স্যার। চিন্তা করবেন না।”
চারপাশের গাড়ির শব্দ শুনে শেহজাদ অল্প বিস্তর ভড়কে গেল। জানতে চাইল,
“গাড়ির শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে, আপনি কি এখনো রাস্তায়?”
“আমি কেসটাকে আগাতে চাচ্ছি স্যার!”
কী এক সন্দেহে শেহজাদ উঠে দাঁড়াল। শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী বলতে চাইছেন আপনি?”
“ম্যানেজারকে দিয়ে সত্যিটা উগড়ানো যাবে না। তার চেয়ে বরং কোনো ওয়েটারকে ধরতে হবে। দুটো ধমক খেলেই গড়গড় করে সব সত্য বলে দেবে।”
“প্লিজ ডোন্ট টেল দ্যাট, ইউ আর গোয়িং টু দ্য ক্যাফে এলোন?”
“আই উইল ম্যানেজ, ডোন্ট বি প্যানিকড!” বলেই রোদসী কল কেটে দিল। শেহজাদ দ্রুত তার নম্বরে আবার ডায়াল করল। এবার রিং হয়ে কল কেটে গেল। রোদসী তার কল উপেক্ষা করছে। শেহজাদ প্রায় সাথে সাথেই চাবি নিয়ে বেরিয়ে গেল। পেছন থেকে ফরিদা বেগম অবশ্য বেশ কয়েকবার ডাকলেন। সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় এখন হাতে নেই। রোদসী মেয়েটাকে তার এই মুহুর্তে ভীষণ বোকা মনে হচ্ছে। একা একা এতো রাতে ঐ জায়গায় আবার যাওয়া বোকামি বৈ কিছুই নয়। শেহজাদ পুনরায় তার নম্বর ডায়াল করল। এবারো রোদসী কল রিসিভ করলো না। বরং পাঠাল একটি মেসেজ,
“আপনার ওপর ওরা নজর রাখছে, আমার ওপর নয়। আমি নরমাল কাস্টমার সেজেই যাচ্ছি। সো, ডোন্ট ওরি ফর মি।”
মেসেজ পড়া মাত্রই শেহজাদের গাড়ির স্পিড আরো খানিকটা বাড়ল। ক্যাফেতে তারা ঠিক করে দুটো মিনিটও সময় কাটাতে পারেনি। তবে সেটুকু সময়ের মাঝে একজোড়া চোখ তাদের দিকে সন্দেহ নিয়ে তাকিয়েছিল। শেহজাদ যদি খুব একটা ভুল না হয়, তবে এই ওয়েটারের কাছে কোনো না কোনো ইনফরমেশন আছে। এমনকি সেই হয়তোবা শেহজাদের যাওয়ার খবর আততায়ীদের দিয়েছিল। সেখানে গিয়ে তার থেকে তথ্য বের করার মতো কাজকে রোদসী যতোটা সহজ ভাবছে, তা মোটেও ততোটা সহজ নয়। শেহজাদ যখন ক্যাফে শ্যাডোতে পৌঁছালো, তখন ঘড়িতে রাত এগারোটা বেজে বিশ মিনিট। ক্যাফের প্রতিটি বাতি ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ক্যাফের ক্লোজিং টাইম রাত দশটা ত্রিশ মিনিট। ক্যাফে কি তাহলে বন্ধ হয়ে গিয়েছে? শেহজাদ ডানে বামে তাকিয়ে রোদসী খুঁজতে চাইল। দুশ্চিন্তায় তার গলা শুকিয়ে আসছে। একা একা গেল কোথায় মেয়েটা? কোনো বিপদ হলো না তো আবার? নানারকম খারাপ চিন্তায় আকণ্ঠ ডুবে থেকে শেহজাদ তার ফোন নম্বরে আরো একবার ট্রাই করল। এবারো কল রিসিভ হলো না। না এলো কোনো ফিরতি মেসেজ। মেয়েটা ঠিক আছে তো? শেহজাদ কী করবে বুঝতে পারছে না। মাথাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু করেছে। রোদসী তখন ভেবে নিয়েছি বলার পরপরই তাকে বারণ করা দরকার ছিল। কেন যে তার ইঙ্গিত তখন সে ধরতে পারল না! উপায় অন্ত না পেয়ে শেহজাদ দু'হাতে নিজের চুলগুলো টেনে অস্ফুটে বলে উঠল, “শিট!”
এলোমেলো পা ফেলে ক্যাফের চারিদিকটা এবার ভালো করে খুঁজতে শুরু করলো শেহজাদ। একটু এগোতেই দেখল, রোদসী রাস্তার ধারে উবু হয়ে বসে একটা জীর্ণ শীর্ণ বিড়াল ছানাকে আদর করছে। মেয়েটির পরনের মেরুন কূর্তির পেছন ভাগ রাস্তার ধুলো কুড়োচ্ছে অবহেলে। তার অবশ্য সেদিকে খেয়াল নেই। সে তার সামনের সফেদ বিড়াল ছানাটিকে খুঁটে দেখতে ব্যস্ত। শেহজাদ প্রায় ছুটে গেল তার কাছে। অস্ফুটে ডাকল,
“মিস, রোদসী?”
এতক্ষণের খোঁজাখুঁজিতে শেহজাদের শ্বাস প্রশ্বাসের হার বেড়েছে। তারই জেরে সে বড় বড় শ্বাস ফেলছে। হুট করে শেহজাদের কণ্ঠ শুনে রোদসী চমকে পিছু ফিরল। শেহজাদের পরনে একটা ট্রাউজার্স আর কালোরঙা পোলো টি-শার্ট। টি-শার্টটির কলারের নিচ দিক থেকে দুটো বোতামই খোলা। লোকটিকে দেখতে এই মুহূর্তে ভীষণ আনপ্রফেশনাল লাগছে। সে কি বাসার জামা কাপড়েই এখানে চলে এসেছে নাকি? কিন্তু কেন? শেহজাদকে অসময়ে এমন অবিন্যস্ত ভাবে এখানে আসতে দেখে খানিকটা বিব্রত হলো সে। বলল,
“স্যার, আপনি এখানে?”
শেহজাদ বাঁ হাতে কপাল চেপে ডানে বামে তাকাল। সে খুব করে তার রাগ সংবরণ করতে চাইছে। কিন্তু পারছে না। এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো একা একা এতো রাতে এখানে আসার অপরাধে রোদসীকে সে কড়া দুটো কথা শোনাতে চাইছে। কিন্তু এই মুহূর্তে তা করা যাবে না। শেহজাদ নিচু গলায় বেশ শক্ত করে বলল,
“গাড়িতে বসুন।”
_____
শেহজাদ তার ডেস্কে বসে কফি খাচ্ছে, রোদসী নিজের ডেস্কে বসে ল্যাপটপে ক্যাফে শেডো-র মালিকের ফোনের কল রেকর্ড এবং তার পরিচিত সোর্স থেকে পাওয়া ওয়েটারদের একটা লিস্ট এনালাইসিস করছে। তার জন্য সে এই রুমেই আরেকটি ছোট টেবিল আলাদা করে সেট করা হয়েছে। গতরাতে সেখান থেকে আসার পথে অনেকগুলো কথা শোনানোর ইচ্ছে থাকলেও শেহজাদ তাকে কথা শোনাতে পারেনি। পাছে সবকিছু আবার বাড়াবাড়ি মনে হয়! তবু দায়িত্বের খাতিরে সাবধান করে বলেছে, “কেস সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনি অবশ্যই আমার পারমিশন নেবেন, মিস রোদসী। এন্ড দিস ইজ ইওর লাস্ট ওয়ার্নিং।” রোদসী জবাবে হ্যাঁ বা না কিছুই বলেনি। কেন বলেনি তা অবশ্য শেহজাদ জানে না। সে শুধু জানে, ক্যাফের ভেতরেই কোনো গন্ডগোল আছে। রাতে রোদসী যেতে যেতে ক্যাফেটা বন্ধ না হলে বড় কোনো বিপদ হতে পারতো। এই কয়েক সেকেন্ডের জন্য নজরে আসা চোখ দুটি মিস করে যাচ্ছিলো বলেই শেহজাদ সারা সন্ধ্যা অস্থির হয়েছিল। বারবার মনে হয়েছে, সে কোনো একটা ভুল করেছে। তবে এখন মনে হচ্ছে, ভুলটা হয়ে ভালো হয়েছে। তার হাতে অন্তত এমন একজন সাসপেক্ট আছে, যার কথা তার এসিসট্যান্টও এখনো জানেনা। তাকে জানিয়ে কাজ নেই। শেষে তাকে পাকরাও করতে আবার রাত বিরেতে ছুটে গিয়ে বিপদ বাঁধাবে।
"স্যার, একটা ক্লু পাওয়া গেছে। ক্যাফে শেডো-তে সেদিন রাতে যে ওয়েটার ডিউটিতে ছিল, তার নাম জাহিদ। ছেলেটা গত সপ্তাহেই চাকরি ছেড়ে গ্রামের বাড়ি, ডকুমেন্ট অনুযায়ী নরসিংদী চলে গেছে। কিন্তু তার ফেসবুক আইডি বা বিকাশ নাম্বারে এখনো ট্র্যাক করা যাচ্ছে। সে গুলশানের একটা লোকাল মার্কেটে যাতায়াত করছে। তার মানে সে এখনো ঢাকাতেই আছে, বা নরসিংদী গিয়েও আবার ঢাকায় ফিরে এসেছে।"
রোদসী ঘেঁটেঘুঁটে কাজের একটা তথ্য বের করেছে বটে। তবু শেহজাদ তাকে এপ্রিশিয়েট করল না। একটু এপ্রিশিয়েট করলেই মেয়েটা আবার নিজে নিজে রাবণ বধ করতে নামবে। তার চেয়ে একটু কাঠিন্য-ই ভালো। কফির কাপটা ডেস্কে রেখে সে সোজা হয়ে বসল। বলল,
"এই জাহিদ ঢাকায় থাকুক বা নরসিংদী, তাকে খুঁজে বের করতে হবে। কারণ, একমাত্র জাহিদই আমাদের এই কেসের নেক্সট ক্লু এনে দিতে পারবে।”
শেহজাদের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ভেতরে ঢুকল তন্ময়। তার হাতে একটা খাম, মুখাবয়ব ফ্যাকাশে। দেখেই মনে হচ্ছে, কোথাও কিছু গন্ডগোল হয়েছে। অল্পতেই প্যানিক করার স্বভাব আছে ছেলেটার।
শেহজাদের ধারণা ঠিক প্রমাণ করে তন্ময় কাঁপা গলায় বলল, "স্যার... একটা খুব খারাপ খবর আছে।”
একটু থেমেই অনুমতি ছাড়া বলতে শুরু করল,
"ডিবি অফিস থেকে নোটিশ এসেছে। ইন্সপেক্টর মোয়াজ্জেম আমাদের নামে অফিশিয়াল একটা অভিযোগ দায়ের করেছেন। উনি বলছেন, আমরা নাকি মির্জা কামরুল হাসানের মার্ডার কেসের ইনভেস্টিগেশনে বেআইনিভাবে নাক গলাচ্ছি এবং পুলিশকে থ্রেট করছি। উনি আজ বিকেলের মধ্যেই আমাদের চেম্বার সার্চ করার জন্য ওয়ারেন্ট নিয়ে আসছেন!" তন্ময়ের গলা এখনো কাঁপছে।
শেহজাদ তাকে রিসিপশনে পাঠিয়ে আয়েশ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। সে এমন কিছু আগেই আন্দাজ করেছে। গতকাল তাকে হুমকি দিয়ে তারা কাবু করতে পারেনি। এটা তাদের দ্বিতীয় চেষ্টা। একদিনের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার শেহজাদকেই টার্গেট করার কারণ এবার একেবারেই স্পষ্ট। তারা ইতিমধ্যে শেহজাদকে ভয় পেতে শুরু করেছে। আর এই ভয় থেকেই জন্ম নেবে তাদের প্রথম ভুল।
চলবে…