#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_৭
তন্ময়ের চলে যাওয়ার মিনিট পাঁচেকের মাঝেই "দ্য থার্ড আই" চেম্বারের দরজা খোলার শব্দ পাওয়া গেল। রোদসী মনে মনে ঠিক করল, এই দরজাটি খুলে ফেলার ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ সময়ে অসময়ে কোনো প্রকার শিষ্টাচার ছাড়াই হুটহাট সবাই ভেতরে ঢুকে আসে। যেখানে অনুমতি নিতে হয় না, সেখানে এই নামে মাত্র বাঁধাটি রাখার কোনো দরকার নেই।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ইন্সপেক্টর মোয়াজ্জেম। পরনে ইউনিফর্ম, চোখেমুখে এক ক্রূর, দাম্ভিক হাসি। তার পেছনে দুজন সশস্ত্র কনস্টেবল। চেম্বারের ভেতরে ঢুকে তিনি চারপাশটা এমনভাবে জরিপ করলেন, যেন জায়গাটা ইতিমধ্যেই তার পৈতৃক সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে।
"ওয়ারেন্ট নিয়ে আসতে বিকেল অব্দি অপেক্ষা করার সময় আমার নেই, শেহজাদ সাহেব," মোয়াজ্জেমের কর্কশ গলাটা এসির ঠান্ডা বাতাসে যেন চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল।
"সরকারি কাজে বাধা দেওয়া, তদন্তাধীন একটা মার্ডার কেসে বেআইনিভাবে নাক গলানো আর পুলিশকে থ্রেট করার অভিযোগে আমি আপনার এই চেম্বার তল্লাশি করতে এসেছি। আশা করি, আইনের লোক হয়ে আইনের কাজে বাধা দেবেন না।"
তন্ময় ছুটে এসেছিল তাদের সাথে। তার চোখে মুখে দুর্নিবার আতঙ্ক, সে দাঁড়িয়ে আছে চেম্বারে এক কোণে, ঠিক রোদসীর পাশে। রোদসী নির্বিকার, তার চোখমুখ ভীষণ রকম শান্ত। তার কেন যেন মনে হচ্ছে শেহজাদ এ ধরণের ঘটনার জন্য প্রস্তুত। তাই তন্ময়ের মতো সে উশখুশ করতে পারছে না। রোদসী শেহজাদের মুখাবয়ব পরখ করতে চাইল। লোকটা তার রিভলভিং চেয়ারে অত্যন্ত আয়েশ করে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার চোখেমুখে বিন্দুমাত্র উৎকণ্ঠা নেই, বরং একটা প্রচ্ছন্ন তাচ্ছিল্য খেলা করছে। বোঝাই যাচ্ছে, রোদসীর ধারণা একেবারে সত্য। শেহজাদ অলসভাবে আড়মোড়া ভেঙে সোজা হয়ে বসল, বলল,
"আইনের কাজে বাধা দেওয়ার স্বভাব আমার নেই, ইন্সপেক্টর। তবে কেউ যদি আইনের ইউনিফর্ম গায়ে জড়িয়ে বেআইনি কাজ করতে আসে, তাকে সোজা রাস্তাটা দেখিয়ে দেওয়াটাও আমার পেশা।" শেহজাদ ড্রয়ার টেনে একটা অফিশিয়াল ফাইল বের করে ডেস্কের ওপর রাখতে রাখতে কথাগুলো বলল।
মোয়াজ্জেমের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, “বেআইনি মানে? আমার কাছে ওপর মহলের অর্ডার আছে!"
"ওপর মহলের অর্ডার আর কোর্টের আইনের মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে, ইন্সপেক্টর। যাকে তাকে সালাম ঠুকে ওপরমহলের দোহাই দিলেই তা আইন হয়ে যায় না।” এটুকু বলেই সে ফাইল থেকে একটা কাগজ বের করে মোয়াজ্জেমের দিকে একরকম ছুঁড়ে দিল, ভাবটা এমন করল যেন হাত থেকে ফসকে গেছে কাগজটি। অতঃপর বেশ সহজভাবে বলল,
"এটা একটু কষ্ট করে পড়ে দেখুন। মির্জা কামরুল হাসান মার্ডার কেসে আপনাদের প্রাইম সাসপেক্ট, আলীর ওকালতনামা এটা। আমি এখন অফিশিয়ালি আলীর ডিফেন্স ল'ইয়ার।"
ইন্সপেক্টর মোয়াজ্জেম বোধহয় এমন কিছুর জন্য তৈরি ছিলেন না। তিনি দ্রুত হাতে কাগজটি নাড়াচাড় করতে লাগলেন। ইতিমধ্যেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। সে আশ্চর্য গলায় জানতে চাইল,
“কী বলতে চাচ্ছেন? আলীর মতো একজন লোক অ্যাডভোকেট মূর্তজাকে এফোর্ড করে ফেলেছে? তার কি আঙুল ফুলে কলাগাছ হলো? নাকি আপনারই দিনকাল খারাপ যাচ্ছে?”
শেহজাদ তার সূক্ষ্ম খোঁচাটাকে উড়িয়ে দিল। মাথা নেড়ে কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে বসল। স্মিত হেসে বলল, “কী আর করব বলুন? দুর্দিন তো কারো বলে কয়ে আসে না। এই ধরুন, অ্যাডভোকেট মূর্তজার পেছনে লোক ভাড়া করে হুমকি দেওয়ার মতো দুর্দিনও যে পুলিশ ডিপার্টমেন্টের আসবে, তা আমি কল্পনা করেছিলাম?”
“লোক ভাড়া করে হুমকি দিয়েছি মানে? কী বলতে চাচ্ছেন আপনি?”
“বোকা সাজছেন কেন, ইন্সপেক্টর? এতো বোকা তো আপনি নন।”
মোয়াজ্জেম বোধহয় বুঝতে পারলেন, শেহজাদ তাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে। ধরা পড়ার ভয়ে তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন, চড়া গলায় কনস্টেবলদের সার্চ শুরু করতে বললেন। শেহজাদ নির্লিপ্তচোখে তার উচাটন দেখল কিছুক্ষণ। অতঃপর শব্দ করে টেবিলে হাত রেখে উঠে দাঁড়াল। গমগমে গলায় বলল,
"বাংলাদেশের সংবিধান এবং ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, একজন ডিফেন্স ল'ইয়ারের পূর্ণ অধিকার আছে তার মক্কেলকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য স্বাধীনভাবে প্রমাণ খোঁজার এবং আমি ঠিক সেই কাজটাই করছি। “
একটু থেমেই সে গলার স্বর নামিয়ে বলল,
“আপনি যদি এখন জোরপূর্বক একজন ডিফেন্স ল'ইয়ারের চেম্বার সার্চ করেন কিংবা আমার ইনভেস্টিগেশনে বাধা দেন, তবে আমি হাইকোর্টে আপনার বিরুদ্ধে 'কনটেম্পট অফ কোর্ট' এবং 'হ্যারাসমেন্ট'-এর কাউন্টার স্যুট ফাইল করব। আর আপনি তো খুব ভালো করেই জানেন, শেহজাদ মূর্তজা কোর্টে দাঁড়ালে আপনার সো কল্ড ওপর মহলও আপনাকে সাসপেনশন থেকে বাঁচাতে পারবে না। সো, জাস্ট গেট লস্ট ফ্রম হিয়ার।”
মোয়াজ্জেমের মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। এমনিতে লোকটা বেশ ধুরন্ধর হলেও এই মুহূর্তে তাকে কলে আটকানো অসহায় ইঁদুরের মতো লাগছে। হয়তো কোথাও না কোথাও সে নিজেও জানে, শেহজাদ মূর্তজার আইনি মেধার সাথে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। শেহজাদ এমন নিখুঁতভাবে তার কেসটা দাঁড় করিয়েছে যে এখানে জোর খাটানো মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা। তাই কনস্টেবলদের দিকে ইশারা করলেন পিছু হটার জন্য। রাগে তার সর্বাঙ্গ জ্বলছে। শেহজাদ মূর্তজাকে এই মুহূর্তে খপ করে ধরে রিমান্ডে নিতে পারলে খুব ভালো হতো। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে তিনি বলে ফেললেন,
"অ্যাডভোকেট মূর্তজা, আপনার কি মনে হচ্ছে না আপনি খুব বেশি উড়ছেন? এর পরিণতি কিন্তু ভালো নাও হতে পারে।"
"পরিণতির কথা ভেবে আমি কখনো কেস নেই না, ইন্সপেক্টর। কারণ, পরিণতি শেহজাদ মূর্তজার প্রতিপক্ষের হোমওয়ার্ক।”
মোয়াজ্জেম আর কথা বাড়াতে চাইলেন না। চলে যেতে উদ্যত হলেই হঠাৎ তার চোখ পড়ল পাশের ডেস্কে দাঁড়িয়ে থাকা রোদসীর ওপর। রোদসীর পরনে সাধারণ পোশাক হলেও তার চোখের ওই তীক্ষ্ণ, বিকারহীন দৃষ্টি মোয়াজ্জেমের নজর কাড়ল। সাধারণ কেউ হলে নিশ্চয়ই পুলিশের রেইড দেখে এভাবে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না। মোয়াজ্জেম সরু চোখে তাকিয়ে রোদসীকে আগাগোড়া অবলোকন করতে শুরু করলেন।
শেহজাদ মুহূর্তের মধ্যে তার মনোভাব আঁচ করে ফেলল। এই মুহূর্তে শত্রুপক্ষকে প্রতিটি ঘুঁটি সম্পর্কে ধারণা দিয়ে ফেললে বিপদ। শেহজাদ কোনোভাবেই চায় না মোয়াজ্জেমের সন্দেহের তীরে রোদসী আসুক। রোদসী তার অ্যাসিস্ট্যান্ট বা এই কেসের ইনভেস্টিগেটর এমন কোনো ধারণা সে করে ফেললে এরপর কেস স্টাডি করাটা শেহজাদের জন্য কঠিন হবে। এমনিতেই তিনি শেহজাদের দিকে নজর রাখছেন। এখন এই কেসে তাকে আগাতে হলে রোদসীকে ব্যবহার করা ছাড়া আর কোনো উপায় হাতে নেই। শেহজাদ এই শেষ উপায়টা হারাতে চায় না। তাই পরিস্থিতি বদলাতে অত্যন্ত সাবলীলভাবে গলা খাঁকারি দিল। তারপর রোদসীর দিকে তাকিয়ে এমন একটা ভাব করল যেন রোদসী নিছকই একজন সাধারণ মক্কেল, যে পুলিশের আগমনে বিরক্ত হচ্ছে। বিব্রত হয়ে বলল,
"আপনার কেসটি নিয়ে আমি আগে স্টাডি করতে চাই। এরপর আমি এ নিয়ে বসব। আপনি এখন আসতে পারেন।"
রোদসী শেহজাদের এই তাৎক্ষণিক অভিনয়ের ব্যাপারটা ধরে ফেলল। এর আগেও শেহজাদ এমন করেছে। লোকটা কেন যেন তার শত্রু পক্ষকে তার এসিসট্যান্ট সম্পর্কে ধারণা দিতে চাচ্ছে না। কিন্তু কেন? সে কি তবে রোদসীকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করতে চাইছে? রোদসী চটজলদি নিজেকে সামলে নিল, মাথা নেড়ে খুব সাধারণ ভাবে বলল, "ঠিক আছে, স্যার। আমি তাহলে পরে আসব।”
মোয়াজ্জেম আর সময় নষ্ট করল না। মূর্তজার ক্লায়েন্টকে পরখ করে তার কাজ নেই। তার কাজ এখন শেহজাদের ঔদ্ধত্য আসল জায়গায় পৌঁছান। তবেই তার ডানা কাটা হবে। আপাতত এটাই তার জন্য জরুরী। মোয়াজ্জেম চলে যেতেই শেহজাদ স্বস্তির শ্বাস ফেলল। তন্ময় তখনো রোদসীর পাশে দাঁড়িয়ে ঘামছে। এই ছেলেটা এতো জলদি ঘাবড়ে যায় কী করে কে জানে? তাকে রোদসীর পেছনে দাঁড়িয়ে কাঁপাকাঁপি করতে দেখার দৃশ্যটা খুব একটা শোভনীয় লাগছে না। রোদসী আজ গাঢ় সবুজ রঙের একটা কূর্তি পড়েছে। গলায় জড়িয়েছে কলাপাতা রঙের ওড়না। চুলগুলো আজও পিঠজুড়ে ছড়িয়ে আছে এলোমেলো ভাবে। শেহজাদ তার দিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চাইল, মেয়েটিকে একপলক দেখেই কি কেউ ধরতে পারবে, সে একজন বুদ্ধিদীপ্ত নব্য উকিল? মনে হয় না। শেহজাদের ঠোঁটের কোণে হঠাৎ হাসি ফুটল। রোদসীর দিকে তাকিয়েই সহজ গলায় বলল,
"ইউ আর আ গুড এক্ট্রেস এ্যাজ ওয়েল।”
__
ভাদ্রমাসের গুমোট বিকেল। ঢাকা শহরের আকাশ আজ সকাল থেকেই মুখ ভার করে আছে। রোদের দেখা নেই, চারপাশ কেমন একটা ছাইরঙা বিষণ্ণতায় ঢাকা। মূর্তজার ‘দ্য থার্ড আই' চেম্বারে আজ পিনপতন নিরবতা। সকালের ঘটনার পর বেশ লম্বা একটা লাঞ্চ ব্রেক কাটিয়ে এসেছে তারা। শেহজাদ তার ডেস্কের ওপর রাখা একটা ম্যাপের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। ম্যাপটা গুলশানের। তার একপাশে কড়াইল বস্তির ঘিঞ্জি এলাকা, অন্যপাশে শহরের সবচেয়ে অভিজাত রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেগুলোর অবস্থান।
"জাহিদের লাস্ট লোকেশন কড়াইল বস্তির ভেতরের ওই নদীর পাড়ঘেঁষা ভাঙা গোডাউনটা।” শেহজাদ লাল মার্কার দিয়ে ম্যাপের ঐ বিশেষ অংশে গোল দাগ দিল। তারপর মুখ তুলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রোদসী আর তন্ময়ের দিকে তাকাল।
"ছেলেটা ক্যাফে শেডো-তে ওয়েটার ছিল। মির্জা কামরুল যেদিন খুন হন, তার আগের দিন সন্ধ্যায় উনি ওই ক্যাফেতে গিয়েছিলেন। এবং জাহিদ তাকে সার্ভ করেছিল। জাহিদ এমন কিছু শুনেছে বা দেখেছে, যার কারণে সে চাকরি ছেড়ে বস্তিতে গিয়ে লুকিয়ে আছে।"
তন্ময় একটু ইতস্তত গলায় বলল, "স্যার, পুলিশও তো তাহলে জাহিদকে খুঁজছে। আমরা কি পুলিশের আগে তার কাছে পৌঁছাতে পারব?"
"আমাদের পৌঁছাতেই হবে," শেহজাদ ড্রয়ার থেকে গাড়ির চাবিটা বের করে ডেস্কের ওপর রাখল। ব্যস্ত গলায় বলল,
"তন্ময়, তুমি আর রোদসী এখনই কড়াইল বস্তির ওই গোডাউনে যাবে। জাহিদকে যেভাবেই হোক, কনভিন্স করে আমাদের সেফ হাউসে নিয়ে আসবে। ওর স্টেটমেন্ট ছাড়া আমরা পুলিশের সাজানো চার্জশিট ভাঙতে পারব না।"
রোদসী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শেহজাদের দিকে তাকাল। মেয়েটার অবজারভেশন স্কিল সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। সে বুঝতে পারছে, শেহজাদের কথার সাথে বডি ল্যাঙ্গুয়েজের কোথাও একটা সূক্ষ্ম অমিল আছে।
"আপনি আমাদের সাথে যাচ্ছেন না, স্যার?" রোদসী প্রশ্ন করল।
"না। আমার অন্য একটা কাজ আছে। একটা পেপারওয়ার্কের জন্য আমাকে হাইকোর্টের দিকে যেতে হবে," শেহজাদ অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় মিথ্যাটা বলল। গোটা বাক্যে তার চোখের পাতা এক সেকেন্ডের জন্যও কাঁপল না। একটু থেমেই বলল,
"তোমরা দুজন যাও। তবে সাবধানে। বস্তির ভেতর পুলিশের সোর্স থাকতে পারে।"
রোদসীর মনের ভেতর খচখচ করতে লাগল। শেহজাদ মূর্তজা এমন একটা মানুষ, যে যেকোনো বড় লিডের পেছনে নিজে সবার আগে দৌড়ায়। এত বড় একটা উইটনেস বস্তিতে লুকিয়ে আছে, আর শেহজাদ কি না পেপারওয়ার্কের অজুহাত দিচ্ছে? কিন্তু তার নির্দেশের বাহিরে কথা বলার এখতিয়ার রোদসীর নেই। এ নিয়ে গতরাতেই সে বিস্তর জ্ঞান শুনেছে। নতুন করে জ্ঞান শোনার ইচ্ছে তার নেই। রোদসী কাঁধের ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে তন্ময়ের সাথে বেরিয়ে গেল।
চেম্বার ফাঁকা হতেই শেহজাদের মুখের সেই স্বাভাবিক, চিন্তিত ভাবটা উবে গেল। তার জায়গায় আচানক ফুটে উঠল এক হিমশীতল হিংস্রতা। সে খুব ভালো করেই জানে, জাহিদকে কড়াইল বস্তিতে পাওয়া যাবে না। ইন্সপেক্টর মোয়াজ্জেমের লোকজন ইতিমধ্যেই জেনে গেছে যে মূর্তজা জাহিদের খোঁজ করছে। আর পুলিশ যখন কোনো সাক্ষী সম্পর্কে আগে থেকেই অ্যালার্ট হয়ে যায়, তখন সেই সাক্ষীর বেঁচে থাকার মেয়াদ কয়েক ঘণ্টার বেশি হয় না। শেহজাদ জেনেশুনেই রোদসী আর তন্ময়কে ওই বস্তিতে পাঠিয়েছে, কারণ সে চায় পুলিশের নজর বস্তির দিকেই থাকুক। মোয়াজ্জেম ভাবুক শেহজাদের পুরো টিম জাহিদের পেছনে দৌড়াচ্ছে।
আর এই সুযোগে শেহজাদ যাবে আসল জায়গায়।
শেহজাদ তার কালো জ্যাকেটটা গায়ে চাপাল। তারপর ডেস্কের সবচেয়ে নিচের দিকের ড্রয়ারটা খুলল। ড্রয়ারের ভেতর কালো ভেলভেটের ওপর রাখা আছে তার লাইসেন্স করা গ্লক-১৯ পিস্তলটা। ক্রিমিনাল ল'ইয়ারের কাছে অস্ত্র থাকাটা খুব একটা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। কিন্তু আজ এই জিনিসটার ঠিক কখন কীভাবে দরকার পড়তে পারে, তা সে নিজেও জানে না। শেহজাদ পিস্তলটা চেক করে জ্যাকেটের ভেতরের পকেটে সযত্নে লুকিয়ে রাখল। আজ তার গন্তব্য কোনো বস্তি নয়, তার গন্তব্য গুলশানের সেই নামকরা 'ক্যাফে শেডো'।
কড়াইল বস্তির গলিগুলো যেন এক অন্তহীন গোলকধাঁধা। পচা মাছের আঁশটে গন্ধ, খোলা ড্রেনের দুর্গন্ধ, আর হাজারটা মানুষের দরদাম করার আওয়াজ—সব মিলিয়ে জায়গাটা একটা জগাখিচুড়ি পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। ভাদ্রমাসের এই ভ্যাপসা গরমে এখানকার বাতাসে নিশ্বাস নেওয়াও যেন দায়। রোদসী আর তন্ময় কাদা,ময়লা মাড়িয়ে খুব সাবধানে সামনের দিকে এগোচ্ছে।
তন্ময় এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে ফিসফিস করে বলল, "ম্যাডাম, জায়গাটা সুবিধার মনে হচ্ছে না। চারপাশের মানুষগুলো কেমন যেন সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।"
"স্বাভাবিক," রোদসী তার চশমার কাঁচটা একটু ঠিক করে নিল। সতর্ক দৃষ্টিতে ডানে বামে তাকিয়ে বলল,
"আমরা এখানকার মানুষ নই, সেটা আমাদের পোশাক দেখলেই বোঝা যায়। সোজা হাঁটো তন্ময়। চোখের দৃষ্টি স্বাভাবিক রাখো।"
ম্যাপ অনুযায়ী নদীর পাড়ের সেই ভাঙা গোডাউনটার সামনে পৌঁছাতে তাদের প্রায় আধঘণ্টা লেগে গেল। গোডাউনের টিনের চাল অর্ধেক ভাঙা, চারপাশটা ঝোপঝাড়ে ঘেরা। বুড়িগঙ্গার কালো পানির একটা তীব্র পচা গন্ধ চারিদিকের বাতাসটাকে ভারী করে তুলেছে।
"এটাই তো সেই গোডাউন," তন্ময় ঢোক গিলে বলল।
"হুম," রোদসী সাবধানে গোডাউনের মরিচা পড়া লোহার দরজাটার দিকে এগোল। দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার।
রোদসী ফোনের ফ্ল্যাশলাইট অন করে সন্তর্পণে ভেতরে ঢুকল। তন্ময় তার ঠিক পেছনে।
"জাহিদ?" রোদসী খুব নিচু গলায় ডাকল। "জাহিদ, আছ এখানে? ভয় পেও না, আমরা তোমাকে সাহায্য করতে এসেছি।"
কোনো উত্তর এল না। শুধু গোডাউনের টিনের চালে কয়েকটা ইঁদুর দৌড়ে যাওয়ার শব্দ হলো। রোদসী ফ্ল্যাশলাইটের আলোটা চারদিকে ঘোরাতে শুরু করল। ভাঙা কাঠের বাক্স, পুরোনো বস্তা, আর ধুলোর আস্তরণ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না। হঠাৎ আলোটা গিয়ে পড়ল গোডাউনের একদম শেষ প্রান্তের একটা খড়ের গাদার ওপর। রোদসীর নিঃশ্বাস আটকে গেল।
তন্ময় পেছন থেকে উঁকি দিয়ে দৃশ্যটা দেখেই একটা অস্ফুট চিৎকার করে নিজের মুখ চেপে ধরল।
খড়ের গাদার ওপর একটা ছেলে পড়ে আছে। তার গায়ে ক্যাফের ইউনিফর্মের একটা মলিন শার্ট। ছেলেটার গলাটা এমনভাবে কাটা হয়েছে যে পুরো খড়ের গাদাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। রক্তের রঙ কালচে হয়ে এসেছে, যার মানে মৃত্যু হয়েছে বেশ কয়েক ঘণ্টা আগে। চোখ দুটো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে কোটর থেকে প্রায় বেরিয়ে আসার উপক্রম।
"জাহিদ..." রোদসী ফিসফিস করে উঠল। তার সারা শরীর একটা শীতল স্রোতে কেঁপে উঠল। সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে এল।
"ম্যাডাম... ওকে তো মেরে ফেলেছে! পুলিশ... পুলিশ হয়তো আমাদের ফলো করে..." তন্ময় আতঙ্কে তোতলাতে শুরু করেছে।
"পুলিশ আমাদের ফলো করেনি তন্ময়," রোদসীর তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক এবার পুরো সমীকরণটা মেলাতে শুরু করেছে। "পুলিশ আমাদের আগেই জানত জাহিদ কোথায় আছে। তারা ওকে অনেক আগেই মেরে রেখে গেছে। ভালো করে দেখো, রক্তের রঙ কালো হয়ে এসেছে। এই মাত্র মা'রা গেলে র'ক্তের রঙ এমন বদলাতো না।”
___
গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ঠিক কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত 'ক্যাফে শেডো'।
বাইরের ভ্যাপসা গরম আর কোলাহলের সম্পূর্ণ বিপরীত এক পরিবেশ এখানে। মৃদু আলো, ইতালিয়ান মার্বেলের ফ্লোর, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে সফট জ্যাজ মিউজিক। শহরের হাই-প্রোফাইল বিজনেসম্যান আর পলিটিশিয়ানদের আনাগোনা থাকে এই ক্যাফেতে। শেহজাদ ক্যাফের একদম কর্নারের একটা টেবিলে বসে আছে। তার সামনে রাখা এক কাপ ব্ল্যাক কফি, যেখান থেকে ধোঁয়া উঠছে। শেহজাদের দৃষ্টি ক্যাফের কাউন্টারের দিকে।
তার টার্গেট জাহিদ নয়। জাহিদ তো একটা সাধারণ মোহরা ছিল মাত্র, যে পুলিশকে ব্যস্ত রাখার জন্য যথেষ্ট। শেহজাদের আসল টার্গেট হলো কাউন্টারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওই লম্বা, ফর্সা ওয়েটারটি। ছেলেটার নেমপ্লেটে লেখা 'সাগর'। গতকাল শেহজাদ আর রোদসী যখন এই ক্যাফেতে এসেছিল, তখন সে এই সাগর তাদের দিকে কৌতুহল নিয়ে তাকায়নি, তার চোখে মুখে অস্থিরতা ছিল। কিসের সেই অস্থিরতা? তার সেই অস্থির চোখজোড়া গতরাত শেহজাদকে ঘুমাতে দেয়নি। জাহিদের পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে ক্যাফের স্টাফরা যখন ফিসফিস করছিল, তখন সাগরের চোখেমুখে কোনো কৌতূহল ছিল না, বরং ছিল একটা চাপা আতঙ্ক। সে বারবার ক্যাফের ম্যানেজারের কেবিনের দিকে তাকাচ্ছিল। শেহজাদের সাইকোলজিক্যাল রিডিং কখনো ভুল হয় না। সে জানে, এই সাগর হয়তোবা এমন কিছু জানে, যা জাহিদের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শেহজাদ কফি নিয়ে বসে আছে। তার মুখে মাস্ক, মাস্ক খুলে সে কফিতে চুমুক দিতে চাইছে না। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর সাগরের দেখা পাওয়া গেল। তাকে দেখতেই শেহজাদ কাশি দেওয়ার ছলে ইচ্ছে করে প্যান্টে কিছুটা কফি ফেলল। তারপর তাকে দেখিয়ে উঠে দাঁড়াল। তাড়া দেখিয়ে প্যান্টটা ঝারতে শুরু করল। বিব্রতকর মুহূর্ত সামলাতে সামনে থাকা সাগর ছুটে এল। বলল,
“স্যার, আপনি ঠিক আছেন?”
শেহজাদ টিস্যু এগিয়ে দেওয়া ছেলেটার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। ঠান্ডা গলায় জানতে চাইল,
"ওয়াশরুমটা কোন দিকে?"
"ওই যে স্যার, ওই করিডোরের শেষে বাঁ দিকে," সাগর হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল।
শেহজাদ ইতস্তত করে ইচ্ছে করে উল্টো দিকে হাঁটা ধরল। তাকে স্টোররুমের দিকে এগোতে দেখে এগিয়ে এল সাগর। শেহজাদকে পথ দেখিয়ে করিডোর পার হয়ে ওয়াশরুমের দিকে নিয়ে গেল সে। শেহজাদ ওয়াশরুমে ঢুকে সতর্ক চোখে চারিদিকে দেখল। ভেতরে একজন মধ্যবয়স্ক লোক প্রাকৃতিক কাজ সারছেন। ভেতর থেকে পানি পড়ার মৃদু শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। শেহজাদ অপেক্ষা করল। সময় নিয়ে প্যান্টে পানি দিয়ে টিস্যুর সাহায্যে তা ঘষল। মিনিট খানেক বাদেই ভদ্রলোক হাত ধুয়ে বেরিয়ে গেলেন। তিনি বের হতেই শেহজাদ চট করে ঘাড় বের করে বাহিরে উঁকি দিল। সাগর এখনো এখানেই। সে বোধহয় ক'টা টাকা টিপস পাওয়ার লোভে একটা হেয়ার ড্রায়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তার উদ্দেশ্য স্পষ্ট। শেহজাদের ভেজা প্যান্ট শুকিয়ে দিয়ে দাঁত কেলিয়ে ক'টা টাকা হাতিয়ে নেওয়ার লোভে তার মুখটা হাসি হাসি। শেহজাদ ধীর গলায় তাকে তাকে ডাকল,
“এক্সকিউজ মি! আই নিড ইওর হেল্প।”
সাগর যেন এই কথার অপেক্ষাই করছিল। সে বড় বড় পায়ে ভেতরে এল। সাগর ওয়াশরুমের ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই শেহজাদ বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে দাঁড়াল, সাগরের কলার চেপে ধরে তাকে সজোরে ভেতরে টেনে দরজা আটকে দিল। সাগর কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজেকে আটক অবস্থায় আবিষ্কার করল। তাকে ধাক্কা দিয়ে বেসিনের পাশের টাইলস করা দেয়ালের সাথে চেপে ধরা হয়েছে। সাগর আঁতকে উঠল। বড়লোকেদের কত রকমের কুৎসিত চাহিদা। সেসবের জেরে সে আবার ফেঁসে গেল না তো? হড়বড় করে বলল,
"কী করছেন স্যার! ছাড়ুন আমাকে! আমি কিন্তু সিকিউরিটি ডাকব!"
"ডাকো। কিন্তু জেনে রেখো, সিকিউরিটি আসা অবধি তোমার চোয়ালের হাড়গুলো আর আস্ত থাকবে না।”
কথাটা বলার সাথে সাথেই শেহজাদ তার জ্যাকেটের পকেট থেকে তার পিস্তলটা বের করল। পিস্তলের কালো, ভারী মেটাল বডিটা দেখে সাগরের চোখের মণি বড় বড় হয়ে গেল। তার গলা দিয়ে আর কোনো আওয়াজ বের হলো না। শেহজাদ আচমকাই একজন নিখুঁত প্রফেশনালের মতো পিস্তলটা উল্টো করে ধরল। তারপর পিস্তলের ভারী পেছনের অংশটা দিয়ে সাগরের নিচের চোয়ালের বাঁ দিকে বিশেষ কায়দায় সজোরে একটা আঘাত করল। প্রায় সাথে সাথেই হাড় মড়মড় করার একটা বীভৎস শব্দ হলো। সাগর যন্ত্রণায় কোঁকিয়ে উঠে বসে পড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু শেহজাদ তাকে সেই সুযোগ দিল না। সে কলার ধরে তাকে পুরোপুরি আয়ত্তে আনল। ফিসফিস করে বলল,
"এটা ফার্স্ট স্ট্রাইক, নিচের ম্যান্ডিবল জয়েন্টটা জাস্ট ডিসলোকেট হয়েছে। ব্যথাটা মারাত্মক, কিন্তু তুমি মরবে না। আমি যদি রাইট সাইডে আরেকটা স্ট্রাইক করি, তাহলে তোমার চোয়ালটা চিরকালের মতো বাঁকা হয়ে যাবে। সারাজীবন স্ট্র দিয়ে লিকুইড খাবার খেতে হবে। সো, ডোন্ট বি স্মার্ট।"
সাগর যন্ত্রণায় কাতরাতে শুরু করেছে। তার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। সে হাত জোড় করে গোঙাতে গোঙাতে বলল,
"স্যার... প্লিজ..."
যখন তখন কেউ ওয়াশরুমের দিকে আসতে পারে। বেশী সময় নেওয়া যাবে না। তাই তাকে থামিয়ে শেহজাদ চটজলদি আসল কথায় এল,
"মির্জা কামরুলের সাথে সেদিন রাতে কে দেখা করতে এসেছিল? আর জাহিদ কী এমন জানত যার জন্য ওকে মরতে হলো?" শেহজাদ পিস্তলটা সাগরের ডান চোয়ালের কাছে তাক করে ধরে রেখেছে। সাগর সত্য গোপনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করল। জড়ানো গলায় বলল,
“আমি কিছু জানি না, স্যার। সব জাহিদ জানে।”
শেহজাদ পুনরায় পিস্তলের পেছনভাগ দিয়ে সাগরের বাঁ চোয়ালে শক্ত করে একটা বারি দিল। যদিও আগের থেকে কম শক্তি প্রয়োগ করেছে সে, তবু ব্যথা পেল সাগর। সদ্য আঘাত পাওয়া জায়গায় আলতো টোকা খেলেও ব্যথায় সারা শরীর কাবু হয়, সেখানে সে পরপর দু’বার ঘা খেয়েছে। এবার আর সে মিথ্যা বলল না।
"জাহিদ... জাহিদ শুধু মন্ত্রী সাহেবকে দেখেছিল স্যার, কিন্তু আমি... আমি সেদিন ভিআইপি লাউঞ্জের সিসিটিভি ক্যামেরাটা পরিষ্কার করছিলাম। মন্ত্রী সাহেব যখন কামরুল সাহেবকে থ্রেট দিচ্ছিল, তখন আমি ওই ক্যামেরার ফুটেজটা গোপনে আমার একটা পেনড্রাইভে কপি করে নিয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম... ভেবেছিলাম ব্ল্যাকমেইল করে কিছু টাকা কামাব। কিন্তু পুলিশ জাহিদের পিছে লাগার পর আমি ভয়ে চুপ হয়ে যাই।"
শেহজাদের চোখ দুটো জ্বলে উঠল। সিসিটিভি ফুটেজ! এটার জন্যই পুলিশ ক্যাফে শেডো-র হার্ডডিস্ক গায়েব করে দিয়েছিল। শেহজাদ পিস্তলটা ঘুরিয়ে এবার গুলি করার ভাব ধরল। থুতনির নিচ দিকে শক্ত করে পিস্তল ঠেকিয়ে জানতে চাইল,
"কোথায় সেই পেনড্রাইভ?"
"ক্যাফের... ক্যাফের লকার রুমে আমার ব্যাগের ভেতর লুকানো আছে স্যার। লাল রঙের একটা পেনড্রাইভ। আমি আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি, আল্লাহর দোহাই আমাকে ছেড়ে দিন!"
ঠিক সেই মুহূর্তে শেহজাদের পকেটে রাখা মোবাইল ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। শেহজাদ এক হাত আড়াআড়ি করে কনুই এর সাহায্যে সাগরের গলা চেপে ধরল, অন্য হাতে পকেট থেকে ফোন বের করল। স্ক্রিনে বড় বড় লেখা ভাসছে—'Miss Trouble'।
শেহজাদ ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরল। সাগরের দিকে তাকিয়ে ইশারায় চুপ থাকতে বলল। বাড়ন্ত শ্বাস-প্রশ্বাস চেপে বলল, “হ্যালো!”
ফোনের ওপাশ থেকে রোদসীর ঠান্ডা গলা ভেসে এল। সে বিকারহীন গলায় বলল,
"স্যার, আই থিংক উই আর ইন ট্রাবল এগেইন। আমরা গোডাউনে আছি, কিন্তু..."
“জাহিদ মারা গেছে, তাইতো?”
ফোনের ওপাশে রোদসী হতবিহ্বল হল, বোকার মতো জানতে চাইল,
"আপনি কী করে জানলেন?"
দাম্ভিক হাসিতে শেহজাদের ঠোঁটের কোণ বেঁকে উঠল। স্বাভাবিক গলায় বলল,
"ওখানের কিছুতে হাত লাগাবেন না। ফিরে আসুন সাবধানে।”
রোদসীর বিস্ময় এখনো কাটেনি। সে আবারো জানতে চাইল,
“জাহিদ মৃত, তার মানে আবারো কেসটার একটা ডেড এন্ডে এসে পোঁছেছি। আর আপনি এতো স্বাভাবিক ভাবে বলছেন ফিরে আসতে? আশ্চর্য হচ্ছি।”
“সামনে আরো হবেন। পদে পদে হবেন।”
“আমার আপনাকে অস্বাভাবিক লাগছে। কেন যেন মনে হচ্ছে আপনি সবটা আগে থেকেই জানতেন,তাই অবাক হননি। আমি যদি খুব একটা ভুল না হই, তবে আপনার অন্য কোনো প্ল্যান আছে। এবং হয়তোবা আপনি এই মুহূর্তে সেই প্ল্যান ধরেই আগাচ্ছেন। এ্যাম আই রাইট?”
শেহজাদ তার সামনের দেয়ালের সাথে সেঁটে থাকা, যন্ত্রণায় কোঁকাতে থাকা সাগরের দিকে তাকাল। ছেলেটার চোখের ওই আতঙ্কিত দৃষ্টি শেহজাদকে অদ্ভুত এক তৃপ্তি দিচ্ছে। ওদিকে রোদসীও আবার তাকে টেক্কা দিতে চাইছে। মেয়েটির এই স্বভাব বোধহয় শেহজাদকে বেশ মজা দিচ্ছে, তাই কল কাটার আগে সে ঠান্ডা গলায় বলল,
“ওয়েল, আই ওয়াজ রাইট। ইউ ডু হ্যাভ আ শার্প ব্রেইন।”
চলবে…