ফন্ট সাইজ:
থিম:
তবুও জোছনা নামে

পর্ব 9

লেখক: বর্ণপ্রিয়া

#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_৯

গুমোট রাত পেরিয়ে সবেই ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। জানালার কাঁচ ভেদ করে আসা শহরের নিস্তেজ আলোয় চেম্বারের ভেতরের ভারী আসবাবগুলো এক একটা বিশাল ছায়ার মতো লাগছে।

শেহজাদ তার ডেস্কের ওপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। তার ল্যাপটপের স্ক্রিনটা এখনো অন, কিন্তু স্লিপ মোডে চলে যাওয়ার কারণে পুরোটাই অন্ধকার হয়ে আছে। গত রাতে শেহজাদ একটুও ঘুমাতে পারেনি। ক্যাফে শেডোর ওয়েটার সাগরের কাছ থেকে উদ্ধার করা সেই লাল রঙের পেনড্রাইভটা নিয়ে সে সারারাত স্টাডি করেছে। ফুটেজটা সে বারবার প্লে করে দেখেছে, অডিওটা এনহ্যান্স করার চেষ্টা করেছে। ফুটেজে এটা স্পষ্ট যে, মির্জা কামরুল হাসানের সাথে বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী রাশেদুল হকের তীব্র কথা কাটাকাটি হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হলো, ভিডিওতে এমন কোনো ডিরেক্ট ডেথ থ্রেট বা সরাসরি খুনের হুমকি নেই, যা দিয়ে একজন রানিং মিনিস্টারের বিরুদ্ধে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট বের করা যায়। ভিডিওতে মন্ত্রী শুধু একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে বেরিয়ে যান। বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থায় এইটুকু এভিডেন্স দিয়ে রাশেদুল হকের মতো ক্ষমতাধর মানুষকে ছোঁয়াটা রীতিমতো অসম্ভব।

শেহজাদ এখনো কাউকে এই ব্যাপারে কিছু জানায়নি। আদতেও মির্জা কামরুল হাসানের খু'নে মন্ত্রীর হাত আছে কিনা তা আগে জানা দরকার। সে সারারাত বসে তাদের দুজনার মধ্যে কমন, এমন শক্ত পয়েন্ট খোঁজার চেষ্টা করেছে, এবং একপর্যায়ে চরম ক্লান্তিতে ডেস্কের ওপরই ঘুমিয়ে পড়েছে।

সকাল ঠিক সাড়ে দশটায় রোদসী অফিস এসেছে। গতরাতে শেহজাদ তাকে কিছুই বলেনি। শুধু বলেছে, “বিশ্বাস না করলে আপনার জেদকে প্রশ্রয় দিয়ে কোনোরকম স্টাডি করা ছাড়াই ডিভোর্স কেসটা হাতে নিতাম না।” এরপর রোদসী আর কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। শেহজাদ হয়তো নিজে কোনো ব্রেকথ্রু বের করতে চাচ্ছে। রোদসীর সহায়তায় সে কেসে এগিয়ে যেতে চাচ্ছে না। সেই এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় সে যদি সত্য গোপন করেই আগাতে চায়, তবে তাই হোক। রোদসীও পেছাবে না। রোদসী কাল হাবে কল করে পার্সেলটি হোল্ড করিয়েছে। সকাল সকাল সেখান গিয়ে পার্সেলটি আনার উৎকণ্ঠায় গতরাতে তার ঘুম হয়নি। সকালে সে ফ্রেশ হওয়ার সুযোগও পায়নি। গতকালের পোশাকেই ছুটে আসতে হয়েছে অফিসে।

রোদসী ভেতরে ঢুকে শেহজাদকে ডেস্কে মাথা রেখে ঘুমাতে দেখল। লোকটার গায়ে গত কালকের কালো শার্ট। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সে হয়তো গত রাতে বাড়ি ফেরেনি। রোদসী কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। প্রতিযোগিতা তবে সমানে সমানে চলছে। রোদসী পার্সেলটা হালকা শব্দ করে ডেস্কের ওপর রাখল।

শব্দ পেয়ে শেহজাদ ধড়ফড় করে চোখ মেলে তাকাল। তার ঘুম এমনিতেই খুব পাতলা। সে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসল। চোখেমুখে তার ঘুম আর ক্লান্তির রেশ,

"গুড মর্নিং, মিস রোদসী।”

"গুড মর্নিং, স্যার।” রোদসী পার্সেলটা শেহজাদের দিকে এগিয়ে দিল।

“এতো সকাল সকাল পার্সেলটা উদ্ধার করে আনলেন!”

"জি, সকাল সকালই আনলাম।”

“বাহ! তা কী আছে এতে?”

“খোলা হয়নি।”

শেহজাদ আড়মোড়া ভেঙে ওয়াশরুমে গেল। চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিতেই মনে হলো, মেয়েটাকে অন্ধকারে রাখা উচিত হচ্ছে না। মেয়েটি চাইলেই পার্সেলটি একা খুলে ফেলতে পারতো। কিন্তু সে সেটা করেনি। শেহজাদেরও কি তাকে পেনড্রাইভটার কথা জানানো উচিত?

চিন্তামগ্ন শেহজাদ ফিরে আসতেই টেবিলে রাখা ধোঁয়া ওঠা গরম কফি কাপে তার নজর গেল। রোদসী এখন হয়তো তার নিজের জন্য আরেক কাপ কফি বানাচ্ছে। কাজে মন রেখেই সে শেহজাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আর ইউ ওকে? আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি সারারাত ঘুমাননি।"

শেহজাদ জবাব দিল না, কফি কাপে চুমুক দিয়ে সে পার্সেল খোলায় ব্যস্ত হয়েছে। আবরণ ছিঁড়ে বাক্সটা খুলতেই তার আশ্চর্যের সীমা রইলো না। এতো বড় বাক্সে একটা ছোট্ট খাম, সাথে একটা হাফ লিটারের পানির বোতল। শেহজাদ বোতলটা নেড়েচেড়ে দেখল, বোতলটি সিলড। হয়তো পার্সেলের ওজন বাড়াতেই এটি দোকান থেকে কিনে বাক্সে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার হুট করেই মনে হলো, একটি পার্সেলের ওজন বাড়াতে এই পদ্ধতি অবলম্বনের অর্থ খুব স্পষ্ট। এই পার্সেলের বাক্সটি আসলে চোখে ধুলো দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে মূলত খামটাই আসল। শেহজাদ খাম খুলে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করল।

ভেতরে কোনো কন্ট্রাক্ট পেপার বা গোপন ডকুমেন্টস নেই। বরং আছে একটা চেক। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের একটা অরিজিনাল চেক, যার অ্যামাউন্টের ঘরটা সম্পূর্ণ ব্ল্যাংক! কিন্তু সবচেয়ে বড় চমকটা হলো চেকের নিচে থাকা সিগনেচারটা।

"রাশেদুল হক..." রোদসী বিড়বিড় করে সিগনেচারটা পড়ল। "এটা মন্ত্রী রাশেদুল হকের সাইন করা একটা ব্ল্যাংক চেক!"

শেহজাদ চেকটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার মস্তিষ্ক খুব দ্রুত ঘটনাগুলো মেলাতে শুরু করেছে। রাশেদুল হক আর মির্জা কামরুল হাসানের মাঝে কিছু নিয়ে হয়তো ঝামেলা হয়েছিলো। যার সমাধানে রাশেদুল হক মির্জা কামরুলকে একটি ব্ল্যাংক চেক অফার করে। কিন্তু কোনো কারণে মির্জা কামরুল হাসান সেই চেক গ্রহণ করেন না। এখন প্রশ্ন হলো, এমন কিছু হলেও জাহিদের কাছে এই চেক গেলো কী করে?”

“স্যার! একজন ওয়েটারের কাছে মন্ত্রীর সাইন করা ব্ল্যাংক চেক থাকা অসম্ভব ব্যাপার। ঘটনাটা মনে হচ্ছে ভিন্ন।”

“যেমন?”

“যেমন এই চেকটা হয়তো অন্য কাউকে অফার করা হয়েছে, জাহিদ সুযোগ বুঝে তা চুরি করেছে। এবং এটি নিয়েই সে কাজ ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে সেটেল হতে চেয়েছে।”

শেহজাদ তাকে মাঝপথে থামাল, বলল, “কিন্তু জাহিদ গ্রামের বাড়ি যায়নি। গেলে নিশ্চয়ই সে কুরিয়ারে চেক পাঠাতো না?”

“এক্সাক্টলি। শুধু একটা চেক কেউ বাড়ি পাঠাবে না, স্যার। আমার মনে হচ্ছে খামে একটা চিঠিও আছে। একটু দেখুন তো!”

শেহজাদ খামটা উল্টো করে ঝাঁকি দিল। সত্যি সত্যি ছোট একটা চিরকুট বের হলো। সেখানে সুন্দর করে লেখা,

“শুনো মা, আমার কিছু হইয়া গেলে এটা দিয়া ব্যাংক থেইকা তুমি অনেক টাকা তুলতে পারবা। একবারে অনেকগুলা শূন্য বসাইও। এটা কিন্তু বারবার ব্যবহার করতে পারবা না। তুমি আবার আমার চিন্তা কইরো না, আমি এমনিও বেশীদিন বাঁচতাম না। ডাক্তার কইসে, ক্যান্সার হইছে। একবারে শেষ সময়। টাকা উড়াইলেও নাকি বড়োজোর ছয় মাস বাঁচুম। এতোগুলা টাকা উড়ায়া ছয় মাস বাঁইচা লাভ আছে কও? ওরা তো এমনিও আমারে বাঁচতে দিবো না। মা, আমার কী দোষ কও তো? ওরাই ঝগড়া কইরা কাগজটা ফালায়া গেছে। আমি খালি ফালাইয়া দেওয়া কাগজটা জমিন থেইকা উঠায়া আমার কাছে রাখছি। মা, ও মা! আমি কিন্তু চুরি করি নাই, মা। ফালাইয়া দেওয়া জিনিস নিজের কাছে রাখসি। আমি কী গোনাহ করছি, মা? করি নাই তো। তয় ওরা আমারে খোঁজে কেন?

জানো মা? সারাদিন ছায়ার মতো কারা জানি আমার পিছে ঘুরে। ওরা কারা জানো? ওরা আসলে মরণ ছায়া, ওরা আমারে মারতে চায়। আমি হয়তো বাঁচুম না বেশী। কিন্তু তুমি বাঁইচো। আমার সব হায়াত আল্লাহ তোমারে দেক, মা। সাবধানে থাইকো, আর এই চিঠি আর কাগজ কাউরে দেখাইও না।”

চিঠির শেষভাগে এসে রোদসী টের পেল, তার গলায় দলা পাকানো কিছু অনুভূতি উগড়ে আসতে চাইছে। একজন মৃ’ত মানুষের শেষ কথা পড়ে বুক ভার হয়ে আসছে। আচ্ছা? জাহিদের মা কি জানে? তার ছেলেটা আর দুনিয়ায় নেই। জানার কথা নয়। যতক্ষণে জানবে, তখন কি সে তার ছেলেকে চিনতে পারবে? উহ! অবান্তর সব ভাবনা। সেসব দিয়ে তার কাজ কী? রোদসী শেহজাদের দিকে তাকাল। লোকটাও কি একই কথা ভাবছে? তাইতো মনে হচ্ছে। শেহজাদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

"এর মানে বুঝতে পারছেন রোদসী? মির্জা কামরুলকে হয়তো মন্ত্রী সাহেব ব্ল্যাংক চেক অফার করেছিলেন। কিন্তু কামরুল সাহেব রাজি হননি।”

"এবং সেই রাগে কামরুল সাহেব চেকটা ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন, যেটা জাহিদ টেবিল পরিষ্কার করার সময় কুড়িয়ে পেয়েছিল,” রোদসী বাকি ঘটনার সূত্র মেলালো। একটু থেমেই বলল, “এ ঘটনায় মন্ত্রী সরাসরি যুক্ত নাও থাকতে পারে। এমনও হতে পারে, এটা তার কোনো কাছের চ্যালাপ্যালার কাজ।”

শেহজাদ হুট করেই বলে ফেলল, “এই ঘটনায় মন্ত্রী সাহেব সরাসরি যুক্ত।”

রোদসী কৌতুহলী নজরে তাকালো। শেহজাদ বাঁ হাতে চুলগুলো ঠিক করে একে একে বাকি কথা খুলে বলল। সাগর এবং পেনড্রাইভের কথা জেনে তার আশ্চর্যের সীমা রইলো না। চোখমুখ ভীষণ রকম শক্ত হয়ে এলেও সে এই সত্য গোপনের জন্য শেহজাদকে কিছুই বলল না। শেহজাদ নিজে থেকেই বলল,

“এতো অবাক হওয়ার কিছু নেই। আপনার আগ বাড়িয়ে বিপদ কাঁধে নেওয়ার স্বভাবের জন্যই আগে থেকে জানাইনি।”

রোদসী তখনো একভাবে দাঁড়িয়ে আছে। শেহজাদ হাতের কাগজগুলো রেখে কফি কাপে চুমুক দিল। থেমে থেমে বলল,

“আমি না জানালেও আপনি অবশ্য অনেকটাই ধারণা করে ফেলেছেন। আ'ম রিয়েলি ইম্প্রেসড!”

রোদসী তার এতো কথার বিনিময়ে টুঁ শব্দও করলো না। নিস্পৃহ গলায় বলল, "কিন্তু স্যার, এটা তো একটা বদ্ধ দরজা। লিটরেলি ডেড এন্ড।"

শেহজাদ ভ্রূ কুঁচকালো, "ডেড এন্ড?"

"কারণ আপনি কোর্টে এই চেকটা সাবমিট করে কী প্রমাণ করবেন? মন্ত্রী সহজেই বলতে পারেন যে তিনি মির্জা কামরুলকে তার ব্যবসার জন্য কোনো লোন বা ফান্ডিং দিতে চেয়েছিলেন। একটা ব্ল্যাংক চেক কখনো খুনের ডিরেক্ট এভিডেন্স হতে পারে না।”

শেহজাদ টেবিলে থাকা পেপারওয়েটটা আঙুলের সাহায্যে ঘোরাতে লাগলো। রোদসীর কথা শতভাগ সত্য। তিক্ত সত্যটা সে মেনে নিয়ে বলল,

“এমনকি আমাদের হাতে কোনো মোটিভও নেই।”

“আমাদের কাছে মার্ডার সিন আর মন্ত্রীর মাঝে সরাসরি সংযুক্ত কোনো প্রমাণও নেই।"

শেহজাদ এবার একটু হেলান দিয়ে বসল। রোদসীর চিন্তাভাবনা তাকে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করছে। মুগ্ধ না হলে প্রথম দিন থেকে মর্জি খাটানো জেদী মেয়েটাকে সে এসিস্ট্যান্ট বানাতো না। তার ঠোঁটের কোণে একটা সূক্ষ্ম হাসি লুটোপুটি খাচ্ছে। রোদসী তার হাসিমুখের দিকে সরু চোখে তাকাল। তার মন বলছে, এই লোকের কাছে এছাড়াও আরো কিছু আছে। কিন্তু সেটা কী?

"আপনি ঠিকই বলেছেন, রোদসী। শুধু এই চেক আর পেনড্রাইভ দিয়ে রাশেদুল হকের মতো রাঘব বোয়ালকে ধরা যাবে না।”

শেহজাদ উবু হয়ে চাবির সাহায্যে ডেস্কের নিচের ড্রয়ারের তালা খুলল। প্রসন্ন মনে বলল,

"কিন্তু আমি যদি বলি, তার সরাসরি সংযুক্ত হওয়ার প্রমাণ আমাদের হাতে অলরেডি আছে?"

“আছে?”

শেহজাদ ড্রয়ার থেকে একটা ছোট, ট্রান্সপারেন্ট এভিডেন্স ব্যাগ বের করে রোদসীর দিকে এগিয়ে দিল। বলল,

"মনে আছে, কালিয়াকৈরের সেই ফার্মহাউসে ক্রাইম সিন ভিজিট করতে গিয়ে আমরা পেছনের সীমানা দেয়ালটা চেক করছিলাম? আপনি যখন পা পিছলে পড়ে যাচ্ছিলেন, আমি তখন দেয়ালের ওপরে কিছু একটা দেখেছিলাম।"

রোদসীর মনে পড়ল সেদিনের ঘটনা। সাথেই বিব্রতকর মুহূর্তের স্মৃতিও তরতাজা হয়ে উঠল। এরপর শেহজাদ কথা ঘুরিয়ে ফেলেছিলো। এককোণে পরে থাকা একটা সিগারেটের টুকরোকে তুলে এনে বলেছিল, বৃষ্টি বাদল না হলে এই সিগারেটের অংশটাকেও কাজে লাগানো যেতো। সেদিনও লোকটা ধূর্ততার সাথে মিথ্যে বলেছিল!

"কী ছিল ওটা?" রোদসী ভ্রূ কুঁচকে এভিডেন্স ব্যাগটার দিকে তাকাল।

ব্যাগের ভেতর একটা খুব ছোট, অদ্ভুত দেখতে মেটালিক বস্তু রাখা। জিনিসটা দেখতে অনেকটা বুটের নিচে লাগানো মেটাল স্পাইক বা ট্যাকটিক্যাল জুতোর ক্লিপের মতো।

"এটা একটা মিলিটারি গ্রেড ট্যাকটিক্যাল বুটের মেটাল স্পাইক। ফার্মহাউসের পেছনের দেয়াল টপকে পালানোর সময় খুনির বুট থেকে হয়তো এটা খসে পড়েছিল।”

একটু থেমেই বলল, “সাধারণ কোনো লোক, এমনকি পুলিশের লোকজনও রেগুলার ডিউটিতে এ ধরনের বুট পরে না। এগুলো পরে স্পেশাল ফোর্সের রিটায়ার্ড কমান্ডোরা, যারা ভিআইপিদের প্রাইভেট বডিগার্ড হিসেবে কাজ করে।"

রোদসীর কাছে সব এবার পরিষ্কার মনে হতে থাকল। সাথে এও পরিষ্কার হলো, অ্যাডভোকেট শেহজাদ মূর্তজাকে কেন সকলে আনপ্রেডিক্টপবল বলে। লোকটা ঠান্ডা মাথায় এগোতে জানে। প্রমাণ হাতে পেয়েও না জানার ভান ধরতে জানে। রোদসী হাতের কফি কাপ টেবিলে রাখতে রাখতে মৃদু স্বরে বলল,

“তবু উনি ধরা পড়বেন না। ফাঁসবে তার বেচারা কোনো কর্মী।”

শেহজাদ জানে এই কথা সত্য। সে কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে চেম্বারের ভারী দরজাটি খোলার শব্দ পেয়ে সচকিত হলো সে। দরজার সামনে দাঁড়ানো লোকটা রোদসীর বাবা, জামিল ব্যাপারী। তার ঠিক পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে তার বিশ্বস্ত ম্যানেজার আনোয়ার।

জামিল ব্যাপারী ভেতরে ঢুকে খুব ভদ্রভাবে রোদচশমা খুলে পকেটে রাখলেন। ধীর পায়ে হেঁটে রোদসীর কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন। রোদসী দাঁড়িয়েই ছিল। ভদ্রলোককে এগিয়ে আসতে দেখে সে সোজা হলো। কানে এলো,

"মা রোদসী, কেমন আছো?"

জামিল ব্যাপারীর গলার স্বরটা আজও মোলায়েম, ঠিক যেন একজন আদর্শ বাবা। কিন্তু তার এই মোলায়েম গলার ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিষটা রোদসীর চেয়ে ভালো আর কেউ চেনে না।

"অনেকদিন পর বাবাকে দেখে খুশি হওনি? নাকি উকিল সাহেবকে দিয়ে ডিভোর্সের কাগজ পাঠিয়ে ভেবেছিলে বাবার সাথে আর দেখাই হবে না?"

রোদসী নড়ছে না। সে অপলক তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়ানো মানুষটার দিকে। জামিল ব্যাপারী মনে হলো, হঠাৎ করে শেহজাদকে দেখলেন। তেমন একটা ভাব করে ঘাড় ঘুরিয়ে শেহজাদের দিকে তাকালেন। তার ঠোঁটের সেই মেকি হাসিটা এখনো অটুট।

“আরে অ্যাডভোকেট শেহজাদ মূর্তজা যে। শহরের নামকরা ক্রিমিনাল ল'ইয়ার। আপনার দিনকাল কেমন যাচ্ছে?"

"ভালো যাচ্ছে। বেশ ভালো যাচ্ছে।”

জামিল ব্যাপারী শেহজাদের কথায় কান না দিয়ে আবার রোদসীর দিকে ফিরলেন। হাসি হাসিমুখটা সামান্য নামিয়ে নিচু গলায় বললেন,

"শোনো মা, রাস্তায় পড়ে থাকা একটা কুকুরকে কেউ মায়া করে জায়গা দিলে, সে কিছুদিন পর মালিককেই কামড়াতে চায়। কারণ এটাই কুকুরের স্বভাব। কিন্তু মালিক তো জানে কীভাবে কুকুরের গলায় শেকল পরাতে হয়। তুমি আর তোমার মা আমার খেয়ে পরে আজ আমার বুকেই ছুরি মারতে চাইছ? কী ভেবেছ এই চ্যাংড়া উকিল তোমাকে আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে?”

রোদসী প্রায় সাথে সাথেই অকপটে বলে ফেলল,

"কুকুরটা আপনি, ব্যাপারী সাহেব।”

রোদসীর মুখে এই ধরনের তিক্ত, যারপরানই অপমানজনক কথা শুনে জামিল ব্যাপারীর মুখের সেই ভদ্রলোকের মুখোশটা এক সেকেন্ডে উবে গেল। তার ভেতর লুকিয়ে থাকা জানোয়ার সত্তাটা মুহূর্তের মধ্যে বাইরে বেরিয়ে এল। তার অহমিকায় তীব্র আঘাত লেগেছে! তার নিজের মেয়ে, নিজের অংশ আজ তাকে কুকুর বলছে!

কোনো রকম পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই জামিল ব্যাপারী তার ডান হাতটা শূন্যে তুলে সজোরে একটা চড় কষালেন রোদসীর গালে। বিশ্রী শব্দ পুরো চেম্বারের প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনিত হলো। চড়ের তীব্রতায় রোদসীর চশমাটা ছিটকে দূরে কার্পেটের ওপর কোথাও একটা পড়ল।

শেহজাদ এমন ঘটনার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। তার চেম্বারে বসে তার চোখের সামনেই কেউ তার টিম মেম্বারের গায়ে হাত তুলছে, এ নেহাতই লজ্জাজনক। শেহজাদ আর সময় অপচয় করল না। চট করেই সে উঠে এল। রোদসীর সামনে দাঁড়িয়ে ডান হাত বাড়িয়ে জামিল ব্যাপারীকে পিছে যাওয়ার ইঙ্গিত দিল। শেহজাদকে দেখেই তিনি জোরপূর্বক হাসি টানলেন মুখে। বললেন,

“ফ্যামিলি ম্যাটার, উকিল সাহেব। এসবের মাঝে বাঁ হাত ঢোকাবেন না।”

“আপনার বোধহয় চোখে সমস্যা হচ্ছে। আমি বাঁ হাত ঢোকাইনি, ডান হাত ঢুকিয়েছি।”

জামিল ব্যাপারীর হাসি আরেকটু প্রশ্বস্ত হলো। তিনি শেহজাদের সামনে নিজেকে একজন চমৎকার মানুষ হিসেবে দেখাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তাই হেসে হেসেই বললেন,

“চলো মা, আমরা উনার চেম্বার থেকে বেরিয়ে বাহিরে কথা বলি। শুধু শুধু আমাদের ফ্যামিলি প্রবলেমের মাঝে উনার মূল্যবান সময় তাহলে নষ্ট হবে না।”

রোদসীকে প্রতিক্রিয়া করতে হলো না। তার আগেই শেহজাদ কয়েক পা এগিয়ে গেল। খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রূঢ় গলায় বলল,

“এনাফ! ইউ মে লিভ নাও।”

“এভাবে অতিথি তাড়িয়ে দিচ্ছেন?”

শেহজাদের বলতে ইচ্ছে হলো, আপনার মতো অসভ্য অতিথিদের সামলানোর জন্যই দশতলায় চেম্বার গড়েছি। বেশী আঁইঢাঁই করলে এক ধাক্কায় নিচে ফেলে দেব। কিন্তু কথাগুলো সে বলতে পারলো না। মুখে বলল,

“প্রতিপক্ষ কখনো অতিথি হতে পারেনা।”

জামিল ব্যাপারী এবার গলাটা উঁচু করে রোদসীকে ডাকলেন। বললেন,

“তুমি কি এখানে আরো ড্রামা করতে চাও?”

শেহজাদ এবারো তার আর রোদসীর মাঝে দেয়াল হয়ে রইল, অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল,

“এটা ড্রামা নয়, এটা লিগ্যাল প্রসিডিউর।"

বারবার বাঁধা পেয়ে জামিল ব্যাপারী বিরক্ত হয়ে উঠলেন, হাসি হাসি মুখটা তার পাংশুটে হয়ে এল, বললেন,

“বারবার আমাদের কথার মাঝে কথা বলবেন না, উকিল সাহেব। শুনতে খারাপ লাগে।”

“বেয়াদবি লাগে না?” কথাটা বলেই শেহজাদ সামান্য চোখ মারলো। জামিল ব্যাপারী তার এই টোপে পুরোপুরি পরাস্ত হল। এতোক্ষণের ভদ্রতা ঝেরে চিৎকার করে বললেন,

“আপনি কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি করছেন।”

শেহজাদ তন্ময়কে ডাকতে গিয়েও থেমে গেল। আজ তন্ময় আসেনি। নাহয় লোকটাকে ঘাড় ধরে বের করা যেতো। উপায় নেই জেনেও শেহজাদ গমগমে গলায় ধমক দিল,

“জাস্ট শাট ইওর মাউথ এন্ড গেট লস্ট।”

জামিল ব্যাপারী এগিয়ে আসতে চাইলেন, শেহজাদ তাকে আটকে ফেলল। শাঁসানোর স্বরে বলল, “প্রথমবার এসেছেন বলে, লোক ডেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করতে চাইছি না। এটাকে আমার দুর্বলতা ভেবে ভুল করবেন না।”

এহেন অপমানের পর জামিল ব্যাপারীকে আর থাকতে হয়নি। ম্যানেজার আনোয়ার তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে টেনে নিয়ে গেছেন। যাওয়ার আগে অবশ্য তিনি প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছেন, বলেছেন,

“এই ছোকরা আমায় চেনে না। কিন্তু তুই তো চিনিস? দুদিনের মধ্যে মামলা তুলে নিয়ে ভালোয় ভালোয় মা-মেয়ে ঘরে ফিরে আয়। নইলে আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না।”

তারা বেরিয়ে যাওয়ার পরেও শেহজাদ অনেক্ক্ষণ একভাবে দাঁড়িয়ে রইল। এই পরিস্থিতিতে পিছু ঘুরে তার অশ্রুসজল চোখদুটো দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, এই মেয়েটির চোখে অপমান কিংবা অসহায়ত্বের জল বড্ড বেমানান লাগবে। এমন বেমানান দৃশ্য দেখার অধিকার শেহজাদের নেই। তাই কার্পেটে পড়ে থাকা ভাঙা চশমার দিকে তাকিয়ে, পিছু না ঘুরেই বলল,

“দুদিনের মধ্যেই এই কেসের প্রথম শুনানি হবে। আমিও দেখি, জামিল ব্যাপারী ঠিক কতোটা খারাপ হতে পারেন।”

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 9 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন