#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_১০
আজকের বিকেলটা ভীষণ রকম অদ্ভুত। ভাদ্রমাসের ভ্যাপসা গরমে চারপাশটা যেন হাঁসফাঁস করছে। আকাশের বুকে ছোপ ছোপ কালচে মেঘ জমে থাকলেও রোদের তেজ যেন কিছুতেই কমতে চাইছে না। জানালার বাইরে যতদূর দেখা যায়, কেবল উঁচু-নিচু দালান। ফাঁকফোকরে যাও কয়েকটা গাছ আছে, সেসবও আজ অনড়, নিস্তব্ধ। সেন্ট্রাল এসির কৃত্রিম বাতাসে বসে বাইরের সেই অসহ্য গরম টের পাওয়ার কোনো উপায় নেই। তবু কেন যেন আজ ভীষণ থমথমে হয়ে আছে 'দ্য থার্ড আই' চেম্বারের ভেতরের মানবমন দুটি।
জামিল ব্যাপারী নামক অমানুষ শ্রেণীর লোকটা চেম্বার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেছে। কিন্তু তার রেখে যাওয়া সেই নগ্ন পশুবৃত্তির রেশ এখনো চেম্বারের ভারী বাতাসে ভাসছে। শেহজাদ কাঁচের জানালার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে। তার দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢোকানো, চোয়াল বেজায় শক্ত। একজন অমানুষ তার অফিসে দাঁড়িয়ে তারই সামনে তার এসিসট্যান্টকে এভাবে চ’ড় মে'রেছে। ব্যাপারটা শেহজাদের জন্য রীতিমতো অপমানসূচক। শেহজাদ ঘাড় ঘুরিয়ে একপলক রোদসীকে দেখল। জামিল ব্যাপারী চলে যাওয়ার পরেও মেয়েটি টুঁ শব্দ করেনি। কী চলছে তার মনে?
রোদসী নিজের ডেস্কে নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে আছে। তার বাঁ গালের চামড়ার নিচে জমে থাকা রক্তিম ছোপটা জানান দিচ্ছে, আঘাতের জোর বেশ ভালোই ছিল। এত কিছুর পরও মেয়েটার চোখে এক ফোঁটা পানি আসেনি। না লজ্জার, না অপমানে, না জেদের। কারো প্রতি কারো ঘৃণার জোর কি এতোটাও হতে পারে? শেহজাদ দেখল রোদসী আবারো ল্যাপটপ খুলে বসেছে। চশমা ছাড়া তার মায়োপিক চোখ দুটো হয়তো আশপাশের সবই ঘোলাটে দেখছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভাসা অক্ষরগুলোও তবে ঝাপসা হওয়ার কথা। রোদসী সরু চোখে কী যেন মন দিয়ে দেখছে। মাঝে সাঝেই দেখার সুবিধার জন্য স্ক্রিনের একদম কাছাকাছি মুখ নিতে হচ্ছে তাকে।
শেহজাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়াল। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ল্যাপটপের ফ্ল্যাপটা অর্ধেক নামিয়ে দিল। তার শীতল ব্যবহারে সে বোধহয় খানিকটা বিরক্ত। বলল,
"চোখ দুটো কি একেবারে নষ্ট করার প্ল্যান আছে ?"
রোদসী শেহজাদের দিকে তাকাল না। দৃষ্টি ল্যাপটপের স্ক্রিন বরাবর শূন্যে রেখে বলল,
“আমি কেসটা রি-স্টাডি করছি। কোথাও কোনো ক্লু ছুটে গেল কিনা তা দেখতে হবে।”
“এই সময় কেস রি-স্টাডি করা জরুরি নয়।”
রোদসী বাধ সাধল, চোখে চোখ রেখে বলল, “আলবাত জরুরি। মোটিভ অফ মার্ডার জানা ছাড়া কেসটা কখনোই সলভ হবে না।”
“আর তাই ভাবছেন মোটিভ অফ মার্ডার পুলিশ আপনার জন্য রিপোর্টে একদম সাজিয়ে রেখেছে?”
শেহজাদ নড়ছে না, একভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সেও কি আজ রোদসীর মতো জেদী হয়ে উঠেছে নাকি? রোদসী কয়েক সেকেন্ড থেমে বলল,
“পুলিশ সাজিয়ে রাখেনি, খু’নি রেখেছে।”
শেহজাদের ভ্রু যুগল কুঁচকে এল। খু'নি নিজেই কী করে তার মোটিভ অফ মার্ডার জানান দিতে পারে? রোদসী তাকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দিল না। নিজে থেকে বোকার মতো শুধাল,
“বলুন তো, মির্জা কামরুল হাসানকে কয়বার স্ট্যাব করা হয়েছে?”
শেহজাদ এবার ভীষণ বিরক্ত। মেয়েটা নিজের মাইন্ড ডাইভার্ট করতে অকারণ এই কেসটা নিয়ে ব্যস্ত হতে চাইছে। তার অহেতুক প্রশ্নের জবাবে শেহজাদ কৌতুক গলায় জানতে চাইল,
“কয়বার? এক- দু'বার?”
“না, সাতবার।”
শেহজাদ হুট করেই হাত তালি দিলো। তাচ্ছিল্য ভরে বলল, “গ্রেট! এই ইনফরমেশন তো আমি জানতামই না। ভাগ্যিশ আপনি কেসটা রি-স্টাডি করলেন! নয়তো কত বড় একটা পয়েন্ট মিস হয়ে যেতো।”
ইচ্ছেকৃত খোঁচাকে গায়ে মাখল না রোদসী। স্মিত হেসে বলল,
“এক্সাক্টলি, আর এখানেই মোটিভ অফ মার্ডার স্পষ্ট। একজন মানুষকে প্রাণে মা'রার অনেক অনেক উপায় আছে। ছু'রিকা'ঘাতে মা'রলেও ঠিক করে দুটো স্ট্যাব করলেই অতিরিক্ত র'ক্ত'ক্ষর'ণে তার মৃ'ত্যু নিশ্চিত। অথচ…”
“অথচ এই কেসে কামরুল সাহেবকে সাতবার স্ট্যাব করা হয়েছে। খু’নির সময়ের অপচয় হয়েছে। এবং এ নিয়ে আলোচনা করে এখন আমাদেরও সময় অপচয় হচ্ছে।”
“সাতবার স্ট্যাব করা কোনো আকষ্মিক ঘটনা নয়। এটা দীর্ঘদিনের রাগ ও..”
“ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। এসব আমি জানি, মিস রোদসী।”
শেহজাদকে আজ অধৈর্য্য লাগছে। রোদসীর কোনো কথারই সে যুক্তি খুঁজে পাচ্ছে না। খারাপ লাগলে মেয়েটা ছুটি নিক, রাগ জমলে তা প্রকাশ করুক। তাও ঘটনাটাকে স্বাভাবিক ভাবে নেওয়ার অভিনয় না করুক। এই অভিনয় দেখতে সামনের মানুষের বড্ড অস্বস্তি হয়। রোদসী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। শক্ত গলায় বলল,
“পরিচয় দীর্ঘদিনের হলেই আঘাত গাঢ় হয়।”
শেহজাদ কিছু বলতে গিয়েও আটকে গেলো। মনে হলো, রোদসী কথাটা শুধু কামরুল হাসানের কেস নিয়ে বলেনি। এটা তার ব্যক্তিগত উপলব্ধি। শেহজাদকে চুপ থাকতে দেখে রোদসী এবার ভেঙে বলল,
“মন্ত্রী আর কামরুল হাসান দীর্ঘদিনের পরিচিত হয়ে থাকলে, তাদের হয়তো ঘন ঘন একে অপরের বাসায় যাতায়াতও হতো।”
“কামরুল হাসানের স্ত্রী গতবছর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মা'রা গেছেন। এমনকি তার সন্তানরা কেউ দেশে নেই। অতএব, তাদের যদি যাতায়াত হয়েও থাকে, সেই সাক্ষাৎকারের কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা প্রমাণ নেই।”
“আপনি একজনের কথা ভুলে যাচ্ছেন, স্যার। সে সব জানে। সমস্যা হলো, আমরা এখনো অবধি তার সাথে দেখাই করিনি।”
শেহজাদ ভ্রু কুৃচকে ভাবতে বসল। কার সাথে সে দেখা করেনি? একটু ভাবতেই তার ভ্রুজোড়া শিথিল হয়ে এল। ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে বলল,
“আলীর কথা বলছেন?”
“জি, আপনি দুম করেই লোক পাঠিয়ে তার থেকে ওকালতনামায় সই করিয়ে আনলেন। অথচ নিজে গিয়ে একবারও দেখা করলেন না। একবারও শুনলেন না তার আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো কারণ। অথচ তার কাছেই আছে আমাদের বাকি প্রশ্নের জবাব। কামরুল হাসানের অনুপস্থিতিতে, এই ঘটনার আংশিকও যদি কেউ ঠিকঠাক বলতে পারে তবে সেটা নিঃসন্দেহে আলী।”
শেহজাদ আশ্চর্য হলো, সত্যিই তো! সে এখনে আলীর সাথে দেখা করেনি। কিন্তু কেন? তার কাছে কেস নিয়ে নতুন কোনো তথ্যও তো থাকতে পারে। তাকে সে কীভাবে ভুলে গেল? একবার ইচ্ছে করল, চোখে আঙুল দিয়ে ভুলটা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য রোদসীকে থ্যাংকস বলা উচিত। পরক্ষণেই সেই ভাবনা বাদ দিল। রোদসীর কাজ-ই এটা। তাকে শেহজাদের কাজে অগ্রগতি আনার জন্যই রাখা হয়েছে। যে কাজের জম্য তাকে মাস শেষে স্যালারি দেওয়া হবে, সেই কাজের জন্য ঘটা করে থ্যাংকস বলার কোনো মানে হয় না। শেহজাদ আর সময় অপচয় করলো না। ডেস্ক থেকে গাড়ির চাবি নিতে নিতে বলল,
"ডিবি অফিস থেকে খবর পেয়েছিলাম, আলীকে আজ সকালে হসপিটালাইজড করা হয়েছে। রিমান্ডের নামে মানুষটার ওপর ভালোই ঝাল ঝেড়েছে পুলিশ। মনে হচ্ছে, আজই তার জবানবন্দি নেওয়াটা সহজ হবে।”
রোদসী দ্বিরুক্তি করল না। সে দ্রুত ব্যাগটা গুছিয়ে কাঁধে তুলে নিল। চশমা না থাকায় আজ তার ভালোই কসরত করতে হচ্ছে। সেই স্ট্রাগল শেহজাদ খেয়াল করল কি না কে জানে? তবে লিফট অবধি হাঁটার সময়টুকু আজ তার দৈনন্দিন এর চেয়ে একটু বেশীই লাগলো। শেহজাদ সবেই হসপিটালের উদ্দেশ্যে গাড়ি স্টার্ট দিয়েছিল, তীক্ষ্ণ শব্দে তার ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভাসছে একটি আননোন নাম্বার। শেহজাদ সেই কলকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে স্টিয়ারিং এ মন দিতে চাইল। অপর পাশের ব্যক্তিটি তাকে সেই সুযোগ দিল না। দ্বিতীয়বার কর্কশ শব্দে ফোন বাজতেই, সে রোদসীকে ফোনটি রিসিভ করতে বলল। রোদসী কলটা রিসিভ করে স্পিকারে দিল। শোনা গেল,
"হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম। আমি স্টেডফাস্ট থেকে বলছিলাম। অ্যাডভোকেট শেহজাদ মূর্তজা বলছেন?”
“ জি, বলুন।”
“স্যার, আপনার একটা পার্সেল ছিল। আমি ধানমন্ডি সাত নম্বর রোডের 'জলনূপুর' বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে আছি। কাইন্ডলি কাউকে পাঠিয়ে পার্সেলটি রিসিভ করে নিবেন।”
শেহজাদ ভ্রূ কুঁচকাল। সে কিছু অর্ডার করেছে বলে তো তার মনে পড়ছে না। তাহলে? শেহজাদ শান্ত গলায় বলল,
"ঠিক আছে, আপনি পার্সেলটা সিকিউরিটি গার্ডের কাছে দিয়ে যান। আমি রিসিভ করে নেব।"
“কিন্তু স্যার, পার্সেলটায় 'কনফিডেনশিয়াল' স্টিকার লাগানো আছে। ওটিপি আর সিগনেচার ছাড়া ডেলিভারি করা যাবে না," ডেলিভারি বয়ের জবাবে শেহজাদ খানিকটা বিপাকে পড়লো। জানতে চাইল,
"কনফিডেনশিয়াল পার্সেল? কে পাঠিয়েছে?”
“সরি স্যার, এতে কোনো নাম লেখা না থাকায় আমি বলতে পারছি না। তবে পার্সেলটির ওজন দেখে মনে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কিছুই হবে হয়তো।”
শেহজাদ ঘড়ি দেখল। তার বাসা এখান থেকে খুব কাছেই। চাইলে যাওয়ার পথে থেমে পার্সেলটা নিয়ে নেওয়া যায়। গম্ভীর গলায় বলল, “মিনিট দশেক সময় দিন, আমি আসছি।” কল কেটে শেহজাদ রোদসীকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"যাওয়ার পথে একেবারে পার্সেলটা রিসিভ করেই আগাই।”
রোদসী জবাব দিল না। এখানে তার জবাব দেওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট নেই। ঝাপসা চোখে গাড়ির বাইরের জ্যাম দেখতে ব্যস্ত হল সে। মিনিট দশেকের মধ্যেই শেহজাদের কালো গাড়িটা 'জলনূপুর' বাড়ির গেটের সামনে এসে থামল। শেহজাদ গাড়ি থেকে নেমে ডেলিভারি বয়ের কাছ থেকে পার্সেলটা রিসিভ করল। একটা মাঝারি সাইজের চারকোনা বাক্স। প্যাকেজিংটা বেশ যত্ন করে করা। শেহজাদ ফর্মালিটি সেরে বাক্সটা নেড়েচেড়ে দেখল। কাজ শেষ হলেও ডেলিভারি বয় গেল না। সে শেহজাদকে দেখছে বড় বড় চোখে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে যখন তখন অটোগ্রাফ চেয়ে বসবে। রোদসী গাড়ি থেকে নেমে শেহজাদের কৌতুহলী মুখে তাকিয়ে জানতে চাইল,
"কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু?”
"বেনামি। সেন্ডারের জায়গায় শুধু 'ওয়েলউইশার' লেখা।
শেহজাদ পকেট থেকে ছোট সুইস নাইফটা বের করে অত্যন্ত সাবধানে বক্সের টেপটা কাটল। খুলতেই ভেতরে একটা থার্মোকলের প্যাকেট দেখা গেল। শেহজাদ একটানে সেটাও সরিয়ে ফেলল, দেখা পাওয়া গেল ভেতরের আসল জিনিসটার। একটা খেলনা গাড়ি। কালো রঙের একটা মেটালিক রেসিং কার। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, খেলনা গাড়িটার ছাদের ওপর ডিজিটাল একটা সার্কিট বোর্ড বসানো, যার সাথে লাল আর নীল রঙের কয়েকটা তার পেঁচানো। শেহজাদ কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা ভয়ানক ঘটনা ঘটল। বক্সটা খোলার প্রায় সাথে সাথেই সার্কিটের ডিজিটাল স্ক্রিনটা মৃদু শব্দ করে জ্বলে উঠল। স্ক্রিনে লাল রঙের সংখ্যা ভাসছে— ০২:০০। এবং সেটা উল্টো দিকে কমতে শুরু করেছে। টাইমার! কিসের টাইমার এটা?
"বোম!"
ডেলিভারি বয় আচমকাই চেঁচিয়ে উঠল। কয়েক পা পিছিয়ে আতঙ্কিত চোখে বলল, “ইয়া আল্লাহ! এতে তো একটা বোম আছে।” সারা রাস্তা এই ভয়ানক জিনিসটা সে বয়ে এনেছে ভাবতেই তার হাত পা কাঁপতে শুরু করল। দিগ্বিদিক হারিয়ে সে ছুটে গেল রাস্তার দিকে, পড়ে রইল তার সাইকেল। শেহজাদ অবশ্য তথনো স্থির, একদম অটল। কী একটা ভেবে এই সময়ও সে পকেট থেকে ফোন বের করল। ক্যামেরা অন করে খেলনা গাড়ি আর টাইমারটার একটা খুব ক্লিয়ার ছবি তুলে নিল। সদ্য খোলা কুরিয়ার বক্সটারও ঝটপট কয়েকটা ছবি তুলল সে। অতঃপর অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে, গাড়িটা বাড়ির সামনের লনের ঘাসের ওপর রাখল। নিজে দাঁড়িয়ে রইল ঠিক তার সামনে। ওদিকে সময় কমতে কমতে একেবারেই কমে এসেছে। লোকটা আসলে চাচ্ছে কী? বোমটি ফে'টে যাওয়া অবধি সে অপেক্ষা করবে নাকি? রোদসী শেহজাদের এই চূড়ান্ত বিকারহীনতা দেখে আর চুপ থাকতে পারল না। থেমে থেমে বলল,
“এটা জীবন নিয়ে বাজি ধরা হয়ে যাচ্ছে না?”
শেহজাদ তার প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না। তার চোখ এখনো স্ক্রিনের সংখ্যাগুলোর দিকে স্থির। রোদসীকে অবাক করে শেহজাদ হুট করেই এক অভাবনীয় কাজ করে বসল। সে উল্টো দিক থেকে শেষ পাঁচ সেকেন্ডের কাউন্ট ডাউন করতে শুরু করল।
“পাঁচ, চার, তিন, দুই….আর এক!”
দুই মিনিটের সময়সীমা শেষ হতেই খুব আস্তে একটা শব্দ হলো। না, কোনো বিকট বিস্ফোরণ হলো না, আগুন জ্বলল না, চারপাশের মাটিও কাঁপল না। শুধু খেলনা গাড়িটার সামনের দিকটা স্প্রিংয়ের মতো খুলে গেল এবং সেখান থেকে একটা প্লাস্টিকের ছোট বোর্ড ছিটকে বেরিয়ে এল।
বোর্ডটার ওপর একটা বড়সড় স্টিকার লাগানো। স্টিকারটিতে একটা হাতের ছবি, যার বৃদ্ধাঙ্গুলিটা ওপরের দিকে উঁচু করা—একটা ব্যঙ্গাত্মক 'থাম্বস আপ'! আর তার নিচে লেখা: "নেক্সট টাইম ইট ওন্ট বি আ টয়।"
রোদসী কপাল কুঁচকে ঘটনাটির মূলভাব বোঝার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যেই তার কপালের দুপাশে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। শেহজাদ একভাবে ওই স্টিকারটার দিকে তাকিয়ে থেকে শব্দ করে হাসল। রোদসী অবাক হল, কেউ তাদের হুমকি দিতে চেয়েছে, তাও এতো ভয়ানক হুমকি। ব্যাপারটা এমন ব্যাঙ্গাত্নক অপমান না হয়ে সত্যিকারের বোম হলে এই মুহূর্তে এ জায়গাটি ধ্বং’সস্তূপে পরিণত হতো। অথচ সামনে দাঁড়ানো লোকটি তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো ঘটনায় হাসছে। মনে হচ্ছে এর চেয়ে মজার কোনো ঘটনা ঘটতেই পারে না। হাসতে হাসতেই সে ঠান্ডা গলায় বলল,
"কী ভাবছেন? ভয় না পেয়ে হাসছি কেন?”
একটু থেমে সে রোদসীর দিকে তাকাল। মেয়েটা কি সত্যিই এমন কিছু ভাবছিল? আশ্বাস দিয়ে বলল,
“আগামীকাল এই কেসের প্রথম শুনানি। এমন সময় প্রতিপক্ষের উকিলকে শেষ করে ফেললে হিতে বিপরীত হবে। এটুকু তো তারা বোঝে। তাই নিশ্চিন্তে থাকুন, অবেলায় আমাদের মে’রে ফেলার মতো চেষ্টা হয়নি।”
"খুব সস্তা ট্যাকটিক্স।”
শেহজাদ চমকাল। রোদসী এই ঘটনায়ও ভয় পায়নি? তবে তখন যে জীবন নিয়ে বাজি ধরার কথা বলল? শেহজাদের অধর যুগল আবারো প্রসারিত হলো। মেয়েটি নিজেকে চটজলদি গুছিয়ে নিতে পারে। এটাও তার একটা চমৎকার গুণ। তার জায়গায় অন্য কেউ হলে নতুন অফিসে অপমানিত হওয়ার ঘটনা ভুলতে দুটো দিন গুমর গুমরে থাকত। এটা রোদসী হওয়াতেই একটু আগের বিভৎস ঘটনার পরও এই হুমকিকে সে সাধারণ ভাবে নিয়েছে।
“হাসছেন যে?”
“কারণ খু'নি নিজেই আমাদের ক্লু দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বারবার হুমকি দিতে গিয়ে আজ তারা মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছে।”
রোদসী কৌতুহলী হলো। জানতে চাইল,
“কিসের কথা বলছেন?”
"কুরিয়ার। এবার হুমকি দিতে গিয়ে তারা স্টেডফাস্ট কুরিয়ার ব্যবহার করেছে। এই পার্সেল যে হাব থেকে বুক করা হয়েছে, সেখানে সিসিটিভি আছে, সেন্ডারের নাম্বারও আছে। আমি জাস্ট আমার ফোনে আসা এসএমএস থেকে ট্র্যাকিং নাম্বার দিয়ে ওই লোকটার আইডেন্টিটি বের করে ফেলতে পারব।"
শেহজাদ কথা শেষ করতেই পকেটের ফোনটা আবারো বেজে উঠল। মনে হল, আজ তার সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে এটা। শেহজাদ বিরক্তিতে ‘চ' সূচক শব্দ তুলে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে— 'বাবা' নাম। রিসিভ করলে কানে আসে কৌতুহলী স্বর,
“আমরা অতটাও ব্যাকডেটেড না যে তুই বাসার নিচে থেকে ঘুরে যেতে হবে।”
“মানে?”
শেহজাদ ঘাড় ঘুরিয়ে উপরে দেখল। বাবা ছয়তলার বারান্দা থেকে তাকিয়ে আছেন। এখানকার ঘটনা তিনি কতদূর কী দেখেছেন তা আন্দাজ করা যাচ্ছে না। শেহজাদ তাকাতেই শেষ বাক্য ভেসে এল,
“লনে দাঁড়িয়ে আড্ডা না দিয়ে মেয়েটাকে বাসায় আন।”
এটুকু বলেই তিনি কল কাটলেন। শেহজাদ ভড়কে গেল। বাবা তার সাথে মেয়ে মানুষ দেখে কী ভাবতে কী ভেবেছেন কে জানে? এখন বাসায় না গেলে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হবে। আর সেই আলোচনায় জজ সাহেবের নিকট বিনা আপিলে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে শেহজাদ। অগত্যা তাকে বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হল। ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে পার্সেলের সাথে আসা যাবতীয় বাক্স আর খেলনা গাড়িটিকে সে গাড়ির ভেতর রেখে লক করল। ইতস্তত করে বলল,
“বাবা ডেকেছেন, একবার বাসায় উঠতে হবে।”
রোদসী প্রায় সাথে সাথেই তাকে স্পেস দিল। বলল,
“ঠিক আছে, স্যার। আমি অপেক্ষা করছি। আপনি কাজ সেরে আসুন।”
“আপনাকেও উপরে আসতে হবে। তিনি আপনাকেও ডেকেছেন।” এটুকু বলতেই লিফট চলে আসল। শেহজাদ ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
"এখানকার পার্সেল বা হুমকিজনিত ঘটনা যেন কোনোভাবেই উপরে না ওঠে। আমি চাই না, আমার পরিবার এসব নিয়ে প্যানিক করুক। আমরা বড়জোর এক কাপ চা খাবো, আর তারপর সোজা হাসপাতালে যাব। ওকে?”
রোদসী জবাব দিল না, ধীর পায়ে লিফটে প্রবেশ করল শুধু। শেহজাদ এখানে তার মতামত জানতে চায়নি। বরং তাকে জানিয়েছে। এই জানানোর বিপরীতে কী বলা যেতে পারে? কিছুই না কিংবা একটি সাধারণ ‘ঠিক আছে’।
শেহজাদদের ফ্ল্যাটের দরজাটি খুলে রাখা। হয়তো শেহজাদ আসবে বলেই, নয়তো সদর দরজা এমন খুলে রাখার কোনো যুক্তি নেই। রোদসী দেখল, বাড়ির বাহিরে কোনো নেমপ্লেট নেই। এতো বড় একজন রিটায়ার্ড জজ আর তার ছেলে এখানে থাকছে অথচ কোনো নেমপ্লেট নেই। এই ব্যাপারটা অদ্ভুত। ভেতরে ঢুকতেই ছুটে এলেন মাঝারি গড়নের একজন হাসিখুশি মহিলা, পরনে তার সবুজ একটা সুতি শাড়ি। কত হবে বয়স? এই পঞ্চাশের আশপাশে হয়তো। এসেই তিনি দু’হাতে ছুঁয়ে দিলেন রোদসীর হাত জোড়া। ব্যস্ত গলায় বললেন,
“সে কী রে? আজ ওকে আনবি, আমায় আগে বলবি না?”
এটুকু বলতেই তার হঠাৎ নজর গেল রোদসীর র'ক্তাভ গালে। চমকে উঠলেন তিনি। উদ্বিগ্ন গলায় ছেলেকে শাঁসালেন,
“এ কি! ওর গাল এমন লাল হয়ে আছে কেন? এমপ্লয়িদের গায়ে আবার হাত টাত তুলতে শুরু করেছিস নাকি, শেহু?”
বিব্রত হল শেহজাদ। জিব দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“কীসব উল্টোপাল্টা বলছো! গায়ে হাত তুলতে যাব কেন? উনি বোধহয় অন্য কোথাও ব্যথা পেয়েছেন।”
এটুকু বলেই শেহজাদ নিজের ঘরের দিকে গেল। মায়ের সামনে বেশীক্ষণ থাকলে এই ঘটনার আদ্যোপান্ত না জেনে তিনি কিছুতেই ছাড়বেন না। অকারণ কারো ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা শুনিয়ে সহানুভূতি আদায় করার মানে নেই। তার নিজের বলতে ইচ্ছে হলে সে বলুক। কিন্তু শেহজাদ নিজে থেকে আজকের তিক্ত ঘটনার বর্ণনা করতে চায় না। করা উচিত বলে মনেও করে না। ঘরে ঢুকতেই তার মনে হলো, বাবা ডেকেছিলেন। তার সাথে দেখা করাটা জরুরি। তিনি বোধহয় রোদসীকে ভুল বুঝেছেন। কিছু অঘটন ঘটার আগেই তাকে একবার ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে হবে। শেষে দেখা যাবে, পুত্রের প্রেমে পড়ার সুখবর দিতে এলাকা জুড়ে মিষ্টি বিলাবেন। শেহজাদের প্রায়ই সন্দেহ হয়, তার বাবা কি আগে থেকেই এমন পাগল ছিলেন? নাকি আধপাগল মায়ের প্রেমে পড়ে পুরো পাগল হয়েছেন?
শেহজাদ বাবার ঘরে উঁকি দিল, ঘরটা খালি। বারান্দা কিংবা ওয়াশরুমেও কারো অস্তিত্ব নেই। এর মাঝেই তিনি আবার কোথায় চলে গেলেন? শেহজাদকে অবশ্য বেশী ভাবতে হলো না। বসার ঘর থেকে ভেসে আসা শব্দ শুনেই নিশ্চিত হওয়া গেল তিনি এখন সেখানে আছেন। শেহজাদ ত্রস্ত পায়ে ছুটে গেল সেদিকে। গিয়ে যা দেখল, তাতে তার মাথা রীতিমতো ঘুরতে শুরু করলো। বাবা সাদা পাঞ্জাবী পড়ে চা-নাস্তা পরিবেশন করছেন। সাথেই ভরে ভরে সুপুত্রের গুণগান করছেন। শেষ বয়সে এসে পুত্রের জীবনসঙ্গী দেখে যাওয়ার রোগ তার নতুন নতুন হয়েছে। একে তাকে যাকেই পান, ভালো মেয়ে টেয়ে পেলে দেখাতে বলেন। মাঝেমধ্যে আবার জোঁকের মতো ছেলের পিছু লেগে থাকেন। এইতো মাসের প্রথম দিকের ঘটনা, শেহজাদ অফিস গিয়ে দেখল, তার আগেই সেখানে চলে গিয়েছেন বাবা। গিয়েই তিনি থেমে থাকেননি। রিসিপশনে বসা মেয়েটির নাড়ি নক্ষত্র যাচাই করতে শুরু করেছেন। কথা প্রসঙ্গে মেয়েটি বিবাহিতা জেনে, তার আফসোসের আর সীমা রইলো না। চেম্বারে ঢুকেই পুত্রকে গোমড়া মুখে বললেন, এবার তিনি গার্লস কলেজের সামনে ঘুর ঘুর করবেন। তাও পুত্রের জন্য একজন সুন্দরী মেয়ে তিনি খুঁজে এনে দেবেন। তার পাগলামি দমাতে শেহজাদ চট করেই বলেছিল, তার একজনকে পছন্দ করা আছে। সময় হলে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বাবার মাথার সেই পোকাকে সে নিয়ন্ত্রণে এনেছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে হুট করে একটি মেয়েকে পুত্রের সাথে দেখে তার মাথার পুরনো পোকা কিলবিল করে উঠেছে। শেহজাদ তড়িঘড়ি বসার ঘরে ঢুকল। বাবার পাশের সোফায় বসেই বলল,
“বাবা, উনি আমার ক্লায়েন্ট, মিস রোদসী।”
কথাটা বলতে বলতে সে অবশ্য বাবার বাহু শক্ত করে ধরল। তার সেই ইশারা তিনি আদও বুঝলেন কিনা কে জানে? দুম করেই বলে বসলেন,
“তো ক্লায়েন্টের সাথে প্রেম করা যাবে না এমন কোনো আইন আছে নাকি?”
রোদসী সবেই ভদ্রলোকের বাড়াবাড়িতে চায়ের কাপে চুমুক বসিয়েছিল। এই কথা শুনতেই সে বাজেভাবে বিষম খেল। একজন রিটায়ার্ড জজের এমন আধপাগল কথাবার্তায় বিব্রত তো হলোই, সাথে বেশ খানিকটা অবাকও হলো। শেহজাদ অস্ফুটে ডেকে উঠল,
“বাবা! প্লিজ…”
ভদ্রলোক পুত্রের অনুনয়ের দু’আনা দামও দিলেন না। বললেন,
“আরে রাখ তোর প্লিজ! তোর বয়সে থাকতে আমি বউয়ের পিছে পিছে ঘুরতাম। এ নিয়ে আম্মার সাথে তিনবেলা ঝগড়া হতো, এমন বউপাগল ছেলেকে নিয়ে আম্মা ছিলেন বড্ড জ্বালায়। চারিদিকের খালা-চাচীরা মাকে উষ্কাতেন। বলতেন কী পোলা জন্ম দিলা? প্রেম কইরা বিয়ে করলো, তোমগো কথার তো কোনো দামই নাই। এহন আবার বউয়ের পিছ ছাড়ে না। দেইখো, বউ আবার মন্ত্র টন্ত্র কিছু করছেনি?”
“এই গল্প তুমি আমাকে আগেও আঠেরোবার শুনিয়েছো বাবা। নতুন কিছু বলো।”
এটুকুতেই ফরিদা বেগম এলেন হরেক রকমের ফল নিয়ে। টেবিলে ট্রে রাখতে রাখতে বললেন,
“আগের আঠারোবার তো মেয়েটি শুনেনি। তাই গর্ব করে তাকে শোনাচ্ছে এখন।”
শেহজাদ বিব্রত হলো। বাবা-মা ফরমালিটির ধার ধারছেন না। এভাবে অপরিচিত মানুষের সামনে পারিবারিক বিষয়বস্তু উঠে আসায় তাকে বেশ অপ্রস্তুত হতে হচ্ছে। অস্বস্তি এড়াতে ইতিমধ্যেই সে হাত দিয়ে কপাল ঘষতে শুরু করেছে। ওদিকে মা আবার কী যেন আনতে গেছেন। মনে হচ্ছে পাঁচমিনিটের জন্য ঘরে আসার সিদ্ধান্তটা মস্ত বড় ভুল ছিল। রোদসী কাপ হাতে অবাক চোখে শেহজদের বাবা-মাকে দেখছে। এরা কি আসলেই এমন? এতো সহজ! এতো প্রাণবন্ত? নাকি তাকে দেখে এমন করছে? কিন্তু তাদের চোখেমুখে তো অভিনয়ের রেশ নেই। তার ভাবনার মাঝেই ফরিদা বেগম পাশে এসে বসলেন। হাতে থাকা বরফের টুকরো বিনা অনুমতিতেই মেয়েটির নরম গালে ছোঁয়ালেন, আদর করে বললেন,
“দুটো মিনিট মন দিয়ে গল্প শুনো। ততক্ষণে ফোলাটা কমে যাবে।”
রোদসী প্রতিক্রিয়া করার সময় পেলো না। আসার পর থেকে সে দুটোর বেশী কথাও হয়তো বলেনি। তার আগেই মানুষ দুটো তাকে মাথায় বসানোর চেষ্টা করছে। গালে বরফ লাগাতে দেখে উশখুশ করে উঠলেন এনায়েত মূর্তজা। বেফাঁস কথা শোনার আগেই শেহজাদ তার কানের পাশে গিয়ে বিরবির করল,
“এটা উনার ব্যক্তিগত ব্যাপার, কিছু জিজ্ঞেস করো না। ব্যাপারটা খারাপ দেখায়।”
এনায়েত মূর্তজা ছেলের দিকে তীর্যক চোখে চাইলেন। যেন বোঝাতে চাইলেন, তোর বাপ হই আমি। আমাকে শেখাচ্ছিস কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ? শেহজাদ তাকে কিছু বলার সুযোগ দিল না। তাড়া দিয়ে বলল,
“মিস রোদসী, আপনার চা খাওয়া হলে এবার আমরা উঠি?”
“ওমা! উঠবে কী রে? আমি তো মাংস ভিজিয়ে এলাম। তেহারী রাঁধব। না, না- না খেয়ে আজ কোথাও যাওয়া হচ্ছে না।”
শেহজাদ উঠে দাঁড়াল। মায়ের হাত দুটো ধরে খানিকটা বোঝানোর মতো করে বলল,
“খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটো কাজ আছে, মা। আজ না গেলে সর্বনাশ হবে। একটু বোঝার চেষ্টা করো। হাতের কেস দুটো শেষ হলে আমি উনাকে আবার আনব, কেমন?”
“না, কোনো কেমন তেমন নেই। তোর কাজ থাকলে তুই যা। মেয়েটা এখানেই থাকুক। মাত্রই তো এলো, এখন আবার যাবে?”
রোদসীর মনে হলো, এবার তার অন্তত কিছু বলা উচিত। গলা খাঁকারি দিয়ে সে নিচু গলায় বলল,
“কাজটা সত্যিই খুব জরুরি, আন্টি। আজ আমাকে উঠতেই হবে।”
এনায়েত মূর্তজাও এবার বাধ সাধলেন, বললেন,
“কাজ তোর, তুই যা। ক্লায়েন্টকে কেন যেতে হবে? ও কি তোর এসিসট্যান্ট নাকি যে সাথে সাথে ঘুরতে হবে?”
ফরিদা বেগম অবাক গলায় বললেন, “সে কী? ক্লায়েন্ট আবার কী? এটা তো ওর নতুন এসিসট্যান্ট, কেন তোমায় বলেনি?”
শেহজাদ হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরল। সর্বনাশের বাকি যা ছিল, তার ষোলো কলা পূর্ণ করেছেন মা। এবার বাবাকে সামলাতে ঘন্টাখানেক পেরোবে। দিশেহারা হয়ে শেহজাদ দরজার দিকে এগিয়ে গেল, যেতে যেতে বলল,
“আজ রাতে আমি অফিসেই থাকব, মা। তেহারীটা কাল রেঁধো।”
শেহজাদকে বেরিয়ে যেতে দেখে এগিয়ে গেলেন এনায়েত মূর্তজা। ক্রোধিত হয়ে বললেন,
“দেখলে! দেখলে! তোমার ছেলে মুখের ওপর আমায় মিথ্যা বলল!”
ফরিদা বেগম সেই নালিশে তার সঙ্গ দিলেন না। উল্টো ধমকানোর মতো করে বললেন,
“বলবে না? তোমারই তো ছেলে।”
বেচারা এনায়েত মূর্তজার মুখটা এবার শুকিয়ে এল, রোদসীর কাছে বিচার দেওয়ার মতো করে বললেন,
“যত দোষ নন্দ ঘোষ। একটু ভালোবাসি বলেই এমন পেয়ে বসে আমায়। এটা কি ঠিক?”
রোদসী এবার হুট করেই হেসে ফেললো। ভদ্রলোকের মুখটা এখন দেখার মতো লাগছে। অপরিচিত কারো সামনে বউয়ের ধমক খেয়ে চুপসে গেছেন একদম। এই সময় হেসে ফেললে তিনি হয়তো মনে মনে ব্যথিত হবেন। নিজেকে সামলে নিল সে, বলল,
“একদম ঠিক হয়নি। আপনি এর প্রতিবাদে একটি কেস ফাইল করুন, আঙ্কেল। প্রথম শুনানিতে আমি অবশ্যই আপনার হয়ে লড়বো।”
প্রসন্ন হাসিতে এনায়েত মূর্তজার অধরযুগল প্রসারিত হলো। আসার পর থেকেই মেয়েটার অন্ধকার করে রাখা মুখটা তাকে পীড়া দিচ্ছিল। অল্পবয়সী একটা মেয়ে, কোথায় হাসিখুশি থাকবে, তা না। বহু চেষ্টার পর অবশেষে মেয়েটা স্বাভাবিক হয়েছে। সাধারণ মানুষের মতো হাসছে, কথা বলছে। মেয়েটির হাসি মুখ দেখতে মন্দ লাগছে না। একদম মন্দ লাগছে না। ফরিদা বেগম টিস্যু এনে রোদসীর ভেজা গালটা মুছিয়ে দিলেন। বললেন,
“রাতে বাসায় গিয়ে আরেকটু বরফ দেবে। তাহলেই দেখবে, ব্যথা কমে যাবে।”
রোদসীর বলতে ইচ্ছে হল, বহু বছর পর ব্যথায় বরফ লেগেছে, আন্টি। এই ব্যথা তো এমনিতেই প্রশমিত হয়ে গেছে। আলাদা করে কি আর যত্ন নেব? তবু সে কিছুই বলল না। হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বলল,
“আজ তবে আসি?”
“এসো, তবে আবার এসো, বারবার এসো।”
লিফট দিয়ে নামার পুরোটা সময় রোদসী আনমনেই হাসলো। সামনে থাকা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বে তাকিয়ে সে চমকে উঠল। কতগুলো দিন পর সে স্বাভাবিক ভাবে হাসছে? ঠিক কতগুলো দিন পর মন থেকে ভালো অনুভব করছে? রোদসী এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে একটু ঠিক করে নিল। আসার সময় ভদ্রমহিলা তাকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। কী ভীষণ মমতামাখানো তার হাতদুটো! রোদসী একপলক ঘড়ি দেখল, আধঘন্টা পেরিয়েছে। অথচ মনে হচ্ছে, মাত্র কয়েক মিনিট পার হলো। এই আধঘন্টা তার জীবনের সবচেয়ে অন্যরকম আধঘন্টা। আচ্ছা..? কী হতো আজ উপরে না উঠলে? সে হয়তো কখনো জানতেই পারতো না, পরিবারের মানুষগুলোর সাথে চায়ের আড্ডা এতোটাও চমৎকার হতে পারে। একটা পরিবার এতো সুন্দরও হতে পারে। একটা সত্যিকারের পরিবার- যাতে প্রতিটি মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে। মন থেকে ভালোবাসে।
চলবে…