ফন্ট সাইজ:
থিম:
তবুও জোছনা নামে

পর্ব 11

লেখক: বর্ণপ্রিয়া

#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_১১

বেসমেন্টের পার্কিংয়ে শেহজাদের কালো গাড়িটা স্টার্ট দেওয়া অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে আছে। শেহজাদ ড্রাইভিং সিটে বসে ফোনে কিছু একটা করছে। রোদসীকে এগিয়ে আসতে দেখে তার সেই কাজে বিঘ্ন ঘটল। কিছু একটার তাড়ায় থেকে সে কোনো কথা বলল না। শুকনো মুখ তাকে গাড়ি চালাতে দেখে রোদসীর আশ্চর্য লাগল। বারবার মনে হল, একটু আগের ঐ মানুষ আর এখনকার মানুষটার আকাশ পাতাল তফাত। একটু আগে তাকে মোটেও এখনের মতো কঠোর লাগেনি। কয়েক মুহূর্তের জন্য রোদসী নিজেও একটা কঠিন সত্য ভুলে গিয়েছিল। এনায়েত মূর্তজা একজন রিটায়ার্ড জজ এবং তার পুত্র বর্তমানে দেশের একজন নামকরা ক্রিমিনাল লইয়ার। অথচ বাড়িতে তারা সাধারণ। এতোটাই সাধারণ যে, বাকি পাঁচটা পরিবারের থেকে তাদের পরিবারকে আলাদা করা যাবে না। রোদসীর কৌতুহল টের পেয়েই বোধহয় শেহজাদ গলা খাঁকারি দিল। অনিচ্ছুক ভঙিতে বলল,

“পারিবারিক বিষয়ে খুব একটা জানাতে আগ্রহী নই। তবু এতোটুকু বলে রাখতে চাই, মায়ের সামনে কখনোই কেস সম্পর্কিত কিছু আলোচনা করবেন না।” পরের কথাটুকু সে বেশ জোর দিয়ে বলল, “কোনো অবস্থাতেই না। এ্যাম আই ক্লিয়ার?”

রোদসী জানলার বাহিরে তাকিয়ে শহরের জ্যামে মনোনিবেশ করল। শেহজাদের পারিবারিক বিষয় জানার জন্য প্রয়োজনীয় সময় তারও নেই। তাই সেই বিষয়ক নিষেধাজ্ঞার জবাব সে দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। উল্টো কয়েক পল থেমেই জানতে চাইল,

"হসপিটালে কি আমাদের সহজে ঢুকতে দেবে?"

শেহজাদ হয়তো প্রথমে ধরতে পারল না। অস্ফুটে জানতে চাইল,

“হু?”

রোদসী নিস্পৃহ গলায় বলল,

"আলীর মতো প্রাইম সাসপেক্টকে পুলিশ এখন চিলের মতো নজরে নজরে রাখবে। সেসবের ভিড়ে আমাদের কি আলীর সঙ্গে দেখা করা সহজ হবে?”

"সহজ হবে না, সেটাই স্বাভাবিক।” শেহজাদের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। একটু আগে সে এই খোঁজই নিচ্ছিল। হসপিটালে কড়া পাহারায় রাখা হয়েছে আলীকে। একটু হেরফের হলেই তারা মিডিয়া ডেকে হুলুস্থুল কান্ড ঘটাতে চাইবে। তবু রোদসীকে সে সাহস দিল। বলল,

“কঠিন কাজটাই সহজ ভাবে করে ফেলার মতো জাদু জানতে হবে, রোদসী। বি প্রিপেয়ার্ড। আজ মেডিকেল প্রিজন সেলে লাইভ জাদু দেখানো হবে। আ ওয়ান্ডারফুল ম্যাজিক শো।"

হাসপাতাল মানেই চারিদিক থেকে ভেসে আসা ফিনাইলের গন্ধ আর মন খারাপের সুর। সরকারি হাসপাতালগুলো এদিক থেকে আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে। সেখানে এগুলোর পাশাপাশি মিলে নানা স্তরের মানুষের আহাজারি। এখানে সেখানে আলসে ভঙিতে শুয়ে থাকে কত কত লোক! দেখলে মনে হয়, এদের আর কাজ বাজ নেই। দিন-রাত পালা করে রোগী পাহারা দিয়ে বিছানায় এমন মটকা মেরে শুয়ে থাকাই এখানে মূখ্য কাজ। আর বাকি যা থাকে, তার নিরানব্বই ভাগ করে আয়ারা। বাকি এক শতাংশ করে ডাক্তার।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিবেশটাও একই রকম। ফিনাইলের কড়া গন্ধ, নানা মানুষের গুনগুন আর ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের সামনে ট্রলির দৌড়াদৌড়ি—সব মিলিয়ে একটা চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা। শেহজাদ আর রোদসী দোতলার প্রিজন ওয়ার্ডের দিকে এগিয়ে গেল। করিডোরের শেষ মাথায় একটা কেবিনের সামনে দুজন সশস্ত্র পুলিশ কনস্টেবল এবং একজন সাব-ইন্সপেক্টর দাঁড়িয়ে আছেন।

শেহজাদ লম্বা লম্বা পা ফেলে কেবিনের দরজার দিকে এগোতে নিলেই সাব-ইন্সপেক্টর হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন। চরম বিরক্তি নিয়ে বললেন,

"এক্সকিউজ মি! কোথায় যাচ্ছেন?”

“ভেতরে।”

“আপনি ভেতরে যেতে পারবেন না। রোগী পুলিশ রিমান্ডে আছেন।”

শেহজাদ পকেট থেকে নিজের আইডেন্টিটি কার্ডটা বের করে লোকটার চোখের সামনে ধরল, স্পষ্ট গলায় জানাল,

"আমি অ্যাডভোকেট শেহজাদ মূর্তজা। ভেতরে যে পেশেন্ট আছে, মোহাম্মদ আলী, আমি তার ডিফেন্স ল'ইয়ার। আমার ক্লায়েন্টের সাথে আমার দেখা করতে হবে।"

সাব-ইন্সপেক্টর তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। মনে হল, এমন ঘটনার জন্য তিনি আগে থেকেই প্রস্তুত। তাই মুখস্ত কথার মতো আওড়াল,

"উকিল সাহেব, এটা কোর্ট না, এটা হসপিটাল। ডক্টরের স্ট্রিক্ট অর্ডার আছে, পেশেন্টের এই কন্ডিশনে তার সাথে কেউ দেখা করতে পারবে না। তাছাড়াও, ওপর মহলেরও কড়া হুশিয়ারি আছে। তাদের পারমিশন ছাড়া একটা মাছিও এই ঘরে ঢুকতে পারবে না।"

"ওপর মহলের পারমিশন?" শেহজাদের গলাটা অস্বাভাবিক রকমের গম্ভীর এবং ভয়ংকর শোনাল। তাকে অবশ্য বাকি কিছুই করতে হয়নি। রোদসী আগ বাড়িয়ে এবারও পেনাল কোড উগড়ে ঝামেলার তাৎক্ষণিক সমাধান বের করে ফেলল, বলল,

"বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একজন আসামির তার মনোনীত আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করার পূর্ণ অধিকার আছে। আর ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪০ ধারা আইনজীবিকে ক্লায়েন্টের সাথে যেকোনো সময়, যেকোনো অবস্থায় দেখা করার লিগ্যাল রাইট দিচ্ছে। সেখানে আপনি বা ডক্টর মানা করার কে?”

শেহজাদ সামনে দাঁড়নো সাব-ইন্সপেক্টর কাশেমের ফ্যাকাশে মুখটা দেখে ঠান্ডা গলায় বলল,

"আপনি ডক্টরের দোহাই দিয়ে আমাকে আটকাতে চাইছেন? ফাইন! আমিও তাহলে হাইকোর্টের ডিউটি জজের কাছে ফোন করে আপনার নামে 'ভায়োলেশন অফ ফান্ডামেন্টাল রাইটস'-এর রিট পিটিশন ফাইল করছি। কাল সকালের মধ্যে আপনার ওই ইউনিফর্ম যদি আমি না খুলিয়েছি, তবে আমার নামও শেহজাদ মূর্তজা নয়!"

শেহজাদের আচানক হুমকিতে ভড়কে গেল সে। খানিকটা আমতা আমতা করে সে কাউকে কল করতে চাইল। শেহজাদ তাকে সেই সময় দিল না। কাঁধে মৃদু চাপর দিয়ে নিচু গলায় বলল,

“আইন না জেনে আইনের লোকেদের সাথে লাগতে এলে জুনিয়রদের সামনে ইজ্জত যাবে, কাশেম সাহেব।”

এবারের টোপে পুরোপুরি পরাস্ত হল কাশেম। সরু চোখে দরজার সামনে দাঁড়ানো কনস্টেবলদের দিকে তাকিয়ে ইশারায় সরার নির্দেশ দিলেন। ঠাঁট বাঁচাতে তাও বিরস গলায় বলল,

"ঠিক আছে, যান। তবে পাঁচ মিনিটের বেশি সময় পাবেন না।”

শেহজাদ তার সময়সীমা একরকম হাওয়ায় উড়িয়ে দিল। ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখল বেডের ওপর শুয়ে আছে আলী। লোকটার বয়স এমনিতেই পঞ্চাশের এদিক সেদিক, তার ওপর রিমান্ডের নামে পুলিশ যে পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে, তা দেখে শিউরে উঠতে হয়। আলীর দুটো চোখই কালশিটে পড়ে ফুলে বন্ধ হয়ে আছে। ডান হাতের দুটো আঙুল অস্বাভাবিকভাবে বাঁকা হয়ে আছে, দেখেই বোঝা যাচ্ছে আঙুলগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। লোকটার বোধহয় ঠিক করে শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে, তাইতো নাকে অক্সিজেনের নল লাগানো।

শেহজাদ ধীর পায়ে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। গলাটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক করে ডাকল,

"মোহাম্মদ আলী..."

ডাক শুনে আলী একটা চোখ সামান্য একটু খোলার চেষ্টা করল। তাতেই বোধহয় তার ভীষণ যন্ত্রণা হল। কপাল কুঁচকে গেল অজানা কারণে। সামনে দাঁড়ানো শেহজাদকে সে চিনতে পারছে না। চেনার কথাও নয়। আগে তো দেখেনি। শেহজাদ পরিচয় দেওয়ার মতো করে বলল,

“আমি অ্যাডভোকেট শেহজাদ মূর্তজা। আপনার কেসটা আমিই লড়বো।”

খুব অন্ধকারে আশার এক চিলতে আলো দেখলে মানুষের চোখমুখ চকচক করে ওঠে। পরিস্থিতি খুইয়ে তনুমন শুধু মুক্তির স্বাদ পেতে চায়। আলীর ক্ষেত্রেও তেমন হলো। সে গুঙিয়ে গলায় বলে উঠল, "স্যার... আমারে বাঁচান স্যার। আমি খুন করি নাই... বিশ্বাস করেন স্যার, আমি মির্জা সাবরে মারি নাই। পুলিশ আমারে হুদাই ধইরা আনছে, ওরা মাইরা ফালাইব স্যার..."

শেহজাদ ভদ্রলোককে শান্ত করতে চাইল। অনেকটা আশ্বাস দিয়ে বলল,

"আমি জানি আপনি খুন করেননি। আপনাকে বাঁচাতেই আমি এখানে এসেছি।”

আলী এবার কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“আমারে আপনে এইখান থেকে বাহির করেন স্যার। লাগলে আমি আমার র'ক্ত বেইচা আপনার ফিস দিমু। তাও আমারে বাঁচান, স্যার।”

“আমি অবশ্যই আপনাকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। তবে তার আগে আমাকে আপনার সব সত্যি কথা বলতে হবে। বলুন তো, খুনের দিন রাতে বা তার আগে ওই ফার্মহাউসে ঠিক কী হয়েছিল? কেউ কি এসেছিল মির্জা সাহেবের সাথে দেখা করতে?”

আলী কিছুক্ষণ বড় বড় শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলাল। তারপর কাঁপা গলায় বলতে শুরু করল,

"স্যার, ঘটনার দুই দিন আগের কথা। মির্জা সাব খুব টেনশনে আছিল। ওইদিন রাইতে ঢাকা থেইকা একটা বিশাল সাদা গাড়ি আইছিল ফার্মহাউসে। গাড়িতে মন্ত্রী রাশেদুল হক সাব আছিলেন। আমি গেট খুইলা দিছিলাম।"

শেহজাদ অবুঝ সাজল। অবাক হয়ে জানতে চাইল,

“মন্ত্রী সাহেব? কামরুল সাহেবের সাথে তার কী কাজ?”

"কইতে পারি না, স্যার। উনারা ডয়িংরুমে বসা আছিল। আমি চা দিতে গিয়া শুনছি, মির্জা সাব খুব চিল্লাচিল্লি করতাছিল। মির্জা সাব মন্ত্রী সাবরে কইতাছিল— পূর্বাচলের ওই জমি আমার বাপ-দাদার সম্পত্তি। আপনে আপনার মেগা পজেক্টের লাইগা আমারে এই চেক দিয়া কিনতে পারবেন না। আমি জমি দিমু না।”

আলী থামতেই রোদসী আর শেহজাদ একে অপরের দিকে তাকাল। চোখে চোখে হয়তো কিছু একটা হিসেবও মিলাল। আলী আবারো বলল,

“এরপর মন্ত্রী সাব চইলা গেছিল। আর আসে নাই। তয় যাওয়ার আগে কইছিল, সময় আছে কামরুল। পাগলামি না কইরা ফাইলটা আমার নামে কইরা দাও।”

রোদসী প্রায় সাথে সাথেই জানতে চাইল,

“খুনের দিন আপনার সাথে কামরুল সাহেবের কথা কাটাকাটি হয়েছে। এই কথা কি সত্যি?”

আলী পড়ল দুর্বিপাকে। কথায় আছে, ডাক্তার আর উকিলের কাছ থেকে কখনো সত্যি লুকাতে নেই। তারও কি এখন সত্যি বলা উচিত? প্রশ্ন শুনে শেহজাদের ভ্রু যুগল কুঁচকে গেছে। এই কথা-কাটাকাটির তথ্য সে পুলিশ ফাইলে পায়নি। তাহলে রোদসী জানল কী করে? আলীর কাঁচুমাচু করা দেখে শেহজাদ বড় করে শ্বাস ফেলল। সহজ গলায় বলল,

“আপনি আমাদের সত্যি না বললে, আমরা আপনাকে বাঁচাতে পারব না। এখন আপনি যদি নিজেই নিজের মুক্তি না চান, তাহলে আমাদের তো কিছু করার নেই।”

এতোটুকু বলেই শেহজাদ দরজার দিকে এগোল। তার হাবভাব স্পষ্ট। সে কেসটা থেকে সরে দাঁড়াতে চাচ্ছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আলী চটজলদি মুখ খুলল,

“আমার বাতের ব্যথায় খুব কষ্ট হয়, স্যার। একটা ডাক্তার দেখাইসিলাম গত মাসে। ডাক্তার কইসে, থেরাপি দিলে কয়ডা ভালো থাকমু। তয় টাকা লাগবো বিশ হাজার। এতো টাকা আমি কই পামু কন? আমি.. আমি ওই টাকাটা মির্জা সাবের কাছে চাইছিলাম।”

“মির্জা কামরুলের কিপ্টেমিতে বেশ নাম-ডাক আছে। উনি আপনাকে টাকা দেননি। উল্টো অনেক কথা শুনিয়েছেন। আর ওটা নিয়েই আপনাদের কথা কাটাকাটি হয়। সেই কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তিনি আপনার গায়ে হাত তোলেন। ঠিক বলছি?”

শেহজাদ ততক্ষণে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সন্দিহান চোখে সে আলীকে দেখছে। মনে মনে সে দ্বিতীয় দফায় আশ্চর্য। একটু আগে করা প্রশ্নটা অন্ধকার ঘরে ঢিল ছোঁড়া ধরে নিলেও এখনকার কথাগুলো মোটেও তার আন্দাজ নয়। রোদসী কি আলাদা কোনো সোর্স থেকে এই ইনফরমেশন নিয়েছে? তাহলে শেহজাদকে এ বিষয়ে কিছু জানাল না কেন?

রোদসীর কথাগুলো শুনতেই অপমানে আলীর চোখদুটো ভিজে উঠল। সিলিং এ তাকিয়ে সে ভাঙা গলায় বলল,

“বড়লোকের বিরাট কারবার। দৈনিক কত খানা ফালায়া রাখে, তয় আমগোরে দেয় না। আমগোরে দেয় দুইদিন পরে পইঁচা গন্ধ বাহির হইলে। ওই খানা কি খাওন যায়? বিয়ার পর থেইকাই আমি মির্জা সাবের বাড়িত কাজ করি। সারাটা জীবন আমি এই বাড়ির লাইগা দিছি। বিনিময়ে তিনবেলার পঁচা বাসি খাওন ছাড়া কিছু চাই নাই। মাস শেষে মির্জা সাব দশ হাজার টাকা দিত। আমার পোলাডা ছোট থিকাই অসুস্থ। ওরে আমি পড়াইবার পারি নাই। এই বেতনে ওর অসুধ কিইনাই কূল পাই না। কতদিন কইসি দুইটা হাজার টাকা বাড়ায়া দিয়েন। দেয় নাই।”

আলী একটু থামল। শুকনো ঢোক গিলে বলল, “ওর মা তো জন্ম দিয়াই গেল গা। ফালায়া গেল আমারে। আমি ছাড়া আমার পোলাডার আর কেউ নাই। সারাদিন কাম কইরা রাইতে আমি ব্যথায় চিল্লাই। পোলাডা আমার পাগল হইয়া যায়। কিছু করতে পারে না। ওর কথা ভাইবাই আমি ডাক্তার দেখাইসিলাম। মির্জা সাবরে কইসিলাম বেতন বাড়ান লাগব না। আমারে আপনে খালি বিশ হাজার টাকা দেন। আমি একটু সুস্থ হই। আমি সুস্থ না হইলে আমার পোলার কী হইব? হেয় দেয় নাই। এই কথা কওয়াতে আমারে দুইডা থাপ্পড় দিসে। কইসে টাকা কি গাছে ধরে? কাম নাই, কাজ নাই। সারাদিন খালি গেটে বইসা থাইকা এতো টাকা চাই কেন?”

লোকটার গলা কাঁপছে। বোঝাই যাচ্ছে, কথাগুলো বলতে তার ভীষণ লজ্জা লাগছে। রোদসী হুট করেই জিজ্ঞেস করল,

“এই মার খাওয়ার কথা পুলিশ জানে?”

“না, জানে না।”

শেহজাদ এখন ভীষণ বিরক্ত হচ্ছে। রোদসীর এই প্রশ্ন উত্তর পর্বে আলীর মোটিভ অব মার্ডার ক্লিয়ার হচ্ছে। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য তো আসল খুনীকে খোঁজা। মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসতে শেহজাদ তাড়া দিল। জানতে চাইল,

“খু’নের রাতে ঠিক কী হয়েছিল?”

আলীর দৃষ্টি সিলিং থেকে সরে এল। শেহজাদের চোখের দিকে তাকাল সে। করুণ গলায় বলল,

“আমার মনে নাই, স্যার।”

“মনে নেই মানে?” শেহজাদের গলায় চরম আশ্চর্য।

“আমার খালি মনে আছে মাঝরাইতে আমি গারির আওয়াজ শুনছিলাম। বাহির হইয়া কিছু দেখার আগেই কে জানি আমার মাথায় জোরে বারি দিছে। জ্ঞান ফেরার পর ঐ ঘরে গিয়া খালি র'ক্ত দেখছি, স্যার। কালসা র'ক্ত। আমি হেরে মারি নাই, স্যার।”

রোদসী এক পা এগিয়ে এল। সন্দেহ নিয়ে বলল,

“ভালো করে ভেবে বলুন, কিছু কি বাদ যাচ্ছে? যা আমরা জানিনা?”

রোদসীকে এগিয়ে আসতে দেখে আলী এবার আতঙ্কিত হল, হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“আমি যা জানতাম সব আপনাগোরে কইয়া দিসি, স্যার। আমি আর কিছুই জানি না। আমারে মাইরেন না, প্লিজ। আমি আর মাইর খাইতে পারমু না।”

রোদসী হতবিহ্বল হল। লোকটা কী ভাবল? সে তাকে মারবে? আশ্চর্য তো! শেহজাদ কী একটা ভেবে আলীকে আশ্বস্ত করল। নরম গলায় বলল,

“আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন? আপনি মিথ্যা না বললে ভয় পাওয়ার দরকার নেই।” একটু থেমেই পকেট থেকে কার্ড বের করে এগিয়ে দিল, বলল, “আমরা এখন আসি। আপনি একটু আরাম করুন। আর নতুন কিছু মনে পড়লে কাউকে দিয়ে আমায় জানাবেন।”

আলীর বালিশের পাশে কার্ডটা রেখে বেরিয়ে যাওয়ার পথেই আলীর ডাক পড়ল। শেহজাদ থমকাল, কৌতুহলী নয়নে আলীর দিকে চাইল। সে বলল,

“স্যার! আমি কি বাঁচমু না? পুলিশ আমারে মাইরা ফালানোর ভয় দেখাইয়া আমার থিকা জোর কইরা কাগজে সাইন নিছে। ওরা কি আমারে ছাড়বো?”

ঠিক সেই মুহূর্তে সাব-ইন্সপেক্টর দরজা খুলে উঁকি দিল, বলল, "স্যার, টাইমস আপ। রোগী এবার রেস্ট নিতে হবে।”

শেহজাদ আর কথা না বাড়িয়ে রোদসীকে নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল।

হসপিটাল থেকে বেরিয়ে শেহজাদ গাড়িতে বসল। রোদসী খেয়াল করল, তার চোখমুখ অসম্ভব রকমের গম্ভীর। সে স্টেয়ারিং এ হাত দিয়ে বসে আছে, অথচ ইঞ্জিন স্টার্ট দিচ্ছে না। রোদসী তার ভাবনাটা ধরে ফেলল। জিজ্ঞেস করল,

“কী ভাবছেন? জমির দলিলটা এখন কোথায়?”

শেহজাদ আসলে তাই ভাবছিল। রোদসীর প্রশ্নে সে অবাক হল না। মেয়েটা তাকে পদে পদে এতোবার অবাক করেছে যে, এখন আর সে আশ্চর্য হচ্ছে না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে শেহজাদ কেসের মূল গল্প মেলাতে শুরু করল, বলল,

“পূর্বাচলকে ঘিরে মন্ত্রী রাশেদুল হক এক মেগা প্রজেক্টের প্ল্যান করেছেন। তার সেই প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য মির্জা কামরুল হাসানের জমিটা যেকোনো মূল্যে দরকার। প্রথমে তিনি কামরুল হাসানকে বুঝিয়ে শুনিয়ে মানাতে চাইলেন। অফার করলেন ব্ল্যাংক চেক। কামরুল সাহেব সেই ব্ল্যাংক চেক নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় মন্ত্রী দলবল নিয়ে তার বাড়িতে হাজির হন। কিন্তু তিনি তখনও কামরুল সাহেবকে মারেননি। ছোটখাট হুমকি দিয়েই বেরিয়ে যান। এই পুরো ঘটনাটার একাংশের সাক্ষী ছিল জাহিদ, যে এখন মৃ'ত। দ্বিতীয় অংশের এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশের সাক্ষী আলী নিজেই, তাই হয়তো এই কেসে তাকেই ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

“এখন আসামী তো নিজেই নিজের সপক্ষে একমাত্র সাক্ষী হতে পারবে না।”

“দ্যাটস দ্য পয়েন্ট!” শেহজাদ ডান হাতটা শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে স্টেয়ারিং এ একটা কিল বসাল। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে বলল,

“মোয়াজ্জেম মনে হচ্ছে আলীর থেকে স্বীকারোক্তি নিয়ে ফেলেছে। যদি তাই হয়, তাহলে কেসটা আমাদের জন্য এবার বেশ কমপ্লিকেটেড হতে চলেছে।”

“পুলিশের জোর করে নেওয়া স্বীকারোক্তির মূল্য নিশ্চয়ই আপনার অজানা নয়।”

শেহজাদ গাড়ি স্টার্ট দিল। তিক্ত গলায় বলল, “ব্যাপারটা স্বীকারোক্তির নয়। ব্যাপারটা প্রমাণের। সেই রাতে কী হয়েছে তা স্বয়ং কামরুল সাহেব আর খোদা ছাড়া কেউই জানে না। এমন সময় প্রাইম সাসপেক্টের স্বীকারোক্তি কেসকে কতোটা কমপ্লিকেটেড করে তুলবে, ভাবতে পারছেন?”

“আগামীকালই শুনানি। একবার কেস কোর্টে উঠে গেলে, এই বানোয়াট স্বীকারোক্তির আসল সত্যিটা সবাইকে জানাতে খুব একটা সময় লাগবে না।”

শেহজাদ শ্লেষাত্মক হাসল। বলল, “আপনার কেন মনে হচ্ছে এই স্বীকারোক্তির খবর এখনো নেটপাড়ায় জানাজানি হয়নি?”

রোদসী চমকে উঠল। স্বীকারোক্তির ব্যাপারে কি সত্যিই জানাজানি হয়েছে। ফোন বের করে দ্রুত স্ক্রল করল সে। দেখল দেশের বড় বড় পত্রিকা গুলো তাদের অফিশিয়াল পেইজ থেকে ইতিমধ্যেই পোস্ট করে ফেলেছে। “মির্জা কামরুল হাসান কেইসের প্রাইম সাসপেক্টের স্বীকারোক্তি। এই স্বীকারোক্তির পর কাল হতে যাচ্ছে এই কেসের প্রথম শুনানি। কী হবে সেই শুনানিতে? অপরাধ স্বীকার করেও কোর্টে কেস তুলে কী প্রমাণ করতে চাচ্ছেন অ্যাডভোকেট মূর্তজা? তবে কি তিনি জোর করে অপরাধীকে নিরপরাধ দেখাতে চাইছেন?”

রোদসী বাকিটুকু শুনল না। ভিডিও পজ করে ফোনটা লক করল। শেহজাদের চিন্তার কারণটা এবার স্পষ্ট। এত গুরুত্বপূর্ণ একটা কেসের প্রথম শুনানির আগে এমন গুঞ্জন ওঠা ভালো লক্ষণ নয়। প্রতিপক্ষের সাহসের পাল্লাটা এই গুঞ্জনকে ঘিরেই ভারি হয়ে উঠবে। রোদসীর ভাবনার মাঝেই শেহজাদ বিরস গলায় জানতে চাইল,

“বাড়ি যাবেন না?”

“হু?” রোদসী ভড়কে গেল। অমনোযোগী থাকায় শেহজাদের হঠাৎ প্রশ্ন সে ধরতে পারল না। শেহজাদ হাইওয়েতে গাড়ি ওঠাতে ওঠাতে বলল,

"আমি আজ রাতটা অফিসে থাকব। যাওয়ার আগে আপনাকে বাসায় নামিয়ে যাব।”

“তার দরকার হবে না, স্যার। আমি নিজেই চলে যেতে পারব।”

শেহজাদ এক ভ্রু উঁচিয়ে রোদসীর দিকে তাকাল। উদ্দেশ্য প্রবণিত স্বরে বলল,

“আর ইউ শিওর? চেম্বার থেকে লিফট অবধি হাঁটতে তিনবার হোঁচট খেয়েছেন, এখন বলছেন একা বাসায় যেতে পারবেন? আনবিলিভেবল!”

রোদসী গোল গোল চোখে শেহজাদকে দেখল। সে কখন হোঁচট খেল? হ্যাঁ একটু আস্তে হেঁটেছে, চোখ পিটপিট করে সময় নিয়ে আশপাশের সব দেখেছে। তার মানে এটা নয় যে সে শুকনো জায়গায় হোঁচট খেয়েছে। ইচ্ছেকৃত খোঁটায় রোদসীর নাকের পাটা ফুলে উঠল। শেহজাদ ততক্ষণে রাস্তায় মন দিয়েছে। তার কানে এল, রোদসীর ঝাঁঝাল স্বর,

“এতোটাও কানা হইনি যে নিজের বাসা চিনব না।”

“বেশ, মানলাম আপনি কানা হননি। এবার ঠিকানা বলুন।”

রোদসী ঘাড় ঘুরিয়ে বাহিরে মন দিল। কর্কশ গলায় বলল,

“মিরপুর এগারো।”

শেহজাদ একবার হাতঘড়িতে সময় দেখে নিল। রাত আটটা বেজে ত্রিশ মিনিট। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে গেলেও ঘন্টা দুয়েক অন্তত লাগবে। শেহজাদ গাড়ির স্পিড বাড়াল। রোদসী বিড়বিড় করে বলল,

“সোজা রাস্তা রেখে এতো ঘুরে যাওয়ার দরকার কী?”

শেহজাদ বোধহয় সেই কথা শুনতে পেল। জবাবের বদল সে আরেক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,

“ক্লায়েন্টকে নির্দোষ প্রমাণ করার বদলে তাকেই সন্দেহ করার কারণ কী?”

রোদসী এমন কথার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। কিছু বলার আগেই শেহজাদের দ্বিতীয় প্রশ্ন ভেসে এল,

“আলী আর কামরুল সাহেবের কথা কাটাকাটির ব্যাপারটা কবে জেনেছেন?”

রোদসী জবাব দিল না। শেহজাদ একপলক তার দিকে তাকাল। মেয়েটা বাহিরে তাকিয়ে আছে। জবাব দিবে বলে মনে হচ্ছে না। তাই নিজ থেকেই বলল,

“আপনাকে আমি আগ বাড়িয়ে কিছু করতে মানা করেছিলাম রোদসী।”

“আমি আগ বাড়িয়ে কিছু করিনি। যা করেছি তার সবটাই ধারণা।”

“শুধু ধারণা?” শেহজাদের গলায় স্পষ্ট আশ্চর্যের ছাপ।

“জি, ধারণা। এতো বছরের বিশ্বস্ততার বিনিময়ে তাকে মালিকের মা’র্ডার কেসে ফাঁসানো হয়েছে। তিনি বারবার বলছিলেন তাকে বাঁচানোর কথা। অথচ একবারও বলেননি আসল খু'নিকে খোঁজার কথা। তাতেই ঝগড়ার ব্যাপারটা আন্দাজ করেছি। বাকিটা তার চুপ থাকাই বলে দিয়েছে।”

“ধারণা করলে, টাকা না দিয়ে থা'প্প'ড় দেওয়ার ব্যাপারটা এভাবে বলতে পারলেন কী করে?”

রোদসী সিটের সাথে ক্লান্ত ভঙিতে হেলান দিল। বলল,

“তার চোখের ভাষায় অসহায়ত্ব ছিল। মনে হচ্ছিল, টাকাটা তিনি পাননি। পেলে তার চোখে থাকতো কৃতজ্ঞতার অশ্রু।” একটু থেমে সে তাচ্ছিল্য হাসল, বলল, “আর রইল চ'ড়ের কথা। এই শহরে গরীবের ওপর জুলুম না করা বড়লোকের সংখ্যা খুবই কম। তাই সেটা ধারণা করাও খুব একটা কঠিন কিছু নয়।”

“ওয়েল, ইউ ডিড আ গ্রেট জব। দ্য বল ইজ ইন আওয়ার কোর্ট নাও।”

রোদসী শেহজাদের দিকে তাকাল। একটু আগে দুশ্চিন্তা করা লোকটা এখন ফুরফুরে মেজাজে আছে। তার মাথায় কী চলছে কে জানে? রোদসীকে তাকিয়ে থাকতে দেখে শেহজাদ কৌতুক গলায় বলল,

“প্রশংসা করেছি, অপমান নয়। এতো অবাক হচ্ছেন কেন?”

রোদসীর বলতে ইচ্ছে হল, ভূতের মুখে রাম নাম শুনলে অবাক হব না? কিন্তু সে বলল ভিন্ন কথা,

“আমি অবাক হচ্ছি না, স্যার। আপনাকে অবজার্ভ করার চেষ্টা করছি।”

শেহজাদ হেসে ফেলল। ঠোঁট টিপে হাসি থামিয়ে বলল,

“সে তো আপনি না তাকিয়েও বুঝে ফেলেন। সাইকোলজির ওপর আলাদা করে কোনো কোর্স করেছেন নাকি?”

“কোর্স করিনি। করলে আপনার প্ল্যানটা এতক্ষণে ধরে ফেলতাম।”

“কেমন প্ল্যান?”

গাড়িটা জ্যামে পড়েছে। শেহজাদ রোদসীর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। রোদসী তার দিকে তাকিয়েই ছিল। তাই চোখাচোখি হল। কানে এল রোদসীর অদ্ভুত এক প্রশ্ন,

“আলী যে আপনাকে হায়ার করেনি তা অন্তত নিশ্চিত। তাহলে পেমেন্ট ছাড়া এমন কমপ্লিকেটেড একটা কেস হাতে নেওয়ার কারণ আসলে কী?”

শেহজাদ অপ্রস্তুত হল। তার মুখ থেকে প্রসন্ন ভাবটা ধীরে ধীরে উবে গেল। সেখানে ভর করল এক কাঠিন্য। ঘাড় ঘুরিয়ে সে সামনের রাস্তায় তাকাল। বলল,

“কোনো কারণ নেই।”

রোদসী হুট করেই হেসে ফেলল। মিষ্টি করে হেসে বলল,

“আমি কিন্তু ইতিমধ্যেই আপনাকে পড়ে ফেলেছি। তাই কারণটাও আমার জানা। আপনার মুখ থেকে শুনতে ইচ্ছে হল বলেই ঘটা করে জিজ্ঞেস করলাম।”

শেহজাদ ব্যস্ত হল। দ্রুত জানতে চাইল,

“কী জেনেছেন?”

রোদসী তৎক্ষনাৎ জবাব দিল না। তার জবাব না পেয়ে শেহজাদ পুনরায় তার দিকে তাকাল। কী এক আশঙ্কায় অস্থির হয়ে জানতে চাইল,

“বলছেন না কেন? কী জেনেছেন?”

রোদসী পলক ফেলল না। একভাবে তাকিয়ে থেকে বলল,

“আপনি একজন কট্টর স্বার্থপর লোক। নিজের ক্যারিয়ারে আরও একটি হাই প্রোফাইল কেসের সফলতা জুড়তেই আপনার এই কেস হাতে নেওয়া। আই নো, আ'ম রাইট। সো, ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু এডমিট ইট।”

জ্যাম ছেড়েছে। পেছনের গাড়িগুলো সমানে হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছে। শেহজাদের সেদিকে মন নেই। সে ব্যস্ত পাশে বসা রহস্যময়ী মেয়েটিকে দেখতে। মেয়েটিকে তার একটু আগেও ভীষণ ভালো লাগছিল। মনে হচ্ছিল, সেরা একজন এসিস্ট্যান্ট জুটেছে। অথচ কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তার অনুভূতি বদলে গেছে। এখন আর মেয়েটিকে ভালো লাগছে না। রীতিমতো অসহ্য লাগছে তার উপস্থিতি। মেয়েটা এতো সহজে তাকে স্বার্থপর বললো!

“স্বার্থপর হতে তো দোষ নেই, রোদসী। সেদিন আপনিই বলেছিলেন, আমরা সবাই স্বার্থপর। তাহলে এখন আমার বেলায় সেই স্বার্থপরতায় দোষ কেন?”

“আমি তো একবারও বলিনি দোষ। তবে স্বার্থপর হতে গিয়ে মিথ্যা বলা দোষের।”

পেছনের গাড়িগুলো এবার বেজায় শব্দ করতে শুরু করেছে। শেহজাদ স্টিয়ারিং এ মন দিল। সাথেই জানতে চাইল,

“কেমন মিথ্যা?”

“আপনার জন্য কেস জেতাটা জরুরি। কিন্তু সেই জিত আবার মিথ্যার হবে না তো? এমন নয় তো? যে সত্যি সত্যি কোনো অপরাধীকে আপনি শুধুমাত্র নিজের জয়ের জন্য নিরপরাধ প্রমাণ করতে চাইছেন?”

শেহজাদ শুকনো ঢোক গিলল। জানতে চাইল,

“মন্ত্রীর মতো ক্ষমতাধর ব্যক্তির হস্তক্ষেপ আছে জেনেও আলীর মতো দুর্বলকে আপনার অপরাধী মনে হচ্ছে?”

“প্রতিপক্ষকে কখনো দুর্বল ভাবতে নেই।”

জবাবে শেহজাদ এতোটাই অপ্রস্তুত হলো যে, রাস্তার ধারে গাড়িটা একপাশে এনে থামাল। রোদসীর কথার ধরণ তার পছন্দ হচ্ছে না। কখনো সে প্রশ্ন করছে, কখনো আবার জ্ঞান দিচ্ছে। মেয়েটার অবজারভেশন পাওয়ার চমৎকার, এই প্রমাণ সে আগেও পেয়েছে। আলীকে দেখে কি তার কোনোভাবে অপরাধী মনে হয়েছে? নয়তো নিজের ক্লায়েন্টকে-ই সে প্রতিপক্ষ ভাবছে কেন?

“বেশ, ভাবলাম না দুর্বল। আপনার থিওরি মতে, শক্তিশালী আলী মাত্র বিশ হাজার টাকার জন্য নিজেই তার মালিককে এমন প্রফেশনালভাবে মেরেছে এবং নিজেই নিজেকে আঘাত করে অজ্ঞান হয়েছে। তাই তো?”

শেহজাদের উচাটন দেখে রোদসী হেসে ফেলল। হাসলে তার চোখ দুটো ছোট হয়ে আসে। দেখতে অন্যরকম লাগে। চশমা না থাকায়, আজ তার চোখদুটো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। শেহজাদ তার সেই দৃষ্টির গভীরতায় খেই হারাল। মনে হল, তার মাথাটা ঝিমঝিম করছে। গতকালের নির্ঘুম রাত কি তার এই অবস্থার জন্য দায়ী? নাকি সামনে বসা মেয়েটির হাসিই তাকে পাগল করে তুলছে। শেহজাদের কানে তীরের মতো বিঁধছে রোদসীর কথা,

“আমি কখন বললাম, আলীই অপরাধী?”

“হেঁয়ালি না করে পরিষ্কার করে বলুন তো। কী বলতে চান?”

“আপনি নিজের জয়ের চিন্তায় এতোটাই মগ্ন যে, আপনি আপনার ক্লায়েন্টকে রীতিমতো ভুলেই গেছেন। কেস নিয়ে এতোগুলো দিন এতো জায়গায় ছোটাছুটি করলেন অথচ একবারও আলীর সঙ্গে দেখা করলেন না। তার নির্দোষ হওয়াটা আপনার জন্য জরুরি মনে হচ্ছে না। আপনার জন্য আপনার জয়টাই আসল।”

রোদসী একটু থামল। শেহজাদের ভড়কানো মুখটা দেখতে তার মজা লাগছে। চোখে চশমা থাকলে আরেকটু পরিষ্কার ভাবে দেখা যেত। স্মিত হেসে সে আরও বলল,

“আপনি তো আলীর উকিল, এই কেসের ডিফেন্স লইয়্যার, রাইট? সো, অ্যাডভোকেট মূর্তজা, হোয়াট ডিড ইউ ডু ফর হিম?”

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 11 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন