ফন্ট সাইজ:
থিম:
তবুও জোছনা নামে

পর্ব 12

লেখক: বর্ণপ্রিয়া

#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_১২

রোদসীরা যে বাড়িতে থাকে, বাড়িটার কোনো নাম নেই। নিতান্তই পুরনো আমলের একটা বাড়ি। রঙচটা একটা পুরনো ঘিয়ে রঙে বাড়িটি আচ্ছাদিত। বাড়িটির দুটো ছাদ। একটা ছাদ দোতলায়, বাড়িওয়ালারা সেখানে বিশাল করে ছাদ বাগান করেছেন। বাড়িটির অন্য পাশ লম্বা হয়ে উঠে গেছে পাঁচতলা অবধি। বাহির থেকে দেখতে দোতলার ছাদটিকে শৌখিনতা মনে হলেও আসল সত্য হলো, বাড়িটি দু'ভাইয়ের। একপাশ এক ভাইয়ের, অন্য পাশ আরেক ভাইয়ের। এক ভাই আর্থিক সংকটে আর উপরের দিকে তুলতে পারেনি। পাড়ি জমিয়েছে না ফেরার দেশে। অন্য ভাই পুরোটার কাজ শেষ করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন অন্য কোথাও। রোদসীরা থাকে পাঁচতলার ওপর, ছয়তলা তথা ছাদঘরে। ছাদে একটি পরিবার থাকার মতো দুই রুমের ছোট্ট একটি বাসা। হয়তো কেয়ারটেকার রাখবেন ভেবে এমন একটি ফ্ল্যাট করেছিলেন বাড়িওয়ালা। পরবর্তীতে কেয়ারটেকার আর রাখা হয়নি। এক মালিকের পরিবার দোতলায় সগৌরবে থাকা অবস্থায় আলাদা করে কেয়ারটেকার লাগে নাকি? রোদসী আগে থেকেই এ বাসাতে থাকত। বাসাটির সাথে লাগোয়া প্রশস্ত ছাদ তাকে স্বস্তি দিত। একটু খানি মেঘ হলেই মন ভরে ভিজে নেওয়া যায়। যখন তখন কাপড় নেড়ে দেওয়া যায়। প্লাস্টিকের বোতল আর বালতি কেটে তাতে মাটি দিয়ে নানা রঙের ফুলগাছ লাগানো যায়। মন চাইলেই দরজা খুলে বাহির হয়ে, খোলা আকাশের নিচে মুক্ত বিহঙ্গনার মতো দু'হাত দুদিকে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। কলেজে ওঠার পর থেকে জামিল ব্যাপারী নামক লোকটি থেকে এক পয়সাও সে খরচা করেনি। স্কলারশিপ আর টিউশনের টাকা দিয়ে আলাদা বাসায় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছে। শেহজাদের অফিসে যোগ দেওয়ার পরপরই সে মাকে নিয়ে এসেছে। ঐ চারদেয়াল থেকে তাকে বের করে এনেই ডিভোর্স কেস ফাইল করার ব্যাপারটা এতোই অপ্রত্যাশিত ছিল যে, জামিল ব্যাপারী বুঝতেই পারেননি কিছু। আর যখন বুঝেছেন, তখন সব কিছু তার হাতের বাহিরে। চাইলেই তিনি এখন বেল্টটা খুলে বউকে দুটো ঘা লাগিয়ে কেসটা উঠিয়ে নিতে বলতে পারছেন না। এই ঝাঁজ মেটাতে তিনি আজ রোদসীর অফিসে এসে ঝামেলা করলেন।

শেহজাদ গোটা রাস্তায় রোদসীর সাথে আর একটা কথাও বলেনি। রাস্তা চিনিয়ে দেওয়া বাদে অন্য কোনো কথা রোদসীও বলেনি। বাড়ির কাছাকাছি এসে তারা একটা চশমার দোকানে থেমেছে। রোদসীর জন্য দুটো চশমা বানাতে দিয়ে পুরো টাকাটাই এডভান্স করেছে শেহজাদ। বের হয়ে বলেছে, “আমি দয়া বা মায়া করে বিল দেইনি। এটা শুধুই একটা ইনভেস্টমেন্ট বা কম্পেনসেশন। আপনাকে কাজে রাখার ইনভেস্টমেন্ট কিংবা আমার অফিসে আমার কেসজনিত কারণে আপনার ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতিপূরণও ভাবতে পারেন।”

রোদসী বেশ বুঝতে পারছে লোকটা নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছে। অথচ তার ভেতরটা ততক্ষণে তিতকুটে হয়ে আছে। মানুষ কখনো নিজের সম্পর্কে সত্য অভিযোগ মানতে চায় না। সুযোগ থাকলে অকপটে জোর গলায় বলে বেড়ায়, এগুলো মিথ্যে। সত্যকে মিথ্যা বলে দাবি করতে না পারলে অবচেতন মনেই সে বারবার নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করে। শেহজাদও নিশ্চয়ই নিজের এই দিকটা মানতে চাচ্ছে না। আবার তা প্রকাশও করছে না। রোদসী বাসার সামনে আসতেই বিনা বাক্যে বেরিয়ে এল। পরপর শেহজাদও নামল গাড়ি থেকে। তাকে নামতে দেখে রোদসী ভদ্রতা দেখিয়ে তাকে ধন্যবাদ জানাল। শেহজাদ সেই ধন্যবাদ গ্রহণ করলো না। উল্টো নির্লজ্জের মতো বলল,

“এখান থেকেই বিদায় জানানোর চিন্তা ভাবনা করে থাকলে তা বাদ দিন। কারণ আমি আপনার মায়ের সাথে দেখা করতে চাচ্ছি।”

রোদসী ভড়কানো গলায় বলল, “মা এতক্ষণে ঘুমিয়ে গেছেন।” শেহজাদ তার সেই অজুহাতকে তোয়াক্কা করল না। গাড়িটা লক করে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল। ভাবলেশহীন গলায় বলল,

“ভুলে যাচ্ছেন, দুদিন বাদেই আপনার মায়ের ডিভোর্স কেসের প্রথম হিয়ারিং। দিনশেষে আমি তার লইয়্যার, ক্লায়েন্টের খোঁজ নেওয়া আমার পেশাগত দায়িত্ব।”

কথাটা বলে সে নিচতলার ডানদিকের ফ্ল্যাটে ইশারা করে আঙুল তুলল। যেন জানতে চাইল, এটায় থাকেন? রোদসী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ছাদঘরে থাকি। ছয়তলায়।”

রোদসী বুঝল, কথাটা সে তাকেই কাউন্টার দিয়ে বলেছে। তবু বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখাল না সে। শেহজাদ ততক্ষণে ডানে বামে তাকিয়ে লিফট খুঁজতে চাইল। অথচ চারিদিকে কেবল নিরেট শূন্যতা। রোদসী সন্তপর্ণে তাকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতেই বলল,

“জরুরি নয় যে, সব বাসাতে লিফট থাকবে। সিঁড়িরও একটা ব্যবহার আছে।”

ছয়তলায় লিফট ছাড়া উঠতে শেহজাদের বেশ বেগ পেতে হল। তার সিঁড়ি বাওয়ার অভ্যেস নেই। কাজেই কাঙ্খিত বাসার সামনে আসতে আসতে তার ঘাম ছুটল। গলার টাইটা সামান্য ঢিলে করে সে বড় বড় শ্বাস নিয়ে ধাতস্থ হল। রোদসী বদ্ধ দরজায় ধীরে ধীরে দু’বার কড়া নাড়ল। ভেতর থেকে সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। শেহজাদ বুঝতে পারছে না একটা বিল্ডিং এর ছাদে কেন টিনশেড করে ভাড়া দেওয়া লাগবে। সিমেন্ট আর টিন দুটোই এক জায়গায় থেকে মানুষভেদে ভিন্ন ভিন্ন মাথার উপরের ছাদ হয়ে উঠছে। এতো রীতিমতো বৈষম্য! এখানকার বাতিটাও আজ বন্ধ। শেহজাদ পাশের সুইচবোর্ড চেপে সেটা জ্বালানোর বৃথা চেষ্টা করে বুঝল বাতিটা নষ্ট। কী এক বিচ্ছিরি হাল! রোদসী তৃতীয় দফায় দরজা নক করেও জবাব পেল না। এবার সে ডাকতে শুরু করল, “আম্মু! আম্মু! ঘুমিয়ে পড়েছ?” শেহজাদ এই পর্যায়ে তাকে থামিয়ে সন্দিহান গলায় জানতে চাইল,

“একটু আগেই বললেন, তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাহলে এখন আবার ডাকাডাকি করছেন কেন? কোনো স্পেয়ার কী নেই আপনার কাছে?”

রোদসী তৎক্ষনাৎ জবাব দিতে পারল না। তার বাসার দরজাটা টিনের। সাধারণ হ্যান্ডেল লক ছাড়াও এখানে ডাবল সিলিন্ডার ডেড বোল্ট নামক আরেকটা তালার ব্যবস্থা আছে। বাড়িওয়ালা মূলত এটা চোর থেকে বাঁচতে লাগিয়েছেন। এই তালার বিশেষত্ব হলো, বাহির থেকে চাবি ঘোরালে ভেতর থেকে লক করা থাকলেও তালা খুলে যায়। রোদসী মাকে আনার ওর থেকে সবসময়ই এই লক করে বের হয়। ভেতরেও গেটের পাশেই চাবি রাখা থাকে। চাইলেই মা তালা খুলে বাহির হতে পারবেন। তবু কেন যেন তিনি বাহির হননা। এতো কাছে থেকেও একপলকের জন্য মন ভরে নীলরঙা ঐ আকাশ দেখেন না। রোদসী উপায় না পেয়ে ব্যাগ থেকে স্পেয়ার কী বের করল। সাবধানে তালা খুলে দরজা ধাক্কা দিতেই বিনা নোটিশে চিনামাটির এক ফুলদানি এসে আঘাত হানল তার মাথায়। ঘটনার আকষ্মিকতায় রোদসী প্রতিক্রিয়া করতে ভুলে গেল। প্রায় সাথে সাথেই কপাল ফেটে র'ক্ত গড়াতে শুরু করল। রোদসী সাথে সাথেই দু হাত উপরে তুলে তোতা পাখির মতো আওড়াল, “আমি রোদসী, আম্মু। আমি রোদসী। ভালো করে দেখো, আমি তোমার রোদ।” বলতে বলতেই সে এগিয়ে গেল, সামনে ফুলদানি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ভীত সন্ত্রস্ত মায়ের দিকে। দুহাতে বার কয়েক ছুঁয়ে দিল তার কম্পিত হাতজোড়া। তাকে আশ্বস্ত করে বলল, আম্মু এই দেখ, আমি এসেছি। এটা আমি, তোমার রোদ। শান্ত হও প্লিজ। একটু শান্ত হও!”

মিনিট খানেক বাদেই তিনি ঠান্ডা হয়ে এলেন। তার হাত পা দূর্বল হয়ে আসল। তিনি লুটিয়ে পড়লেন মেঝেতে। পাগলের মতো বলতে শুরু করলেন, “রোদ! রোদ! তুই এসেছিস? এসেছিস মা? দেখ না, বাহিরে কে যেন আসছে। কার একটা পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। শক্ত জুতার শব্দ। ঠিক ওই লোকটার মতো।”

রোদসী দুহাতে বার কয়েক মায়ের মাথায় হাত বুলাল। নরম গলায় বলল,

“কেউ আসেনি, মা। এখানে কেউ আসবে না। বলেছি না তোমায়? এখানে শুধু তুমি আর আমি থাকব। তুমি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছ, দেখি বড় করে শ্বাস টানো তো। টানো টানো!”

রুমানা খাতুন মেয়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে মানলেন। বড় করে শ্বাস টেনে মেয়ের কথামতো ছাড়লেন। বার কয়েক একই কাজ করতেই তিনি ঠান্ডা হয়ে এলেন। সম্বিত ফিরতেই মেয়ের সাথে পুরুষলোক দেখে তিনি চমকে উঠলেন। শেহজাদ তখনো হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে বোধহয় কিছুই বুঝতে পারছে না। রোদসী সেদিকে তাকিয়ে পরিচয় দেওয়ার মতো করে বলল, “এটা আমাদের উকিল, আম্মু। উনিই আমাদের কেসটা লড়বেন।” রুমানা খাতুন কী বুঝলেন কে জানে? কতক্ষণ ড্যাবড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে থেকে ঘাড় ঘুরালেন মেয়ের দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে তার নজর গেল মেয়ের ফাটা কপাল গড়িয়ে পড়া লালরঙা তরলে। তিনি হঠাৎই আবার চিৎকার করে উঠলেন। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “হায়হায়! এ আমি কী করলাম? নিজ হাতে আমি আমার রোদকে মা'রলাম! আমি কীভাবে আমার রো'দের র'ক্ত ঝরালাম? হায় আল্লাহ! এ আমি কী করলাম? কী করলাম?” আহাজারি করতে করতে শেষদিকে তিনি দু’হাতে সজোরে নিজের কপালে নিজে মা'রতে শুরু করলেন। শেহজাদ ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এল। যতটা সম্ভব কোমল করে বলল,

“আপনি অকারণ চিন্তিত হচ্ছেন, আন্টি। তেমন কিছুই হয়নি। সামান্য চামড়া কে'টেছে। আপনি ঠান্ডা হোন প্লিজ। আপনি ঠান্ডা না হলে আপনার মেয়ে এর চেয়ে বেশি কষ্ট পাবে। একটু ঠান্ডা হোন।”

রোদসী আর শেহজদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কিছুটা শান্ত হতেই তাকে ঔষধ দেওয়া হল। মিনিট পাঁচেকের মাঝে তিনি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন। শেহজাদ খেয়াল করল, রোদসীর কপাল থেকে এখনো র'ক্ত ঝরছে। শুকনো কাশি দিয়ে সে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। অতঃপর পকেট হাতড়ে রুমাল বের করল। এগিয়ে দিল রোদসীর দিকে। নিরেট গলায় বলল, “এটা কপালে চেপে ধরুন কিছুক্ষণ, চেপে না ধরলে র'ক্ত'ক্ষরণ বন্ধ হবে না।”

রোদসী রুমাল নিল না। নিচু গলায় বলল, “এখানে কথা বললে আম্মু উঠে যাবে। বাহিরে আসুন প্লিজ।”

শেহজাদ কথা বাড়াল না। নিঃশব্দে বেরিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াল। রোদসী বাঁ হাতে কপালের র'ক্ত সরানোর চেষ্টা করছে। তার সেই বৃথা চেষ্টা দেখে বিরক্ত হলো শেহজাদ। রুমালটা এগিয়ে চেপে ধরল রোদসীর কপাল। রোদসী প্রতিক্রিয়া করার আগেই বলল, “সবকিছুতে জেদ করলেই সমস্যা সমাধান হয় না।”

রোদসী শুকনো মুখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তার দৃষ্টি ছাদের শক্ত মেঝেতে নিবদ্ধ। সেদিকে তাকিয়ে থেকেই একসময় বলল, “এজন্যই আপনাকে আসতে দিতে চাইনি। আশা করি এবার বুঝতে পেরেছেন।”

“উনাকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাচ্ছেন? উনার পিটিএসডি (PTSD) তো মনে হচ্ছে সিভিয়ার লেভেলে চলে গেছে। এমন অবস্থায় আমরা উনাকে কোর্টে তুলব কী করে?”

রোদসী জবাব দিল না। সে তখন একভাবে দাঁড়িয়ে আছে। একটু আগের ঘটনায় সে পুরোপুরি কাবু হয়েছে। তার হাত-পা এখন অসার হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, যখন তখন সেও জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়বে। শেহজাদ আবার তাকে ডাকল,

“মিস রোদসী? আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?”

“হুঁ”

“ফার্স্ট এইড বক্সটা আনুন। এটা ক্লিন করতে হবে।”

“আমি করে নেব, স্যার।”

রোদসী টের পেল, কপালে সরাসরি না ছুঁয়ে রুমাল চেপে রাখা হাতের জোর বেড়েছে। ব্যথায় তার চোখ মুখ কুঁচকে এল। অসময়ে রাগ দেখানো লোকটাকে দুটো কঠিন কথা শুনিয়ে বের করে দিতে ইচ্ছে হল। তবু সে কিছুই বলল না। ভাঙা গলায় বলল, “ওয়াড্রবের ওপরে আছে।” শেহজাদ তাকে রুমালটা চেপে ধরতে দিয়ে নিজে গিয়েই বক্সটা আনল। ফিরে এসে দেখল, রোদসী দেয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে পড়েছে। শেহজাদ ত্রস্ত পায়ে ছুটে এল। দু হাঁটু ভাঁজ করে উবু হয়ে বসল। উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইল,

“আপনি কি জ্ঞান হারাচ্ছেন? মিস রোদসী? মিস রোদসী? আপনি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? হ্যালো!”

রোদসী চোখদুটো বুজে রেখেছে। শেহজাদের এতোগুলো প্রশ্নের জবাবে সে দুর্বল গলায় শুধু এতটুকু বলল,

“আপনি কি জলদি কাজ শেষ করে বেরুবেন প্লিজ? আমি ঘুমাব। অল্প কিছুক্ষণ সব ভুলে ঘুমাব।”

খোলা আকাশের নিচে থাকায় কৃত্রিম আলো খুব একটা চোখে পড়ছে না। আজ বোধহয় পূর্ণিমা। আকাশে গোল চাঁদ ঝকমক করছে। সেই আলোতে রোদসীর ক্লান্ত মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে বয়সের চেয়ে দ্বিগুণ ওজনের চাপে মেয়েটির হৃদয় পিষ্ট হয়েছে। শেহজাদ মেয়েটির বদ্ধ চোখের পাতায় তাকিয়ে আচমকাই ক্রোধ অনুভব করল। দু'দুটো মানুষকে জীবিত অবস্থায় মৃ’ত্যুর স্বাদ দেওয়া নরপিশাচটাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ানোর ক্রোধ। একটি মেয়ের শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য উপভোগ করতে না দেওয়ার ক্রোধ। একটি মহিলাকে মানসিক রোগী বানিয়ে ফেলার ক্রোধ। অথচ তার এমন অনুভব হওয়া উচিত নয়। সে শুধুমাত্র একটা উকিল। শেহজাদ চোয়াল শক্ত করে মন ঘোরাল। আলতো হাতে রোদসীর কপাল পরিষ্কার করে তাতে ব্যান্ডেজ করে দিল। কাজটা সে খুব সাবধানে করল। পাছে ক্লান্ত রোদসীর ঘুম ভেঙে যায়। কাজ শেষে বক্সটা জায়গামতো রেখে সে দাঁড়িয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। তার কি এখন মেয়েটাকে ঘরে নিয়ে শুইয়ে দেওয়া উচিত? নাকি তার ক্ষণিকের আরাম ভেঙে তাকে ডেকে তোলা উচিত? শেহজাদ এলোমেলো পা ফেলে কিছুক্ষণ খোলা ছাদে পায়চারি করল। সে মূলত বাবার সাথে কথা বলে ডিভোর্স কেসটির শুনানি আগানোর চেষ্টা করছে। তার সেই চেষ্টা কাজে দেবে, এ ব্যাপারেও সে নিশ্চিত। কিন্তু আগামীকালের মা'র্ডার কেসটার হিয়ারিং এর একদিন পরেই ফ্যামিলি কোর্টে গিয়ে কী হবে তা সে বুঝতে পারছে না। কিছুক্ষণ এলোমেলো হাঁটাহাঁটি করে সে না চাইতেও দ্বিতীয় অপশনটা বেছে নিল। মৃদু গলায় কয়েকবার রোদসীকে ডাকল। রোদসীর ঘাড়টা বাঁকা হয়ে কাঁধে পড়ে আছে। শেহজাদের ডাক শুনে সে সামান্য নড়ে উঠল। জড়ানো গলায় বলল, “আরেকটু ঘুমাব, আম্মু। অনেক মাথা ব্যথা করছে।” শেহজাদ যেন এবার থমকে গেল। মনে হলো, মেয়েটাকে দুটো দিন সমস্ত দায়িত্ব থেকে ছুটি দেওয়া গেলে ভালো হতো। একজন মেয়ে হওয়ার দায়িত্ব, একমাত্র সন্তান হওয়ার দায়িত্ব, একজন পশুকে শায়েস্তা করার দায়িত্ব, উকিল হওয়ার দায়িত্ব, দু'দুটো কেসের দায়িত্ব— সব থেকে একসাথে ছুটি দরকার মেয়েটার। তবেই না সে বাঁচবে। শেহজাদ হুট করেই একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।

ভেতর থেকে বালিশ এনে দেয়ালের পাশেই নিচে রাখল। রোদসীকে বাহু চেপে সাবধানে শুইয়ে দিল সেখানে। নিজে বসল একটু দূরে রোদসীদের চৌকাঠে। ঘাড় ঘুরালেই সে রোদসীর মাকে দেখতে পাচ্ছে, আবার পাশে তাকালে রোদসীকে। গতরাতেও তার ঘুম হয়নি। মনে হচ্ছে, আজও ঘুমোনো সম্ভব হবে না। শেহজাদ টেবিল থেকে রোদসীর একটা খাতা আর কলম নিয়ে বসল। আগামীকালের জন্য টুকটাক একটা খসড়া প্রস্তুত করার চেষ্টা করল। তার কাজ শেষ হতে হতে চারিদিকে ফজরের আজান পড়ল। রুমানা খাতুনের ঘুমের ঔষধের পাওয়ার ততক্ষণে কমে এসেছে। তাকে উঠতে দেখে শেহজাদ খুব সন্তপর্ণে বেরিয়ে এল। ছাদের দরজার বাহিরে মিনিট পাঁচেক দাঁড়াতেই শুনল, তিনি মেয়েকে ডাকছেন, আশ্চর্য নিয়ে বলছেন, “রোদ! রোদ রে! কী রে মা? তুই কি সারারাত খোলা ছাদে ঘুমালি?” শেহজাদ বুঝল, এরপর এখানে থাকার প্রয়োজন নেই। শেষে সারা রাত তার উপস্থিতি নিয়ে ভদ্রমহিলার আবার প্যানিক এট্যাক শুরু হবে। দ্রুত পায়ে সে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল। নামতে নামতে রোদসীকে মেসেজ দিল,

“আপনার ডেস্কে রাখা হলুদ খাতায় আজকের কেসের সব পয়েন্ট সাজানো আছে। ওটার প্রিন্টেড কপি আর যাবতীয় ডকুমেন্টস নিয়ে ঠিক ন'টার সময় কোর্টে আসবেন। আমি বাসা থেকে একেবারে ফ্রেশ হয়ে কোর্টে যাব। ডকুমেন্টস আনতে আর অফিস যাওয়ার সময় পাব না।”

মেসেজটা পাঠিয়ে সে ফেরার পথ ধরল। তার এখানে রাতে থাকার ব্যাপারটি জানতে পারলে রোদসীও হয়তো বিষয়টা খুব একটা স্বাভাবিক ভাবে নেবে না। তাই ব্যাপারটাকে সে যতোটা সম্ভব আড়াল করার চেষ্টা করছে। আর তার জন্যই ফেরার পথে একবার অফিসে ঢুকতে হবে। রোদসীর ডেস্কে রাখতে হবে ওর টেবিল থেকে নিয়ে আসা খাতাটা। মেয়েটা খাতাটা চিনে ফেললেও খুব একটা ক্ষতি নেই। ভুল করে অফিসে রেখে গেছে ভেবে উড়িয়ে দিবে তা। শেহজাদ টের পাচ্ছে, ঘুমে তার চোখ দুটো জড়িয়ে আসছে। বাড়ি ফিরে তারও কয়েক ঘন্টার বিশ্রাম একান্তই দরকার। কিন্তু ততোটুকু সময় কি আদৌ পাওয়া যাবে? নাকি শাওয়ার নিয়ে বেরুতে বেরুতেই কোর্টের সময় হয়ে যাবে?

শেহজাদের ধারণা সঠিক প্রমাণিত হলো। ভোর ভোর বাড়ি ফিরে মায়ের হরেক রকমের প্রশ্নের জবাব দিয়ে শাওয়ার নিতে বেশ সময় নষ্ট হলো। শাওয়ার শেষে ঘড়িতে দেখা গেল সাতটা বেজে পঞ্চাশ মিনিট। শেহজাদ জোর করেই ত্রিশ মিনিটের জন্য চোখ বুজে শুয়ে থাকল। ঘুম যদিও হলো না, তবু স্নায়ুগুলো কিছুটা শান্ত হলো। একটা পাওয়ার ন্যাপ নিতে পারলে আরেকটু ভালো হতো। কিন্তু এই মুহূর্তে তার ঘুম আসছে না। এতোদিন ডিভোর্স কেসটা নিয়ে সে বিশেষ অগ্রগতি দেখায়নি। কিন্তু কাল বাদে পরশু এই কেসের প্রথম হিয়ারিং। শেহজাদ তার প্রথম হিয়ারিং এই কেসটায় নিজের দখলদারিত্ব দেখাতে চায়। এর জন্য জামিল ব্যাপারীর উপর নজর রাখতে হবে। তার ব্যাকগ্রাউন্ড না জেনে তাকে টেনে নামানো খুব একটা সহজ হবে না। রোদসী গতকাল তার প্রশ্নের জবাব দেয়নি। রুমানা খাতুনকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো হচ্ছে কিনা তা জানাটা জরুরি। তার মানসিক স্বাস্থ্যের মেডিকেল সার্টিফিকেট পেলে কেসটা আরও একটু জোরালো হবে। একটু পর মির্জা কামরুলের কেসের হিয়ারিং। সব ঠিক থাকলে, আজকেই হয়তোবা আলীকে জামিন দেওয়া হবে। কিন্তু তারপর? রাশেদুল হকের উপর আকষ্মিক আঙুল ওঠালে মিডিয়ায় যে বো'মা ফাটবে তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হবে? শেহজাদ আর ভাবতে পারল না। টাইমারটা বাজছে। আধঘন্টা এতো দ্রুত হয়ে গেল?

শেহজাদ রেডি হয়ে কোর্টে যেতে যেতে বাজলো ন'টা দশ। সাড়ে ন'টায় কেসের হিয়ারিং। জজকোর্টের তিন নম্বর এজলাসের বাহিরে আজ তিল ধারণের ঠাঁই নেই। সাধারণ মানুষ আর আইনজীবী তো বটেই, কৌতুহলী সাংবাদিক দিয়েও ভরে গেছে তার একাংশ। প্রসিকিউটর সেসব সাংবাদিকের সামনে হাসি হাসি মুখে কীসব বলছেন। শেহজাদ সেদিকে বেশিক্ষণ তাকাল না। খুঁজতে শুরু করল রোদসীকে। মেয়েটার এতক্ষণে চলে আসার কথা। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মেয়েটাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। শেহজাদকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। মিনিট খানেকের মাঝেই পেছন থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এল তন্ময়। তার হাতে কেসের মাস্টার ফাইল। ছেলেটার চেহারায় একটা নার্ভাসনেস কাজ করছে। মনে হচ্ছে, দেরি করে ফেলায় সে বেশ ভয়ে আছে। শেহজাদ তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। ফাইলটা হাতে নিয়ে জানতে চাইল,

“মিস রোদসী কোথায়?”

"রোদসী ম্যাডাম তো কোর্টে আসেননি, স্যার। উনি সকাল সকাল ফাইলটা আমাকে দিয়ে বললেন আপনাকে কোর্টে পৌঁছে দিতে।

শেহজাদ আশ্চর্য হলো। মেয়েটা আসেনি এবং এই না আসার ব্যাপারে সে শেহজাদকে জানায়নি। শেহজাদ আর কিছু বলার সুযোগ পায়নি। সাংবাদিক মহলের নজরে আসতেই তাদের একদল ঘিরে ধরেছে তাকে। শেহজাদ এই মুহূর্তে সংবাদ সম্মেলন করতে চাচ্ছে না। তার মাথাটা দপদপ করছে। দু’টো নির্ঘুম রাত কাটিয়ে আজকের প্রথম শুনানিটা তাকে একা সামলাতে হবে তা সে কল্পনাও করেনি। মেয়েটা এতো বড় একটা হাই প্রোফাইল কেসে আসলো না! এতো আনপ্রফেশনাল কেন সে? মেয়েটাকে সে একমুহূর্তে সাধারণ, বুদ্ধিদীপ্ত একজন মনে করলেই পরমুহূর্তে সে সব গুড়িয়ে দেয়। দায়িত্বজ্ঞানহীনতার শীর্ষে যদি কেউ থেকে থাকে তাহলে সেটা মিস রোদসীই হবেন। আবারো শেহজাদকে না জানিয়ে কেসে গাফিলতি করে নিজের মনমর্জি খাটালো সে। না, এভাবে চলতে পারে না। এর একটা বিহিত অবশ্যই করতে হবে।

তন্ময় ভিড় ঠেলে শেহজাদকে নিয়ে কোনোমতে কোর্টরুমে গেল। শেহজাদের চোখমুখ অস্বাভাবিক হয়ে আছে। তন্ময়ের কেন যেন মনে হচ্ছে, আজ মিস রোদসীর কপালে দুঃখই আছে। হুটহাট মনমতো কাজ করে মেয়েটা তার বিপদ ডেকে আনছে। জজ সাহেব প্রবেশ করার আগে শেহজাদ শক্ত চোয়ালে ফাইলটা একবার খুলে দেখল। হতভম্ব হয়ে আবিষ্কার করল, এই ফাইলে কেস জনিত গুরুত্বপূর্ণ কাগজ আর এভিডেন্স গুলো নেই। উল্টো রাখা আছে খুব সাধারণ কিছু পয়েন্ট। শেহজাদ দ্রুত হাতে ফাইলের পাতাগুলো ওল্টালো। অস্ফুটে বলে ফেলল, “হোয়াট রাবিশ!”

শেষ পাতাটি উল্টাতেই নজরে এলো একটা স্টিকি নোট। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,

"আজ একটু হেরে যাওয়ার ভান ধরুন স্যার। শত্রুপক্ষকে একবার অন্তত সাময়িক সময়ের জন্য জয়ের আনন্দ উপভোগ করতে দিন। এভিডেন্স সংগ্রহের অজুহাতে কোনোভাবে শুধু দ্বিতীয় শুনানির ডেট নিয়ে আসুন। বাকিটা ফেরার পর বলছি। ট্রাস্ট মি! দ্য বল ইজ ইন ইওর কোর্ট নাও। ব্রেক আ লেগ!"

চিরকুটটা পড়ার পর শেহজাদের রাগটা তরতর করে বাড়লো। তার এখন এসিস্ট্যান্টের কথা শুনে চলতে হবে? অসম্ভব! প্রথম শুনানিতে নিজেকে দূর্বল দেখিয়ে সে প্রতিপক্ষকে গর্বিত হতে দেখতে পারবে না। শেহজাদ তন্ময়কে কিছু একটা বলতে চাইল। তার আগেই কোর্টরুমে জজ সাহেবের আগমন ঘটল। না চাইতেও শেহজাদকে গোটা ব্যাপারটা হজম করতে হলো।

এজলাসের ভেতরে শুনানি শুরু হলো। এবং আশ্চর্যজনক ভাবে সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রোদসীর কথা মতো কাজ করলো। এতোদিনের দাপুটে শেহজাদ মূর্তজাকে আজ আর তার স্বভাবসুলভ এগ্রেসিভ রূপে দেখা গেল না। সে জজের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত নিষ্প্রভ ভঙ্গিতে বলল, পুলিশের থার্ড সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিটের বিপরীতে তার হাতে আপাতত কোনো শক্ত প্রমাণ নেই এবং ইনভেস্টিগেশনের জন্য তার আরও সময় প্রয়োজন। এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা কেসের প্রথমদিন তাকে অনেকটা নাজেহাল লাগল।

শেষদিকে অনেকটা শেষ ভরসার মতো করে সে আলীর মতো বয়ষ্ক লোকের পক্ষে একটা ডেডবডি উঠিয়ে সমস্ত কিছু ক্লিন করা অসম্ভব— এমন যুক্তি উত্থাপন করল। যদিও তার সেই যুক্তিকে প্রসিকিউটর বদরুল রহমান উড়িয়ে দিলেন। তার ধারণামতে এই কাজে আলীকে আরও কয়েকজন সহায়তা করেছেন। তবু মোটিভ অব মার্ডার ক্লিয়ার করতে না পারায় তার অভিযোগকেও শুধুমাত্র ধারণা হিসেবে গ্রহণ করা হলো। সুযোগ পেয়ে আলীর আর্থ্রাইটিস সমস্যার মেডিকেল সার্টিফিকেট সাবমিট করে তার জামিনের আবেদন করল শেহজাদ। আলীর বিরুদ্ধে খু’নের অকাট্য প্রমাণ না থাকায় তার জামিনের আবেদন মঞ্জুর করা হল।

কোর্টে উপস্থিত ইন্সপেক্টর মোয়াজ্জেম আর বিপক্ষ দলের উকিলের মুখে তখন বিজয়ের হাসি। প্রথমবারের মতো তাদের মনে হলো শেহজাদ মূর্তজা নাকানিচুবানি খাচ্ছে। বদরুল রহমান বয়সে শেহজাদের থেকে অনেকটাই এগিয়ে। চল্লিশের কিছু ওপারে হয়তো। প্রথমদিনই শেহজাদকে এমন আটকাতে পেরে তাকে বেশ গর্বিত মনে হল। তিনি শেহজাদের দিকে তাকিয়ে এমন একটা ভাব করলেন যেন শেহজাদের ডানা কেটে দিয়েছেন। অথচ কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াও প্রথমদিন হিসেবে শেহজাদ এগিয়ে। তার মক্কেলের জামিনও কার্যকর হয়েছে। তবু মামলার অগ্রগতির সুবিধার্থে আরো কিছু সময় দিয়ে আগামী সপ্তাহে দ্বিতীয় শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হলো।

কোর্ট থেকে বের হতেই শেহজাদকে আবারো সাংবাদিকরা ঘিরে ধরল। চারদিকের ক্রমাগত ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানিতে তার মাথাব্যথা বাড়তে শুরু করল। রিপোর্টারদের প্রশ্নগুলো একের পর এক তীরের মতো ছুটে আসতে লাগল।

"অ্যাডভোকেট মূর্তজা, আপনার মতো একজন ডাকাবুকো ল'ইয়ার আজ কোর্টে কোনো শক্ত প্রমাণই পেশ করতে পারলেন না! আপনি কি তবে কেসটা হেরে যাচ্ছেন?"

"কোনো রকম শক্ত প্রমাণ ছাড়াই আপনি এই কেসটা হাতে নিয়েছেন। তবে কি আপনিও মনে করেন, গরীব মানেই নির্দোষ?"

"আজ কোর্টে আপনার নিশ্চুপতাকে ঘিরে নানা গুঞ্জন উঠেছে। বিরোধী পক্ষের উকিল দাবি করছেন, তার হাত ধরেই আপনার প্রাইম টাইম ফুরিয়ে আসছে। এই ব্যাপারে আপনার কী মত?”

মিডিয়ার এহেন অপমানজনক আর উসকানিমূলক প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর শেহজাদের কাছে নেই। সে শক্ত চোয়ালে একভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে একটা রোদচশমা। চশমাটা না থাকলেই তারা দেখতে পেত, শেহজাদের র'ক্তাভ দৃষ্টির ধার। তন্ময় সঠিক সময়ে গাড়িটা নিয়ে কোর্টের গেটে চলে আসলে শেহজাদ দ্রুত ভিড় ঠেলে গাড়িতে উঠে বসে।

গাড়ির চলন্ত এসিও আজ তাকে ঠান্ডা করতে পারছে না। সে ঘামছে কুল কল করে। তন্ময় শুকনো ঢোক গিলে শেহজাদের দিকে তাকাল। গাড়িতে বসেই সে রোদচশমাটা খুলে ফেলেছে। এই মুহূর্তে তাকে দেখতে ভয়ংকর লাগছে। তন্ময় দুরুদুরু বুকে গাড়ি চালাচ্ছে। মনে হচ্ছে, যখন তখন কানের সামনে একটা বো'মা ফাটবে।

শেহজাদ চোখ দুটো বুজে হেলান দিল। দরাজ গলায় জানতে চাইল,

“মিস রোদসী এখন কোথায়?”

“তার এখন অফিসে থাকার কথা।”

শেহজাদ চোখ বন্ধ রেখেই শ্লেষাত্মক হাসল। মেয়েটা তার আন্ডারে কাজ করে, শুধুমাত্রই একজন বেতনভুক্ত জুনিয়র। অথচ সে নিজের মতো ডিসিশন নিয়ে, অফিসে বসে চিরকুট দিয়ে তার বসকে গাইড করছে! তার কি এখন অফিসে থাকার কথা? সে যদি অফিসেই থাকবে তবে তাকে এসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ফায়দা কী হলো?

আধঘণ্টার মাঝেই শেহজাদের গাড়িটা "দ্য থার্ড আই" এর নিচে এসে পৌঁছাল। শেহজাদ গাড়ি থেকে নেমে লম্বা লম্বা পা ফেলে ভেতরের দিকে গেল। লিফটের বাটনে তার অধৈর্য্য বল প্রয়োগ দেখে তন্ময় গুটিয়ে গেল। তার কেন যেন মনে হচ্ছে, আজ অফিসে ঝড় উঠবে। যেন তেন ঝড় নয়, একেবারে সুনামি।

শেহজাদ চেম্বারে ঢুকে দেখল, রোদসী তার নিজের ডেস্কে বসে অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে ল্যাপটপে কাজ করছে। কারো ভেতরে ঢোকার আওয়াজ পেয়েও সে ঘাড় ঘুরায়নি। তাকে দেখতে বেশ ফুরফুরে লাগছে, কোনোভাবে মনেই হচ্ছে না—সে এতো বড় একটা অন্যায় করেছে। আজও মেয়েটা চশমা পড়েনি। কাজ করছে কপাল কুঁচকে। মাথার ব্যান্ডেজটাও বোধহয় বদলায়নি। গতরাতে শেহজাদের বেঁধে দেওয়া ব্যান্ডেজটাই শোভা পাচ্ছে কপালে। শেহজাদ গটগট করে হেঁটে রোদসীর ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়াল। দুই হাত ডেস্কের ওপর শক্ত করে রেখে তার মনোযোগ আকর্ষণ করল। গমগমে গলায় বলল,

"হোয়াট দ্য হেল ওয়াজ দ্যাট?”

শেহজাদের আচানক হুংকারে চেম্বারের নীরবতা বিদীর্ণ হলো। রোদসী মাথা ওঠাল না। সে একভাবে ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। শেহজাদ তার ভাবলেশহীনতায় আরও অধৈর্য্য হলো। শব্দ করে ল্যাপটপটা বন্ধ করল একহাতে। অন্য হাত তখনো তার ডেস্কে। দ্বিতীয় দফায় ক্ষোভ ঝারল সে,

“আপনি কি ভুলে গেছেন? ইউ আর জাস্ট মাই অ্যাসিস্ট্যান্ট, নট এ্যান ইনস্ট্রাক্টর! আমি কোর্টে কী করব না করব সেটা ঠিক করার আপনি কে? হু ডু ইউ থিংক ইউ আর?”

চলবে….

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 12 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন