ফন্ট সাইজ:
থিম:
তবুও জোছনা নামে

পর্ব 14

লেখক: বর্ণপ্রিয়া

#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_১৪

[গল্পের প্রয়োজনে কিছু অসংলগ্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। গল্পের মাধ্যমে কোনোভাবেই এগুলোর প্রচার করা আমার উদ্দেশ্য নয়।]

“কোর্টে যেতে পারব না? কেন? টায়ার পাংচার হয়েছে?”

শেহজাদের হাতের কাজ ততক্ষণে শেষ। বক্সটা জায়গামতো রাখতে রাখতে কৌতুক গলায় জবাব দিল সে। তার বিকারহীনতায় তন্ময় এবার ব্যস্ত হয়ে উঠলো। বলল,

“স্যার, কালকের কেসটা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় ঝড় উঠেছে।”

রোদসী চমকে উঠল। তড়িঘড়ি ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রল করলে একে একে চোখে এল অদ্ভুত সব পোস্ট। দেশের অন্যতম বড় কয়েকটা নিউজ পোর্টাল এবং লিগ্যাল ফোরামের পেজগুলোতে শেহজাদকে নিয়ে আড়ম্বরপূর্ণ সব হেডলাইন।

"অ্যাডভোকেট শেহজাদ মূর্তজা কি তবে ফুরিয়ে এলেন? হাই-প্রোফাইল মার্ডার মিস্ট্রি সলভ করতে না পেরে, এখন মান বাঁচাতে ফ্যামিলি কোর্টের ছোটখাটো কেস নিচ্ছেন কর্পোরেট ল'ইয়ার!"

আরেকটা পোস্টে লেখা,

"খুনিদের কাছে বিক্রি হয়ে গেলেন শেহজাদ? নাকি সাধারণ এক ডিভোর্স কেসে ব্যস্ত হয়ে মির্জা কামরুলের মার্ডার কেসটা ধামাচাপা দিতে চাইছেন?"

কমেন্ট বক্সগুলো আরও জঘন্য। সেখানে শেহজাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, তাকে কাপুরুষ, বিক্রি হয়ে যাওয়া উকিল বলে রীতিমতো গালি দেওয়া হচ্ছে। কেউ যে ইচ্ছে আইটি সেলে বেশ মোটা অঙ্কের টাকা ঢেলে বট আইডির মাধ্যমে এই প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে, তা বুঝতে সময় লাগার কথা নয়। শেহজাদ পোস্টগুলো দেখেনি, কমেন্ট বক্সের হালও তার অজানা। তাই তাকে বেশ স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। তন্ময় তখনও একভাবে দাঁড়িয়ে আছে। শেহজাদ খুলে রাখা ডায়রিতে কিছু লিখছে, কাজে পূর্ণ মনোযোগ রেখেই সে ঠান্ডা গলায় বলল,

“এটা খুব প্রেডিক্টেবল ঘটনা। এতে এতো অবাক হওয়ার কিছু নেই। আজকাল কাউকে আক্রমণ করার সহজ উপায় সাইবার বুলিং।”

রোদসী ফোন রেখে সরু চোখে শেহজাদকে দেখছে। লোকটাকে একবারের জন্যেও সোশাল মিডিয়ায় কী চলছে তা নিয়ে আগ্রহী দেখা যাচ্ছে না। অথচ তন্ময়ের নাভিশ্বাস দশা। শেহজাদকে সতর্ক করতে সে আবারও বলল,

“আপনি বুঝতে পারছেন না, স্যার। গত দু'ঘন্টায় ব্যাপারটা যেভাবে ছড়াচ্ছে, রাতারাতি ব্যাপারটা ট্রেন্ডিং এও চলে আসতে পারে। আর এমন কিছু হলে কাল অফিস এবং আদালতের সামনে উত্তেজিত জনগণ ভিড় জমাবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে গেলে…”

এই পর্যায়ে তন্ময়কে থামিয়ে দিল রোদসী। কয়েক কদম এগিয়ে কিছুটা সামনে এসে দাঁড়াল। বলল,

“পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাহিরেই যাওয়া উচিত।”

শেহজাদ লেখা থামাল। এক ভ্রু উঁচিয়ে রোদসীর দিকে তাকাল। মেয়েটি তন্ময়ের দিকে ফিরে আছে। তাই তার মুখাবয়ব দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। সে শুধু শুনতে পেল,

“তবেই না প্যারা লিগ্যাল এক্সিকিউটিভ হিসেবে আপনি আপনার দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাবেন!”

তন্ময় ভড়কাল। তার চোখে মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেছে। রোদসী তাকে আরেকটু ভয় দেখাতে বলল,

“কাল অফিস কিংবা কোর্টের সামনে ভিড় জমে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে, সেটা সামলাবেন আপনি। কারণ এটা আপনারই কাজ। আর এই কাজের জন্য প্যানিক করে স্যারের কাছে এসে নালিশ দেওয়া বাচ্চামো। বি প্রফেশনাল, ওকে?”

তন্ময় বোধহয় একটা ধাক্কা মতো খেলো। মাস ছয়েক আগে এসিসট্যান্ট হিসেবে যোগদান করতে এলেও তার অপটু কাজকর্মের জন্যই স্যার তাকে এসিস্ট্যান্ট হিসেবে রাখেননি। মাঝেমধ্যে তার নিজেকে রানার মনে হয়। শুধুমাত্র ফাইলপত্র আনা নেওয়া ছাড়া তেমন কোনো কঠিন কাজ তাকে দেওয়া হতো না। আস্তে আস্তে স্যার তাকে সোশাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন। নতুন এসিস্ট্যান্ট আসার পর তাকে একদিন ফিল্ডের কাজেও সুযোগ দিয়েছেন, অথচ সে? সে সেদিন ঐ লোকের গলা কা'টা লা'শ দেখে বমি করে সব ভাসিয়েছে। পদে পদে নিজেকে অযোগ্য প্রমাণ করে সে কি নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মারছে? ল' নিয়ে পড়াশোনা করেও কথায় কথায় প্যানিক করে ফেলে সে। এর জন্য কাঠখোট্টা স্যারও কখনো কিছু বলেননি। কিন্তু স্যারের এসিস্ট্যান্ট আজ তাকে কড়া দুটো কথা বলেছে। এবং এই কথার পরেও নিজেকে দুর্বল রূপে উপস্থাপন করা অপমানজনক। নিজেকে সামলে নিল তন্ময়। খানিকটা গলার জোর এনে বলল,

“আমি প্যানিক করছিলাম না, ম্যাডাম। আমি শুধু স্যারকে সাবধান করতে চেয়েছি।”

তন্ময়ের জবাব শুনতেই শেহজাদের অধরযুগল প্রশস্ত হলো। মনে হলো, রোদসীর ছোঁয়ায় তন্ময়ের মতো অকালকুষ্মাণ্ড ছেলেটাও শক্ত হতে শুরু করেছে। সেই প্রসন্নতা সে চেপে গেল। বলল,

“ওয়েল, তাহলে কাল কোর্টে আমরা আলাদা আলাদা যাব। যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তৈরি হলেও সেটা ভিক্টিমের মেন্টাল হেলথে এফেক্ট না করে। তন্ময়…”

“জি, স্যার!”

“তুমি রোদসী আর তার মাকে নিয়ে একটু পর যাবে। এতে ভিড়ভাট্টা সব এড়ানো সহজ হবে। গট ইট?”

তন্ময় মাথা নেড়ে চটজলদি বেরিয়ে গেল। তাকে দেখে মনে হলো, রোদসী আর শেহজাদের তোপের মুখ থেকে বাঁচতে পারাটাই এখন তার মুখ্য কাজ। শেহজাদের লেখা শেষ হয়েছে। সে ডায়রির পাতাটা ছিঁড়ে রোদসীর দিকে এগিয়ে দিল। রোদসী কাগজটায় চোখ বুলিয়ে কয়েকটা সম্ভাব্য প্রশ্ন দেখল। শেহজাদ তাকে বুঝিয়ে দেওয়ার মতো করে বলল,

“প্রথম শুনানি হিসেবে আগামীকাল টুকটাক প্রশ্ন করা হবে। বিপক্ষের উকিল চল্লিশোর্ধ্ব আলমগীর কবির। কবির সাহেব তার রূঢ় আচরণের জন্য কুখ্যাত। আপনার বাবা তাকে কেন এপোয়েন্ট করেছেন তা নিশ্চয়ই ভেঙে বলতে হবে না?”

“আমি রাতেই আম্মুকে প্রশ্নগুলো বুঝিয়ে বলব।”

শেহজাদ কিছুক্ষণ থামল। অতঃপর নিচু গলায় বলল,

“জবাব গুলোও একটু বুঝিয়ে দিবেন। নয়তো আমাদের কেসটা শুরুতেই দুর্বল হয়ে উঠবে। গতকাল আমি আসলে এই বিষয়ক আলোচনার জন্যই গিয়েছিলাম। তা যেহেতু করা হয়নি, তাই ব্যাপারটা এবার আপনাকেই দেখতে হবে।”

শেহজাদের এবারের কথাটা রোদসীর কাছে অনেকটা কৈফিয়তের মতো শোনাল। স্মিত হেসে সে শ্লেষাত্মক গলায় বলল,

“জবাব শিখিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। যা কিছু সত্য, তিনি তাই বলবেন।”

শেহজাদ থতমত খেল। সে কখন মিথ্যে জবাব শেখাবার ইঙ্গিত দিয়েছে? সে শুধুমাত্র মানসিকভাবে রূঢ় প্রশ্নগুলোর জন্য প্রস্তুত থেকে জবাব দেওয়ার ব্যাপারটায় জোর দিয়েছে।

“আমি মিথ্যা বলার কথা বলিনি, কবির সাহেবের আক্রমণকে স্মার্টলি হ্যান্ডেল করার কথা বলেছি।”

“সত্যি সবসময়ই পরিষ্কার। তাকে আলাদা করে রঙ চঙ মেখে স্মার্ট ওয়েতে উপস্থাপন না করলেও, দিনশেষে সেই জিতবে।”

শেহজাদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আপাতত মেয়েটার সাথে তর্ক করার ইচ্ছে হচ্ছে না। একটু ঘুমাতে হবে। ভাবতে হবে আগামীকালের শুনানি সম্পর্কে। তার আগে আরও কিছু কাজ সারতে হবে। শেহজাদ যাওয়ার পথে তন্ময়কে বলল,

"তুমি এখনই তেজগাঁওয়ের স্টেডফাস্ট কুরিয়ারের মেইন হাবে যাবে। আমি গতকাল রাতে হাব ম্যানেজারের সাথে কথা বলে এসেছি। তুমি জাস্ট গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজের পেনড্রাইভটা কালেক্ট করে আনবে।”

তন্ময় দ্রুত মাথা নাড়ল। আজ তাকে বেশ একটিভ লাগছে। শেহজাদ তন্ময়কে কাজ বুঝিয়ে বের হতে নিয়েও কেন যেন অফিসে ফিরে আসল। রোদসী তখন সবে ব্যাগ গুছিয়ে উঠেছে। তাকে দরজার সামনে এগোতে দেখে শেহজাদ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

“টুমোরো ডোন্ট ডু এনিথিং উইদআউট ইনফরমিং মি।”

আকস্মিক এমন কথা শুনে রোদসী হতভম্ব হলো। তাকে সেভাবে রেখেই শেহজাদ বেরিয়ে এল। গাড়িতে বসে স্টার্ট দেওয়ার আগেই সে তার ব্লুটুথ হেডপিসে অত্যন্ত গোপনীয় একটা কল কানেক্ট করল। কঠোর গলায় জানতে চাইল,

“অল সেট?”

“স্যার, আপনি অযথাই ভয় পাচ্ছেন। ইন্সপেক্টর মোয়াজ্জেম টেকনোলজিতে বড্ড কাঁচা। এতো দূর তিনি হয়তো ভাববেনও না।”

শেহজাদের গলার স্বর এবার ধারালো হয়ে উঠল,

“তিনি ভাববেন কি না ভাববেন, তা তো তোমার জানার দরকার নেই। তোমাকে যেই কাজ দিয়েছি, তুমি সেটা ঠিকঠাক করো।”

শেহজাদের ধমক খেয়ে ওপাশের পুরুষ কণ্ঠটি এবার ব্যস্ত হলো। সাফাই গাওয়ার মতো করে বলল,

“আমি আমার কাজ শেষ করেছি, স্যার। আপনি চিন্তা করবেন না। আপনার ফোন নাম্বার এখন স্পুফ করা আছে। আমি প্রতি ত্রিশ সেকেন্ড পরপর আইপি বাউন্স করাচ্ছি। ইন্সপেক্টর মোয়াজ্জেম কেন, এবার সাইবার ক্রাইম ইউনিটও আপনার কল লিস্ট বা অরিজিনাল লোকেশন ট্রেস করতে পারবে না।”

শেহজাদের ঠোঁটের কোণে এবার হাসি ফুটে উঠল। কোনো একটা দুশ্চিন্তা কাটিয়ে উঠলে মানুষ যেমন সহজ হয়, তাকেও তেমন নিশ্চিন্ত লাগলো। অস্ফুটে বলল,

“গুড জব!”

কল কেটে হাতের কাজ সেরে শেহজাদ যখন বাড়ি পৌঁছাল ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা বেজে তিন মিনিট। ফরিদা বেগম জেগেই ছিলেন। ছেলের ক্লান্ত মুখটা দেখে তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, বললেন,

“তোর চোখমুখ তো বসে গেছে রে! কী হাল করেছিস নিজের?”

শেহজাদ এগিয়ে গিয়ে মাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল। বুক ভরে শ্বাস নিতেই মনে হলো সারাদিনের সমস্ত ধকল এক চুটকিতে গায়েব হয়েছে। মাকে জড়িয়ে রেখেই সে ফিসফিস করে বলল,

“আমার খুব ঘুম পাচ্ছে মা, আমি আজ ঘুমাবো। অনেক্ষণ ঘুমাবো। কেমন?”

ঘুমের কথা বলে ঘরে এলেও শেহজাদ ঘুমালো না। আধঘন্টারও বেশি সময় নিয়ে শাওয়ার করল। সচরাচর সে এতো সময় নিয়ে শাওয়ার নেয় না। কিন্তু আজ কেন যেন নিল। শাওয়ার শেষে ডাইনিং টেবিলে এসে বসতেই তার নাকে ভিড়ল একটা পরিচিত সুঘ্রাণ। মায়ের হাতের ঘন ডাল আর শুকনা মরিচ দিয়ে মাখানো আলুভর্তা। কর্পোরেট লাঞ্চ বা ক্যাফের দামি খাবারের চেয়ে এই সাদামাটা খাবারটাই শেহজাদের সবচেয়ে বেশি পছন্দ। বরাবরের মতোই সে তৃপ্তি করে খেল। খাওয়া শেষে ওঠার সময় সে ফরিদা বেগমকে বলল,

“মা, তোমার হাতের ডালের কোনো তুলনাই নেই। মাঝে মাঝে মনে হয়, এসব কেস টেস ছেড়ে ব্যবসা শুরু করি। তুমি এমন মজার মজার খাবার রাঁধবে, আমি আর বাবা মিলে সেগুলো বিক্রি করবো।”

ফরিদা বেগম সন্দেহের চোখে তাকালেন পুত্রর দিকে। আজ ছেলেকে কেমন অস্বাভাবিক লাগছে। বাবার মতো মজাও করছে। সমস্যা কী? কেস টেস জিতে ফিরেছে নাকি?

“এতো আহ্লাদ দেখাচ্ছিস যে? ঘটনা কী?”

শেহজাদ হাত ধুতে ধুতে বলল,

“কোনো ঘটনা টটনা নেই। আজ একটু আহ্লাদ দেখাতে ইচ্ছে করলো, তাই দেখালাম।”

ফরিদা বেগম পুত্রের সেই কথা খুব একটা বিশ্বাস করলেন না। শেহজাদ হাত ধুয়ে ঘরে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল,

“আমি ঘুমাতে যাচ্ছি, মা। জরুরি কিছু না হলে ডেকো না।”

ফরিদা বেগমের নিকট সবটাই কেমন ধোঁয়াশা লাগলো। তিনি ছুটলেন স্বামীর কাছে এই রহস্যের সমাধান খুঁজতে। এনায়েত মূর্তজা তখন ঘরে হাঁটু গেঁড়ে বসে কী এক ব্যায়াম করছিলেন। ফরিদা বেগমকে আসতে দেখেই তিনি উঠে বসলেন। বললেন,

“এমন ছোটাছুটি করছ কেন? পড়ে গিয়ে মাজা ভাঙবে নাকি?”

“আর মাজা! তোমরা বাপ ব্যাটা মিলে আমায় দুদন্ড শান্তি দাও কখনো?”

“আমি? আমি আবার কী করলাম?”

“কী করলে? বুড়ো বয়সে হাড় ভাঙতে কিসব ইয়োগা ফিয়োগা শুরু করেছ। আবার বলছ, আমি আবার কী করলাম?”

এনায়েত মূর্তজা দাঁত বের করে হাসলেন। এগিয়ে এসে বধূর কাঁধে হাত রেখে হাঁটতে হাঁটতে বললেন,

“তোমার মতোন সুন্দরীর পাশে নিজেকে ফিট না রেখে উপায় আছে?”

ফরিদা বেগম সরু চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন। শুধালেন,

“বাপ ব্যাটার আজ হলো কী বলো তো? দুটোতে এমন আহ্লাদ দেখাচ্ছ কেন?”

“আহ্লাদ! ঐ রোবটটা আবার আহ্লাদও করে! কীসব বলছ?”

ফরিদা বেগম আয়োজন করে এতোক্ষণের ঘটনা খুলে বললেন। সেসব শুনে এনায়েত মূর্তজা বেশ কিছুক্ষণ ভাবুক হয়ে বসে রইলেন। অতঃপর মাথা নেড়ে বললেন,

“আমাদের পুত্র এবার সত্যি সত্যি প্রেমে পড়েছে, বুঝলে?”

__

রাত তখন প্রায় একটা। পুরো বাড়ি মোটামুটি নিস্তব্ধ। স্বামীর সাথে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করে ফরিদা বেগমের গলা শুকিয়ে গেছে। তিনি পানি খাওয়ার জন্য কিচেনের দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তার নজর গেল শেহজাদের রুমের দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে আসা আলোর রেখার দিকে। শেহজাদ বলেছিল ঘুমাবে, তাহলে এখনো আলো জ্বলছে কেন? আবার বাতি জ্বালিয়েই ঘুমিয়ে গেলো নাকি? ফরিদা বেগম বাতি নেভানোর উদ্দেশ্যে দরজার কাছে গেলেন। দরজাটা সামান্য ভেজানো ছিল। ফাঁকা অংশ দিয়ে উঁকি দিতেই তার আশ্চর্যের সীমা রইল না।

শেহজাদ ঘুমাচ্ছে না। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে কিসব কাগজ। সে অদ্ভুত ভঙ্গিতে আয়নার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করছে। দেখে মনে হচ্ছে, সে হয়তো কিছু অনুশীলন করছে। তার মুখাবয়ব প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে। একবার মনে হচ্ছে সে ভীষণ বিরক্ত, পরক্ষণেই সে তাচ্ছিল্য করে হাসছে। ফরিদা বেগম আর থাকতে পারলেন না। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। কৌতুহল নিয়ে শুধালেন,

“এ কী! মাঝরাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একা একা কথা বলছিস কেন? সত্যি সত্যি প্রেমে পড়লি নাকি?”

শেহজাদ চমকে পেছনে ঘুরল। হুটহাট মাকে আসতে দেখে খানিকটা ভড়কেও গেল। নিজেকে সামলে হাতের কাগজগুলো বিছানায় রাখল। সহজ গলায় বলল,

“প্রেম নয় মা, সাইকোলজি।”

ফরিদা বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। শেহজাদ তাকে বুঝিয়ে বলল,

“তুমি তো জানোই মা, কাল আমার ফ্যামিলি কোর্টে প্রথম শুনানি। ফ্যামিলি কোর্টের পরিবেশ জজকোর্টের মতো নয়। আমার প্রতিপক্ষও কোনো সাধারণ মানুষ নয়। তাই..”

“প্র্যাকটিস করছিলি?”

শেহজাদ হেসে ফেলল। মাথা নেড়ে মায়ের কথা সায় দিলো। ফরিদা বেগমের আশ্চর্য তাতে একটুও কমলো না। তিনি একভাবে তাকিয়ে থেকে বললেন,

“তুই কবে থেকে কোর্টে যাওয়ার আগে প্র্যাকটিস করা শুরু করেছিস?”

শেহজাদ মাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো। দু'হাত তুলে তার সন্দেহ কাটাতে ভেঙে বলল,

“আমার প্রতিপক্ষ একটা অমানুষ। এমন মানুষকে হারাতে হলে একটু প্র্যাকটিস তো করতেই হবে বলো!”

“সেসব আমি জানি না। আমি শুধু জানি, তোকে আজ অন্যরকম লাগছে। একবার খুশি হচ্ছিস আবার ঘরের মধ্যে পাগলের মতো কীসব প্র্যাকটিসও করছিস। মনে হচ্ছে, তোর বাপ ঠিক কথাই বলেছে।”

“কী বলেছে?”

“বলেছে, ঠিক সময়ে বিয়ে দিচ্ছি না বলে, ক'দিন পর তুই সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত পাগল হবি।”

শেহজাদ হতবিহ্বল চোখে মায়ের দিকে তাকালো। বাবার পাল্লায় পড়ে মায়েরও কি আজকাল বিয়ে করানোর ভূত চেপেছে? নিজেকে সামলে সে মাকে ঠেলে দরজার কাছে নিয়ে গেল। বলল,

“ঘাট হয়েছে আমার। আর করব না প্র্যাকটিস। যাও, এবার অন্তত ঘুমাও। এসব ভেবে শুধু শুধু রাতের ঘুম নষ্ট করো না।”

ফরিদা বেগম ছেলের কথাকে মূল্য দিলেন না। বললেন,

“তোর এসব ছাইপাঁশ প্র্যাকটিস করতেও হবে না। ওসব এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। তুই যা পারার এমনিতেই পারবি। এখন চুপচাপ এসে শুয়ে পড় দেখি, আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।”

শেহজাদ এবার আর মানা করলো না। বাধ্য ছেলের মতো বিছানার এককোণে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লো। ফরিদা বেগম চিন্তিত মনে ছেলের মাথায় বিলি কাটলেন। একটামাত্র ছেলে তার, এসব কেস টেসের চক্করে সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাবে না তো?

___

ঢাকা ফ্যামিলি কোর্টের তিন নম্বর এজলাসের বাইরে আজ হুলুস্থুল কাণ্ড। শেহজাদ তার গতকালের পরিকল্পনা মতো এগিয়েছে। কোর্টে এসেছে ঘন্টা দুয়েক আগে। সেই সুবাদে মিডিয়া তাকে ঘেরাও করতে পারেনি। ওদিকে তন্ময়, রোদসীদের নিয়ে সিএনজি করে আসছে। রোদসীর মাকেও হয়তো কোনো ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না।

শেহজাদের পরিকল্পনা ঠিকঠাক কাজে দিলো। রোদসীরা নির্বিঘ্নে কোর্টে এসে পৌঁছাল। কোর্টরুমে ঢোকার ঠিক আগ মুহূর্তে শেহজাদ থমকে দাঁড়াল। শেষবারের মতো সতর্ক করে বলল,

“আজ আপনি গতকালের মতো কোনো ছেলেমানুষি করবেন না।”

রোদসী মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করে বলল,

“করব না স্যার। আমি জানি, এই লোকটার সাইকোলজি আলাদা। সে বরাবরই জিতে অভ্যস্ত। তাকে নতুন করে জয়ী হওয়ার স্বাদ দিলে বদলাবে না কিছুই।”

শেহজাদ সন্তুষ্ট হলো। আজকের কেসটা সে নিজের মতো হ্যান্ডেল করতে চায়। রোদসী সেখানে উল্টোপাল্টা কিছু করে ফেললে কাজটা কঠিন হয়ে যাবে। শেহজাদ রোদসীর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছে। মেয়েটা আজ প্রথমবারের মতো কালো কোট জড়িয়েছে গায়ে, চুলগুলো বেঁধেছে পনিটেল করে। বলা বাহুল্য, প্রথমদিন হিসেবে বেশ গুছিয়েই এসেছে। চোখে একটা নতুন চশমা পরেছে। এই মেরুন রঙা ফ্রেমটায় তাকে যেন অন্যদিকের চেয়ে বেশি সুন্দর লাগছে। কপালের ব্যান্ডেজটা খুলে সেখানে ছোট্ট একটা ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ লাগিয়েছে সে। শেহজাদ ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে ভেতরে প্রবেশ করল। ঢোকার আগে নিচু গলায় বলল,

“ইট'স ইয়োর ফার্স্ট ডে এ্যাট কোর্ট। নক ‘এম ডেড!”

জামিল ব্যাপারী কোর্টে এসেছেন। তার পরনে আজ একটা ঘিয়ে রঙা শার্ট আর কালো প্যান্ট। চোখে রিমলেস চশমা। গালের ভেতর উঁকি দিচ্ছে কাঁচা-পাকা দাড়ি। তিনি বারবার রুমানা খাতুনের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন, তাকে দেখে মনে হচ্ছে, তিনি স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল।

কেস শুরু হতেই আলমগীর কবির প্রথম আক্রমণ করেন রোদসীকে। বলেন,

“ইয়োর অনার, আমার মক্কেল অত্যন্ত সাধারণ এবং পরহেজগার একজন মানুষ। তার স্ত্রী রুমানা খাতুনকে তিনি এতোগুলো বছর ধরে সম্মানের সাথে নিজের কাছে রেখেছেন। তাদের একমাত্র সন্তান রোদসী, তাদের ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, ইদানীং তার মেয়ে শহরের একটা কর্পোরেট ল' ফার্মে কাজ করছে। সে বাইরের দুনিয়ার চাকচিক্যে মেতে উঠে তার মাকে ভুল বুঝিয়ে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে গেছে। তার বাড়াবাড়িতেই এই ডিভোর্স কেস চালু হয়েছে। আমার মক্কেল তার স্ত্রীকে ভালোবাসেন, তিনি কোনোভাবেই এই ডিভোর্স দিতে রাজি নন।”

শেহজাদ চট করেই উঠে দাঁড়াল। গমগমে স্বরে বলল,

“অবজেকশন ইওর অনার! সন্তান কখনোই ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি হতে পারে না। মেয়ে সন্তান তো আরও আগে নয়। এমন মেয়ে, যে নিজেই বাবা-মার বিরুদ্ধে কেস ফাইল করে, তাকে ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি বলাটা নেহাতই ভুল।”

এতোটুকু বলেই সে জামিল ব্যাপারীর দিকে তাকাল। অতিষ্ঠ গলায় বলল,

“বিগত কয়েক দিনেই আপনার মেয়ের উপর আমি বিরক্ত। যখন তখন যা মন চায় তাই করে আমার কালঘাম ছুটিয়ে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই আমার বস। আমি শুধু তার কর্মচারী। এমন মেয়েকে আপনি আপনার ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি মানেন?”

জামিল ব্যাপারী প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

“ওর মাথায় সমস্যা আছে। আমি তো আপনাকে আগেই সাবধান করেছিলাম।”

জজ সাহেবা বাধা দিলেন। জজের আসনে আজ বসে আছেন সৈয়দা জাহানারা। একজন মহিলা জজের সামনেই মেয়েদের নিচু করে কথা বলতে দেখে তিনি আশ্চর্য হলেন। জানতে চাইলেন,

“অ্যাডভোকেট মূর্তজা! হ্যাভ ইউ লস্ট ইয়োর মাইন্ড? আপনি কোর্টরুমে দাঁড়িয়ে মেয়েদের এভাবে অসম্মান করতে পারেন না।”

শেহজাদ মাথা নিচু করে ক্ষমা চাইল, বলল,

“আ'ম সরি, ইয়োর অনার। তবে এই কথা সত্য যে, আমি যা বলেছি তা একদমই সঠিক। আমি আমার নতুন এসিসট্যান্টকে নিয়ে এতোটাই বিড়ম্বনায় আছি যে মনে হচ্ছে, এজন্যই হয়তো বলা হয়—নারীদের বেশি উড়তে দিতে নেই। বেশি উড়লেই এরা নিজেদের গন্ডি ভুলে যায়। সবভাবে চেষ্টা করে পুরুষকে ছোট দেখাতে। আর এমন মেয়েরাই একসময় স্বাধীনতা পেয়ে স্বামীর টুঁটি চেপে ধরে। বড় গলায় ডিভোর্স চায়।”

মুহূর্তেই কোর্টরুমে গুঞ্জন শুরু হলো। ডিভোর্স কেস ফাইল করা উকিল নিজেই এখন কোর্টে দাঁড়িয়ে তার মক্কেলের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। এ আবার কেমন কথা! রাতারাতি তার মনোভাব বদলে গেল নাকি? শেহজাদের আচানক আক্রমণে রোদসী প্রথমে চমকে উঠলেও পরক্ষণেই ব্যাপারটা ধরে ফেলল। মাথা নিচু করে সে হাসি হাসি মুখটা আড়াল করল।

কাঠগড়ায় দাঁড়ানো জামিল ব্যাপারীর চোখেমুখে এবার একটা অদ্ভুত পরিবর্তন এল। শেহজাদের পুরুষতান্ত্রিক কথাগুলো জামিল ব্যাপারীর ভেতরের আসল পশুটাকে সুড়সুড়ি দিয়ে জাগিয়ে তুলল। সে দেখল, শেহজাদ মূর্তজার মতো এত বড় উকিলও মেয়েদের ঠিক তার মতোই 'পায়ের জুতো' মনে করে। তার ভেতরের ইগো আর অহংকার এবার আর আড়ালে রইল না। সে ভাবল শেহজাদ তার মতোই একজন। তাই ঘৃণাভরে বলল,

“শোনেন, মেয়েরা হলো পায়ের জুতা। সেই জুতা আপনি যতো ভালো দাম দিয়েই কিনেন না কেন? তার স্থান শুধুমাত্র পায়ে। আদর করে জুতাকে মাথায় ঠাঁই দিলে ওরা নিজেরে সেরা মনে করে। এই মেয়েরাও ঠিক তেমন। কথায় কথায় এই দাও, ওই দাও। খালি দাও আর দাও। কিন্তু আমার কাছে অবশ্য বেশি সুবিধা করতে পারেনি। বিয়ের পরপরই আমি আমার বউকে শাসন করা শুরু করেছি। একদম সোজা করে ফেলেছি। আমার কথা ছাড়া সে এক পা উঠেওনা, আবার বসেওনা। আফসোস! মেয়েটারে পারলাম না। পড়ালেখার নামে এটা হলো অমানুষ। নিজের মিষ্টি মিষ্টি কথায় সে আমার বউকেও ভুলিয়ে ফেলেছে। ভাবা যায়? আমার খেয়ে আমার পড়ে এখন আমার নামেই মামলা করে। কত্ত বড় সাহস! কু’ত্তার জাত কোথাকার!”

জামিল ব্যাপারী কথাগুলো বলতে বলতেই হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে হঠাৎ করেই রোদসীর দিকে তেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। চিৎকার করে বললেন,

“কু’** বা’চ্চা! তোর জন্য আজকে আমাকে কোর্টে আসতে হলো! তোরে তো আমি আজকে...”

কোর্টে থাকা পুলিশ সদস্যরা প্রায় সাথে সাথেই তাকে আটকে ফেললেন। জজ সৈয়দা জাহানারা হতবাক হয়ে গেলেন। হাতে থাকা কলম দিয়ে টেবিলে মৃদু টোকা দিয়ে হট্টগোল থামাতে বলে উঠলেন, “অর্ডার! অর্ডার!”

বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল পরিবেশ স্বাভাবিক হতে। শেহজাদের মুখের ওই ম্রিয়মাণ ভাবটা হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে। তার জায়গায় ফুটে উঠেছে এক বিজয়ী হাসি।

“ইওর অনার! আপনারা এইমাত্র যা দেখলেন, সেটা কোনো সাধারণ মান-অভিমানের দৃশ্য নয়। এটা একজন সাইকোপ্যাথের স্বীকারোক্তি। যে এইমাত্রই ভরা কোর্টে দাঁড়িয়ে নিজের কন্যাকে মা'রতে উদ্যত হয়, তার সাথে সাতাশটা বছর সংসার জীবন কাটানো কতোটুকু বিষাক্ত তা নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা রাখে না।”

শেহজাদের কথায় জজ সাহেবা গম্ভীর ভাবে মাথা নেড়ে কিসব কাগজে লিখলেন। শেহজাদ একটু দম নিয়েই বলল,

"ইয়োর অনার! আমি আমার ক্লায়েন্টের ডিভোর্স পিটিশনের পাশাপাশি তার স্বামীর বিরুদ্ধে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স তথা পারিবারিক নির্যাতনের একটা ক্রিমিনাল চার্জও আরোপ করছি।”

বিপক্ষ দলের উকিল সাথে সাথেই বাধা দিতে চাইলেন, "অবজেকশন ইওর অনার! এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। উনার ক্লায়েন্ট সাতাশ বছর ধরে জামিল সাহেবের সংসার করেছেন, কই এর আগে তো কোনোদিন নির্যাতনের কথা বলেননি। এই কেস ফাইল করার আগেও তিনি এমন কিছুর অভিযোগ করেননি। তাহলে হঠাৎ এখন কেন এই কথা বলছেন? এই অভিযোগের কোনো মেডিকেল রিপোর্ট বা প্রমাণ কি অ্যাডভোকেট মূর্তজা কোর্টে সাবমিট করতে পারবেন?”

শেহজাদ বিপক্ষ উকিলের চোখে চোখ রেখে তাচ্ছিল্য ভরে হাসল। বলল,

"প্রমাণ? গত সপ্তাহে মশারি টানাতে দেরি হওয়ায় কোর্টরুমের বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা যে তার বউকে চ'ড় মেরেছে তার প্রমাণ কোথায়? এইতো সেদিন তরকারিতে চুল পাওয়ায়, রাগের মাথায় আপনি আপনার স্ত্রীর চুল টেনে দুটো ধাক্কা দিলেন, সেই প্রমাণই বা কে দেবে? ইট’স অবভিয়াস, চার দেয়ালের ভেতরের এই নীরব অত্যাচারগুলোর কোনো কাগুজে প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। সাতাশ বছর ধরে যে নারী সমাজ আর সম্মানের ভয়ে মা’র খেয়ে মুখ বুজে ছিল, আজ সে মুখ খুলছে; এটাই তো সবচেয়ে বড় প্রমাণ।"

বিপক্ষের উকিল আলমগীর কবির এই অপ্রত্যাশিত আক্রমণে রীতিমতো থতমত খেলেন। তবু নিজেকে সামলে তিনি বলে উঠলেন,

“এটা আপনার জজ কোর্ট নয়, অ্যাডভোকেট মূর্তজা। এখানে সম্ভাবনা, কী হয়েছে কিংবা কী হতে পারতো তা ম্যাটার করে না। এখানে ম্যাটার করে প্রমাণ।”

“ওকে ফাইন! আপনার প্রমাণ লাগবে তাইতো? একটু আগে ঘটা ঘটনাটিই আমার প্রমাণ।”

কবির সাহেব ব্যস্ত গলায় বলে উঠলেন, “অবজেকশন ইয়োর অনার! উনি আমার মক্কেলকে উষ্কে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা তৈরি করেছেন। এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে আমার মক্কেলের ওপর নতুন করে কোনো আরোপ লাগানো অনুচিত হবে।”

শেহজাদের মুখের হাসি চওড়া হলো। চোখের চশমা কিছুটা ঠেলে দিয়ে সে হঠাৎ বিনা মেঘে বর্জ্রপাতের মতো বলল,

“ইওর অনার, আমার কাছে এমন একজন আই-উইটনেস বা প্রত্যক্ষদর্শী আছেন, যিনি বিগত বেশ অনেক বছর ধরে ওই চার দেয়ালের ভেতরের প্রতিটি ঘটনার সাক্ষী। আমি জামিল ব্যাপারীর এতো বছরের অন্যায়ের সাক্ষী তার নিজের মেয়ে, মিস রোদসীকে উইটনেস বক্সে ডাকতে চাই।"

জজ সাহেবা সৈয়দা জাহানারা অনুমতি দিলেন। রোদসী উইটনেস বক্সে এসে আনুষ্ঠানিকতা সারলো। তাকে দেখতেই জামিল ব্যাপারী আবারো তেড়ে আসতে চাইলেন। উঁচু গলায় বললেন,

“বাপের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিবি তুই? এই বেয়াদব! কথা বলস না কেন? কথা বল।”

রোদসী হাসছে। তার চোখে মুখে ভীষণ অবজ্ঞা। তার উচাটন বাড়াতে সে বলে উঠল,

“জি, আমি আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেব।”

“তোর মতো কু’লা’ঙ্গারকে জন্মের পরপরই মে'রে ফেললাম না কেন আমি? বে’হায়া বে’জ’ন্মা মেয়ে মানুষ!”

জামিল ব্যাপারীকে আটকানোর চেষ্টা করছেন আলমগীর কবির। তিনি ব্যর্থ, তার বাধা পেরিয়ে তিনি কোর্টরুমে দাঁড়িয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করছেন রোদসীকে। তার উগ্রতা দেখে জজ সাহেবা আর কোনো প্রমাণের অপেক্ষা করলেন না। ডিভোর্সের পাশাপাশি তার নামে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের কেসও চার্জ করলেন। পাশাপাশি একজন উকিল হয়ে এভাবে ভরা আদালতে নারীদের অপমানসূচক কথা বলার জন্য শেহজাদকেও সাবধান করলেন। একজন উকিলের এই ধরণের কথা বলা মোটেও শোভা পায় না বলেও জানালেন, সে যে কোনো উদ্দেশ্যেই হোক না কেন। পরবর্তীতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে তাকে জরিমানা গুনতে হতে পারে বলেও জানালেন। শেষে কোর্টের কলরব নিয়ন্ত্রণে আনতে পরবর্তী শুনানি অবধি মুলতুবি ঘোষণা করে প্রথমদিনের মতো শুনানি শেষ করলেন।

কোর্ট রুম থেকে বের হওয়ার সময় জামিল ব্যাপারী দাঁতে দাঁত চেপে হুংকার দিয়ে গেলেন। শাসালেন শেহজাদকেও। বললেন, “কাজটা ভালো করলেন না, উকিল সাহেব।” শেহজাদ তার সেই কথায় সায় দিয়ে উপর নিচ মাথা দোলাল। বলল, “কী করব বলুন তো? ভালো কাজ করার অভ্যাস নেই।”

রুমানা খাতুন গোটা শুনানিতে হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে বসে থাকলেও শেষবেলায় ফ্যালফ্যাল করে কেঁদে ফেললেন। রোদসীর হাত শক্ত করে ধরে তাকিয়ে থাকলেন স্বামী নামক অমানুষটার দিকে। লোকটা দৃষ্টি সীমানা থেকে সরতেই তিনি নিচু গলায় বললেন,

“পুলিশ ওকে সত্যি সত্যি ধরে নেবে, রোদ?”

রোদসী সেই প্রশ্নের জবাব দিল না। কিছু প্রশ্নের জবাব মুখে দিতে নেই। কাজে করে দেখাতে হয়। এটাও তেমনই একটা প্রশ্ন। কোর্ট থেকে বেরিয়েই শেহজাদ কোথাও একটা গেছে। রোদসী তার এক পরিচিত বান্ধবীকে ডেকে পাঠিয়েছে কোর্টে। মেয়েটার নাম ফিমা। স্কুলে থাকতে তারা একই বাসায় থেকে, একই ক্লাসে পড়াশোনা করেছে। এই মেয়েটি ছাড়া তার বন্ধুতালিকায় আর কেউই নেই। ফিমা স্বভাবে তার একদম উল্টো। রোদসী যতোটা থমকে থাকা মেঘ, সে ততোটাই অবিরাম ঝরতে থাকা বারিধারা। জীবনের প্রতিটি রঙে সে সদাই রঙিন থাকে। ফিমার মন কখনোই খারাপ হয়, রোদসী অন্তত খারাপ হতে দেখেনি। মেয়েটি তাকে কঠিন কঠিন বিপদের সময় চমৎকারভাবে সাহায্য করে। আজও তাকে সাহায্যের জন্যই আনিয়েছে সে। মাকে ফিমার বাসায় কিছুক্ষণ রাখতে বলে নিজে বেরিয়েছে অফিসের উদ্দেশ্যে। আজকাল তার মাকে একা রাখতে ভয় হয়। ধানমন্ডি থেকে মিরপুরের দূরত্বও কম নয়। হুটহাট খারাপ কিছু ঘটলে সে অফিস থেকে বাড়ি পোঁছানোর মতোও সময় পাবে না। এই সমস্যার সমাধানে তাকে এদিকেই বাসা দেখতে হবে। আর বাসা দেখার আগ অবধি মাকে ধানমন্ডির আশপাশেই কোথাও রাখা গেলে নিশ্চিন্তে থাকা যাবে। সকাল সকাল গুছিয়ে বলতেই ফিমা লাফাতে লাফাতে রাজি হয়েছে। মেয়েটার সেমিস্টার ব্রেক চলছে। প্রাইভের ভার্সিটিতে বিবিএ নিয়ে পড়ছে সে। রোদসী একবার বলতেই সারাদিনের একঘেয়েমি কাটাতে রুমানা খাতুনকে সে নিজের কাছে রাখতে রাজি হয়েছে সে।

মাকে ফিমার কাছে দিয়ে রোদসী কোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কালো গাড়িটায় উঠল। দেখল, ভেতরে আগে থেকেই শেহজাদ বসে আছে। সে কেস শেষে কোথায় গেল? আবার এলোই বা কখন তা সে জানতে চাইল না। তন্ময় ইতিমধ্যেই স্টেডফাস্ট কুরিয়ার থেকে কালেক্ট করা সিসিটিভি ফুটেজের ডেটা নিয়ে এসেছে। শেহজাদ গাড়ির মাঝে বসেই ল্যাপটপে তা চালু করল।

“ফুটেজটা ক্লিয়ার। তবে লোকটার মুখে মাস্ক আছে।”

শেহজাদ রোদসীর সেই কথার পিঠে কিছুই বলল না। হুট করেই সে জায়গাটা জুম করতে শুরু করল।

“লোকটার ডান হাতের উল্টো পিঠে একটা বার্ন মার্ক আছে।”

রোদসী মন দিয়ে দেখল। শেহজাদ ঠিকই বলেছে। তবে শুধুমাত্র একটা বার্ন মার্ক দিয়ে একজন অজ্ঞাত লোককে খুঁজে বের করা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই অসম্ভব। শেহজাদ বিরক্ত হয়ে ল্যাপটপটা বন্ধ করলো। শরীর এলিয়ে ঘাড় কাত করে বাহিরে তাকাল। রোদসী তার মতো দমে যেতে পারল না। সে পুনরায় ল্যাপটপটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ঘাঁটাঘাঁটি করল। তারপর অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে একটা ক্লিপে এসে ভিডিওটা পজ করল। জায়গাটায় জুম করে একটা ঘোলা মুখচ্ছবিতে মন দিলো। কাঙ্ক্ষিত মানুষের খোঁজ পেয়ে তার ঠোঁটে হাসি ফুটল। বলল,

“হি ইজ দ্য ওয়ান!”

শেহজাদ কৌতুহল নিয়ে তার দিকে ফিরতেই চমকে উঠলো। স্ক্রিনে মাস্ক পরা লোকটিকে মাস্ক ছাড়া দেখা যাচ্ছে। শেহজাদ আশ্চর্য হলো, ক্লিপটায় তাকিয়ে জানতে চাইল,

“এটা কোথায় পেলেন?”

তন্ময় ড্রাইভিং সিট থেকে হুট করেই বলে উঠল,

“আমি কুরিয়ার থেকে ফুটেজ কালেক্ট করে আসার সময়, রোদসী ম্যাডাম বললেন, সম্ভব হলে আশপাশের কোনো দোকানের ফুটেজও কালেক্ট করে আনতে। বাকিরা কেউ দিতে রাজি না হলেও, এক ফার্মাসিস্ট দিয়েছে। সেই ফুটেজেই লোকটাকে রাস্তা দিয়ে মাস্ক ছাড়া হেঁটে যেতে দেখা গেছে।”

শেহজাদ এবার আর না জানিয়ে কাজ করার জন্য তন্ময়-রোদসীকে কিছুই বললো না। কারণ তাদের আগ বাড়িয়ে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য হলেও লোকটাকে চিহ্নিত করা গেছে। আর এই মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তন্ময় মনে মনে ধমক খাবার পূর্ণ প্রস্তুতি রাখলেও আদতে কিছুই হলো না। কয়েক সেকেন্ড বাদেও কানে উচ্চবাচ্য না আসায় তন্ময় লুকিং গ্লাসে পেছনের সিটে বসা শেহজাদের দিকে একবার তাকাল। তার অধরযুগল উন্মুক্ত। সে হাসছে, সহজ ভাবে হাসছে। কারণ ল্যাপটপের স্ক্রিনে থাকা লোকটা তার চেনা একজন।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 14 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন