#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_১৫
বিগত চব্বিশ ঘণ্টায় রোদসীর জীবনের ওপর দিয়ে রীতিমতো ঝড় বয়ে গেছে। এইবারের ঝড়টা অবশ্য ধ্বংসাত্মক হয়নি, হয়েছে প্রশান্তিদায়ক। সেই প্রশান্তিতে বেশ আরাম করে ঘুম হয়েছে।
গতকাল ফিমা একটা চমৎকার কাজ করেছে। তার এক চাচার নাকি ধানমন্ডির শংকর এলাকায় দুই বেডরুমের ফ্ল্যাট বেশ কয়েক মাস ধরে খালি পড়ে ছিল। ফিমা কাল রাতেই চাচার সাথে কথা বলে চাবি ম্যানেজ করেছে। শেষে রাতেই রোদসী আর ফিমা মিলে রুমানা খাতুনকে নিয়ে সেই ফ্ল্যাটটা দেখে এসেছে। রোদসীদের নতুন ফ্ল্যাটটা খুব একটা বড় না হলেও বেশ ছিমছাম। সবচেয়ে বড় কথা, দক্ষিণমুখী একটা ছোট্ট বারান্দা আছে এতে। এটা এই বাসার সবচেয়ে বড় আশ্চর্য। আরেকটা আশ্চর্য হলো, ঘর থেকে আকাশ দেখা যায়। যান্ত্রিক জীবনের রাশি রাশি ইট পাথরের দালানকোঠার ভিড়ে জানলা থেকে আকাশ দেখতে পাওয়া যায় এমন বাসা পাওয়া বেশ দুষ্কর। এই আকাশ দেখতে পাওয়ার সুবিধা রোদসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ না হলেও রোদসীর মায়ের জন্য ভীষণ জরুরি। তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে হলে, বাহিরের আলো বাতাস এসবের সাথে সখ্যতা গড়ার সুযোগ দিতে হবে। লাগোয়া বারান্দাটা না পেলে দু'কামরার এই শহুরে দালানে রোদসীরও অবশ্য দমবন্ধ হয়ে আসতো। বারান্দাটা খুব একটা প্রশস্ত নয় বটে, তবু এতে ফুল গাছগুলো শিফট করলে সুন্দর লাগবে। এই ফুলগাছগুলো তার খুব আপন। কত-শত তিক্ত রজনীর ভার নিভৃতে সামলেছে তারা।
বাসা পছন্দ করে রাতটা তারা ফিমার বাসাতেই কাটিয়েছে। বহু বহুদিন পর আড্ডা-গল্পে মুখরিত হয়েছে মা-মেয়ের আঁধার জীবন। ফিমা মেয়েটা দারুণ মিথ্যে বলতে জানে। সে এমনভাবে মিথ্যে বলে যে, সামনের মানুষটি তার সেই মিথ্যাকে চোখ বুজে সত্য মানে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার হরেক রকম মিথ্যে দিয়ে কীভাবে যেন একরাতেই সে রুমানা খাতুনকে বেশ কিছুটা স্বাভাবিক করে ফেললো। রোদসীর মনে হলো, মিরপুরের বাসা থেকে আসবাব শিফট করানোর অজুহাতে দুয়েক রাত ফিমার বাসায় কাটানো উচিত। তার মতো প্রাণবন্ত মানুষের সঙ্গ পেয়ে মায়ের আত্মকেন্দ্রিকতা অল্প কিছু কমলেও কমতে পারে।
আশ্বিনের নীল গগনে পেঁজা তুলোর মতো মেঘরাশি উড়ছে। বেহিসেবি হাওয়ায় দূরে কোথাও কাশফুলও হয়তো দোল খাচ্ছে। নীল আকাশে ছোটাছুটি করা সফেদ মেঘেদের দিকে তাকিয়ে শ্বাস ফেললো শেহজাদ। অনেকগুলো দিন পর আজ তার ছুটি। পারিবারিক অনুষ্ঠানটির খাতিরে হলেও একটিদিনের ছুটি পাওয়া গেছে। মনে হচ্ছে, কাজের চাপে বছর কেটেছে, সেই ফাঁকতালে শরৎ ও চুপিচুপি চলে এসেছে। একটিবারের জন্যেও জানান দিয়ে তাকে স্বাগত করার সুযোগ দেয়নি।
শেহজাদের আজ বেশ বেলা করে ঘুম ভেঙেছে। হয়তো ছুটি পেয়ে এই ক'দিনের ঘুমেরা সব অনিয়ম পুষিয়ে নিয়েছে। সকাল থেকেই শেহজাদদের বাসার পরিবেশটা একটু উৎসবমুখর হয়ে উঠল। আজ এনায়েত মূর্তজা এবং ফরিদা বেগমের পঁয়ত্রিশতম বিবাহবার্ষিকী। অনুষ্ঠানটা জলনূপুরে হচ্ছে না। এনায়েত সাহেবের পুরনো জজ আর উকিল কলিগদের সংখ্যা এত বেশি যে জলনূপুরের ড্রয়িংরুমে এত মানুষের সংকুলান হওয়া সম্ভব নয়। তাই শহরের স্বনামধন্য ফাইভ স্টার হোটেল 'দ্য ওয়েস্টিন'-এর গ্র্যান্ড বলরুমে আজকের এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অথচ দুপুর থেকেই বাসায় মেহমানে একেবারে গিজগিজ করছে। শেহজাদের বেশ কিছু কাজিনদের অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাড়িতে আনানো হয়েছে। এতো মানুষেও তাদের মন ভরছে না। তন্ময় আর হাসিকেও ইতিমধ্যেই ফোন করে ডাকানো হয়েছে। একটু আগেই ফরিদা বেগম শেহজাদকে বলে গেলেন রোদসীকেও কল করে ডাকতে। শেহজাদ অবশ্য কল করেনি। তার মনে হচ্ছে, অনুষ্ঠান রাতে, শুধু শুধু ঘটা করে দুপুর দুপুর ডেকে আনানোর কোনো মানে নেই। তাছাড়া, এই ক'দিনের পরিচয়ে তার পারিবারিক অনুষ্ঠানে আসা নিয়েও জোর করা মানায় না। অথচ তার যুক্তি অযুক্তির ফাঁকতালে ফরিদা বেগম ঠিকই তন্ময়ের থেকে নাম্বার জোগাড় করে রোদসীকে ডেকে নিয়েছেন।
প্রথম ধাক্কাটা সে কফির মগ রান্নাঘরে রাখতে গিয়ে খেল। ডাইনিং রুমে রোদসীকে দেখামাত্রই তার মনে হলো সে দিবাস্বপ্ন দেখছে। মেয়েটিকে সে ফোন করে ডাকেনি। তাহলে সে এখন এখানে আসবে কী করে? দুদিকে মাথা নেড়ে মগটা ফেলে আসতে নিলেই তন্ময়কে দেখা গেলো পেছনে তাকিয়ে দ্রুত গতিতে এদিকে আসছে। শেহজাদ অল্পের জন্য তার সাথে ধাক্কা খেলো না। সম্বিৎ ফিরতেই তন্ময় হড়বড় করে বলল,
“স্যার! রোদসী ম্যাডাম এখানে এসেও কেসের আপডেট জানতে চাচ্ছে। দোহাই আপনার! আমায় আজকের দিনটা অন্তত ছুটি দিন।”
শেহজাদ ভড়কে গেল। রোদসী তাহলে সত্যি সত্যি এখানে এসেছে। কিন্তু কীভাবে? মিরপুর থেকে এক ফোনকল পেয়ে সে এতো জলদি ধানমন্ডি এলো কী করে? শেহজাদ বিভ্রান্ত নয়নে সামনে তাকাল। রোদসী ভ্রু কুঁচকে তন্ময়কে দেখছে। শেহজাদের মনে হলো, রোদসীর এ বাসায় আসাটা এক রকম আশ্চর্য। এহেন আশ্চর্য তার মস্তিষ্কের নিউরনে পৌঁছাতে বেশ সময় নিল। বেশ অনেক্ক্ষণ সময় নিয়ে সে ছোট্ট করে বলল,
“আজ সবার ছুটি। যা কাজ বাকি, সব কাল থেকে দ্বিগুণ গতিতে শুরু হবে।”
শেহজাদের কথা শুনে তন্ময় বেশ আশ্বস্ত হলো। ছেলেটা আজকাল শেহজাদের থেকেও রোদসীকে বেশি ভয় পাচ্ছে। শেহজাদ তাকে পাশ কাটিয়ে নিজের ঘরের দিকে যেতে চাইল। এতো মানুষের সমাগমে তার অস্বস্তি হচ্ছে। ঘরের দিকে যাওয়ার আগেই নয়না পেছন থেকে তাকে ডাক দিল। বলল,
“শেহজাদ! এই তোমার ঘুম ভাঙলো!”
নয়না শেহজাদের খুব একটা ছোট নয়। মোটামুটি পিঠাপিঠি বলা চলে। বাকি কাজিনদের সাথে বয়সের আকাশ পাতাল পার্থক্য থাকলেও নয়নার সাথে তেমন কিছু ব্যবধান নেই। শেহজাদ চলমান পা জোড়া থামিয়ে ঘাড় ঘুরাল। কাঠিন্য মেখে বলল,
“আমার ঘুমের মাঝে হাঁটাহাঁটি করার অভ্যেস নেই। হাঁটছি যখন, ঘুম তখন অবশ্যই ভেঙেছে।”
শেহজাদের তিক্ত জবাবের বিপরীতে আর কিছু বলার সুযোগ পেল না মেয়েটা। তার আগেই ফরিদা বেগম দুপুরের খাবার খেতে ডাক দিলেন। দেখা গেলো বেশ বেশ হই হই করেই দুপুরের খাবারের পর্ব চুকেছে। শেহজাদ গোটা সময়টা নিজের ঘর থেকে বের হয়নি। মাথাব্যথার অজুহাতে চোখ বুজে বিছানায় পড়েছিল। শেষে ব্যস্ততা ফেলে ফরিদা বেগম নিজ হাতে খাইয়ে গেছেন তাকে।
দুপুরটা কোনোমতে ঘরে কাটালেও বিকালে শেহজাদকে বের হতেই হলো। ছাদে তখন জম্পেশ চায়ের আড্ডা বসেছে। এনায়েত মূর্তজার চাপাচাপিতে তাকেও সেখানে যোগ দিতে হলো। শেহজাদ খেয়াল করলো বয়সে ছোট, বড় কাজিনরা নিজেদের মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্যে গল্প করলেও হাসি, তন্ময় আর রোদসী বেশ বোর ফিল করছে। শেহজাদের মনে হলো, প্রফেশনাল মানুষজনকে ব্যক্তিগত গন্ডিতে ডেকে আনার এই সিদ্ধান্ত আগাগোড়া ভুল। হাসি বেশ কিছুক্ষণ উশখুশ করে ফোন নিয়ে এক কোণে কেটে পড়েছে। সেখানেই কলে সে কারো সাথে খোশগল্প জুড়েছে। তন্ময়ও বাকিদের সাথে একটু একটু করে মিশে যাচ্ছে। ছেলেটা সহজ সরল হওয়ায় চট করেই সবাইকে আপন ভেবে ফেলে। বিপত্তি বেঁধেছে রোদসীর ক্ষেত্রে। মেয়েটা কোনোভাবেই মন লাগাতে পারছে না। বেশ কিছুক্ষণ সে চুপচাপ নিচে তাকিয়ে বসেছিল। শেষে ফরিদা বেগমের ডাক পড়ায় তার ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এনায়েত মূর্তজা এসবের মাঝে পুত্রকে সতেজ ফুল আনতে বলেছেন। বিবাহবার্ষিকীর খুশিতে তিনি আজ রীতিমতো উড়ছেন। সকাল থেকেই কেমন লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছেন, রোজকার স্বাভাবিক হাঁটার ভঙ্গিও বোধহয় তিনি এর মাঝেই ভুলে গেছেন। শেহজাদ কালো রঙের একটা টি-শার্ট পরা ছিলো। সেভাবেই সে বাবার কথামতো ফুল আনতে বের হয়েছে।
রোদসী ফরিদা বেগমের ঘরে ঢুকতেই দেখল এলাহী কান্ড। ভদ্রমহিলা চমৎকার একটা উজ্জ্বল নীলরঙের শাড়ি পরেছেন। তাকে দেখতে আজ ভীষণ সুন্দর লাগছে। এলোমেলো খোঁপায় শাড়ির আঁচলে সেফটিপিন লাগাতে ব্যস্ত থাকা ফরিদা বেগমকে দেখেই সে বলে উঠল,
“আপনাকে আজ চমৎকার লাগছে, আন্টি।”
ফরিদা বেগমের গালদুটো লাল হয়ে উঠল। লাজুক স্বরে বললেন,
“ধূর! বুড়ো বয়সের ঢঙ আরকি। দেখি দরজাটা আটকে এদিকে এসো দেখি।”
রোদসী দরজা চাপিয়ে তাকে শাড়ি পরতে টুকটাক সাহায্য করল। সাজসজ্জার এক পর্যায়ে তিনি আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলেন রোদসী একটি হালকা গোলাপি রঙা কামিজ পরে আছে। তিনি কৌতুহলী গলায় বললেন,
“তুমি তৈরি হবে না?”
রোদসী তার প্রশ্নে খানিকটা ভড়কাল। তার হতবিহ্বল মুখপানে তাকিয়ে আঁতকে উঠলেন ফরিদা। বললেন,
“তুমি কি এভাবেই প্রোগ্রামে যাওয়ার প্ল্যান করছ নাকি?”
রোদসী বুঝতে পারছে না এতে ঠিক কী সমস্যা। ওদিকে ফরিদা বেগম ততক্ষণে ব্যস্ত হয়ে আলমারিতে কিছু খুঁজছেন। মিনিটখানেক খুঁজে পেতে তিনি একটা কালো রঙের শাড়ি বের করলেন। তাড়া দিয়ে বললেন,
“আজ মেয়েরা সবাই শাড়ি পরবে। সেসবের মাঝে তুমি শাড়ি না পরলে কেমন একটা ব্যাপার হবে বলো তো!”
“শাড়ি…আমি আসলে শাড়িতে অভ্যস্ত নই। এতেই ঠিক আছি।”
ফরিদা বেগম তাকে পাত্তা দিল না। জোর করে হাতের শাড়িটা তাকে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“মোটেও ঠিক নেই। এটা দেখোতো পছন্দ হয় কিনা। এটা ছাড়া নতুন শাড়ি আর পাচ্ছি না বুঝলে?”
শাড়িটা রোদসীর হাতে দিয়ে তিনি আরেকদফায় আলমারি খুঁজলেন। এবারো কিছু পেলেন না। অসহায় গলায় বললেন,
“দেখলে আর একটাও নতুন শাড়ি নেই। সবক’টা একবার না একবার পরা হয়েছে। আগে জানলে তোমার জন্য একটা আলাদা করে রাখতাম।”
“আপনি অকারণ ব্যস্ত হচ্ছেন, আন্টি। আমি কখনোই শাড়ি পরিনি, আজও পরছি না। আমায় রেখে আপনি একটু নিজের সাজে মন দিন। আজকের দিনটা আপনার।”
ফরিদা বেগম রোদসীর সমস্ত কথা হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন। রোদসীর হাতে থাকা কালো শাড়িটার ভাঁজ খুলতে খুলতে বললেন,
“গতমাসে মার্কেটে গিয়ে বলেছিলাম কালো রঙের একটা শাড়ি দেখব। দোকানটায় এই একটা শাড়ি বাদে আর কোনো কালো রঙের শাড়ি ছিলো না। এসব জরজেট ফরজেট কি পরার আমার বয়স আছে বলো? বললাম নিব না এটা। কে শোনে কার কথা? ঠিক জোর করে কিনে আনলো ছেলেটা!”
একটু থেমেই শাড়িটা রোদসীর গায়ে ধরলেন তিনি। প্রসন্ন চিত্তে বললেন,
“জেদ করে কিনে এনে লাভ হয়েছে কী? ঘরেই পরে ছিল। পরা হয়নি একদিনও। আজই শাড়িটার ভাঁজ ভাঙলাম। তোমাদের বয়সেই এসব শাড়ি মানায়। দেখো তো! কি চমৎকার মানাচ্ছে তোমায়! যাও এটা একবার ট্রায়াল দিয়ে এসো।”
রোদসী ফরিদা বেগমকে ইনিয়েবিনিয়ে বেশ কয়েকবার বাধা দিতে চাইল। শেষ অবধি তার কোনো কথাতেই ভদ্রমহিলার মন গলেনি। আয়োজন করে তিনি নয়না নামের কারো থেকে একটা কালো রঙের ফুল স্লিভ ভেলভেট ব্লাউজও জোগাড় করে ফেললেন। অগত্যা তার জোরাজোরিতে প্রথমবারের মতো শাড়ি পরতে হলো রোদসীকে। যদিও শাড়ি পরার গুরুত্বপূর্ণ সব কাজগুলো ফরিদা বেগমই তাকে করে দিল। গোটা ব্যাপারটায় তার ভীষণ অস্বস্তি হলো। মনে হলো, ভদ্রতা দেখাতে অনুষ্ঠনে আসাটাই অনুচিত হয়েছে। কোনোমতে শাড়ি পরার পর বাঁধলো আরেক বিপত্তি। গহনা পরার বিষয় এলে ফরিদা বেগমকে রোদসী কঠিন গলায় মানা করল। তার গয়না সে কোনোভাবেই পরবে না। মেয়েটার বাড়াবাড়িতে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি আবারো তিথি নামের কারো সাহায্য নিলেন। তিথি নামের মেয়েটির কোলে আট মাসের একটা ছোট্ট বাবু। ননাসের হাঁকডাকে সে সাড়া দিলেও গয়না বাছাই করতে রোদসীকেই গেস্টরুমে ডেকে নিল। অস্বস্তিকর মুহূর্ত এড়াতে রোদসীর ইচ্ছে করল, এক দৌড়ে বাড়ি চলে যেতে। এ বাড়ির মানুষ দুটো তাকে বোধহয় অকারণ ভীষণ রকম পছন্দ করেন। দুপুর দুপুর ফরিদা বেগমের চারবার কল পেয়ে সে এ বাসায় এসেছে। তিনি এতোবার করে না বললে সে কিছুতেই এ বাসায় আসতো না। সাথে শাড়ি বিষয়ক ঝামেলার ব্যাপারে অবগত হলে কবেই বারণ করে দিত!
রোদসী খুব সাবধানে হাঁটার চেষ্টা করছে। অথচ বারবার কুঁচি জড়িয়ে বিচ্ছিরি কাণ্ড হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ভেন্যুতে যাওয়ার আগেই বাসার মাঝে শাড়ি খুলে একটা লেজেগোবরে দশা হবে। পেঙ্গুইনের মতো ধীরে ধীরে হেঁটে ড্রয়িংরুম অবধি আসতেই আরেকটি ইতস্তত মুহূর্তের সম্মুখীন হতে হয়।
সন্ধ্যে হয়েছে বহু আগে। অথচ আড্ডার আসর আরো জমজমাট হয়ে উঠছে। কারো মাঝেই অনুষ্ঠানে যাওয়ার তাড়া দেখা যাচ্ছে না। মেয়েরাও যাও টুকটাক তৈরি হতে গিয়েছে, ছেলেগুলো তখনো বাড়িটা মাথায় করে রেখেছে। ছাদ থেকে নেমে তারা শেহজাদের ঘরটা দখল করেছে। বেশ জমিয়ে তারা গানের কলি খেলার আয়োজন করেছে। অনেকদিন পর একসাথে হয়ে কাজিন মহল আয়োজন করে সময়টা উপভোগ করছে। বহুদিন পর দেখা হওয়ার খুশিতে ফায়াজ ভাইও গিটার টিটার নিয়ে একেবারে প্রস্তুত হয়ে এসেছেন। সুযোগ পেয়েই তিনি গাইতে শুরু করলেন বেশ পুরনো একটা গান। তার গানের আওয়াজে ঘরের জনরবগুলো ফিকে পরলো। কানের কাছে শুধু বাজতে থাকল,
‘এ মায়া এমনই করেছে বেহাল
এ মন আজকাল বড়োই নাজেহাল
নেশায় সে মাতাল
বড়োই বেসামাল..’
শেহজাদ তখন সবেই ফুল নিয়ে ফিরেছে। বাবা এতো বড় তোড়া আনিয়েছে যে ঠিকভাবে সামনে তাকিয়ে হাঁটতেও পারছে না শেহজাদ। যার সুবাদে ড্রয়িংরুমে আসতেই পাঁচ বছরের বিচ্ছু মামাতো ভাই রিহানের আকষ্মিক ছুটে আসার দরুন ভালো রকমের ধাক্কা খেল শেহজাদ। হুটহাট ঘটা ঘটনায় হাত থেকে ছুটে বেশ কিছু গোলাপ দিগ্বিদিক হারিয়ে এলোমেলো ছিটাল। শেহজাদ বিরক্ত গলায় ধমক দিতে সামনে তাকিয়েই দ্বিতীয় দফায় ধাক্কা খেল। রোদসী অন্যমনস্কভাবে হেঁটে আসছে, বড় অদ্ভুত সেই হাঁটার ধরণ। শেহজাদ কয়েক মুহূর্ত একভাবে তাকিয়ে মেয়েটিকে আগাগোড়া পরখ করল। কালো রঙের জরজেট একটা শাড়ি পরেছে সে। সবসময় জিন্স, কূর্তিতে দেখা মেয়েটাকে এভাবে শাড়ি পরা দেখে সে আশ্চর্য হচ্ছে। মেয়েটির চোখদুটো খালি। চশমাটা আবার ভেঙে ফেলল নাকি? খালি চোখে এমন শাড়ি পরে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় হাঁটছে কেন? কপালের ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজটাও দেখা যাচ্ছে না। সেটাও খুলে ফেলেছে নাকি?
পরপরই মনে হল, এই শাড়িটা সে চেনে। কোথায় যেন দেখেছে এটাকে। কোথায় দেখেছে? একটু ভাবতেই মনে পড়ল, এটা মায়ের শাড়ি! কিন্তু মায়ের শাড়ি মেয়েটার পরনে কেন? এই প্রশ্নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, গান বাজছে কোথায়। অসময়ে ফুলের পাপড়িগুলোই বা এমন উড়ছে কেন? শেহজাদের মনে হল, সে এই ঘরে কেন এসেছে তা তার মাথায় আসছে না। মনে হচ্ছে শর্ট টাইম মেমোরি লস হয়েছে। রোদসীও ততক্ষণে উড়ন্ত গোলাপের পাপড়ি দেখে থমকে দাঁড়িয়েছে। তার চোখ পরেছে ঘরের মাঝামাঝি হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকা শেহজাদের দিকে। লোকটার হাতে তরতাজা লাল গোলাপের ইয়া বড় এক তোড়া। তা হাতে সে হতবিহ্বল হয়ে রোদসীর দিকে তাকিয়ে আছে। ড্রয়িং রুমে বাচ্চারা ছোটাছুটি করছে, তাদের জন্য এককোণে একটা স্ট্যান্ড ফ্যান চালু করা। সেই বাতাসে ছিটকে যাওয়া ফুলের কিছু পাপড়ি এদিক সেদিক বেহিসেবি উড়ছে। শেহজাদকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রোদসী ভড়কে গেল। মনে হল, মায়ের শাড়ি পরতে দেখে এক্ষুনি হয়তো দুটো কড়া ধমক দিবে সে। অথচ ঘটল সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা। শেহজাদ প্রতিক্রিয়া করার আগেই শেহজাদের মামাতো ভাই ভয়ানক এক হুল ফোটাল। দু’হাতে তালি দিতে দিতে চিৎকার করে বলতে শুরু করল,
“ইয়ে ইয়ে! শেহু ভাইয়ু প্রেমে পড়েছে! কি মজা! কি মজা! শেহু ভাইয়ু প্রেমে পড়েছে!”
তার বেফাঁস কথাবার্তায় শেহজাদ শুকনো গলায় বিষম খেল। দ্রুত হাঁটু গেঁড়ে বসে ফুলের তোড়া ফ্লোরে রাখল। চটজলদি চেপে ধরল বিচ্ছুটার মুখ। এই বান্দা আসার পরেই শেহজাদের দুটো বই ছিঁড়ে ফেলেছে। ঘটনাটা নিয়ে সকাল সকাল তার মন মেজাজ বিশেষ খারাপ হলেও একটু বাদেই মায়ের মিষ্টি কথায় সে গলে গিয়েছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে অকাজ ঘটিয়ে বীরদর্পে অবান্তর কথা বলতে দেখে ইচ্ছে করল, কানটা টেনে লাল করে দিতে। নাক চাপলে দুধ বের হবে সেই পিচ্চি কিনা জোর গলায় শেহজাদের প্রেমে পড়ার লাইভ টেলিকাস্ট করছে! শেহজাদ চাপা গলায় ধমক দিল তাকে,
“শাটাপ! কীসব উল্টোপাল্টা কথা বলছিস? এসব আজেবাজে জিনিস কে শিখিয়েছে তোকে?”
শেহজাদের হাতটা একটু আলগা হতেই রিহান আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল,
“গত সপ্তাহেই বাবার সাথে মুভি দেখেছি। হিরো হিরোইনের প্রেমে পরলেই এমন ফুল পরে, বাতাস হয়, গান টান বাজে। কী ভেবেছো? তুমি যে হিরো সেটা আমি বুঝব না?”
শেহজাদের ইচ্ছে করল, আগে ছোট মামুকে দুটো গাট্টা মেরে তারপর এই ছোট প্যাকেটকে শায়েস্তা করতে। এটুকু পিচ্চিকে ইঁচড়েপাকা করার সবরকম দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন মামু। বাপ হয়ে এই বয়সে পুত্রকে দেখান রোমান্টিক সিনেমা। এই ছেলে বড় হতে হতে তো পরিচিত সবার হারমাস জ্বালিয়ে খাবে! শেহজাদ রিহানের মুখে তর্জনী চেপে ফিসফিসিয়ে বলল,
“তুইও পাগল, তোর বাপও পাগল। দুটোকেই অতিসত্বর জেলে ভরা দরকার।”
রিহান মানতে নারাজ। শেষে তাকে বোঝাতে গিয়ে পকেট থেকে কড়কড়ে দুশো টাকা গচ্চা দিয়ে চকলেট ঘুষ দিতে হয়। জীবনে প্রথমবার অ্যাডভোকেট মূর্তজা ঘুষ দিল। তাও একেবারে অকারণে। ব্যাপারটা তাকে এতোটাই পীড়া দিল যে, তাকে বাসার নিচে দাঁড়িয়ে দু'দুটো সিগারেট ফুঁকতে হল। মাথা ঠান্ডা হতেই মস্তিষ্কে ভাসলো রোদসী নামক মেয়েটির টানটানা আঁখিদ্বয়। গোটা ঘটনা মেয়েটা সামনে থেকে দেখেছে। ক বলতে কলকাতা বোঝা মেয়েটা এই ঘটনার পেছনে নতুন কী যুক্তি সাজিয়েছে কে জানে? শেহজাদ বড় বড় শ্বাস ফেলে ঘরে ঢুকল। তার ঘর দখল করে তখনও গানের মেলা চলছে। সে গিয়ে সেই আনন্দময় সভা ভেঙে দিল। সবাইকে রেডি হতে পাঠিয়ে নিজেও সময় নিয়ে তৈরি হল। খুব করে চাইল, অন্তত আজকের জন্য রোদসীর মুখোমুখি না হতে। পাছে মেয়েটা আবার ইতিপূর্ব ঘটনার আজগুবি কোনো অর্থ সাজায়!
ওদিকে রোদসীর অবস্থা আরও খারাপ। এহেন বিব্রতকর মুহূর্তের পর তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। তিথি নামের মানুষটি ভীষণ চমৎকার। কথা বলে জানা গেল, তিনি শেহজাদের ছোট মামী। ছোট মামী বলতে একেবারেই ছোট। তাকে দেখে মনে হল, শেহজাদ আর তার ছোট মামার বয়সের পার্থক্যও হয়তো খুব কম। বয়সে কাছাকাছি হওয়ায় কিনা কে জানে? বাকিটা সময় রোদসীর সাথে তিনি গল্পই করলেন। আটমাসের বাবুকে নিয়ে শাড়ি টারি মিলিয়ে তার নাভিশ্বাস দশা। কথায় কথায় তাকে টুকটাক সাহায্য করে রোদসী। জানতে পারে, বাবুটির নাম রিপ্তী। মেয়েটা তাদের দ্বিতীয় সন্তান। এই তথ্যটাও সে জানতো না, যদি না তার পাঁচ বছর বয়সী বাচ্চাটা ছেঁড়া প্যান্টে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে আসতো। এসেই শুধু ক্ষান্ত হয়নি সে, আয়োজন করে কয়েকজনের নাম বিচার বসায় সে। তারা নাকি তাকে কোলে নিতে টানাটানি করায় বেচারার প্যান্টটা ছিঁড়ে গেছে। রোদসী দেখল তিথি মেয়েটা একটুও রাগ করল না। দ্রুত হাতে ছেলেকে তৈরি করে, মেয়ের সব গুছিয়ে তবেই নিজে তৈরি হলো। খুব কাছ থেকে একজন মায়ের হুলুস্থুল কাণ্ড দেখেও তার কেন যেন ভালো লাগল। পুরো ব্যাপারটা রোদসীর এতো ভালো লাগল যে সে একটু আগে ঘটা অসহ্যকর মুহূর্তটা বেমালুম ভুলে গেল। তিথি নিজে তৈরি হয়ে, রোদসীর সাজসজ্জায় মন দিল। জুয়েলারির বক্স খুলে সে রোদসীকেই সেখান থেকে পছন্দ করতে দিল। রোদসী প্রথমে কয়েকবার বাধা দিলেও শেষে তার পাল্লায় পড়ে একেবারে সাদামাটা দেখতে ডায়মন্ড কাটের একটা ছোট্ট দুল আর পেন্ডেন্ট বেছে নিল। কালো শাড়ির সাথে সাদা পাথরের সেই জুয়েলারি গুলো খুবই চমৎকার মানাল। তিথি অবশ্য ভারি কিছু দেওয়ার জন্য তাকে বেশ কয়েকবার বলেছে। রোদসী তাতে পাত্তা দেয়নি। এমনিতেই এসবে সে অভ্যস্ত নয়। শেষে অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে জ্ঞান হারাতে হবে।
শেহজাদ খুব করে চেয়েও বিব্রতকর মুহূর্ত এড়াতে পারল না। রেডি হয়ে ঘরের দরজা খুলতেই তার সামনে পড়ল রিহান। স্যূট ব্যূট পরে ভদ্রলোক সেজেছেন তিনি। শেহজাদকে দেখতেই সে মিটিমিটি হাসল। সেই হাসি শেহজাদের কাছে আসন্ন বিপদঘন্টার মতো লাগল। মিষ্টি করে হেসে সে উবু হয়ে বসল। তার সাথে উচ্চতা মিলিয়ে প্রলোভন দেখাতে বলল,
“গেম খেলবি?”
“তুমি আমায় আবার ঘুষ দিবে, ভাইয়ু?”
শেহজাদের মনে হলো, খাল কেটে সে কুমির এনেছে। বিপাকে পড়ে একটানে তাকে কোলে তুলল সে। হাসি হাসি মুখ করে বলল,
“সকালে ফোনের লক খোলার চেষ্টা করছিলি তাই জানতে চেয়েছি। সত্যি সত্যি খেলতে দিতামও না।”
____
ভেন্যুতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শেহজাদদের প্রায় আটটা বাজল। ততক্ষণে বাহিরের মেহমানরাও আসতে শুরু করেছে। সেদিকে মন দেওয়ার বিশেষ সময় পেলেন না ফরিদা বেগম আর এনায়েত মূর্তজা। ফটোসেশান শেষ করতেই মোটামুটি ঘন্টখানেক লাগল। ফটোসেশানের শেষদিকে, ঘড়িতে যখন রাত ন'টার কাছাকাছি, ঠিক তখনই সব ভালোর মাঝে একটা মন্দ ঘটনা ঘটল। কোথা থেকে বলরুমে এলেন মন্ত্রী রাশেদুল হক। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, তার সাথে আজ কোনো বডিগার্ড নেই। মন্ত্রীকে দেখতেই চারিদিকের পরিচিত মানুষজন মোটামুটি গুঞ্জনে ভাসলেন। গুটিকতক আইনজীবী তার সাথে হাতও মেলালেন। ভদ্রলোক সেসব পেরিয়ে এলেন এনায়েত মূর্তজার কাছে। হাতটা বাড়িয়ে চওড়া হেসে বললেন,
“পঁয়ত্রিশতম বিবাহবার্ষিকীর অনেক অনেক শুভেচ্ছা। দোয়া করি, এভাবেই সবসময় হাসিখুশি থাকুন।”
“ধন্যবাদ।”
এনায়েত মূর্তজা জবাব দেওয়ার আগেই শেহজাদ তাকে ধন্যবাদ জানাল। অতঃপর বাড়িয়ে রাখা হাতটা আলতো ছুঁয়ে করমর্দনের একটা আলগা ভাব করল। মুখটায় স্মিত হাসি ধরে রাখলেও শেহজাদের চোয়াল ইতিমধ্যেই শক্ত হয়ে উঠেছে। রাশেদুল হক একেবারে একা আসেননি, সাথে করে এনেছেন পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়সী তার উদ্ধত ভাইপো, আসিফ হককে। কোনোরকম নিরাপত্তা না নিয়ে এমন ভরা সমাগমে আসার মানুষ তো তিনি নন। বাকি লোকজনকে কি তবে গেইটের কাছেই অপেক্ষারত রেখেছেন?
রাশেদুল হক সবার সামনে দুয়েকটা সৌজন্যমূলক কথাবার্তা শেষ করে সরে গেলেন। বলা যায়, শেহজাদ তাকে সরিয়ে দিল। বাবা-মার আশপাশে এই লোকটির উপস্থিতি যে তার খুব একটা পছন্দ হচ্ছে না, তা একেবারে স্পষ্ট। শেহজাদ তাদের সাময়িক সময়ের জন্য সরিয়ে দিলেও অনুষ্ঠান থেকে তার মন উঠে গেল। ধারালো নজর বারবার মন্ত্রীর চারিদিকেই ঘুরছে। অনুষ্ঠানের জন্য যতটুকু নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা নিশ্চয়ই একজন মন্ত্রীর কথা ভেবে রাখা হয়নি! তাহলে সাঙ্গপাঙ্গ ছাড়া শুধুমাত্র ভাইপোকে সঙ্গে নিয়ে তার অনুষ্ঠানে আসার কারণ-ই বা কী? শেহজাদ কিছুতেই বুঝতে পারছে না, এই লোককে কি দাওয়াত করা হয়েছে? নাকি সে যেচে এসেছে কোনো ঝামেলা পাকাতে। শেহজাদকে দূর থেকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মন্ত্রী উঠে দাঁড়ালেন। কাছাকাছি গিয়ে নাটকীয় সুরে বললেন,
“এভাবে তাকিয়ে না থেকে এককথায় চলে যেতে বললেই পারো!”
“আসার কথা যখন বলিনি, যাওয়ার কথাও বলার প্রয়োজন মনে করছি না।”
শেহজাদের তীক্ষ্ণ জবাবে রাশেদুল হকের হাসি হাসি মুখটা আরেকটু প্রশস্ত হল। তিনি গাল চুলকে নিচু গলায় বললেন,
“শুনলাম আজকাল নাকি তুমি আমায় বেশ অপছন্দ তালিকায় রাখছ। কেন জানতে পারি?”
“অপছন্দ তালিকায় রেখেছি জানতে পারলে, কেন রেখেছি তাও আপনার জানার কথা।”
রাশেদুল হক হাসি হাসি মুখ করে ডানে বামে তাকালেন। দূরে কাউকে দেখে এমনভাবে হাত উঁচালেন মনে হলো তারই কোনো ভক্ত অদূরে দাঁড়িয়ে তাকে অবলোকন করছে। মেকী গল্প করার ভাবটা ধরে রেখেই তিনি নিচু গলায় বললেন,
“ভুল পথে হাঁটছো অ্যাডভোকেট। মির্জাকে আমি মারিনি।”
“আমি তো একবারও বলিনি, আপনি মে'রেছেন। তাছাড়া আপনার মতো মানুষরা যেখানে নিজে হাতে খাবার খাওয়ার অবধি প্রয়োজন পড়ে না, সেখানে একটা খু’ন করার তো প্রশ্নই আসছে না।”
“আমার লোকজনও তাকে মারেনি।”
শেহজাদ শ্লেষাত্মক হাসল। তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“নিজের নির্দোষ হওয়ার গল্প শোনাতে এসেছেন?”
রাশেদুল হক মুখের হাসিটা ধরে রেখে শেহজাদের কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন,
“না, ভুল বোঝাবোঝি শেষ করতে এলাম।”
শেহজাদ কাঁধ নাচিয়ে তার হাতটা সরিয়ে দিল। চাপা গলায় বলল,
“বাবার হাতের সাথে আপনার র'ক্তা'ক্ত হাতটার স্পর্শ লাগুক চাইনি বলেই তখন হাত মিলিয়েছি। তার মানে এই নয় যে, প্রতিবার কারণে অকারণে দুর্গন্ধযুক্ত ঐ হাতে নিজেকে ছোঁয়ার সুযোগ দিব।”
রাশেদুল হক তীব্র অপমানটুকুও হাসতে হাসতে গিলে ফেললেন। কৌতুক গলায় বললেন,
“আমায় নিয়ে তোমার দেখছি বেশ অনেকগুলো ভুল ধারণা জন্মেছে। সময় করে একদিন মন্ত্রণালয়ে এসো। কথা বলে সব ভুল বোঝাবোঝি মিটিয়ে ফেলব। কেমন...?”
এতোটুকু বলেই তিনি পিছু ঘুরলেন। দু’কদম এগোতেই তার কানে এল, শেহজাদের তীক্ষ্ণ স্বর,
“ভাইপোকে বলবেন, এসব ছোটদের খেলা অন্য কারো সাথে খেলতে। আমাকে ভয় দেখানোর বৃথা চেষ্টা করে লাভ নেই।”
একটু থেমেই জোর গলায় বলল, “শেহজাদ মূর্তজা ভয় পেতে শেখেনি, সে শুধু অন্যকে ভয় পাওয়াতে জানে।”
রাশেদুল হক ভ্রুঁ কুঁচকে পিছু ফিরলেন। কানে এল,
“তার পাঠানো বো'ম নকল হলেও আমার তৈরি করাটা কিন্তু আসল হবে। একেবারে থ্রিডি কোয়ালিটিসহ।”
বলেই হুট করে চোখ মারল সে। রাশেদুল হক হতভম্ব হলেন। ভড়কানো গলায় বললেন,
“ভয় দেখাচ্ছ?”
শেহজাদ হুট করেই হেসে ফেলল। আশ্চর্য নিয়ে বলল,
“মন্ত্রী সাহেব সাধারণ এক অ্যাডভোকেটকে ভয় পাচ্ছেন নাকি?”
এতোটুকু বলেই সে হতাশ বদনে দুদিকে মাথা নাড়ল। অতঃপর জিভের সাহায্যে ‘চ’ সূচক শব্দ তুলে বলল,
“ভয় পেলেই হারের কাউন্টডাউন শুরু হয়। দেখুন তো, শুনতে পাচ্ছেন কিনা? টিক টক টিক টক!”
বলতে বলতেই সে রাশেদুল হকের কানের কাছে মুখ নিয়ে এল। ফিসফিস করে ভর্ৎসনার মতো করে বলল,
“এতো সহজে হেরে যাবেন?”
রাশেদুল হক হুট করেই কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন। তার মুখের হাসি সরে গেছে। চোয়ালের পেশিগুলোও সংকুচিত হতে শুরু করেছে। তিনি শেহজাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন,
“যা খুশি তাই করো। কিন্তু মনে রেখো, আমি মির্জাকে মা'রিনি। আর এটাই সত্য।”
রাশেদুল হক দ্রুত পায়ে পার্টি ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। শেহজাদ তার গমনপথে সরু চোখে তাকিয়ে রইল। রাশেদুল হকের উদ্দেশ্য সে ধরতে পারেনি। কী করতে এসেছিল লোকটা? শেহজাদের হঠাৎ করেই মনে হলো, এই প্রশ্নের জবাব রোদসীর কাছে আছে। সে ব্যস্ত চোখে রোদসীকে খুঁজতে চেষ্টা করল। প্রতিটি কোণা ভালোভাবে খোঁজার পরেও তাকে না পেয়ে সে চিন্তায় পড়ল। মেয়েটা আবার না বলে চলে গেল কিনা কে জানে? শেহজাদ ঘড়ি দেখল। রাত্রি ন'টা বেজে চল্লিশ মিনিট। এতো দ্রুত চলেও তো যাওয়ার কথা নয়। শেহজাদ ফোন হাতে ত্রস্ত পায়ে বাইরে আসতেই দেখল, বাহিরের প্রি-ফাংশন এরিয়াতে রোদসী একা দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি কাঁচের জানলার বাহিরে। হয়তোবা নীলচে আঁধার আকাশে। শেহজাদ কয়েক পা এগিয়ে, তার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য গলা খাঁকারি দিল। জিজ্ঞেস করল,
“অনুষ্ঠান ফেলে একা দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
“ভেতরের এতো চাকচিক্যে সর্বগ্রাসী আঁধার দেখতে ঠিক কেমন হয় ভুলে যাচ্ছিলাম। তাই..”
শেহজাদ ধীরপায়ে তার পাশে এসে দাঁড়াল। বাহিরে চোখ রেখেই বলল,
“আমি ভাবলাম, জোছনা দেখছেন।”
রোদসী তাচ্ছিল্য হাসল। থেমে থেমে বলল,
“জোছনা দেখার কী আছে? সে তো অসম্ভব সুন্দর কিছু নয়।”
শেহজাদ আশ্চর্য হলো। এতো চমৎকার জোছনাকেও কেউ অসুন্দর বলতে পারে, তা তার ধারণাতেও ছিল না। সে হতবাক গলায় শুধাল,
“কী বলছেন? জোছনা সুন্দর না?”
“না, অন্যের আলো ধার করে নিকষ কালো আঁধারের রাজত্ব বিনষ্ট করা এক গোলাকার পাথর কখনো সুন্দর হতেই পারে না।”
শেহজাদ চকিতে পাশে ফিরল। গ্লাস ভেদ করে চাঁদের রূপোলি আলো আসছে। সেই আলোতে রোদসীকে আজ অন্যরকম দেখাচ্ছে। ভীষণ অন্যরকম। এই অন্যরকম রোদসীকে তার নতুন লাগছে। গলাটাও কেমন অচেনা লাগছে। মেয়েটার কি মন খারাপ? এতো কঠিন কথা বলছে কেন? এতো মোহনীয় চাঁদনী রাতকে কেন অপছন্দ করছে?
“আপনার বুঝি জোছনা অপছন্দ?”
“আমাদের পছন্দ আর অপছন্দে কী যায় আসে, স্যার?”
একটু থেমে রোদসী কী একটা ভাবল, তীব্র মন খারাপ নিয়ে বলল,
“খুব করে চাইলেও অসহ্য গরমে একটু বৃষ্টির দেখা পাইনা। আবার ভীষণ ভীষণ ঘৃণা করলেও চাঁদকে চোখের সামনে থেকে একেবারের জন্য সরাতে পারিনা। চাইলেও খুব খুব খুব পছন্দের কিছু পাইনা। অথচ কখনো না চাওয়া সময়গুলোই বারবার ফিরে পাই। আমার জোছনা পছন্দ নয়। একটুও না।”
রোদসী একনাগাড়ে কথা বলে একটু থামল। শ্বাস নিয়ে আগের মতোই মন কেমন করা সুরে বলল,
“মাঝে মাঝে এবড়োখেবড়ো ঐ শক্ত পাথরটাকে দেখলে আমার অসহ্য লাগে। ইচ্ছে হয়, চিৎকার করে বলি—অন্যের আলো কেড়ে এভাবে তুমি হেসো না, এসো না, একদম এসো না। অথচ তবুও জোছনা নামে। বারংবার নামে, হাজারবার নামে।”
চলবে…