#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_১৬
শেহজাদের হতভম্বতা কাটার আগেই ভেতর থেকে রিহান ছুটে এল। শেহজাদের হাত টেনে ভেতরে নিতে নিতে বলল,
“সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে, ভাইয়ু! জলদি আসো।”
তার তাড়া দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য শেহজাদের মাথা থেকে রোদসীর তিক্ত ভাবনা গুলো সরে গেল। শেহজাদকে ভেতরের দিকে নিতে গিয়ে দরজা অবধি গিয়ে থেমে গেল রিহান। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা হতবিহ্বল রোদসীকে একপলক দেখল। অতঃপর একটু পেছনের দিকে গিয়ে রোদসীর হাত ধরে, তাকেও একরকম টেনে ভেতরে আনল। শেহজাদের মনে হল, মন্ত্রীর লোক হয়তো ভেতরে কোনো হাঙ্গামা করেছে। নয়তো সর্বনাশের কী আছে?
কিন্তু ভেতরে গিয়ে দেখা মিলল সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্যের। স্যূট ব্যূট পরা এনায়েত মূর্তজা ভরা সমাগমে হাঁটু গেঁড়ে বসে ফরিদা বেগমকে ফুলের তোড়া দিচ্ছেন। বিপরীতে ফরিদা বেগম লাজে রাঙা হয়ে উঠেছেন। তিনি চাপা গলায় বারবার বলছেন,
“কী করছো? ছেলেপুলে, নাতি-নাতনি সব সামনে। লাজ-লজ্জা সব ভুলে গেলে নাকি? ওঠো! ওঠো বলছি! রাতে হাঁটুর ব্যথা বলে কাঁদলে আমি কিন্তু মালিশ টাকিশ করে দেব না বললাম।”
এনায়েত মূর্তজা থামলেন না। শুনলেন না মেকী সেসব শাসন। বুক ফুলিয়ে বললেন,
“পঁয়ত্রিশটা বছর ধরে আমার মতো অধমের সাথে সংসার করে যাওয়ার জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। সেই সাথে প্রথম দিনের মতোই অনেক অনেক প্রেম।”
একটু থেমেই হাসি হাসি মুখে বললেন,
“সে তুমি আমায় যতোই বুড়ো বলো না কেন? আমি কিন্তু তোমাকে একদম শুরুর দিনের মতোই ভালোবাসি। ক'দিন পর দেখবে আমার বেচেকুচে থাকা চুলগুলো সব ঝরে যাবে, হাঁটুর ব্যথায় হাঁটা-চলাও হয়তো বন্ধ হবে। বিছানায় গড়াগড়ি খেতে খেতেও তখন তোমাকে বলতে থাকব, ভালোবাসি। প্রথম দিনের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি ভালোবাসি। এভাবে বউকে ভালোবাসতে ভালোবাসতেই একদিন ম’রে যাব। তারপর ওপারে গিয়ে খোদার কাছে কান্নাকাটি করব, বলব আমার বউকে এনে দেন মাবুদ! ওকে ছাড়া আমি অচল।”
ফরিদা বেগম এবার কেঁদে ফেললেন। লোকটা তাকে বরাবরই পাগলের মতো ভালোবাসে। এতো এতো ভালোবাসায় মাঝেমাঝে তার হিংসে হয়। নিজেই নিজের সুখে অবাক হয়ে ভাবেন, একটা মানুষ এতো কীভাবে ভালোবাসতে পারে? প্রতিবার আগেরবারের চেয়েও বেশি পাগলামি করে লোকটা কেমন তাক লাগিয়ে দেয়। এইযে সপ্তাহখানেক ধরে রাত বিরাতে অদ্ভুত অঙ্গ ভঙ্গিমা করছিল, সব বুঝি এইদিনের প্রস্তুতি ছিল? একবারও মাথায় আসেনি। ফরিদা বেগমকে কাঁদতে দেখে তাড়া দিলেন এনায়েত মূর্ডজা। বললেন,
“এইবার ফুলটা নাও প্লিজ। এর চেয়ে বেশি দেরী হলে আমার মাজার ব্যথা শুরু হবে।”
অবশেষে চারিদিকের করতালির মাঝে অশ্রুসজল চোখে ফুলের তোড়া গ্রহণ করলেন তিনি। ফুলের তোড়াটা সন্ধ্যায় শেহজাদই এনে দিয়েছে। তবে বাবা যে এমন কিছু করবেন তা সেও জানতো না। শেহজাদকে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিহান তাকে প্যান্ট টেনে ডাকল। উদাস গলায় বলল,
“তোমার লাইন তো হওয়ার আগেই কেটে গেল, ভাইয়ু। তোমার ফুল অন্য কেউ নিয়ে গেল। এবার কী হবে?”
শেহজাদ ভড়কে গেল। হাঁটু ভাঁজ করে বসে রিহানের উচ্চতার কাছাকাছি এল। অবাক হয়ে বলল,
“লাইন কেটে গেল মানে?”
রিহান কপাল চাপড়ে ডানে বামে তাকিয়ে রোদসীকে খুঁজল। দেখা গেল পিলারের পাশে এককোণে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে সে। পাশ থেকে ফায়াজ ভাই ড্যাবড্যাবিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। ফায়াজ ভাই শেহজাদের চেয়ে চার বছরের বড়। নয়না আর ফায়াজ ভাই বাদে বাকিদের সাথে বয়সের পার্থক্য ভয়ানক। কারো বাচ্চা কাচ্চা কলেজে যাচ্ছে, কেউ আবার নিজেই বাচ্চা। ফায়াজ ভাই অবশ্য এখনো বিয়ে করেননি। বেচারা যেখানেই মেয়ে দেখতে যান, সেই মেয়েই মিষ্টি করে রাজি হয়। কিন্তু তার দুয়েকদিন পরই সংবাদ পাওয়া যায় মেয়ে পালিয়েছে। পরপর দু'বার একই ঘটনা ঘটায় তার মতিভ্রম হয়েছে। তার কপালে বিয়ে নেই বলে বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে। সেই সুবাদে তিনি চিরকুমার সংঘের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক। তবে তার মতো লোক হঠাৎ এভাবে রোদসীকে কেন দেখছে সেটাই ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। রিহানের দেখাদেখি শেহজাদও সেদিকে তাকিয়েছে। সন্ধ্যার ঘটনা মনে আসতেই তার টনক নড়ল। মৃদু করে কান টেনে ধরল রিহানের। রুক্ষ গলায় বলল,
“এসব পাকনামি করতে নিষেধ করেছি না তোকে?”
রিহান কপাল কুঁচকে শেহজাদের হাতটা সরাল। বিরক্ত হয়ে হাঁটা দিল ফায়াজ ভাইয়ের দিকে। মনে হচ্ছে ওদিকের মামলাটা বেশ জম্পেশ হতে যাচ্ছে। রিহানকে দৌড়াতে দেখে শেহজাদ উঠে দাঁড়াল। বাকিটা সময় সে অনুষ্ঠানেই পূর্ণ মনোযোগ রাখল। একবারের জন্যেও দেখল না উশখুশ করা ফায়াজ ভাইয়ের মুখটা। ভদ্রলোক বোধহয় রোদসীকে পছন্দ করতে শুরু করেছেন। অন্তত তার ছটফটে নজর তো তাই বলছে। রিহান মনোযোগ দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ফায়াজ ভাইকে দেখল। শেষে বিরবির করে বলল,
“এক পাগলে ভাত পায় না, নতুন পাগলের আমদানি!”
এই কথাটাও সে মুভি দেখে শিখেছে। এক নায়িকা নিয়ে দু’জন নায়ক টানাটানি করলেই বাবা এই কথাটা বলে। শেহু ভাইয়ার কাহিনি নিয়ে বাবার সাথে বসতে হবে। এই গল্পের শেষটা নিয়ে জল্পনা কল্পনা করতে হবে। রিহানের মা তাকে যতোটা রেস্ট্রিশনে রাখে। বাবা ঠিক ততোটাই লাই দেয়। রিহানের বাবা রিজওয়ান এখনো বাকি পাঁচটা বাবার মতো গম্ভীর হতে শেখেনি। সময় পেলেই সে রিহানের সাথে ভিডিও গেমস খেলতে বসে। এসব নিয়ে দিনে বার কয়েক মায়ের বকাঝকা খেলেও তার স্বভাব বদলে না। রিহানের ভাবনার সুতো বেশি দূর অবধি যাওয়ার সুযোগ পায় না। তার আগেই তার চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে। অনুষ্ঠানে বসেই সে পাড়ি দেয় স্বপ্নীল ঘুমরাজ্যে।
আগের রাতের জমজমাট অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে তুমুল বৃষ্টি হয়। ঘড়িতে তখন বারোটা পেরিয়েছে। বৃষ্টির গতি দেখে মনে হলো, বেশ অনেক্ষণ এই বৃষ্টি চলবে। একে একে গাড়ি নিয়ে সবাই বেরিয়ে যেতে শুরু করলে বাঁধে বিপত্তি। ফরিদা বেগম এতো রাতে কাউকেই বাড়ি যেতে দেন না। সকলকে নিজেদের বাসায় নেওয়ার জন্য জোরাজুরি করেন। নিজেদের মানুষজন রাজি হলেও বিপত্তি বাঁধে রোদসীকে ঘিরে। ততক্ষণে হাসি তার নিজের বাসার উদ্দেশ্যে চলে গিয়েছে। তন্ময়ও শেহজাদের কাজিনদের সাথে গাড়িতে করে জলনুপূরের উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করেছে। রোদসীর যেন কোনো কিছুতেই কোনো হেলদোল নেই। তার অন্যরকম মুখাবয়ব দেখে দুর্বিপাকে পড়েন এনায়েত মূর্তজাও। বৃষ্টির ছাঁটে তারা সবাই মোটামুটি আধভিজে হয়ে গেল। রোদসীর পরনের শাড়িটা তুলনামূলক পাতলা। বৃষ্টির ঝাপটায় এই মাঝরাতে যুবতী মেয়েটির শাড়ি ভিজে গেলে, সেটা নিশ্চয়ই খুব একটা শোভনীয় দৃশ্য হবে না। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটিতে মেয়েটির কোনো হেলদোল নেই। অনুষ্ঠানের শেষাংশ থেকেই সে অন্যমনষ্ক। সে যে কী ভাবছে, তা ঠিক বোঝা গেল না। এনায়েত মূর্তজা আর ফরিদা বেগমের নানাবিধ প্রশ্নের বিপরীতেও মেয়েটিকে দেখা গেল নির্বিকার। শূন্যে তাকিয়ে কী এক বিষণ্নতায় ডুবেছে সে। তাকে একভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বড় করে শ্বাস ফেলে শেহজাদ। পরনের কোটটা খুলে কাঁধের ওপর থেকে আলগা করে তার গায়ে জড়ায়। বিনা অনুমতিতে হাতটা ধরে নিজের গাড়ির দিকে নিয়ে যায় রোদসীকে। যাওয়ার পথে বিরস গলায় বলে,
“উনার মা বাসায় একা আছেন। উনার পক্ষে রাতে থাকা সম্ভব নয়।”
গাড়িতে বসার বেশ কিছুক্ষণ পর রোদসী তার মুখ খুলে। বাসা বদলানোর খবরটা শেহজাদের জানা ছিল না। ঠিক সময়ে না জানলে উল্টো পথে যাওয়া লাগতো। শেহজাদ ভেবে পায় না, একটা মানুষ এতো বিষণ্ন কী করে হতে পারে? কতোটুকু তিক্ততা নিয়ে বাঁচলে প্রকৃতির এক মোহনীয় সৌন্দর্যকেও নিদারুণ যন্ত্রণার বেশে দেখতে হয়? গতরাতে সে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছে। দেখেছে, কোনো এক জাদুবলে তার আর রোদসীর আত্মা বদলে গেছে। রোদসী পেয়ে গেছে হাসিখুশি সুখী পরিবার আর সে পেয়েছে তীব্র হাহাকার নিয়ে ধুঁকতে থাকা এক জীবন। সেই জীবনের কয়েক মুহূর্ত তার শ্বাস আটকে দিচ্ছিল। স্বপ্নটা বেশিক্ষণ দেখতে হয়নি। তার আগেই পাশে শোয়া ফায়াজ ভাইয়ের দু মণ ওজনের হাতের চাপে তার ঘুম ভেঙেছে। অথচ ওই কয়েক মিনিটের স্বপ্নেই তার মনে হচ্ছিল, দম আটকে সে ম'রে যাচ্ছে। জীবনের এতোগুলো বছর এই ছাইচাপা যন্ত্রণা নিয়ে রোদসী বাঁচছে কীভাবে?
শেহজাদের ঘুম ভেঙেছে বেশ অনেক্ষণ আগে। তবু সে চোখ দুটো খুলেনি। তার বারবার মনে হচ্ছে, গতকাল রিহান না আসলে রোদসী হয়তো আরো কিছু বলতো। সেই কিছু শুনতে না পাওয়ার আফসোসে তার অস্থির লাগছে। শেহজাদ বিছানা ছাড়ল তন্ময়ের হাঁক ডাকে। গত রাতে এবাড়িতেই ছিল সে। সকাল সকাল কী এক আশ্চর্য নিয়ে ডাকতে শুরু করেছে। শেহজাদ চোখ বন্ধ রেখেই নড়েচড়ে উঠল। ঘুমজড়ানো গলায় শুধাল,
“কী সমস্যা?”
“শুধু সমস্যা না, স্যার; মহা সমস্যা। মোহাম্মদ আলী আজ সকালেই ডিবি অফিসে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছে।”
তন্ময়ের কথাটা শেহজাদের কাছে বিনা মেঘে বর্জ্রপাতের মত শোনাল। সে থতমত খেয়ে উঠে বসল। সন্দিহান গলায় বলল,
“কী বলছ? সে তো জামিনে মুক্তি পেয়েছে। আত্মসমর্পণ করতে যাবে কেন?”
“তা তো বলতে পারছি না, স্যার। তবে সকাল থেকে এ নিয়ে খবরের চ্যানেলগুলো সব জোট বেঁধেছে।”
শেহজাদ সময় নষ্ট করল না। চটজলদি ফ্রেশ হয়ে ছুটল ডিবি অফিসের দিকে। তন্ময়ও সঙ্গ দিল তার। শেহজাদের মাথা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না, দ্বিতীয় শুনানির দু’দিন আগে হুট করে আলী আবার আত্মসমর্পণ করতে গেল কেন? প্রথম শুনানিতে জামিন পাওয়ার পরেও এমন বোকামি কেউ কী করে করতে পারে? অতিরিক্ত রাগে সে ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে। চিন্তায় মগ্ন থেকেই বাঁ হাতে কপাল ঘষল সে, জানতে চাইল,
“আলী ডিবি অফিসে কখন গেল?”
“কখন বা কার সাথে গেছে তা তো জানি না, স্যার। পুলিশ বলছে সে একা এসেছে। সে নাকি নিজের মুখে বলেছে— মির্জা কামরুল তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করত, গায়ে হাত তুলত, তাই সে রাগ সামলাতে না পেরে তাকে সাতবার ছু'রি মে’রেছে।”
একটু থেমে সে আড়চোখে শেহজাদকে দেখল। লোকটা আজ নিজেই ড্রাইভ করছে। সেই ড্রাইভিং এর গতিও খুব একটা সুবিধার না। কোথায় কখন লাগিয়ে দিয়ে কী অঘটন ঘটায় কে জানে? শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে প্রস্তুত করল তন্ময়। থেমে থেমে বলল,
“স্যার, নিউজটা কিন্তু অলরেডি ব্রেকিং নিউজ হিসেবে সব জায়গায় চলছে। এই কেসটা মনে হচ্ছে এখানেই শেষ।"
শেহজাদ শব্দ করে স্টিয়ারিং এ হাত রাখল। জোর গলায় বলল,
“ইম্পসিবল!”
তাকে আরও রেগে যেতে দেখে তন্ময় মুখের লাগাম টানল। পাছে তার কথায় ক্ষেপে গিয়ে দূর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে! তন্ময় থামতেই তার ফোনে কল এল রোদসীর। ওপাশ থেকে কী বলল তা ঠিক শোনা না গেলেও তন্ময় বেশ রয়েসয়ে বলল,
“আমরা ডিবি অফিসে যাচ্ছি। উই উইল ম্যানেজ ইট।”
বলা বাহুল্য, কথাটা রোদসীর কাছে নিজেকে শক্ত প্রমাণ করতে বলেছে সে। আদতে তার থানায় যাওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই। এর আগে যতবার সে থানায় গিয়েছে ততোবারই বিশ্রিভাবে কোনো না কোনো কয়েদিকে মা'র খেতে দেখেছে। আজও তেমন কিছু দেখে হুট করে মাথা ঘুরে গেলে বিপদ হবে। তন্ময়ের অকাট্য ভরসাকে রোদসী কতটুকু গ্রহণ করল কে জানে? খট করেই লাইনটা কেটে গেল। তন্ময় ফোনটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল। তারপর মনে মনে বলল,
“যেমন স্যার, তেমন ম্যাডাম! একদম পার্ফেক্ট এসিস্ট্যান্ট জুটেছে স্যারের।”
শেহজাদ সবসময়ই এই কাজটা করে। কাজের কথা বলেই দুম করে কল কেটে দেয়। অনেকসময় সে কল কেটে দেওয়ার পরেও তন্ময় বোকার মতো বেশ অনেক্ষণ কথা বলে ফেলে। পরে ব্যাপারটা বুঝতে পারলে এতো লজ্জা লাগে! শেহজাদ কিছুতেই নিজেকে শান্ত করতে পারছে না। বারবার মনে হচ্ছে, কোথাও কিছু একটা বড় গন্ডগোল হয়েছে। নয়তো তার সাজানো গোছানো কেস এভাবে ফ্লপ করতেই পারে না। সিসিটিভি ফুটেজে তার কাছে স্পট প্রমাণ আছে, তাকে মেকি হুমকি দিয়ে পাটানো ঐ পার্সেল রাশেদুল হকের ভাইপো আসিফ পাঠিয়েছে। ফার্মেসির সিসিটিভি ফুটেজে মাস্ক ছাড়া ছবিতে আসিফকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আসিফ দ্রুত পায়ে ফার্মেসিতে এসেছিল। কিনেছিলো একটা কালো রঙের সার্জিক্যাল মাস্ক। হোমওয়ার্ক না করেই এসেছিল সে। তাই শেষ সময়ে কুরিয়ারের গলির ফার্মেসি থেকেই মাস্ক কিনেছিল। এ ছাড়াও ফার্মেসির বাহিরে লাগানো সিসিটিভি ফুটেজে পার্সেল হাতে ফার্মেসির সামনের গলিতে দু'বার তাকে ঘুরতে দেখা গেছে। খুব সম্ভবত নামাজের বিরতি থাকায় কুরিয়ার অফিস তখন সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ ছিল। এমন সরাসরি সংযুক্ত প্রমাণ হাতে পাওয়ার পর রাশেদুল হককে নিয়ে সন্দেহের আর কোনো অবকাশ থাকে না। এই সরল কেসটাকে শুধুমাত্র তার মক্কেলের ধোঁকার জন্য তাকে হারতে হবে। এ তো রীতিমতো অবিশ্বাস্য ব্যাপার!
শেহজাদ কী একটা ভেবে গাড়ি ঘুরাল। সরাসরি ডিবি অফিসে না গিয়ে গেল দ্য থার্ড আই চেম্বারে। সেখানে হাসি ছাড়া আর কেউই নেই। শেহজাদ চটজলদি কেস সম্পর্কিত সবগুলো ফাইল আর এভিডেন্সে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিল। আলী দোষী হয়ে থাকলে, তার একার পক্ষে এতো পরিষ্কারভাবে খু'নের প্র’মাণ সরানো সম্ভব নয়। তাছাড়া, সে যদি খু'ন করেই থাকতো তাহলে রোদসীর ফাঁপড়ে সেদিন বিশ হাজার টাকার ঘটনাটা স্বীকার করতো না। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কামরুল হাসানের ম্'ত্যুতে তার কোনো লাভ নেই। উল্টো যাও মাসিক বেতন আসতো তাও প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তাহলে? তাহলে সে অকারণ তাকে মা'রবেই বা কেন? আর মে'রে থাকলেও রিমান্ডে যাওয়ার পর সত্য স্বীকার না করে, জামিন পাওয়ার পর স্বীকার করার কারণ ঠিক কী? লোভ নাকি ভয়? কোনটা? ঠিক কোন দূর্বলতায় আঘাত করেছে রাশেদুল হক? তীব্র রাগে হিতাহিত হারিয়ে আচমকাই টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলো সে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। গলা চড়িয়ে তন্ময়কে বলল,
“উইল! কামরুল হাসানের উইল কোথায়? রোদসীকে ডাকো। এক্ষুনি।”
শেহজাদের কথা শেষ হওয়ার আগেই দরজায় রোদসীকে দেখা গেল। মেয়েটির পরনে গাঢ় নীল রঙের একটি কূর্তি, গলায় ঝুলছে মেঘবরণ ওড়না। তার চোখে আজ ভিন্ন একটি চশমা শোভা পাচ্ছে। এই ফ্রেমটি অনেকটা রোজ গোল্ড রঙের। চশমার আড়ালেই তার চোখদুটো লালচে হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, গতরাতে সে ঘুমায়নি। শেহজাদের ক্রোধান্বিত বাক্যের বিপরীতে ভেসে আসল তার শান্ত জবাব,
“এতো হাইপার হওয়ার কিছু নেই। সবে ন’টা বায়ান্ন বাজছে। অফিস টাইমের আগেই আমি এসেছি।”
শেহজাদ রোদসীর সেই যুক্তিতর্কে সময় অপচয় করতে চাইল না। সোজাসুজি জানতে চাইল,
“কামরুল হাসানের উইলের ব্যাপারে খোঁজ নিতে বলেছিলাম। নিয়েছিলেন?”
“জি, নিয়েছি। এবং একটা আশ্চর্যজনক তথ্য জানতে পেরেছি।”
“কেমন তথ্য?”
“কামরুল হাসান তার সকল প্রকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির অগ্রাধিকার তার পালিত কন্যা কানিজ পাবে।”
“হোয়াট! পালিত কন্যা?”
“জি, পালিত কন্যা।”
“তার কোনো পালিত কন্যা আছে এই তথ্য তো আমাদের কাছে ছিল না।”
“আমরা সকলে তার যেই ছোট সন্তানকে চিনি, সেই ছোট সন্তানই তার পালিত কন্যা। সারাজীবন কিপটে বলে পরিচিত হওয়া কামরুল হাসান তার জীবনের এতো সম্পত্তির সত্তর শতাংশই দিয়ে গেছেন তার পালিত কন্যাকে। বাকি ত্রিশ শতাংশ তার দুই ছেলের মাঝে সমানভাবে ভাগ হবে।”
“নিজের সন্তানকে রেখে পালিত কন্যাকে এতো প্রাধান্য? এর কারণ কী হতে পারে?”
“কারণ তার ছেলে দুজনই গুড ফর নাথিং। অন্যদিকে পালিত মেয়ে কানিজ এদিক থেকে বেশ এগোনো। ভদ্রলোকের ব্যবসা এখন কানিজই পরিচালনা করছে। তাছাড়া..”
“তাছাড়া?” শেহজাদ উতলা হয়ে উঠেছে। এই নতুন তথ্যটা তার মাথা পুরোপুরি এলোমেলো করো দিচ্ছে।
“তাছাড়া, পূর্বাচলের ঐ জায়গাটার আসল মালিক কখনো কামরুল হাসান ছিলেনই না। গত দু'বছর আগেই তিনি এই জমি এককভাবে কানিজের নামে করে দিয়েছেন।”
“আনবিলিভেবল!”
শেহজাদ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এতো বড় একজন শিল্পপতি এভাবে তার ঔরসজাত সন্তানকে ঠকিয়ে পালিত মেয়েকে সব দিয়ে যাবেন তা সে কল্পনাও করতে পারছে না। এই খবর থেকে অন্তত তার এই ধারণা আরও পরিপক্ক হলো যে, কামরুল হাসানের মৃ'ত্যুতে মোহাম্মদ আলীর এক আনাও লাভ নেই। তবে তার আত্মসমর্পণের কারণ ভয় নাকি লোভ তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে হলে তার সাথে দেখা করা একান্তই জরুরি। তার মাইন্ড রিড করার জন্য সাথে দরকার রোদসীকেও।
শেহজাদ যখন রোদসীকে সঙ্গে নিয়েই ডিবি অফিসে গেল সূর্য তখন একটু একটু করে মাথার ওপরে উঠতে শুরু করেছে। সেখানে গিয়ে তাকে মুখোমুখি হতে হলো বিব্রতকর পরিস্থিতির। ইন্সপেক্টর মোয়াজ্জেম তাকে কোনোভাবেই মোহাম্মদ আলীর সাথে দেখা করার অনুমতি দিতে চাইল না। তার ভাষ্যমতে, আলী নিজেই শেহজাদের সাথে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এক কথা দু’কথায় কথা বাড়ল। শেষ অবধি শেহজাদ তার নিজের জায়গায় অটল রইল। তার মক্কেলের সাথে দেখা না করে সে ডিবি অফিস ছাড়বে না। অসহ্য হয়ে ইন্সপেক্টর মোয়াজ্জেম আলীকে ডাকিয়ে আনলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল, তার সামনেই পাকাপাকি ভাবে শেহজাদের সাথে দেখা না করার ব্যাপারটা জানিয়ে দেওয়া। মোহাম্মদ আলী সামনে এসেই অকপটে বলে ফেলল,
“আমার আর উকিল লাগবে না, স্যার। আপনি আর কষ্ট কইরা আইসেন না।”
“আসবো না মানে? আপনি কী ভাবছেন? পুলিশের কাছে এসে আমি দোষী বললেই সব শেষ? এর আগে তারা আপনাকে লিখিত কাগজে সাইন করায়নি? মনে নেই আপনার? এসব জোর করে নেওয়া সাইন আদালতে ঠাঁই পেয়েছে? পায়নি। তাহলে আজ কেন ভয় পাচ্ছেন?”
আলী কাঁচুমাচু করে বলল,
“আমি ভয় পাইতাছি না, স্যার। আর এইবার আমারে কেউ জোর করেও নাই। আমি নিজে থিকা কইছি। আমিই দোষী। আমিই মা'রছি মির্জা সাবরে।”
শেহজাদ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“বেশ, বলুন তবে মা'রার পর মির্জা কামরুল হাসানের লা'শকে আপনি কী করেছেন?”
আলী এবার বেশ বিপাকে পড়ল। লা'শ কী করেছে এই প্রশ্নের জবাব তার জানা নেই। তাকে আটকে যেতে দেখে বাধা দিল ইন্সপেক্টর মোয়াজ্জেম। চতুর গলায় বলল,
“আপনি ভুলে যাচ্ছেন, অ্যাডভোকেট মূর্তজা। আপনি এখন আর মোহাম্মদ আলীর উকিল নন। তাই আত্মসমর্পণ করা আসামীকে আপনি এভাবে উস্কাতে পারেন না।”
শেহজাদ শ্লেষাত্মক হেসে কয়েক কদম এগিয়ে গেল। মোয়াজ্জেমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,
“আপনি বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন, আপনি কার সাথে কথা বলছেন। এটা আমি, অ্যাডভোকেট মূর্তজা। আমাকে আপনি আইন শেখাবেন? ওহ রিয়েলি!”
এতোটুকু বলেই সে থামল। সামনে দাঁড়ানো অপ্রস্তুত মোয়াজ্জেমকে পুরোপুরি কাবু করতে হেঁয়ালি বাদ দিয়ে ধারালো গলায় বলল,
“আপনি তার আত্মসমর্পণ গ্রহণ করার কেউ নন। একজন আসামীর আত্মসমর্পণ শুধু এবং শুধুমাত্র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রেকর্ড করতে পারেন। তিনি কোর্টে বসবেন সকাল এগারোটায়। এখন বাজছে দশটা বেজে ঊনপঞ্চাশ মিনিট। অতএব, এখনো অবধি লিগ্যালি, আমি মোহাম্মদ আলীর উকিল এবং আমার তার সাথে কেস জনিত কথাবার্তা বলার পূর্ণ অধিকার আছে।”
শেহজাদের তোপ কাজে দিল। মোয়াজ্জেম পুরোদস্তুর মুষড়ে গেল। তাকে আরেকটু ভড়কাতে রোদসী হুট করেই বলল,
“তাছাড়াও আপনার জানা উচিত, ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট আত্মসমর্পণ করলেও ৩ ঘন্টার রিফ্লেকশন টাইম পাওয়া যায়। অতএব, কেউ আত্মসমর্পণ করেছে শুনেই ওভার কনফিডেন্ট হয়ে যাবেন না। নাথিং নিউ আন্ডার দ্য সান।”
মোয়াজ্জেম শুকনো ঠোঁটজোড়া জিবের সাহায্যে ভিজিয়ে নিয়ে কিছু একটা বলতে চাইল। রোদসী তার সেই কথা শোনার আগেই বলল,
“আমাদের ক্লায়েন্টের প্রাইভেসির কথা চিন্তা করে আমরা আপনার সামনে মোহাম্মদ আলীর সাথে আমাদের কথোপকথন আগাতে পারছি না। সো, ক্যুড ইউ প্লিজ লিভ আস এলোন?”
তীব্র অপমানে মোয়াজ্জেমের মুখটা আঁধার হয়ে এলো। তার অফিসে দাঁড়িয়েই চ্যাংড়া উকিলগুলো তাকে যা নয় তাই বলছে। শেষবেলায় নিজের অফিস থেকেই তাকে বের হতো হচ্ছে। এর চেয়ে বড় অপমান আর কী হতে পারে? মোয়াজ্জেম বেরিয়ে যাওয়ার পর শেহজাদ পুনরায় প্রশ্ন করল,
“কী ব্যাপার জবাব দিচ্ছেন না কেন? বলুন, ক'টার সময়, কীভাবে, কোন জায়গায় তাকে আপনি মে'রেছেন?”
আলী এবারো জবাব দিতে পারল না। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকে আচমকাই ফ্যালফ্যাল করে কেঁদে ফেলল। বলল,
“আমারে আপনি ছাইড়া দেন, স্যার। আমি আর এগুলা শুনতে চাই না। আমি খালি জানি— আমি দোষ করছি, সাজা চাই।”
শেহজাদ কপালে আঙুল ঘষে বড় করে শ্বাস ফেলল। নরম গলায় বলল,
“কাকে ভয় পাচ্ছেন?”
“আমি কাউরে ভয় পাইতাছি না, স্যার।”
“তাহলে কেন করছেন এমন? গত হিয়ারিং এই তো আমি প্রমাণ করেছিলাম—আপনি গতমাসে আপনার ছেলের চিকিৎসাও করাননি। অর্থাৎ আপনার টাকারও কোনো প্রয়োজন ছিল না। না তারা কোনো মোটিভ অব মার্ডার ক্লিয়ার করতে পেরেছে। এতো বড় আরোপ থেকে আপনি প্রথম শুনানিতেই বিনা শর্তে জামিন পেয়েছেন। জামিন পেয়েও নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারলেন কেন?”
একটু থেমেই উঁচু গলায় ধমকে উঠল,
“কী হলো জবাব দিচ্ছেন না কেন? বলুন, কত টাকা দিচ্ছে মন্ত্রী?”
আলীর কান্নার জোর বাড়ল। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“বিশ্বাস করেন, আমারে কেউ টাকা দেয় নাই, স্যার। কেউ না।”
ভদ্রলোককে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখে শেহজাদ নতুন করে আর কোনো প্রশ্ন করল না। দরাজ গলায় বলল,
“এই আত্মসমর্পণের নাটক বন্ধ করুন জলদি। নয়তো ফল খুব একটা ভালো হবে না। যে বা যার কথায় আপনি আসল দোষীকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন, তাকে বলে দেবেন, এই কেসের শেষ শেহজাদ মূর্তজা দেখে ছাড়বে।”
এতোটুকু বলেই শেহজাদ হনহন করে ডিবি অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। রোদসী তবু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। চোখ ভরে দেখল কাতর আলীর মুখাবয়ব। লোকটা দুর্বলতার জন্য ঠিক করে দাঁড়াতেও পারছে না। এই সময়ও সে একটা খু'নের আরোপ মাথায় তুলে নিচ্ছে। অথচ সেদিন সে বারবার অনুনয় করে তাকে বাঁচাতে বলছিল। দু'দিনের মধ্যে কোনদিনের আলী সৎ তা সে বোঝার চেষ্টা করল। যাওয়ার আগে একবারের জন্য বলল,
“যা করবেন ভেবে করবেন। আপনার একটা সিদ্ধান্তে কেসটা জটিল থেকে জটিলতর হবে। আসল অপরাধী তো ধরা পড়বেই। মাঝখান থেকে শুধু শুধু কোর্টে দাঁড়িয়ে মিথ্যে বলার অপরাধে আপনার কড়া সাজা হবে।”
তাকে সাবধান করে রোদসী এক মুহূর্তও দাঁড়ায়নি। বাহিরে এসে দেখল, শেহজাদ সিগারেট জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তা ঠোঁটের কাছ অবধি আনছে না। তার দু'আঙুলের ফাঁকেই তা একটু একটু করে জ্বলছে, বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী। রোদসীকে আসতে দেখে সে সিগারেটটা ফেলে দিল। মন ঘোরাতে সে সিগারেট জ্বেলেছে, কিন্তু সিগারেটটা মুখ অবধি আনার মতো ফুরসত পায়নি। তার আগেই মাথায় একে একে ঘুরলো বেশ অনেকগুলো প্রশ্ন। উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইল,
“কী মনে হয়? উনি ভয় পেয়েছেন নাকি টাকার কাছে বিক্রি হয়েছেন?”
“দুটোর কোনোটাই না।”
শেহজাদ চমকে উঠল। রোদসীর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,
“তাহলে?”
“তার চোখে অনুশোচনা ছিল। এই অনুশোচনা তার চোখে আগোরবার ছিল না। তার মানে এর মাঝে সে কিছু না কিছু অবশ্যই করেছে। কোনো অপরাধ না করলে রাতারাতি এমন অনুশোচনা জন্ম নিতো না।
শেহজাদ রোদসীর কথায় নতুন করে চিন্তায় পড়ল। তাকে একভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রোদসী বিরামহীন গলায় বলল,
“সকালে নাস্তা করিনি। আপনার সমস্যা না থাকলে, রাস্তার পাশের টং টা থেকে এক কাপ চা খেয়ে আসতাম।”
শেহজাদ অন্যমনষ্ক ছিল। রোদসীর কথায় তার হুশ ফিরল। নিচু গলায় বলল,
“হু! চলুন, আমিও এক কাপ চিনি ছাড়া রং চা খাব।”
রোদসী চায়ের অর্ডার দেওয়ার সাথে সাথেই টঙের দোকানে লাগানো টিভিতে সরগরম একটি খবর প্রচারিত হলো। বলা হলো,
“ডেমরার কাছে একটি বালুর মাঠে পাওয়া গেছে, ক্যাফে শ্যাডোর বেশ কিছুদিন ধরে গুম হওয়া ওয়েটার সাগরকে। প্রাথমিকভাবে লা'শ শনাক্ত করা না গেলেও পরবর্তীতে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে পুলিশ এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়। এক নিরীহ ওয়েটারের এমন নিদারুণ মৃ'ত্যুকে ঘিরে জনমনে আ’তঙ্ক তৈরি হচ্ছে। তার সাথে কাজ করা লোকজন জানান, সাগর একজন ভালো মানুষ ছিল। কোনো কারণে সে কোনো ভুল করলেও নিজ থেকেই তা স্বীকার করে শুধরে নিতো। তার এই স্বভাবের জন্যই কলিগদের মাঝে তার বেশি পরিচিতি ছিল। তারা সকলেই এই হ'ত্যার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে, খু'নির কঠিন থেকে কঠিনতর সাজা চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেন।”
টং এর বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও গোটা খবরটা রোদসী বেশ স্পষ্টই শুনতে পেল। কাপদুটো হাতে নিয়ে তারা ধীরে ধীরে জায়গাটা থেকে বের হতে শুরু করল। গাড়ির কাছাকাছি আসতেই রোদসী চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
“সাগর যে মা'রা গেছে তা আপনি আগে থেকেই জানতেন। তাই না?”
শেহজাদ চা হাতে রোদসীর দিকে তাকাল। তিক্ত গলায় শুধাল,
“এমন মনে হওয়ার কারণ?”
“কারণ গোটা খবরে আপনি একবারের জন্যেও আশ্চর্য হননি। কিংবা চোখের পলকও ফেলেননি। মনে হয়েছে, আপনার জানা কোনো খবর পুনরায় কানের সামনে বেজেছে তাই তাতে গুরুত্ব দেননি।”
শেহজাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সত্যিটা স্বীকার করে বলল,
“হু! শেষদিন ডিবি অফিসে আসার পর বেনামি লা'শ পাওয়ার কথা শুনে ধারণা করেছিলাম।”
“এবার আরেকটা জিনিস ধারণা করুন তো!”
“কী?”
“জাহিদ এবং সাগরকে সরিয়ে আলীর কী লাভ? শেহজাদ মূর্তজাকে ভয় দেখিয়ে কেস থেকে সরাতে চাওয়া মন্ত্রীর ভাইপো আসিফেরই বা ঠিক কী উদ্দেশ্য?”
চলবে…