#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_১৭
ডিবি অফিস থেকে বের হয়ে শেহজাদ আর রোদসী যখন চেম্বারে ফিরে এল, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল একদম ছুঁইছুঁই। লাঞ্চটা তারা বাহিরেই করে এসেছে। কেবিনে ঢুকেই শেহজাদ তটস্থ হয়ে হোয়াইটবোর্ডের সামনে দাঁড়াল। ড্রয়ার থেকে মার্কারটা বের করে বোর্ডের ওপর পরপর কয়েকটা শব্দ লিখল— মির্জা কামরুল, আলী, জাহিদ, সাগর, রাশেদুল হক, আসিফ এবং উইল।
রোদসী আরাম করে নিজের চেয়ারে বসেছে। সেখানে বসেই সে শেহজাদের হুলুস্থুল কাণ্ড দেখছে। লোকটার চোখেমুখে এখন আর সকালের মতো অস্থিরতা নেই। বরং সেখানে জায়গা করে নিয়েছে এক তীক্ষ্ণ, শীতল স্থিরতা। একজন দুর্ধর্ষ শিকারি যখন তার শিকারের গন্ধ পেয়ে যায়, তখন হয়তো তাকে ঠিক এরকমই দেখায়। নাকি জালে জড়ানো ধূর্ত শেয়াল প্রাণ বাঁচাতে এমন কান খাড়া করে বিপদের গভীরতা আঁচ করে?
"তন্ময়!" শেহজাদ না ঘুরেই হাঁক দিল।
তন্ময় সেই ডাক শুনতে পেল না। পাওয়ার কথাও নয়। লোকটা দ্বিতীয় দফায় হাঁকডাক শুরু করার আগেই রোদসী হাত বাড়িয়ে ইন্টারকমে প্রেস করল। একটু পরেই তন্ময় কেবিনে ঢুকল। শেহজাদ গমগমে স্বরে জানতে চাইল,
“সাগরের মৃ’ত্যু নিয়ে পুলিশ কি কোনো স্টেটমেন্ট দিয়েছে?”
“কোন সাগর?”
হুট করে সাগরের নাম শুনে তন্ময় মোটামুটি ঘাবড়ে গেছে। সে শুরু থেকে সাগরের ব্যাপারে কিছুই জানে না। রোদসী শান্ত গলায় তাকে জানাল,
“মির্জা কামরুলের কেসের একজন ম্যাটারিয়াল উইটনেস সে। রিসেন্ট ডেমরার বালুর মাঠে তার লা'শ উদ্ধার হয়েছে।”
তন্ময় এই লা'শটার ব্যাপারে টুকটাক জানলেও লোকটা যে তাদের কেসের সাথে জড়িত তা জানতো না। শেহজাদের আদেশ পেয়ে সে তৎক্ষনাৎ ফোন ঘাঁটলো। শেহজাদ ততক্ষণে বোর্ডে সব ডটগুলো সাজিয়েছে। সে ডানে আলাদা করে কানিজ নামটাও তুলেছে। এই ঘটনা পারিবারিক সম্পত্তিজনিত কারণে হলে কেসটার মোড় ঘুরে যাবে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে এই সম্ভাবনাটাকেও ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। শেহজাদ বোর্ড থেকে সরে এসে নিজের চেয়ারে বসলো। দুচোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ হেলান দিয়ে পড়ে রইলো চেয়ারে। হয়তো কেস নিয়েই আকণ্ঠ চিন্তায় ডুবল। মিনিট পাঁচেকের মাঝেই তন্ময় সাগরের ব্যাপারে একটা আবছা ধারণা তৈরি করল। সময় নিয়ে গুছিয়ে বলল,
“ডেমরার বালুর মাঠে রিসেন্টলি একটা অজ্ঞাত পরিচয়ের লা'শ পাওয়া গিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে দেখে মনে হয়েছে, গলা কে'টে তাকে হ'ত্যা করা হয়েছে। এবং পরিচয় নষ্ট করার উদ্দেশ্যে মুখটাও পাথর দিয়ে থেতলে দেওয়া…”
“আই নো দ্যাট! নতুন কিছু বলো।”
শেহজাদ ধপ করে চোখ মেলল। তন্ময়ের একঘেয়ে বকবকে তাকে বেশ বিরক্ত লাগছে। তন্ময় বিপাকে পড়লো। এটা আজ সকালের খবর। লোকটার পরিচয় পাওয়ার পর টুকটাক কয়েকটা চ্যানেল থেকে এটার প্রচার হয়েছে। এখন সে রাতারাতি নতুন তথ্য পাবে কোথায়? তবু ইতস্তত করে বলল,
“স্যার, মেইনস্ট্রিম ফুটেজ অনুযায়ী…”
শেহজাদ দ্বিতীয় দফায় তাকে আটকাল। ধারালো গলায় বলল,
"মেনস্ট্রিম নিউজে সাগরের লাশের যেসব ব্লার করা ফুটেজ দেখাচ্ছে, ওসব আমার দরকার নেই। ডেমরার বালুর মাঠে পুলিশ বা ডিবি পৌঁছানোর আগে, ওই এলাকার লোকাল কোনো সাংবাদিক বা ইউটিউবার নিশ্চয়ই লা’শের ভিডিও করেছে। ফেসবুকে বা ইউটিউবে খোঁজো। আমার ওই আনকাট, র-ফুটেজটা চাই। এখনই!"
তন্ময় মাথা নেড়ে রোদসীর পাশের চেয়ারটায় বসলো। নিচু গলায় বলল,
“ম্যাম, আপনার ল্যাপটপটা একটু ব্যবহার করব?”
রোদসী মৌখিক জবাব দিল না, নিঃশব্দে ল্যাপটপটা এগিয়ে দিল তন্ময়ের দিকে। তন্ময় সময় অপচয় করল না। দ্রুত হাতে খুঁজতে শুরু করল তেমন কোনো লোকাল ভিডিও। রোদসী গোটা সময় আয়েশ করে বসে দেখছিল। বেশ কিছুক্ষণ শেহজাদকে পর্যবেক্ষণ করায় তার মোটামুটি একটা ধারণা হল, জানতে চাইল,
“আপনি সাগরের খু'ন থেকে ক্লু নিতে চাচ্ছেন?”
শেহজাদ এতক্ষণ হেলান দিয়ে বসেছিল। রোদসীর কথা শোনামাত্রই সে সোজা হয়ে বসল। বলল,
“এছাড়া আর কোনো অপশন আছে?”
রোদসী স্মিত হেসে শেহজাদের উতলা হয়ে ওঠা মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে রইল। তাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে শেহজাদ তাকে বোঝাতে শুরু করল,
“আলী রিমান্ডে থাকাকালীন জাহিদ এর মৃ'ত্যু হয়। সে নিশ্চয়ই পালিত জ্বিন দিয়ে এই কাজ করায়নি?”
“জাহিদের মৃ'ত্যুতে আলীর লাভ নেই।”
“এক্সাক্টলি। এরপর ধরুন, আমাদের উপর ফাঁপা গুলি, ওটাও তো আলীর লোকজন চালায়নি। কারণ আমরা তাকে বাঁচাতেই চাইছি, আমাদের উপর হা'মলা করে তার লাভ নেই।”
“আপনি আমাকে ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন, স্যার? আলী নির্দোষ?”
শেহজাদ বড় করে শ্বাস ফেলল। টেবিলে আঙুল দিয়ে মৃদু শব্দ করে বলল,
“জাহিদ, সাগর কিংবা আমরা আলীর শত্রু নই। আলীর দোষী হওয়ার সম্ভাবনা এখানেই শূন্য।”
রোদসী বুঝতে পারছে না, তার সামান্য কথাকে মূখ্য ধরে লোকটা আলীকে নির্দোষ প্রমাণ করতে এমন মরিয়া হয়ে উঠেছে কেন? কয়েকটা আন্দাজ ঠিক হতে দেখে লোকটা আবার তাকে পীর মানতে শুরু করল নাকি? শেহজাদ অন্যমনষ্ক হয়ে টেবিলে আঙুলের সাহায্যে টোকা দিচ্ছে। বড্ড বেসুরো শব্দ হচ্ছে তাতে। বেশ খানিকক্ষণ ওভাবে থেকে সে দুম করেই জানতে চাইল,
“গতকাল পার্টিতে মন্ত্রী এসেছিল। দুনিয়াবি কাজ ছেড়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করতে তার আসাটাকে আপনার কাছে স্বাভাবিক লাগছে?”
“তিনি আপনার কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করতে আসেননি।”
“তাহলে? পরিবার তুলে হুমকি দিতে এসেছিলেন?”
পরিবারের প্রসঙ্গ ওঠায় শেহজাদের গলার স্বর সামান্য নরম হলো কি? রোদসী লোকটার শুকনো মুখে তাকিয়ে তার অস্থিরতা অনুধাবন করল। ধীরে সুস্থে বলল,
“উনি আপনার সাথে মিটমাট করতে এসেছেন। হয়তোবা আপনার ভুল ধারণাও ভাঙতে এসেছেন।”
শেহজাদ হুট করেই রেগে গেল। ধমকে উঠে বলল, “বোকার মতো কথা বলবেন না। কীসের ভুল ধারণা? চোখের সামনে এতো এতো প্রমাণ রেখেও ভুলের প্রশ্ন আসছে কোথায়?”
একটু থেমেই টেবিলে জোর দিয়ে দুটো টোকা দিয়ে বলল,
“সেদিনের সিসিটিভি ফুটেজে আমাদের নকল বো'মা পাঠানো লোকটা কে ছিল জানেন?”
“মন্ত্রী রাশেদুল হকের ভাইপো— আসিফ।”
“তাহলে? এরপরেও আপনার মনে হচ্ছে আমরা ভুল?”
রোদসী বড় করে শ্বাস টানল। হাত বাড়িয়ে এসির রিমোটটা নিয়ে পাওয়ার খানিকটা কমাল। এতো ঠান্ডায়ও লোকটা ঘামছে। এভাবে রাগতে থাকলে হয়তো পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাবে। তাই চুপ করে থাকাটাই তার কাছে শ্রেয় মনে হলো। অথচ লোকটা একবারও ভাবতে চাইছে না, মির্জা কামরুলের মৃ'ত্যুর পর আলী কিংবা রাশেদুল হক দুজনের কেউই লাভবান হয়নি। হয়েছে কানিজ। এখন ভাবতে হলে, তাকে নিয়ে ভাবতে হবে।
রোদসীর নিরবতায় শেহজাদের রাগের পারদ তরতর করে বাড়ল। মেয়েটা কী মনে করে নিজেকে? দুম করে একটা খোঁচা দিয়ে এখন এমন চুপ করে থাকার মানে কী? শেহজাদ অবশ্য তাকে আর কিছু বলার সুযোগ পায় না। তার আগেই তন্ময় বলে উঠে,
"স্যার, পেয়েছি! ডেমরার লোকাল একটা ফেসবুক পেজ থেকে তৎক্ষনাৎ লাইভ করা হয়েছিল। ভিডিওর কোয়ালিটি খুব একটা ভালো না যদিও, তবে এটা কিন্তু পুলিশ আসার আগের ভিডিও।"
শেহজাদ দ্রুত ল্যাপটপের স্ক্রিনটা প্রজেক্টরে কানেক্ট করল। চেম্বারের কাঁচের জানলা গুলোর ওপর ব্লাইন্ডস বা সাদা শীট টেনে দেওয়া হলো। কৃত্রিম আলো বন্ধ করে ঘরটা তুলনামূলক আঁধার করা হয়েছে। প্রজেক্টরের বড় স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে ডেমরার সেই পরিত্যক্ত বালুর মাঠ। ভিডিওটা বেশ কাঁপছে। এক হাতে ক্যামেরা ধরে এক লোক উত্তেজনায় বকতে বকতে লাশের দিকে এগোচ্ছে। শেহজাদ বিরক্ত হয়ে ভিডিওটার সাউন্ড জিরো তে আনল। এসব অহেতুক বকবক শুনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিস করা যাবে না।
সাগরের গলাকাটা লাশের কাছে গিয়ে লোকটা ক্যামেরা জুম করতেই শেহজাদ হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, "পজ! এখানেই পজ করো।"
তন্ময় তড়িঘড়ি করে ভিডিও পজ করল। রোদসী শেহজাদের পজ করা ভিডিওর অংশ মন দিয়ে দেখছে। লা’শের গলাকাটা বীভৎস অবস্থার দিকে শেহজাদের নজর নেই। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে লাশের ঠিক দুই হাত দূরে, নরম বালুর ওপর পড়ে থাকা পায়ের ছাপের দিকে।
"ভিডিওর রেজুলেশন ফেটে যাচ্ছে। তন্ময়, ডিবি অফিসের আমাদের সোর্সকে এখনই টেক্সট করো। পুলিশ ক্রাইম সিনের যেসব হাই-রেজুলেশন ছবি তুলেছে, সেখান থেকে কোনোভাবে লাশের চারপাশের ফুটপ্রিন্টের ছবিগুলো আমার চাই। ইন ফাইভ মিনিটস!" শেহজাদের গলায় স্পষ্ট এক উন্মাদনা।
শেহজাদ পাঁচ মিনিটের মাঝে চাইলেও, কাজটা এতো জলদি হলো না। শেহজাদ পরপর কয়েকবার প্লে করল ফুটেজটা। অথচ বারবার তার চোখ ঐ এক জায়গাতেই গিয়ে থামছে। বালুর ওপর দেবে থাকা পদচিহ্ন খু'নি চিহ্নিত করার একমাত্র সূত্র। রোদসী শেহজাদের অস্থিরতা ধরতে পারছে। লোকটা ধৈর্য রাখতে না পেরে পায়চারি করতে শুরু করেছে। কী এক ভাবনায় তার মন মেজাজ বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। তন্ময় ততোক্ষণে কিছু ছবি সংগ্রহ করে ফেলেছে। ছবিগুলো প্রজেক্টরে প্লে করতেই পদচিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠল। কিন্তু ছাপ দুটো মোটেও স্বাভাবিক নয়। ডান পায়ের জুতার ছাপটা বালুতে অনেক গভীরে বসে গেছে ,অথচ বাম পায়ের ছাপটা তার তুলনায় খুব হালকা। বাম পায়ের ছাপ অনেকটা ঘষে যাওয়ার ছাপও রেখেছে। শেহজাদ কয়েকটা ছবি দেখে ব্যাপারটা পোক্ত করল। স্ক্রিনের দিকে আঙুল তাক করে জোরালো গলায় বলল,
"লুক অ্যাট দিস, রোদসী! যে লোকটা সাগরকে মেরেছে, সে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না। তার বাম পায়ে সমস্যা আছে। হাঁটার সময় সে ডান পায়ে নিজের শরীরের পুরো ভর দেয়, আর বাম পা-টা একটু টেনে টেনে হাঁটে!"
কথাটা বলেই শেহজাদ ল্যাপটপের ফোল্ডার থেকে ফার্মেসির সেই সিসিটিভি ফুটেজটা অন করল। যে ফুটেজে আসিফ কুরিয়ারে পার্সেল পাঠানোর ঠিক আগে ফার্মেসিতে ঢুকে মাস্ক কিনেছিল। শেহজাদ ফুটেজটা একদম স্লো-মোশনে প্লে করল। স্ক্রিনে দেখা গেল, মাস্ক ছাড়া আসিফ ফার্মেসির দিকে হেঁটে আসছে। তন্ময় রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে আসিফের পায়ের দিকে। আসিফ ডান পায়ে ভর দিয়ে বাম পা-টা সামান্য টেনে টেনে হাঁটছে! গতরাতে দ্য ওয়েস্টিনের পার্টিতেও আসিফ যখন প্রবেশ করছিল, তার হাঁটার ধরণটা ঠিক এমনই ছিল।
"দ্যাটস ইট!" শেহজাদ টেবিলের ওপর সজোরে একটা চাপড় মারল। তার চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। গলায় ঝরছে আত্মবিশ্বাসের সুর,
"পাজল মিলে গেছে রোদসী! আসিফ আমাদের হু'মকি দিয়ে পার্সেল পাঠিয়েছিল, আবার এই আসিফ-ই সাগরকে খুন করেছে। আর এখন হয়তোবা আলীকে দিয়ে মিথ্যা কনফেশন করাচ্ছে।"
রোদসী গভীর মনোযোগ দিয়ে হোয়াইটবোর্ডের দিকে তাকাল। তার কেন যেন কেসটা এতো সহজ লাগছে না। মন্ত্রীকে সে নির্দোষ ভাবছে না। আবার আলীকেও তার নির্দোষ লাগছে না। জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর সে আবার আত্মসমর্পণের পাগলামি করতে চাইল কেন? তাদের সাথে দেখা করে আবার ঠান্ডাও বা হলো কেন? তার চেয়ে বড় কথা, দু'পক্ষের কেউই আপাতত কামরুল হাসানের অনুপস্থিতির সুযোগ ভোগ করছে না। রোদসী সেদিকে তাকিয়ে থেকেই বলল,
“পূর্বাচলের জমির লোভে রাশেদুল হক জাহিদ, সাগর আর আপনার ভাষ্যমতে মির্জা কামরুল হাসানকেও মা'রলেন। দিনশেষে তিনি কি পূর্বাচলের জমিটা পেলেন?”
শেহজাদ চকিতে মাথা ঘোরাল। সে এতক্ষণ প্রজেক্টরের স্ক্রিনে তাকিয়ে ছিল। রোদসীর বলা এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটা সেও এতক্ষণ ভেবেছে। আর সব শেষে তার শেষ প্রশ্ন গিয়ে থেমেছে কানিজের ওপর।
শেহজাদের চোখের দৃষ্টি হঠাৎ কেমন স্থির হয়ে এল। সে ধীরে সুস্থে ঘাড় ঘুরিয়ে রোদসীর দিকে তাকাল। তার মস্তিষ্কের নিউরনগুলো এবার আলোর বেগে ছুটতে শুরু করেছে। হুট করেই মনে হলো, খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে তো ভাবাই হলো না। তৎক্ষনাৎ জানতে চাইল সে,
"রোদসী, মির্জা কামরুলের ওই উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে দুটো এখন কোথায়?"
"তারা মিডিয়ার সামনে আসেনি। বাবার মৃত্যুর বিচারও চায়নি। আমার মনে হচ্ছে, ওরা এখনো উইলের ব্যাপারে অবগত নয়।”
শেহজাদ এবার দুই হাত দিয়ে নিজের চুল খামচে ধরল। অজানা আশঙ্কায় তার ভ্রু যুগলেও ভাঁজ পড়ল। গম্ভীর গলা বলল,
"কামরুল হাসানের ছেলেরা যখন উইলের ব্যাপারে জানবে, তখন দুটো ঘটনা ঘটতে পারে। হয় তারা কানিজকে আক্র’মণ করবে, নচেত মিডিয়ার সামনে ধরা দিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে সিম্প্যাথি নিতে চাইবে।”
একটু থেমে সে রোদসীর চোখের দিকে তাকাল। বলল,
“তখন তো এই উইলের ব্যাপারটাও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে। মন্ত্রী আর আসিফ যখন জানতে পারবে যে পূর্বাচলের ওই জায়গার আসল মালিক কামরুল নয়, বরং তার পালিত কন্যা কানিজ— তখন নিশ্চয়ই হা'মলা হবে…”
“কানিজের ওপর।”
“দ্যাট মিনস, খু’নিদের নেক্সট টার্গেট কানিজ!"
শেহজাদের কথার পিঠে রোদসী নতুন ভাবনা জুড়লো। বলল,
“আবার হতেও তো পারে, সেই আসল কালপ্রিট। মন্ত্রীকে সাহায্য করতেই সে আগে থেকে নিজের নামে জায়গাটা সরিয়ে ফেলেছে। হতেও তো পারে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জমিটা সে ছেড়ে দিচ্ছে?”
শেহজাদের মনে হলো শুরুতে কেসটা ঠিক যেখানে ছিল, এখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। মির্জা কামরুল হাসান মা'র্ডার কেসের মোটিভ এখনো চিহ্নিত হয়নি। অপরা'ধী আলী হলে খু'নের কারণ শুধুমাত্র বিশ হাজার টাকা। যেটা শেহজাদের একেবারেই বিশ্বাস হয় না। খু’ন রাশেদুল হক করে থাকলে তার কারণ পূর্বাচলের জমি। কিন্তু সমস্যা হলো, কামরুল হাসানের অনুপস্থিতিতেও তার স্বার্থ হাসিল হয়নি। আবার ছেলে দুটোর বাবার মৃ’ত্যু নিয়ে উদাসীনতা দেখে মনে হচ্ছে, নিজ হাতে বাবার খু'ন করাটা তাদের জন্যেও অসম্ভব কিছু নয়। কোনোভাবে উইলের ব্যাপারে জানতে পেরে ক্ষো'ভের বশে অঘটনটা তারাও ঘটাতে পারে। আরেক সাসপেক্ট যোগ হয়েছে এখন, কানিজ। মেয়েটা ছোট থেকে কামরুল হাসানের কাছে বড় হয়েছে। কামরুল হাসানের মতো কিপটে লোক যে বিশ হাজার টাকা নিজের কেয়ারটেকারকে দিতে চায় না, সে এতোগুলো বছর মেয়েটাকে নিজের মেয়ে বলে পাললো। জীবনের শেষদিকে এসে আবার তার নামেই সম্পত্তির বৃহদাংশ দিয়ে গেল। এর কারণ কী হতে পারে? একজন অনাথ মেয়ের প্রতি তার এতো মায়ার কারণ ঠিক কী? আবার এমন কোনো ব্যাপার নয়তো, কানিজ নিজেই সব ভোগ করতে চেয়েছে। তাই ছলচাতুরী করে পূর্বাচলের জমির পাশাপাশি তার সম্পত্তির সিংহভাগ নিজের নামে করে নিয়েছে? কাজ শেষ লোক দিয়ে পথের কা'টা সরিয়েছে। হ্যাঁ, হতে পারে। যা কিছু হতে পারে।
শেহজাদ অন্তর্দন্দ্বে জর্জরিত থেকেও রোদসীকে বুঝতে দিল না। বলল,
“আমাদের একবার কানিজের সাথে দেখা করা দরকার। উইলের ব্যাপারে সে কতটুকু অবগত তা জানা দরকার। এবং কেস সলভ হওয়ার আগে এই তথ্য বাহিরে প্রকাশ করতে বারণ করা উচিত। নয়তো খুব শী'ঘ্রই একটি খু’ন থেকে যেই কেস তিনটি লা'শের ওপর দাঁড়িয়ে, তা চারে এগিয়ে যাবে। এটা কোনোভাবেই হতে দেওয়া যাবে না।”
রোদসী হাত ঘড়িতে সময় দেখল। সময় রাত আটটা বেজে দশ মিনিট। সে তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
“এতো রাতে একজন মেয়ের সাথে দেখা করতে যাওয়াটা আনপ্রফেশনাল। আমরা কাল সকালে যেতে পারি।”
শেহজাদ সময়ের কথা মনে পড়তেই হুশে ফিরল। কিছুটা সহজ হয়ে বলল,
“বেশ, আমরা তবে কাল সকালেই কানিজের সাথে দেখা করব। তাকে এখন কোথায় পাওয়া যাবে?”
“তিনি বোধহয় মির্জা কামরুলের আরেকটি ফার্মহাউজে থাকেন।”
“সেটা কোথায়?”
“বেরাইদ এলাকার বালু নদীর তীরে।”
“ওদিকে! ওদিক তো পূর্বাচলের মধ্যেই পড়েছে বোধহয়।”
“কাছাকাছি, মাঝে শুধু বালু নদী।”
শেহজাদ চটজলদি একটুকরো কাগজে আনুমানিক একটা ম্যাপ তৈরি করল। বালু নদীর এপার ঘিরে রাশেদুল হকের ড্রিম প্রজেক্ট। আর অন্য পারেই মির্জা কামরুলের বিলাসবহুল ফার্মহাউজ। এই ফার্মহাউজটা এবং তার আশপাশের জায়গা কামরুল হাসানের জন্য সেই সোনার ডিম পারা হাঁস, যা একেবারে নিয়ে নিতে চাচ্ছিলেন রাশেদুল হক। আবার সেইখানেই এখন কানিজ থাকছে। তবে কি কানিজের আর মন্ত্রীর সম্পৃক্ততার সন্দেহটা আরেকটু গাঢ় করা উচিত? সে কি কোনো ভাবে মন্ত্রীর সাথে ডিল করার আগ্রহ থেকেই ওখানে থাকছে?
শেহজাদ কূল কিনারা না পেয়ে ঠাশ করে হাতে কলম টা ফেলল। তন্ময়কে জিজ্ঞেস করল আলীর খোঁজ,
“আলী কি ম্যাজিস্ট্রেটের এর কাছে গিয়ে আ’ত্মসমর্পণ করেছে?”
“না, স্যার। সে ডিবি অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। আপাতত হাসপাতালে আছে সে। হাতে স্যালাইন চলছে। হয়তো রিমান্ডের ধকল এখনও পুরোপুরি কাটেনি।”
“সাচ আ ফুল! ম’রে ম’রেও কেসটা ঘেঁটে দিচ্ছিল।”
তন্ময় ভড়কে গেল। লোকটা অসুস্থ এটা শুনেও রেগে যাচ্ছে কেন লোকটা? সমস্যা কী এনার? থমথমে চেম্বারে হুট করেই বিনা মেঘে বর্জ্রপাত হলো। কোথা থেকে রিজওয়ান মামা এসেছেন রিহানকে নিয়ে। তার হাতে আবার এক পলিথিন কোণ আইসক্রিম। সৌজন্যতার বালাই রেখে তারা হনহনিয়ে হেঁটে এল ভেতরে। রিজওয়ান মামা দাঁত কেলিয়ে বললেন,
“আরে সাবাশ! হেব্বি ইনটেরিয়র করিয়েছিস দেখছি! আগের বারের চেয়ে ভালো লাগছে এখন। বেশ পশ পশ একটা ভাইব আসছে।”
শেহজাদ এই মুহূর্তে চরম বিরক্ত। তার ওপর বিধাতা এই দুই বাপ ব্যাটাকে দিলেন বোনাস হিসেবে। দাঁতে দাঁত চেপে শেহজাদ বড় করে শ্বাস ফেলল৷ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“মুভির টিকেট ক্যান্সেল হয়েছে নাকি? এদিকে কী করছো?”
রিজওয়ানের কয়েক মুহূর্ত লাগলো ভাবার্থ বুঝতে। বোঝা মাত্রই সে হো হো করে হেসে উঠল। হাঁটতে হাঁটতে শেহজাদর চেয়ারের কাছে পৌঁছাল সে। অনাড়ম্বরভাবে তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ধূর! সবসময় দেখি নাকি? মাঝে মাঝে বউয়ের সাথে ঝগড়া করে বের হলে…”
তন্ময় হুট করেই বলে উঠল,
“বের হলে না, ওটা বের করে দিলে হবে। আপনার বউ তো বললো, সপ্তাহে অন্তত দুদিন উনি আপনাদের বাপ ব্যাটাকে ঘর থেকে বের করে দেন।”
রিজওয়ান মামা ভুল জায়গায় ধরা খাওয়ায় দাঁত দিয়ে জিব কাটলেন। চোখ রাঙিয়ে তন্ময়কে বেফাঁস কিছু বলতে মানা করতে চাইলেন। ততক্ষণে তার গুণধর পুত্র বলে উঠল,
“দু'দিন না মাঝে মাঝে তো তিনদিনও একই কাজ করে। রাগায় বাবা, ফেঁসে যাই আমি।”
রিজওয়ান কাঁদো কাঁদো চোখে ছেলের দিকে চাইলো। বেস্টফ্রেন্ডকে বিয়ে করে বেচারা পড়েছে মহা ঝামেলায়। সারাদিনই তাদের টুকটাক লেগে যায়। পেশায় আবার সে ফ্রিল্যান্সার। কোনো কর্পোরেট জব হলে হয়তো দূরত্বে থাকলে এসব টোকাটুকি কমে যেতো। এখন হয় যত বিপদ। বাবুর ডায়পার বদলানো দিয়ে শুরু হয়ে সারাদিন ল্যাপটপে বসে থাকাতে ঝগড়ার সমাপ্তি হয়। আর ফলাফল? ফলাফলস্বরূপ বাপ ব্যাটাকে না খেয়ে থাকতে বলা হয়। শেষে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তারা একযোগে গলা ছেড়ে গান গায়। সেই গানে বাবুর ঘুম ভাঙে। তিথির কয়েক ঘন্টার খাটুনি বাড়িয়ে দেওয়ার অপরাধে শেষমেষ তাদের একেবারে নি’রস্ত্র করে বের করে দেওয়া হয়। ভাগ্নের অফিসে আসা নতুন মেয়েটি তার জন্য অপরিচিত। সেই অপরিচিত মেয়েটির সামনে ইজ্জত নিলামে ওঠায় তাকে বেশ দুঃখ পেতে দেখা যায়। বেচারা কাঁদো কাঁদো মুখে রোদসী দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক হাসে। কী যে বিদঘুটে লাগে সেই হাসি! শেহজাদ কাঁধ নাচিয়ে মামার হাতটা সরিয়ে দেয়। সোজাসুজি জানতে চায়,
“হঠাৎ অফিসে এলে কেন তা বলো।”
“কেন এলাম মানে কী? তোকে দেখতে এলাম।”
শেহজাদ ভ্রু কুঁচকে তার দিকে ঘুরে বসল। নিজের দিকে আঙুল দিয়ে রুক্ষ গলায় বলল,
“আমার কি লেজ গজিয়েছ নাকি যে টিকিট কেটে দেখতে আসবে?”
রিজওয়ান মামা তার রাগকে প্রাধান্য দিলেন না। হাসতে হাসতে বললেন,
“বের হলেও হতে পারে, মানুষ থেকে বন মানুষ হওয়ার প্রক্রিয়ায় এটা একটা সাধারণ ঘটনা।”
তাদের কথোপকথনের মাঝেই রিহান কোণ আইসক্রিম এগিয়ে দিল তন্ময় আর রোদসীর দিকে। রোদসী প্রথমে একবার মানা করলেও রিহানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির ধারে তাকে হার স্বীকার করতে হলো। শেষ কোণটা নিয়ে সে ছুটে গেল শেহজাদের দিকে। শেহজাদ তার আইসক্রিম পার্টির উৎসাহে পানি ঢেলে তার বাবার সাথে তর্কযুদ্ধে ব্যস্ত হলো।
“হয়েছে আমাকে দেখা? নাকি একটু নেচে গেয়েও দেখাব, বলো তো?”
রিজওয়ান মামা সেই কথায় বেশ মজা পেলেন। হাত দুটো ভাঁজ করে বুকে বেঁধে বললেন,
“দেখালে তো বেশ ভালোই হয়!”
তাদের আলাপের মাঝে শেহজাদের প্যান্ট ধরে নিচের দিকে টান দিল রিহান। শেহজাদ বিরক্ত হয়ে ঘাড় নুইয়ে রিহানের কাছাকাছি গেল। ধমকের সুরে বলল,
“কথা বলছি না? বড়রা কথা বললে মাঝখান থেকে এমন ডিস্টার্ব করতে হয় না। ইট'স আ ব্যাড ম্যানার।”
শেহজাদের জ্ঞানের বাণী মুহূর্তেই উড়িয়ে দিল রিহান। ফিসফিস করে বলল,
“আমিও কি বলবো, যা যা বলতে বারণ করেছ?”
শেহজাদের চোখ কপালে উঠল। বলে কি এই ছেলে! এ তো রীতিমতো ব্ল্যাকমেইল করছে। শেহজাদকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিজেই আইসক্রিমটা তার হাতে দিল। হাসি হাসি মুখে বলল,
“লক্ষ্মী বাবুর মতো গলে যাওয়ার আগেই আইসক্রিমটা খেয়ে ফেলো, ভাইয়ু।”
শেহজাদ সোজা হয়ে মামার দিকে হতাশ নজরে তাকাল। ভাবুক গলায় বলল,
“এই প্যাকেট বড় হলে তোমার আর ঘরে থাকা নসিব হবে না, মামা। সময় থাকতে থাকতে হয় এটাকে গোছাও, নাহলে নিজের জন্য একটা আলাদা ফ্ল্যাট দেখো।”
রিজওয়ান ততক্ষণে তন্ময়ের এগিয়ে দেওয়া চেয়ারে আয়েশ করে বসেছে। তন্ময় আইসক্রিম হাতেই রিসিপশনের দিকে গেল। হাসি আজ আসেনি। কেন আসেনি তা একবারও জিজ্ঞেস করেনি স্যার। অথচ আজ কোনো কারণে তন্ময় না আসতো… তাহলে ফোনেই পেটের ভাত হজম করিয়ে দিতো সে। যত বকা সব শুধু তন্ময়ের ঘাড়ে। নাহ! রিসিপশনটা খালি দেখতে ভালো লাগছে না। তন্ময় বিমর্ষ মনে আইসক্রিম হাতে হাসির চেয়ারটায় গিয়ে বসলো। পাছে সশস্ত্র বাহিনীরা আবার স্যারের ওপর হামলা করতে আসে! নিরাপত্তার একটা ব্যাপার স্যাপার আছে না?
রিহান তার আইসক্রিম হাতে নিয়েই শেহজাদের চেম্বার জুড়ে ছোটাছুটি করছে। একবার এটা, একবার সেটায় হাত লাগাচ্ছে। তাকে আটকাতে শেষমেশ রোদসী তার পিছু করতে শুরু করল। এটা সেটা ধরার আগেই এলার্মের মতো বলতে থাকল, “এটায় হাত দিলে কিন্তু দশ নম্বর বিপদ সংকেত!”
রিজওয়ান দেখল শেহজাদ আইসক্রিম হাতে নিয়ে রিহানের পেছন পেছন ক্লান্ত হয়ে ছুটতে থাকা রোদসীর দিকে তাকিয়ে আছে। তার আইসক্রিম গলে গলে পড়ছে। সেই আঠালো তরল তার শার্টের হাতায় লেপ্টে যাচ্ছে, অথচ তার সেদিকে হেলদোল নেই। রিজওয়ানের হঠাৎ করেই মনে হলো, এই রোগের লক্ষ্মণ সে জানে। তাই অন্ধকার ঘরে ঢিল ছোঁড়ার মতো করেই চাপা গলায় বলল,
“কতটুকু কি কেস আগালি, বস?”
শেহজাদ অন্যমনষ্ক হয়েই জবাব দিল, “হুঁ?”
“দাওয়াত টাওয়াত কবে পাচ্ছি?”
শেহজাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ও বোধহয় এবার সচল হয়ে উঠলো। আশ্চর্য গলায় জানতে চাইল,
“কীসের দাওয়াত?”
“বন মানুষ থেকে আবার মানুষ হওয়ার খুশিতে দাওয়াত।”
শেহজাদ ভ্রুঁ কুঁচকে মামার মতিগতি বোঝার চেষ্টা করলো। মামা তার তাকানোর ধরণ দেখেই বললেন,
“ওহ! এখনো ফাইনাল হিয়ারিং অবধি আগাতে পারিসনি? তাহলে আর কী? এ বছরও দাওয়াত পাওয়া হবে না।”
শেহজাদ তড়িৎ গতিতে বলল,
“পাগল হয়েছ? আশপাশে কোনো একজনকে পেলেই হয় নাকি? শী ইজ জাস্ট মাই এসিসট্যান্ট।”
বলতে বলতেই তার খেয়াল হলো আঠালো তরলে মাখামাখি হওয়া শার্টের হাতায়। টপটপ করে সেই তরল আবার তার প্যান্টের হাঁটুর অংশেও মাখিয়েছে। কি বিচ্ছিরি ব্যাপার! শেহজাদ দ্রুত আইসক্রিম টা ফেলে এলো। বাথরুমে ঢুকে সময় নিয়ে পানি দিলো শার্টের হাতায় আর প্যান্টের নষ্ট হওয়া হাঁটুর অংশটায়। বেরিয়ে এসে মন দিয়ে হাত মুছতে ব্যস্ত হলো সে। প্রায় সাথে সাথেই রিজওয়ান মামা পেট চেপে ওয়াশরুমে ঢুকলো। বাহির থেকে দুটো পুরি খেয়েই মনে হচ্ছে পেটটা টনটন করছে। বাসা অবধি যাওয়ার আগেই রাস্তাঘাটে অঘটন ঘটতো। তাই বাধ্য হয়েই রিহানের আইসক্রিম পার্টির ছুতোয় শেহজাদের অফিসে এসে ঢুকেছে। এখন ঠিকই অঘটনের সিগন্যাল হাজির। ভাগ্যিশ! ঠিক সময়ে অফিসে আসা গেছে!
রিজওয়ান মামার দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢোকার ব্যপারটা শেহজাদ চোখ বড় বড় দেখছে। মামাটা কি দিনদিন বাচ্চা হচ্ছে নাকি? এমন না দৌড়ে লম্বা লম্বা কদম ফেলেও একই সময়ে পৌঁছানো যেত, তাহলে এমন বাচ্চামো করার কারণ? হতাশ বদনে দুদিকে মাথা নেড়ে সে সামনের দিকে না তাকিয়েই পা ফেললো। ঠিক সেই মুহূর্তে রিহান দৌড়ে এসে তার সাথে ধাক্কা খেল। শেহজাদ দেখল, এক ধাক্কাতেই বাচ্চাটার নাক ফুলে লাল হয়েছে। হুট করেই যে বাচ্চাটা এভাবে সামনে আসবে তা হয়তো সেও আন্দাজ করতে পারেনি। করলে নিশ্চয়ই এভাবে ব্যথা পেতে দিতো না। শেহজাদ চট করেই বসে পড়লো। ডান হাতে আলতো করে নাকটা ছুঁয়ে দিল। দেখল, রিহানের চোখজোড়া ছলছল করছে। নাকের মতো নরম অংশে বেচারা ধাক্কা খেয়েছে। য'ন্ত্রণাও হচ্ছে হয়তো অনেক। হয়তো বাবা সামনে না থাকায় চেঁচিয়ে কাঁদছে না, কিংবা নিজেকে স্ট্রং প্রমাণ করার চেষ্টায় কান্না আটকে রেখেছে। শেহজাদ অন্য সময় হলে ধমক দিত, এবার আর দিল না। মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় জানতে চাইল,
“বেশি ব্যথা পেয়েছিস?”
এতক্ষণ কান্না চেপে রাখা রিহানটার হঠাৎ কী হলো কে জানে? সামান্য প্রশ্নে ঠোঁট উল্টে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল। শেহজাদ কী করবে বুঝতে পারছে না। ছেলেটা এমন হুট করে কাঁদতে শুরু করলো কেন? শেহজাদকে বোকার মতো বসে থাকতে দেখে রোদসী এগিয়ে এসে তাকে কোলে তুললো। রিহানকে সে গত রাতে টুকটাক চিনেছে। তাই হয়তো তাকে সামলানোর ব্যপারটা সে ধরে ফেলেছে। নাকি নারী জাতির ভেতর খোদা আগে থেকেই এমন মায়া দিয়ে পাঠিয়েছেন? রোদসী রিহানকে কোলে নিয়ে জানলার কাছে গেল। হাত উঁচিয়ে মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলায় ব্যস্ত চাঁদকে দেখিয়ে কী কী যেন বলতে শুরু করল। রিহানও যেন তার সেসব ভিত্তিহীন গল্পে মুহূর্তেই মজে গেল। শেহজাদ হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ রোদসীকে দেখল। মেয়েটা জাদু টাদু জানে নাকি? এতো সহজে বাচ্চাটাকে সামলে নিলো! নাকি এটাও কোনো সাইকোলজির খেলা? শেহজাদের অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে কোন ফাঁকে যে রিজওয়ান মামা বেরিয়ে এলো, তা ঠাওর করা গেল না। এসেই তিনি দূর্বল চিত্তে চেয়ারে বসলেন। মনে হচ্ছে, শালারা নষ্ট পুরি খাইয়েছে। স্যালাইন না খেলে বাড়ি অবধি যাওয়া সম্ভব হবে না। ভাগ্নের নতুন এসিসট্যান্টের সামনে লজ্জায় এভাবে পেটের খবরটা বলাও যাবে না। গোপনে তার কাছে জানতে হবে, অফিসে স্যালাইন ট্যালাইন আছে কিনা! থাকলে আপাতত ওটা খেয়েই বাড়ির পথ ধরতে হবে। বোনের বাড়িতে আজকের রাতটাও থাকতে হবে। সেখানে আবার ঘর ভর্তি মেহমান, মাঝখান থেকে সে ঘরে-বাহিরে, ঘরে-বাহিরে করলে কি আর ইজ্জত থাকবে? শেহজাদের কাছে স্যালাইন চাইতে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করলেন, ভাগ্নে আবারও ধ্যান হারিয়েছে। উঠে এসে পাশে দাঁড়ালেন তার। ভাবনায় মগ্ন শেহজাদ টেরও পেলো না মামার উপস্থিতি। শেহজাদকে অনড় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, তিনি বেশ উৎসাহী হলেন। তার বেগতিক আঁখিদ্বয়ে তাকিয়ে আচমকাই কানের খুব কাছ থেকে ফিসফিস বলে উঠলেন,
“আশপাশে হাজারো কেউ থাকতে হয় না। কোনো একজনের উপস্থিতিই সময়ে অসময়ে হৃৎস্পন্দন থমকে দিতে যথেষ্ট।”
চলবে…