#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_১৮
হুট করে কানের কাছে বিকট শব্দে প’টকা ফাটার শব্দ শুনলে মানুষ যেমন চমকে ওঠে, শেহজাদও ঠিক সেভাবে চমকে উঠল। ঘাড় ঘুরিয়ে মামার দিকে তাকাল সে। তার চোখেমুখে উপচে পড়া এক অস্বস্তি ফুটে উঠল। কপাল কুঁচকে বিতৃষ্ণা নিয়ে বলল,
“হৃদস্পন্দন থামলে মানুষ মরে যাবে, মামা।”
চটজলদি জবাব ভেসে এল,
“একতরফা প্রেমে রোজই প্রেমিকের মৃত্যু হয়।”
শেহজাদ তটস্থ হলো। ব্যস্ত ভঙ্গিতে নিজের চেয়ারে বসতে বসতে বলল,
“কীসব আবোলতাবোল বকছো? আমি তো তোমার প্যাকেটের ভোল বদলানো দেখলাম। নাথিং এলস!” একটু থেমেই আবার বলল,
“এই কাঁদে, এই হাসে— এটা তোমার ছেলে না বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্র? থেমে থেমে সিগন্যাল ক্র্যাক করে।”
শেহজাদের সেই কথা অনেকটা কৈফিয়তের মতো শোনাল। রিজওয়ান মামা তবু প্রতিক্রিয়া করলেন না। ঠোঁট দুটো সরু করে বললেন,
“হ্যাঁ! তা তো দেখতেই পেলাম!”
রিজওয়ান মামার মুখটা বেশ গম্ভীর। মনে হচ্ছে তিনি সত্যি সত্যি শেহজাদের যুক্তি মেনে নিয়েছেন। তবু কেন যেন মনে হচ্ছে তার কণ্ঠে কৌতুক ঝরছে। শেহজাদ হাতে থাকা টিস্যু দলা পাকিয়ে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“বাড়ি চলো। হচ্ছে তোমার…”
রিজওয়ান মামা সুযোগ বুঝে কানের কাছে মুখ এনে বললেন,
“সেসব যা হওয়ার পরে হবে। তার আগেই আবার যেতে হবে মনে হচ্ছে। কীভাবে যেন সব ডাইরেক্ট হয়ে গেছে। একটা স্যালাইন না পেলে আজ নড়তেও পারব না।”
শেহজাদ আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। তার আগেই পেট চেপে তিনি আবারো ওয়াশরুমে ঢুকলেন। শেহজাদ তার হুড়োহুড়ি দেখে তপ্ত শ্বাস ফেলে তন্ময়ের কাছে গেল। ওকে দিয়ে দুটো স্যালাইন আনাতে হবে। নাহয় এই লোক সারা রাত অফিসেই থেকে যাবে। শেহজাদ যখন রিসিপশন থেকে ফিরল, রিহান তখন পাকাপাকি ভাবে রোদসীর গলা জড়িয়ে ঝুলে পড়েছে। বেচারিও হয়তো দুর্বিপাকে পড়েছে। উল্টো ঘুরে থাকায় তার সেই বিব্রত মুখটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। কানে আসছে রিহানের পাকা পাকা কথা,
“মাত্র একটা গান শুনাতে পারবে না? বাসার ছোট বাবুদের কি গান টান শোনাও না নাকি?”
“না, শোনাই না।”
রিহান মাথাটা সামান্য তুলে রোদসীর চোখের দিকে তাকাল। আশ্চর্য হয়ে বলল,
“কেন শোনাও না?”
রোদসী ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে রিহানকে নিয়ে শেহজাদের টেবিলের কাছে গেল। তাকে টেবিলে পা ঝুলিয়ে বসিয়ে দিতে চাইল বোধহয়। রিহান হাতের বাঁধন শক্ত করে সেই কাজে পূর্ণ বাঁধা দিল।
“কারণ আমার বাসায় কোনো ছোট বাবু নেই।”
রিহানের চোখ দুটো এবার বড় বড় হলো। বলল,
“তোমার ভাই নেই?”
“না।”
“আমার মতো মামাতো ভাইও নেই?”
রিহানের সরল প্রশ্নে শেহজাদ একটু অপ্রস্তুত হলো। ছেলেটা তখন থেকে রোদসীকে খুঁচিয়ে যাচ্ছে। আজ আর কাজ নেই অফিসে। শুধু শুধু মেয়েটাকে এখানে আটকে রাখার তো কোনো মানে হয় না। সে এগিয়ে এসে রিহানকে রোদসীর থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কথা ভাবল। কয়েক পা এগুতেই কানে এল ভয়ানক এক কথা,
“আমার মাও এতিম, আমিও এতিম। আমাদের আমরা দুজন ছাড়া কেউই নেই।”
রিহান তার সেই কথার অর্থ ধরতে পারল না। বোকা বোকা গলায় জানতে চাইল,
“এতিম? এতিম হলে কি কাজিন থাকে না?”
এই পর্যায়ে শেহজাদ বেশ কসরত করেই তাকে নিজের কোলে আনল। অকারণ নজর লুকিয়ে বলল,
“কোনটার মানে কী সব তোকে জানতে হবে? ইঁচড়েপাকা বিড়াল কোথাকার!”
রিহান শেহজাদের সেই কথা শুনল না। লাফালাফি করে শেহজাদের কোল থেকে নেমে সে রোদসীর কাছেই যেতে চাইলো। শেহজাদ তাকে শক্ত হাতে আটকালো। চোখ রাঙিয়ে ধমকাতে চাইলো। তাতেও কাজে দিলো না কিছুই। নাছোড়বান্দা রোদসীকেই জ্বালাবে। ঠিক সেসময় তন্ময় স্যালাইন নিয়ে ফিরে আসায় শেহজাদের কাজ কিছুটা সহজ হলো। রিহানকে তার কোলে দিয়ে দোকানে পাঠানো হলো। শেহজাদ যেন রীতিমতো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে পরিবেশ স্বাভাবিক করতে চাইল। বলল,
“ছোট বাবুদের সামনে অকপটে এসব কথা বলবেন না।”
“কোন সব কথা?” রোদসীর সন্দিহান প্রশ্নে অস্বস্তি বোধ করল শেহজাদ। খানিকটা ইতস্তত করে বলল,
“এই বয়সে ওদের গন্ডি বাবা-মা আর পরিবারে সীমাবদ্ধ। এখন এসব শব্দ শুনে কিংবা শব্দের ভাবার্থ বুঝতে গিয়ে শৈশবের রঙিন মুহূর্ত হারিয়ে ফেললে গোটা একটা জীবন বৃথা কাটবে।”
“ওহ আচ্ছা! বলবো না।”
“কী বলবেন না?”
“কথা বলবো না।”
শেহজাদ আশ্চর্য হলো। সে তাকে কথা বলতে কখন বারণ করলো? ‘ক’ বললে কলকাতা বোঝা মেয়েটা আবার তার কথাকে ভুল বুঝেছে। শেহজাদ বোঝানোর মতো করে বলল,
“কথা বলতে বারণ করিনি। বলেছি, সেনসিটিভ কথাগুলো না বলতে।”
“আচ্ছা।”
শেহজাদ ঘুরে দাঁড়ালো। অকারণ কলমদানীতে সাজানো কলমগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে বলল,
“আপনার মা এতিম এটা তো আগে বলেননি?”
“কেসের জন্য কি এই তথ্যটাও জরুরি ছিল?”
শেহজাদ থমকাল। সত্যিই তো! সে নিজেই যখন নিজের পরিবারকে আড়ালে রাখে, কিছু হলেই তা থেকে দূরত্ব রাখতে বলে, সেখানে রোদসীকে এই প্রশ্ন করাটা তো বেমানান হলো। টের পেয়েও নিজের ভুলটা সে ঢাকতে চাইল। কয়েক সেকেন্ড থেমে চমৎকার একটা অজুহাত তৈরি করলো। বলল,
“অবশ্যই জরুরি। এতোগুলো বছর এই অমানবিক অত্যা’চার সহ্য করেও তাকে কোন স্বামীর ঘরেই থাকতে হয়েছিল সেই পার্সপেক্টিভে এই তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।”
রোদসী তার সেই কথা বোধহয় বিশ্বাস করে ফেলল। দেয়ালের দিকে একদৃষ্টে উদ্দেশ্যহীন তাকিয়ে বলল,
“জামিল ব্যাপারী আমার মাকে এতিমখানা থেকে এনে বিয়ে করেছিলেন। বলেছিলেন, বাবা-মা না থাকায় তিনি এতিম হওয়ার য'ন্ত্রণা বোঝেন। সেসব যন্ত্র’ণা থেকে মুক্তি দিয়ে তিনি মাকে একটা নতুন জীবন দিবেন।”
একটু থেমে সে বড় করে শ্বাস নিল। গলার স্বরে কাঠিন্য এনে বলল,
“তিনি অবশ্য মাকে নতুন জীবন দিয়েছিলেন। একটি বিষা’ক্ত নতুন জীবন। যে জীবনের পদে পদে ভয় আর তিক্ততা মিশে আছে।”
শেহজাদ খুব করে চাইছে ঘাড়টা ঘুরিয়ে একপলকের জন্য রোদসীর দিকে তাকাতে। মেয়েটা প্রথমবার তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খোলামেলা কিছু বলছে। অথচ সে তাতে প্রতিক্রিয়া করতে পারছে না। আবার তাকালেই দেখা যাবে মামা এসে তা দেখে ফেলেছেন। শেষে এই খবর ব্রেকিং নিউজ হওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবে না। শেহজাদকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে রোদসী বিব্রত গলায় বলল,
“আমি কখনোই আমার বয়সী কারো সাথে মিশিনি। বয়সে ছোট কাউকেও এতো কাছে থেকে দেখিনি। তাই বুঝতে পারিনি, কোন কথা তাদের বলা যাবে আর কোন কথা যাবে না। আমার প্রশ্নে রিহানের মানসিক বিকাশে সামান্যতম ক্ষ'তি হলেও আমি এর পূর্ণ দায়ভার নেব। এবং ভবিষ্যতেও কখনো এ ধরণের কোনো জটিল শব্দ ব্যবহার করব না।”
শেহজাদ তুরন্ত পিছু ফিরল। হতবাক গলায় বলল,
“এটা তেমনও কোনো বড় ভুল নয়। এতো ব্যস্ত হবেন না।”
রিজওয়ান মামা এবারও ভুল সময় বের হলেন। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েই দেখলেন শেহজাদ আর রোদসী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। তিনি চরম আশ্চর্য নিয়ে শুধালেন,
“কে আবার কীসে ব্যস্ত হচ্ছে?”
শেহজাদ বাঁকা চোখে মামার দিকে তাকাল। নীচু স্বরে বলল,
“এটা নিয়ে ভাববেন না। আমি জাস্ট কথার কথা বলেছি।”
এতোটুকু বলেই সে টেবিল থেকে কাগজের প্যাকেটটা নিয়ে মামার হাতে দিল। বিরক্ত হয়ে বলল,
“ভুল টাইমিং এর জন্য তোমার একটা এওয়ার্ড পাওয়া উচিত। নাও আপাতত এসএমসি ওর স্যালাইনটাকেই পুরস্কার হিসেবে বুঝে নাও।”
রোদসীর সামনে স্যালাইনের কথা শুনে রিজওয়ান মামা পারলে মাটি কেটে তার ভিতরে ঢুকে বসে থাকেন। শেহজাদকে চোখ রাঙিয়ে তিনি বললেন,
“এই ছেলের দেখছি, পুরোই মাথা গেছে।”
শেহজাদ পকেটে হাত গুঁজে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গম্ভীর স্বরে বলল,
“মিস রোদসী, এদিকে আর কাজ নেই আজ। শুধু শুধু রাত করে লাভ নেই। আপনি বরং আজ বাড়ি যান। কাল সকাল সকাল আমরা পূর্বাচলের ফার্মহাউজে যাব।”
রোদসী ধীরেসুস্থে তার ব্যাগ গোছালো। যাওয়ার আগে ভদ্রতার খাতিরে দুজনকেই একশব্দে গুড নাইট বলে বেরিয়ে গেল। রোদসী বের হতেই রিজওয়ান মামা স্যালাইনটা গুলিয়ে নিলেন। তাতে কয়েক চুমুক দিয়ে উদাস গলায় বললেন,
“আপা জানে?”
শেহজাদ সিগারেট ধরিয়েছে। কামরার বাতি নিভিয়ে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে সে সিগারেটটা চেপে ধরেছে ঠোঁটে। অন্য হাত তার প্যান্টের পকেটে। অন্ধকার কামরায় বাহিরে আলো আসছে। মৃদুমন্দ যাও একটু আলো আসছে, সেসবের ফাঁকে জ্বলজ্বল করছে এক চুটকি আগুনের ফুলকি। অসময়ে বাতি নেভানোর কারণ, আচমকাই আলোটা শেহজাদের চোখে বিঁধছে। মনে হচ্ছে, মাথাব্যথা শুরু হলে বলে। ব্যথা হবে নাই বা কেন? সেখানে তো ঘুরছে মির্জা কামরুল কেসের মা’র্ডার মিস্ট্রি। মামার অহেতুক প্রশ্নের জবাব সে আনমনেই দিল,
“কী?”
“তার পুত্র এখন দিনে দুপুরে ফার্মহাউজে যায়।”
শেহজাদ তড়াক করে ঘাড় ঘুরাল। উচ্চস্বরে বলল,
“মামা! প্লিজ!”
রিজওয়ান মামা আর তাকে ডিস্টার্ব করল না। মিনিট বিশেক বসে অবস্থা কোনোরকম স্থির হতেই একসাথেই অফিস থেকে বের হলেন। তন্ময় হাবিজাবি ফাস্টফুড কিনে রিহানকে রিসিপশনে বসিয়ে রেখেছিল। তাদের মাঝে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্টুন ক্যারেক্টার “ডোরেমন” নিয়ে আলোচনা চলছিল। আলোচনা চলছিল, ডোরেমনের পকেট থেকে তারা ঠিক কী কী বের করবে। সেসবের মাঝেই শেহজাদ আর রিজওয়ান চলে আসায় তাদের সেই আলোচনা ক্ষান্ত হলো।
শেহজাদ দ্রুত বাড়ি ফিরলেও সারা রাত তার ভালো করে ঘুম হয়নি। কাজিনমহলের দাপাদাপিতে মাঝরাত অবধি বাড়ি সরগরম ছিল। মায়ের তুমুল সাধাসাধি সত্ত্বেও তারা আগামীকাল চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই শেষরাত ভেবে একসাথে তারা পুরোটা সময় আনন্দ করে কাটিয়েছে। তবে সেই আনন্দের মাঝে একটা দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছে। শেহজাদ তখন ড্রয়িং রুমের আড্ডা থেকে দূরে সরতে ডাইনিং এ রিহানকে কোলে নিয়ে হাঁটছিল। মামী তাকে একটু আগেই বলেছে, বিচ্ছুটাকে কোনোমতে ঘুম পাড়াতে। বড়দের মাঝে বসে থেকে সে হাঁ করে সব পাকা পাকা কথা শুনছিল। শেহজাদও কোনো না কোনো অজুহাতে উঠে আসতে চাইছিল। তাই মামীর ইচ্ছেকৃত করে দেওয়া এই সুযোগকেই সে কাজে লাগাল। রিহানকে কোলে নিয়ে উদ্দেশ্যহীন পায়চারি করল কিছুক্ষণ। একটা সময় রিহান পকপক থামিয়ে শান্ত হয়ে মাথা এলিয়ে দিল ঘাড়ে। শেহজাদের মনে হলো তার বোধহয় ঘুম আসছে। এরই মাঝে ফায়াজ ভাই হুট করেই শেহজাদের কাছে জানতে চাইলেন, তার এসিসট্যান্টটি কেমন? প্রশ্ন শুনেই রিহানের ঘুম ছুটে গেছে। একলাফে মাথা উঠিয়েছে সে। শেহজাদের আগে রিহান বুড়ো-ই তার সেই প্রশ্নের জবাব দিয়েছে। জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব নিয়ে বলেছে,
“সেও শেহু ভাইয়ার মতোই একটা সেদ্ধ করলা।”
শেহজাদ রিহানের জবাবে ভড়কে গেল। তার চেয়েও বেশি ভড়কাল ফায়াজ। বিব্রত গলায় সাফাই গাইল,
“ও! আচ্ছা! আমি তো জাস্ট এমনিই জিজ্ঞেস করলাম…”
এতোটুকু বলতেই তার গলা শুকিয়ে এল। তিনি ত্রস্ত পায়ে ছুটলেন ফিল্টারের কাছে। তাড়াহুড়োয় শুকনো জায়গায় হোঁচটও খেলেন একচোট। তার এলোমেলো পায়ে তাকিয়ে রিহান ডানে বামে মাথা নাড়ল। ভারিক্কি গলায় বলল,
“ফায়াজ ভাইয়ুর মনে ঘন্টি বাজছে।”
শেহজাদ বোকার মতো প্রশ্ন করল,
“কী বাজছে?”
“ঘন্টি, প্রেমের ঘন্টি। শুনতে পাচ্ছ না নাকি?”
শেহজাদ অপ্রস্তুত হলো। প্রেমের ঘন্টি বলতেও কিছু হয়? কই? সে তো আগে কখনো এই শব্দ শোনেনি। সে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল। কিছু শুনতে পেল না। আশ্চর্য হয়ে বলল,
“কই? আমি তো কিছু শুনতে পাচ্ছি না?”
“বড় হও বুঝলে। বড় হলেই শুনতে পাবে।”
এই পর্যায়ে রিহানের কানজোড়ায় শক্ত হাতের থাবা বসল। কান মুচড়ে শেহজাদ ধমকে উঠল,
“আমি বড়ো হবো আর তুই কী হবি? দিনদিন ফাজিল হবি? এতক্ষণ কোলে নিয়ে হাঁটলাম। না ঘুমিয়ে এখন পাকামি করছিস আবার?”
রিহান আচানক আক্রমণে মিইয়ে গেল। গলা জড়িয়ে মাথাটা আবার এলিয়ে দিল তার চওড়া কাঁধে। ফায়াজ ভাই ততক্ষণে পানি খেয়ে আবারো ফিরে এসেছেন। চরম অস্থিরতা নিয়ে জানতে চেয়েছেন,
“তোর এসিসট্যান্ট, মানে রোদসীর কন্ট্যাক্ট নাম্বার দেওয়া যাবে?”
শেহজাদের এবার চোয়ালটা রীতিমতো ঝুলে পড়ল। ফায়াজ ভাই মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি রোদসীর প্রেমে পড়ে গেছে। কিন্তু কেন? এমন একদেখায় কি প্রেম হয়ে যায় নাকি? রোদসীর মতো মেয়েকে এই নরম মনের ফায়াজ ভাই মন দিয়ে ফেললে তো দারুণ সমস্যা। তার কাছে জোছনার ব্যাখ্যা শুনলেই তো ভাই হাত পা ছুঁড়ে ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ টাইপ কান্নাকাটি শুরু করবে। না, না — তা তো হতে দেওয়া যায় না। তাছাড়া, রোদসীর মতো শক্ত ধাঁচের মেয়ে আর যাই হোক এসব সস্তা প্রেমে অন্তত মজবে না। মন ভাঙার আগেই সতর্ক করে দেওয়াই বরং ভালো। সবদিক বিবেচনা করে শেহজাদ শুকনো ঢোক গিলে নরম গলায় কথা বলতে চাইল। তবু তার গলাটা ভীষণ রুক্ষ শোনাল,
“শী ইজন’ট ইওর টাইপ।”
তারপর ফায়াজ ভাই দ্বিরুক্তি করেনি। চপল পায়ে হেঁটে গেছে ছাদের দিকে। শেহজাদ সেদিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকেছে। আচ্ছা? ফায়াজ ভাই কি তার কথার ভাবার্থ ধরতে পেরেছে? শেহজাদের অন্যমনষ্কতার মাঝেই রিহান মাথা তুললো। তীর্যক চোখে শেহজাদের দিকে তাকালো। ভাবটা এই — বলেছিলাম না? মুখে বলল,
“আমাকে নামাও। আমি রুহি বোনু না যে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াতে হবে। ঘরে গিয়ে একাই শুয়ে পড়ব।”
শেহজাদ তাকে নামিয়ে ঘরে এসে দোর দিয়েছে। তারপর বহু চেষ্টার পরেও আর ঘুম হয়নি। চোখ লেগে এলেই ফায়াজ ভাইয়ের চকচকে চোখ আর কাঁপা গলার কন্ট্যাক্ট নাম্বার চাওয়ার দৃশ্যটা ভাসছিল। শেহজাদ ভেবে পেল না এই একটা বাক্য মাথায় এমন গেঁথে যাওয়ার কী আছে?
পরদিন খুব সকাল সকাল ফ্রেশ হয়ে সে রোদসীকে আনতে গেল। শেহজাদের কলে রোদসীর ঘুম ভাঙল। সে আশ্চর্য হয়ে ঘড়ি দেখল। সবে সাতটা তেরো বাজছে। এতো সকালে কারো কাছে ইন্টারোগেশনের জন্য যাওয়ার মতো উদ্ভট ভাবনায় তার চোখ কপালে উঠল। সে কল ধরে কপাল কুঁচকে বলল,
“এর চেয়ে কাল রাতেই চলে যেতেন। কষ্ট করে ভোর হওয়ার অপেক্ষা করলেন কেন?”
এতোটুকু বলেই সে কল কেটে দিল। শেহজাদ হতভম্ব হয়ে ফোনটা দেখল। মেয়েটা বিনা নোটিশে এমন রেগে গেল কেন? সে রেগে যাওয়ার মতো করেছে কী? শেহজাদ একবার ভাবল, ওকে রেখেই চলে যাবে। পরক্ষণেই মনে হলো, রোদসী ছাড়া গেলে কাজটা জটিল হবে। মেয়েদের মন হয়তো আরেকটি মেয়েই সহজে ধরতে পারবে। তাই তার জন্য আজকের ইন্টারোগেশনে রোদসীর সঙ্গ একান্তই দরকার। শেহজাদ বুঝতে পারছে না, তার কি এখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা উচিত? নাকি একবার কল করে ‘ডিউটি ফার্স্ট’ এর লেকচারটা শোনানো উচিত? নাকি সরাসরি উপরে গিয়ে চোখ রাঙিয়ে চাকরি থেকে বের করে দেওয়ার ধমক দেওয়া উচিত? কোনো উপায়ই তার মনমতো হলো না। সে ভিন্ন কিছু ভাবতে চাইল। তার আগেই রোদসীর টেক্সট এলো ফোনে। ‘আটটার মাঝে আসছি। অপেক্ষা করতে কষ্ট হলে কোনো দোকানে বসতে পারেন কিংবা চলেও যেতে পারেন।’
কি আশ্চর্য! বসকে সে দোকানে বসতে বলছে, তাও ঘরে যেতে বলছে না! এ কেমন ব্যবহার! শেহজাদের রাগ হলো ভীষণ। সে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে তাকে দুটো কড়া কথা শোনাতে চাইল। পরক্ষণেই মনে পড়ল, রোদসীর মায়ের ভীতির কথা। তরতর করে বাড়তে থাকা রাগটা যেন মুহূর্তেই উবে গেল। এই এক সমস্যা তার। হুট করেই রাগ হয়, আবার হুট করেই নেমেও যায়।
শেহজাদ কী করবে ভেবে না পেয়ে সময় কাটাতে শুরু করল। লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে বাঁ হাতে চুলগুলো সেট করল একবার। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখল সাতটা বাইশ বাজছে। এখনো আধঘন্টার উপরে বাকি। অধৈর্য হয়ে সে কাউকে ফোন করল। জানতে চাইল পূর্বাচলের জমিকে ঘিরে মন্ত্রী রাশেদুল হকের কোন মেগা প্রজেক্ট এর পরিকল্পনা হচ্ছিল। ওপর পাশ থেকে আধঘন্টার মধ্যে জানানোর কথা বলে ফোন কেটেছে। শেহজাদ সিটে মাথা এলিয়ে বাঁ হাতটা চোখের ওপর রাখল। ভাবতে বসল, রাশেদুল হকের পরিকল্পনা। কী এমন সোনার খনিতে হাত দিচ্ছিলেন তিনি? যার জন্য তাকে পরপর তিনটি খু'ন করতে হলো? আগডুম বাগডুম ভাবতে ভাবতে শেহজাদের চোখটা একসময় লেগে এল।
চোখের সামনে ঘটলো একটা অদ্ভুত ঘটনা। রোদসী কেন যেন আজ একটা গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি পরেছে। শেহজাদ গাড়িতে বসেই তার শাড়ি পরে এলোমেলো হাঁটার ভঙ্গি দেখছে। সে দেখল, কুঁচি সামলে গাড়ি অবধি আসতে গিয়েই তার পা হড়কে একদম পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ব্যতিব্যস্ত হয়ে সে নেমে এসে তাকে বাঁচাতে চাইল। দেখল, তার আগেই কোথা থেকে ছুটে এসেছেন ফায়াজ ভাই। ঘনিষ্ঠভাবে তাকে আঁকড়ে ধরে তিনি দাঁত কেলিয়ে হাসছেন। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো রোদসীও তার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা আজও চশমা পরেনি। একটু সাজলেই কি চশমাটা খুলে রাখতে হয় নাকি? এ আবার কেমন থিওরি? ওদিকে ফায়াজ ভাই এমন দাঁত কেলাচ্ছেন কেন? মেয়েটা তো পড়ে যায়নি। সামান্য পা হড়কেছে, এটুকুতেই এতো হাসার কী আছে? চকচকে চোখে রোদসীকে দেখছেন তিনি। পরক্ষণেই গদগদ গলায় বলছেন,
“শাড়িতে আপনাকে দারুণ লাগে।”
এই পর্যায়ে তার কানে এল, রোদসীর তীক্ষ্ণ গলার স্বর।
“কী বলছেন? শুনতে পাচ্ছি না? বিরবির করে কথা না বলে দরজা খুলুন প্লিজ।”
শেহজাদ বুঝতে পারছে না মেয়েটা হঠাৎ কীসের দরজা খোলার কথা বলছে? দরজা খোলার কথা শুনে ফায়াজ ভাইয়ের মুখটাও বা শুকিয়ে আসছে কেন? একি! ফায়াজ ভাই ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হচ্ছেন। হারিয়ে যাচ্ছেন তিনি! কিন্তু কোথায়? শেহজাদ হুড়মুড় করে উঠে বসল। সেকেন্ড খানেক সময় লাগল তার পরিস্থিতি বুঝতে। আগামাথাহীন অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখেছে সে। তার চেয়েও অপ্রস্তুত ব্যাপার হলো, গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে রোদসী কাঁচে টোকা দিচ্ছে। শেহজাদ লম্বা করে শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করল। হাত বাড়িয়ে দরজাটা আনলক করল। ধরফর করা বুকে হাত দিয়ে ডানে বামে পানির বোতল খুঁজল সে। ঝামেলাটা হলো, কাজের সময় কিছুই হাতের কাছে পাওয়া যায় না। আজও পাওয়া গেল না। শেহজাদ পানি খুঁজতে খুঁজতেই রোদসী সরু চোখে তার দিকে তাকালো। বলল,
“কী বলছিলেন তখন? এবার বলুন।”
শেহজাদ শুকনো মুখে বিষম খেল। কপাল ভালো, স্বপ্নের ব্যাপারটা সামনের মানুষ ধরতে পারে না। পারলে বিরাট এক কেলেংকারী হতো আজ! শেহজাদ শুকনো গলায় বলল,
“পানি এনেছেন?”
রোদসী ব্যাগ হাতড়ে একটা পানির বোতল এগিয়ে দিল। শেহজাদ এক ঢোকে বেশ খানিকটা পানি খেয়ে শুকিয়ে আসা গলাটাকে ভেজাল। পানির বোতল ফেরত দিতে গিয়ে দেখল, মেয়েটা আজ হালকা নীল রঙের একটা কূর্তি পরেছে। চশমাও পরেছে ঠিকঠাক। স্বপ্নের সাথে কিছুরই মিল নেই। অবশ্য মিল থাকার কথাও নয়। স্বপ্ন শুধুমাত্র স্বপ্ন। তা নিয়ে এতো ভাবাভাবির কী আছে? শেহজাদ ড্রাইভিং এ মন দিল। এর মাঝেই কল এল আননোন একটা নাম্বার থেকে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শুনতে পাওয়া গেল,
“মন্ত্রী পূর্বাচলের ঐ অংশটাকে ঘিরে একটা ইকো-রিসোর্ট বানাতে চান। যার প্রাথমিক নাম দেওয়া হয়েছে 'রিভারস্টোন ইকো-রিসোর্ট'। প্রজেক্টের ব্লু-প্রিন্ট আর পেপারওয়ার্ক অলরেডি রেডি করে রাখা হয়েছে বেনামি ইনভেস্টরদের মাধ্যমে। শুধু জমির ওই অংশটুকু পেলেই কাজ শুরু হয়ে যাবে।"
কলটা লাউডে ছিল। রোদসীও সেসব কথা স্পষ্ট শুনল। শেহজাদ কৌতুহল নিয়ে শুধাল,
“ইকো রিসোর্ট? আর ইউ সিরিয়াস?”
“ইয়েস স্যার, এটাই তার মেগা প্রজেক্ট।”
শেহজাদ খট করেই লাইন কাটল। তার যা জানার তা জানা হয়ে গেছে। তবে কেন যেন ইকো রিসোর্টটা তার কাছে নেহাতই এক মোহড়া মনে হচ্ছে। ভেতরে নিশ্চয়ই ভিন্ন কোনো ঘটনা আছে। শেহজাদরা বালু তীরে পৌঁছাতে খুব একটা সময় লাগল না। সময়ের আগে চলে আসায় শেহজাদ পার্শ্ববর্তী এলাকায় ঘুরে সন্দেহজনক কিছু খোঁজার চেষ্টা করল।
বালু নদীর তীরে চারিদিকে থরে থরে কাশফুল ফুটেছে। শরতের আগমনী বার্তা বুকে চেপে তারা দুলছে মনের সুখে। মেঘবরণ সেই কাশফুলের সারিতে মুক্ত বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে। সাধারণ চোখে সেদিকে একবার তাকালেই মনে হচ্ছে, চোখের সামনে ফুলগুলো রীতিমতো ঢেউ খেলছে। শেহজাদ বার কয়েক সেই ঢেউ খেলানো ফুলগুলো দেখল। আড়চোখে রোদসীর দিকে তাকালো। মেয়েটির চোখে মুখে কোনো মুগ্ধতা নেই। গতবার তার ছাদ দেখে মনে হয়েছে, ফুল খুব পছন্দ করে। বছরে একবার ফোটা এই কাশফুল তাহলে তাকে প্রফুল্ল করছে না কেন?
শেহজাদের উদ্বিগ্ন দৃষ্টির বিপরীতে রোদসীকে দেখা গেল একেবারেই স্বাভাবিক। সে সরু চোখে ডানে বামে তাকিয়ে কিছু খুঁজছে। শেহজাদ হাঁটা থামালো। একজায়গায় দাঁড়িয়ে ফোন বের করে চমৎকার সেই প্রাকৃতিক দৃশ্যের দুটো ছবি তুলল। রোদসী এগিয়ে গিয়েছিল। ছবি তোলার শব্দ পেয়ে সে থামল। এগিয়ে এসে দেখল শেহজাদ কাশফুল আর নদীর কয়েক রকম ছবি তুলছে। রোদসী কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইল,
“কোনো ক্লু পাওয়া গেল?”
“হুঁ?”
“ছবি তুলছেন হঠাৎ তাই বললাম।”
রোদসীর কাঠখোট্টা প্রশ্নের বিপরীতে শেহজাদ একটু বিব্রত হলো কি? মেয়েটা মনে হচ্ছে শুধু জোছনা নয়, প্রকৃতির সমস্ত সৌন্দর্যতেই উদাসীন। নয়তো এতো চমৎকার দৃশ্যকে সামনে রেখে ছবি তোলার মতো সাধারণ ঘটনায় যুক্তি খুঁজতো না নিশ্চয়ই? শেহজাদ সময় নিয়ে ভাবল কিছু একটা। তারপর গুছিয়ে বলল,
“মাঝে মাঝে আমরা কিছু কাজ অকারণেই করি। আর সেই অকারণ কাজগুলোই হয়তো ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে একটু প্রশান্তি এনে দেয়।"
রোদসী তার কথা বুঝল কিনা কে জানে? তাকে একভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে শেহজাদ নিজ থেকেই আবার বলে উঠল,
“শরতের মেঘগুলো আজ মাটিতে নেমে এসেছে। এই চমৎকার দৃশ্যের দুটো ছবি না তুললে কেস শেষ হলেও আফসোস রয়ে যাবে।”
রোদসী তার কথায় পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কাশফুল দেখল। মুহূর্তেই তার কপালের ভাঁজ স্তিমিত হলো। বেশ অনেক্ষণ তারা সেখানে দাঁড়িয়ে শরতের সকালে নরম রোদের সৌন্দর্য উপভোগ করল। বাতাসের সাথে কাশফুলের ছোট ছোট অংশ উড়ে যাচ্ছে। এতো মোহনীয় সৌন্দর্য এভাবে ঝরে যেতে দেখেও কেন যেন খারাপ লাগছে না। বরং প্রকৃতির মাতাল করা সৌন্দর্যে আরও মুগ্ধতা জন্মাচ্ছে। শেহজাদ খেয়াল করল, তার ছাইরঙা ফর্মাল শার্টটা অক্ষত থাকলেও কালো প্যান্টের জায়গায় জায়গায় কাশফুল লেগে যাচ্ছে। ঝেরে টেরেও তার দূর করা যাচ্ছে না। রোদসীর খোলা চুলেও কাশফুলগুলো এলোমেলোভাবে আটকে যাচ্ছে। কই? তাকে তো বিব্রত লাগছে না?
শেহজাদ এবার তাড়া দিল। দ্রুত পায়ে তারা মির্জা কামরুলের বিশালকার ফার্মহাউজটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। যার সামনে বড় বড় অক্ষরে লেখা, “কুহক”। যার আভিধানিক অর্থ মায়া বা ছলনা। শেহজাদ ভেবে পেল না, এতো এতো নাম থাকতে বাড়িটির নাম এটাই কেন দেওয়া হলো? কানিজের সাথে তারা খুব বেশি সময় কথা বলতে পারেনি। মেয়েটি আজ ভীষণ ব্যস্ত। আজই তার বিয়ে। ব্যাপারটায় শুরুতে খটকা লাগলেও সামান্য কথোপকথনে জানা গেল এক চরম সত্য। কানিজ মির্জা কামরুলের পালিত কন্যা নয়। কানিজ তার এমন এক অন্ধকার সত্য, যা সে সারাজীবন লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে চেয়েছিল। চেয়েছিল তার নামের সাথে অবৈধ ট্যাগে নিজেকে না জড়াতে। তাই হয়তো কানিজের মায়ের মৃ'ত্যুর পর কানিজকে তিনি নিজের নজরদারিতে নিয়ে আসেন। শুধুমাত্র তার জন্য এক সোনার খাঁচা বানান। মায়া করে নাম রাখেন — কুহক। কানিজ কখনোই তার সাথে থাকতে চায়নি। সে তার টোপ হিসেবে দেওয়া এতো এতো অর্থও চায়নি। সে সারাজীবন নিজের মতো মুক্ত হয়ে বাঁচতে চেয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে, যে লোকটি তার অবৈধ সন্তানকে দুনিয়ার সামনে চুপ থাকার জন্য উইল করে সব লিখে দিয়ে গেছেন, সেই লোকটির মৃ'ত্যুর পরপরই মেয়েটি তার জীবনের সঠিক ছন্দ খুঁজে পেয়েছে। কাঙ্ক্ষিত মানুষকে নিয়ে সে সত্যিকারের ঘর করার সুযোগ পেয়েছে। বিনা দ্বিধায় সে উড়তে চাইছে কারো ব্যক্তিগত আকাশে। মেয়েটি মির্জার উইলের ব্যাপারে অবগত নয়। তাকে বেশ কয়েকবার কল করেও যোগাযোগ করতে পারেনি উকিল। সে মির্জার ছায়াও তার জীবনে রাখতে চায় না। মেয়েটির প্রাণহীন আঁখিদ্বয়ে নতুন প্রাণের সঞ্চার দেখে শেহজাদ কথা বাড়ায় না। তাকে নতুন জীবনের শুভেচ্ছা জানিয়ে বেরিয়ে আসে সেখান থেকে। গাড়িতে বসে পুরো রাস্তায় সে কেন যেন কিছুই বলতে পারে না। কানিজের কথায় এতোটুকু স্পষ্ট, সে মির্জার খুনের সাথে শূন্য দশমিক দশ ভাগও জড়িত নয়। তাহলে এই মিস্ট্রির আসল মাস্টারমাইন্ড কে?
চলবে…