#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_১৯
অফিসে ফিরে শেহজাদ নতুন করে রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে প্রমাণ খুঁজতে শুরু করল। ‘রিভারস্টোন ইকো রিসোর্ট’ কে ঘিরে তার বড় বড় স্বপ্নীল ব্যাখ্যা দেওয়া স্পিচগুলোও দেখল। কিন্তু তাতে সন্দেহ করার মতো কিছুই পাওয়া গেল না। গোটা দিন কাটল এসব অহেতুক কাজে। শেষ অবধি শেহজাদ মনমতো ছক কষল। টুকটাক জমানো সব প্রমাণ সে একে একে সাজাল। এবার আর রোদসীর ওপর ভরসা করা যাবে না। নাহয় গতবারের মতো শেষ সময়ে হতভম্ব হতে হবে। শেহজাদকে পুরোদমে প্রস্তুত হতে দেখে রোদসী হুট করেই জানতে চাইল,
“আপনি কি নেক্সট হিয়ারিং-এ মন্ত্রীর নাম নিতে চাচ্ছেন?”
“কেন? তার নাম নিলে সমস্যা হবে?”
শেহজাদ কাজে ডুবে থেকেই জবাব দিল। রোদসীর মনে হলো, শেহজাদ আগামী শুনানিতেই এই কেসের হাঁটু ভেঙে দিতে চাচ্ছে। আর তার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতিও সে ইতিমধ্যেই গোছাতে শুরু করেছে। তবু কোথাও একটা রোদসীকে বেশ জ্বালাচ্ছে। মনে হচ্ছে খুব সূক্ষ্ম কিছু তারা মিস করছে। কিন্তু সেটা কী? রোদসী শুরু থেকে ভাবতে শুরু করল। মির্জা কামরুলকে তার ফার্মহাউজে সাত সাতবার স্ট্যাব করা হয়েছে। মাথা খাটিয়ে তাকে বাথটাবে উপুড় করে ফেলে সমস্ত র’ক্ত পরিষ্কার করা হয়েছে। পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে ম্'ত্যুর কারণ হিসেবে অতিরিক্ত র'ক্তক্ষ'রণকেই দায়ী করা হয়েছে। পুরো ফার্মহাউজে পুলিশ আলী ব্যতীত কারো ফিঙ্গারপ্রিন্ট পায়নি। তার ধারণা যদি খুব একটা ভুল না হয়, তাহলে মির্জাকে মা'রার পর তার মৃ'ত্যু নিশ্চিত করে খু'নি তাকে বাথটাবে ফেলে রাখে। এবং সময় নিয়ে সমস্ত প্রমাণ মিটিয়ে দেয়। সবকাজ শেষে মির্জাকে আবারো ঘরে আনা হয়। পরিষ্কার করা হয় বাথটাব। এতো এতো কাজে মোটামুটি ঘন্টা দুয়েক সময় অবশ্যই তাদের লেগেছে। এই দুটো ঘন্টায় কেউ তাদের উপস্থিতি ঠাওর করতে পারেনি এটা কীভাবে সম্ভব? আলী কি ঘটনার শুরুতেই অজ্ঞান হয়েছিলেন? যদি তাই হবে, তাহলে ম্'ত্যু য'ন্ত্রণায় মির্জা যখন কাতরাচ্ছিলেন, তখন সেই শব্দ কি আর কেউ শোনেনি? রোদসীর অস্থির লাগছে, মনে হচ্ছে খুব কাছে গিয়েও সে বড় কিছু মিস করছে। মির্জা কামরুলের মৃ'ত্যুর পর কানিজ বাদে কেউ-ই সবথেকে বেশি সুবিধা পায়নি। অথচ সুবিধা পেয়েও কানিজ স্বেছায় সব ছেড়ে চলে যাচ্ছে। মি’র্জাকে মেরে তাহলে খু'নির লাভ হলো কী? নাহ, এই প্রশ্নের জবাব সে এখনো পায়নি। পায়নি আলীর আত্মসমর্পণ নাটকের যুৎসই কোনো কারণও। কেস নিয়ে ভাবতে ভাবতেই রোদসীর চোখ টেবিলের ওপর থাকা একটা লেখায় পড়ল। সেদিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ ভেবে রোদসী কেন যেন একদিনের ছুটি চাইল। বলল,
“আমি আগামীকাল ছুটি নিতে চাচ্ছি।”
শেহজাদের ব্যস্ত কলম এক মুহূর্তের জন্য থামল। জানতে চাইল,
“পরশু মির্জা কামরুলের কেসের দ্বিতীয় হিয়ারিং। আপনি কি এই হিয়ারিংটাও মিস করতে চাইছেন?”
“না, এটা এই কেসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক দিন। এটা মিস করব না। কে বলতে পারে? এটাই হয়তো দ্বিতীয় এবং সম্ভাব্য শেষ হিয়ারিং।”
শেহজাদ মাথা তুলে সামনে বসা মেয়েটির একরোখা ভাব দেখল। মেয়েটির চোখ কেমন জ্বলজ্বল করছে। কী আশ্চর্য তাকে এতো অদ্ভুত দেখাচ্ছে কেন? সে কি হাসছে নাকি? ঠোঁট দুটো একটু চাপা হাসিতে প্রশস্ত হলো বলে মনে হলো কেন? শেহজাদ পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকে অবলোকন করে বলল,
“শেষ? এতো জলদি? কী বলছেন? মাথা ঠিক আছে?”
“এই শেষ দিয়ে একেবারে শেষ বোঝাইনি। আমাদের দিক থেকে জানা-অজানার শেষ বুঝিয়েছি।”
শেহজাদের ভ্রু কুঁচকে এল। ইদানীং সে খেয়াল করছে, মেয়েটির আশপাশে এলেই তার কপাল কুঁচকে যাচ্ছে। সারাজীবনেও সে এতোবার ভ্রু কুঁচকায়নি যতবার মেয়েটির কথায় তার এখন ভ্রুদ্বয়ের মাঝে ভাঁজ পড়ে। শেহজাদকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রোদসী স্মিত হাসল। আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল,
“আমাকে শুধু আপনি কালকে দিনটা ছুটি দিন, স্যার। কথা দিচ্ছি, আপনার সামনে এমন কিছু নিয়ে আসব, যা আপনাকে মোটেও নিরাশ করবে না।”
শেহজাদ রোদসীর আত্মবিশ্বাস দেখে ভেতর ভেতর বিচলিত হলো। গতবার মেয়েটা একা একা ক্যাফেতে গিয়ে কালঘাম ছুটিয়ে দিয়েছিল। এবার আবার কী করার কথা ভাবছে? শেহজাদ বিচলিত গলায় জানতে চাইল,
“আপনি কী করার কথা ভাবছেন?”
"কেসটার আসল মোড় অবধি যাওয়ার কথা ভাবছি।”
শেহজাদকে বোকা বানিয়ে কথার মাঝেই রোদসী উঠে দাঁড়াল। অনুমতির তোয়াক্কা না করেই ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল। শেহজাদ বেশ কিছুক্ষণ একভাবে বসে রইল। রোদসীর কথার ধরনে মনে হচ্ছে, কোথাও একটা গন্ডগোল আছে। কিন্তু সেটা কী তা আন্দাজ করা যাচ্ছে না। ঘড়িতে একবার সময় দেখল সে। রাত ন'টা বেজে তিন মিনিট। এই অসময়ে মেয়েটি একদিনের ছুটি নিয়ে কোথায় গেল? গতবারের মতো আগ বাড়িয়ে বিপদ কাঁধে নিবে না তো? পরক্ষণেই নিজের ওপর তার বিরক্তি জন্মাল। রোদসী কি বাচ্চা নাকি যে তার জন্য শেহজাদকে ভাবতে হবে? ল' পাশ করে এসেও যদি এতোটুকু বাস্তবজ্ঞান না থাকে, তাহলে বিপদে পড়েই শিক্ষা নেওয়া উচিত। বারবার বাঁচিয়ে ফেললে ঠিক ভুল সম্পর্কে তার ধারণা হবে কী করে?
শেহজাদ নিজের কাজে মন দিতে চাইল। কিন্তু কেন যেন মনোযোগ ধরে রাখতে পারল না। শেষে অসহ্য হয়ে সে খাতা কলম গুছিয়ে বসল। ছড়িয়ে রাখা কেসের কাগজপাতি গোছানোর একপর্যায়ে মেডিকেল রিপোর্ট গুছাতে গিয়ে আচমকাই তার চোখে পড়ল একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মির্জা কামরুলের মাথার সামনের অংশে ফ্র্যাকচার দেখা গিয়েছিল। ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করা ছাড়া এমন হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
মজার বিষয়, এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় প্রথমবারের ময়নাতদন্তের রিপোর্টে আসেনি। এসেছে দ্বিতীয়বারের টায়। কিন্তু বাকি সব তথ্য একই হওয়ায় এই ছোট্ট করে লেখা অংশটায় তার নজর যায়নি। মির্জা কামরুলের প্রথম ময়নাতদন্তে শরীরের কোথাও কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ব্লাড স্যাম্পল পাওয়া যায়নি। অনাস্থা নিয়ে পুলিশ দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত করালেও ফলাফল একই আসে। পুলিশি রিপোর্টে দুটো ময়নাতদন্তের ফলাফল একই বলায় এভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চেক করা হয়নি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটাই সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে। মন্ত্রীর লোক তো ছু’রি দিয়েই তাকে মেরে ফেলতে পারছে, এর জন্য সামনে থেকে ভারী কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত করার প্রয়োজনটা ঠিক কোথায়? তবে কি কোথাও ভুল রয়ে গেল?
____
শেহজাদ অফিসে এল পরদিন সকালে। রাতে সে দ্রুত-ই বাড়ি ফিরেছিল। রাতভর ভেবে সে আলীকে অফিসে ডাকিয়েছে। একমাত্র আলী ছাড়া সত্য বলার মতো আর কেউ নেই। যে ভারী বস্তুর আঘাতে আলী শুধু অজ্ঞান হলো, সেই একই বস্তুর আঘাত মির্জা কামরুলের মাথায় কী করে গেল সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ হয়েই লোকটা হুট করে আত্মসমর্পণ এর নাটক-ই বা কেন করলো? তৃতীয়পক্ষের হু'মকিতেই যদি করে থাকে, তাহলে কোনো রকম নিরাপত্তা ছাড়া আবার শেহজাদের কথায় ভরসা রাখল কেন? শেহজাদ কিছুতেই হিসাব মিলাতে পারছে না। মনে হচ্ছে, আলীকে নির্দোষ ভাবাটা তার ভুল ছিল।
সকাল দশটার দিকে তন্ময় আলীকে নিয়ে চেম্বারে ঢুকল। লোকটার চেহারা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি, গালও মনে হচ্ছে অনেকাংশে ভেতরের দিকে দেবে গেছে। অপরাধবোধ আর অজানা কোনো এক আতঙ্কে লোকটার চোখজোড়া অস্থির হয়ে আছে। শেহজাদ তাকে আগাগোড়া পরখ করল। চোখের ইশারায় সামনের চেয়ারে তাকে বসতে দিল। আলী বসতেই শেহজাদ কিছুটা ঝুঁকে বসল। কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইল,
“মাথা এখন কেমন আছে?”
আলী বিভ্রান্ত নজরে শেহজাদকে দেখল। তাকে থমকে যেতে দেখে শেহজাদ প্রশ্নটার ধরণ বদলালো,
“খু'নের দিন আততায়ীরা আপনার মাথার পেছন দিক থেকে ভারি কিছু দিয়ে আঘাত করেছিল, এখন সেটা কেমন আছে? ব্যান্ডেজও খুলে ফেলেছেন, তাই জানতে চাচ্ছি।”
আলী দুর্বল গলায় কিছু বলতে চাইলে শেহজাদ তাড়া দেখিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল,
“হোয়াটেভার! ভালোই হয়তো আছে, দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।”
শেহজাদ টেবিলের ওপর রাখা ময়নাতদন্তের রিপোর্টটা আলীর দিকে ছুঁড়ে দিল। কড়া গলায় বলল,
"মিথ্যের পর মিথ্যে বলে যাচ্ছেন। একটুও ক্লান্ত লাগছে না?”
একটু থেমেই বলল,
“প্রথম হিয়ারিংয়ে আপনাকে রিমান্ডের ঐ জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি থেকে বাঁচালাম, আর আপনি? আপনি গিয়ে সোজা ফাঁসির দড়িতে গলা বাড়িয়ে দিলেন। এইতো সেদিন বললেন, আমায় বাঁচান। দু'দিন পরেই আবার বলছেন, আমাকে ছেড়ে দিন। আইনকে আপনি খেলনা পেয়েছেন? যখন মন চাইবে খেলবেন, যখন মন চাইবে ছুঁড়ে ফেলবেন?”
আলী মাথা নিচু করে ফেলল। একটিবারের জন্যেও প্রতিউত্তর করল না। শেহজাদ টেবিলে মৃদু টোকা দিয়ে বলল,
“বেশ, আপনার শেষদিনের কথাকেই আজ সত্যি মানি। খু'ন আপনি করেছেন। এবার বলুন, কীভাবে মে'রেছেন মির্জাকে? আর নিজের মাথার পেছনে ঐ আঘাত-ই বা কীভাবে এনেছেন?”
আলী এবারও জবাব দিল না। শেহজাদ ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। এই লোকটা চুপ থেকে কেসটাকে জটিল বানাতে চাচ্ছে। সেদিন ডিবি অফিসে বসে তাকে এভাবে জেরা করা যায়নি। আজ তাকে জানতেই হবে, আলীর আত্মসমর্পণের কারণ। শেহজাদ টেবিলে সজোরে থাবা বসিয়ে জানতে চাইল,
“খু'ন আপনি করেননি, তা আমি ভালো করেই জানি। ডিবি অফিসে গিয়ে আত্মসমর্পণের নাটকটা পুরোটাই মিথ্যে ছিল। কিন্তু কাকে বাঁচাতে আপনি মিথ্যে বলেছেন?”
আলী শুকনো ঢোক গিলে শেহজাদের দিকে তাকাল। তার চোখ জলে টুইটুম্বুর হয়ে আছে। এই বুঝিয়ে গড়িয়ে পড়ে সেগুলো নতুন কোনো মিথ্যের ফাঁদ পাতবে। শেহজাদের মাথাটা গরম হয়ে গেল। সে ক্ষেপা বাঘের মতো চেঁচিয়ে উঠল,
“আনসার মি, ড্যাম ইট!”
তার আকষ্মিক গর্জনে আলী রীতিমতো কেঁপে উঠল। তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল এতক্ষণের ভাসা ভাসা অশ্রু। দুই হাত তুলে সে কাঁপা গলায় বলল,
“আমারে মাফ করেন, স্যার। আমি আর এমন কিছু করমু না।”
শেহজাদ ঠান্ডা গলায় জানতে চাইল,
“কাকে বাঁচাতে চেয়েছেন আপনি? কাকে বাঁচাতে মিথ্যে বলেছেন?”
আলী এবার হাউমাউ করে শেহজাদের পায়ের কাছে হুমড়ি খেল। ক্রন্ধনরত গলায় বলল,
“আপনি আমারে মা'ইরা ফেলেন, স্যার। তাও এই কথা জিগায়েন না। আমি জবাব দিবার পারমু না।”
শেহজাদ হতভম্ব হলো। বলে কি এই লোক? লাগলে ম'রে যাবে তাও সত্যি বলবে না? শেহজাদ দু'হাতে আঁকড়ে ধরল নিজের চুলগুলো। জানলার দিকে হেঁটে গিয়ে আচমকাই এক ধাক্কায় ফেলে দিল রোদসীর টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা সব জিনিস। কলমদানি, পেপারওয়েট, ডায়রি, স্টিকি নোটস সহ হাবিজাবি সশব্দে আছড়ে পড়ল ফ্লোরে। শেহজাদকে প্রথমবারের মতো এতো রাগতে দেখে ছুটে এল তন্ময়। ব্যতিব্যস্ত হয়ে সে আলীকে সেখান থেকে বের করে আনল। দ্রুত হাতে ফোন করল রোদসীর নম্বরে। তন্ময়ের হাত পা কাঁপছে। শেহজাদের এমন উন্মাদ রূপ সে আগে কখনোই দেখেনি। হুট করে তাকে এভাবে রাগতে দেখে সে কী করবে বুঝতে পারছে না। রোদসী ফোন রিসিভ করতেই সে হড়বড় করে একে একে সব বলে ফেলল। ওপাশে থাকা রোদসী সেসব কথার বিনিময়ে একটি মাত্র বাক্য খরচ করল,
“ঘন্টাখানেক একা ছেড়ে দেন।”
তন্ময় বিব্রত হলো। ভুল শুনেছে ভেবে বোকার মতো জানতে চাইল,
“একা ছেড়ে দেব?”
রোদসী ফোন কেটে দিয়েছে। তন্ময়ের দ্বিধাদ্বন্দে ভোগা মনকে কৌতুহলী রেখেই সে ফোন কেটেছে। তন্ময় পড়েছে বিপাকে। হাসি মেয়েটা আজও অফিস কামাই করেছে। পুরো অফিসে শেহজাদ আর সে ছাড়া কেউই নেই। এই অসময়ে স্যারের সাথে একা অফিসে থাকা আর বাঘের গুহায় বসে গান গাওয়া একই কথা। না, না — সে কিছুতেই উপরে উঠবে না। আলীকে বিদায় দেওয়ার পর শেহজাদ সামনের একটা দোকানে বসে চা খেতে শুরু করল। তবু একবারের জন্যেও উপড়ে উঠল না।
রোদসী তন্ময়ের কল কেটে না চাইতেও হেসে ফেলল। সে মাত্রই কালিয়াকৈরের ক্রাইম স্পটটা থেকে বেরিয়েছে। ফার্মহাউজের সীমানা পেরিয়ে একটু পেছন দিকে এক কামরার একটি আধপাকা ঘর আছে। এই ঘরেই মোহাম্মদ আলী তার বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছেলে আরিয়ানকে নিয়ে থাকত। এই ঘরটি মির্জা কামরুলই করে দিয়েছেন। আদতে ফার্মহাউজটি দেখাশোনা করলেও তাদের থাকার ঘর আলাদা। উঁচুশ্রেণীর মানুষজন নিজেদের বিশাল কামরার বাড়ি ফাঁকা ফেলে রাখলেও কর্মচারীদের সেখানে থাকার অনুমতি দেননা। তাদের জন্য বরাবরই থাকে আলাদা ব্যবস্থা। আলীর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে।
রোদসী যখন সেখানে পৌঁছাল, দরজাটা তখন ভেজানো ছিল। রোদসী আলতো করে ধাক্কা দিতেই মৃদু শব্দ তুলে দরজাটা খুলে গেল। ভেতরের পরিবেশটা বেশ স্যাঁতসেঁতে। একটা ভাঙাচোরা চৌকি, কিছু অগোছালো কাপড় আর খেলনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। চৌকির এক কোণায় গুটিশুটি মেরে বসে ছিল বিশালদেহী এক যুবক। বয়স আঠারো বা উনিশ হবে, কিন্তু তার মানসিক বিকাশ একদম পাঁচ বছরের অবুঝ শিশুর মতো। রোদসী তার মনোযোগ আকর্ষণ করতে ধীর গলায় বলল,
“আসব?”
যুবকটি চমকাল। ডানে বামে তাকিয়ে দ্রুত দুদিকে মাথা নাড়ল। হাতে ধরা খেলনা গাড়িটি সামনের দিকে উঁচু করে ভয়ার্ত গলায় বলল,
“না, না — কেন আসবে? কেন আসবে? কে তুমি? কে তুমি? বাবা! বাবা!”
রোদসী খেয়াল করল, ছেলেটি এক কথা দু'বার করে কিছুটা টেনে টেনে বলছে। রোদসী তাকে অভয় দিল। গুছিয়ে বলল,
“আমি তোমার বাবার বন্ধু। মোহাম্মদ আলী আমাকে এখানে এলে দেখা করে যেতে বলেছে। কই তোমার বাবা? বাসায় নেই?”
যুবকটি বাবার নাম শুনে কিছুটা ধাতস্থ হলো। তাকে আরেকটু ধাতস্থ করতে রোদসী বলল,
“তোমার বাবার কেসটা আদালতে আমরাই দেখছি। তাকে জেল যাওয়া থেকে বাঁচাতে হবে তো, তাই দেখা করতে এলাম।”
“জেল, জেল— জেল খুব খারাপ। খুব খারাপ! বাবাকে মেরেছে। মেরেছে বাবাকে।”
রোদসী সাহস করে এবার ভেতরে ঢুকল। আলীর ছেলেটি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। রোদসীকে আগাতে দেখে সে তার একটা খেলনা তার দিকে এগিয়ে দিল। বলল,
“আরিয়ানের সাথে খেলবে তুমি? খেলবে তুমি?”
রোদসী আলগা হাতে খেলনাটি হাতে নিয়ে চৌকিতে বসল। ডানে বামে তাকাতে তাকাতে বলল,
“সে নাহয় খেলব। কিন্তু তোমার বাবা কোথায় বলোতো?”
“বাহিরে গেছে বাবা। বাহিরে।”
ছেলেটির এক কথা দু'বার বলার সমস্যা আছে। প্রায় প্রতিটি কথাই সে দু'বার করে বলছে। তবে স্বস্তির ব্যাপার হলো, ছেলেটি তাকে একনজরে দেখছে না। সে খেলনাগুলো নিয়ে বসে থেকেই কথা বলছে। এতে রোদসীর অস্বস্তি একটু কম হচ্ছে। রোদসী বড় করে শ্বাস নিয়ে জানতে চাইল,
“বাবাকে পুলিশরা খুব মেরেছে, দেখেছো?”
“দেখেছি, দেখেছি। মেরেছে, খুব মেরেছে।”
রোদসী আলীর অনুপস্থিতির সুযোগ পেয়ে কৌশলে জানতে চাইল,
“ওরা বলেছে, তোমার বাবা নাকি মির্জা কামরুলকে মেরেছে। বাবা কি সত্যি মির্জাকে মেরেছে, আরিয়ান?”
আরিয়ান দুদিকে মাথা নেড়ে চেঁচিয়ে উঠল। বলল,
“বাবা মারেনি, মারেনি বাবা। মির্জা মেরেছে বাবাকে। চড় মেরেছে, চড়।”
রোদসী খেয়াল করল ছেলেটির বাচন ভঙ্গি চমৎকার। পূর্ণ শুদ্ধ ভাষায় কথা বলছে সে। অথচ আলী আঞ্চলিক ভাষা আর শুদ্ধ ভাষা মিলিয়ে কথা বলে। তাহলে সে শুদ্ধ ভাষা শিখল কী করে?
“মির্জা তো তাহলে খুব খারাপ লোক ছিল।”
“খারাপ লোক, খারাপ লোক। ওই মির্জা একটা খারাপ লোক।”
রোদসী আরিয়ানের সাথে সহজ হতে চাইল, বলল,
“তুমি তো খুব সুন্দর করে কথা বলো! এতো সুন্দর করে কথা বলা শিখলে কোথায়?”
“টিভিতে। বড় টিভিতে।”
এতোটুকু বলেই সে হেসে কুটিকুটি হলো। রোদসী বুঝল, মির্জার অনুপস্থিতিতে ঐ বাড়িতে আরিয়ানের যাতায়াত ছিল। নিষিদ্ধ জিনিসে সবারই প্রবল আকর্ষণ থাকে। আরিয়ানও তেমন। তাই হয়তো সেখানে যাওয়ার কথা বলতেই তার এতো খুশি লাগছে।
“তুমি কি বড় বাড়িটায় যেতে আরিয়ান?”
“যেতাম, যেতাম। লুকিয়ে লুকিয়ে যেতাম।”
আরিয়ান আবারো হাসছে। মনে হচ্ছে, সে খুব মজার কথা বলেছে। রোদসী সুযোগ পেয়ে জানতে চাইল,
“মির্জা যেদিন মা'রা গেল সেই রাতে তুমি ওখানে গিয়েছিলে আরিয়ান?”
আরিয়ান এবার জবাব দিল না। সে হাতে ধরে রাখা গাড়িটা হাওয়ার মাঝেই গুড়িয়ে প্লেনের মতো চালাতে থাকল। রোদসীর মনে হলো, সেই রাত নিয়ে কথা বলতে আলী তাকে মানা করেছে। নয়তো এভাবে সে এড়িয়ে যেত না। কথা আগানোর প্রসঙ্গ না পেয়ে সে শুকনো কাশল, বলল,
“ঘরে পানি আছে? একটু পানি খাব।”
আরিয়ান তার পাশে থাকা পানির বোতলটা রোদসীর দিকে এগিয়ে দিল। ঠোঁট দিয়ে সে উদ্ভট শব্দ তুলে গাড়ি চালাচ্ছে। ইঞ্জিনের শব্দ সে মুখ থেকেই বের করছে। রোদসী বোতল হাতে নিয়ে মুখ খুলতে গিয়ে ইচ্ছেকৃত তা হাত থেকে ফেলে দিল। মুখে বলল,
“ইশ! পড়ে গেল তো!”
সতর্ক দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকাতে তাকাতে সে উবু হয়ে বসল। বোতলের মুখটা উঠাতে গিয়ে অসাবধানে তার চোখ পড়ল চৌকির নিচে থাকা একটা মেটালিক স্ট্যাচুতে। খোলা দরজা দিয়ে আসা দিনের আলোয় তার গায়ে লেগে থাকা কা'লসিটে পড়া র'ক্তের দাগ স্পষ্ট। রোদসী সময় নিল না। প্রায় সাথে সাথেই উঠে বসল। স্বাভাবিক ভাবে বোতলের মুখটি উঠিয়ে বলল,
“পেয়ে গেছি।”
রোদসী ঢাকনাটা লাগিয়ে বোতলটা আরিয়ানের হাতে ধরিয়ে দিল।
"পানি খেতে ইচ্ছে করছে না আর। থাক, খাবো না।”
রোদসী বুঝতে পারছে না, এত বড় প্রমাণ পুলিশের চোখ এড়াল কী করে? তারা আলীর ঘর সার্চ করেনি? তাহলে কি এটা ঘটনার পরে এখানে এনে লুকানো হয়েছে? তাও এত কাছাকাছি জায়গায়? রোদসীর হুট করেই মনে হলো, সে কেসটার মূল খু্ঁজে পেয়েছে। ব্যাগ হাতড়ে সে একটা সাদা কাপড় বের করল। জুতোয় লেগে থাকা ময়লা পরিষ্কারের অজুহাতে চৌকিতে বসেই হাতটা নিচের দিকে নামাল। আরিয়ানের অন্যমনষ্কতার সুযোগ নিয়ে পিতলের ছোট্ট স্ট্যাচুটা কাপড় পেঁচিয়ে বের করে আনল। সময় মতো তন্ময়ের ফোন আসতেই সে ফোনের অজুহাতে মূর্তি হাতে বেরিয়ে এল।
আরিয়ান কিছু বোঝার আগেই রোদসী দ্রুত পায়ে খু'নের মূল হাতিয়ারটা নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। ফার্মহাউসের সীমানা পার হয়ে বড় রাস্তায় আসতেই শরতের ঠান্ডা বাতাস তার মুখে আছড়ে পড়ল। কিন্তু রোদসীর মস্তিষ্কের ভেতর তখন ঝড় বইছে। মির্জা কামরুলের মৃত্যু রহস্যের সবকটা জট তার চোখের সামনে এখন জলের মতো পরিষ্কার। সে দ্রুত একটা সিএনজি ডেকে শহরের দিকে রওনা হলো। অফিসে গিয়ে এবার স্যারকে সব গুছিয়ে বলতে হবে। পিতলের মূর্তিটিকেও ফরেন্সিক টেস্টের জন্য পাঠাতে হবে।
এদিকে শেহজাদের চেম্বারের অবস্থা তখন ভয়াবহ। রোদসীর টেবিলের যাবতীয় জিনিসপাতি ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। শেহজাদ সময় নিয়ে ফ্রেশ হলো। ঠান্ডা পানির ঝাপটা চোখেমুখে পড়তেই একটু একটু করে রাগটা নিয়ন্ত্রণে এলো। বেশ কিছুক্ষণ সে হাবিজাবি আঁকিবুঁকি করে কোথায় আসল ভুলটা হচ্ছে তা খুঁজতে শুরু করল। এবং আচমকাই তার মাথায় এলো আলীর প্রতিবন্ধী ছেলেটির কথা। আলীর একমাত্র দুর্বলতা তার ছেলেটি। সে কি কোনোভাবে তার ছেলেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে? তার ছেলেকে কেউ জিম্মি করে রাখেনি তো? ব্যাপারটা মাথায় আসতেই অধৈর্য্য হলো শেহজাদ। চটজলদি কোটটা গায়ে চাপিয়ে বের হতে চাইল। রিসিপশনটা খালি। তন্ময় ঘন্টাখানেক আগে বেরিয়েছে। এখনো ফেরেনি নাকি? শেহজাদ তাকে কল করল। কিন্তু ফোনটা রিসিভ হলো না। শেহজাদ পরপর আরও কয়েকবার চেষ্টা করল। প্রতিবার একই ফলাফল এল। উপায় না পেয়ে সে অফিসে তালা লাগাতে উদ্যত হলো। ঠিক সেই মুহূর্তে তন্ময় কল ব্যাক করল। রয়েসয়ে বলল,
“সরি স্যার, ফোন সাইলেন্টে ছিল।”
ডাহা মিথ্যা কথা বলেছে সে। ফোন হাতে নিয়ে সে বিপদের মাত্রা আঁচ করছিল এতক্ষণ। মিস রোদসীর কথামতো স্যারকে সে ঘন্টাখানেকের বেশি সময় একা রেখেছে। এতক্ষণে তার রাগ কমে যাওয়া উচিত। সব ভেবে সে সাহস করে কল ব্যাক করেছে। শেহজাদের ব্যস্ত গলা ভেসে এল,
“অফিসে এসো, আমি বের হবো। অফিস খালি।”
“স্যার, রোদসী ম্যাডাম আসছেন। তিনি আপনাকে অপেক্ষা করতে বলেছেন।”
শেহজাদ ত্রস্ত পায়ে লিফটের কাছে এগিয়েছিল। তন্ময়ের কথা শোনামাত্র সে চমকে উঠল। উদ্বেগ নিয়ে জানতে চাইল,
“কোথা থেকে আসছেন? উনি তো আজ ছুটি নিয়েছেন।”
“উনি আমাকে একটু আগেই বললেন, উনি আসছেন। আর…”
“আর?”
“আর উনাকে বেশ খুশি মনে হলো।”
শেহজাদ ভড়কে গেল। তন্ময় এসব কী বলছে? সত্যতা যাচাই করতে শেহজাদ তন্ময়ের কল কেটে রোদসীকে কল করল। রোদসী আজ অন্যদিনের তুলনায় দ্রুতই কল রিসিভ করল। তার গলার স্বরটা অন্যরকম শোনাচ্ছে,
“রাস্তায় প্রচুর জ্যাম, স্যার। আরও ঘন্টা দুয়েক লাগতে পারে।”
শেহজাদ কিছু একটা জিজ্ঞেস করার আগেই সে ফোন কেটে দিল। কয়েকবার ফোন করেও এবার আর তার সংযোগ পাওয়া গেল না। ফোনটি বন্ধ বলছে। শেহজাদ বিরক্তিতে ‘চ' সূচক শব্দ করে উঠল। মেয়েটা ফোন বন্ধ করেছে কেন? পরের দু'ঘন্টা শেহজাদ বেশ অধৈর্য্য হয়ে কাটিয়েছে। তন্ময় সাহস করে ওপরে এসেছিল। তাকে সে পুনরায় নিচে পাঠিয়ে ঠান্ডা কিনিয়ে এনেছে। তার অস্থিরতার ফাঁকেই তন্ময় ঘরটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করেছে। রোদসী দু'ঘন্টা লাগবে বললেও সে ফিরে এসেছে পনেরো মিনিট আগেই। এসে ধীরেসুস্থে সে দরজায় নক করেছে। ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলেছে এক আশ্চর্যজনক কথা।
"মিস্ট্রি সলভড, স্যার!"
শেহজাদ তুরন্ত প্রশ্ন ছুঁড়ল,
"সলভড মানে?”
রোদসী একটা চেয়ার টেনে বসল। সামনে রাখা গ্লাস থেকে সবটুকু পানি গলাধঃকরণ করে ধাতস্থ হলো। বড় করে শ্বাস টেনে বলল,
“মির্জা কামরুল হাসানের খু'নের পেছনে দু'পক্ষের হাত আছে। যার দ্বিতীয় পক্ষ মন্ত্রীর লোক।”
“আর প্রথম পক্ষ?”
“আরিয়ান।”
“ সে কে?” তন্ময় বাধ সেধে রোদসীর পাশের চেয়ারটা টেনে বসল। রোদসী তার দিকে তাকিয়ে সহজ গলায় জবাব দিল,
“ আলীর ছেলে।”
“ কী সর্বনাশ! আলীর ছেলে মে'রেছে মির্জা কামরুলকে?” তন্ময়ের গলায় চরম অবিশ্বাস। তার একের পর এক প্রশ্ন শেহজাদকে কিছু বলার সুযোগ দিচ্ছে না।
রোদসী বড় করে শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করল,
“আরিয়ান বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। তার মানসিক বিকাশ এখনো সঠিকভাবে হয়নি। মির্জা কামরুল আলীদের থাকার ঘরটা ফার্মহাউজের সীমানার বাহিরে তৈরি করেছেন। আরিয়ানের ফার্মহাউজে আসা নিষিদ্ধ ছিল। তবু সুযোগ পেলেই সে বাবার থেকে লুকিয়ে ফার্মহাউজে যেত। ওখানকার টিভি দেখা তার একটা গোপন শখের মতো ছিল। সেদিন মির্জা যখন আলীর গায়ে হাত তুললেন আরিয়ান তখন ফার্মহাউজে। সে এই বিশ্রি দৃশ্যটা দেখে ফেলে।”
একটু দম নিয়ে সে ফের বলতে শুরু করে,
“এতেই তার তীব্র ক্ষোভ জন্মে। বাবার চড়ের বদলা নিতে সে রাতের বেলা আলীর ঘুমের সুযোগ নিয়ে ফার্মহাউজে যায়। সেখানে মির্জা হয়তো তখন ড্রয়িং রুমে বসে আয়েশ করে টিভি দেখছিলেন। আরিয়ান হুট করে চলে আসায় তার হয়তো আরিয়ানের সাথে কথা কাটাকাটি হয়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে আরিয়ান একসময় ড্রয়িং রুমের ভারি পিতলের স্ট্যাচুটা দিয়েই মির্জার মাথায় আঘাত করে ফেলে।”
রোদসী থামতেই শেহজাদ প্রশ্ন ছোঁড়ে,
“কাজটা আরিয়ান-ই করেছে, এ ব্যাপারে আপনি এতো শিওর হচ্ছেন কীভাবে?”
“কারণ আমার হাতে প্রমাণ আছে।”
কথাটা বলেই রোদসী ব্যাগ থেকে কাপড়ে পেঁচানো পিতলের ছোট স্ট্যাচুটা বের করে টেবিলের ওপর রাখে। শেহজাদের চোখে চোখ রেখে বলে,
“বলেছিলাম না? নিরাশ করব না।”
শেহজাদের ঠোঁটের কোণে এবার সূক্ষ্ণ হাসির রেখা দেখা গেল। এতক্ষণ যেই একটা জায়গা সে মিস করছিল, তা এখন পুরোপুরি পরিষ্কার। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর আরিয়ান হয়তো আলীকে সত্যি বলে দিয়েছে, তাই আলী আত্মসমর্পণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। শেহজাদের নিরবতার সুযোগ নিয়ে রোদসী আবারও বলতে শুরু করে,
“মির্জাকে আঘাত করার পরপর র'ক্ত দেখে আরিয়ান ভয় পেয়ে যায়। সে স্ট্যাচু হাতেই দৌড়াতে শুরু করে। সে ফার্মহাউজের গেট থেকে বের হওয়ার পরপরই হয়তো মন্ত্রীর লোকেরা মির্জাকে শাঁসাতে আসে।”
রোদসীর মুখের কথা শেহজাদ এবার একরকম কেড়ে নিল। নিজ থেকেই খু'নের রাতের বাকি গল্পটা সে মিলিয়ে ফেলল,
“তাদের কথা কাটাকাটির শব্দে আলীর ঘুম ভাঙে। পাশে ছেলেকে না পেয়ে সে তটস্থ হয়ে ছুটে যায় ফার্মহাউজে। সেখানে মন্ত্রীর লোকেরাও ততক্ষণে চলে এসেছে। আলী তাদের দেখে ফেলতেই তারা কৌশলে আলীর মাথার পেছন অংশে আঘাত করে তাকে অজ্ঞান করে। ঘরে গিয়ে র'ক্তা'ক্ত মির্জাকে দেখে তারা হতবিহ্বল হয়। নিজেদের লোকের কাজ ভেবে অপরাধটা ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করে। মির্জার মৃ'ত্যু নিশ্চিত করতে তাকে সাত সাতবার স্ট্যাব করা হয়। প্রমাণও সব যত্ন সহকারে ধুয়ে মুছে ফেলা হয়।”
“এক্সাক্টলি!” রোদসী শেহজাদের সাথে সহমত প্রকাশ করল। বাঁ হাতে চশমাটা একটু ঠেলে দিয়ে বলল,
“তার মৃ'ত্যুর রাতের সম্পূর্ণ ঘটনা আন্দাজ করা গেলেও, তার মৃ'ত্যুর জন্য আদতে কে দায়ী— তা কিন্তু জানা অসম্ভব। আরিয়ানের ঐ আঘাতে মির্জা সাহেব মা'রা গিয়েছিলেন কিনা বা তিনি তখনও জীবিত ছিলেন কিনা এই সত্য শুধু মন্ত্রীর লোকেরা জানে। আর তারা নিশ্চয়ই শাস্তি নিশ্চিত জেনে সত্য বলবে না?”
শেহজাদ স্মিত হেসে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। এবার তার কাছে পুরো কেসটা একদম জলের মতো পরিষ্কার। সে তাচ্ছিল্য হেসে সেই সত্য অস্বীকারের সংশয়টা উড়িয়ে দিল। তন্ময় তখনও হতভম্ব হয়ে বসে আছে। সে ভাবতেও পারেনি এই কেসের মূল হোতা আরিয়ান নামের এই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছেলেটা হবে। সে আশ্চর্যে ডুবে থেকেই জানতে চাইল,
“আপনি মার্ডার ওয়েপন পেলেন কোথায়?”
রোদসী তন্ময়ের উচাটন টের পেল। মৃদু হেসে বলল,
“স্বপ্নযোগে এক ঋষি এসে দিয়ে গেলেন।”
তন্ময় অপমানিত বোধ করল। ম্যাডাম কি এইমাত্রই তাকে নিয়ে রসিকতা করল? সে করুণ চোখে বিচার চাইতে স্যারের দিকে তাকাল। স্যার তখন অলক্ষ্যে তাকিয়ে হেসে চলেছেন। কী আশ্চর্য! একটু আগে ঘর এলোমেলো করে ফেলা লোকটা জয় নিশ্চিত হতেই এমন ভোল বদলে ফেলল কী করে? তন্ময় বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা না দেখে রিসিপশের দিকে বেরিয়ে যেতে চাইল। আপাতত তার মাথাটা এই কেস নিয়ে যথেষ্ট ভড়কে আছে। শেহজাদ কি একটা ভেবে টেবিলে চাপড় দিল। তন্ময়কে উঁচু গলায় ডেকে বলল,
“এটা একটা স্ট্রং এভিডেন্স, তবে এভাবে মার্ডার ওয়েপন কালেক্ট করা আনএথিকাল। চাইলেই এটা আমরা সরাসরি কোর্টে নিতে পারব না, নয়তো বিপক্ষ দল প্রমাণের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাবে। তন্ময়, ডিবি অফিসে আমাদের পক্ষের এসআই মাহফুজকে কল করো। তাকে বলো, আমি তাকে একটা মার্ডার ওয়েপন হ্যান্ডওভার করব। সে যেন অফিশিয়াল 'জব্দতালিকা' তৈরি করে এটা ইমার্জেন্সি ফরেনসিকে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।"
তন্ময় তৎক্ষনাৎ মাথা নেড়ে কাউকে কল করতে করতে স্ট্যাচু নিয়ে বেরিয়ে গেল। সে বের হতেই শেহজাদ মৃদু হেসে রোদসীকে অভিবাদন জানাল। যদিও কাজটা সে ভুল করেছে, তবু তার সাহসিকতার জন্যই আজ কেসটা সহজ হয়েছে। নয়তো এই মিস্ট্রি হয়তো সহজে উদঘাটন করা যেতো না। এর বিনিময়ে সামান্য প্রশংসা তো অবশ্যই করা যায়! শেহজাদ ঠোঁট দুটো সরু করে সোজা সাপটা বলল,
“ওয়েল, ইউ ডিড আ গ্রেট জব।”
সূর্য ততক্ষণে পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। প্রথমবারের মতো ঠিকঠাক প্রশংসা পেয়েও রোদসী হাসল না। বড় করে শ্বাস ফেলল শুধু। ক্লান্ত গলায় বলল,
“আমি কি এবার বাসায় যেতে পারি? আজ এমনিতেও আমার ছুটি চলছে।”
শেহজাদ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। হয়তো কিছু বলতেও চাইল। কিন্তু শেষ অবধি তা আর বলল না। হাত বাড়িয়ে সে ড্রয়ার থেকে কালো কাপড়ে মোড়ানো কিছু একটা বের করল। জিনিসটা রোদসীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“এটা সাথে রাখুন। কাল এর দরকার হতে পারে।”
রোদসী কাপড়টা সরিয়ে দেখল, তাতে একটি কালো রঙের পিস্তল। তার কৌতুহল ধরতে পেরে শেহজাদ নিজে থেকেই বলল,
“মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অফিশিয়ালি কাল প্রমাণ পেশ হবে। এতে…”
“আন্ডারস্টুড!”
শেহজাদকে কিছুই ভেঙে বলতে হলো না। তার আগেই রোদসী পিস্তলটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল, অতঃপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শেহজাদের দিকে পিস্তলটা তাক করে বলল,
“এটা তো পুরনো মডেল, স্যার!”
শেহজাদ ভেবেছিল হুট করে পিস্তল পেয়ে মেয়েটা ভড়কে যাবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটা তার দিকেই পিস্তল তাক করেছে। তার চোখেমুখে একটুও জড়তা নেই। শেহজাদ বেশ কিছুক্ষণ তার আত্মবিশ্বাসী চোখ দুটো দেখল। হুট করেই হেসে ফেলল সে। চেয়েও আটকাতে পারল না সেই চওড়া হাসি। হাসতে হাসতেই বলল,
“পিস্তল পেয়ে কি আমাকেই আগে উড়িয়ে দিতে চাইছেন?”
রোদসীর অধরযুগল সামান্য প্রসারিত হলো। গলায় কৌতুক ঢেলে সে বলল,
“এক কেস শেষ হওয়ার আগেই নতুন কেস নিয়ে নেব, এতোটাও বোকা আমি নই।”
সূর্যের বিদায়ী বেলায় আকাশ কেমন লাল হয়ে আছে। সেই লালচে আলোয় প্রথমবারের মতো দুজন মানব মানবীকে সহজ ভাবে হাসতে দেখা গেল। জটিলতম একটি কেসকে অবশেষে সমাপ্তির দ্বারপ্রান্তে আনার খুশিতে দুজনকেই বেশ প্রফুল্ল হতে দেখা গেল। মনে হলো, এমন একটি অসম্ভব দৃশ্যের সাক্ষী হতেই আজ আকাশরাজ এমন অনন্য সুন্দর লালরঙে সেজে উঠেছেন।
____
দ্বিতীয় শুনানির দিন আদালত কক্ষ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠল। সাংবাদিক, আইনজীবী আর উৎসুক জনতার ভিড়ে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। হয়তো শেহজাদ মূর্তজার শেষবারের ছন্দহীনতার খবর পেয়েই তাদের ভিড় জমেছে। রঙচঙে মোড়কে কীভাবে আজকের খবর সকলের সামনে উপস্থাপন করবেন সেই চিন্তায় বিভোর হয়েছেন। তাদের সেই আশায় পানি ঢেলে শেহজাদ মূর্তজা আজ নিজের সেরা ফর্মে ফিরল।
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে বিশালদেহী আরিয়ান। শেহজাদকে বেশি কষ্ট করতে হয়নি। আরিয়ানকে কয়েকটি সহজ প্রশ্ন করতেই সে গড়গড় করে সব সত্য বলে ফেলে। সত্যি শুনে আদালত কক্ষের ভেতর নেমে আসে ভয়ানক নিস্তব্ধতা। শেহজাদ আরিয়ানের জবানবন্দির পর সেই রাতের বাকি ঘটনা এক এক করে খুলে বলে। বলা বাহুল্য, মন্ত্রীর সংযুক্ত থাকার মতো খবরে চারিদিক সরগরম হয়ে উঠল। পক্ষ বিপক্ষের তুমুল তর্কের এক ফাঁকে শেহজাদ তার জমিয়ে রাখা প্রমাণগুলো পেশ করল। জজ হাসানুল করিমও বোধ হয় এমন কিছুর জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। আদালতের বিশৃঙ্খলা এড়াতে তিনি চড়া গলায় বেশ কয়েকবার বললেন ‘অর্ডার, অর্ডার!’ তিনি দ্রুত ভিত্তিতে একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড তৈরি করে আরিয়ানের মানসিক অবস্থার একটি পূর্ণ রিপোর্ট চাইলেন। সাথেই যাবতীয় প্রমাণ ক্রসচেক করে নতুন করে এই মামলায় আরিয়ানের নাম চার্জশিটে যুক্ত করার নির্দেশ দিলেন। কোনোপ্রকার রাজনৈতিক চাপ যেন আইনি প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে না পারেন সেই বিষয়েও তিনি কড়া করে আদেশ জারি করলেন। পেশকৃত প্রমাণের সত্যতা যাচাই এরপর মন্ত্রী রাশেদুল হক এবং তার ইকো রিসোর্টটিকে কেন্দ্র করে হওয়া তিনটি হ'ত্যার বিষয়টি পুনরায় খতিয়ে দেখে সিআইডিকে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আদেশ দেন। সবশেষে আরিয়ানের লুকিয়ে রাখা স্ট্যাচুটির গায়ে লেগে থাকা র'ক্তের ফরেন্সিক রিপোর্ট আসা অবধি মামলাটি দশদিনের জন্য মুলতুবি ঘোষণা করলেন। এক্ষেত্রে অবশ্য ধাক্কা খেলেন ইন্সপেক্টর মোয়াজ্জেম। তিনি মোটেও আশা করেননি, তার অগোচরে তার টিমের কেউ শেহজাদের কথায় দ্বিতীয়বার আলীর ঘরে সার্চ অপারেশন করেছে। তার নাকের ডগা দিয়ে এভাবে মার্ডার ওয়েপন উদ্ধার করা হলো, অথচ তিনি সামান্যতম আভাসও পেলেন না। মজার ব্যাপার হলো, গোটা ঘটনাটাই আসলে সাজানো এক নাটক। এর পেছনে লুকিয়ে থাকা আসল সত্য এসআই মাহফুজ আর দ্য থার্ড আই মেম্বার্সের তিন সদস্য ছাড়া আর কেউই জানে না।
আদালত কক্ষ থেকে বের হতেই ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর সাংবাদিকদের মাইক্রোফোনের ভিড়ে শেহজাদ আর রোদসী প্রায় আটকে গেল।
"অ্যাডভোকেট মূর্তজা! মন্ত্রী রাশেদুল হকের নাম আসায় এই কেস কি পলিটিক্যাল টার্ন নিচ্ছে?"
"আলী মিয়ার ছেলের ব্যাপারে আপনার কী মনে হয়? সে কি সত্যিই বুদ্ধি প্রতিবন্ধী?"
"স্যার, এদিকে একটু..."
হাজারো প্রশ্নের ভিড়ে শেহজাদ রোদসীকে আড়াল করে সামনের দিকে এগোচ্ছিল। এমনিতেই হুট করে মন্ত্রীর নাম আসায় চারিদিক উত্তাল। এই সময় সাক্ষাৎকার দিয়ে জলঘোলা করার কোনো মানে হয় না। রোদসী শেহজাদের ঠিক পেছনেই ছিল। কোর্ট প্রাঙ্গণের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় হঠাৎ ভিড়ের মাঝখান থেকে মাথায় ক্যাপ আর মুখে মাস্ক পরা একটা সন্দেহভাজন লোক শেহজাদের একদম গা ঘেঁষে দাঁড়াল। তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটার হাত বিদ্যুৎ বেগে শেহজাদের পেটের বাম দিকে নেমে এল।
একটা তীক্ষ্ণ ধারালো কিছু শেহজাদের পেটের মাংস ভেদ করে পরপর দু’বার ভেতরে ঢুকল। তড়িৎ গতিতে তার হাতটা খপ করে ধরে ফেলল শেহজাদ। ধরা পড়ার ভয়ে সে প্রায় সাথে সাথেই শেহজাদের হাতের কবজিতেও পোঁ'চ বসালো। অস্ফুটে গুঙিয়ে উঠল শেহজাদ। তার হাত থেকে ছুটে গেল আততায়ী। ভিড়ের সুযোগ নিয়ে চোখের পলকেই পালিয়ে গেল লোকটি। সাংবাদিকের দলেরা তখনো চারপাশ থেকে শেহজাদকে ঘিরে রেখেছে। হাতের ক্যামেরার সাহায্যে তারা ক্রমাগত ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়েছে। মনে হচ্ছে, আপাতত শেহজাদ মূর্তজার অবস্থা জানার থেকে হট টপিকটা পার্ফেক্ট একটি ছবি দিয়ে কভার করাই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কয়েকজন ততক্ষণে লাইভে এসে দেখাতে শুরু করেছে — কোর্টপ্রাঙ্গণেই অ্যাডভোকেট শেহজাদ মূর্তজার ওপর ছু'রিকাঘাত। তবে কি মন্ত্রীর লোকজন তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চাচ্ছে?
নানাবিধ গুঞ্জনে শেহজাদের কানে রীতিমতো তালা লেগে গেল। বাঁ হাতে সে পেটের বাম দিকটা চেপে ধরল। টের পেল, আঙুলের ফাঁক গলে ফিনকি দিয়ে বের হচ্ছে উষ্ণ র'ক্তের স্রোত। সূক্ষ্ম যন্ত্রণা সারা শরীরে ছড়িয়ে পাওয়ার সাথে সাথেই শেহজাদের চারপাশের পৃথিবীটা ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসতে শুরু করল। টলতে টলতে সে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। পেছন থেকে নরম কোনো হাত তাকে টেনে ধরতে চাইল। কিন্তু শেহজাদের নিস্তেজ শরীরটার ভারের কাছে সেই সামান্য শক্তি নেহাত-ই তুচ্ছ প্রমাণিত হলো। সিঁড়িতেই মুখ থুবড়ে পড়লো সে। জ্ঞান হারানোর আগ মুহূর্তে মনে হলো, রোদসী নামের একটি মেয়ে উতলা গলায় তাকে ডেকে চলেছে। শেহজাদ প্রাণপণে চেষ্টা করল চোখটা মেলে একটাবার বলতে — “ডোন্ট ওরি! আ'ম ফাইন।”
চলবে…