#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_২০
অন্ধকার, গাঢ় অন্ধকারে শেহজাদের পরিচিত পৃথিবীটা যখন একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছিল, তখনো তার কানে ভেসে আসছিল এক নারী কণ্ঠের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ। সেই কণ্ঠস্বর তার নিকট অকারণ বড্ড পরিচিত লাগছিল। মনে হচ্ছিল, কেউ একজন খুব পরিচিত মানুষ তার কানের কাছ থেকে হৃদয় নিঙড়ানো স্বরে ডেকে উঠছে। কিন্তু শেহজাদের তখন আর চোখ মেলার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট ছিল না। অগত্যা তাকে আত্মসমর্পণ করতে হলো আঁধাররাজের নিকট। জ্ঞান থাকলে হয়তো সে দেখতে পেত তন্ময় নামের ভীতু ছেলেটা কী সাহস নিয়ে সাংবাদিকদের ভিড় সরাচ্ছে, এ্যামবুলেন্সের অপেক্ষা না করেই তাকে গাড়িতে করে হাসপাতালে আনছে। আরও দেখত, র'ক্তের ফোবিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ছেলেটা নিজেই আজ র'ক্তে মাখামাখি হয়ে আছে। তবু তার বমি পায়নি, মাথাও ঘুরেনি। হ্যাঁ, আজও অকারণ তার চোখের কোণ গড়িয়ে অবিরাম ঝরেছে নোনা জল। এ জল ভয়ের তো বটেই, খুব পছন্দের কাউকে হারানোর ভয় আর তাকে আঁকড়ে রাখার অদম্য সাহস মিলেমিশেই অশ্রুজলে তার কপোলদ্বয় চিকচিক করছিল। জেগে থাকলে শেহজাদ দেখতে পেত, তন্ময়ের উচাটন। দেখতে পেত, রোদসীর হতভম্বতা। মেয়েটি গাড়িতে আসেনি, হাসপাতালও যায়নি। তন্ময় তাকে দুয়েক বার ডেকেছিল, তার সাড়া না পেয়ে আর জোর করেনি। মেয়েটা বোধহয় হতবাক হয়েছে। এত হতবাক হওয়ার কী আছে এতে কে জানে? তন্ময়ের অগোচরে রয়ে গেল রোদসীর মাথায় ঘুরপাক খাওয়া সদ্য জন্মানো একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যেই কেসের উকিল শেহজাদ মূর্তজা নিজে, সে কেন নিজের সেফটির আগে রোদসীর সেফটি নিশ্চিত করবে? রোদসীকে আগের রাতে পিস্তল বুঝিয়ে দিয়ে সে নিজে কেন বোকার মত ছু'রি'কা'ঘাত সইল? কেন? এতেও কি তার কোনো স্বার্থ আছে? কী সেটা?
শেহজাদের সম্বিত ফিরল খুব অস্বস্তি নিয়ে। ঠিক কত ঘন্টা তার জ্ঞানহীন কেটেছে তা সে জানে না। জ্ঞান ফেরার পর প্রথম যে জিনিসটা তার বোধশক্তিকে নাড়া দিল তা হলো, পেটের বাঁ দিকটা বাজেভাবে জ্বলছে। সেই তীব্র যন্ত্রণার মাঝেই একসময় তার মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে সচল হতে শুরু করল। চারিদিকের উদ্ভট একটা ঘ্রাণ তার নাসারন্ধ্রে হুটোপুটি খাচ্ছে। কীসের গন্ধ এটা? এন্টিসেপটিকের? পিঠের নিচের বিছানাটা তুলনামূলক শক্ত লাগছে না? কোথায় আছে সে? সারা শরীরে এতো অসহ্য য'ন্ত্রণা কেন বোধ হচ্ছে? একটু ভাবতেই ধীরে ধীরে সব মনে পড়তে শুরু করল। গোটা ব্যাপারটা মনে পড়তেই অস্বস্তিতে তার নাক-মুখ কুঁচকে এল। এরই মাঝে কর্ণকুহরে হানা দিচ্ছে শক্তপোক্ত এক পুরুষালি কণ্ঠস্বর,
"উই আর লাকি। ছুরিটা লিভার বা কোনো ভাইটাল অর্গানকে হিট করেনি। তবে রক্তপাত হয়েছে প্রচুর। ডাক্তার বলল, খুব দ্রুতই স্যারের জ্ঞান ফিরবে। আপনি চিন্তা করবেন না, প্লিজ। নিজেকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করুন।”
শেহজাদের মনে হচ্ছে তার নিউরনগুলো ঠিকঠাক সচল হয়নি এখনো। নয়তো এই কণ্ঠস্বর সে চিনতে পারছে না কেন? মনে হচ্ছে খুব অপরিচিত কোনো রাশভারি লোক কথা বলছে। কিন্তু তেমন কেউ তাকে স্যার বলছে কেন? শেহজাদ সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে চোখদুটো মেলল। যান্ত্রিক আলোর তীব্রতায় তার চোখ দুটো সংবেদনশীল হয়ে উঠল। মিনিট খানেক সময় নিল সে। কানের পাশেই কোথাও মায়ের ডুকরে কান্না করার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। বাবা বোধহয় বিড়বিড় করে তাকে কিছু বোঝাচ্ছেন। সেই অস্পষ্ট কথা সে ঠিক করে শুনতে পারছে না। শেহজাদ আরেকবার চোখ মেলার চেষ্টা করল। ততক্ষণে তার চোখদুটো শিথিল হয়ে এসেছে। চিনচিনে ব্যথা ছাপিয়ে সবার আগে চোখের সামনে ভেসে এলো লালরঙা একটি গোলগাল মুখশ্রী। শেহজাদ নজর মেলানোর ভয়ে চট করে চোখদুটো বন্ধ করে ফেললো। খেয়াল করল, তার দু’চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে তপ্ত জল। মায়ের ভাঙা গলার ক্রমাগত কান্নায় দুর্বল হয়ে শেষ অবধি সে মৃদু স্বরে ডেকে উঠল,
“ মা! কেঁদো না প্লিজ। এভাবে কাঁদতে থাকলে তো মাথাব্যথা হবে।”
পুরো বাক্যটা সে সময় নিয়ে ভেঙে ভেঙে বলল। অথচ তার কথা শোনামাত্রই ফরিদা বেগমের কান্নার জোর বেড়ে গেল। আজ তার সাথে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। তিনি দেখলেন, শেহজাদ ব্যাগ গুছিয়ে কোথাও চলে যাচ্ছে। তার পরনে ফকফকে সাদা পাঞ্জাবি। ফরিদা বেগম তাকে বেশ কয়েকবার ডেকে জানতে চাইলেন, সে কোথায় যাচ্ছে? শেহজাদ সেই ডাক উপেক্ষা করেই হাঁটা দিল। ফরিদা বেগম টিফিন বক্স হাতে তাকে পেছন থেকে ডাকতে ডাকতে কয়েক কদম এগোলেন। দেখলেন শেহজাদের সাদা পাঞ্জাবি হুট করেই রঙ বদলে লালরঙা হয়ে উঠছে। তিনি আশ্চর্য হলেন! নতুন উদ্যোমে পুত্রকে আরো কয়েকবার ডাকলেন। ডাকতে ডাকতই তার ঘুম ভাঙলো। আগামাথা হীন এই স্বপ্ন শেষে তার বুকটা যখন ধড়ফড় করছিল, তখনই চারিদিকের নিরবতা বিদীর্ণ হয় ফজরের আজানের সুমধুর সুরে। ব্যস! এরপর থেকেই তার মনটা কেমন আনচান করছে। কী এক দুশ্চিন্তায় ফজরের পর আর ঘুম হলো না। নাস্তা বানানোর ফাঁকে শেহজাদও না খেয়ে বেরিয়ে গেল। ফরিদা বেগম অকারণ পায়চারি করলেন কিছুক্ষণ। খানিক বাদেই তার মনে হলো তার বুকটা কেমন ব্যথা হচ্ছে। এনায়েত মূর্তজা তাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালালেন। তাতে কাজ হলো না। ঠিক সেই সময় ড্রয়িংরুমে চালিয়ে রাখা টিভিতে আচানক লাইভ দেখানো হলো কোর্টরুমের বাহিরের সেই বিভ'ৎস দৃশ্য। ফরিদা বেগম এই অবধি দু'বার জ্ঞান হারিয়েছেন। একমাত্র পুত্রর এমন আশঙ্কাজনক অবস্থায় এনায়েত মুর্তজার মুখটাও শুকিয়ে গেছে। শেহজাদ একটাবার মায়ের মুখ দেখার লোভ সামলাতে পারল না। এতক্ষণের একঘেয়ে অন্ধকারে তার দমবন্ধ লাগছে। সে চোখ মেলে মাথার কাছে বসে থাকা মাকে দুচোখ ভরে দেখল। খুব কষ্ট করে বলল,
“আমি ঠিক আছি, আর কেঁদো না প্লিজ। তুমি কাঁদলে আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, মা।”
ফরিদা বেগম ছেলের বারণ শুনলেন না। চোখের সামনে তার যক্ষের ধন র'ক্তা'ক্ত হয়ে পড়ে আছে, মা হয়ে তিনি নিজেকে এতো সহজে সামলে নিবেন? এ ও কি সম্ভব? মায়ের কান্নার জোর বাড়তে দেখে শেহজাদ ডান হাত বাড়িয়ে মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরল। ফরিদা বেগম সেই হাতে অজস্র চুমু আঁকলেন। পুত্রের অগোছালো চুলে হাত বুলিয়ে কপালেও এলোমেল চুমু আঁকলেন। ক্রন্ধনরত গলায় জানতে চাইলেন,
“কোথায় কষ্ট হচ্ছে বাবা?”
মায়ের পাগলামি দেখে শেহজাদ হেসে ফেলল। ঠোঁট চেপে হাসি আটকে বলল,
“তোমাদের কান্নাকাটি দেখে মাথাব্যথা হচ্ছে, মা। আর কোথাও কোনো কষ্ট নেই।”
ছেলের মাথাব্যথার কথা শুনে ফরিদা বেগমের কান্নার জোর কমলো। তিনি কান্না থামাতে চাইলেন। তবু চাপা কান্নার দমকে তার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠল। পরিস্থিতি সামলাতে এনায়েত মূর্তজা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
“এতোদিন খাইয়ে দাইয়ে লাভ হলো কী? সামান্য জিনিসের এক খোঁচায় এখন শুয়ে আছিস। এই ইমিউনিটি নিয়ে তুই হবি সেরা ল’ইয়্যার?”
ফরিদা বেগম মুহূর্তেই ক্ষেপে গেলেন। আঙুল উঁচিয়ে শাঁসালেন স্বামীকে। বললেন,
“খবরদার বলছি, ঐ ওকালতির নাম যদি আর নিয়েছো! তোমার একদিন কি আমার একদিন।”
শেহজাদ টের পেল বিস্তর এক ঝগড়া বাঁধতে যাচ্ছে। কোনো অজানা কারণে ফরিদা বেগমের অপছন্দের চাকরি এই ওকালতি। দুঃখজনক ব্যাপার হলো তার অর্ধাঙ্গ সেই পেশাতেই নিজের সারাটাজীবন কাটিয়েছে। মিথ্যার সাথে ফরিদা বেগমের ঘোর শত্রুতা। টাকার জন্য কেউ কারো জীবন নষ্ট করবে, মিথ্যা অপবাদ আনবে এসব ভাবতেই তার দমবন্ধ হয়ে আসে। এনায়েত মূর্তজার প্রেমের প্রস্তাব সে দু’বছর বুকে পাথর চেপে ঠুকরেছে। বারবার খোদার কাছে চেয়েছে লোকটা এমন বিশ্রি কাজ থেকে সরে আসুক। দরকার হয়, তারা চাষবাস করে গ্রামে পড়ে থাকবে, তাও কারো জীবন ধ্বং’সের হায় না লাগুক। এনায়েত মূর্তজা অবশ্য তার আইনের প্রতি ঝোঁক থেকে কখনোই বের হননি। শেষ অবধি তিনি ফরিদাকে পটিয়েছেন এই বলে, সংসারজীবনে তিনি কখনোই কাজের কথা টানবেন না। তার কাজ তার ভিন্ন দুনিয়া হবে। সাথে এ ও কথা দেন, দরকার হলে কোনো কেস নেবেন না, তাও অন্যায়ের সাথ দিতে কখনোই তিনি মিথ্যা বলবেন না, কারো প্রতি অবিচার করবেন না। ফরিদা বেগম কখনোই আশা করেননি তার একমাত্র পুত্রও একই লাইনে যেতে চাইবে। ছেলে যেদিন আয়োজন করে হাত-পা টিপে দেওয়ার বাহানায় ল' নিয়ে পড়তে চাইলো, কেন যেন সেদিন তিনি বারণ করতে পারেননি। হয়তো খুব বেশি ভালোবাসেন বলেই অপছন্দ হওয়া সত্ত্বেও ছেলের স্বপ্নকে তিনি মেনে নিয়েছেন হাসিমুখে। এতোগুলো দিন তিনি খোদার কাছে শুধুই ছেলের সততা চেয়েছেন, এতো এতো খাটাখাটুনির বিনিময়ে তার সফলতা চেয়েছেন। আজ এখন থেকে তার নতুন দোয়া যুক্ত হবে, ছেলেকে সকল বদনজর থেকে বাঁচিয়ে রাখার দোয়া। আইনের লড়াইয়ে জমা শত্রুদের কালো থাবা থেকে বাঁচানোর দোয়া।
শেহজাদ বাঁ পাশে ছলছল চোখে দাঁড়িয়ে থাকা তন্ময়কে দেখে টের পেল, একটু আগে স্যার ডাকা পুরুষালি গলাটা তন্ময়ের ছিল। তার গলাটা আজ অপরিচিত লেগেছে। ছেলেটা এক ধাক্কায় ম্যাচিউরড হয়ে গেলো নাকি? নয়তো কথাবার্তায় এমন ভারিক্কি ভাব এলো কী করে? শেহজাদ তাকে চোখের ইশারায় কিছু একটা বলতে চাইল। তন্ময় চট করেই বুঝে নিল সেই ইশারা। ব্যস্ত হয়ে বলল,
“আঙ্কেল, ডাক্তার বলেছেন জ্ঞান ফিরলেই স্যারকে কিছুক্ষণ একা থাকতে দিতে হবে। এ সময় ভিড় জমালে তার শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যা হতে পারে।”
ফরিদা বেগমের ভ্রু যুগল কুঁচকে এল। তিনি অবাক হয়ে বললেন,
“মা-বাবা সাথে থাকলে ছেলের শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হবে কেন? এ আবার কোন কথা?”
শেহজাদ তন্ময়ের বোকামিতে ভীষণ বিরক্ত হলো। ছেলেটা গুছিয়ে মিথ্যেও বলতে জানে না। ঘটনা সামলানোর বদলে আরো ঘেঁটে দিতে ওস্তাদ সে। দুর্বল গলায় সে নিজেই পরিস্থিতি সামলে নিল,
“তোমরা কি প্লিজ একটু বাহিরে যাবে? আমি একটু রেস্ট নেব। মাথাব্যথা উঠছে, কিছুক্ষণ একা না থাকলে পরে আর এই ব্যথা সহজে কমবে না।”
এবার এনায়েত মূর্তজাও ছেলের সাথ দিলেন। ফরিদাকে রীতিমতো টেনেই বাহিরে নিলেন। শেহজাদ বড় করে শ্বাস ফেলল। দেখল, চলে যাওয়ার আদেশ পেয়েও তন্ময় নড়ছে না। মাথা নামিয়ে সে একভাবে দাঁড়িয়ে আছে। শেহজাদ তার মুখাবয়ব লক্ষ্য করল। এরপর তার কিছু বলার অপেক্ষা না করেই বলল,
“গাড়ি আনতে দেরি করায় কিছুই হয়নি। শুধু শুধু নিজেকে দোষ দিও না, তন্ময়। যা হয়েছে তার সবটাই প্রি-প্ল্যানড।”
তন্ময় চকিতে মাথা তুলল। সে এইমাত্রই গাড়ি আনতে দেরি করার অপরাধবোধ থেকে মাফ চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। না বলতেই স্যার তা বুঝে গেল কী করে? তারও কি রোদসী ম্যাডামের মতো মন পড়ার আশ্চর্য গুণ আছে নাকি? কই? আগে তো সে টের পায়নি। কাঁচুমাচু করে সে তবু কিছু বলতে চাইল। শেহজাদ তাকে সেই সুযোগ দিল না। বলল,
“এখন স্যরি বলার আনুষ্ঠানিকতা ছেড়ে কাজের কথা বলো। আহাম্মক টাকে ধরা গেছে?”
তন্ময় থতমত খেলো। স্যার কি আ'ক্রমণকারীর কথা বলছে? তাকে কীভাবে ধরা যাবে? সে তো তখনই পালিয়েছে। তার হতভম্ব মুখ দেখেই শেহজাদ বাকিটা আন্দাজ করে নিল। ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে সে ডানে বামে তাকালো। চারিদিকের পরিপাটি অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, প্রাইভেট কোনো হাসপাতালেই আনা হয়েছে তাকে। কিন্তু কে আনলো? তন্ময়? শেহজাদ হুট করেই আবিষ্কার করল, জ্ঞান ফেরার পর থেকে সকলকে দেখলেও সে রোদসীকে দেখেনি। ঘটনার সময় তো সে সাথেই ছিল। এখন কোথায় গেল? শেহজাদ উদ্বেগ নিয়ে জানতে চাইল,
“মিস রোদসী কোথায়? ঠিক আছেন তো? তার ওপরও কি আ'ক্রমণ হয়েছিল?”
“ম্যাডামের ওপর আ’ক্রমণ হয়নি। তিনি ঠিক আছেন।”
শেহজাদ তবু শান্ত হলো না। চারিদিকে ইতিউতি করে জড়তা নিয়েই জানতে চাইল,
“রোদসী হাসপাতালে আসেননি?”
“না স্যার, তিনি অফিসে আছেন। হাসি বললো, তিনি একটু আগেই অফিসে গিয়েছেন।”
শেহজাদ অস্ফুটে বলল, “ওহ! ভালোই হয়েছে। অফিসে কেউ না থাকলে আবার সমস্যা।”
অতঃপর চোখ দুটো বন্ধ করে বলল, “একটু একা থাকব, তন্ময়।” তন্ময় অপেক্ষা করল না। চট করেই বেরিয়ে গেল। তার কেন যেন মনে হচ্ছে, স্যার কোনো দুশ্চিন্তায় ডুবছে। জ্ঞান ফিরতে না ফিরতেই লোকটা আনার কেস নিয়ে ভাবতে বসলো না তো? তন্ময় বেরিয়ে যাওয়ার পরেও কী ভেবে একবার দরজা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিল। স্যার ডান হাতে কপাল ডলছেন। এই কাজ তিনি তখন-ই করেন যখন কোনো কিছু নিয়ে তিনি তুমুল বিরক্ত হন। এখন কী তবে তিনি কিছু নিয়ে বিরক্ত? কী সেটা? আ'ক্রমণকারী নয়তো? সর্বনাশ! এমন হলে স্যার বোধহয় এখন-ই হাসপাতাল ছেড়ে ঐ লোককে খুঁজতে বের হবেন। এই অবস্থায় তা নিশ্চয়ই ঠিক হবে না? চপল পায়ে সে কাউকে এই খবরটা দিতে গেল।
শেহজাদ মুখে ভালো হয়েছে বললেও আদতে তার ভীষণ রাগ লাগছে। বস এমন ভয়াবহ রকমের অসুস্থ, আর মেয়েটা কিনা অফিস পাহারা দিচ্ছে? বসকে একনজর হাসপাতালে দেখতে আসার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কাজ কি অফিসে থাকা? বসের থেকেও তার কাছে অফিস বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো? শেহজাদ চোখ বুজে বেশিক্ষণ থাকতে পারল না। চোখ মেলে জানলা হয়ে বাহিরের আঁধার আকাশে তাকাল। বিড়বিড় করে বলল,
“এবার অফিসে গেলে আপনাকে এসিস্ট্যান্ট থেকে সরিয়ে একেবারে সিকিউরিটি এক্সিকিউটিভ বানানোর ব্যবস্থা করবো, রোদসী। তখন দেখব, আপনি কত অফিস পাহারা দিতে পারেন।”
কথাটা বলতেই তার মনে হলো, রোদসীর না আসাটা তাকে বেশ পীড়া দিচ্ছে। মা-বাবা তার মাথার কাছে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এমন গুরুত্বপূর্ণ সময় একজন এসিসট্যান্টের থাকা না থাকায় তার এতো যায় আসছে কেন? এ কেমন অর্থহীন অনুভূতি?
নিজেকে ধমকে সে জোর করে চোখ বুজতে চাইলো। ঠিক সেই সময় কামরায় কারো আসার উপস্থিতি পাওয়া গেল। সেই কেউ হয়তোবা কোনো ডাক্তার অথবা নার্স। তার ভারি পারফিউমের ঘ্রাণে শেহজাদের অস্বস্তি হলো। হাসপাতালে একজন রোগীর সামনে কেউ এমন কড়া পারফিউম ব্যবহার করে আসে? মন চাইল কয়েকটা কঠিন কথা শুনিয়ে তাকে বিদেয় করতে। কিন্তু সেই সুযোগ পাওয়া গেল না। তার আগেই সূঁচ ফুটিয়ে দেওয়া হলো। তাকে কি ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হলো? তার চোখদুটো এমন গভীর ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছে কেন? সে তো ঘুমাতে চায় না। সে জাগতে চায়, চটজলদি রিলিজ নিয়ে অফিসে যেতে চায়। সামান্যতম সৌজন্যতাবোধ না দেখানো পাথুরে এসিসট্যান্টটিকে সে মানবিকতার লেকচার দিতে চায়।
শেহজাদের ভাবনা চিন্তা গুলো কেমন জড়িয়ে যাচ্ছে। তার অবচেতন মনের দৃশ্যপটে যেন ভাসছে সিঁড়ির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ার দৃশ্যটি। নরম হাতে কে তাকে টেনে ধরতে চাইছিল? রোদসী ছাড়া সেটা আর কে হতে পারে? তখন শেহজাদ যদি পড়ে না গিয়ে একবার চোখে চোখ রাখত, তাহলে রোদসীর শক্ত খোলসের আড়ালে থাকা উদ্বেগময় চোখদুটি কি সে এক পলকের জন্য দেখতে পেতো? দেখতে পেতো এক র'ক্ত মাংসে গড়া মানবীর আবেগী রূপ? কী হতো সেই আবেগপ্রবণ চোখজোড়া একটা বার দেখলে?
শেহজাদ গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। অথচ তার ইচ্ছে করছে একটাবার তন্ময়কে ডাকতে। বলতে, আজ আর তাকে পাহারা দিতে হবে না। সে যেনো অফিস ফিরে যায়। তন্ময় না ফিরলে রোদসীও হয়তো অফিসেই থেকে যাবে। তাকে গোটা রাত অকারণে অফিসে রেখে দেওয়া ঠিক হবে না। শেহজাদ খুব চেষ্টা করেও তাকে ডাকতে পারল না। তার আগেই মা মা সুবাসে পেটের তীক্ষ্ম ব্যথা আড়াল হলো। মাথায় উষ্ণ হাতের মমতা যেন লুটিয়ে পড়ল। শেহজাদের মস্তিষ্ক এই মমতার কাছে হার মানল। সেও একটু একটু করে ঘুমিয়ে পড়ল।
শেহজাদের ঘুম ভাঙে খুব ভোরে। মাথার কাছে বাবা বসে আছেন। আশপাশে মাকে দেখা যাচ্ছে না। তাকে বোধহয় ভুলিয়ে ভালিয়ে বাসায় পাঠানো গেছে। শেহজাদ হাত নাড়াতে গিয়ে টের পেল তার বাঁ হাতে ক্যানোলা লাগানো। গতকাল রাতে সে এই ব্যাপারটা খেয়াল করেনি। বাঁ হাতের কবজিতে ফকফকা সাদারঙা ব্যান্ডেজ থাকা সত্ত্বেও ডাক্তাররা সেই হাতেই ক্যানোলা লাগিয়েছেন। সুস্থ সবল ডান হাতটাকে এই কাজে লাগাননি কেন কে জানে? শেহজাদ নড়েচড়ে উঠে বসতে চাইল। এভাবে শুয়ে থাকতে মোটেও ভালো লাগছে না। তার নড়ার আভাস পাওয়া মাত্রই এনায়েত মূর্তজা জেগে গেলেন। ব্যস্ত হয়ে বললেন, “উঠছিস কেন? কিছু লাগবে?”
“ওয়াশরুমে যাওয়া লাগবে, বাবা। না উঠে বিছানাতেই করব নাকি?”
এনায়েত মূর্তজা তীর্যক চোখে পুত্রকে দেখলেন। বললেন,
“হ্যাঁ কর না কর। সামলানোর জন্য বুড়ো বাপ আছে না? এখন যত অঘটন ঘটানোর সব একসাথে ঘটা।”
বলতে বলতেই তিনি পিঠের পেছনে বালিশ ঠেকিয়ে শেহজাদকে বসতে সাহায্য করলেন। শেহজাদ হেসে ফেলল। ডান হাতে ঘাড় চুলকে বলল,
“কথাটা মন্দ বলোনি। দেখি লিস্ট করি একটা। কী কী অঘটন ঘটানো যায়। তারপর জানাচ্ছি তোমায়।”
এনায়েত মূর্তজা পুত্রের ক্যানোলা থেকে স্যালাইনের লতা খুলতে নার্সকে ডেকে পাঠালেন। গোমড়ামুখে বললেন,
“আমার মান-সম্মান তো কিছুই রাখলি না। একটা মাত্র লোকের কাছে এমন আক্কেলগুড়ুম করে এলি? ঘুরিয়ে দু’ঘা লাগাতে পারিসনি?”
মুখে মুখে তর্ক জমালেও তিনি খুব সাবধানে ছেলেকে ওয়াশরুম অবধি এগিয়ে দিলেন। ফেরার পথেও খুব সাবধানে তাকে বিছানায় বসালেন। শেহজাদ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। দাঁড়াতে নিলেই পেটের বাঁ দিকে চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। বাবার কাঁধে ভর দিয়ে দু’কদম হেঁটে আসতেই তার হাত-পা অসাড় লাগছে। বিছানায় বসে সে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে জানতে চাইল,
“তন্ময় কোথায়?”
“তোর মাকে বাড়িয়ে পৌঁছে দিয়ে ওকেও ফ্রেশ হয়ে সকালে আসতে বলেছি। আসবে হয়তো একটু পর।”
শেহজাদ একরোখা গলায় বলল,
“তার আর দরকার নেই। আমি আর এখানে থাকব না। রিসিপশনে কথা বলে জলদি রিলিজের ব্যবস্থা করো।”
এনায়েত মূর্তজা আশ্চর্য হলেন। বললেন,
“এই অবস্থায় হাসপাতালে থাকবি না তো কোথায় যাবি?”
“অঘটন নম্বর এক ঘটাব।” বলেই বাবার দিকে তাকিয়ে মৃদু চোখ মা'রলো। রয়ে সয়ে বলল,
“অফিসে যাব। কিছু কাজ বাকি আছে, সেগুলো শেষ করে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই বাসায় যাব। কথা না বাড়িয়ে জলদি রিলিজের দিকটা দেখো। এখানকার ফিনাইলের গন্ধে আমার মাথা ঝিমঝিম করছে।”
এনায়েত মূর্তজা পুত্রের বাড়াবাড়ি রকমের জেদের কাছে পরাস্ত হয়ে রিলিজের ব্যবস্থা করতে গেলেন। মেডিকেল এডভাইসের বিপরীতে নিজের জেদে বহাল থেকে চলে যাওয়ার জন্য তাদের বন্ডসই-ও করতে হলো।
_____
দ্য থার্ড আই চেম্বারের পরিবেশ আজ সকাল থেকেই অন্যরকম। রোদসী খুব দ্রুত হাতে কীসব কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করছে। তাকে দেখে খুব ব্যস্ত হচ্ছে। অথচ ব্যস্ত হওয়ার মতো কোনো অঘটন এখানে ঘটেনি। শেহজাদ যখন তন্ময়ের কাঁধে ভর দিয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে ভেতরে এলো, তখন শেহজাদের অফিসরুমের দরজাটা হাট করে খোলা। সেই খোলা দরজা দিয়ে এসির বাতাস উন্মুক্ত ভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে। শেহজাদ অপ্রস্তুত হলো। সেদিকে তাকিয়ে হাঁটতে নিতেই পায়ের সামনে একটা মানিপ্ল্যান্ট গাছ পড়ল। শেহজাদ কোনোরকম নিজেকে হোঁচট খাওয়া থেকে বাঁচালো। মনে হচ্ছে, তার পরিচিত অফিস দু'দিনেই আগাগোড়া অপরিচিত হয়ে গেছে। আর দু'টো দিন না থাকলে তার গুণবতী এসিসট্যান্ট হয়তো গোটা অফিসের চিত্র-ই বদলে দিতো।
রোদসী নিজের ডেস্কে নেই। তার ল্যাপটপ খোলা, টেবিলের ওপর ছড়ানো ছিটানো অসংখ্য কাগজপত্র, গুলশান এলাকার ম্যাপ, আর ব্যস্ত সড়কের কিছু অস্পষ্ট প্রিন্টেড ছবি। শেহজাদ ভ্রু কুঁচকে পেপারগুলোর দিকে তাকাল। মির্জা কামরুল কেসের সব কাজ শেষ তাদের দিক থেকে মোটামুটি শেষ। তাহলে এগুলো কীসের পেপার?
শেহজাদ ঠিক করে বাকি কিছু দেখার আগেই কফি মগ নিয়ে টেবিলের কাছে এগিয়ে আসা রোদসী থমকে দাঁড়ালো। অস্ফুটে বলল, “স্যার! আপনি এখানে?”
শেহজাদ টেবিল থেকে মনোযোগ সরিয়ে তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। চোখজুড়ে একরাশ ক্ষোভ। সে রোদসীর চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শীতল গলায় বলল,
"নিজেরই অফিসে আসতে পারমিশন লাগবে নাকি?”
কথার ফাঁকেই তন্ময় তাকে সাবধানে চেয়ারে বসালো। শেহজাদ কিছুটা বাঁকা হয়ে ঝুঁকে বসল। ওপর ওপর কপট জেদ দেখালেও সত্য তো এটাই, তার পেটে ভীষণ টান লাগছে। মনে হচ্ছে হাসপাতাল থেকে চলে আসার সিদ্ধান্তটা একেবারেই ঠিক হয়নি। য'ন্ত্র’ণাটুকু গিলে সে রোদসীর দিকে সরু নয়নে তাকাল। জানতে চাইল,
“বসকে হাসপাতালে ফেলে তার অগোচরে কী এতো স্টাডি করছেন?”
রোদসী হাতে থাকা কফি মগটা শেহজাদের টেবিলে এগিয়ে দিল। কফিটা সে নিজের জন্য বানালেও মনে হচ্ছে এখন স্যারের সামনে বসে কফি খাওয়াটা খুব একটা শোভনীয় হবে না। শেহজাদের সামনের চেয়ারটিতে বসলো সে। রুক্ষ গলায় বলল,
“এসিসট্যান্টকে সাবধানে থাকার জ্ঞান দিয়ে বস যদি নিজেই আত'তায়ীর কাছে ধরাশায়ী হয়, সেখানে এসিট্যান্টের কী করার থাকতে পারে?”
শেহজাদ শ্লেষাত্মক হাসল। তার এগিয়ে দেওয়া কফি মগটা হাতে নিয়ে সে অকারণ একটু নাড়াচাড়া করল। বিদ্রুপ করে বলল,
“সেই তো! কী-ই বা করার থাকতে পারে?”
এটুকু বলেই সে প্রসঙ্গটা হাওয়ায় উড়িয়ে দিল। কৌতুহল নিয়ে শুধাল,
“টেবিলে ওগুলো কীসের কাগজ? নতুন করে কী ঝামেলা আনছেন?”
তার সূক্ষ্ম খোঁচা এড়িয়ে, রোদসী অকপটে বলে উঠল, “নতুন কেসের পেপারওয়ার্ক।”
শেহজাদের মনে হলো তার মাথায় যেন বিনা মেঘে বর্জ্রপাত হয়েছে। মেয়েটা আবার নিজে নিজে নতুন কোনো কেস নিয়ে ফেলেছে! মির্জা কামরুলের কেস, রোদসীর বাবা-মায়ের ডিভোর্স কেস দুটো চলমান কেসের ফাঁকে আবার নতুন কেস! এতো ভয়াবহ ব্যাপার! সে হতবাক গলায় জানতে চাইল,
“নতুন কেস?”
“স্যরি স্যার, পারমিশন নেওয়ার মতো সিচুয়েশন ছিলো না। আশা করব, পরিস্থিতি বিবেচনায় আপনি ব্যাপারটি সহজভাবে নেবেন।”
শেহজাদ ডান হাতের আঙুল গুলো বাঁকিয়ে শব্দ করে ফোটালো। তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“ওয়াও গ্রেট! এরই মাঝে আপনি আবারো নতুন কেস নিয়ে ফেলেছেন?”
এতোটুকু বলেই সে পাশে দাঁড়ানো তন্ময়কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“দ্য থার্ড আইয়ের মালিকানা বদলের চুক্তিপত্র বানাও, তন্ময়। আনঅফিশিয়ালি ম্যাডাম যেহেতু কেসজনিত সকল সিদ্ধান্ত একাই নিচ্ছেন, অফিসটিও তার নামে নতুন করে রেজিস্ট্রেশন করাও। তাতে আমায় বড়জোর এসিস্ট্যান্ট পদটা দিও। আফটার অল, সব সিদ্ধান্ত শেষে আমাকে একবার জানিয়ে আনুষ্ঠানিকতা তো পূরণ করা হয়।”
রোদসী তার সূক্ষ্ম খোঁচাটা বিনা বাধায় হজম করল। তার রাগ বাড়াতে দুম করেই বলে ফেলল,
“কেসটা আপনার কাছে এলে, হসপিটলের বেডে শুয়েও আপনি এই কেস নিতেন সে বিষয়ে আমি শতভাগ নিশ্চিত। সো, ডোন্ট বি ইগোইস্টিক। আগে সবটা শুনুন, জানুন এরপর বিবেচনা করুন।”
“ওহ রিয়েলি! আমার জানার, শোনার কিংবা বিবেচনা করার মতো অপশন এখনো আছে? দ্যাটস গ্রেট!”
“বাচ্চা চুরির দায়ে একজন নিরপরাধের ক্যারিয়ার হুমকির মুখে। তার পক্ষ হয়ে আমরা কেসটা না লড়লে হয়তো চমৎকার একটি তারকা খসে যাবে।”
শেহজাদ পেটে হাত দিয়ে চোখ মুখ কুঁচকে নড়েচড়ে বসল। তার এই মুহূর্তে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। রোদসীর একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঘটনায় তার মেজাজ গরম হয়ে আছে। তাকে হাসপাতালে ফেলে সে কোন তারকার ক্যারিয়ার বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে তা সে জানতে চায় না। রোদসী ফোন থেকে একটি হাসিখুশি যুবকের ছবি বের করে শেহজাদের সামনে ধরল। বলল,
“এমন প্রাণবন্ত একটি ছেলে মিথ্যা অপবাদে গারদের ওপারে থেকে মুষড়ে যাবে আর আসল অপরাধী দেদারসে ঘুরে বেড়াবে, আইনের লোক হয়ে আমরা তা চেয়ে চেয়ে দেখব?”
শেহজাদ সরু চোখে ছেলেটির ছবির দিকে তাকালো। ছেলেটির পরনে সাদা এপ্রোন, গলার স্টেথোস্কোপ। ছেলেটি কি ডাক্তার? এই ছেলেটিকে বাঁচাতে রোদসী এমন উতলা হচ্ছে কেন? কী হয় সে রোদসীর? কিছুক্ষণ একভাবে তাকিয়ে আচমকাই প্রশ্ন ছুঁড়ল সে,
“প্রাণবন্ত ছেলেটি যে নিরপরাধ সে বিষয়ে আপনি এতো নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে? কে হয় ও আপনার? বয়ফ্রেন্ড?”
শেষের কথাটা সে বেশ জোর দিয়েই বলল। রোদসী ফোনটা নামিয়ে কাটকাট গলায় জবাব দিল,
“জরুরি নয় যে, নিরপরাধ মানুষ চিনতে তার প্রেমিকা হওয়া লাগবে। কখনো কখনো একনজর তাকিয়েই বলা যায়, সামনের মানুষটির ব্যক্তিত্ব ঠিক কেমন।”
“একনজর দেখেই তার ব্যক্তিত্ব চিনে ফেললেন? বাহ! ইন্টারেস্টিং তো! কী চিনলেন বলুন দেখি?”
ছেলেটি নিরপরাধ কিনা বা অপরাধের সত্যতা কতোটুকু তার থেকেও তার পরিচয়ে শেহজাদকে বেশ আগ্রহী লাগলো। রোদসী তার এমন অদ্ভুত ব্যবহারে খানিকটা ভড়কে গেল। বলল,
“যে মানুষ অন্যের প্রাণ বাঁচাতে দিনের পর দিন নির্ঘুম রাত কাটায়, সে আর যাই হোক, অপরাধী হতে পারে না।”
“আশ্চর্য হচ্ছি, মিস রোদসী। আপনি কখনো কাউকে অন্ধবিশ্বাস করে কেস নিবেন তা আমি কল্পনাও করিনি। শুধুমাত্র ডাক্তার বলে সে অপরাধী হতে পারবে না? এ আপনার কেমন যুক্তি?”
রোদসী ব্যস্ত হলো। ছেলেটির হয়ে আরও কিছু বলতে চাইল। তার আগেই তাকে থামিয়ে দিল শেহজাদ। রূঢ় গলায় জানতে চাইল,
“সত্যি করে বলুন তো, ছেলেটা কী হয় আপনার?”
চলবে…