ফন্ট সাইজ:
থিম:
তবুও জোছনা নামে

পর্ব 21

লেখক: বর্ণপ্রিয়া

#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_২১

শেহজাদের ঈর্ষাকাতর প্রশ্নের বিপরীতে রোদসী মুহূর্তকাল নিশ্চুপ রইল। তার চোখমুখ তখনো ভীষণ রকম শান্ত। শেহজাদ অধৈর্য হয়ে উত্তরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। পেটের সেলাইয়ের চিনচিনে ব্যথাটাও এই মুহূর্তে ঠিকঠাক অনুভূত হচ্ছে না। মেয়েটা একটা সহজ প্রশ্নের জবাব দিতে এতো সময় লাগাচ্ছে কেন কে জানে? কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে রোদসী অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় জবাব দিল,

“উনি ডক্টর নির্ঝর মাহবুব। আমার বান্ধবীর ফিয়ন্সে।”

কথাটা শেহজাদের শ্রবণ ইন্দ্রিয় ভেদ করে মস্তিষ্কে পৌঁছাতেই তার ভেতরের উচাটন যেন এক লহমায় থেমে গেল। কীসের এক ঝড় মনে হলো হুট করেই স্তিমিত হয়ে এলো। শেহজাদ কি ভিন্ন কোনো জবাবের দ্বিধায় ভুগছিলো? কী সেটা? কয়েক মুহূর্ত বোকার মতো একভাবে তাকিয়ে রইলো শেহজাদ। মনে হলো, নিজের আচরণ সে নিজেই ধরতে পারছে না। খানিকটা রাগও হলো অনধিকার চর্চা করে এমন ব্যক্তিগত প্রশ্ন তোলায়। শেহজাদকে ভ্রুঁ কুঁচকে একভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রোদসী পুনরায় বললো,

“আমার একমাত্র বান্ধবী ফিমা। ডক্টর নির্ঝর মাহবুব তার ফিয়ন্সে। বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি বা পেশার জন্য বলছি না, তার বিষয়ে টুকটাক অবগত আছি বলেই বলছি, তিনি নির্দোষ।”

সম্বিত ফিরতেই শেহজাদ নিজেকে সামলে নিল। অকারণ গলা খাঁকারি দিয়ে রোদসীর এগিয়ে দেওয়া কফিটা হাতে নিলো। মুহূর্তেই ঠান্ডা সেই তিতকুটে কফির স্বাদে তার কাশি উঠলো। তন্ময় পাশেই ছিল। সে চটজলদি একটা পানির বোতল এগিয়ে দিল। শেহজাদ পরপর কয়েক ঢোক পানি খেয়ে স্বাভাবিক হলো। এমন অদ্ভুত আচরণ করছে কেন সে? পাগল টাগল হয়ে গেল নাকি? মাথায় দুই দুইটা কেসের চাপ, তাতে নতুন করে তিন নম্বর কেস যোগ হওয়ায় একটু আধটু ভড়কে যাওয়া নিশ্চয়ই খারাপ কিছু নয়। ছবির যুবকটি মিস রোদসীর ফিয়ন্সে হলেও তাতে এমন রাগারাগি করাটা তার শোভা পায় না। কাজের বাহিরে সে পুরোটাই তার অপরিচিতা। গলাটা সামান্য ঝেরে কপট গাম্ভীর্যের সাথে বলল,

“অর্ধেক কথা বলার অভ্যেসটা বদলান। কাজের কথা বাদে অকাজের কথাগুলো ঠিকঠাক বলে ফেলেন। তারকা খসে যাবে, ক্যারিয়ার নষ্ট হবে এসব হাবিজাবি না বলে সোজাসুজি আসল কথাটা বলতে সমস্যা কোথায়?”

রোদসী হতভম্ব হলো। তাকে একবারও পুরো কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। বরং আসার পর থেকেই তাকে মিনিটে মিনিটে জেরা করা হচ্ছে। রোদসীর জবাব আসার আগেই হাজির হয় শেহজাদের নতুন প্রশ্ন,

“দরজার সামনে এভাবে মানিপ্ল্যান্ট গাছ রেখেছেন কেন? যাতে আসতে যেতে মানুষ হোঁচট খায়?”

রোদসী বিব্রত হয়ে মানিপ্ল্যান্ট গাছটির দিকে তাকালো। বেখেয়ালি গলায় বলল,

“এটা বাবু রেখে গেছে। তাকে ড্রাঙ্ক এন্ড ড্রাইভ কেসটি থেকে বাঁচানোর তোহফা।”

একটু থেমেই চোখে চোখ রেখে বললো, “আমি তখন কেস স্টাডি নিয়ে একটু ব্যস্ত ছিলাম। তাই গাছটা ওখানেই রেখে যেতে বলেছি।”

শেহজাদ তন্ময়কে ইশারা দিল গাছটা ওখান থেকে সরানোর জন্য। তন্ময় আজ বডিগার্ডের মতো তার সাথে চিপকে আছে। এনায়েত মূর্তজা কিছু বলার আগেই সে নিজ থেকে এই দায়িত্ব নিয়েছে। শেহজাদ ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে জানতে চাইল,

“কেস ডিটেইলস বলুন।”

রোদসী যন্ত্রের মতো বলতে শুরু করলো,

“বিশিষ্ট ব্যবসায়ী তাহের মল্লিকের ছোট ছেলে তামীমকে গতকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। শেষবার তাকে বাসার নিচে ফুটবল খেলতে দেখা যায়। এরপর থেকে সে লাপাত্তা।”

“বাচ্চাটাকে এখনো পাওয়া যায়নি?”

“না।”

শেহজাদ চেয়ারে কিছুটা হেলান দিলো। পেটের সেলাইয়ে হুট করে টান লাগছে। মনে হচ্ছে যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে সব। দাঁত খিঁচিয়ে সে জানতে চাইলো,

“এসবের মাঝে আপনার ফ্রেন্ডের ফিয়ন্সে ফাঁসলো কী করে?”

“ব্যাপারটা আসলে খুব ক্লিঙ্গি। আই হোপ, আপনি ঘটনায় ফোকাস না করে, কেসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যে ফোকাস করবেন।”

শেহজাদ জিব দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে কৌতুহলী নয়নে তাকালো। রোদসী বলল,

“ফিমার সাথে ডেটে যাওয়ার কথা ছিল নির্ঝরের। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কী একটা ইমার্জেন্সিতে সে আটকে যায়। ওটা নিয়ে পরপর তিনদিন তাদের প্ল্যান ক্যান্সেল হয়েছিল। ফিমা বেশ কিছু উল্টোপাল্টা মেসেজ পাঠিয়ে নির্ঝরকে ব্লক করে। মাইন্ড ডাইভার্ট করতে চলে আসে আমাদের বাসায়। মার সাথে তার দারুণ ভাব। সেখানে গিয়ে সে নির্ঝরের কথা বেমালুম ভুলে যায়।”

শেহজাদের বসে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে বসে থেকে বেশি সমস্যা হচ্ছে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে। এভাবে বেশিক্ষণ বসে থাকলে সেলাই ছুটে র'ক্ত বের হলে বাঁধবে আরেক ঝামেলা। রোদসী যা বলছে তা কোনোভাবেই কোনো কেস ডিটেইলস নয়। শুনে মনে হচ্ছে কোনো দম্পতির ব্যক্তিগত বিবাদ মীমাংসার আলাপ চলছে। শেহজাদের মুখাভাব লক্ষ্য হতেই রোদসী কাজের কথায় এলো।

“তাহের মল্লিকের বাড়িটা ফিমাদের বাসার গলিতেই। আবাসিক এলাকা হওয়ায় ওদিকে বাহিরে মানুষের খুব একটা আনাগোনা নেই। ফিমাকে কানেক্ট করতে না পেরে জরুরি ছুটি নিয়ে নির্ঝর তার সাথে দেখা করতে আসে। বাসায় তালা পেয়ে সে গলিতেই অলস সময় কাটায়। পুলিশ কিডন্যাপিং এর সত্যতা জানতে সিসিটিভি ফুটেজ বের করলে তাতে দেখা যায়, নির্ঝর বারবার হাতের ঘড়ি দেখছে আর উৎসুক নয়নে ডানে বামে কারো অপেক্ষা করছে। এর কিছুক্ষণ পর তাকে বাচ্চাদের সাথে ফুটবলও খেলতে দেখা যায়।”

শেহজাদ অধৈর্য্য বোধ করছে। রোদসীর কথার পিঠে সে প্রশ্ন করল,

“তো ফুটবল খেলার অপরাধে এরেস্ট করে নেবে?”

“দুঃখজনক হলেও এই কেসে এটাই সত্যি। কারণ নির্ঝর তামীমের সাথেই খেলছিলো। এবং শুরুর দিকে তাকে এমন সন্দেহভাজনের মতো ঘুরতে দেখায় প্রাথমিকভাবে পুলিশ তাকেই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে।”

“সিসিটিভি ফুটেজে কি নির্ঝরকে কিডন্যাপ করতে দেখা গেছে?”

“না, সে কিডন্যাপ করেনি, করলে হয়তো দেখা যেতো।”

“তাহলে পুলিশ কিসের ভিত্তিতে তাকে প্রাইম সাসপেক্ট বানিয়েছে?”

“অপরিচিত মুখ, উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করা এবং হুট করেই বাচ্চাদের সাথে মিশতে যাওয়া এতেটুকুই তার গায়ে কিডন্যাপার তকমা লাগিয়ে দিয়েছে।”

একটু থেমেই কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে বললো,

“ওহ হ্যাঁ, সিসিটিভিটির ফুটেজ অনুযায়ী তামীম নিজ ইচ্ছেতেই গলির মোড়ের গেইটটির দিকে ছুটেছিল। তবে সে ওদিকে কেন ছুটেছে তা এখনো আন্দাজ করা যাচ্ছে না। এবং ওদিকের সিসিটিভিটা নষ্ট থাকায় ওখান থেকে তামীমকে ঠিক কোথায় নেওয়া হয়েছে কিংবা কে নিয়েছে তা কারোই জানা নেই।”

শেহজাদ কেস নিয়ে ভালোই কৌতুহলী হয়েছে। সেই কৌতুহলের কারণ এতে জড়িত মানুষটা রোদসীর আত্মীয় নাকি এটাও ঘুরেফিরে কোনো বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর সঙ্গে লিঙ্ক আপ থাকায় তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। রোদসী পেপারওয়ার্কগুলো গুছিয়ে নিল। সেগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগেই কর্কশ শব্দে শেহজাদের ফোনটা বেজে উঠলো। রিসিভ করলে ওপাশ থেকে ভেসে আসে এনায়েত মূর্তজার উৎকণ্ঠিত স্বর,

“কই আছিস? অফিসে?”

“হ্যাঁ, বলো।”

“বলাবলির কিছু নেই। তোকে হাসপাতাল রেখে বাসায় আসলাম কেন তা নিয়ে একচোট সুনামি হয়েছে। এখন তোকে দেখতে হাসপাতালে যাওয়ার তোড়জোড় চলছে। অল্পবয়সে বাপহারা হতে না চাইলে জলদি বাসায় আয়।”

এনায়েত মূর্তজা আর কিছু বললেন না। খট করেই কলটা কেটে গেল। শেহজাদ বিব্রত হলো। তবে পেটে সেলাই নিয়ে অফিসে আসার ঘটনা মায়ের কানে গেলে আজ বাবার উপর দিয়ে একটা তুফান বইবে এই কথা চরম সত্য। শেহজাদ সময় নিলো না। সব গুছিয়ে বাসায় যাওয়াকেই বেশি প্রাধান্য দিলো। চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে খেয়াল করল, সে এখন ঝুঁকেও দাঁড়াতে পারছে না। শরীরের পুরোটা ভর তন্ময়ের কাঁধে দিয়ে কোনোমতে সে গাড়ি অবধি পৌঁছালো। ব্যাকসিটে আধশোয়া হয়েই বাকিটা রাস্তা আসতে হলো। রোদসী পাশে বসা শেহজাদের যন্ত্রণায় নীল হয়ে আসা মুখটা দেখে ইতস্তত করে জানতে চাইল,

"আমি কি জিজ্ঞেস করতে পারি, এমন অসুস্থতা নিয়েও অফিসে আসার কারণ কী?”

শেহজাদ চোখ মুখ কুঁচকে হেলান দিয়ে বসে ছিল। রোদসীর প্রশ্ন শুনেও তার মধ্যে ভাবাবেগ দেখা গেল না। জবাব তো এলোই না, উল্টো প্রশ্নের বিপরীতে নতুন এক প্রশ্ন হাজির হলো,

“আমি কি জিজ্ঞেস করতে পারি, বসের জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ডক্টর নির্ঝর মাহবুবের ক্যারিয়ার হলো কেন?”

রোদসী সহসাই জবাব দিতে পারল না। ভড়কানো গলায় বলল,

“বিষয়টা তেমন নয়।”

শেহজাদ হুট করেই চোখ মেলল। পাশে বসা রোদসীর দিকে ঘাড় কাত করে তাকালো। অদ্ভুত সেই নজর। জিজ্ঞেস করল,

“তাহলে বিষয়টা ঠিক কেমন, রোদসী?”

রোদসী অস্বস্তি বোধ করল। চোখ দুটো সরিয়ে সামনের রাস্তায় তাকালো। অপ্রস্তুত গলায় বলল,

“বসকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়া নিশ্চয়ই এসিসট্যান্টের দায়িত্ব নয়।”

“ওহ! তার মানে অফিশিয়াল কাজের বাহিরে একজন এসিসট্যান্টের ভেতর ন্যূনতম সৌজন্যতাবোধও থাকে না?”

তন্ময় ভ্রু কুঁচকে লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে আছে। সে বোঝার চেষ্টা করছে শেহজাদকে, তার কথার ভাবার্থকে। পেটে ছু'রি খেয়ে তার মাথার ব্যামো হলো কিনা তাও ভাববার বিষয়। মিস রোদসী সব ক্ষেত্রেই অদ্ভুত। তার হাসপাতালে না যাওয়াকে এতো বড় করে দেখার কিছু নেই। তবু তখন থেকে স্যার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই প্রশ্নে আসছেন। হাসপাতালে না যাওয়াকে ঘিরে তার এমন অপমানিত বোধ করার কারণ-ই বা কী? তন্ময় দ্রুত চোখ সরিয়ে স্টিয়ারিং এ মন দিলো। রোদসী তখন ভাষাহীন। এতো যুক্তি তর্কের ভিড়ে সে ভাবেনি। হ্যাঁ, কোর্টপ্রাঙ্গণে ঘটনার আকষ্মিকতায় সে হতবিহ্বল হয়েছিলো। চোখের সামনে তাকে লুটিয়ে পড়তে দেখে হাত বাড়িয়ে তার ভারসাম্য রাখার চেষ্টাও করেছিলো। কিন্তু এরপরে তন্ময় একা হাতেই সব সামলেছে। একজন লোক আহ'ত হয়েছে, সময়মতো তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, অপারেশনও ঠিকঠাক করা হয়েছে। গোটা সময়টায় তার ব্যক্তিগত মানুষগুলো তাকে সঙ্গ দিয়েছে। সেসবের ভিড়ে বাড়তি মানুষ হিসেবে তার কী কাজ? হাসপাতালে রোগী দেখতে যাওয়াটাও যে এক ধরণের সৌজন্যতা, তা সে জানতো না। হয়তো নতুন করে জানলো। এছাড়াও তার না যাওয়ার ভিন্ন একটা কারণ রয়েছে। ঐ ঘটনার পরপর তার মাথায় প্রথম প্রশ্ন এসেছিল, এসিসট্যান্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে শেহজাদ নিজে কী করে এতোটা উদাসীন থাকতে পারে? হয়তো ক্ষণিকের জন্য তার নিকট এই আ'ঘাতপ্রাপ্ত হওয়াটা ইচ্ছেকৃত মনে হয়েছে। দুদিন ধরে সোশাল মিডিয়া, নিউজ সবখানে ট্রেন্ডিং করা খবরটা তার সেই ধারণা খানিকটা সত্য প্রমাণ করতে মরিয়া। মামলার জেরে আদালতের বাহিরে আ'হত হওয়ায় কেসটা শেহজাদের দিকে অনেকটাই হেলে গেছে। কোনো না কোনোভাবে এটা হয়তো তারই পরিকল্পনার অংশ ভেবে সে হাসপাতালে যায়নি। পরবর্তীতে কয়েক ঘন্টা পর, নিউজ ক্লিপে ঘটনাটা বিভিন্ন এঙ্গেলে দেখার পর, তার নিকট ঘা'তকের পরিচয় স্পষ্ট হয়।

রোদসীকে বিব্রত হতে দেখে শেহজাদ তাচ্ছিল্য হাসলো। বললো,

“মজার ব্যাপার হলো, তন্ময়ও আমার স্টাফ। তারও সুযোগ ছিল আপনার মতো চোখের সামনে র'ক্তা'ক্ত অবস্থায় আমায় ফেলে চলে যাওয়ার।”

তন্ময়ের মনে হলো, সে এখন জেগে জেগে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। নয়তো প্রকাশ্যে স্যার তার প্রশংসা করবে! এ তো অসম্ভব ঘটনা। রোদসী ধীরস্থির ভাবে ঘাড় ঘুরিয়ে শেহজাদের দিকে তাকালো। শীতল গলায় বললো,

“যদি বলি, আমি বসকে দেখতে যাওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ করছিলাম?”

শেহজাদ একভাবে রোদসীর দিকে তাকিয়ে আছে। সে কী ভাবছে তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। রোদসী হুট করেই গলার স্বর বদলে ফেললো। কেমন একটা আত্মবিশ্বাসী স্বরে বললো,

“ইন্সপেক্টর মাহফুজ আপনাকে সালাম জানিয়েছেন।”

শেহজাদ খানিকটা চমকে উঠলো। কৌতুহল নিয়ে শুধাল,

“ইন্সপেক্টর মাহফুজ?”

রোদসীর অধরযুগল রহস্যজনক হাসিতে উন্মুক্ত। তার এই স্মিত হাসি শেহজাদের নিকট পরিচিত লাগছে। মেয়েটা কি এর মাঝে একা একা কোনো অঘটন ঘটিয়েছে? কী সেটা? তাকে ভ্রু কুঁচকে তাকাতে দেখে রোদসী ব্যাগে হাত দিলো। অলস ভঙ্গিতে কালো কাপড়ে মোড়ানো ভারি বস্তুটা ফেরত দিয়ে বললো,

“মোটে দুটো বুলেট খরচ হয়েছে। আশা করি, খুব একটা লস হয়নি।”

তন্ময় শুকনো মুখে বিষম খেলো। দুটো বুলেট খরচ হয়েছে মানে কী? রোদসী ম্যাডাম কাউকে ট'পকে দিয়েছেন নাকি? তন্ময় ভয়ার্ত নজরে লুকিং গ্লাসে তাকালো। গাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা বেশি নেমে গেছে। মনে হচ্ছে শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দও সেই নিম্ন তাপমাত্রায় ঢোলের আওয়াজের মতো আলোড়ন তুলছে। রাস্তার জ্যামে তাকিয়ে তার একবার ইচ্ছে হলো, গাড়িটা রেখেই স্যারকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে। পাছে রোদসী ম্যাডাম তাদেরও….

“বিস্তারিত বলুন। কী হয়েছে?”

রোদসী অকপটে বলে উঠল,

“আপনাকে আক্রমণ করা লোকটি প্রফেশনাল ছিলো। সে জানতো, এই আঘা'তে আপনি মা'রা যাবেন না। সে আপনাকে সাময়িকভাবে আটকানোর জন্যই আ'ঘাতটা করেছে।”

“আপনি কী করে জানলেন, সে প্রফেশনাল?”

“ঘটনার সময় চারপাশে অনেকগুলো ক্যামেরা ছিলো। বেশ কিছু ফুটেজ এনালাইসিস করার পরই আমি তার মাস্ক ছাড়া ছবি পেয়েছিলাম। গত মাসে জামিন পাওয়া মানিককে চিনতে তাই খুব একটা সময় আমার লাগেনি। শেষবার তাকে চেইন ছিনতাই-এর সময় একজন প্রেগনেন্ট মহিলাকে জীবন মৃ’ত্যুর মাঝামাঝি ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে হাতনাতে ধরা হয়। এ্যাজ ইউজুয়াল সে দু'মাসেই জামিন পায়। এবার জামিন পাওয়ার পর তাকে আপনার উপর হা'মলা করার কাজ দেওয়া হয়।”

শেহজাদ অধৈর্য্য হলো। জানতে চাইল,

“আপনি সব প্রুফ ইন্সপেক্টর মাহফুজকে দিয়েছেন?”

“ইন্সপেক্টর মাহফুজসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য মিলে তাদের ডেরায় গিয়ে তাকে তুলতে আনতে হয়েছে। সেই সুবাদেই দুটো বুলেট খরচ হয়েছে। একটা বুলেট মানিকের বাঁ পায়ে লেগেছে। অন্যটা তার চ্যালার ডান হাঁটুতে। ভাববেন না, দুজনেই আপাতত ডেঞ্জার জোনের বাহিরে আছে।”

তন্ময় কোনোমতে গাড়িটা জলনূপুর বাড়ির সামনে এনে ব্রেক কষেছে। স্টিয়ারিং রেখেই বেরিয়ে গেছে সে পানি কিনতে। তেষ্টায় তার গলা শুকিয়ে এসেছে। রোদসীকে তার ভয় হচ্ছে। তার দিকে তাকাতেও কেমন হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। দুটো মানুষকে গু'লি করার কথা সে এতো সহজে কী করে বলছে? এটা আদৌ মানুষ?

তন্ময়কে বেরিয়ে যেতে দেখে রোদসীও ব্যাগ আঁকড়ে গাড়ি থেকে বের হতে চায়। শেহজাদ বাঁ হাতে শক্ত করে চেপে ধরে তার কবজি। জোর খাটিয়ে তাকে খানিকটা কাছাকাছি টেনে আনে। থেমে থেমে বলে,

“আর ইউ সিরিয়াস? আপনি সত্যি সত্যি মাহফুজের সাথে ওদের ডেরায় গিয়েছেন?”

রোদসী তার অবিশ্বাস দেখে মজা পাচ্ছে। সে সবটুকু সত্য বলেনি। কিছুটা সত্য আর কিছুটা কথা উহ্য রেখে জানিয়েছে। শেহজাদের এমন হতভম্ব মুখশ্রী দেখে তার আনন্দ হচ্ছে। প্রথমদিন তার হাতে পি'স্তল তুলে দেওয়ার সময় তার চোখেমুখে নিজেকে নিয়ে যতটা দম্ভ ছিল, এখন তাকে ঠিক ততোটাই অবাক লাগছে।

“বিশ্বাস না হলে, ইন্সপেক্টর মাহফুজকেই জিজ্ঞেস করুন। মানিক এখনো তার আন্ডারে আছে।”

শেহজাদের বাঁ হাতের কবজিতেও ছু'রি মে'রেছে মানিক। সেখানটায়ও এখনো ব্যান্ডেজ লাগানো। হাতের ক্যানোলাটাও খোলা হয়নি এখনো। সেই হাতেই রোদসীর কবজি চেপে ধরায় তার হাতটা ঝিমঝিম করছে। শেহজাদের সেদিকে মন নেই। সে রোদসীর নির্ভীক চোখজোড়ায় একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ একভাবে তাকিয়ে থেকে আচমকাই সে ধমকে উঠল,

“আর ইউ ক্রেজি? হাও ক্যূড ইউ ইভেন ডু দিস?”

রোদসীর কবজিতে হাতের চাপ গাঢ় হচ্ছে। সে হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করলো। অপরাধী ধরে ফেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রেক্ষিতে শেহজাদের খুশি হওয়ার কথা। তা না হয়ে সে ক্ষোভ ঝারছে। অদ্ভূত লোক! রোদসী ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করতেই শেহজাদের হাতের বাঁধন আরেকটু পোক্ত হলো। তার চোখের ধারালো ভাব কিছুটা কমে এলেও দৃষ্টি অনেকটাই অস্বাভাবিক। রোদসী থেমে থেমে বলল,

“পারমিশন নেওয়ার জন্য তখন আপনি ছিলেন না। তাছাড়া, ঐ রাতে তাকে ধরতে না পারলে….”

রোদসীকে মাঝপথে থামিয়ে দিলো শেহজাদ। দৃঢ় গলায় বলল,

“প্রমিজ মি, ইউ উইল নেভার টেইক দিস কাইন্ড অফ রিস্ক এগেইন।”

____

শেহজাদদের বাড়িটা আজ যেন রীতিমতো একটা হাসপাতালে পরিণত হয়েছে। শেহজাদ বিছানায় শুয়ে আছে। ঘরের পরিবেশটা ফরিদা বেগমের হুড়োহুড়িতে অন্যদিনের তুলনায় বেশ সরগরম হয়ে আছে।

“আনার খাবি? আনার আনি?”

“মা…”

শেহজাদ কথা শেষ করতে পারে না, তার আগেই ফরিদা বেগম ড্রয়িং রুমে ছুটেন। বলে যান,

“কষ্ট করে চিবাতে হবে না বাবা, আমি জুস করে আনছি।”

শেহজাদ চরম বিরক্তি নিয়ে নাকচ করে। ভদ্রমহিলা ছুটে আসেন আপেল হাতে। উদগ্রীব হয়ে শুধান,

“তাহলে আপেল দেব একটু?”

শেহজাদ তুরন্ত বাধ সাধে। বলে,

“আমার পেট এমনিতেই ভরা। আর কত খাব, মা? আমি কি গরু-ছাগল নাকি যে সারাদিন জাবর কাটাবে?”

“আশ্চর্য! গরু-ছাগল হতে যাবি কেন? জলজ্যান্ত মানুষ তুই। মানুষ বলেই তার র'ক্তগুলো পূরণ হওয়া দরকার। তোর বাবা বাজার থেকে কচি দেখে একটা কবুতর এনেছে। ঝাল ঝাল করে ঝোল দিয়ে রেঁধে দেব, দেখবি খেলেই কেমন শক্তি ফিরবে।”

শেহজাদ কথা বলার সময় পেলো না। হাতের আপেলটা তন্ময়ের হাতে ধরিয়ে দিয়েই মা আবারো রান্নাঘরে ছুটলেন। তন্ময় বোকার মতো সেদিকে তাকিয়ে আপেলটা শেহজাদের দিকে এগিয়ে দিল। শেহজাদ ডান হাতে সেটাকে তন্ময়ের মুখে চেপে ধরল। অগত্যা আপেলটা তন্ময়কেই খেতে হলো। রোদসী বিছানার পাশে একটা চেয়ার টেনে বসেছে। এখানে আসার পর থেকে কেসের ব্যাপারে কিছুই আলোচনা করা হয়নি। ফরিদা বেগমের বারবার আগমন দেখে মনেও হচ্ছে না কেস নিয়ে কথোপকথন আগানো যাবে। রোদসী গলা খাঁকারি দিয়ে মনোযোগ টানল, বলল,

“আমার মনে হয়, আপনার কিছুদিন রেস্ট করা দরকার। ততোদিনে আমি কেসটার সবটুকু পেপারওয়ার্ক শেষ করে ফেলব।”

শেহজাদ তার দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকালো। বলল,

“আপনার কী মনে হচ্ছে? বাসায় এসেছি বলে আমি আপনার হঠকারিতা ভুলে গেছি?”

রোদসী কিছু একটা বলতে চাইল, তার আগেই শেহজাদ গলার স্বর উঁচিয়ে বলল,

“আমি অফিস যাওয়ার আগ অবধি, চব্বিশ ঘন্টা এ বাসা-ই আপনাদের জন্য অফিস। প্রয়োজন হলে দু'দিনের জন্য এখানে শিফট হবেন। তাও এখানেই থাকবেন। আপনাদের আমি আর এক মুহূর্তের জন্যেও বিশ্বাস করি না।”

ফরিদা বেগম আনারের জুস হাতে ঘরে আসছিলেন। কতোটুকু কী শুনলেন কে জানে? এসেই দুম করে বললেন,

“আমিও তোকে বিশ্বাস করিনা। পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগে আমিও তোকে বাড়ি থেকে বের হতে দেব না। লাগলে ঘরটাকেই তোর অফিস বানা। আমার আপত্তি নেই।”

রোদসী বিভ্রান্ত নয়নে মা-ছেলের দিকে তাকালো। এদের দুজনের একসাথে বোধশক্তি লোপ পেলো নাকি? সে কী করে এখানে থাকতে পারে? নানাবিধ যুক্তি তর্ক দর্শিয়েও রোদসী এই অস্বস্তি থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলো না। তার ঠাঁই হলো গেস্ট রুমে। শেষে ফোন করে এই ক'দিন ফিমাকে মায়ের কাছে থাকতে বললো সে। দূর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, আগামী সপ্তাহে ডিভোর্স কেসের হিয়ারিং থাকায় শেহজাদের সরু নজরের হুমকিকে মেনে নিতে হয়েছে। নয়তো মাঝপথে কেসটা হেরে গেলে হিতে বিপরীত ঘটনা ঘটবে। ফরিদা বেগম এশার নামাজে বসেছেন। সুযোগ পেয়ে শেহজাদ আধশোয়া হয়ে হেলান দিয়ে বসেছে। আয়োজন করে কেস ডিটেইলস জানতে চেয়েছে। আরেকবার শুরু থেকে সবটা শোনার পর তার আশ্চর্য লাগলো। ডক্টর নির্ঝর মাহবুব মনে হচ্ছে, প্রেমে পড়ে ফেঁসে গেছেন। নয়তো ঐ সময়টায় হসপিটালে থাকলেই তিনি এই শুকনো মুসিবত থেকে বেঁচে যেতেন। পুরো ঘটনা নতুন করে শুনে আপনা থেকে অস্পষ্ট গলায় বলল,

“প্রেম দেখছি এক ভয়ানক জিনিস। সহজ সরল মানুষকে কেমন ফাঁসিয়ে দেয়!”

রোদসী সেই কথা ঠিক করে শুনতে পেলো না। জিজ্ঞেস করলো,

“কিছু বললেন?”

শেহজাদ না সূচক মাথা নেড়ে কেসে মন দিতে চাইলো। রোদসী বেশ কিছু পেপার তার হাতে তুলে দিলো। ঘরটা একবেলাতেই কেমন বোঁটকা একটা রোগী রোগী গন্ধে ভরে গেছে। দমবন্ধ হওয়া থেকে বাঁচতে একটু আগেই তন্ময়কে বলে জানলাটা খুলে দিয়েছে সে। বাহিরে বোধহয় আজ এই রজনীকালে বৃষ্টি আসার তাড়া। হু হু বাতাসে মুহূর্তেই ঘরটা শীতল হয়ে উঠেছে। ঝিরঝিরে হাওয়ায় রোদসীর চুলগুলো সব এলোমেলো ভাবে উড়ছে। রোদসী কয়েকবার সেগুলো হাত দিয়ে ঠিক করে হাঁপিয়ে উঠলো। তার ঠিক পেছনেই জানলা হওয়ায় হাওয়াটা সরাসরি চুলে লাগছে। ত্যাক্ত হয়ে সে হাতের পেন্সিলটা দিয়ে এলোমেলো চুলগুলো খোঁপায় বেঁধে ফেললো। ব্যস্ত গলায় একে একে বলতে শুরু করলো প্রতিটি পেপার কাটিং এর ঘটনা। শেহজাদ সেই বিবরণে মন বসাতে পারলো না। দমকা হাওয়ার অফুরন্ত আসা যাওয়া সত্ত্বেও তার হাঁসফাঁস লাগছে। তন্ময় মন দিয়ে রোদসীর সবগুলো কথা শুনছে। ফাঁকে ফাঁকে আঙুল দিয়ে পেপারে কিছু একটা দেখাচ্ছেও। অথচ শেহজাদ কোনোভাবেই মন বসাতে পারছে না। শুকনো ঢোক গিলে সে ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে দুদিকে মাথা ঝাঁকালো। কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছে না। শেহজাদের হঠাৎ কী একটা হলো। হাত বাড়িয়ে রোদসীর খোঁপা থেকে পেন্সিলটা নিয়ে অবচেতন মনেই সে পেপার কাটিং এ এলোমেলো একটা গোলদাগ কাটলো। রোদসী কি চমকে উঠলো। মাতাল হাওয়ায় তার চুলগুলো চোখেমুখে আছড়ে পড়ছে। ফলস্বরূপ, তার মুখাবয়ব স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। শেহজাদ জোর করে পেপার কাটিং এ তাকিয়ে মূল বিষয়বস্তু খুঁজতে চাইলো। কানে এলো তন্ময়ের হতবাক গলা,

“আমরা তো বাচ্চা চুরির কেসটা দেখছি, স্যার। আপনি হঠাৎ অনাথ আশ্রমের অনুদান বিষয়ক কলামে দাগ দিচ্ছেন কেন?”

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 21 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন