ফন্ট সাইজ:
থিম:
তবুও জোছনা নামে

পর্ব 22

লেখক: বর্ণপ্রিয়া

#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_২২

তন্ময়ের কথায় শেহজাদের ঘোর কাটল। সম্বিৎ ফিরতেই সে উপলব্ধি করল, সে সত্যিই পেপার কাটিংয়ের সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক একটা কলামে গোল দাগ কেটে বসে আছে। শেহজাদ নিজের বোকামিতে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। অবচেতন মনের এই আকস্মিক দুর্বলতা তাকে রীতিমতো হতভম্ব করে দিয়েছে। মনোযোগের এই চরম বিচ্যুতি সে এড়িয়ে গেল সন্তর্পণে। নিজে অন্যমনষ্ক ছিল, এ কথা সে কোনোভাবেই স্বীকার করতে চায় না। চতুরতার সাথে অত্যন্ত দ্রুত নিজেকে সামলে নিল সে। মুখের রেখায় বিন্দুমাত্র পরিবর্তন তো আনলো না, উল্টো কপট গাম্ভীর্য নিয়ে পেপার কাটিংটার দিকে কিছুক্ষণ মন দিয়ে তাকিয়ে রইল। যেন সে আসলেও ওই নির্দিষ্ট কলামেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু খুঁজছিল। কিছুক্ষণ মন দিয়ে তাকাতেই সে ভুলটা ধামাচাপা দিতে যুৎসই একটা কারণ খুঁজে পেল। গলা ঝেড়ে যারপরনাই তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,

“অনুদান নয়, অনুদান দাতার নাম দেখে দাগিয়েছি।”

তন্ময় কৌতূহলী হয়ে পেপার কাটিং এর দিকে ঝুঁকে বসল। শেহজাদের দাগ দেওয়া অংশটায় চোখ বুলিয়ে সে নিজেও কিছুটা বিস্মিত হলো। কলামের নিচে অনুদানদাতার নামের জায়গায় স্পষ্ট অক্ষরে লেখা— ‘রাশেদুল হক’। তন্ময় হতভম্ব হয়ে শেহজাদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“স্যার, আপনি এখনো মন্ত্রীর ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছেন?”

শেহজাদ চোখ তুলে তাকাল। ধীরেসুস্থে মাথা নেড়ে বলল,

“না, তা ভাবছি না। ভাবছি অন্য কথা।”

এতোটুকু বলে শেহজাদ দৃষ্টি ফেরাল রোদসীর দিকে। মেয়েটার চুলগুলো বারবার এলোমেলো হচ্ছে। চুলগুলো সামলানোর বৃথা চেষ্টা করছে মেয়েটি। যা কিছু মুক্ত মনে উড়তে চায়, তা আটকে রেখে লাভ কী? শেহজাদের আবারো মনোযোগ সরে যাচ্ছে। না, না — এমন কথায় কথায় মনোযোগ সরে গেলে তো দারুণ সমস্যা। নিজেকে তৎক্ষণাৎ সামলে নিলো সে। রোদসীর চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল,

“মানিক কি স্বীকার করেছে, সে কার কথায় আমার ওপর আ’ক্রমণ করেছে?”

রোদসী শেহজাদের আকস্মিক প্রসঙ্গ পরিবর্তনে মোটেও ভড়কাল না। সে অত্যন্ত নির্বিকার গলায় জবাব দিল,

“শুরুতে মুখ না খুললেও পরে অবশ্য স্বীকার করেছে, মন্ত্রীর ভাইপো। তবে মনে হচ্ছে না, এ বিষয়ে মন্ত্রী অবগত আছেন।”

শেহজাদ ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটল। বলল,

“এক্সাক্টলি! অবগত থাকলে তিনি নিশ্চয়ই এতো বড় ভুল করতেন না। শেহজাদ মূর্তজাকে দিনের আলোতে আদালত প্রাঙ্গণে আঘাত করাটা যে তার জন্য নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মা'রার সমান, সেই হিসাব মন্ত্রীর ভালো করেই জানা আছে।”

একটু থেমেই আবার জানতে চাইল,

“মানিক এখন কোথায় আছে?”

“এ বিষয়ে ইন্সপেক্টর মাহফুজ ভালো বলতে পারবেন।”

শেহজাদ ছোট্ট করে শ্বাস ফেলল। পেটের সেলাইয়ের জায়গাটা আবার চিনচিন করে উঠছে। বাঁ হাতটা বাড়িয়ে সে পাশের টেবিল থেকে নিজের ফোনটা হাতে নিতে চাইল। উদ্দেশ্য, ইন্সপেক্টর মাহফুজকে কল করে মানিকের বিষয়টা সম্পর্কে পুরোপুরি জানা। শেহজাদের হাত ফোনের নাগাল পাওয়ার আগেই রোদসী বাধ সাধল। শান্ত গলায় বলল,

“এই কেসটার ডিটেইলস শুনে কল করলে ভালো হতো। হয়তো এই কেসের জন্যেও আমাদের ইন্সপেক্টর মাহফুজের সাহায্য লাগবে।”

শেহজাদের প্রসারিত হাতটা মাঝপথেই থেমে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে রোদসীর দিকে তাকাল। একটা সাধারণ বাচ্চা চুরির কেসে ইন্সপেক্টর মাহফুজকে কেন লাগবে?

শেহজাদের কণ্ঠে প্রচ্ছন্ন কৌতূহল ঝরল,

“কেমন সাহায্য?”

রোদসী তার নোটপ্যাডটা খুলে শেহজাদের দিকে এগিয়ে দিল। গুছিয়ে বলল,

“ঘটনাটা মোটেও সাধারণ নয়। কারণ তামীম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে এখন অবধি বিগত আটচল্লিশ ঘন্টায় তাহের মল্লিকের কাছে কোনো মুক্তিপণের কল আসেনি। একটা আট বছরের বাচ্চাকে কিডন্যাপ করে কিডন্যাপাররা চুপ করে বসে থাকবে, এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই ঘটনা এবারই প্রথম নয়।”

শেহজাদ ভ্রুকুটি করল, “প্রথম নয় মানে?”

রোদসী নোটপ্যাডের একটা নির্দিষ্ট পাতায় চোখ বুলিয়ে ভরাট গলায় বলতে শুরু করল,

“জিডির রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুর সাত মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিখোঁজ হওয়া বাচ্চার সংখ্যা পনেরো হাজার সাতশত সতেরো জন। রেকর্ড বলছে, এই সংখ্যার সাতানব্বই শতাংশ শিশুর বয়স দশ থেকে সতেরোর মাঝামাঝি।”

শেহজাদ নড়চড়ে উঠল,

“তামীমের কিডন্যাপিং কে আপনি এতো জটিলভাবে ভাবছেন কেন?”

রোদসী শ্লেষাত্মক হাসলো। বলল,

“সহজভাবে ভাবলেই হিসেব গুলিয়ে যাবে, স্যার। তামীমের কিডন্যাপিং কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চলতি বছরের এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর সাথে এর কোনো না কোনো সম্পর্ক অবশ্যই আছে।”

“কেমন সম্পর্ক?”

“তামীমের কেসের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটা আপনি এখনো জানেনই না।”

তন্ময় হাঁ করে একবার ডানে, একবার বামে তাকাচ্ছে। দুজনের প্রশ্নোত্তর পর্বে সে নিছক-ই এক দর্শক। রোদসী ছোট্ট করে শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করল,

“তামীমের সাথে আরও একটি শিশু নিখোঁজ হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, তার মিসিং হওয়ার ঘটনায় থানায় ডায়েরি করা হয়নি।”

“কে সে?”

“তাহের মল্লিকের বাড়ির দারোয়ান মঞ্জু। মঞ্জুর ছেলে মাসুম আর তামীম একই সাথে খেলছিলো। সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও তারা বাড়ি না ফিরলে মঞ্জুই প্রথম তাদের খুঁজতে শুরু করে। পরে দেখা যায়, রাস্তায় তাদের খেলনা বল-টা পড়ে থাকলেও তাদের দুজনের কাউকেই আর দেখা যাচ্ছে না।”

“তারপর?”

“তারপর সিসিটিভি চেক করে পুলিশ পুলিশের কাজ শেষ করেছে। তবে…”

“তবে কী?”

“আমার মনে হচ্ছে না, এটি একটি সাধারণ ঘটনা।”

শেহজাদ বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারছে না। সে পিঠের পেছনের বালিশটা হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে নড়েচড়ে উঠলো। বলল,

“এই পরিসংখ্যানের একটা দিক আপনি বলেছেন। অন্য দিকটা কিন্তু বাদ দিয়েছেন।”

রোদসী সামনের দিকের ছোট চুলগুলো হাত দিয়ে কানের পিঠে গুঁজলো। বাহিরে ততক্ষণে ইলশেগুঁড়ি ঝরতে শুরু করেছে। বাতাসের দাপটও কিছুটা কমে এসেছে। বৃষ্টির ক্ষীণ সুর তার কানে পৌঁছানোর ফুরসত পেলো না। তার আগেই কানে বিঁধল শেহজাদের গমগমে স্বর,

“পয়লা প্রভাতের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সংখ্যার তেরো হাজার ছয়শত ঊনআশি জন শিশুকেই জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে মাত্র দুই হাজার আটত্রিশ জন।”

তন্ময় বোকার মতো সামনে বসা মানব-মানবীকে দেখছে। এরা মানুষ না যন্ত্র? এমন মুখস্থ সংখ্যা বলছে কী করে? সন্দিহান হয়ে সে কথার ফাঁকে সংখ্যাটা একবার গুগল করে নিলো। ফলাফল দেখে তার চক্ষু রীতিমতো চড়কগাছ। তার হতভম্বতা কাটার আগেই কানে এলো রোদসীর তাচ্ছিল্য ভরা স্বর,

“চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের পরেও পয়লা প্রভাতের রিপোর্টকে আপনি শতভাগ সত্য মানছেন?”

শেহজাদ ডান হাতে থাকা পেন্সিলটা বিশেষ কায়দায় ঘোরাতে শুরু করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভাবতে বসলে মানুষ এমন অদ্ভুত কাজ করে। শেহজাদও কি গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভাবছে? কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে স্বীকার করল,

“শুধুমাত্র পয়লা প্রভাত নয়, দেশের প্রথম সারির কোনো সংবাদ মাধ্যমের খবরকেই আসলে শতভাগ সত্য বলার সুযোগ নেই।”

“এক্সাক্টলি! এই রিপোর্ট বহু সংখ্যার গড়মিল তো আছেই, সাথে আছে গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন। এগুলো সব থানায় জমা পড়া জিডির ভিত্তিতে করা পরিসংখ্যান। যেসব শিশুরা হারিয়ে যাওয়ার পরেও তাদের নামে জিডি করা হয়নি, তাদের সংখ্যা তো এখানে নেই।”

“হুম, সেভাবে ভাবলে আরেকটা ব্যাপার আছে। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়া শিশুর মধ্যে লা’শ হয়ে ফিরেছে অন্তত ছত্রিশ জন। তাহলে যাদের লা'শ বা খোঁজ কোনোটাই পাওয়া যায়নি তারা এখন কোথায় আছে?”

“ওয়েল! দ্যাট ওয়াজ মাই পয়েন্ট!”

রোদসী কেসটা নিয়ে ভালোই স্টাডি করেছে। বেশ কিছু কাগজ ঘেঁটে সে হয়তোবা কোনো ধারণায় এসে পৌঁছেছে। কী সেই ধারণা? শেহজাদ কেসের ব্যাপারে আর কিছু জানার সুযোগ পেলো না। তার আগেই ফরিদা বেগম রাতের খাবারের জন্য তাড়া দিলেন সকলকে। শেহজাদ তাকে ঘুরিয়ে দিতে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করল। তাতে একদমই লাভ হলো না। ফরিদা বেগম পাতলা করে খিঁচুড়ি রেঁধেছেন। সেই খিচুড়ি দেখতে লাগছে অনেকটা স্যূপের মতো। বাটিতে করে সেই খিচুড়ি নিয়ে তিনি বিরস মুখে পাশে ছেলের পাশে বসলেন। শুকনো গলায় বললেন,

“ডাক্তাররা নাকি সপ্তাহ খানেক লিকুইড জাতীয় খাবার দিতে বলেছে। সারাদিন কি জুস খাইয়ে রাখা যায় বল? বললাম একটু কবুতরটা ঝাল ঝাল করে ঝোল করি, বলে এটা নাকি করা যাবে না। শুধু স্যূপ, পাতলা ডাল, ডাবের পানি আর ভাতের মাড় দিতে বলেছে। ওসব তুই মুখে নেস? জানি না যেনো আমি।”

শেহজাদ মায়ের হাতে থাকা বাটিতে উঁকি দিলো। মায়ের হাতের বাটিতে লালরঙা তরল। এই তরল খাবারটা ঠিক কী তা ভেবেই তার ঘাম ছুটল। বিচলিত গলায় শুধাল,

“ডাক্তারের কথা শুনতে যেয়ে এটা কী রেঁধেছো তুমি?”

“খিচুড়ি, একদম মশলা ছাড়া পাতলা খিচুড়ি। দুটো ডিম দিয়েছি এতে, খেলে বল পাবি।”

শেহজাদ মুখের সামনে ধরে রাখা চামচে তাকিয়ে ইতস্তত গলায় জানতে চাইল,

“খিচুড়ির রঙ লাল কবে থেকে হলো, মা?”

ফরিদা বেগম খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,

“ওহ! এটা? এতে মিষ্টি কুমড়া আর লালশাক ব্লেন্ড করে দিয়েছি। তাই একটু লালচে হয়েছে।”

শেহজাদ শুকনো মুখেই বিষম খেলো। চোখের ইশারায় দরজায় দাঁড়ানো বাবার কাছে সাহায্য চাইলো। ভদ্রলোক ঠিক সুযোগ বুঝে কেটে পড়েছেন। রোদসী দ্রুত হাতে কাগজপত্র গুলো গোছাচ্ছে। তন্ময় এনায়েত মূর্তজার পিছু পিছু কী একটা বলতে ছুট লাগিয়েছে। রোদসী পড়েছে বিপাকে। তাকে আরও কিছুটা অপ্রস্তুত করতে ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। শেহজাদ বাচ্চাদের মতো জেদ ধরে বলল,

“সত্যি করে বলো মা, এতে আর কী কী মিশিয়েছো?”

ফরিদা বেগম রেগে গেলেন। আসার পর থেকেই ছেলেটা এটা খাবোনা ওটা খাবোনা করে যাচ্ছে। অথচ বাড়ি এসে বলেছে, হাসপাতালে তার দমবন্ধ লাগছে, সে বাড়িতে থাকবে আর মায়ের হাতের রান্না খাবে। সেসব বুঝি ভাঁওতাবাজি ছিলো? তাহলে তো একে হাসপাতালেই নিতে হবে আবার। নয়তো বড়সড় অঘটন না ঘটিয়ে এই ছেলে মানবে না। তিনি কপট রেগে বললেন,

“কী মিশিয়েছি মানে? তুই কি আমাকে তোর অপরাধী ভাবছিস নাকি? নিজের ছেলের খাবারে আমি কী মিশাবো? ও আল্লাহ! এই দিনও দেখা লাগলো! ছেলে বলে, আমি নাকি তার খাবারে কীসব মিশিয়েছি।”

ফরিদা বেগমের হায়হায় শুনে ছুটে এলেন এনায়েত মূর্তজা। শেহজাদ ব্যথার কথা ভুলে উঠে বসল। মাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল,

“আহহা! ভুল বুঝছো কেন? আমি সেভাবে বলিনি। শুধু শুধু আবার কান্নাকাটি শুরু করলে কেন? দেখি দাও তো, এদিকে দাও, এক্ষুণি খেয়ে নিচ্ছি সবটা।”

ফরিদা বেগম বাটি সরিয়ে ফেললেন। মিছেমিছি নাক টেনে বললেন,

“খাওয়া লাগবে না তোর। তোকে আমি আর খাওয়াবো না। বিয়ে করে বউকে দিয়ে রাঁধাবি তুই। এই খাবার আমি, আমি…”

বাটি নিয়ে উঠতে গিয়েও তিনি উঠলেন না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রোদসীর মুখের সামনে চামচ টেনে বললেন,

“আমি এই খাবার তন্ময় আর রোদসীকে দেব, তাও তোকে দেবো না। তোর ঔষধও আমি…”

এনায়েত মূর্তজা ততক্ষণে তার কথা আটকে দিয়েছেন, বলেছেন,

“সুস্থ মানুষকে অসুস্থ মানুষের ঔষধ খাওয়ানো যায় না।”

ফরিদা বেগমের সম্বিৎ ফিরলো। তিনি ধমকে উঠে বললেন,

“আমি ওদের খাওয়াবো নাকি বোকা? ওসব আমি খাবো। আমারই তো দায়, পেটে ধরেছি না?”

বলে আবারো শব্দ করে নাক টানলেন তিনি। রোদসী হতভম্ব। সে বুঝতে পারছে না, চোখে জল নেই তবু নাক টানার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, এ কেমন কান্না? আচ্ছা? তার কি এখনই উঠে যাওয়া উচিত? না, না — এভাবে উঠে গেলে আবার জল কোথায় না কোথায় গড়ায়! দ্বিধাদ্বন্দে ভুগতে থাকা রোদসী হকচকিয়ে ওঠে ফরিদা বেগমের আওয়াজে,

“তুমি বসে দেখছো কী? হাঁ করছো না কেন? নাকি তুমিও ভাবছো, আমি কিছু মিশিয়ে দিয়েছি খাবারে?”

রোদসী ভড়কে গেল। কিছু বলতে মুখ খোলা মাত্রই এক চামচ খিচুড়ি তার মুখগহ্বরে জায়গা করে নিলো। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটলো যে রোদসী অবাক হতেও ভুলে গেল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফরিদা বেগম ছেলেকে শাঁসালেন, বললেন,

“দেখলি? খেলো না ও? খেয়ে কী হলো? কিছু হলো? শুধু শুধু আমায় সন্দেহ করা, না? এই তন্ময়… তন্ময়…. আশ্চর্য! কাজের সময় তন্ময়টা গেলো কোথায়? এই! তুমি দাঁড়িয়ে দেখছো কী? ওকে ধরে আনো জলদি!”

এনায়েত মূর্তজা বড় বড় চোখে বউকে দেখছে। এতোদিন তার থেকে দেখে দেখে সেও যে এমন ভয়াবহ সব নাটক করতে শিখে গেছে, তা তো নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করা যেতো না। শেহজাদ তপ্ত শ্বাস ফেলে ডান হাতে মায়ের হাত ধরল, বলল,

“কেন শুধু শুধু রাগছো, বলোতো? তোমার রান্না নিয়ে কখনো প্রশ্ন তুলেছি বলো?”

ফরিদা বেগম হাতের বাটিটা এগিয়ে দিয়ে বললেন,

“তাহলে জলদি জলদি খাবারটা শেষ কর দেখি।”

শেহজাদ বিনা বাক্যে বাটির সবটুকু খিচুড়ি সময় নিয়ে খেলো। রোদসী অপ্রস্তুত মুহূর্তটা থেকে পালাতে ত্রস্ত পায়ে গেস্ট রুমের দিকে গেলো। নিঃসন্দেহে এ ঘরের প্রতিটি মানুষ পাগল। একেকজন একেক রকমের পাগল। এদের মাঝে দুটো দিন কাটানোর কথা ভাবতেই তার শ্বাস আটকে আসার উপক্রম হলো। যাওয়ার পথে তন্ময়কে দেখা গেলো ড্রয়িং রুমে আয়েশ করে ফোন স্ক্রল করতে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, ও ঘরের শোরগোলে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। রোদসী ঘরে গিয়ে দু'গ্লাস পানি খেলো। এনায়েত মূর্তজার ব্যবহার পাগলাটে লাগলেও ফরিদা বেগমকে সে ভালো ভেবেছিলো। আজকের ঘটনায় তার সম্পূর্ণ ভাবনা বদলে গেছে। দুজন আধপাগলের সংসারে থেকে শেহজাদ হয়েছে পুরো পাগল। সামান্য হাসপাতালে দেখতে না যাওয়াকে কেন্দ্র করে তাকে যেভাবে জেরা করা হয়েছে তাতে নতুন করে বুঝতে আর কিছুই বাকি নেই। রোদসী ক্লান্ত বদনে বিছানায় বসলো। নজর গেল, ডান হাতের কবজিতে। সেখানটায় এখনো হাতের ছাপ আবছা হয়ে আছে। লোকটা তখন গাড়িতে এমন অদ্ভুত ব্যবহার করলো কেন? সে কি কোনোভাবে জেনে গেছে, রোদসী তার আঘা'তের ঘটনাটা বানোয়াট ভাবছিলো? না, না — তা জানলে নিশ্চয়ই গলার স্বর ঠান্ডা থাকতো না। রোদসীর হুট করেই মনে হলো, অপ্রাসঙ্গিক ভাবনায় সে জড়িয়ে যাচ্ছে। কেস বাদে অন্য কারো ব্যক্তিগত জীবন বা কাজে সে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চায় না। এসব তার জন্য নয়। তার গন্ডি ক্রিমিনাল আর ক্রিমিনাল সাইকোলজিতেই সীমাবদ্ধ। কী একটা ভেবে রোদসী মায়ের নাম্বারে কল করলো। কলটা বোধহয় ফিমা ধরলো। রোদসী কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো খুব পরিচিত গলার গুণগুণ,

‘আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল
শুধাইলো না কেহ
সে তো এল না, যারে সঁপিলাম
এ প্রাণ, মন, দেহ।’

অজান্তেই রোদসীর কপোল বেয়ে দুফোঁটা দুর্বোধ্য তরল গড়ালো। উষ্ণ সেই তরলের ছোঁয়া পেয়েও সে নড়তে ভুলে গেল। তার কণ্ঠ ভুলে গেল নিজের কাজ। এই গলা তার বড্ড পরিচিত। খুব ছোট্টবেলায় এ স্বর তার প্রিয় ছিলো। সন্ধ্যা হলেই সে এই স্বরের মায়ায় ডুবে যেতো। কী ভীষণ ওম পেয়ে সে মুখ লুকাতো মায়ের কোলে। কতো-ই না যত্নে চুলগুলোতে বিলি কাটতো এক আদর আদর হাত। তারপর? তারপরের স্মৃতিগুলো সব ধোঁয়াটে কেন? এরপর আর এই গলা শোনা হলো না কেন? রোদসী কান পেতে শুনলো গানের আরও কিছু অংশ,

‘সে কি মোর তরে পথ চাহে,
সে কি বিরহ-গীত গাহে,
যার বাঁশরি-ধ্বনি শুনিয়ে
আমি ত্যজিলাম গেহ..’

বাকিটা শোনার আগেই তার কানে এলো ব্যাকুল স্বর,

“এ কী! কাঁদছো কেন, মা?”

রোদসী ফোনটা কেটে দিলো। পাছে ফিমার কান অবধি পৌঁছে যায় সেই স্বর। ফিমার সাথে মায়ের বড়ো ভাব। কই? এমন ভাব তো তার সাথে নেই। এভাবে রোদকে তো তার মা গান গেয়ে শোনায় না। ফিমাকে শোনাচ্ছে যে? রোদসী নিজেকে সামলে নিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো। তার আগেই ছুটে এসে দু’হাতের আঁজলায় তার মুখখানা তুলে ধরলেন ফরিদা বেগম। অনুতপ্ত হয়ে বললেন,

“ইশ! আমি ওমন জোর করায় কাঁদছো? বিশ্বাস করো, তোমার খারাপ লাগবে, আমি একদম বুঝিনি। আমার ছেলেটা একটু একগুঁয়ে জানোই তো! কলমি শাক সে ভুল করেও মুখে তোলে না। ডাক্তার বলেছে সবজি ব্লেন্ড করে মশলা ছাড়া পাতলা খিচুড়ি খাওয়াতে পারবো। ঘরে লাল শাক আর কলমি শাক ছাড়া কিছুই ছিলো না। ওটাই তাই রেঁধেছি। ওতে কলমি শাক আছে শুনে ফেললে শেহু জীবনেও মুখে তুলতো না। ওসব নাকি ময়লায় জন্মে। তাই একটু…”

রোদসী তাকে থামিয়ে দিল। দুর্বল গলায় বলল,

“আমি কিছু মনে করিনি, আন্টি। ভুল বুঝছেন আপনি।”

ফরিদা বেগমের হঠাৎ চোখ গেলো রোদসীর হাতে থাকা ফোনের স্ক্রিনে। তাতে ইংরেজি দুই অক্ষরে ভাসছে ছোট্ট একটি ডাকনাম ‘Ma'। সেদিকে চোখ যেতেই তার মনটা নরম হয়ে এলো। দুহাতে রোদসীর গালে লেপ্টে থাকা অশ্রু মুছে দিলেন তিনি। মায়াময় গলায় বললেন,

“মায়ের কথা মনে পড়ছে?”

রোদসী খেয়াল করলো সামান্য এক প্রশ্নে তার কথাগুলো সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে। সে কারো কথা মনে করেনি। কারো কথা না। সে শুধুই নিজের কথা ভেবেছে। কারো কথা ভাবলে একা একটা মানুষকে সে নরকে ফেলে আসতো না। স্বার্থপর সে, বিষম ভীষণ স্বার্থপর। রোদসীকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে ফরিদা বেগম নিজ থেকেই জড়িয়ে নিলেন তাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

“হুটহাট খারাপ লাগলে কেঁদে ফেলবে, মা। কাঁদতে কিন্তু বারণ নেই। কারো সামনে কাঁদতে ইচ্ছে না হলে একা কাঁদবে। তাও নিজেকে হালকা করে নেবে।”

রোদসী তখনো নির্বিকার। ফরিদা বেগম চিবুক ধরে রোদসীর মুখটা উঁচু করে ধরলেন। বললেন,

“জানো তো? দুঃখ চেপে রাখলে মনের বয়স বেড়ে যায়।”

একটু থেমেই রসাত্মক গলায় বললেন,

“তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে আমার চেয়েও তোমার মনের বয়স বেশি। এমন বেশি বয়স নিয়ে চলাফেরা করলে ক’দিন পর তো লোক বুড়ি ডাকবে।”

রোদসী জানে, তাকে হাসাতে ভদ্রমহিলা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তাও কেন যেন তার হাসি পাচ্ছে না। আজ নিজেকে নিয়ে তার প্রচণ্ড ঘৃণা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এক জীবনে সে একজন ভালো সন্তান হওয়ার সুযোগ হারিয়েছে। মাকে সে ভালো একজন সন্তান হওয়ার সুখটুকুও দিতে পারেনি। আজ তার নিজেকে সত্যি সত্যি জামিল ব্যাপারীর র’ক্ত মনে হচ্ছে। ওই অমানুষের র'ক্ত মিশে আছে বলেই সে এতোটা জালিম হয়েছে। বছরের পর বছর সে মুখ ফিরিয়ে নিজের কথা ভেবেছে শুধু। তারপর যখন তার মনে হয়েছে, সে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে সক্ষম, তখন হুট করেই মেয়ে হওয়ার আবদার খাটিয়ে মাকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছে। একবারও ভাবেনি, ফেলে আসা দিনগুলোর ভারে তার মা আদৌ বেঁচে আছে তো? ভাবতে ভাবতেই আচমকা কেঁদে ফেললো সে। তাকে এমন ভঙ্গুর অবস্থায় কাঁদতে দেখে হতভম্ব হলেন ফরিদা। দুহাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন অল্পবয়সে ভুরি ভুরি দুঃখ পোষা মেয়েটিকে। যত্ন করে তার এলোমেলো চুলে হাত বোলালেন। সবটুকু মমতা মিশিয়ে মন কেমন করা স্বরে বললেন,

“সময় নাও রোদ, আমি আছি। “

আমি আছি— দুটো শব্দ, নেহাত-ই দুটো শব্দের জোরে রোদসীর দম আটকে এলো। তাকে আরও সহজ করতেই হয়তো ফরিদা বেগম ফিসফিস করে কানের খুব কাছে এসে বললেন,

“ভেবো না, আমি একবারও তোমার কাছে কাঁদার কারণ জানতে চাইবো না।”

রোদসীর কান্নার জোর যেন মুহূর্তেই বেড়ে গেল। তার ইচ্ছে হলো, নিজের প্রতি জমানো অগাধ ঘৃণা সে নোনাজলে ভাসিয়ে দেবে। মুছে দেবে সব অপারগতার নীলচে দাগ। তার কানের সামনে তখনো হৃদয় গলানো সুরে অন্য একজন মা বলে যাচ্ছেন কিছু। রোদসীর মনে হচ্ছে, কথাগুলো ফরিদা বেগম নয়, রুমানা খাতুন-ই বলছেন। ভিন্ন স্বরে বলছেন,

“কাঁদলে কেউ ছোট হয় না, রোদ।”

চলবে….

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 22 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন