ফন্ট সাইজ:
থিম:
তবুও জোছনা নামে

পর্ব 23

লেখক: বর্ণপ্রিয়া

#তবুও_জোছনা_নামে
#বর্ণপ্রিয়া
#পর্ব_২৩

রোদসী রাতের খাবারটা ঘরেই খেয়েছে। বহুক্ষণ কেঁদেকেটে তার চোখমুখ ফুলে একাকার। ফরিদা বেগম কথা রেখেছেন। তিনি সত্যি-ই কান্নার কারণ জানতে চাননি। মনের ঝড় শান্ত হতেই তিনি হাত মুখ ধুয়ে নিতে বললেন। রোদসী হাত মুখ ধুয়ে দেখল, খাবারটা তিনি ঘরে এনেছেন। সামনে বসে থেকে খাবারটা শেষ করালেন ভদ্রমহিলা। অতঃপর প্লেট নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। রোদসী সাহস করে ফিমার নাম্বার ডায়াল করলো। খুব ইচ্ছে হলে একটাবার তাকে জিজ্ঞেস করতে, কী এমন জাদু জানে সে? রুমানা কেন তার সাথে সহজ হয়ে মেশে? স্ক্রিনে ভাসা নাম্বারটায় বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকেও এই কাজটা সে করতে পারলো না। বিছানার মাঝ বরাবর একরকম অবহেলে ছুঁড়ে মারলো ফোনটা। অতিরিক্ত কান্না করায় তার তীব্র মাথাব্যথা আরম্ভ হয়েছে। রোদসী বাতি নিভিয়ে ঘর অন্ধকার করে বসে রইলো। মিনিটখানেকের মাঝেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেয়ে চমকে উঠলো সে। দরজা খুলে আবিষ্কার করল, ফরিদা বেগম বালিশ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। দরজা খুলতেই তিনি রোদসীকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। বালিশটা রাখতে রাখতে খুব স্বাচ্ছন্দ নিয়ে বললেন,

“এ বালিশ ছাড়া ঘুম হয় না আমার।”

রোদসী দ্বিধায় পড়লো। জানতে চাইলো,

“আপনি আজ এখানে ঘুমাবেন?”

“কেন? কোনো সমস্যা?”

বলতে বলতেই তিনি বিছানা ঝেড়ে বালিশটা ঠিকঠাক গোছালেন। রোদসী তখনো অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার এখন কী করা উচিত? ফরিদা বেগমকে মানা করা উচিত? তার বাড়িতে বসে তাকে না করাটা কি খুব একটা শোভন হবে? রোদসীর ভাবনার সুতোগুলো জট পাকানোর আগেই ফরিদা বেগম তাকে টেনে নিলেন বিছানায়। পা গুটিয়ে আয়োজন করে বসলেন। কোলের সামনে বালিশটা রেখে রোদসীকে ইশারায় সেখানে শুতে বললেন। রোদসী ইতস্তত নিয়ে শুতেই তার মাথায় নরম হাতের ছোঁয়া লাগলো। ভদ্রমহিলা বোধহয় বাম নিয়ে এসেছিলেন। খুব যত্নে তিনি মালিশ করতে শুরু করলেন রোদসীর কপাল। আচ্ছা? তিনি কী করে জানলেন রোদসীর মাথা য'ন্ত্রণা হচ্ছিলো? রোদসী খুব করে চাইলো তাকে বারণ করতে। কিন্তু তার হৃদয়স্পর্শী কোমলতায় সে কাবু হয়ে গেল। চরম আবেশে তার চোখের পাতা আপনা থেকে বদ্ধ হলো। রোদসীর নতুন জায়গায় ঘুম হয় না, তার উপর এটা সম্পূর্ণ অপরিচিত জায়গা। নিরাপত্তার খাতিরে হলেও সে রাতটা জেগেই কাটানোর পরিকল্পনা করেছিলো। অথচ সামান্য মালিশেই তার সমস্ত পরিকল্পনা বিফলে গেল। আরাম পেয়ে গভীর নিদ্রায় তলিয়ে গেল সে। ঘুমানোর আগে মনে হলো, কানের কাছে কেউ একজন খুব পরিচিত কোনো এক সুর বেঁধেছে। এতো চেনা কেন লাগছে এই সুর? কী আছে এই সুরে? ভালোবাসা? তার জীবনে ভালো জাতীয় কিছুরই জায়গা নেই। এও হয়তোবা কোনো নতুন কোনো ফাঁদ। নিজের এতোদিনের গোছালো সত্তাকে গুড়িয়ে ফেলার সর্বনাশী ফাঁদ। এই ফাঁদে রোদসী ভুল করেও পা হড়কাবে না।

শেহজাদ ঘুমানোর আগে একবার ফ্রেশ হতে চাইলো। বাবা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছেন। মাও একটু আগে দেখে গেলেন। শেহজাদ একা একা উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করলো। তার পেটের সেলাইয়ে তখনো চিনচিনে ব্যথা। পলক ফেলার আগেই কোথা থেকে ছুটে এলো তন্ময়। এসেই ক্ষান্ত হয়নি সে, এক হাত নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে শেহজাদের অর্ধেক ভার।

শেহজাদ থমকে গেলো। থেমে থেমে বলল,

“আমি একাই হাঁটতে পারব, তন্ময়।”

“পারবেন না কখন বললাম?”

“তাহলে এমন হুড়োহুড়ি করছো কেন?”

“কারণ আমি আসলে একা হাঁটতে পারবো না। আমার আপনার সাপোর্ট দরকার।”

শেহজাদ হুট করেই হেসে ফেললো। সামনে থাকায় তার চওড়া সে হাসি তন্ময়ের চোখে পড়লো না। সে সাবধানে তাকে ওয়াশরুম অবধি নিয়ে গেল। শেহজাদ মৃদু ধমকে বললো,

“এখন কি সং এর মতো বাকি সময়ও দাঁড়িয়ে থাকবে? বের হও!”

তন্ময় অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেল। ওয়াশরুমের দরজাটা বাহির থেকে লক করে চড়া গলায় বললো,

“শেষ হলে ডাক দেবেন, স্যার।”

শেহজাদের মনে হলো এর চেয়ে বরং মরে গেলেও লজ্জা কম হতো। দুদিনের ছোকড়া এখন তার অভিভাবক হয়েছে। আগে যে চোখে তাকিয়ে কথা বলতো না, সে এখন কথার প্যাঁচে তাকে আটকে দিতে চাচ্ছে। এমন চটপটে তো সে ছিলো না। কোথা থেকে শিখলো এসব? কে শেখালো? রোদসী? হ্যাঁ, হতে পারে।

শেহজাদ ভেবেছিলো বিড়ম্বনার দৌড় বোধহয় ওয়াশরুম অবধি-ই। কিন্তু দেখা গেলো, বিড়ম্বনা সবখানেই। তন্ময় তার ঘরেই ফ্লোরিং করে শুয়েছে। হাতে থুতনি ঠেকিয়ে ভাবুক নয়নে শেহজাদকে দেখছে আর বলছে,

“জেগে আছি আমি, ভাববেন না ঘুমাচ্ছি। যখন যা লাগবে, ডাকবেন।”

শেহজাদ অতিষ্ঠ হয়ে বাঁ পাশ ফিরে শুতে চাইলো। সেলাইয়ে ঘা তাজা থাকায় তা করা গেলো না। বিরক্ত হয়ে সে চোখ বুজলো। কানের সামনে টেপরেকর্ডারের মতে আবারো বেজে উঠলো তন্ময়ের গলা,

“স্যার, কিছু লাগলে ডাকতে কিন্তু দ্বিধা করবেন না।”

একটু থেমেই আবার বলে উঠল, “ডাকতে ইচ্ছে না হলে টেক্সটও দিতে পারেন। আমি কিন্তু জেগেই আছি।”

শেহজাদ না শোনার ভান করলো। পানির বোতলটা পাশে রেখে তন্ময় আবারো বলে উঠল,

“পানিটা পাশেই আছে। বোতলের মুখ খুলতে সমস্যা হলেও কিন্তু আমি আছি। একদম জোর খাটাবেন না, ঠিক আছে?”

শেহজাদ বড় করে শ্বাস ফেলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলো। যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতায় আজ তন্ময় সেজেছে শেহজাদের অভিভাবক। শেহজাদ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করলেও তন্ময় মুখ বন্ধ রাখার ন্যূনতম চেষ্টাও করলো না। একভাবে শেহজাদের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,

“চশমা ছাড়া আপনাকে কিন্তু একটুও কঠিন লাগে না, স্যার।”

শেহজাদ ভ্রু কুঁচকে চোখ মেললো। দেখলো তন্ময় দাঁত বের করে গদগদ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেদিকে তাকিয়ে সে চোখ পাকিয়ে তাকালো। তন্ময় উতলা হয়ে জানতে চাইলো,

“কিছু লাগবে, স্যার?”

শেহজাদ হিসহিসিয়ে বললো,

“আমার বাম হাতে ব্যান্ডেজ থাকলেও ডান হাতটা কিন্তু ঠিকঠাক চলছে। একবার গালটা এগিয়ে এনে পরীক্ষা করে দেখতে পারো।”

তন্ময়ের মুখ থেকে চট করেই হাসিটা সরে গেল। বিরস মুখে সে বলে উঠলো,

“আপনি আমায় চ'ড় মে'রে হাতের পাওয়ার দেখাতে চাচ্ছেন? এটা কি ঠিক?”

শেহজাদ নীচু গলায় শাঁসালো তাকে। বললো,

“আর একবার কথা বলো। ট্রাস্ট মি, এরপর অন্তত তিনদিন আর কথা বলার সুযোগ পাবে না।”

তন্ময় সিঁটিয়ে গেলো। স্যার তার পরিবারের গন্ডি পেরিয়ে আবার এ্যাডভোকেট টোনে কথা বলছে। সত্যি সত্যি ক্ষেপে গিয়ে মারধর শুরু করলে এই মাঝরাতে ভালোই বিপাকে পড়তে হবে। মুখে কথা না বললেও সে একভাবে বড় বড় চোখে শেহজাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। পাছে সে ঘুমিয়ে যাবে, স্যার ডাকবে আর সে শুনতে পাবে না। শেহজাদ চোখ বুজেও দিব্যি টের পাচ্ছে, আবছা আলোয় একজোড়া চোখ মন দিয়ে তাকে দেখছে। ব্যাপারটা নিশ্চিত হতে সে হুট করেই চোখ মেলে তাকালো। চোখে চোখ পড়তেই তন্ময় ভদ্র ছেলের মতো মাথাটা নামিয়ে ফেললো। তাকে স্বাভাবিক ভাবে শুয়ে চোখ বুজতে দেখে শেহজাদ ছোট্ট করে শ্বাস ফেললো। বদ্ধ চোখের পাতায় একে একে ভেসে উঠলো তন্ময় নামক ছেলেটার পাগলামি। কী এক নাম না জানা অনুভূতিতে ছেয়ে গেলো তার অন্তর। এই তো কিছুদিন আগেও তন্ময় ছিল আস্ত একটা গর্দভ! প্রতিটা কাজে তাকে দিয়ে কয়েকবার করে করানো লাগতো, ভুল হয়েছে টের পেয়েই ছলছলে চোখে সরি সরি বলে মুখে ফ্যানা তুলতো। কিন্তু আজ? আজ কেউ কিছু বলে দেওয়ার আগেই ছেলেটা সব একা হাতে গুছিয়ে ফেলছে। শেহজাদ চোখ মেললো। বাহিরের মৃদু আলোতে ঘরের ভেতরটা একদম পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সেই আলোতে তন্ময়ের চোখ পিটপিটও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বোঝা-ই যাচ্ছে, শুধুমাত্র শেহজাদের ভয়ে সে জোরপূর্বক চোখ বুজে পড়ে আছে। তার দিকে তাকিয়ে শেহজাদের কেন যেন মনে হলো, হুট করেই তন্ময় অনেকটা বড় হয়ে গেছে। হয়তো দায়িত্ব নিতেও শিখে গেছে। এই অবেলায়, বুঝদার তন্ময়কে দেখতে মোটেও খারাপ লাগছে না।

___

ঝলমলে রোদে চারিদিক প্রজ্জলিত। শেহজাদ সকাল সকাল বেশ জোর দেখিয়েই নাস্তার টেবিলে এসেছে। একভাবে শুয়ে থেকে থেকে তার পিঠ লেগে এসেছে। টেবিলে এসে দেখল, এদিকে একদম এলাহী কান্ড। নাস্তার যেন ধুম লেগেছে। একেকজনের সামনে একেক রকম নাস্তা। তন্ময় শুকনো মুখে শেহজাদের পাশের চেয়ারটায় বসেছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, শেহজাদ কোনোভাবে পড়ে টরে গেলে ধরার দায়িত্ব টা তাকেই নিতে হবে — সেই চিন্তায় সে ভীষণ রকম বিচলিত।

শেহজাদের প্লেটের সামনে তিন গ্লাস ভিন্ন ভিন্ন রঙের জুস সাজানো। একটা পেঁপের, একটা আপেলের, আরেকটা কিসের কে জানে! শেহজাদ সামনে সাজানো তিন রকমের জুসের দিকে তাকিয়ে থেমে থেমে বড় শ্বাস নিল। এসব ঘাসপাতার রস গিলে সকাল শুরু করার কোনো মানে হয় না। কোন আক্কেলে ডাক্তার এসব খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছে খোদা মালুম। একদিন দুদিন মানা যায়, তাই বলে প্রতিদিন? প্রতি বেলায়? এসব কেমন ফাজলেমি? খোঁজ নিয়ে জানতে হবে, ডাক্তারের সাথে তার পূর্ব কোনো শত্রুতা আছে নাকি। শেহজাদ আর কিছু ভাবার আগেই কানে এলো বাবার হাঁকডাক। টেবিলে বসেই তিনি গলা উঁচিয়ে ডাক দিচ্ছেন,

“কই গেলে? রোদসীকে আরেকটা পরোটা দিয়ে যাও। পরোটা টা নাকি ওর খুব ভালো লেগেছে।”

ফরিদা বেগম কিচেন থেকেই গলা চড়িয়ে বললেন,

“দিচ্ছি, গরম গরম ভেজে আনছি একদম।”

তিনি গরম গরম একটা পরোটা এনে রোদসীর প্লেটে দিয়ে রান্নাঘরে যেতেই এনায়েত মূর্তজা একটা অদ্ভুত কাজ করে বসলেন। তিনি দ্রুত হাত বাড়িয়ে রোদসীর প্লেট থেকে অর্ধেকটা পরোটা ছিঁড়ে নিজের মুখে পুরে নিলেন। তারপর রোদসীর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন,

“এটাও একটা সিক্রেট, ওকে? হোম মিনিস্টার দেখলে কিন্তু কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে ফেলবে। আমার আবার তেল-চর্বি খাওয়া মানা, কিন্তু গরম গরম ঘিয়ে ভাজা পরোটা-টার যা ঘ্রাণ বেরিয়েছে না! উফ! একদম সেরা!”

রোদসী হতবিহ্বল চোখে পাশে বসা লোকটিকে দেখছে। একটু আগে সে মোটেও বাড়তি পরোটা চায়নি। ভদ্রলোক নিজেই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জানতে চেয়েছেন, পরোটা কেমন হয়েছে? সেই কথার জবাব পেয়ে তিনি আরেকটা পরোটা আনার কথা একেবারে বানিয়ে বলেছেন। এখন আবার বাচ্চাদের মতো খাবার চুরি করছেন। ভদ্রলোক মুখ ভর্তি পরোটা নিয়েও রান্নাঘরের দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকিয়ে আছেন। মনে হচ্ছে ধরা পড়ার ভয়টা জাঁকিয়ে ধরেছে তাকে। রোদসী তার উচাটন মুখে তাকিয়ে আচমকাই প্লেটের বাকি অর্ধেক পরোটাও এনায়েত মূর্তজার প্লেটে তুলে দিল। তার মতোই ফিসফিস করে বলল,

“কেউ কিচ্ছু দেখেনি এখনো। দেখে ফেলার আগেই বাকিটুকুও তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন।”

শেহজাদ গোটা ব্যাপারটাই শুরু থেকে শেষ অবধি দেখেছে। তার হুট করেই মনে হচ্ছে, প্রফেশনাল লাইফ আর পার্সোনাল লাইফ এক করা হয়তো উচিত হচ্ছে না। কেন এমন মনে হলো তা সে জানে না। অবচেতন মনে সে কি এমন দৃশ্যের অভ্যাস হয়ে যাওয়ার তাড়নায় ভীত কিনা কে জানে? তার ভাবনার মাঝেই ফরিদা বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তার হাতে আরও দুটো জুসের গ্লাস। তিনি রোদসী আর তন্ময়ের সামনে গ্লাস দুটো রেখে দিয়ে ব্যস্ত গলায় বললেন,

“তন্ময়ের খুব কমলার জুস পছন্দ, তোমাকেও আজ এটাই ট্রাই করতে দিলাম। নাও মা, খেয়ে দেখো। একদম ফ্রেশ কমলার ফ্রেশ জুস।”

রোদসী জুসের গ্লাসটার দিকে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ফরিদা বেগমের সহজ ব্যবহার দেখে মনে হচ্ছে, তার কাছে শেহজাদ, তন্ময় আর রোদসীর মধ্যে বিন্দুমাত্র কোনো পার্থক্য নেই। তারা সবাই যেন তার কাছে এক একটা বাচ্চা। এই যে আলাদা করে কার কী পছন্দ সেটা মনে রেখে জুস বানিয়ে আনা, এই নিখাদ ভালোবাসার সাথে রোদসী খুব একটা অভ্যস্ত নয়। সে ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে নিতে খুব করে চেষ্টা করছে। অথচ গত রাত থেকে ভদ্রমহিলা তার কাছে স্বাভাবিকের সংজ্ঞা বদলে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এভাবে নরম করে কথা শুনতে শুনতে রোদসী আবার বদলে যাবে না তো? সে আর ছোট্টবেলার রোদসী হতে চায় না। একদম না। জুসের গ্লাসে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই রোদসীর চোখদুটো জ্বলে উঠলো। ঘোর কাটলো এনায়েত মূর্তজার চাপা হাহাকার শুনে,

“আরে আরে! একটা পরোটা নিলাম বলে কেঁদে ফেলবে নাকি? হোম মিনিস্টার দেখে ফেললে তো সর্বনাশ হবে!”

একটু থেমেই ঘুষ দেওয়ার মতো করে বললেন, “শোনো, বিকেলে আইসক্রিম এনে দিবো, তবু এখন কেঁদো না কেমন?”

রোদসী হতভম্ব হয়ে গেলো। সে কখন কাঁদলো? তার হতভম্ব মুখে তাকিয়ে শেহজাদও অপ্রস্তুত বোধ করলো। বাবা মাঝে মাঝে এতো অদ্ভুত আচরণ করে! প্রসঙ্গ বদলাতে সে ফোনে বুঁদ হয়ে বসে থাকা তন্ময়কে দুটো ধমক দিলো,

“খেতে বসে ফোনে কী?”

তন্ময় চমকে উঠলো। সে মাত্রই ফোনটা হাতে নিয়েছে। ক'টা বাজে দেখা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য তার ছিলো না। ধমক শুনে এনায়েত মূর্তজা এদিকে মনোযোগ দিলেন। প্রসঙ্গ বদলানোর সুবাদে রোদসীও টেবিল ছাড়ার সুযোগ পেল। সে নাস্তার প্লেট হাতে উঠে দাঁড়াল, বলল,

“প্লেটটা রেখে আসি।”

রোদসী চপল পায়ে রান্নাঘরের দিকে গেল। ফরিদা বেগমের উতলা স্বর ভেসে এল সেখান থেকে,

“আরে কষ্ট করে আবার তুমি রান্নাঘরে আসতে গেলে কেন? আমি আছি তো!”

এনায়েত মূর্তজা রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর শেহজাদের দিকে তাকিয়ে কপট বিরক্তি নিয়ে বললেন,

“মায়া করে থাকতে দিলাম, এখন দেখি দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টা আমার স্ত্রীর সাথে সাথে থাকছে। এ কেমন মুসিবত! চোখের সামনে আমার বউকে দেখছি চুরি করে নিচ্ছে।”

শেহজাদ বাবার কথায় কিছুটা ভড়কে গেলো। জিজ্ঞেস করল,

“চব্বিশ ঘন্টা মানে?”

“আর বলিস না! দিনে তো একসাথে আছেই, কাল রাতেও আবার আমাকে রেখে ওর সাথেই ঘুমাল।”

শেহজাদ অবাক হলো। মা গতরাতে রোদসীর সাথে ঘুমিয়েছে! কিন্তু কেন? কী এক ভাবনায় মশগুল হয়ে সে রান্নাঘরের দরজার দিকে তাকাল। হয়তো মায়ের সাথে রোদসীর এই হুট করে কাছে আসা নিয়ে সে চিন্তিত। সে কি এখনো রোদসীকে বিশ্বাস করে না? না, ব্যাপারটা ঠিক তেমন নয়। বিশ্বাস তো অবশ্যই করে। তাহলে? তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়? পারিবারিক বিষয়ে রোদসীর সংযুক্তি তাকে পীড়া দিচ্ছে কেন? তাকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে এনায়েত মূর্তজা গলার স্বর নামিয়ে আনলেন। ইচ্ছেকৃত খোঁচা দেওয়ার সুরে বললেন,

“তেত্রিশ হতে এখনো চারমাস হাতে আছে। বিয়েটা কি এর মাঝে আয়োজন করবো?”

শেহজাদ সবেই হাতে থাকা জুসের গ্লাসে চুমুক বসিয়েছে। আচমকা এমন কথা শুনে বাজেভাবে বিষম খেল সে। প্রবল কাশিতে তার মুখ লাল হয়ে গেল। কোনোমতে ধাতস্থ হয়ে জানতে চাইল,

“কেন? তেত্রিশ হলে বিয়ে করা যাবে না?”

এনায়েত মূর্তজা সন্দিহান চোখে ছেলেকে দেখছেন। ছেলের মতিগতি তার সুবিধার ঠেকছে না। আজ আর বিয়ের প্রসঙ্গ এড়াতে সে তোড়জোড় করছে না। ব্যাপারটা তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? খাবার টেবিলের কথা আর আগালো না। তার আগেই শেহজাদ উঠে নিজের ঘরের দিকে গেল। গলা চড়িয়ে ডাকলো তন্ময়কে। পেটের ব্যথাটা এখন অনেকটাই সহনীয়। এই বেলায় কেস নিয়ে না বসলে কাজ জমে থাকবে।

সাইড টেবিলে কেসের বেশ কিছু পেপার্স গোছানো অবস্থায় রাখা। শেহজাদ পেপারগুলো হাতে নিল। তাহের মল্লিকের আট বছরের ছেলে তামীমের কিডন্যাপিং কেসের যাবতীয় খুঁটিনাটি তাতে সূক্ষ্ম ভাবে নোট করা। শেহজাদের মনে হলো, এভাবে কাগজ না ঘেঁটে একবার ক্রাইম স্পটে যেতে পারলে ধারণা নেওয়া সহজ হতো। মাকে বলে বাসা থেকে বের হওয়া রীতিমতো অসম্ভব। তিনি নিশ্চয়ই এই সময় কোনোভাবেই শেহজাদকে বাড়ি থেকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেবেন না। তাহলে উপায়?

ভেবেচিন্তে শেহজাদ একটা চমৎকার উপায় বের করেছে। হাতের ক্যানোলা আর স্টিচের চেকআপের অজুহাতে তন্ময়কে নিয়ে বেরিয়েছে সে। হাসপাতালে গিয়ে ক্যানোলা খুলিয়ে স্টিচের টুকটাক দেখভাল করিয়েই পৌঁছেছে স্কাইভিউ লেনে। সেখানে গিয়ে তারা আবিষ্কার করলো, গলির মোড়ে বিস্তর একটি সিকিউরিটি বুথ বসানো আছে। তাতে তিনজন লোক একই সময়ে বসা। এতো কড়া নিরাপত্তা ভেদ করে দু’দুটো বাচ্চা চুরি হলো কী করে? শেহজাদ বার কয়েক চেষ্টা করেও গলিতে ঢোকার পারমিশন পেলো না। শেষ অবধি তাকে আইনি পরিচয় দর্শিয়েই ভেতরে ঢুকতে হলো। ভেতরের সুবিন্যস্ত দালানকোঠার ভিড়ে শেহজাদ শুধু সিসিটিভি গুলোই মন দিয়ে দেখলো। সে একবারের জন্যেও দেখা করলো না তাহির মল্লিকের সাথে। শুধু গলিটা ঠিকঠাক দেখে নিয়েই বেরিয়ে এলো সেখান থেকে। গলি থেকে বেরিয়ে চওড়া রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে একটা সিসিটিভির দিকে আঙুল তাক করলো। শুধাল,

“ওটা কাজ করে না?”

জবাব এলো, “এটা আমার জানা নেই।”

শেহজাদ তন্ময়ের দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকালো। তন্ময় বোধহয় তার বিরক্তির কারণ ধরতে পারলো। সে চট করেই রোদসীর নম্বরে ডায়াল করলো। একই প্রশ্ন রোদসীকে করতেই জানা গেলো,

“সিসিটিভির নির্দিষ্ট দিনের ফুটেজ গায়েব।”

তন্ময়ের ফোনটা লাউডে দেওয়া ছিলো। এই অদ্ভুত কথা শুনে শেহজাদের ভ্রুদ্বয় কুঁচকে এলো। সে তন্ময়ের ফোনের কাছে মুখ নিয়ে থমথমে গলায় বললো,

“অফিসে আসুন। কুইক!”

এতোটুকু বলেই সে গাড়িতে চড়ে বসলো। অফিসে পৌঁছে দেখা গেল, শেহজাদের আগেই রোদসী অফিসে চলে এসেছে। তাকে হোয়াইট বোর্ডের সামনে আঁকিবুঁকি করতে দেখে শেহজাদ কৌতুহলী হলো। কৌতুহল নিয়ে শুধাল,

“কী করছেন?”

রোদসী সরতেই দৃশ্যমান হলো হোয়াইটবোর্ডে আঁকা চারটি আলাদা আলাদা কলাম। প্রথম কলামে বড় করে লেখা ‘র‍্যান্ডম কিডন্যাপিং এবং মুক্তিপণ আদায়’, দ্বিতীয়টিতে লেখা ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা’, তৃতীয় কলামে জ্বলজ্বল করছে লাল মার্কারে গোল করে দাগ কাটা লেখা ‘পঙ্গুকরণ এবং ভিক্ষাবৃত্তি’। চতুর্থ কলামটি খালি, সেখানে বড় করে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন দেওয়া আছে। তন্ময় শেহজাদের জন্য বোর্ডের সামনে একটি চেয়ার টেনে দিলো। শেহজাদ তবু বসলো না। তার জিজ্ঞাসু নয়ন তখনো বোর্ডের এ মাথা থেকে ও মাথা অবধি মুক্ত বিচরণ করছে। শেহজাদকে থমকে যেতে দেখে রোদসী তাকে বসার ইঙ্গিত দিল। গুছিয়ে বলল,

“সরি, আপনার বাসায় বসে ওভাবে গুছিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হচ্ছিলো না। তাই অফিসে যখন আসা হলোই, আমি মূল বিষয়বস্তুটা তাই সামান্য গুছিয়ে নিলাম।”

“মূল বিষয়বস্তু?”

জবাব দিতে গিয়ে রোদসী হাতের মার্কারটা অন্যমনষ্কভাবে নাড়াতে শুরু করলো। বোর্ডে তাকিয়ে পরিষ্কার গলায় বললো,

“ওয়েল, বাচ্চা চুরির মূল কেন্দ্র নিয়ে যদি এনালাইসিস করা হয়, তাহলে গোটা সমস্যাকে আমরা এই চার ভাগে ভাগ করতে পারবো। যার প্রথম ভাগ হয়, র‍্যান্ডম কিডন্যাপিং। এই ক্ষেত্রে বেশিরভাগ কিডন্যাপার মাদকে আসক্ত থাকে। নেশার টাকার যোগান দিতে তারা এই ধরণের কিডন্যাপিং করে থাকে। এসব ক্ষেত্রে বাচ্চাদের বয়স কিংবা পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড কোনোটাই তারা যাচাই করে না। এরা সুযোগ পেলেই কোথাও থেকে একটা বাচ্চাকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর মুক্তিপণ আদায় করে, অজ্ঞান অবস্থায় রাস্তায় ফেলে যায়।”

শেহজাদ চেয়ারে হাত রেখে ঝুঁকে দাঁড়ালো। রোদসীর এনালাইসিস পাওয়ারে সে নতুন করে মুগ্ধ হচ্ছে। মনে হচ্ছে, তার জন্য এর চেয়ে পার্ফেক্ট এসিসট্যান্ট হয়তো আর কেউ হতে পারতো না। তন্ময় বোকার মতো জানতে চাইল,

“যদি বাচ্চার পরিবার মুক্তিপণ দেওয়ার মতো স্বচ্ছল না হয়?”

“এরা লাখ লাখ বা কোটি কোটি টাকা দাবি করে না। এরা দাবি করে বিশ-ত্রিশ হাজার টাকা। এটা এমন একটা এমাউন্ট, যেটা সন্তানের প্রাণ বাঁচানোর বিনিময় হিসেবে খুবই নগন্য। আর তাই একেবারেই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা বাবা-মায়েরাও দুঃখে কষ্টে এটি যোগাড় করে ফেলেন।”

শেহজাদ সহজ গলায় সঙ্গ দিলো তার, বলল,

“এই ধরণের কেস খুব একটা সামনে আসে না। পত্রিকা বা সংবাদ মাধ্যম গুলো তো দূর, পুলিশের ডায়রি অবধিও এই সকল কিডন্যাপিং এর খবর আসে না। কোনোটা যদিও ভাগ্যক্রমে জিডি অবধি আসে, সেটা সেখানেই মাসের পর মাস ঝুলে। খুব বেশি ভাগ্যবান হলে এদের কাউকে হয়তো ধরে ফেলা যায়, তাতেও অবশ্য সমীকরণ বদলায় না। দেখা যায়, অল্প কয়েকদিন পরেই অপ'রাধী জামিনে বেরিয়ে আসে।”

তন্ময় উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলো,

“এসব অপ'রাধীর জামিনের আবেদন-ই বা করে কে?”

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 23 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন