ফন্ট সাইজ:
থিম:
দ্য বন্ডম্যান

পর্ব 3

লেখক: অলকানন্দা আমানি

#The_Bondman
#সংগ্রহ_সেবা_প্রকাশনী
#লেখক_Sir_Thomas_Henry_Hall_Caine
#পর্ব_০৩

​লোকালয়ের সঙ্গে ওদের যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে। সানলককে সামনে থেকে দেখেছে তেমন লোকের সংখ্যা হাতে গোনা। তারাও কেউ সামাজিক জীব নয়। ফলে কারও সন্দেহ হয়নি যে গভর্নরের পালক ছেলেই লিজা আর স্টিফেনের সানলক।

​মা যখন মারা গেল জানল না সানলক। জানল না তাতে কোন ক্ষতি হলো তা নয়। বরং এ এক দিক দিয়ে ভালই হলো। লোকে ওর পরিচয় জানলে জটিলতা সৃষ্টি হতো। সবাই আশা করত ছেলে তার মায়ের কবরের পাশে শেষবারের মতো এসে দাঁড়াবে। গভর্নর একা ছেড়ে দিতে রাজি হতেন না সানলককে। তাঁকেও আসতে হতো পোর্ট লা ভিউলিনে। দুশ্চরিত্রা লিজার শেষকৃত্যে গভর্নরের উপস্থিতি বিশদৃশ একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করত। ফেয়ারব্রাদারের চরিত্রেও একটা কলঙ্কের ছাপ লাগত।

​সানলক কোথায় সেটা স্টিফেন ছাড়া আর কেউ না জানানই ভালই হলো। গভর্নরও জানলেন না সানলকের মা দেহ ত্যাগ করেছে পোর্ট লা ভিউলিনের ভাঙা কুঁড়েতে।

​দশ বছর পর ফিরল স্টিফেন ম্যান দ্বীপে। ভাগ্যের কি নির্মম খেলা, যেদিন সে ফিরল সেদিনই সুদূর আইসল্যান্ডে একটা পর্ণ কুটিরে রোগশয্যায় শুয়ে মৃত্যুপথযাত্রিণী র‍্যাচেল তার বুকের ধন জেসনকে ভয়ঙ্কর নির্দেশ দিচ্ছে,

‘ম্যান দ্বীপে যাবে তুমি, খুঁজে বের করবে তোমার পিশাচ বাবাকে, তাকে এবং তার ছেলেকে হত্যা করবে নিজের হাতে।'

​ম্যান দ্বীপে পৌঁছেই পোর্ট লা ভিউলিনে গেছে স্টিফেন, গিয়ে দেখেছে শূন্য কুটির। দুই মাইল হেঁটে গিয়ে প্রতিবেশীর কাছ থেকে জেনে এসেছে লিজার মৃত্যুসংবাদ। লিজা মরেছে শুনে স্বস্তি পেয়েছে। জঙ্গলের ভেতরে কোথায় লিজাকে কবর দেয়া হয়েছে সেই জায়গায় একবার যাওয়ারও কোন প্রয়োজন বোধ করেনি। শয়তানীটা পৃথিবী থেকে দূর হয়েছে পৃথিবীর কলঙ্ক কমেছে। একটা বোঝা নেমে গেছে স্টিফেনের মাথার ওপর থেকে।

​দু'দিন বিশ্রাম নিয়ে চাঙা হয়ে এবার গভর্নরের সঙ্গে গিয়ে দেখা করল স্টিফেন। নিজের পরিচয় দিয়ে বলল,

‘আমি শুনেছি কত যত্নে আপনি মানুষ করেছেন আমার সানলককে। ধন্যবাদ দিয়ে আপনাকে ছোট করব না। অনেক করেছেন আপনি আমার ছেলের জন্যে। মুখের কথায় সে ঋণ শোধ হয় না। এবার ওকে অনুমতি দিন, কলেজে পড়তে যাক ও।'

গভর্নরের মুখের চেহারায় পরিবর্তন চোখে পড়ল না স্টিফেনের, সে তখন নিজের আনন্দে কথা বলে যাচ্ছে।

‘আইসল্যান্ডের বিশপ অনেকদিন ধরেই একটা ল্যাটিন কলেজ চালাচ্ছেন, আমার অনেকদিনের ইচ্ছে আমি সেই কলেজে সানলককে পড়তে পাঠাব। পড়তে পাঠানোর মতো টাকা আমি গত দশ বছর পরিশ্রম করে জোগাড় করেছি।'

​জীবনে কোনদিন এত চিন্তিত আর বিপন্ন বোধ করেননি গভর্নর অ্যাডাম। সানলককে দিয়ে দিতে হবে? এই অর্ধ বর্বর নিষ্ঠুর চোরাকারবারীর হাতে?

​নিজের ছেলেদের স্বার্থপরতা দেখেছেন তিনি, বউয়ের নিষ্ঠুরতা দেখেছেন, সব সয়ে গেছেন এই সানলকের জন্যে, তবু সানলককে দূরে ঠেলে দেননি। সেই সানলককে দিয়ে দিতে হবে? ছোটবেলা থেকে সানলককে বুকে করে আগলে রেখেছেন তিনি, পড়াশোনা শিখিয়েছেন, আদর্শ মানুষ হবার দীক্ষা দিয়েছেন—সেই সানলককে নিয়ে যাবে স্টিফেন ওরি?

​হোক বর্বর অসভ্য নরপিশাচ, স্টিফেন ওরিই সানলকের আসল বাবা। বাবা যদি তার নাবালক ছেলেকে নিতে আসে তাহলে কোন অধিকারে তাকে ফেরাবেন তিনি! আইনত কোন অধিকার নেই তাঁর সানলকের ওপর। স্নেহের দাবী আছে, ভালবাসার দাবী আছে! কিন্তু স্টিফেন ওরি কি তার ছেলেকে স্নেহ করে না, ভালবাসে না? তার নিজস্ব ধরন অনুযায়ী ঠিকই ছেলেকে ভালবাসে সে। ভালবাসে বলেই শিশু সানলককে তার দুশ্চরিত্রা মায়ের সংস্রব থেকে বাঁচাতে চেয়েছিল, তুলে দিয়ে গিয়েছিল অ্যাডামের হাতে। ভালবাসে বলেই বিদেশে গিয়ে এতগুলো বছর কষ্ট করে ছেলের জন্যে কলেজে পড়ার টাকা সঞ্চয় করেছে। না, স্টিফেনের দাবী এড়ানোর মতো কোন যুক্তি খুঁজে পেলেন না অ্যাডাম।

​মন শক্ত করলেন তিনি সানলককে বিদায় দেয়ার জন্যে। গত দশ বছরে স্নেহ-মায়া-মমতার প্রগাঢ় একটি বন্ধন তৈরি হয়েছিল দু’জনের মাঝে, আজ ছিঁড়ে ফেলতে হবে সেই বন্ধন। নীতি তাই বলে, ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত বিবেক তাই বলে। যত বড় আঘাতই পান অ্যাডামকে সহ্য করতে হবে। আফ্রিকায় দেড় বছর বর্বর উপজাতির ক্রীতদাস ছিলেন তিনি, সেসময় অকথ্য নির্যাতন করা হয়েছে তাঁর ওপর। দৈহিক এবং মানসিক অত্যাচারে জর্জরিত হয়েছেন, তবু ভেঙে পড়েননি। নিজের মনকে প্রবোধ দিলেন অ্যাডাম, সানলককে হারানোর কষ্ট শুধুই মানসিক, ঠিকই এই বিচ্ছেদ বেদনা কাটিয়ে উঠতে পারবেন তিনি।

​কবে ছেলেকে নিয়ে যাবে জানিয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেল স্টিফেন।
​কি চলছে সানলকের মনে? ছোটবেলা থেকে অ্যাডামকে শ্রদ্ধা করেছে ও, একমাত্র আপনজন বলে জেনেছে। বাবা না হয়েও তিনি বাবার চেয়ে বেশি ওর কাছে। এটা সানলক বোঝে যে তার মাঝে যেসব ভাল গুণের বিকাশ ঘটেছে, সবই অ্যাডামের সাহচর্যে, তাঁর শিক্ষায়। বাবার মতো স্নেহ করেছেন তিনি, হাত ধরে ওকে এগিয়ে নিয়ে এসেছেন মনুষ্যত্ব অর্জনের পথে। তাঁকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হবে সানলকের। তবে সে কষ্টেরভূতির সঙ্গে আনন্দের অনুভূতিও মিশে আছে। সানলক জানে, কোন কারণ ছাড়া তাকে নিয়ে যেতে আসেনি তার অচেনা বাবা। আইসল্যান্ডে কলেজে পড়াতে পাঠাবে সে ওর ভালর জন্যেই।
​র‍্যামজেতে যতটা সম্ভব পড়েছে সানলক, অ্যাডাম তাকে সুশিক্ষিত করে তুলেছেন। কিন্তু সুশিক্ষা মানেই উচ্চশিক্ষা নয়। বড় মাপের মানুষ হতে গেলে যে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন এটা তো অ্যাডামই শিখিয়েছেন। রেইকিয়াভেকে ল্যাটিন কলেজে উচ্চশিক্ষা পাবে সানলক। উচ্চশিক্ষা ওর সামনে সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। অ্যাডামের কাছ থেকে চলে যাবার বিচ্ছেদ বেদনার সঙ্গে তাই মিশে আছে একটা আনন্দ।
​বিদায়ের আগে অ্যাডামের কাছে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়াল সানলক। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধরা গলায় বলল,

‘আমি আবার এখানে ফিরে আসব, বাবা। যা শিখি, যে অবস্থাতেই সমাজে থাকি, আমি কখনও ভুলব না তুমি আমাকে শিক্ষা না দিলে আমি মানুষ হতাম না। কোন চিন্তা কোরো না, আমি লেখাপড়া শেষ করেই চলে আসব।'

​অনেক কষ্টে চোখের জল আটকালেন অ্যাডাম। মুখে হাসি টেনে এনে বললেন,

‘না, চিন্তা করছি না। রেইকিয়াভেক তো কাছেই, হয়তো দেখবে আমি হঠাৎ একদিন চলে গেছি ওখানে তোমার সঙ্গে দেখা করতে। বুড়ো বয়সে দেশ-বিদেশে বেড়াতে ইচ্ছেও তো হয় মানুষের।'

​অ্যাডামের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সরে এলো সানলক। গ্রেবার কাছ থেকে বিদায় নিতে হবে এবার। গ্রেবা অ্যাডামের মেয়ে। রুথকে খামার বাড়ি লিখে দেবার সময় অ্যাডামের সঙ্গে রুথের কথা হয়েছিল গ্রেবা লেণ্ডতে খামার বাড়িতেই থাকবে। কিন্তু তা আসলে হয়নি। হয়নি কারণ গ্রেবা কিছুতেই মায়ের কাছে থাকতে রাজি হয়নি। অ্যাডামও সবার ছোট এই কন্যা সন্তানটিকে খুবই ভালবাসেন। গ্রেবা বাবার কাছেই র‍্যামজেতে সরকারী বাসভবনে থেকেছে বরাবর। গ্রেবা আর সানলক একই সঙ্গে খেলেছে, পড়েছে, অবসর কাটিয়েছে, বেড়াতে গেছে। অ্যাডাম ওদের মধ্যে কখনও পার্থক্য করেননি, ওদের নিষ্পাপ ঘনিষ্ঠতা দেখে বাঁকা চোখে তাকাননি কখনও।

​অনেক অর্থহীন কথা হলো গ্রেবা আর সানলকের মাঝে। স্মৃতিচারণ করল ওরা। কখনও হাসল প্রাণ খুলে, কখনও বা চোখ থেকে ঝরে পড়ল দু'ফোঁটা অশ্রুবিন্দু। সানলক চলে যাচ্ছে। আবার ফিরবে কবে তার কোন নির্দিষ্ট তারিখ কেউই বলতে পারে না। বিদায়ের সময় সানলক কথা দিল, আবার দেখা হবে। যেখানেই থাকুক ফিরে আসবে ও গ্রেবার কাছে। ছোটবেলা থেকেই অনাবিল ভাললাগা ছিল, বিদায়ের আগের মুহূর্তে দু'জন বিস্মিত হয়ে উপলব্ধি করল পরস্পরকে অন্তর দিয়ে ভালবাসে ওরা। কেউ জানল না দুটি হৃদয় আজ এক সূতোয় বাঁধা পড়ল। বিদায়ের আগে সানলকের হাত ধরে গ্রেবা কথা দিল, সানলকের ফিরতে যত দেরিই হোক, অপেক্ষা করবে ও।

​বাল্লাসাল্লা পর্যন্ত সানলককে এগিয়ে দিলেন অ্যাডাম। ফিরে যাওয়ার আগে ওর হাতে তুলে দিলেন পঞ্চাশ পাউন্ডের একটি থলে।

​তাঁর হাত ধরে ফেলল সানলক। ধরা গলায় বলল,

‘আমি যাচ্ছি, বাবা। ঈশ্বরের কাছে আমার জন্যে প্রার্থনা করো, আমি যাতে আবার তোমার কাছে ফিরে আসি।'

​প্রার্থনা করতে গিয়ে চোখের জল চেপে রাখতে পারলেন না বৃদ্ধ অ্যাডাম। ছেলেকে বিদায় দিয়ে গাড়িতে চড়ে বসলেন তিনি। র‍্যামজে শহরের দিকে ছুটতে লাগল গাড়ি। পেছন ফিরে তাকিয়ে রইলেন অ্যাডাম যতক্ষণ সানলককে দেখতে পেলেন।

​গাড়িটা দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার পর পোর্ট লা ভিউলিনের দিকে চলল সানলক। নির্জন জলাভূমির গভীরে পাহাড়ী উপত্যকার সেই কুটির চেনে ও। ম্যান দ্বীপের কোন কিছুই অচেনা নেই ওর। গভর্নরের পালক ছেলে সে, ঘোড়ায় চড়ে সারা ম্যান দ্বীপ চষে বেরিয়েছে অনেকবার। সুন্দর ব্যবহার আর মিষ্টি চেহারার কারণে সবাই ওকে পছন্দ করে। লিজার মৃত্যুর বেশ কিছুদিন পর কি করে যেন খবর ছড়াল গভর্নরের পালক ছেলেই আসলে লিজা আর স্টিফেনের সানলক। হ্যাঁ-না কিছুই বলেননি অ্যাডাম, লোকে বুঝে নিয়েছে যা বোঝার। লোকের মুখে সানলক জেনেছে জলাভূমির ওই কুঁড়েতে তার মা থাকত, ওই কুঁড়েতেই তার জন্ম। জেনেছে সানলক, কিন্তু কখনও কুঁটিরের ভেতরে ঢুকে দেখে আসার ইচ্ছে জাগেনি। বাবা স্টিফেন ওরি বা মা লিজা মানুষ হিসেবে ভাল ছিল না একথা মানুষের কাছে জেনেছে ও। বাবা-মায়ের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে এই ভেবে কখনও দুঃখ হয়নি ওর, অ্যাডাম ওকে বাবা-মা দু'জনের স্নেহে যত্নে পালন করেছেন।

​কিন্তু আসলে তিনি তো ওর বাবা নন। ওর আসল বাবা স্টিফেন ওরি। ফিরে এসেছে লোকটা। ফিরে এসেছে ওর মুখ চেয়ে। ফিরে এসেছে ওর জন্যে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে চায় বলে। এখন ওর জন্মস্থান সেই পরিত্যক্ত কুটিরে অপেক্ষা করছে লোকটা ওরই জন্যে অধীর হয়ে। চোরাকারবারী স্টিফেন ওরি ওর বাবা! মনের মাঝে বিতৃষ্ণার একটা জোয়ার উঠল সানলকের। তিক্ত হয়ে গেল অন্তরটা। স্টিফেন ওরিই ওর আইনসম্মত অভিভাবক। তারই হাতে ওর ভাল-মন্দ।

​কুটিরের দরজা বন্ধ। দরজায় টোকা দিয়ে মাথা থেকে টুপি খুলে দাঁড়াল সানলক। স্টিফেন ঘরেই ছিল, দরজা খুলে দিল। সামনে তরুণ দেবতার মতো ছেলেটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। অনিয়ম, মদ্যপান আর যথেচ্ছ জীবনযাপনের চিরস্থায়ী ছাপ পড়েছে স্টিফেন ওরির কঠোর মুখে, ছেলেকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সেই মুখেও কোমল অভিব্যক্তি প্রকাশ পেল। ঢোক গিলে অশ্রু চেপে রাখল লোকটা। মাথা থেকে টুপি খুলে নড় করল। ভাবতে পারল না সামনে দাঁড়ানো এই রূপবান যুবক আসলে তারই নিজের ছেলে। একে দেখে ভদ্রলোক মনে হচ্ছে। সম্ভ্রমের সুরে বলল ওরি,

‘কি চাই, মিস্টার?'

​‘আমি মাইকেল,’ মৃদু স্বরে বলল সানলক।

‘তোমার ছেলে।'

​স্টিফেনের দু'গাল বেয়ে নেমে এলো অশ্রুধারা। অনেক বদলে গেছে ও বিগত বছরগুলোতে। আইসল্যান্ড ছেড়ে যখন আসে একটা পশু ছিল ও। এখন অনুতপ্ত একজন মানুষ। নিজের ভুলগুলো তাকে কষ্ট দেয়।
​মাইকেলকে ভেতরে আসতে দেখে লিজার নোংরা বিছানায় বসল স্টিফেন। মুখ নিচু করে বসেই থাকল।

​তার সামনে হাতল ভাঙা একটা চেয়ারে বসল মাইকেল। অবাক হয়ে গেল বুকের ভেতরে কষ্ট হচ্ছে দেখে। সামনে বসা এই দৈত্যাকৃতির লোকটা সম্বন্ধে একটু আগের সেই বিতৃষ্ণা এখন আর নেই। স্টিফেন ওরির শরীরের কাঠামোটুকুই শুধু আছে, শরীর ভেঙে গেছে কঠোর পরিশ্রমে। ছেলেকে কলেজে পড়াবে এই আশায় নিজেকে শেষ করে দিয়েছে লোকটা। এতদিন মনে মনে স্টিফেন ওরিকে ঘৃণা করেছে ভেবে এখন লজ্জা লাগল মাইকেলের।

​অনেক কথাই হলো বাপ-ছেলের। সে-কথা সানলকের মা লিজা সম্পর্কে নয়। আজকে মন খুলে দিল স্টিফেন, বলল নিজের ফেলে আসা কলঙ্কময় জীবনের কথা। বলল সানলককে দেখে তার মনে পড়ে গেছে প্রথমা স্ত্রী র‍্যাচেলের কথা। বলল তার আরেক সন্তানের কথা। আইসল্যান্ডের সমুদ্র তীরের গ্রামে ভাঙা এক কুটিরে শুয়ে আছে র‍্যাচেল, কোলে ছোট্ট একটা বাচ্চা ছেলে।

​ঘোরের মধ্যে আছে স্টিফেন। ভুল বলছে সে। র‍্যাচেলের সন্তানের জন্ম দেখে আসেনি ও। র‍্যাচেলকে যখন ও ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে এসেছিল তখনও জেসনের জন্ম হয়নি।

​অনেকবার ও ভেবেছে ফিরে যাবে আইসল্যান্ডে, র‍্যাচেলের সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইবে। কিন্তু সাহস হয়নি র‍্যাচেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর। আজ আর স্টিফেন জানে না র‍্যাচেল বেঁচে আছে কিনা, কিন্তু মনে প্রাণে কামনা করে তার সেই ছেলে আজও বেঁচে আছে।

​একটা স্থির বিশ্বাস জন্মে গেছে স্টিফেনের যে তার প্রথম সন্তান মরে যায়নি। কোন দায়িত্ব সে পালন করেনি প্রথম সন্তানের প্রতি। আইসল্যান্ড ছাড়ার পর বারবার স্টিফেনের মনে হয়েছে সন্তানের কাছে ফিরে যাবে সে, যত্ন দিয়ে ভালবাসা দিয়ে ভরিয়ে তুলবে র‍্যাচেল আর ওর সন্তানের জীবন। কিন্তু যেতে পারেনি ও। বারে বারে নানা কাজে জড়িয়ে জীবনটা কেটে গেছে। অনুশোচনায় দগ্ধ হয়েছে প্রতি পলে।
​স্টিফেন কোন মুখে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে? শত অবহেলা আর অপমান ছাড়া আর কি দিয়েছে সে ওদের? কিচ্ছু না। স্টিফেনের সাধ্য নেই ওদের কাছে যায়। কিন্তু মাইকেল? মাইকেল যেতে পারে। মাইকেল কোন অন্যায় করেনি ওদের প্রতি। মাইকেল যদি ভাই বলে ওর প্রথম সন্তানের হাত ধরে, যদি ভ্রাতৃত্বের দাবী জানায় তাহলে ওকে কি ফেরাতে পারবে র‍্যাচেলের সন্তান? পারবে না। স্টিফেন চায় মাইকেল যাক আইসল্যান্ডে, গিয়ে খুঁজে বের করুক ওকে, তাকে বড়র সম্মান দিক। এভাবে হয়তো স্টিফেনের অপরাধ লাঘব হবে, তীব্র অপরাধবোধ থেকে হয়তো মুক্তি পাবে স্টিফেন।

​ধীর গলায় র‍্যাচেলের সব কথাই মাইকেলকে খুলে বলল স্টিফেন। শেষ দিকে বুজে এলো ওর গলা। মাইকেলের হাত ধরে বলল,

‘কোনদিনই আমি ভাল মানুষ ছিলাম না। আজও আমি ভাল মানুষ নই। র‍্যাচেল আর ওর সন্তানের প্রতি যেমন অন্যায় করেছি তেমনি লিজা আর তোমার প্রতিও আমি সুবিচার করতে পারিনি। আজকে তোমার কাছে আমি আমার অপারগতার জন্যে ক্ষমা চাইছি, সানলক। তুমি আমার ছেলে। তোমার ওপর দায়িত্ব দিচ্ছি আমার হয়ে র‍্যাচেল আর ওর ছেলের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে তুমি। বলো তুমি রাজি?'

​‘রাজি,' কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে নিচু গলায় বলল সানলক।

​‘তোমার সৎ মা যদি বেঁচে থাকে এখনও তাহলে...’

​‘তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াব আমি, নিজের মায়ের মতোই ভালবাসব। এতদিন যত অন্যায় হয়েছে তাঁর প্রতি সেজন্যে ক্ষমা চাইব। প্রয়োজনে তাঁর জন্যে জীবন দিতেও দ্বিধা করব না।'

​‘আর যদি র‍্যাচেল বেঁচে না থাকে...’

​‘তাহলে তাঁর সন্তানকে খুঁজে বের করব, যেখানেই তিনি থাকুন তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দেব। তিনি আমার বড়। তাঁকে আপন বলেই মনে করব আমি। তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেব তোমার জন্যে। তাঁর স্নেহ ভালবাসা অর্জন করে নেব শ্রদ্ধা আর ভালবাসা দিয়ে।'

​স্বস্তির শ্বাস ফেলল স্টিফেন। মুহূর্তের জন্যে তার ফ্যাকাসে চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কোটের পকেট থেকে একটা থলে বের করে মাইকেলের হাতে দিল ও। বলল,

‘এর ভেতর তোমার জন্যে দুশো পাউন্ড আছে। যাতায়াত ভাড়া, কলেজের বেতন আর থাকা খাওয়ার খরচ এতেই চলে যাবে। পুরোটা হয়তো লাগবে না, তবু সঙ্গে রাখা ভাল। আইসল্যান্ড তোমার কাছে বিদেশের মতো।'

​থলেটা হাতে নিয়ে হাসল সানলক। পকেটে না রেখে বলল,

‘এটা তুমি আমাকে দিয়েছ, কাজেই এটা এখন আমার, তাই না? ইচ্ছে মতো খরচ করতে পারি আমি এখান থেকে, ঠিক তো?'

​‘তা পারো,’ দ্বিধা ফুটল স্টিফেনের মুখে। ‘...বাজে খরচ নিশ্চয়ই করবে না?'

​‘তা করব না।' থলেটা বাবার দিকে বাড়িয়ে ধরল মাইকেল।

‘আমি এটা তোমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছি। ধরে নাও একটা জিনিসের দাম দিলাম।'

​‘দাম দিলে?’ বিস্মিত হলো স্টিফেন। ‘কিসের?'

​‘এই দুই শো পাউন্ডের বিনিময়ে আমি আশা করব তোমার জীবন। তোমার জীবনের বাকি দিনগুলো। বলো আমার কথা তুমি রাখবে?'
​থলেটা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ছেলের সুন্দর চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকল স্টিফেন। তারপর বলল, ‘বলো কি বলবে। সম্ভব হলে আমি তোমার কথা অবশ্যই রাখব।'

​‘আমি অসম্ভব কোন কাজ করতে বলব না তোমাকে।'
হাসল মাইকেল।

‘ধরে নাও এখন থেকে তোমার জীবন আর তোমার নয়। ওটা আমার। আমি যেভাবে বলব সেভাবে চলবে এখন থেকে। কোন অন্যায় করবে না, অসৎ পথে যাবে না, ভাল মানুষের মতো জীবন কাটাবে। এজীবনে না হোক মৃত্যু পরবর্তী জীবনে তোমার সঙ্গে দেখা হবে আমার। আবার যদি অসৎ কাজ করো পরকালে আমার কাছে জবাব দিতে হবে তোমাকে।'

​বাকরুদ্ধ হয়ে গেল স্টিফেনের। এত সুন্দর করে কথা বলতে শিখেছে তার ছেলে! কোন জবাব দিতে পারল না ও, মাথা নিচু করে বসে থাকল শুধু।
​
​আর একটু পরেই নোঙর তুলবে জাহাজ। মাঝি মল্লারা দৌড়াদৌড়ি চেঁচামেচি করছে ব্যস্ত হয়ে। যাত্রীরা প্রায় সবাই উঠে গেছেন। জাহাজের পাশে অনেকগুলো ডিঙি নৌকো। যাত্রী আর মালামাল আনানেয়া করছে ওগুলো। কোন নৌকোয় বয়স্ক মাঝি, কোন নৌকোর মাঝির বয়স এখনও হয়তো বারো হয়নি। ব্যস্ত হয়ে আছে সবাই। তার মধ্যে হাসি-ঠাট্টা চলছে। নিজের ছোট ডিঙিতে করে মাইকেলকে জাহাজে তুলে দিতে এলো স্টিফেন। দাঁড় বেয়ে সহজেই চলে এলো জাহাজের পাশে।

​মাঝিরা অনেকেই সানলককে চেনে। চেঁচিয়ে বিদায় দিল তারা ওকে।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 3 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন