#The_Bondman
#সংগ্রহ_সেবা_প্রকাশনী
#লেখক_Sir_Thomas_Henry_Hall_Caine
#পর্ব_০৪
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগল কোথায় চলেছে ও আইসল্যান্ডগামী জাহাজে চেপে। মাঝিদের নিজেদের মধ্যে আলোচনা হলো, সানলক যাচ্ছে কোথায়, কেন যাচ্ছে। আবার নিজেরাই জবাব দিল, যাবেই তো, কাঁকড়া তার গর্ত ছেড়ে না বেরলে মোটা হতে পারে না কোনদিন।
জোর বাতাস ছেড়েছে আজকে। ফুলে উঠছে সমুদ্র। পুবদিকে ঘন কালো এক ফালি মেঘ দেখা যাচ্ছে আকাশের কোণে। ঝড় আসতে পারে।
মাইকেলকে জাহাজে উঠিয়ে খোলা সাগরের দিকে নৌকো নিয়ে এগিয়ে চলল স্টিফেন। জাহাজটা নোঙর তুলে ওর নৌকোর পেছন পেছন আসতে লাগল। নৌকো আর আইসল্যান্ডগামী জাহাজ, দুটোই আয়ার পয়েন্টের দিকে চলেছে। আয়ার পয়েন্টে আলো জ্বলছে। জায়গাটা বিপজ্জনক ডুবো পাহাড়ে ভর্তি। ওখানে একটা লাইট হাউস তৈরির কথা সরকারের, অনেকদিন আগে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, কিন্তু আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি। মাঝে মাঝেই ওখানে জাহাজ ডুবি হয় বলে প্রতিদিন সন্ধের আগে বাঁধা এক লোক আয়ার পয়েন্টের আগুনটা জ্বেলে দিয়ে যায়।
কাত হয়ে দাঁড়ানো একটা কাঠের টুকরোর মাথায় কাঁচের খাঁচায় জ্বলছে সে আগুন, দুলছে বাতাসে। স্টিফেন জাহাজের আগে নৌকো নিয়ে আসছিল, আয়ার পয়েন্টের কাছে এসে থেমে গেল। আর সে যাবে না। বৈঠা পাটাতনে তুলে চুপ করে বসে থাকল, তাকিয়ে থাকল মাইকেলের জাহাজের দিকে। নৌকোর পাশ দিয়ে খোলা সমুদ্রের দিকে চলল জাহাজ। ডুবো পাহাড়গুলোকে এড়িয়ে একসময় চলে গেল দূরে। আস্তে আস্তে ছোট হয়ে এলো জাহাজটা। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল স্টিফেন।
ফোঁশ করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ওর বুক চিরে। আর কি দেখা হবে ছেলের সঙ্গে? চাপ চাপ কান্না ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে বুকের ভেতর থেকে। মনটা কাঁদছে, বলছে, না, আর দেখা হবে না সানলকের সঙ্গে। নিজেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছে স্টিফেন, মনে মনে বলছে, তোর মতো নরাধম পিশাচ যে ওর মতো ছেলের বাবা হয়েছে, বাবা ডাক শুনেছে, ক্ষণিকের জন্যে হলেও সান্নিধ্য পেয়েছে সেটাই তো ঈশ্বরের অনেক দয়া। সেই দয়া পাবার মতো কোন কাজ তো জীবনে স্টিফেন করেনি কোনদিন!
কিন্তু মন তবু মানে না। কষ্ট! প্রচণ্ড কষ্ট! আজকে সত্যিই ফাঁকা হয়ে গেছে ওর বুকের ভেতরটা। হৃদয়টা যেন টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। রক্ত ঝরছে বুকের গভীর থেকে। আপনমনে বিড়বিড় করে বলে উঠল স্টিফেন, 'ও আমারই ছেলে! আমার! শুধু আমার! আমি পাপী, আমি অমানুষ, আমি নরাধম, কিন্তু ও আমার ছেলে। এত দূরে চলে গেছে ও? এত দূরে? আমার দেয়া টাকা নিতেও বাধল ওর?' আকাশের দিকে হাত মুঠো করে ঝাঁকাল স্টিফেন।
'ঈশ্বর, নিষ্ঠুর দয়ামায়াহীন তুমি, নাহলে ওকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে না।'
অনেকক্ষণ স্বপ্নাচ্ছন্নর মতো বিবশ হয়ে নৌকোয় বসে থাকল স্টিফেন। মনের মাঝে হাজারো স্মৃতি ঘুরে ঘুরে আসছে। একবার মনে পড়ছে আইসল্যান্ডে তার ফেলে আসা দিনগুলোর কথা, আবার মনে আসছে ম্যান দ্বীপের স্মৃতি। ও জানে না আইসল্যান্ডে ফেলে আসা জীবনে ওর সর্বনাশ বেশি হয়েছে নাকি ম্যান দ্বীপের জীবনে, কেবল এটুকু বোঝে পুরোটা সময় অপচয় করেছে ও, নষ্ট করে দিয়েছে নিজের জীবনটা। শুধু নিজের নয়, কাছের মানুষদের জীবনে অভিশাপ নামিয়ে এনেছে ও। প্রথম জীবনে র্যাচেলকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মস্ত ভুল করেছিল। পরবর্তী জীবনে আজকে আবারও একটা মস্ত ভুল করল সানলককে দূরে চলে যেতে দিয়ে। একমাত্র সানলকের কাছ থেকেই ভালবাসা পাবার দাবী করতে পারত ও, কিন্তু নিজেই ও সে রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে।
তাহলে কি নিয়ে বাঁচবে সে? দুঃখে হাসল স্টিফেন। তার আর নিজের বলে কি রইল? মনটা কেমন যেন করছে। অনেকদিন পর শুষ্ক হৃদয়ে তার ভালবাসা জেগেছিল সানলককে কাছে পেয়ে। যতক্ষণ সানলক কাছে ছিল আর কিছু ভাবেনি ও, কোন পাপ চিন্তা মাথায় ঠাঁই দেয়নি। তখন একটা উদ্দেশ্য ছিল, আশা ছিল, ভালবাসা ছিল। কিন্তু এখন?
উদ্দেশ্যহীন জীবন। একচিলতে সুখ নেই জীবনে। কেউ তাকে ভালবাসে না, কেউ তাকে চায় না, কারও কোন দাবী নেই তার প্রতি, কারও কোন অধিকার নেই। তারও কোন অধিকার নেই কারও ওপর। নিঃসঙ্গ, একাকী, নিঃস্ব, ব্যর্থ একজন লোক সে।
কি যেন বলে গেল মাইকেল? সানলক? আমার জীবন এখন ওর। জবাব দিতে হবে সৎ হয়ে না চললে। আপন মনে মাথা নাড়ল স্টিফেন। কারও কোন উপকার হবে না ও সৎ হয়ে চললে। সৎ হতে চাইলে জীবনটা খামোকা আরও কষ্টে কাটবে ওর। সব ভুল কথা বলেছে সানলক। সব বাজে কথা। ভুলভাল আজেবাজে বাস্তব বিবর্জিত কথা সানলক বলতেই পারে, অ্যাডামের কাছে স্বচ্ছলতার মাঝে মানুষ হয়েছে ও, শিক্ষা পেয়েছে, কিন্তু কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়নি ওকে। সানলক আসলে তার ছেলে নয়, সানলক আসলে অ্যাডামের ছেলে। অ্যাডাম ওকে নিজের মতো করে গড়েছেন। তাঁর আশ্রয়ে, তাঁর সংস্পর্শে, তাঁর আদর্শে যে ছেলে মানুষ হয়েছে সে তো সৎ হবেই। সততার বুলি তার মুখে বেমানান শোনায় না। রাগ হলো স্টিফেনের। যা ইচ্ছে করবে সে, কারও তাতে বাধা দেয়ার অধিকার নেই। উপদেশ দিয়ে গেছে ছোকরা নিজের বাপকে!
'ধরে নাও এখন থেকে তোমার জীবন আর তোমার নয়। ওটা আমার। আমি যেভাবে বলব সেভাবে চলবে এখন থেকে। কোন অন্যায় করবে না, অসৎ পথে যাবে না, ভাল মানুষের মতো জীবন কাটাবে।'
মাথা নাড়ল স্টিফেন। বিড়বিড় করে বলল,
'দুইশো পাউন্ডে আমার জীবন কিনে নিয়েছে, বলে কি সানলক! সারাজীবনে লক্ষ পাউন্ডও তো আয় হতে পারে। মাত্র দুইশো পাউন্ড দিয়ে জীবনের বাকি দিনগুলো কিনতে চায়? আস্পর্ধা! তাও আবার আমারই টাকায় আমাকে কেনা!'
হা-হা করে হেসে উঠল স্টিফেন। কৌতুকের সঙ্গে ভাবল, আচ্ছা, ছোকরা পাগল-টাগল না তো?
এতক্ষণে একটু ভাল লাগল স্টিফেন ওরির। সানলক পাগল হোক বা ছাগল, ওর কথা শুনে পোষা ভেড়ার মতো জীবন কাটাবে না কিছুতেই। এটা ঠিক যে গত দশ বছরে দুশো পাউন্ডের বেশি ও জমাতে পারেনি, কিন্তু তার কারণ ভাগ্য ওর পক্ষে ছিল না। ভাল কোন সুযোগ আসেনি গত দশ বছরে। টানা খারাপ গেছে সময়টা। হাড্ডোভা পরিশ্রম করে রোজগার করতে হয়েছে প্রতিটি পেনি। তাই বলে সব সময়ই কপাল খারাপ থাকবে এটা হতে পারে না। কম খাটুনিতে বেশি আয় না থাকলে স্টিফেন ওরির মতো মানুষ চোরাকারবার করতে যেত না। শেষবারেই শুধু ঠক খেয়েছে ও। ম্যান দ্বীপ ছেড়ে চলে যাবার পর টের পেল ওকে ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু তখন আর ফেরার পথ ছিল না।
যা হয়েছে তা হয়েছে, এবার থেকে আরও সতর্ক থাকবে স্টিফেন ওরি। এখন থেকে এমন কাজে হাত দেবে যেকাজে অল্প সময়ে অল্প খাটুনিতে প্রচুর মুনাফা হয়। সানলক ফেরত দিয়ে গেছে দুশো ডলার, দিয়েছে ভালই হয়েছে। আপাতত কিছুদিন কোন কাজ না করলেও চলবে স্টিফেনের। কাজের যে অভাব আছে তা নয়। গায়ের জোর এখনও কমেনি স্টিফেনের, ইংল্যান্ড আর আয়ারল্যান্ডের অনেক চোরাকারবারীই স্টিফেনকে দলে টানতে পারলে খুশি হবে। ছোটবড় নানা কাজে তার ডাক পড়ে। অনেক পরিশ্রম তারা করিয়ে নিয়েছে স্টিফেন ওরিকে দিয়ে। খাটতে আপত্তি করেনি স্টিফেন, কারণ ছেলেকে আইসল্যান্ডের কলেজে পড়াবার ইচ্ছে ছিল তার। একটা পেনির জন্য সে সাত ফুট মাটিও খুঁড়েছে। চেহারা কঠোর হয়ে গেল স্টিফেনের। আর নয়, এবার নিজেই নিজের কাজ বেছে নেবে ও, নিজেই লোকজন রেখে চোরাকারবার শুরু করবে। দশ বছর অন্যের হয়ে কাজ করেছে ও, চোরাকারবারের আদ্যোপান্ত জানতে বাকি নেই। পরের চাকর হয়ে খাটতে আর রাজি নয় ও। না, আর নয় ওসব। তক্কে তক্কে থাকবে স্টিফেন, বড় দান বুঝলে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
সমুদ্রের ওপর দিয়ে জোর হাওয়া বইছে অনেকক্ষণ। পুবের সেই এক ফালি কালো মেঘ যেন গোটা আকাশ গিলে খেতে এগিয়ে আসছে একটা মস্ত দানবের মতো। সানলকের জাহাজ পাশ কাটানোর সময় স্টিফেনের নৌকো যেখানে ছিল প্রায় সেখানেই আছে এখনও। তাই থাকার কথা। স্টিফেন দাঁড় বাইছে না, নৌকোয় পালও তোলেনি। ঢেউয়ের দোলায় দোলায় সামান্য জায়গা বদল করেছে নৌকো, কিন্তু ওই তো দেখা যাচ্ছে আয়ার পয়েন্টের আলো, জ্বলছে টিপ টিপ করে। জ্বলুক, জ্বলার দরকার আছে। ঝড়ের সময় ওই আলোর নিচের ডুবো পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ডুবে যেত আগে জাহাজগুলো। সানলকের জাহাজ বিপজ্জনক এই জায়গা ছাড়িয়ে খোলা সমুদ্রে চলে গেছে। কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করল স্টিফেন। আয়ার পয়েন্টের আলোর ওপর ভরসা করা যায় না। কাঠের খাঁচার ভেতরে জ্বলছে আগুন। চারপাশ কাঁচ দিয়ে ঘেরা। কাঁচ যদি ভেঙে যায় তো আগুন নিভে যাবে দমকা হাওয়ায়। রাতের এই নিকষ কালো আঁধারে জাহাজগুলো যদি ওই ভয়ঙ্কর ডুবো পাহাড়ে আছড়ে না পড়ে তো সেটা একটা বিস্ময়ের ব্যাপার হবে। চুরমার হয়ে ডুবে যাবে জাহাজ। কত লোক মরবে তার কোন ঠিক নেই। আবার বাঁচবেও অনেকে, নৌকোয় করে তীরে গিয়ে উঠবে বা সাঁতার কেটে।
মুখ নিচু করে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে ছিল স্টিফেন, হঠাৎ খোদ শয়তান ভর করল ওর ওপর। মুখ তুলে তাকাল ও, দেখতে পেল বেশ দূরে সাগরের কালো বুকে অনেকগুলো সোনালী আলোর ঝিকিমিকি। একটা জাহাজ। এদিকেই আসছে। বেশ দ্রুত আসছে। জাহাজের পালে ঝড়ো হাওয়া ঝাপটা মেরেছে। সেই হাওয়ার ধাওয়া খেয়ে যেন উড়ে আসছে জাহাজ। পাল নামিয়ে নিয়ে গতি কমাবার কোন কারণ দেখছে না ক্যাপ্টেন। সামনে তার আয়ার পয়েন্টের আলো। কোথায় ডুবো পাহাড় আছে সেটা ওই আলোই চোখে আঙুল দিয়ে স্পষ্ট দেখিয়ে দিচ্ছে। ওই আলোর কাছ থেকে দূরে থাকলেই জাহাজ নিরাপদ।
বজ্রবিদ্যুৎ যেমন চকিতে ঝলসে উঠেই নিভে যায় ঠিক তেমনি দ্রুত একটা চিন্তা খেলে গেল স্টিফেনের মাথায়। বড় একটা দান খুঁজছিল না ও? ওই তো হাতের নাগালে দেখা যাচ্ছে বিরাট লাভ করার মস্ত একটা সুযোগ। ওইখানে কালো সাগরের বুকে দ্রুতগতির জাহাজ, আর এই তো সামনেই আয়ার পয়েন্টের খুদে আলো। কাছেই ডুবো পাহাড়, চোখা চোখা ক্ষুরধার চূড়ো উঁচিয়ে সাগরের তলায় মুখ লুকিয়ে অপেক্ষা করছে।
আয়ার পয়েন্টের আলো যদি নিভে যায়?
আর বড়জোর আধঘণ্টা, তারপরেই জাহাজটা এসে পড়বে আয়ার পয়েন্টে। এসে ডুবো পাহাড়ে বাড়ি খাবে। টুকরো টুকরো হয়ে যাবে কয়েক সেকেন্ডে। অনেক লোক মারা যাবে। অনেকে বেঁচেও যাবে। তীর খুব দূরে নয়। ডুবোপাহাড়ের ফাঁকগুলো দিয়ে কেউ যদি সাঁতরে বেরুতে পারে তাহলে সহজেই তীরে উঠতে পারবে।
কেউ যদি পারে তো ঠেকাচ্ছে কে তাকে! সাঁতার দিয়ে তীরে উঠে বেঁচে থাকুক আরও একশো বছর, তাতে স্টিফেন ওরির কোন আপত্তি নেই। খুশিই হবে সে। নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু কামনা করতে যাবে কেন, ওরা তো আর শত্রু নয়। ওরা মরলে কোন লাভ নেই স্টিফেনের। স্টিফেনের লাভ ওদের মালপত্র হাতিয়ে নিতে পারলে।
জাহাজটা স্টিফেনের হাতের নাগালের মধ্যে এসে ডুবলেই স্টিফেন খুশি। জাহাজে দামী অনেক কিছুই থাকে। এমন অনেক কাঠের বা স্টিলের বাক্স থাকে যেগুলোতে সাগরের পানি ঢুকতে পারে না। জাহাজডুবি হলে ওগুলো পানিতে ভাসে। ভাসতে ভাসতে চলে যায় সাগরের গভীরে, কখনও বা ঢেউয়ের ধাক্কায় পৌঁছে যায় তীরে। সমুদ্রের আইন অনুযায়ী যে ওগুলো পাবে ওগুলো তারই। পরিশ্রমের কাজ নয়, ভাগ্য লাগে শুধু। পুরোটাই মুনাফা।
তবে এই জাহাজটা ডোবার কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। সানলকের জাহাজ একটু আগেই আয়ার পয়েন্টের আলো পাশ কাটিয়ে চলে গেছে খোলা সাগরে। এই জাহাজটাও তেমনি করে ওই আলোকে পাশ কাটিয়ে নিরাপদে চলে যাবে স্টিফেনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। আয়ার পয়েন্টের আলোটাই যত নষ্টের গোড়া। ওটা যদি না থাকে...
জাহাজটাকে চলে যেতে দেয়া যায় না। বুদ্ধিটা যখন এলোই এই সুযোগ হেলায় হারানো ঠিক হবে না। সারাজীবনেও এমন সুযোগ মানুষের জীবনে আসে না। হয়তো আজকে এক রাতেই একলক্ষ পাউন্ড আয় হয়ে যাবে স্টিফেনের। খোদ শয়তান তাকে পথ দেখিয়েছে। এখন চুপ করে বসে থাকার সময় নয়।দাঁড় বাইতে লাগল স্টিফেন। সানলকের চিন্তা আর মাথায় নেই তার।
কয়েক মিনিটের মধ্যে পছন্দমতো জায়গায় পৌঁছে গেল। ডুবো পাহাড়ের ভেতর দিয়ে সরু এক চিলতে গভীর লেগুন। আগেই এই জায়গাটা চিনত স্টিফেন। এদিকের সাগরের প্রায় সবই চেনে ও। মাঝে বেশ কয়েক বছর ম্যান দ্বীপে না থাকলেও কিছুই ভোলেনি। লিজা যখন বেঁচে ছিল তখন দজ্জাল ওই মহিলার গালাগালি আর দূরব্যবহারের ভয়ে অবসর সময়টা দিন নেই রাত নেই এসব জায়গাতেই ঘুরে বেড়াত ও।
নৌকো ভিড়িয়ে একটা ডুবো পাহাড়ের চূড়ায় নেমে দাঁড়াল স্টিফেন। আয়ার পয়েন্টের আগুন ওর কাছ মাত্র দশ ফিট দূরে। কোমর সমান জলে দাঁড়িয়ে আছে স্টিফেন। পাহাড়ের ওপর পা ফেলে ফেলে এই সমান জল ডিঙিয়েই ওকে যেতে হবে আগুনটার কাছে। গভীরতা কম হলেও তীব্র স্রোত আছে এখানে। পানি বরফশীতল। যেতে হবে সাবধানে। পা ফস্কালেই বিপদ। জায়গা এখানে এতই কম যে সাঁতার কাটা যাবে না। চারপাশের উঁচু উঁচু পাথরগুলোও বাতাস আর ঢেউয়ের কারণে মসৃণ, ওগুলো ধরে ওপরে ওঠা সম্ভব নয়। পা থেকে জুতো খুলে ফেলল স্টিফেন। ধারাল পাথরে পা কাটবে সে ভয় নেই, পায়ে পুরু ডাবল মোজা পরে আছে সে।
নৌকো থেকে দাঁড়টা নামিয়ে নিল ও। সামনে বাড়তে শুরু করল ধীরেসুস্থে। দাঁড়টা একবার ডানে একবার বাঁয়ের পাথরে ঠেকনা দিয়ে এগিয়ে চলল। কয়েক মিনিট লাগল আলোর নিচে পৌঁছতে। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে। ঠিক আলোর নিচে দাঁড়িয়ে আছে সে। এখন যদি কেউ জাহাজ থেকে এদিকে তাকায়? তাকালেই দেখতে পাবে যে একজন লোক আলোর নিচে দাঁড়িয়ে আছে। আলোটা পেছনে, লোকটার চেহারা অবশ্য দেখতে পাবে না যাত্রী। তবে এটা বুঝতে পারবে যে আলো নিভে যাওয়া কোন দুর্ঘটনা নয়। বুঝে যাবে অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আলোটা কেউ নিভিয়ে দিয়েছে। সেই লোক যদি জাহাজ ডুবিতে মারা না যায় তো বিপদ। সরকারী তদন্তের সময় সাক্ষ্য দেবে লোকটা। গভর্নর অ্যাডাম ভাল মানুষ, কিন্তু কর্তব্যে অবিচল। দ্বীপে তোলপাড় তুলে ছাড়বেন তিনি অপরাধীকে ধরার জন্যে।
ভয় একটু লাগলেও ভয়টা কিছুক্ষণের মধ্যেই মিলিয়ে গেল স্টিফেনের। সতর্ক হয়ে উঠল ও। দাঁড়ানোর কোন দরকার নেই, দাঁড়ানো নিরাপদ নয়। দাঁড়ের এক গুঁতোয় খাঁচার কাঁচ ভেঙে দিল স্টিফেন। জড়ো হাওয়ার এক ঝাপটায় দপ করে নিভে গেল আগুন। আয়ার পয়েন্ট এখন অন্ধকার! স্টিফেনের সঙ্গে তাল দিতেই যেন আরও ফুঁসে উঠল সাগর।
কুচকুচে কালো কালি গোলা নিকষ অন্ধকার। দূর থেকে জাহাজের যাত্রী আর মাল্লাদের হৈ-চৈ শুনতে পেল ও। শত কণ্ঠের মিলিত উত্তেজিত আলোচনা। কেন আলো নিভে গেল! কি হবে এখন! জাহাজ ডুবে যাবে না তো! ডুবো পাহাড় পাশ কাটানো যাবে?
যতটা না শুনতে পাচ্ছে স্টিফেন আন্দাজ করে নিচ্ছে তার চেয়ে বেশি। ভীত শঙ্কিত বিপদাপন্ন যাত্রীদের কথা মনে এলেই বিড়বিড় করে বলছে,
'আমি কি করব, তোমাদের মালপত্র আমার দরকার। ওগুলো পেলে প্রত্যেকটা বাক্স থেকে কিছু না কিছু আয় হবে আমার।'
কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে আঁধারে চোখ সইয়ে নিল স্টিফেন। এখন আবছা ভাবে চারপাশের পাথরগুলো দেখতে পাচ্ছে। এবার সাবধানে ফিরতে লাগল নৌকোয়। নিরাপদেই ফিরল। নৌকোয় উঠে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। এভাবেই অপেক্ষা করতে হবে ওকে। জাহাজটা আসবে, ডুবো পাহাড়ে বাড়ি খেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তারপর ডুবে যাবে। ডুবে যাবার পর সক্রিয় হয়ে উঠবে ও। এখন শুধু নৌকোর খোলের ওপর মাথা তুলে দু'একবার জাহাজের দূরত্ব দেখে নেয়া ছাড়া আর কোন কাজ নেই। জাহাজ অন্য পথ ধরতে পারত, কিন্তু এখন সেটা সহজ হবে না। পালে লেগেছে ঝড়ের বাতাস, আসতে ওটাকে হবেই। এদিক দিয়েই আসতে হবে। পাল নামিয়ে অন্য দিকে আর যেতে পারবে না। বড়জোর দশ মিনিট, তারপরই ডুবো পাহাড়ে বাড়ি খেয়ে ভেঙে চুরমার হবে জাহাজ।
একটু পর পর মাথা তুলছে স্টিফেন। জাহাজটা আসছে। দুর্দান্ত বেগে ছুটে আসছে ঝড়ের হাওয়ায় পাল তুলে। আর খানিকক্ষণ মাত্র।
এবার আর নৌকোর ওপর মাথা তোলা যাবে না। বড় বেশি কাছে চলে এসেছে জাহাজ। কোন যাত্রী দেখে ফেললে বিপদ হতে পারে। সমুদ্রের খানিকটা জায়গা আলোকিত হয়ে গেছে জাহাজের আলোয়। সেই আলোয় এদিকটাও দেখা যাবে।
কিন্তু, আশ্চর্য হয়ে গেল স্টিফেন, তার নৌকোয় কোন আলো পড়ছে না! স্টিফেনের অন্ধকারই প্রয়োজন। কিন্তু তার প্রয়োজন মতো আজকে আলো হাওয়া নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে নাকি! না, তা নয়, চারপাশের উঁচু পাথরগুলোর কারণে আলো আসছে না এদিকে। সাগরের দিক থেকে আলো আসতে পারত, কিন্তু এই একটু আগে সেখানে মাথা তুলেছে একটা ডুবো পাহাড়ের চূড়ো।
চমকে গেল স্টিফেন। তার মানে ভাটা শুরু হয়ে গেছে! পানি নেমে যাচ্ছে নিচে, সেই সঙ্গে নৌকোটাও নামছে। জেগে উঠছে পাহাড় চূড়ো। তাহলে! নিজেকে পাগল পাগল লাগল স্টিফেনের। আবার জোয়ার না আসা পর্যন্ত এই লেগুন থেকে বেরুতে পারবে না ও। আঁকাবাঁকা যে পথে এখানে ঢুকেছে সেদিকে তাকাতেই মনটা দমে গেল। পানি নেই সেখানে আর। রুক্ষ, ধারাল পাথরের এবড়োখেবড়ো দেয়াল পড়ে আছে।
চিন্তায় ডুবে জাহাজের কথা প্রায় ভুলেই গেল স্টিফেন।
নিভে গেছে আয়ার পয়েন্টের আলো। ওদিকে ডুবো পাহাড়ের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে জাহাজ। শেষ মুহূর্তে পাল নামিয়ে গতিপথ পাল্টানোর চেষ্টা করল নাবিকরা। কোন কাজ হলো না তাতে। জাহাজের মুখ একটু ঘুরল বটে, তবে সেদিকেও করাল থাবা বিস্তার করে আছে ডুবো পাহাড়। সে পাহাড় অপেক্ষাকৃত নিচু, ভাটার সময়ও পানির ওপর মুখ তোলে না। আসছে জাহাজ। আরও কাছে চলে আসছে। বড় একটা জাহাজ। এসে পড়েছে!
বিকট একটা আওয়াজ রাতের প্রশান্তি ভেঙে দিল। চুরমার হচ্ছে জাহাজটা। কাঠ আর লোহা ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়ায় প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে শত শত মৃত্যু পথযাত্রী মানুষের হাহাকার আহাজারি।
এতক্ষণে খুশি হয়ে উঠল স্টিফেন, এবার ডুবে যাবে জাহাজ। ডুবে যাক বা পাথরে আটকে থাকুক, কিছু যায় আসে না। মালপত্র ঠিকই ভেসে থাকবে সাগরে। তখনই স্টিফেনের সুযোগ। নৌকোয় বাক্স-পেটেরা যা পায় তুলে নেবে ও। কোন একটা বাক্সে হয়তো পেয়ে যাবে প্রচুর টাকা।
কিন্তু ঝামেলা বাঁধাল এই নৌকো। ভাটার কারণে পানি নেমে যাওয়ায় লেগুন থেকে নৌকো বের করার কোন উপায় নেই। আবার জোয়ার আসবে ছয়-সাত ঘণ্টা পর, ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু তখন আর মালপত্র পাবার আশা থাকবে না। অন্য জেলেরা কি বসে থাকবে? জাহাজ ডুবি হয়েছে টের পেলেই নৌকো নিয়ে বেরিয়ে পড়বে সবাই যাত্রীদের উদ্ধার করতে। মালপত্রও নৌকোয় তুলে নেবে তখন। যেগুলো তুলবে না সেগুলো ভেসে ভেসে চলে যাবে দূর সাগরে। স্টিফেনের কোন লাভই হলো না এত পরিশ্রম করে।
রাগে স্টিফেনের গা জ্বলতে লাগল। এত পরিশ্রম আর বুদ্ধি করে জাহাজটা ডোবাল সে, আর লাভ করে নেবে অন্য জেলেরা? চারপাশে অনেক আওয়াজ। তীর থেকে নৌকো নিয়ে কি রওনা হয়ে গেছে মাঝিরা? পাথরের ওপর দিয়ে তাকাল স্টিফেন, ঐ যে তীরের কাছে দেখা যাচ্ছে আলোর সারি। দু'মাইল দূরেই ডাঙা। জাহাজ ভাঙার আওয়াজ ওই পর্যন্ত নিশ্চয়ই গেছে। মাঝিরা আওয়াজ শুনে এখন আসছে যাত্রীদের উদ্ধার করতে। তবে তাদের আসল উদ্দেশ্যও স্টিফেনের মতোই, মালামালের দখল নেয়া।
নৌকো এসে যাচ্ছে। স্টিফেন আটকে আছে এই প্রায়-শুকনো লেগুনের মধ্যে। মাথাটা গরম হয়ে উঠছে স্টিফেনের। সব অন্য লোক নিয়ে নেবে! অসম্ভব! অসম্ভব! একটা কিছু করতে হবে। বেরুতে হবে এখান থেকে। চারপাশের পাথরগুলো ভাল মতো দেখে নিল স্টিফেন। দেখে ওগুলোকে পাহাড়ের চূড়ো মনে হলেও কোন কোনটা শুধুই বড় পাথরের খণ্ড। ওগুলো বসে আছে ডুবো পাহাড় চূড়োর মাথায়। কিন্তু তাতে কি লাভ! একেকটা পাথরের ওজন কমপক্ষে একটন। নড়ানো যাবে না ওগুলোকে। তাই বলে হাল ছেড়ে বসে থাকবে স্টিফেন? কক্ষনো না।
অপেক্ষাকৃত ছোট একটা পাথর বেছে নিয়ে গায়ের জোরে ঠেলতে লাগল স্টিফেন। যৌবনে প্রচণ্ড শক্তি ছিল ওর গায়ে। এখন বয়স বেড়েছে, জোর কমে গেছে, কিন্তু এখনও অন্য অনেকের তুলনায় অনেক বেশি আছে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে সাময়িক এই উত্তেজনা। উন্মাদের মতো পাথরটা ঠেলতে লাগল ও।
ধক করে উঠল ওর বুকের ভেতর। একটু যেন নড়ে উঠেছে পাথরটা! আরও জোরে ঠেলা দিল স্টিফেন। সাগরের দিকে একটু কাত হচ্ছে পাথর, পরক্ষণেই আবার বসে পড়ছে নিজের জায়গায়। নতুন উদ্যমে ঠেলতে লাগল স্টিফেন।
কাত হচ্ছে পাথর। আরও কাত। আরও। আর একটু ঠেলতে পারলেই সাগরের বুকে পড়ে যাবে। আরও জোরে ঠেলতে হবে। ফোঁশ ফোঁশ করে শ্বাস পড়ছে স্টিফেনের। হাপরের মতো ওঠানামা করছে বুক। অতিরিক্ত পরিশ্রমে মাথা ঘুরছে। শক্তি যেন শেষ হয়ে আসছে। গায়ের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে পাথরে ঠেলা দিল স্টিফেন। অনেকটা কাত হয়ে গেল পাথর। এবার সাগরে পড়বে। স্টিফেনের চোখে আশার আলো জ্বলে উঠল। পরক্ষণেই শঙ্কার ছাপ পড়ল চোখে। হয়নি! পাথরটা ফিরে আসছে নিজের জায়গায়। তারপর এদিকে কাত হতে শুরু করল। আরও কাত হচ্ছে। আরও!
লাফ দিয়ে সরে যেতে চাইল স্টিফেন, কিন্তু পারল না। ভারসাম্য হারিয়ে স্টিফেনের গায়ের ওপর পড়ল মস্ত পাথর। স্টিফেনকে চাপা দিয়ে নৌকোর ওপর পড়ে স্থির হলো। স্টিফেনের দেহের এক পাশ পুরোপুরি চাপা পড়েছে পাথরে। প্রচণ্ড ব্যথা! আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো স্টিফেনের গলা চিরে। ওর প্রলম্বিত আর্তনাদ রাতের ঝড়ো বাতাসকে চিরে দিল। পাথরের নিচ থেকে শরীর বের করে আনতে টানাটানি শুরু করল ও। একচুল নড়ল না মস্ত পাথরের খণ্ড।
বিধ্বস্ত জাহাজের যাত্রী আর নাবিকরা বিপদ বুঝে আগেই একটা লং বোটে নেমে গেছে। তাদের কানে গেল স্টিফেনের করুণ আর্তনাদ। মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে যেন কেউ! বুকের মাঝে আতঙ্ক জাগিয়ে তোলে সেই চিৎকার।
এত বিপদের মাঝেও লং বোটের মুখ তীরের দিক থেকে ঘুরে গেল। শৈলশিরার দিকে এগোল লং বোট। পাথরটা পড়ে যাওয়ায় সাগরের দিক থেকে লেগুনটা দেখা যায়। লং বোট এগিয়ে আসতেই যাত্রীরা দেখতে পেল এক মর্মান্তিক দৃশ্য। ডুবো পাহাড়ের মাঝখানে আটকা পড়েছে একটা নৌকো। সেই নৌকোর আরোহীই আর্তচিৎকার করছে। নৌকোটার ওপর পড়ে আছে সে বেকায়দা ভঙ্গিতে। তার ওপর পড়ে আছে বিশাল একটা পাথরের খণ্ড।
দু'তিনজন মিলে ওই পাথর সরানো সম্ভব নয়। অন্তত দশজন লাগবে পাথর সরিয়ে আহত লোকটাকে উদ্ধার করতে। লোক আছে। কিন্তু নৌকোয় দু'জন লোক দাঁড়াবার মতো জায়গাও নেই। প্রায় পুরোটা নৌকো জুড়ে আছে পাথরটা।
কোনরকমে হয়তো একজন লোক নৌকোয় দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু তাতে কি লাভ! একজনের সাধ্য নেই ওই পাথর তোলে। নাকি আছে? কেউ যদি পাথরটা না সরায় তাহলে এখানে এই নির্জন শৈলশিরায় পাথর চাপা পড়েই মৃত্যু লেখা আছে আহত মাঝির।
কেউ কি সাহায্য করতে পারবে না?
গায়ের কোট খুলে লং বোট থেকে লাফ দিয়ে নামল এক যুবক। স্টিফেনের নৌকোয় দাঁড়িয়ে দু'হাতে ধরল পাথরটা দুপাশ থেকে। চুপ হয়ে গেল লং বোটের যাত্রীরা। থমকে গেল সময়। লং বোটে অন্তত পঞ্চাশ জন যাত্রী। প্রত্যেকের চোখ বড় বড় হয়ে উঠল। স্তম্ভিত হয়ে ওরা দেখল অবলীলায় পাথরটা তুলে ফেলেছে যুবক। সাগরে পাথরটা ছুঁড়ে ফেলে দিল সে। যারা চেনে তারা ওকে জেসন নামে চেনে। আইসল্যান্ড থেকে ম্যান দ্বীপে হাজির হয়েছে জেসন মায়ের শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে।
চলবে....