ফন্ট সাইজ:
থিম:
দ্য বন্ডম্যান

পর্ব 5

লেখক: অলকানন্দা আমানি

#The_Bondman
#সংগ্রহ_সেবা_প্রকাশনী
#লেখক_Sir_Thomas_Henry_Hall_Caine
#পর্ব_০৫

পাঁজাকোলা করে মৃত্যুপথযাত্রী স্টিফেনকে লং বোটে তুলল জেসন। ততক্ষণে সমুদ্র তীরের গ্রাম থেকে জেলেদের দু'একটা ডিঙি নৌকাও চলে এসেছে। জেলেরা সবাই আহত লোকটাকে চিনল। স্টিফেন ওরি ওর নাম। পোর্ট লা ভিউলিনে থাকে। কুখ্যাত চোরাকারবারী। এত রাতে নিশ্চয়ই কোন খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে বেরিয়েছিল, কিন্তু কি সেই উদ্দেশ্য তা আঁচ করতে পারল না কেউ। আয়ার পয়েন্টে খাঁচার কাঁচ ভেঙে আলো নিভে গেছে, কিন্তু আলোটা যে স্টিফেনই নিভিয়েছে তা ভাবল না কেউ। কি লাভ তার আগুন নিভিয়ে?

​জেলেরা গ্রামের সরল সাদাসিধে লোক, সহজ যুক্তি দিয়ে সব কিছু বিচার করে। যে-কাজের পরিণতি ভাল সেটা ভাল কাজ আর যে কাজের পরিণতি খারাপ সেটা খারাপ কাজ। ভাল কাজ ঈশ্বরের আদেশে হয় আর খারাপ কাজ শয়তান করায়। সহজ যুক্তি। শয়তানই আয়ার পয়েন্টের আগুন নিভিয়েছে, জাহাজ ডুবিয়েছে, স্টিফেন ওরিকেও ওই শয়তানই পাথর চাপা দিয়ে মেরে ফেলার যোগাড় করেছিল। ওস্তাদের মার শেষ রাতে। এবার ময়দানে নামলেন স্বয়ং ঈশ্বর। আলো ভেঙেছে, জাহাজ ডুবিয়েছে এসব তত বড় মারাত্মক অপরাধ নয়, কিন্তু শয়তান মানুষ খুন করবে এটা তিনি আর হতে দিলেন না। লং বোট থেকে এক বিদেশি যুবককে নামিয়ে দিলেন তিনি স্টিফেনের নৌকোয়, তাকে শক্তি দিলেন একা অত বড় পাথরটা তুলে সাগরে ফেলে দেয়ার। খুব সহজেই সব সমস্যার সমাধান করে ফেলল জেলেরা।

​ঈশ্বরের আদেশে স্টিফেন পাথরের তলা থেকে উদ্ধার পেয়েছে।
​ডুবে যাওয়া জাহাজের আরোহীদের গভর্নর অ্যাডামের খামার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। এখানে আপাতত তাদের থাকা-খাওয়া-শোওয়ার ব্যবস্থা হবে। গভর্নর অ্যাডাম এখন র‍্যামজে শহরে সরকারী বাসভবনে, কিন্তু তাঁর ছেলেরা খামারবাড়িতে আছে। হতভাগ্য লোকগুলোকে তারা আশ্রয় দেবে এই বিশ্বাস গ্রামের জেলেদের আছে।

​সবার সঙ্গে জেসনও লেণ্ডর খামার বাড়িতে গেল। অ্যাডামের মেয়ে গ্লেবা বেড়াতে এসেছিল খামারবাড়িতে, লোকমুখে জেসনের মহত্ব আর শক্তির কথা জেনে জেসনকে সে নিজে আপ্যায়ন করল।
​খাওয়া-দাওয়ার পর জাহাজ ডোবার প্রসঙ্গ ওঠায় গ্লেবাকে জিজ্ঞেস করল জেসন,

‘পাথরের তলায় যে চাপা পড়েছিল, ওই লোকটা কে?’

​‘আমি ওর সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না,’ বলল গ্লেবা।

‘তবে শুনেছি লোকটার বাড়ি নাকি আইসল্যান্ডে। বিশ বছর হলো ম্যান দ্বীপে এসেছে। এখানকার একটা মেয়েকে বিয়েও করেছিল, কিছুদিন আগে মারা গেছে ওর বউ।’

গাল দুটো লাল হয়ে গেল গ্লেবার।

‘ওদের একটা ছেলে আছে। আজকের জাহাজেই সে আইসল্যান্ডে গেছে কলেজে পড়তে।’

​আইসল্যান্ডে দেশ? বিশ বছর আগে ম্যান দ্বীপে এসেছিল? বিয়ে করেছে এখানে? ছেলে আছে একটা? ভ্রূ কুঁচকে গেল জেসনের। সবই তো ওর বাবা স্টিফেন ওরির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে!

‘নাম কি লোকটার?’ জানতে চাইল জেসন।

​‘আমি জানি না,’ বলল গ্লেবা লাজুক গলায়।

সানলকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও ওর বাবাকে কখনও দেখেনি গ্লেবা। শুনেছে লোক সে বিশেষ সুবিধার নয়, এছাড়া প্রায় আর কিছুই জানে না। অ্যাডাম কখনও সানলকের বাবার বিষয়ে মুখ খোলেন না। একটু চিন্তা করে গ্লেবা বলল,

‘ওর নাম জানি না, কিন্তু ওর ছেলের নাম সানলক।’

​সানলক কারও ডাক নাম মনে হয় না শুনলে। মনে হয় যেন বংশ পরিচয়। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল জেসন। এ তাহলে সেই লোক নয় যাকে খুঁজতে ম্যান দ্বীপে ছুটে এসেছে সে। ছেলের উপাধি যখন সানলক তখন বাবার উপাধিও সানলকই হবে। ওরির ছেলে কখনোই সানলক হবে না। বিরাট একটা ঝামেলা থেকে বাঁচা গেল। আহত লোকটা যদি স্টিফেন ওরি হতো তাহলে এখন তাকে বাঁচানোর কারণে অনুশোচনায় জ্বলতে হতো ওকে। মায়ের আদেশে স্টিফেন ওরিকে খতম করে দিতে এখানে এসেছে ও। মায়ের শেষ আদেশ। ভাগ্যিস লোকটা স্টিফেন ওরি নয়।
​ঠিক তখন এক জেলে এসে খবর দিল,

‘জ্ঞান ফিরে এসেছে স্টিফেন ওরির, দেখতে চাইছে কে ওকে বাঁচিয়েছে। তুমি একবার দেখতে যাবে?’

​ভেতরে ভেতরে চমকে গেল জেসন। সঙ্গে সঙ্গে কথার জবাব দিতে পারল না। স্টিফেন ওরি! ওর বাবা! স্টিফেন ওরিকে খুন করতেই ম্যান দ্বীপে এসেছে ও। মায়ের শেষ আদেশ মনে পড়ল জেসনের।

‘তোমার ওপর আমার শেষ আদেশ, হত্যা করবে তুমি স্টিফেনকে, ওর ছেলেকে। ওদের রক্ত ছাড়া আর কোন কিছুতেই তৃপ্তি হবে না আমার আত্মার। শুনেছ? হত্যা করবে তুমি ওদের। হত্যা! তুমি ভয় পাচ্ছ না তো, জেসন? পিছিয়ে যাচ্ছ না তো? ভুলে যেয়ো না ঈশ্বর সাক্ষী রেখে শপথ করেছ তুমি।’

​‘চলো যাই,’ শান্ত গলায় জেলেকে বলল জেসন।

মনে মনে ঠিক করে ফেলেছে এবার আর কোন ভুল করবে না। প্রথম সুযোগেই স্টিফেন ওরিকে সরিয়ে দিতে হবে দুনিয়া থেকে। মায়ের আদেশ পালন করতেই হবে।

​এখন অনেক রাত। স্টিফেন ওরির কাছে নিশ্চয়ই বেশি লোক নেই। যারা আছে তাদের কোন একটা অজুহাতে দু’এক মিনিটের জন্যে সরিয়ে দিতে হবে। দু’এক মিনিটই যথেষ্ট। ঘরের মধ্যে আহত স্টিফেনকে একা পেলে গলা টিপে মেরে ফেলতে বেশি সময় লাগবে না। এভাবে মারতে চায়নি জেসন। চেয়েছিল দ্বন্দ্বযুদ্ধে স্টিফেনকে আহ্বান করবে। হারিয়ে দেবে। প্রাণ কেড়ে নেবে বীরের মতো। সেই সুযোগ হচ্ছে না যখন তো কি আর করা।

​খুন করাটাই আসল কথা। কিভাবে করল সেটা কোন ব্যাপার নয়। মা বলেছিল খুন করতে, খুন করবে সে।

​জেসনের শিরায় শিরায় দ্রুত হয়ে উঠল রক্তের গতি। হাঁটার সময় অজান্তেই টলতে লাগল, যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে। চোখের সামনে ধোঁয়া ধোঁয়া ​লাগছে। বুকের ভেতরে অজানা একটা অনুভূতি। খুন করতে যাচ্ছে সে। নিজের বাবাকে খুন করতে যাচ্ছে। মায়ের আদেশ পালন করতে যাচ্ছে। আজ একই সঙ্গে মায়ের প্রতি কর্তব্য আর বাবার প্রতি চরম অন্যায় করতে যাচ্ছে সে। আহত, অসুস্থ স্টিফেন ওরি জানে না যাকে ডেকে আনছে সে তারই ছেলে, তাকেই হত্যার শপথ নিয়ে এখানে এসেছে!

​ঘরে পা দিয়ে নিম্পলক চোখে স্টিফেন ওরিকে দেখল জেসন। এই লোক তার বাবা? তার মায়ের স্বামী? একে বিয়ে করবে বলে ডেনমার্কের কাউন্টকে ফিরিয়ে দিয়েছিল মা? এই সেই স্টিফেন ওরি? এরই জন্যে নিজের মাথার চুল বিক্রি করে টাকা এনে দিয়েছিল মা? এই সেই লোক যে তার মাকে অপমান করেছে, অবহেলা করেছে? এই সে লোক যে মায়ের চুল বিক্রি করা টাকা দিয়ে মদ খেয়েছে, জুয়া খেলেছে? এই লোক তার মায়ের গায়ে হাত তুলেছে। আজকে স্টিফেন ওরিকে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।

​স্টিফেন ওরির মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়াল জেসন। চোখ বুজে পড়ে আছে স্টিফেন ওরি। মুখটা রক্তাক্ত। পাথরের চাপে করোটির একপাশ ভেতর দিকে দেবে গেছে। চামড়া-মাংস-চুল, ভাঙা হাড় আর রক্ত দলা পাকিয়ে আছে ওখানে।

​বিড়বিড় করে কি যেন বলছে স্টিফেন ওরি। কি বলছে শুনতে নিচু হলো জেসন। ঘরে আরও কয়েকজন আছে। জেলে ওরা। এখনই স্টিফেন ওরির গলা টিপে ধরা যাবে না। কোন একটা কৌশলে লোকগুলোকে সরাতে হবে। একবার স্টিফেন ওরিকে একা পেলে এক মিনিটের মধ্যে খতম করে দিতে পারবে ও। কিন্তু কি বকছে লোকটা? হয়তো নিজের জীবনের কোন গোপন কথা বলছে। প্রলাপ বকছে হয়তো। অতীত নিয়ে কথা বলছে। কৌতূহল বোধ করল জেসন। কি বলছে লোকটা? স্টিফেন ওরি যখন আইসল্যান্ড ছেড়ে আসে তখন একটা পশু ছিল। এখনও সে পশুই আছে না বদলে গেছে?

​জ্বর এসেছে স্টিফেনের। প্রলাপ বকছে অর্ধঅচেতন হয়ে।

‘র‌্যাচেল! র‌্যাচেল! র‌্যাচেল!’

​ঘোরের মধ্যে কাঁদছে স্টিফেন ওরি!

​‘র‌্যাচেল, ক্ষমা করে দাও আমাকে। আমি অনেক দুঃখ দিয়েছি তোমার মনে। ক্ষমা করে দাও, র‌্যাচেল। আমি আসছি। দেখা হবে না তোমার সঙ্গে? হবে? আমি দোজখে যাব যে! দেখা হবে না। র‌্যাচেল, আমাকে ক্ষমা করে দাও! আমি পাপী। তুমি অনেক ভাল। আমাকে ক্ষমা করবে না?’

​টপটপ করে জল গড়াচ্ছে স্টিফেনের গাল বেয়ে। বিড়বিড় করে ক্ষমা চাইছে র‌্যাচেলের কাছে। স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল জেসন। স্টিফেন ওরি আজকে কি বলছে এসব!

​‘তোমার ছেলের নাম কি রেখেছ, র‌্যাচেল? ও, সানলক? সানলক, না? ভাল। খুব ভাল নাম। বেঁচে থাকুক সানলক। তোমার ছেলে তোমার মতোই ভাল হবে, দেখো। তোমার মতোই মিষ্টি চেহারা, সেই সোনালী চুল, তেমনি কোমল, রেশমি...চুল বেচে দিয়েছিলে না তুমি আমার জন্যে? সানলকের মাথায় আবার ফিরে এসেছে সেই চুল। রোদ লাগলে ঠিক তেমনি ঝিকমিক করে সোনার মতো। র‌্যাচেল, আমাকে ক্ষমা করে দাও...’

​ভুল বকছে স্টিফেন ওরি। গভীর মনোযোগে শুনছে জেসন।
​হঠাৎ চোখ খুলল স্টিফেন। জেসনকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দুর্বল কিন্তু রুক্ষ স্বরে বলল,

‘তুমি কে! তুমি তো সানলক নও? কি চাও তুমি আমার কাছে?’

​জেলেদের একজন বলল,

‘এই যুবকই তোমাকে আজ বাঁচিয়েছে, স্টিফেন। তুমি ওকে ডেকে পাঠিয়েছিলে।’

​‘তাই!’

অনেক কষ্টে জেলেদের দিকে মাথা কাত করে তাকাল স্টিফেন।

‘তোমরা একটু বাইরে যাবে? আমি একা এই ছেলের সঙ্গে কয়েকটা কথা বলতে চাই।’ এখন স্টিফেনের গলায় কোন অস্বাভাবিকতা নেই। প্রলাপ বকছে না সে আর। প্রায় স্বাভাবিক মানুষের মতোই শোনাল ওর গলা।

​জেলেদের মধ্যে থেকে কেন ওয়েড বলে উঠল,

‘এখন আর কারও সঙ্গে কথা বোলো না, স্টিফেন। ঈশ্বরের কথা ভাবো। চিন্তা করো কি করে স্বর্গে ঠাঁই পাবে। প্রার্থনা করো, স্টিফেন, প্রার্থনা করো। এই দেহ তো মাটিতে মিশে যাবে। প্রার্থনা! মন লাগিয়ে প্রার্থনা করো, ঈশ্বর হয়তো তোমাকে মুক্তি দেবেন।’

​জেলেদের মধ্যেও সমর্থনের গুঞ্জন উঠল।

​‘কেন ওয়েড ঠিকই বলছে, স্টিফেন।’

​‘প্রার্থনা করো, স্টিফেন।’

​‘প্রার্থনাতেই মুক্তি মিলবে।’

​‘আমি প্রার্থনা করতে জানি না,’

দুর্বল স্বরে জানাল স্টিফেন।

​অসন্তুষ্ট হয়ে চুপ করে গেল জেলেরা। তারপর মোহ হলো বোধহয়। একজন বলল,

‘ঠিক আছে, তাহলে তোমার হয়ে আমরাই বরং প্রার্থনা করি।’

​‘কোন লাভ নেই,’ কাতর গলায় বলল স্টিফেন।

‘অনেক দেরি হয়ে গেছে, প্রার্থনায় আর কাজ হবে না। মরে যাচ্ছি আমি। আর আমাকে জ্বালিয়ো না, যা বলছি করো, একটু বাইরে যাও তোমরা।’

​‘ঈশ্বরকে ডাকো, স্টিফেন, ঈশ্বরকে ডাকো,’

প্রায় হাহাকার করে উঠল নাছোড়বান্দা কেন ওয়েড।

‘সেই চোরের কথা তোমার মনে নেই? ওই যে যিশুর পাশে ক্রুশে ঝুলছিল, মাপ চেয়ে ঈশ্বরকে ডাকল আর অমনি ঈশ্বর তাকে স্বর্গে নিলেন? ঈশ্বরকে ডাকো, স্টিফেন, তোমাকেও তিনি স্বর্গে নেবেন।’

​‘মরে যাচ্ছি তবু রেহাই দেবে না তোমরা?’

খেপে গেল স্টিফেন।

​কিছুটা বিরক্ত হয়েই বেরিয়ে গেল জেলেরা। একেবারে যে চলে গেল তা নয়, ঘরের বাইরে গিয়ে আঁধারে কোথায় যেন বসে বসে প্রার্থনা সঙ্গীত গাইতে লাগল চড়া গলায়। মৃত্যুপথযাত্রী পাপী স্টিফেন ওরিকে তারা স্বর্গে পাঠিয়েই ছাড়বে।

​জেলেরা সবাই বেরিয়ে যেতে অনেক কষ্টে কনুঁইয়ে ভর দিয়ে উঁচু হলো স্টিফেন।

‘আমার কোট কোথায়?’ জেসনের দিকে তাকাল। ‘দেখা তো আমার কোট কোথায় রেখেছে ওরা।’

​ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলছে। ফায়ারপ্লেসের কাছে কে যেন রেখে দিয়েছে স্টিফেনের ভিজে কোট। সেখানেই এখনও পড়ে আছে ওটা। জেসন ওটা নিয়ে -এসে স্টিফেনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
​মাথা নাড়ল স্টিফেন। বলল,

‘ভেতরে একটা থলে আছে। তুমি নিয়ে নাও। তোমাকে দিয়ে দিলাম।’

​কোটের পকেটে হাত দিয়ে থলেটা বের করল জেসন। এই থলিতেই আছে স্টিফেনের দুশো পাউন্ড। সানলককে দিয়েছিল, সানলক নেয়নি। ফিরিয়ে দিয়েছে। সঙ্গে দিয়েছে কিছু উপদেশ।

​থলেতে টাকা-পয়সা আছে, নাড়াচাড়া করার সময় বুঝতে পেরেছে জেসন। ভ্রূ কুঁচকে উঠল ওর। জিজ্ঞেস করল,

‘এটা দিয়ে আমি কি করব?’

​‘তোমাকে দিলাম,’ বিড়বিড় করে বলল জেসন।
​‘আমাকে!’

​‘আমার ছেলেকে দেব বলে সঞ্চয় করেছিলাম। সে নেয়নি। ওটা তুমি নিতে পারো। এক এক পাউন্ড হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ছেলের জন্যে জমিয়েছিলাম। অচেনা কাউকে দিয়ে দেব ভাবিনি কখনও। তবে তুমি আমার জন্যে যা করেছ তাতে এটা তোমার প্রাপ্য হয়। নিয়ে নাও তুমি...’

​‘আমি নেব না,’ ধীর গলায় বলল জেসন।

‘আমি এমন কিছুই করিনি যে আমাকে পুরস্কৃত করতে হবে।’

​‘তুমিই তো আমাকে বের করে এনেছ সেই পাথরের তলা থেকে। মাথা থেঁতলে গেছে, বেশিক্ষণ আর বাঁচব না, কিন্তু তুমি তো আমাকে বাঁচাতে চেষ্টা করেছিলে। নাও তুমি ওটা।’

​‘আমি তো টাকার লোভে সাহায্য করিনি। অন্য কেউ বিপদে পড়লেও আমি সাহায্য করতাম। তোমার টাকা আমি নেব না।’

​বিরক্ত হলো স্টিফেন। ‘থলেতে পুরো দুইশো পাউন্ড আছে। দুইশো পাউন্ড খুব কম হলো? নিয়ে নাও দিচ্ছি যখন।’

​‘হোক দুইশো পাউন্ড। আমি নেব না।’
​‘ও, তোমার তাহলে অনেক টাকা বুঝি?’
​‘এক পাউন্ডও নেই আমার।’
​‘নেই? জাহাজ ডুবিতে সব হারিয়েছ?’
​‘তা নয়। আগেও প্রায় কিছুই ছিল না আমার।’

​অবাক না হয়ে পারল না স্টিফেন। জীবনে কত রকমের লোকই তো দেখল, এর মতো নির্লোভ আর কাউকে দেখেনি। নিজের টাকা-পয়সা নেই, অথচ অবলীলায় দুইশো পাউন্ড দূরে ঠেলে দিচ্ছে! আর কিছু ভাবতে পারল না স্টিফেন। মাথার ব্যথাটা হঠাৎই আবার বেড়ে গেছে। অসহ্য ব্যথা! আস্তে করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কাতর স্বরে বলল,

‘নিয়ে যাও। আমাকে আর বকিয়ো না। নিয়ে যাও থলেটা। যা ইচ্ছে তাই করো।’

​‘বেশ,’ বলল জেসন।

‘আমি রেখে দিচ্ছি এটা নিজের কাছে। তোমার ছেলে ফিরে এলে তাকে দেব। তোমার ছেলের নাম তো মাইকেল সানলক, তাই না? সে তো আইসল্যান্ডে গেছে আজকের জাহাজে। ভাল। আমার দেশও ওই আইসল্যান্ডেই। দেশে যদি ফিরি তাহলে ওকে খুঁজে বের করে দিয়ে দেব টাকাগুলো।’

​‘তোমার মতো ছেলের বাবা হতে পারলে যেকারও গর্ব হবে,’ দুর্বল স্বরে বলল স্টিফেন। ‘তোমার বাবা ভাগ্যবাান। কি নাম তোমার বাবার?’

​‘কখনও তাকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি,’

তিক্ত স্বরে বলল জেসন।

‘আমার বাবা কে তাও আমি জানি...’ চুপ হয়ে গেল ও। বাবার নাম জানে না এটা মুখ ফুটে বলতে পারল না। পারল না শুধু মিথ্যে কথা বলা হবে সেজন্য নয়, মাকেও অপমান করা হবে।

​‘তুমি যখন ছোট তখনই মারা গেছে মানুষটা?’
​‘না।’
​‘তাহলে তোমার জন্মের আগে মারা গেছে?’
​‘না, ঠিক তা নয়।’
​‘তাহলে বেঁচে আছে?’
​‘হয়তো।’

​কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে অনেক কষ্টে অধশোওয়া হলো স্টিফেন ওরি। ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে, শরীরটা কাঁপছে থরথর করে। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

‘তাহলে কি তোমার মাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল সেই লোক?’

​‘সম্ভবত ঠিকই বলেছ তুমি।’

​‘নরপিশাচ!’ ঘৃণায় চেঁচিয়ে উঠতে চাইল স্টিফেন, তারপর সামলে নিল নিজেকে। খুব দুর্বল স্বরে বিড়বিড় করল,

‘আমি নিজেও তো...’ জেসনের দিকে তাকাল।

‘আর তোমার মা? তোমার মা বেঁচে আছে?’
​‘না।'

​‘তোমার বাবা কোথায়?’

​‘তাতে তোমার কি? এত সব প্রশ্ন করছ কেন আমাকে?’

​‘তোমার...তোমার নাম কি?’

​‘জেসন।’

​দীর্ঘশ্বাস ফেলল স্টিফেন। শক্তি শেষ। বিছানায় শুয়ে পড়ল আবার। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে দম নেবার ফাঁকে বলল,

‘তোমার বাবার দুর্ভাগ্য যে তোমার মতো ছেলেকে দেখে যেতে পারল না।’

​শ্বাস অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছে স্টিফেনের। হেঁচকি উঠছে থেকে থেকে। কথা বলতে জোর পাচ্ছে না। ফিসফিস করে বলল,

‘শোনো, জেসন...’

​‘শুনছি।’ বিছানায় ঝুঁকে বসে আছে জেসন। এই লোকটাকে খুন করতেই এখানে এসেছে সে, ভুলে গেছে সে-কথা।

​‘আমি বোধহয় বিরাট একটা অন্যায় করেছি তোমার প্রতি।’

​‘কবে!’ অস্বীকার করতে চাইল জেসন। মৃত্যু পথযাত্রী লোকটাকে মানসিক ভাবে আরও কষ্টে ফেলার কোন অধিকার নেই ওর।

‘আমার ওপর অন্যায়!’

​‘আমি জানি না। তবে মনে হচ্ছে। আমার কথাগুলো শোনো। মনে করো আমিই তোমার সেই পালিয়ে যাওয়া বাবা। মনে করে নাও আমিই তোমার বাবা। আমার টাকার থলেটা তুমি নাও। ওটাতে তোমার অধিকার আছে।’​

‘আমার কাছেই রাখছি। তোমার ছেলে সানলককে ফেরত দেব।’

​‘ওই টাকা সানলক নেবে না, জেসন। ও অনেক অন্যরকম। ভাবছ ওর সঙ্গে তোমার দেখা হবে?’

​‘হতে পারে। আইসল্যান্ড বড় দেশ, কিন্তু লোক সংখ্যা কম। দেখা হলে আমি অবাক হব না। ভাল হয় যদি তুমি বলতে পারো সে কোথায় গিয়েছে, তাহলে ওকে খুঁজে বের করা আমার জন্যে সহজ হবে।’

​‘সানলক পড়তে গেছে। বিশপ জনের ল্যাটিন কলেজে পড়বে ও। তবে আইসল্যান্ডে আরও একটা কাজ আছে ওর। একজনকে খুঁজে বের করবে সানলক। খুব ভাল ছেলে ও।’

হাসার চেষ্টা করল স্টিফেন।

‘এই যে মরে যাচ্ছি, তবু একটা তৃপ্তি আছে যে সানলকের মতো ছেলের বাবা আমি। কত ভাল যে বাসত ও আমাকে। অনেক অনেক দিন আগে, তখন ছোট ছিল ও। আমি তো একটা অপদার্থ, তবু ওকে খাওয়ানো, পরানো, গোসল করানো সব এই আমিই করতাম। হ্যাঁ এই আমিই করতাম। হাহ্-হাহ্-হাহ্-হাহ্!’

কেন কে জানে, হয়তো নিজেকে টিটকারি দিয়ে মানসিক তৃপ্তি পেয়ে অট্টহাসি হাসতে লাগল স্টিফেন। হাসতে হাসতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল সে।

​জেসন মাত্র বলতে যাচ্ছিল যে সানলকের মতোই সে-ও স্টিফেনেরই ছেলে। বলা হলো না। বলার সুযোগ হলো না। সুযোগ যদি হতো, তাহলে কি ওর কথা বিশ্বাস করত স্টিফেন?

​ছয়

​দেখতে দেখতে কেটে গেল চার বছর।
​জাহাজ ডুবির পর আর সব যাত্রীদের সঙ্গে জেসনও গিয়ে উঠেছিল গভর্নর অ্যাডামের খামারবাড়িতে। সেখানেই ছিল পরবর্তী কয়েকটা দিন। তারপর নিজের নিজের ব্যবস্থা করে যে যার পথে চলে গেল নাবিক আর যাত্রীরা। জেসন কোথাও গেল না। কোথায় যাবে? বিস্তৃত এই বিশাল পৃথিবীতে কোথাও তার যাবার জায়গা নেই। কোথাও কেউ অপেক্ষা করে নেই ওর জন্যে।

​আইসল্যান্ড থেকে ম্যান দ্বীপে এসেছিল ও মায়ের আদেশে দুরূহ একটা কর্তব্য পালন করতে। সেই কর্তব্য পালন করতে পারেনি। ভাগ্যের খেলায় বাবাকে হত্যা করার বদলে মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার করে এনেছিল ও। মায়ের আদেশ পালন করার সুযোগ ছিল তবু। একা ঘরে স্টিফেনকে পেয়েছিল সে। ইচ্ছে করলে গলা টিপে তাকে মেরে ফেলতে পারত। কিন্তু পারেনি। ইচ্ছে হয়নি। এজন্যে হয়তো চিরকাল মায়ের অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হবে ওকে। কিংবা..

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 5 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন