#The_Bondman
#সংগ্রহ_সেবা_প্রকাশনী
#লেখক_Sir_Thomas_Henry_Hall_Caine
#পর্ব_০৬
কিংবা মা হয়তো এটাই চেয়েছিলেন।
এখন আর জেসন আগের মতো অতটা নিশ্চিত নয়। মৃত্যুর সময়ে মায়ের বলা কথাগুলো কি তাঁর মনের কথা ছিল? প্রলাপ নয় তো? স্নেহময়ী র্যাচেল ছিলেন গোলাপ ফুলের মতোই কোমল মনের অধিকারিণী। তিনি জেসনকে আদেশ করবেন নিজের বাবা আর ভাইকে হত্যা করার এটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। হয়তো প্রকৃতিস্থ ছিলেন না তখন। জেসন আদেশ পালন করতে পারেনি বলে হয়তো খুশিই হয়েছেন তিনি।
মা'র আত্মা তৃপ্ত হয়েছে এই আশাই করছে জেসন।
দ্রুত বয়ে চলেছে সময়। এখন আর লেগুর খামার বাড়িতে থাকে না জেসন, স্টিফেন ওরির পরিত্যক্ত কুটিরে গিয়ে উঠেছে। স্টিফেনের দেয়া দুইশো পাউন্ড থেকে সামান্য কিছু খরচ করে কুটিরটা মেরামত করে নিয়েছে ও। আগে ওই কুটিরে সর্বক্ষণ একটা বদ গন্ধ ছিল। এখন সেই গন্ধটা আর পাওয়া যায় না। তবে এখনও ওটাকে জীর্ণ কুটির না বলে কোন উপায় নেই। একটা জানালা তৈরি করে নিয়েছে জেসন। এখন সকাল বেলায় কিছুক্ষণের জন্যে সূর্যের আলো ঢোকে ঘরে। সেটুকুই যথেষ্ট। সকাল বেলা ছাড়া জাগ্রত সময়টা কুটিরে মোটেই থাকে না জেসন। সকালে বন্দুক কাঁধে বেরিয়ে যায় শিকার করতে। স্টিফেনের বন্দুকটাও সে পেয়েছে সমস্ত স্থাবর সম্পত্তির সঙ্গে। কখনও জেসন পাহাড়ে যায় শিকার করতে, কখনও চলে যায় জলাভূমির গভীরে। কখনও শিকার পায় পাখি, আবার কখনও পেয়ে যায় দু'একটা হরিণ। সন্ধ্যার আগে ফেরে ও। কখনও কোমরের থলেতে থাকে পনেরো-বিশটা পাখি, কখনও কাঁধে থাকে আস্ত হরিণ।
এত মাংস একা খাওয়া যায় না। লেগুর খামার বাড়িতে অথবা গভর্নরের সরকারী বাসভবনে অর্ধেকটা শিকার রেখে আসে জেসন। কাউকে সে ডাকে না। বাড়ির লোকরা যখন দরজা খুলে পাখি বা হরিণ পায়, বুঝে নেয় জেসন এসেছিল।
কোন চাকরিবাকরি ব্যবসা কিছুই করে না জেসন। স্টিফেন ওরির মতোই হয়েছে ওর স্বভাব। তবে শুধু ওটুকুই, স্টিফেন ওরির আর সব বদগুণ ওর মধ্যে নেই।
গভর্নর অ্যাডাম জেসনকে বেশ পছন্দ করেন। ছেলেটার সৎসাহস, সরলতা তাঁর ভাল লেগেছে। প্রথম তিনি জেসনকে দেখেন লেগুর খামার বাড়িতে। হ্যাঁ, স্ত্রীকে খামার বাড়িটা দান করে দিয়েছেন তিনি, তিক্ত একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তাঁর স্ত্রী-ছেলেদের সঙ্গে, তবুও মাঝে মাঝে তিনি পৈতৃক এই বাড়িটিতে বেড়াতে আসেন।
জেসনের আচরণে খুশি হয়ে প্রথম সাক্ষাতের দিনই বিদায়ের সময় তিনি বলেছিলেন, 'সময় পেলে মাঝে মাঝে আমার শহরের বাড়িতে এসো।'
তাঁর অনুরোধ রেখেছে জেসন। মাঝে মাঝেই গেছে অ্যাডামের সরকারী বাড়িতে। আস্তে আস্তে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। যাওয়া আসা বেড়েছে। সম্পর্ক গভীর হয়েছে। সানলকের অভাব যেন অনেকটাই পূরণ করে দিয়েছে এই জেসন। অ্যাডাম এখন জেসনকে দেখে বেশ সান্ত্বনা পান।
র্যামজে শহরের সরকারী বাসভবনে গেলে অ্যাডাম ছাড়াও গ্রেবার সঙ্গে দেখা হয় জেসনের। এখনও বাবার কাছেই আছে গ্রেবা। লেগুর খামার বাড়িতে টিকতে পারেনি। মা অত্যন্ত স্বার্থপর। ভাইদের ব্যবহার রুক্ষ। তারা যেন গ্রেবাকে কোনমতে কারও হাতে গছিয়ে দিতে পারলেই বেঁচে যায়। খামার বাড়িতে সবার বোঝা হয়ে থাকতে চায়নি গ্রেবা, বাবার কাছে ফিরে এসেছে। বাবা খুবই আদর করেন ওকে। ওকে গুরুত্ব দেন। ভালবাসেন, স্নেহ করেন।
দিনগুলো যেন নদীর বয়ে যাওয়া জল, থেমে থাকে না, পার হয়ে যায় দ্রুত। সময় পার হচ্ছে। সানলক আইসল্যান্ডে গেছে অনেকদিন হলো, কোন চিঠিপত্র পাননি অ্যাডাম। সানলক কি তাহলে তার শ্রদ্ধাভাজন অভিভাবককে ভুলে গেল? একথা ভুলেও ভাবেন না অ্যাডাম। সেই ছোটবেলা থেকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন তিনি সানলককে, ওকে তিনি ভাল করেই চেনেন। ছেলেটা সরল সাদাসিধে, কিন্তু মনটা মস্ত বড়। অ্যাডামকে ও ভুলে যেতে পারে না।
তাহলে কেন সানলক চিঠি লেখে না? ও কি তাহলে কোন বিপদে পড়েছে? খোঁজ নেবার কোন উপায় নেই। খুব চিন্তায় আছেন অ্যাডাম। শুধু যে সানলকের চিঠি আসছে না সেজন্যে নয়, ম্যান দ্বীপের রাজনৈতিক পরিবর্তনও তাঁর দুশ্চিন্তার বড় একটা কারণ। ডিউক অফ অ্যাথল ম্যান দ্বীপের রাজপ্রতিনিধি। তিনি ম্যান দ্বীপে থাকেন না বলেই অ্যাডাম ফেয়ারব্রাদারকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছেন। ডিউক অফ অ্যাথলের কারণেই আজ তিনি ম্যান দ্বীপের গভর্নর। কিন্তু সেই ডিউক অফ অ্যাথল পড়েছেন নিদারুণ আর্থিক সংকটে। আর কোন উপায় দেখতে না পেয়ে ম্যান দ্বীপের স্বত্ব তিনি বিক্রি করে দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত এক উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসারের কাছে। সেই অফিসার নিজেই ম্যান দ্বীপে বসবাস করতে আসছেন, কাজেই অ্যাডামকে তাঁর গভর্নর রাখার কোন যুক্তি নেই।
চাকরি থাকছে না অ্যাডাম ফেয়ার ব্রাদারের। অ্যাথলের ডিউক কেনা-বেচার বিবরণ জানিয়ে খবর পাঠিয়েছেন তাঁকে। সঙ্গে ছয় মাসের বেতনও অগ্রিম দিয়েছেন। বলে দিয়েছেন তাঁকে আর ডিউকের পক্ষে কাজ করতে হবে না। অ্যাডামের সততা, যোগ্যতা, প্রশাসক হিসেবে দক্ষতা সবকিছু উল্লেখ করে তাঁর ভবিষ্যতের সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করেছেন ডিউক। তাঁর পক্ষে যা যা করা সমীচীন কিছুই বাকি রাখেননি করতে। এবার তিনি সম্পর্ক ছিন্ন করলেন।
অ্যাডামের মাথায় বাজ পড়ল বললেও কম বলা হয়। বাজ পড়লে মানুষ কিছু বোঝার আগেই মারা যায়। অ্যাডাম মরলেন না। কিন্তু মরলেও হয়তো এর চেয়ে ভাল হতো। এতদিন অ্যাডাম ম্যান দ্বীপের সবাইকে সুশাসনে রেখেছেন, বিপদে সাহায্য করেছেন, গরীবকে দান করেছেন উদার হস্তে। গভর্নর হিসেবে ভাল বেতন পেতেন। কিন্তু কিছুই জমাননি। আজ একেবারে নিঃস্ব তিনি। কখনও তাঁর গভর্নরের চাকরি চলে যাবে একথা ঘৃণাক্ষরেও চিন্তা করেননি। এখন কি করবেন তিনি! চোখে অন্ধকার দেখলেন অ্যাডাম।
চাকরি নেই তাঁর। কোন রোজগার নেই। কোন সঞ্চয়ও নেই। সরকারী বাসভবনে আর থাকা যাবে না। এখন তিনি আর ম্যান দ্বীপের গভর্নর নন। নতুন রাজপ্রতিনিধি শিগগিরই এসে পৌঁছবেন। তার আগেই তাঁকে বাড়ি খালি করে দিতে হবে।
জিনিসপত্র গোছাতে লাগলেন তিনি। বেশি সময় লাগল না। এতদিন যা ব্যবহার করেছেন সবই তো ডিউক অ্যাথলের জিনিস। এখন সেসব অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসারের। অ্যাডামের নিজের জিনিস বলতে শুধু কাপড়-চোপড়,কয়েকটা খাবার প্লেট, ফুলদানী আর বিছানাপত্র। একটা ঘোড়ার গাড়িতেই সব এঁটে গেল। গ্রেবাকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলেন অ্যাডাম, মেয়েকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিজেও চেপে বসলেন অন্য একটা ঘোড়ায়। এই ঘোড়া দুটো তাঁর নিজের, নতুন গভর্নরের নয়। অ্যাডাম আর গ্রেবার আগে আগে সামনে বাড়ল মাল বোঝাই ঘোড়ার গাড়ি। আজকে তাঁর অধীনস্থ কোন কর্মচারী গাড়ি চালাচ্ছে না। গাড়িটাও গভর্নরের সেই ঘোড়ার গাড়ি নয়। চেলসি নামের এক ভবঘুরে আধপাগলা আছে র্যামজে শহরে, সে-ই গাড়িটা আস্তাবল থেকে ভাড়া নিয়ে এসেছে। গাড়িটা চালাবেও সে। কালকে নতুন গভর্নর আসছেন র্যামজে শহরে। মান্যগণ্য নাগরিকরা সংবর্ধনার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ এলো না অ্যাডামকে বিদায় দিতে। সাধারণ লোক শহরটা সুন্দর করে সাজাতে ব্যস্ত। কারও খেয়াল হলো না অ্যাডামের কথা।
শহরের ভেতর দিয়েই চলছে ঘোড়ার গাড়ি। গাড়ির পিছু পিছু ঘোড়ায় চেপে চলেছেন অ্যাডাম আর গ্রেবা। রাস্তায় কত লোক! সবার সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আজকে খুব কম মানুষই তাঁকে সম্মান দেখিয়ে মাথা থেকে হ্যাট খুলছে। যাদের সঙ্গে চোখাচোখি হচ্ছে তাদের বেশিরভাগই মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ব্যস্ততার ভান করে চলে যাচ্ছে। ভিড়ের মধ্যে নীচ ছোটলোকও কম নেই। তারা অ্যাডামকে নিয়ে ঠাট্টা করছে, টিটকারি দিয়ে নিষ্ঠুর মন্তব্য করতেও বাধছে না তাদের।
'এবার গেছে গভর্নরগিরি।'
'চাকরি কই?'
'নেই বুঝি চাকরি?'
'এবার লাঙল ঠেলবেন লেগুর খামারে গিয়ে?'
'এখন গর্ব দেখাবেন কি নিয়ে?'
'আপনি কিন্তু, এখন সাধারণ এক চাষা।'
নানা রকম মন্তব্য। কটুক্তি। অ্যাডামকে ছোট করে মজা পাচ্ছে লোকগুলো। ওরা আসলে জানে না মানুষকে ছোট করতে চাইলে নিজের নীচতাই প্রকাশ পায়। কোন কথা গায়ে মাখছেন না অ্যাডাম। কিন্তু আধপাগলা চেলসি আর সহ্য করতে পারল না। গাড়িটা অ্যাডামের পাশে নিয়ে এসে বলল, 'চলুন আমরা শহরের বাইরে দিয়ে লেগুতে যাই।'
হাসলেন অ্যাডাম। বললেন, 'তাতে লাভ হবে কোন, ওদের মুখ তো আমি বন্ধ করতে পারব না। যে যাই বলুক সহ্য করে নিতে হবে আমাকে। আমি রাস্তা ধরেই যাব, তবে তুমি ইচ্ছে করলে গাড়ি নিয়ে শহরের বাইরে দিয়ে যেতে পারো। ভালই হয় তাহলে। গ্রেবাও তোমার সঙ্গে যাবে। লোকের কথায় ও মনে কষ্ট পাক তা আমি চাই না।'
আলাদা হয়ে গেল বাপ-মেয়ে। গাড়ির সঙ্গে চলল গ্রেবা। একটু পরেই বেরিয়ে গেল শহরের সীমানা ছেড়ে। অ্যাডাম চললেন রাজপথ ধরে।
তবে একই সঙ্গে লেগুর খামার বাড়িতে পৌঁছুলেন তাঁরা। আস্তাবলের দিকে গাড়ি নিয়ে গেল চেলসি। তার সঙ্গে গেল গ্রেবা। চাকররা এখন মাঠে কাজ করছে। তার ঘোড়া আস্তাবলে নিয়ে রাখবে তেমন কেউ বাড়িতে থাকার কথা নয়। নিজের কাজ গ্রেবাকে নিজেরই করতে হবে।
বাইরে ঘোড়াটা রেখে খাবার ঘরে এসে ঢুকলেন অ্যাডাম। কেউ নেই ঘরে। প্রাচীন ডাইনিং টেবিলের একমাথায় ঠিক তেমনি রাখা আছে তাঁর পুরনো চেয়ার। তিনি জানেন না এখন ওটা তাঁর স্ত্রী রুথের দখলে। চেয়ারটা এখন খালি। অভ্যাসবশত চেয়ারটাতে বসলেন অ্যাডাম। ডুবে গেলেন অস্বস্তিকর ভাবনায়।
এবাড়ি, এই খামার, কিছুই তাঁর নয়। আইনত তিনি এর মালিক নন। রুথকে দান করে দিয়েছিলেন তিনি চাপের মুখে। কাজটা কতটা ঠিক হয়েছিল আজ চিন্তা করতে গিয়ে বুঝতে পারলেন না অ্যাডাম। তাঁকে অবশ্য তাড়িয়ে দেবে না রুথ। কোন স্ত্রীই পারে না অমন করতে। কিন্তু সেটা কি খুব সান্ত্বনার কথা? বাড়ি থেকে দূর করে দেয়ার ক্ষমতা যে রুথের আছে সেটা তিনিও জানেন রুথও জানে। এখানে যদি অ্যাডামকে থাকতে হয় তাহলে আশ্রিতের মতো থাকতে হবে। কথায় কথায় খোঁটা দেবে রুথ। সহ্য করে যেতে হবে সবই। আর রুথ যদি তাঁর আগে মারা যায় তাহলে ছেলেমেয়েরা পাবে এই খামার বাড়ি। ছেলেরা তাঁকে বের করে দেবে না হয়তো, কিন্তু বাঁচতে হবে উচ্ছিষ্ট খাওয়া কুকুরের মতো, অবহেলায়। তিনি মরলে স্বস্তির শ্বাস ফেলবে সবাই, গ্রেবা ছাড়া।
এখন বুঝতে পারছেন অ্যাডাম, সমস্ত সম্পত্তি স্ত্রীর নামে লিখে দিয়ে বিরাট একটা ভুল করেছেন। চেহারায় শঙ্কার কোন ছাপ নেই অ্যাডামের, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অত্যন্ত শঙ্কিত তিনি। দুশ্চিন্তায় মাথাটা ভারী হয়ে আছে।
তাঁর অজান্তেই ঘরে ঢুকলেন রুথ, ঢুকেই চমকে উঠলেন। তাঁর মনে হলো উটকো ঝামেলা এসে কাঁধে চেপেছে। প্রায় খেঁকিয়ে উঠলেন, 'তুমি! তুমি এখানে এই অসময়ে কি করছ!'
জবাব না দিয়ে নির্বাক তাকিয়ে থাকলেন অ্যাডাম। এত রুক্ষ ব্যবহার তিনি আশা করেননি। মনটা ছোট হয়ে গেল তাঁর। এখানে না এলেই ভাল হতো। কিন্তু না এলে যেতেন কোথায়? একা হলেও না হয় একটা ব্যবস্থা করে নিতেন, কিন্তু সঙ্গে গ্রেবাকে নিয়ে...
না, একটা কিছু বলতে হয়। কৈফিয়তের সুরে বললেন অ্যাডাম, 'তুমি তো জানো আমার চাকরি নেই। আগেই তোমাকে জানিয়েছি। এখানে, বাড়িতে ছাড়া আর কোথায় আসব?'
'বাড়ি?' টিটকারির সুরে জানতে চাইলেন মহিলা। 'কার বাড়ি? ভুলে গেছ যে এই বাড়ি আমার? আমি তোমাকে আসতে বলিনি। কেন এসেছ! তুমি কি ভেবেছ এখানে এসে সমস্ত কিছু উড়িয়ে দেবার সুযোগ দেব তোমাকে? ভেবেছ বঞ্চিত হতে দেব আমার ছেলে-মেয়েদের? কক্ষনো না!'
হতবাক হয়ে গেলেন অ্যাডাম। তারপর সম্বিত ফিরতে কাঁপা গলায় বললেন, ' উড়িয়ে দেব? বঞ্চিত করব ছেলে-মেয়েদের? এসব কি বলছ, রুথ?'
'কম তো ওড়াওনি জীবনে,' ঝঙ্কার দিয়ে উঠলেন রুথ। 'কোথাকার কোন্ সানলক, তার জন্যে এতগুলো বছর কম পয়সা নষ্ট করেছ? আমার নিজের ছেলেরাও অত আদরে মানুষ হয়নি। যখন গভর্নর ছিলে মাসে দুইশো পাউন্ড করে বেতন পেতে, কোথায় গেল সেই টাকা? এতগুলো বছর জমাতে পারোনি? তিনজন মানুষের খেতে-পরতে কত টাকা লাগে? নিজে সর্বস্বান্ত হয়ে এখানে এসে উঠেছ আমাদের ফকির করতে?'
মায়ের চড়া গলার আওয়াজে ছেলেরাও ঘরে এসে উপস্থিত হয়েছে। এবার তারা মুখ খুলল, 'এতবছর ধরে যাদের সাহায্য করেছ তাদের কাছে আশ্রয় চাও না গিয়ে।'
'তোমার তো যাওয়ার জায়গার অভাব থাকার কথা নয়।'
'তোমার চোখের মণি সানলক তো আইসল্যান্ডে, যাও না, তার কাছেই চলে যাও না।'
'তুমি এখানে থাকলে সর্বক্ষণ অশান্তি হবে, সেটা আমরা চাই না। তুমি বরং নিজের ব্যবস্থা করে নাও।'
রুথ আর ছেলেরা একমত যে এখানে অ্যাডামের থাকা কোনমতেই উচিত হবে না। তিনি কোথায় যাবেন সেটা কেউ বুঝতে চাইছে না।
চুপ করে ছেলেদের অপমান সহ্য করছে অ্যাডাম। আর কি করার আছে তাঁর! গ্রেবা না থাকলে হয়তো তিনি চলেই যেতেন অন্য কোথাও, কিন্তু গ্রেবাকে নিয়ে কোথায় গিয়ে উঠবেন! মনস্থির করে ফেললেন অ্যাডাম। বললেন, 'গ্রেবার একটা অংশ পাওনা হয় এই খামার বাড়িতে। ছেলেদের মতোই গ্রেবারও থাকার অধিকার আছে এখানে।'
'গ্রেবা থাকুক,' বললেন রুথ, 'কিন্তু উন্নাসিকতা চলবে না এখানে। শহরের বাড়িতে তোমার কাছে যেমন ননীর পুতুলের মতো ছিল সেরকম চলবে না। গৃহস্থ ঘরের মেয়ের মতো ভদ্র হয়ে চলতে হবে, আমার কথা শুনতে হবে, যার সঙ্গে ওর বিয়ে ঠিক করব তাকেই বিয়ে করতে হবে। যদি আমার শর্তে রাজি হয় তাহলে থাকতে পারে গ্রেবা।'
ঘরে ঢোকা তক স্তব্ধ হয়ে মা আর ভাইদের নিষ্ঠুরতা দেখছিল গ্রেবা। এবার আর চুপ করে থাকতে পারল না। ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল, 'না, না, বাবা, আমি থাকব না এখানে। তুমি যদি থাকতে তাহলে সব কিছু সয়ে এখানে থাকতে পারতাম আমি। কিন্তু তোমাকে ওরা...' দৌড়ে এসে অ্যাডামকে জড়িয়ে ধরল গ্রেবা। 'তোমাকে ছাড়া আমি স্বর্গেও যেতে চাই না, বাবা।'
সন্ধ্যা নেমেছে তখন। শিকার থেকে ফিরছে জেসন। আজকে কয়েকটা পাখি ছাড়া কিছুই পায়নি। সেগুলো থেকে কয়েকটা লেগুর খামার বাড়িতে দিয়ে পোর্ট লা ভিউলিনের কুটিরে ফিরে যাবে ও। কিন্তু খামার বাড়ির উঠানে পা দিয়ে হতভম্ব হয়ে গেল জেসন। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। গ্রেবার কাঁধ জড়িয়ে ধরে টলতে টলতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছেন অ্যাডাম। আধপাগলা চেলসি ঘোড়ার গাড়ি থেকে মাল তখনও নামায়নি। অপেক্ষা করছে কেউ তাকে আদেশ করবে মাল নামানোর, দেখিয়ে দেবে কোথায় নামাতে হবে। তাকে আর মাল নামাতে হলো না।
অ্যাডামের পিছু পিছু গাড়ি নিয়ে খামার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো চেলসি।
সম্বিত ফিরে এলো জেসনের, কি ঘটেছে বুঝতে দেরি হলো না। অ্যাডামের পিছনে পা বাড়াল ও, পাশ থেকে শক্ত করে ধরল তাঁর দুর্বল শরীর।একই সঙ্গে তিনজন ওরা খামার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলো। পিছনে ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে এগোল চেলসি। পায়ে হাঁটছে গ্রেবা, অ্যাডাম আর জেসন। অ্যাডাম আর গ্রেবার আর মনে নেই ঘোড়া দুটোর কথা। নির্বাক তাঁরা দু'জন, মাথা নুয়ে পড়েছে চিন্তার ভারে, গ্রামের পথ ধরে হাঁটতে লাগলেন ধীর পায়ে।
রাত নামছে। আশ্রয়হীন অ্যাডাম আর যুবতী গ্রেবা কোথায় যাবে এই রাতের আঁধারে?
চলবে.....