ফন্ট সাইজ:
থিম:
দ্য বন্ডম্যান

পর্ব 7

লেখক: অলকানন্দা আমানি

#সংগ্রহ_সেবা_প্রকাশনী
#লেখক_Sir_Thomas_Henry_Hall_Caine
#পর্ব_০৭

বদলে গেল জেসনের ছন্নছাড়া জীবন। এখন একটা দায়িত্ব পালন করতে হবে। পিছিয়ে যাবার লোক জেসন নয়। অ্যাডাম আর গ্রেবার জন্যে একটা আশ্রয় খুঁজে বের করতে হবে। তাঁদের এখন সাহায্য দরকার। সাহায্য করতে হবে যে করে হোক।

​আপন মানুষরা যখন অ্যাডামের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, বিপদে যখন একা হয়ে কুল খুঁজে পাচ্ছেন না অ্যাডাম, তাঁর মস্ত একটা সহায় হয়ে দেখা দিল জেসন। অথচ জেসন কে ওর! ম্যান দ্বীপের মানুষ নয় জেসন, অ্যাডামের আত্মীয় নয়, কোনদিন কোন সাহায্য নেয়নি সে অ্যাডামের কাছ থেকে, কাজেই কৃতজ্ঞতাবশত কিছু করছে তা নয়। নিঃস্বার্থ যুবকের আন্তরিক ব্যবহারে, সহমর্মিতায় একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেলেন অ্যাডাম। জেসনকে আপন করে নিলেন অন্তরে। ভরসা করতে লাগলেন জেসনের ওপর।

​শিকার করা জেসনের শখ। শিকারের উদ্দেশ্যে নানা জায়গায় যায় সে। অনেক কিছুই দেখে। পোর্ট এরিনের কাছে নির্জন পাহাড়ে একটা পরিত্যক্ত বাড়ি আছে, সেখানেই অ্যাডাম আর গ্রেবাকে নিয়ে তুলল ও। মালপত্র নামিয়ে দিয়ে শহরে ফিরে গেল আধপাগলা চেলসি। র‍্যামজে শহরে গাড়িটা মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে। তবে আর সবার মতো অকৃতজ্ঞ নয় পাগলা চেলসি, অ্যাডাম যখন গভর্নর ছিলেন অনেকবার সাহায্য করেছেন ওকে, আবারও আসবে সে, কথা দিয়ে গেল।
বলল,

'গভর্নর, আপনাকে ছেড়ে আমি যাব না, দেখবেন ঠিকই এসে হাজির হয়ে গেছি আমি।'

​পাগলা চেলসির কাছে অ্যাডাম, এখনও গভর্নর। তিনি শ্রদ্ধেয়, ক্ষমতাবান, প্রাজ্ঞ একজন পুরুষ। তাঁর ছত্রছায়ায় থাকার একটা আলাদা আনন্দ আছে।

​কিন্তু অ্যাডাম তো পাগল নন। নিজের অসহায় অবস্থা তিনি ভালই বুঝছেন। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে তাঁর। ম্যান দ্বীপের সবচেয়ে সম্মানিত লোক ছিলেন তিনি, আজ তিনি আশ্রয়হীন, অবহেলিত, উপেক্ষিত, সর্বস্বান্ত একজন মানুষ। ভাগ্য মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাঁর দিক থেকে। তাঁর এই যে পতন, এটা তো তাঁর নিজের দোষে হয়নি। অমোঘ নিয়তির খেয়ালে তিনি পথের ফকির হয়েছেন। নিজের ভাগ্য মেনে নিয়েছেন অ্যাডাম। মনটা শক্ত করে নিয়েছেন। দেখা যাক ভাগ্য তাঁকে নিয়ে কত খেলা খেলতে পারে।

অ্যাডামের আশ্রয় থেকে পোর্ট এরিন মাত্র দু'তিন মাইল দূরে। একদিন পোর্ট এরিনে গেলেন অ্যাডাম, খোঁজ নিয়ে এলেন কবে নাগাদ আইসল্যান্ডগামী জাহাজ ছাড়বে। কেরানী জানাল আগামী কালই আইসল্যান্ডের উদ্দেশ্যে একটা জাহাজ ছেড়ে যাবে। ভেবেচিন্তে আগেই একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন অ্যাডাম, কাজেই দেরি না করে রেইকিয়াভিকের টিকিট কাটলেন তিনি। বাড়ি ফিরে এসে গ্রেবাকে কিছু বললেন না, অপেক্ষায় থাকলেন জেসন কখন আসবে।

​প্রতিদিনই আসে জেসন। এটা যেন একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন শিকার নিয়ে এসে অ্যাডাম আর গ্রেবাকে দিয়ে যায়। জেসন শিকারের মাংস দিয়ে না গেলে গ্রেবা আর অ্যাডামের কিভাবে চলত ভাবলে শিউরে ওঠেন অ্যাডাম। দিনে দিনে ছেলেটার প্রতি কৃতজ্ঞতা বাড়ছে তাঁর।

​সন্ধ্যের দিকে এলো জেসন। আজকে একটা হরিণ নিয়ে এসেছে। হরিণের মাংস রান্না করতে কিচেনে চলে গেল গ্রেবা। আজকে জেসন এখানেই খাবে।

​আজকে অ্যাডাম তেমন একটা কথাবার্তা বলছেন না। কি যেন ভাবছেন সারাক্ষণ। চুপচাপ ডিনার সারা হলো। বিদায়ের আগে জেসনকে তিনি একা ডেকে নিয়ে বললেন,

'জেসন, তুমি যদি ঠিক রাত দশটার সময় আসতে পারো তাহলে খুব উপকার হয়। জরুরী একটা কাজ আছে। তোমার সাহায্য দরকার। ব্যাপারটা আমাদের দু'জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। গ্রেবাকে কিছু বলা চলবে না।'

​অ্যাডাম অত্যন্ত ভাল মানুষ। অন্যায় কিছুতে নিজেকে তিনি জড়াবেন না এই বিশ্বাস জেসনের আছে। একটু বিস্মিত হলেও তাঁর কথায় সম্মতি দিল জেসন। গ্রেবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির পথ ধরল ও চিন্তিত মনে।

​রাত দশটায় আবার এলো জেসন। গ্রেবা তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। অ্যাডাম নিজে দরজা খুললেন। জেসনকে ফিসফিস করে বললেন,

'গ্রেবা ঘুমাচ্ছে। ওকে জাগানোর দরকার নেই। আমি চলে যাচ্ছি, জেসন।'

জেসনকে বিস্মিত হয়ে মুখ খুলতে দেখে হাত তুললেন তিনি।

'গ্রেবা জানলে কিছুতেই আমাকে যেতে দেবে না। সঙ্গে ওকে নিয়ে যাবার জন্যে জেদ ধরবে। আমি ওকে নিয়ে অচেনা জায়গায়...'

​জেসনের মাথায় কিছু ঢুকছে না।

'কোথায় যাচ্ছেন আপনি?' জানতে চাইল ও।

​বুঝিয়ে বললেন অ্যাডাম। তিনি আইসল্যান্ডের টিকিট করে এনেছেন। কালকে সকালে জাহাজ ছাড়বে। রাতেই বন্দরে চলে যাবেন অ্যাডাম। গ্রেবাকে তাহলে একা থাকতে হয়। সেটা এই নির্জন বুনো এলাকায় ঠিক হবে না, তাই জেসনকে আজকে রাতটা থাকতে হবে এই বাড়িতে, পাহারা দিতে হবে গ্রেবাকে। ভোরে গ্রেবার ঘুম ভাঙলে জেসন ওকে খুলে বলবে অ্যাডাম আইসল্যান্ডে যাচ্ছেন সানলকের খোঁজে। সেখানে কোন একটা কাজ খুঁজে নেবেন। বুঝিয়ে শুনিয়ে গ্রেবাকে লেগুর খামার বাড়িতে দিয়ে আসবে জেসন।

মায়ের কাছে থাকাই গ্রেবার জন্যে মঙ্গলজনক, ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছেছেন অ্যাডাম। এছাড়া তাঁর মতো নিঃস্ব একজন ফুরিয়ে যাওয়া মানুষের কিই বা করার আছে?

​উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল জেসন। জিজ্ঞেস করল, 'আইসল্যান্ডে কি কাজ করবেন আপনি?'

​'সে দেখা যাবে,' মৃদু হাসলেন অ্যাডাম, 'সানলক আছে ওখানে।

ও কি বলে সেটাও শোনা দরকার। নিজের ছেলেরা তো আমাকে হতাশ করেছে, সানলক তেমন করবে না সে বিশ্বাস আমার আছে।'

​নিজের সিদ্ধান্তে অ্যাডাম অটল। বেশি জোরাজুরি করল না জেসন। তাছাড়া সেই অধিকারও নেই ওর। অ্যাডামের আত্মীয় নয় ও, বন্ধুও নয়। দুঃসময়ে সবাই যখন অ্যাডামকে ছেড়ে চলে গিয়েছে তখন সে যায়নি, তবে সেজন্যে ওর এত অধিকার নিশ্চয়ই জন্মায়নি যে অ্যাডামের মতো জ্ঞানী একজন মানুষকে তাঁর করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দেবে। অ্যাডামের কথা মেনে নিল জেসন। বলল,

'ঠিক আছে, আপনি যা বলছেন সেভাবেই সব হবে।'

​'তুমি যতটা করলে আমার নিজের ছেলেরা তার হাজার ভাগের এক ভাগও করেনি,' আবেগে রুদ্ধ হয়ে এলো অ্যাডামের কণ্ঠ।

'যতদিন আমি বাঁচব, আমার সানলককেও যতটা ভালবাসি, ঠিক ততটাই ভালবাসব তোমাকে আমি।'

​আর দেরি করা সমীচীন মনে করলেন না অ্যাডাম, জেসনকে অপেক্ষা করতে বলে গ্রেবার ঘরে এলেন তিনি। ঘুমিয়ে আছে গ্রেবা। নিষ্াপ মুখে রাজ্যের সারল্য। তবু যেন চিন্তিত ও, ঘুমের মধ্যেও ভাবছে কিছু। দারিদ্র্য, হতাশা, একাকীত্ব, অসহায়ত্ব এসব ওর প্রাপ্য নয়, কিন্তু গ্রেবাকে অন্য কিছু উপহার দেবার সামর্থ্য এই মুহূর্তে নেই অ্যাডামের। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন তিনি। বুকের ভেতর হাহাকার উঠল। তিনি চলে যাচ্ছেন। আর কখনও কি দেখা হবে আদরের ছোট্ট লক্ষ্মী গ্রেবার সঙ্গে? আপন মনে মাথা নাড়লেন অ্যাডাম, না, কাঁদবেন না তিনি। মৃদু ছোঁয়ায় একবার তিনি ছুঁয়ে দিলেন গ্রেবার চুল। প্রার্থনা করলেন মেয়েটির ভবিষ্যতের ভালর জন্যে, তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে এলেন ঘর ছেড়ে। দরজাটা আস্তে করে ভিড়িয়ে দিল জেসন।

​খানিকটা পথ অ্যাডামকে এগিয়ে দিতে চেয়েছিল জেসন, কিন্তু অ্যাডাম রাজি হলেন না। বললেন,

'গ্রেবা একা আছে। ওকে তুমি দেখে রেখো। আমি একাই যেতে পারব।'

​বিদায় নিয়ে পা বাড়ালেন অ্যাডাম। দাঁড়িয়ে থাকল জেসন একটা মূর্তির মতো। দেখল ধীর পায়ে হেঁটে চলেছেন অ্যাডাম, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।

​চাঁদ উঠেছে আকাশে। রূপোলি জ্যোৎস্না রাতের পৃথিবী ধুয়ে দিচ্ছে। সমস্ত কলঙ্ক যেন মুছে দেবে ওই জ্যোৎস্না। বিষণ্ণ আলোয় ধীরে ধীরে দূরে চলে গেলেন নিঃস্ব অ্যাডাম, এক সময় চলে গেলেন চোখের আড়ালে।

​ফিরে এসে বিছানা করে ঘুমিয়ে পড়ল জেসন। পরদিন ঘুম ভাঙল গ্রেবা। তখনও জানে না বাবা ওকে ছেড়ে চলে গেছেন।
​গ্রেবা যখন জানল, অদম্য কান্নায় ভেঙে পড়ল। নীরবে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকল জেসন। সান্ত্বনা দিতে হয় কি করে তা ওর জানা নেই।
​গ্রেবা একটু সুস্থ হওয়ার পর গ্রাম থেকে একটা ঘোড়া নিয়ে ফিরে এলো ও, গ্রেবাকে ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে হাঁটতে লাগল পাশে পাশে। লেগুতে ফিরে চলেছে ওরা। এখন আর কাঁদছে না গ্রেবা। পাথর হয়ে গেছে প্রচণ্ড শোকে।

'বুড়ো আসেনি? বুড়োটা গেছে কোথায়?'

খামার বাড়িতে মা আর ভাইদের মুখোমুখি হয়ে গ্রেবাকে প্রথমেই এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হলো।

​জবাব জেসনই দিল।

'তিনি ফিরে আসবেন ভেবেছিলেন আপনারা?'

​জেসনের সঙ্গে কথা বাড়াল না গ্রেবার ভাইরা। জেসন প্রকাণ্ড একটা দানবের মতো। একা মস্ত একটা পাথর সরিয়ে স্টিফেনকে উদ্ধার করেছিল সে, এটা তারা শুনেছে। জেসনকে রাগালে জেসন একাই ওদের সব কয়টাকে পিটিয়ে ছাতু বানাতে পারবে। রাগালে জেসনের হুঁশ থাকে না, তাকে গুঁতো মেরে কথা না বলাই ভাল।

​গ্রেবার এক ভাই বলল,

'এমনি জিজ্ঞেস করছি। পোর্ট এরিনের কাছে সেই পোড়ো বাড়িতেই বাবা এখনও আছে নিশ্চয়ই? ভাল। ওখানেই থাকুক। গ্রেবাকে যে সুবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে তা-ই যথেষ্ট।'

​'ও-বাড়িতে এখন আর কেউ নেই,' বলল জেসন।

'মিস্টার অ্যাডাম আইসল্যান্ডে গেছেন। সেখান থেকে কড মাছের তেল আমদানী করবেন তিনি।'

​কড মাছের তেল আমদানী করা অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। অনেক টাকা লাগে ওই ব্যবসা করতে। ভাইদের একজন জিজ্ঞেস করল,

'কড মাছের তেল আমদানী করবে? বাবার কাছে অত টাকা আছে?'

​'তা আছে। অবসর দেয়ার আগে মিস্টার অ্যাডামকে অনেক টাকা দিয়েছিলেন ডিউক অফ অ্যাথল। আপনারা জানেন না কারণ তিনি আপনাদের বলেননি। সবই আপনাদের দিতেন তিনি, কিন্তু আপনারা তো তাঁকে বাড়ি থেকে একরকম তাড়িয়েই দিলেন। মিস্টার অ্যাডাম চেয়েছিলেন তাঁর ব্যবসায় আপনাদের অংশীদার করে নেবেন। অন্তত দু'জনকে তিনি সুযোগ দিতেন। একজন বসত পোর্ট এরিনের আড়তে, আরেকজন থাকত আইসল্যান্ডে, জেলেদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করত সে। অনেক টাকার ব্যবসা; নিজের বিশ্বস্ত লোক না হলে মুশকিল।'

​'তাই নাকি?'

'সত্যি বলছ?'

'বাবা তাহলে আইসল্যান্ডে গেছে?'

'ব্যবসাতে কাকে কাকে নেবে কিছু বলেছে তোমাকে?'

​অ্যাডামের ছেলেরা একেকজন একেক মন্তব্য করতে লাগল। সবাই বিচ্ছিন্ন, মর্মাহত, হতাশ। বাবা এত টাকা নিয়ে এখানে এসেছিল জানলে তাঁকে কোনমতেই এরকম অপমান করে দূর করে দিত না তারা।
​জেসন তখন বলে যাচ্ছে,

'ম্যান দ্বীপটা আমার ভাল লেগে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম এখানেই থেকে যাব, চাষবাস করব। কিন্তু তা আর হলো না। মিস্টার অ্যাডাম আমাকে অনুরোধ করেছেন তাঁর ব্যবসায় বিনা পয়সার অংশীদার হবার জন্যে। এত ভাল সুযোগ জীবনে আর পাব না, তাই রাজি হয়ে গেলাম। আইসল্যান্ডের জেলেদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কড মাছের তেল সংগ্রহ করা হবে আমার দায়িত্ব। আমার অবশ্য সুবিধেই হলো, আইসল্যান্ডেরই লোক আমি, জেলেদের সঙ্গে পরিচয়ও আছে, কাজটা আমি ভালই চালিয়ে নিতে পারব।'

মিস্টার অ্যাডাম আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এখানে কিছু কাজ থাকায় সেগুলো শেষ না করে আর যেতে পারলাম না। একটা গুদাম ঠিক করতে হবে। মাস চারেকের মধ্যেই যদি জাহাজ বোঝাই করে কড মাছের তেল আসতে শুরু করে পোর্ট এরিনায় তাহলে একেবারে বিপদে পড়ে যাব গুদাম ঠিক করে না রাখলে।'

​কত বড় বিপদে পড়ে যাবে সেটা চোখ-মুখের ভাবায়, হাত-পা নেড়ে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল জেসন। দেখল অ্যাডামের ছেলেরা একেবারে মুষড়ে পড়েছে।

​গ্রেবা তখন তার ঘরে চলে গেছে। গ্রেবা সামনে থাকলে জেসন হয়তো এভাবে অনর্গল মিথ্যে কথা বলতে পারত না।

​মুখে জেসন যাই বলুক, ম্যান দ্বীপ ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই ওর। পরবর্তী দিনগুলোতে মিস্টার অ্যাডামের জন্যে গুদাম ঠিক করার কোন লক্ষণ দেখাল না ও। অ্যাডামের ছেলেরা বুঝে নিল ভবঘুরে স্বভাবের এই দৈত্যাকৃতির লোকটা আসলে ব্যবসার ব্যাপারে ততটা উৎসাহী নয়, ভুল লোককে অংশীদার করেছে বাবা। প্রত্যেকেই আশান্বিত হয়ে উঠল, বুড়ো অ্যাডাম হয়তো বিরক্ত হয়ে জেসনকে বাদ দিয়ে নিজের ছেলেকে কাছে ডেকে নেবেন।
​প্রতিদিন শিকারে যাচ্ছে জেসন। শিকার পেলে লেগুর খামার বাড়িতে যাবেই ও। শিকারের পাখি বা হরিণ যাই হোক দিয়ে আসবে বাড়ির রান্নাঘরে। খামার বাড়িতে প্রায় নিয়মিতই যাচ্ছে জেসন, রান্নাঘরেও ঢুকছে, কিন্তু যতই তাকে অনুরোধ করা হোক কিছুতেই সে বসবে না ওবাড়ির চেয়ারে। রুথ এবং রুথের ছেলেরা অনুরোধ করেও জেসনকে ডিনারে বসাতে পারেনি কখনও। তবে ওদের সবার সঙ্গেই ভদ্রতার সম্পর্ক রেখে চলছে জেসন। ভদ্রতার সম্পর্ক রাখছে, তা না হলে গ্রেবার দেখা পাবে না ও সহজে।

​তাই বলে খাবার টেবিলে বসবে না জেসন! ও ভুলে যায়নি রুথ আর তাঁর ছেলেরা কি ব্যবহার করেছে অ্যাডামের সঙ্গে। মানুষ কতটা স্বার্থপর হতে পারে এরাই তার প্রমাণ। এই বাড়িতে কিছু খাবার মতো রুচি জেসনের নেই। তবুও সে আসছে এই বাড়িতে। নিয়মিতই আসছে। তাকে আসতে হয়। আসতে হয় গ্রেবার জন্যে। গ্রেবাকে ভালবেসে ফেলেছে জেসন।

​আজকাল স্বপ্ন দেখছে ও। সংসারের স্বপ্ন। গ্রেবাকে নিয়ে ছোট একটা সুখী পরিবারের স্বপ্ন। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করবে ও, উপার্জন করবে, সচ্ছল হবে, হাসি ফুটিয়ে তুলবে গ্রেবার চিন্তাক্লিষ্ট বিষণ্ণ মুখে। ছোট্ট, সাজানো গোছানো সুন্দর একটি সংসার। গ্রেবা অপেক্ষা করবে, অ্যাডাম ফিরে এলে ওদের সঙ্গেই থাকবেন।

​এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে কোন বাধা জেসনের চোখে পড়ছে না। গ্রেবা এখন পরিপূর্ণ যুবতী নারী। নিজের ইচ্ছেয় বিয়ে করতে পারবে। রুথ আর তাঁর ছয় ছেলে যতই আপত্তি করুক, নিজের পছন্দ মতো বিয়ে করার আইনগত অধিকার গ্রেবার আছে। আর গ্রেবা যদি নিজের পছন্দ মতোই বিয়ে করে তাহলে তাকে ছাড়া আর কাউকে যে করবে না এব্যাপারে জেসন নিশ্চিত।

​ম্যান দ্বীপের আর কোন যুবককে গ্রেবা পছন্দ করে না এটা জেসন জানে। ও জানে গ্রেবা তাকে পছন্দ করে। খেয়াল করে দেখেছে, ওকে বাড়িতে ঢুকতে দেখলেই গ্রেবার ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে ওঠে।
​এখন দরকার আয় রোজগার করা। জেসন মনপ্রাণে বিশ্বাস করে, উপার্জনের একটা বিহিত হয়ে গেলেই গ্রেবাকে তার ঘরে তুলে আনতে কোন বাধা থাকবে না।

​রোজগার করার বুদ্ধিও জেসনের মাথায় এসে গেছে। পোর্ট লা ভিউলিনে ওর নির্জন কুটিরের কাছ দিয়েই বয়ে যাচ্ছে ছোট্ট একটা নদী। ছোট্ট নদী হলেও বেশ স্রোত আছে তাতে। স্রোতটা কাজে লাগাতে পারলে অনায়াসেই এখানে একটা আটাকল চালানো যাবে। বারো মাস চলবে ওর আটাকল। খোঁজ নিয়ে জেসন দেখেছে লেগুতে একটা আটাকলও নেই, র‍্যামজে শহরে গিয়ে আটা ভাঙিয়ে আনে সবাই। এখানে একটা আটাকল থাকলে কম খরচে আটা ভাঙানো যাবে, সবাই আসবে আটা ভাঙাতে।

​একদিন জেসন আধপাগলা বুড়ো চেলসিকে জিজ্ঞেস করল,

'এখানে একটা আটাকল থাকলে কেমন চলবে?'

​হুজুগে লোক চেলসি, জেসনের কথা শুনে তার হুজুগ উঠল। হড়বড় করে বলল, 'চলবে মানে? দারুণ চলবে। চলতেই হবে!'

​কথাটা আর কেউ যাতে না জানে, চেলসিকে সাবধান করে দিল জেসন। রাজি হলো চেলসি, কিন্তু শর্ত জুড়ল, সে-ও আটাকল বানাবার সময় সাহায্য করবে।

​বাড়তি একজন লোক পেলে সুবিধেই হয় জেসনের। কোন আপত্তি করল না ও।

​নদীর ধারে চলল দু'জনের আটাকল তৈরির কাজ। প্রথমে দরকার একটা বাড়ি বানানো। স্টিফেনের দেয়া টাকাগুলো প্রায় কিছুই খরচ করেনি জেসন। ওগুলো রইল বাড়ি বানাবার পর যন্ত্রপাতি কেনার জন্যে। বাড়ি জেসন নিজেই বানাবে। কাঠ যা লাগে জঙ্গল থেকে কেটে আনলেই হবে। ভিত আর দেয়াল হবে পাথরের। পাহাড় থেকে নিজেই পাথর বয়ে আনতে লাগল জেসন। কোন মজুর না থাকলেও দ্রুত এগোচ্ছে বাড়ির কাজ। জেসন একাই ছয়-সাতজন মজুরের সমান খাটছে।

​গ্রেবা মাঝে মাঝে আসে, দেখে যায় জেসনের আটাকলের নির্মাণমাণ বাড়ি। এবাড়িতে শুধু আটাকল নয়, থাকার জন্য ঘরও বানাচ্ছে জেসন। তবে এখনও গ্রেবাকে বলেনি এই বাড়িতেই ও তুলতে চায় নবপরিণীতা যুবতীকে। তবে সব কথা কি মুখে উচ্চারণ করে বলতে হয়? যৌবনের নিজস্ব ভাষা আছে। সে-ভাষা নীরব, নিভৃতে কথা বলে।

​গ্রেবা কি জানে না জেসন তাকে ভালবাসে?

​হয়তো জানে। কিন্তু গ্রেবা জেসনের মনোভাব জানে তেমন কিছু আচরণে কখনও প্রকাশ করেনি।

​এরমধ্যে কাজে একদিন পোর্ট এরিনে গেল জেসন। কাজ সেরে ফেরার সময় ময়লা একটা খাম তার হাতে ধরিয়ে দিল সেখানকার পোস্টমাস্টার। বলল,

'তুমি তো লেগুতে যাচ্ছ, এটা মিস্টার অ্যাডামের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ো।'
​খামার বাড়িতে গিয়ে খামটা গ্রেবার হাতে দিল জেসন। খামের ওপর গ্রেবার নামই লেখা আছে। খামটা দিয়ে বলল,

'পোর্ট এরিনের পোস্টমাস্টার দিল। বোধহয় তোমার বাবার চিঠি।'

​খামটা ছিঁড়ে গ্রেবা চিঠি বের করছে এমন সময় ওর ভাই জেকব বলল,

'এদিকে একটু আসবে, জেসন? তোমার সঙ্গে জরুরী কথা ছিল।'

​গ্রেবা চিঠি পড়ুক, পরে জানা যাবে অ্যাডাম কি লিখেছেন। জেকবের কাছে গিয়ে দাঁড়াল জেসন। কাজের কোন কথা নয়, এমনি ফালতু আলাপ করতে ডেকেছে জেকব। জেসনের আটাকল নিয়ে বকবক করতে শুরু করল লোকটা। কিছুক্ষণ পর ঘাড় থেকে আপদটাকে খসাতে পারল জেসন, ঘরে এসে দেখল গ্রেবা কখন যেন চলে গেছে। গ্রেবা হয়তো ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করছে। ডাকতে বাঁধল জেসনের। চিঠিতে অ্যাডাম কি লিখেছেন সেটা কালকেও জানা যাবে। সেদিনের মতো বাড়ি ফিরল জেসন।

​পরদিন সকালেই বাড়ির পাথর গাঁথার কাজে সাহায্য করতে প্রতিদিনের মতো হাজির হয়ে গেল চেলসি। পাগল লোকটাকে একা কাজ করতে দিলে হয়তো উলটাপালটা কাজ করে রেখে দেবে। জেসন ঠিক করেছিল সকালে উঠেই লেগুর খামার বাড়িতে যাবে, সেটা আর হয়ে উঠল না ওর। বিকেলের আগে চেলসির হাত থেকে ছাড়া পাওয়া গেল না।
​সন্ধ্যের খানিক আগে খামার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলো জেসন। অন্যদিনের মতো স্বাভাবিক নয় আজ বাড়ির লোকদের আচরণ। ওকে দেখেই গ্রেবার ছয় ভাই চেঁচিয়ে উঠল।

​'গ্রেবা কোথায়?'
'গ্রেবা কোথায় জানো?'
'গেছে কই হারামজাদী!'
'তুমি জানো না কিছু?'

​প্রশ্নবাণ একটু কমতে পুরো ব্যাপারটা জানা হলো জেসনের। সকাল থেকে গ্রেবাকে পাওয়া যাচ্ছে না। ঘরে পড়ে আছে একটা ছেঁড়া ময়লা খাম। গ্রেবার নাম লেখা আছে তাতে। হাতের লেখাটা চিনেছে অ্যাডামের ছেলেরা। ওরা সবাই একমত, সানলক চিঠি লিখেছিল গ্রেবাকে। তার চিঠি পেয়েই বাড়ি ছেড়েছে গ্রেবা।

​খামটা দেখেই চিনল জেসন, গতকাল পোর্ট এরিন থেকে এই খামটা নিয়ে এসে নিজের হাতেই গ্রেবাকে দিয়েছিল ও। খামের মুখ তখন বন্ধ ছিল। ভেতরে ছিল পুরু কাগজ। দীর্ঘ চিঠি লেখা হয়েছিল গ্রেবাকে। অ্যাডাম ফেয়ারব্রাদারের ছেলেরা বলছে সে-চিঠি লিখেছে সানলক।
​সানলকের চিঠি পেয়েই চলে গেছে গ্রেবা।

কোথায় গেছে? সঙ্গে সঙ্গে পোর্ট এরিনে ছুুটল জেসন। ওখানে গিয়ে শুনল ভোরে একটা মেয়ে এসেছিল ঘোড়ায় চেপে। খোঁজ নিয়েছিল আইসল্যান্ডের কোন জাহাজ আছে কিনা। একটু পরই আইসল্যান্ডের একটা জাহাজ ছাড়বে শুনে দেরি না করে একটা টিকেট কেনে সে-মেয়ে, তারপর চড়ে বসে জাহাজে। ভোরেই আইসল্যান্ডের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছে সে-জাহাজ।

​বাড়ি ফিরে এলো জেসন। মাথাটা কাজ করছে না কোন। প্রচণ্ড এক আক্রোশে ফেটে যাচ্ছে বুকের ভেতরটা। সব হারানোর বেদনায় নিজেকে মনে হচ্ছে উন্মাদ। আটাকলের বাড়িটা তৈরি প্রায় শেষ। ওটার ওপর গিয়ে উঠল জেসন। একটা একটা করে পাথর খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিতে লাগল দূরে। দুই বছর লেগেছিল বাড়িটা তৈরি করতে। এক ঘণ্টা লাগল ওটা নিশ্চিহ্ন হতে।

চলবে.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 7 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন