#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে
#অহর্নিশা
#পর্ব_সংখ্যা ৩
বেলা দ্বিপ্রহর, নয়ন্তীকা বেলকনির দোলনায় বসে রয়েছে। কোলে তার চিনি-মিনি, আদরের খরগোশ বাচ্চা। তারা ব্যস্ত নিজেদের কাজে। এই যেমন, কোলে উঠছে আবার নামছে, আবার থেকে থেকে নয়ন্তীকার পরনের জামা ধরে টানাটানি করছে। তবু সে বিরক্ত হচ্ছে না মোটেই। বরং, আরও যত্ম সহকারে দুজনকে আদর করে দিচ্ছে।
আজকে নয়ন্তীকার মনে কালো মেঘ জমেছে। এই বুঝি চোখ বেয়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। তার মন খারাপের প্রধান কারণ হলো কালকের ঘটনা। তার মনে আছে আবছা আবছা, নয়ন্তীকার কালকে হঠাৎ করেই মাথা ঘুরে উঠলো কে.বি.সি মাঠটার সামনে। তারপরের ঘটনা নয়ন্তীকার অজানাই ছিল। তবে কাল রাতে বাবার অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পর নয়ন্তীকা আরও ঘটনা জানতে পারে। আর তা জেনে তার হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে মন চাইছিল। তার মোটেই কোনো বল-টল দিয়ে আঘাত লাগেনি। আর তার বাবা নাকি এই কারণে ঝামেলা বাঁধিয়ে এসেছে। ভাবতেই তার কান্না কান্না পাচ্ছে। তার খারাপ লাগাটা বেশি কাজ করছে, কারন রক্তিম দাশগুপ্ত কে নিয়ে ঝামেলা বেঁধেছে। যদিও, তার দোষ নেই। তবু তাকে নিয়ে কানাঘুষো তো হচ্ছে পাড়ায়-প্রতিবেশিদের মধ্যে।
মন খারাপের দ্বিতীয় কারণ হলো, তার মা জননী কিছুক্ষণ আগে তাকে বকে গেছেন। শুধু মারাটাই বাকি রেখেছেন। যদিও এটা নতুন নয়। প্রতিদিনই বকা খেয়ে তবেই তার ঘুম ভাঙে। কেননা, সে ঘুম প্রিয় আর ঘুমকাতুরে কিনা। আজকেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কালকে বাবার থেকে পরবর্তী ঘটনা জানতে পেরে কিছুতেই ঘুম চোখে ধরা দেয়নি। যার জন্য আজকে ঘুম থেকে উঠতে এত বেলা হয়েছে। তার উপর তার আজ কলেজ যাওয়া হয়নি, যদিও বাবা আজকে যেতে নিষেধ করেছিল।
আবার, রিহাটা কলেজ গেছে। যদিও তার আর রিহার কলেজ আলাদা। তবু আজকে মেয়েটা বাড়ি থাকলে মন্দ হতো না। নয়ন্তীকা বুঝে পায়না মেয়েটার সাথে এত সখ্যতা কীভাবে গড়ে উঠলো। মেয়েটা এত কাছের কীভাবে হয়ে গেল। সে কোথায় মেধাবী পদার্থ বিজ্ঞানের ছাএী, আর সে ফাঁকিবাজ ইতিহাস বিভাগের। দুজনেই দুই মেরুর একে বারে। নয়ন্তীকা চঞ্চল একটু দুষ্টু, আর রিহা শান্ত-শিষ্ট। যদিও, এখন মেয়েটা একটু দুষ্টুমি করে তার সাথে। অবশ্য তার হাওয়া লেগে,ওই যে—“সঙ্গ দোষে, লোহা ভাসে।”
রিহা তার বাল্যকালের সই। তার বাড়ি নয়ন্তীকার দুটো বাড়ি পর। তাই অবশ্য ভাবটা একটু বেশি। তাছাড়া, সেই ছোট্ট বেলা থেকে তারা একই স্কুল-প্রাইভেটে পড়ে এসেছে। তবে কলেজে উঠে তারা আলাদা হয়ে গেছে। কী আর করার! বর্তমানে তারা সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট। আপাতত, রিহাকে ছাড়া তার কলেজ লাইফ ভালোই চলে যাচ্ছে। অবশ্য ভালো যাওয়ারই কথা! কলেজে তিনটে মূলবান রত্ন জুটেছে তার কপালে। আহা কি ভাগ্য!
“আমি মঞ্জুলিকা!! হা হা”....
হঠাৎ ষাঁড়ের মতো গলার আওয়াজ কানে আসায়, নয়ন্তীকা ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এল। তারপর চোখ তুলে সামনের বেলকনিতে নজর দিল। কন্ঠের মালিক তখনও ষাঁড়ের মতো গলা ছেড়ে গান গেয়ে চলেছে,,,,,,
“আমি যে তোমার! শুধু যে তোমার!”....
নয়ন্তীকা ভ্রু কুঁচকে বিরক্তির সহিত তাকিয়ে রইলো বদ ছেলেটার পানে। ততক্ষণে তার যাএাপালা থেমেছে। সে কুটিল হেসে নয়ন্তীকাকে উদ্দেশ্য করে বললো,,,,,
“এ চন্দ্রমুখী! উপস, মঞ্জুলিকা! — শুনলাম নাচতে নাচতে নাকি জ্ঞান হারিয়েছিলিস?”
মুখে তার কুটিল হাসির ছড়াছড়ি। যা দেখে নয়ন্তীকার গা ছ্যাঁত করে জ্বলে উঠলো। এ হল তার আর একটা জাত শএু। রক্তিম দাশগুপ্তের ছোটো ভাই রূপক দাশগুপ্ত। বয়সে তার থেকে গুনে পাঁচ-ছয় বছরের ছোট্ট হবেই। তবু বড়োদের সম্মান করতে জানে না। ওহ না!শুধু তাকে সম্মান দিতে জানে না এই বেয়াদব ছেলে।ছোটো বেলা থেকেই দুজনের ‘দা কুমড়োর’ সম্পর্ক।
হঠাৎ নয়ন্তীকার মুখটা মলিন হয়ে ওঠে। মানসপটে ভেসে ওঠে ছোটো বেলাকার সুন্দর ছবি। কয়েক বছর আগেও তো সব ভালোই ছিল! হঠাৎ কী থেকে কী হয়ে গেল জানা নেই নয়ন্তীকার।
নয়ন্তীকার বাবা নৈতিক মুখার্জি আর রক্তিমের বাবা অনিমেষ দাশগুপ্ত বাল্যকালের বন্ধু। তাদের দুজনেরই বন্ধুত্ব বিখ্যাত ছিল একটা সময়। হোক সেটা স্কুল কিংবা কলেজের ক্যাম্পাসে। তাদের পড়াশোনার সাথে সাথে ব্যবসা জগতের হাতে খড়ি একই সাথে। দুজনের বাড়ি পাশাপাশি একই পাড়ায়। দুজনের একে অপরের পরিবারের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল একটা সময়। দুই বাড়ির বাচ্ছাদের আসা-যাওয়া-খাওয়া একে অপরের বাড়িতে হত। তাদের আদর-যত্নও করা হত একে অপরের বাড়িতে। যা এখন কেবল অতীত। হঠাৎ সব পরিবর্তন হয়ে গেল। তবে কী থেকে কী হয়ে গেল নয়ন্তীকা জানে না। আর না তো পাড়া-প্রতিবেশীর কোনো মানুষ জানে। পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে তাদের বন্ধুত্ব যেমন চর্চিত ছিল, এখন তাদের শব্দহীন মন মালিন্য ও বেশ চর্চিত। তবে এর কারণ সবারই অজানা।
“তুই দেখি আসলেই চন্দ্রমুখী হওয়ার চেষ্টা চালাছিস!! হা হা ,,,,,, এই রূপে ভালোই লাগছে তোকে। পুরো মঞ্জুলিকা।”
বেয়াদব ছেলেটা আবার দাঁত-কপাটি বার করে হেসে উঠলো। যার জন্য নয়ন্তীকার রাগের মাএা আর একটু বেড়ে গেল। সে নিজের দিকে তাকালো একবার,,, আসলেই তার করুন অবস্থা। তা বলে মঞ্জুলিকার মতো মোটেই না। তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে, আর জামা একটু কুঁচকে গেছে এই যা। এই রূপে তাকে কিউট লাগছে,,,,তা নয়ন্তীকা বেশ জানে। তবু এই ছেলের কথায় তার রাগ উঠছে। এই বেয়াদব ছেলেকে এখন জব্দ না করলে নয়ন্তীকার আজকে ঘুমই হবে না। তাছাড়া, এই ছোট্ট প্যাকেটকে কাঁদানোর নিনজা টেকনিক ভালোই জানা আছে নয়ন্তীকার। সে মনে মনে কুটিল হাসলো। তারপর বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে রূপকের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,,,,,
“এ বান্টি!! তেরা সাবুন শ্লো হে ক্যায়া ?”
বলেই হেসে গড়াগড়ি খেল নয়ন্তীকা। কোলে চিনি-মিনি নিরব দর্শক। যদিও আজকে নতুন না, দুজনে কতই বার চিনি-মিনির সামনে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ তুলে ধরেছে। সে কথা না বললেই নয়। বর্তমানে, চিনি-মিনি চুপটি করে বসে আছে নয়ন্তীকার কোলে। দুজনে টুকটুক করে চেয়ে রয়েছে রূপকের পানে।
“নয়নের বাচ্ছা !! তোকে কতবার বলেছি আমাকে বান্টি বলবি না।”
রূপকের চোখে-মুখে ক্রোধ স্পষ্ট। যা দেখে নয়ন্তীকা আরো মজা পেল। তার সাথে এই চৌবাচ্চা'টা লাগতে আসে। এ্যাঁহ!! সাহস কত। মুখ ব্যাঁকালো নয়ন্তীকা। তারপর বেশ ভাবসাব নিয়ে বললো,,,,,
“তুমি কে হে ?? কোথাকার প্রধানমন্ত্রী? তোমার কথা আমি শুনবো?”
— আমি তো একশো বার বান্টি’ বলবো। কী করবি তুই??,,,,,বান্টি! বান্টি! এ বান্টি !! এএএএএ বান্টি....
বলেই নয়ন্তীকা এবার শব্দ করে হেসে উঠলো। তারপর চোখ বোলালো লাল হয়ে যাওয়া ছেলেটার মুখশ্রীতে। চোখ তার ছল ছল করছে। এই বুঝি কেঁদে দেবে। যা দেখে নয়ন্তীকা পৈশাচিক আনন্দ পেল।
“তুই দেখবি আমি কি করবো ?”
“হ্যাঁ! দেখা না। আমি তোকে ভয় পাই নাকি বান্টি।”,,,,বলেই নয়ন্তীকা মুচকি মুচকি হাসলো।
যা দেখে রাগ চেপে ধরলো রূপকের মাথায়। এই একটা নাম তার বড্ড অপছন্দের। সবাই তাকে এই নামে ডেকে ক্ষেপিয়ে দেয়। আর মজা নেয়। যেমনটা আজকে নয়ন্তীকা নিচ্ছে। যা রূপকের মোটেই সহ্য হচ্ছে না। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বেলকনি থেকে একটা ফুল গাছের ছোট্ট টব তুলে নিল হাতে। উদ্দেশ্য নয়ন্তীকার বেলকনিতে ছুঁড়ে মারা। আর নয়ন্তীকার বেলকনি খুব একটা দূরে নয়, কম করে হলেও দুহাত দূরে হব।
এই দিকে রূপকের কান্ড দেখে হকচকিয়ে উঠলো নয়ন্তীকা। এই বেয়াদব ছেলেকে মোটেই ভরসা নেই তার, এর দ্বারা সব সম্ভব। এত বছরে তার প্রমাণ সে অনেক বারই পেয়ে গেছে। যার দরুন নয়ন্তীকা একটু ভয় পেল বটে। সে তড়িঘড়ি করে চিনি-মিনি কে বগলদাবা করে দোলনা থেকে উঠে দাঁড়ালো। উদ্দেশ্য এক ছুটে রুমে। এই দিকে বিচ্ছু চিনি-মিনি হাত-পা ছোড়াছুড়ি করতে লাগলো। যেন দুজনকে নয়ন্তীকা কিডন্যাপ করে গঞ্জের বাজারে গিয়ে বেঁচে দেবে।
“বান্টি!! কি হচ্ছেটা কি ?? নীচে রাখ ওটা।”
আকস্মিক রক্তিমের কন্ঠস্বর পেয়ে নয়ন্তীকার পা জোড়া থেমে গেল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে চাইলো ওদের বেলকনির পানে। তারপর রূপকের মুখ দেখে উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো। এইদিকে, নয়ন্তীকার হাসি দেখে রূপক ঝর ঝর করে কেঁদে উঠলো। যা এতক্ষণ সে চেপে রেখেছিল। সে ফুলের টবটা শব্দ করে নীচে রাখলো। তারপর রুমের ভিতরে যেতে যেতে বললো,,,,,
“তুমিও আমাকে বান্টি বলেছো ভাইয়া। আমি কথা বলবো না তোমার সাথে।”
রূপকের অভিমানী কন্ঠস্বর। ততক্ষণে সে প্রস্থান করেছে সেখান থেকে। ও যেতেই রক্তিম নয়ন্তীকার পানে চাইলো, ওমনি নয়ন্তীকার হাসি ফুরুৎ! তার মুখটা চুপসে গেল তৎক্ষণাৎ। সে রক্তিমের এই চাহনি থেকে বাঁচার জন্য পালাতে চাইলো। সে পিছু ঘুরে হাঁটা ধরলো নিজের রুমের উদ্দেশ্যে। ওমনি কানে বাজলো রক্তিমের কিছু কটু কথা.....
চলবে,,,,,,,
( আপনাদের কী এই গল্পটা ভালো লাগছে না?? আমি কী আর লিখবো না?? আপনারা প্লিজ আপনাদের মতামত জানান। আপনারা না বললে বুঝবো কি করে বলুনতো।
ভালো লাগলেও বলুন, না লাগলে তাও বলুন। আমি নিজের ভুল-এুটি শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করবো। কিন্ত এই ভাবে চুপ থেকে হতাশ করবেন না। আমি লেখার আগ্ৰহটুকু হারিয়ে ফেলেছি ধীরে ধীরে।)