#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে
#অহর্নিশা
#পর্ব_সংখ্যা ৬
শীতে মোড়ানো নিস্তব্ধ বিকেল তখন। তবে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। কুয়াশায় ইতিমধ্যে ঢেকে ফেলেছে রাস্তা-ঘাট থেকে শুরু করে উঁচু বাড়িঘরের ছাদ। দেখে মনে হচ্ছে গভীর রাত তখন। তবে, ঘড়িতে সাড়ে ছ'টা তখনো। খুব একটা সময় পেরিয়ে যাইনি।
নয়ন্তীকা আর রিহা হেলে দুলে বাড়ি ফিরছে। প্রতিবারের মতো একই সময়ে। নাচের মিস যে সময়ে ছাড়েন, ঠিক তখনই তারা কে.বি.সি ক্লাব থেকে বেরিয়ে পড়েছ। যদিও রিহা আসতে চাইছিল না। এমনকি নয়ন্তীকার ও আসার ইচ্ছা ছিল না। খেলা বেশ ভালোই জমে উঠেছিল। সবে একটা রাউন্ড শেষ হওয়া মাত্রই নয়ন্তীকারা বাড়ির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়েছে। কেননা নয়ন্তীকা আর রিহার বাড়িতে জানাজানি হলে সমস্যা হতো। যদিও রিহার না হলেও, তার হওয়ার চান্স ছিল। তাই নয়ন্তীকা রিস্ক নিতে চাইনি।
---------
নয়ন্তীকা গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে বাড়িতে ঢুকলো,যেন কিছু হয়নিই। বাড়ির দরজা খোলাই ছিল যার কারণে নয়ন্তীকার আর মা'কে ডাকা ডাকি করতে হলো না। নয়ন্তীকা কলেজ, টিউশন অথবা নাচ করতে গেলে,,,, তার আসার সময় মিস অহনা দরজা খুলেই রাখেন প্রতিদিন। তাই আজও তার ব্যতিক্রম হল না।
“দাঁড়াও নয়ন্তীকা! তোমার সাথে কথা আছে।”
বাবার গম্ভীর কন্ঠস্বর শুনে নয়ন্তীকার পা জোড়া থেমে গেল। এতক্ষণ সে লিভিং রুমে তার মা-বাবা খেয়ালই করেনি। যার জন্য সে একেবারে নিজের বরাদ্দকৃত ঘরের দিকে রওনা দিচ্ছিল।
“এদিকে এসো!”
বাবার কন্ঠস্বর শুনে নয়ন্তীকা একটু ঘাবড়ালো। তার ওপর বাবাকে এইসময় বাড়িতে দেখে নয়ন্তীকা বেশ চিন্তায় পড়লো। তবু সে চিন্তাকে পাওা না দিয়ে এগিয়ে গেল বাবা-মায়ের কাছে। তারপর বাবার পাশে বসলো।
“আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো ?”
এই প্রশ্নে হাত পা ভয়ে ঠান্ডা হয়ে এল নয়ন্তীকার। সে একটা ঢোক গিলে, মাথা নিচু করে না সূচক মাথা নাড়লো।
“নাচ ক্লাস কেমন গেল ?”
এই প্রশ্নে নয়ন্তীকা মাথা তুলে চাইলো, তার মা-বাবা দুজনেই নিস্পলক তাকিয়ে রয়েছে তার উওর শোনার আশায়। নয়ন্তীকা সামান্য হেসে হ্যাঁ সূচক ঘাড় নেড়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো—“ভালো।”
বলার সাথে সাথেই নয়ন্তীকার গালে স্বজোড়ে একটা চড় পড়লো। নিস্তব্ধ পরিবেশে আওয়াজটা আরও জোড়ালো শোনালো।
নৈতিক মুখার্জির এই কার্যকলাপে মিসেস আহানা আঁতকে উঠলেন তৎক্ষণাৎ। মেয়েকে আগলে নিয়ে বলে উঠলেন— “কী করছো কী? এত বড়ো মেয়ের গায়ে কেউ হাত তোলে?”
"তুমি চুপ করবে একদম! তোমার জন্যই মেয়ের এই অবস্থা।“— নৈতিক মুখার্জি রাগে গর্জে উঠলেন। তারপর নয়ন্তীকার দিকে গিয়ে বাহু আঁকড়ে ধরে বললেন,,,,
- আর তোমার সাহস কী করে হয় মিথ্যে বলার? তার ওপর নাচের ক্লাসের নাম করে এইদিক সেইদিকে যাওয়ার? তুমি কী ভেবেছো আমি খবর পাবো না?
মিসেস আহানা নৈতিক মুখার্জি থেকে নয়ন্তীকার বাহুখানা ছাড়িয়ে আবার আগলে নিলেন মেয়েকে। নয়ন্তীকা তখন মায়ের বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে চলেছে।
“ও আর এই রকম করবে না নৈতিক। বাচ্চা মানুষ ভুল করে ফেলেছে।”
“তোমার জন্য মেয়ের এই অধঃপতন। মিথ্যে বলার সাহস দেখিয়েছে। কান খুলে শুনে রাখো আহানা,,,আজ থেকে ওর নাচ বন্ধ। কথাটা মাথায় ঢুকিয়ে দিও ওর।”— বলেই নৈতিক মুখার্জি ব্যস্ত পায়ে স্থান ত্যাগ করলেন।
------------------
অন্ধকার নিমজ্জিত ঘরে শুয়ে আছে নয়ন্তীকা। তবে, চোখে মুখে ঘুমের ছিটেফোঁটা মাএ নেই। সে বিভিন্ন ভাবনা চিন্তায় ব্যস্ত। কেঁদে কেটে চোখ মুখের অবস্থা একেবারেই খারাপ হয়ে আছে।
কান্নাকাটির কারণটা নাচ ছেড়ে দেওয়া নিয়ে। হ্যাঁ, সে দোষ করেছে। বাবা তার জন্য মেরেছে। তবে, নাচ ছাড়িয়ে দেবে নয়ন্তীকা কখনোই ভাবিনি। নাচ তার প্রিয় একটা সখ। নাচ করলে মানসিক শান্তি পায় সে। যদিও, নাচের হাতেখড়ি মায়ের জন্য হয়েছিল। এমনকি মায়ের ইচ্ছাতেই। তবে চাইলেই মায়ের সেই চাপিয়ে দেওয়া ইচ্ছা নয়ন্তীকা ত্যাগ করতে পারবে না। কেননা এখন নাচ তার জন্য সব।
আর এই কথা নয়ন্তীকা তার বাবাকে কখনোই বলতে পারবে না। মানুষটাকে বড্ড ভয় পায় নয়ন্তীকা। বাবা'রা বুঝি এইরকমই হয়? বাবা'র ভালোবাসাও বুঝি এইরকমই হয়??
নয়ন্তীকা মলিন হাসলো। তার বাবা তাকে ভালোবাসে না। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে নয়ন্তীকা কখনো দেখিনি তার বাবা তাকে ভালোবেসে আদর করছে। সবসময় গম্ভীর গলায় শাসন করতেই সে দেখেছে। স্কুলে থাকাকালীন, সমস্ত মিটিং এমনকি নিতে যেতেও তার মা যেত। কখনো বাবা যাইনি। এখন পর্যন্ত, কোনো বাচ্চাকে তার বাবার সাথে দেখলে নয়ন্তীকার কষ্ট হয়। বড্ড কষ্ট হয়।
তবে নয়ন্তীকার সাথে তার বাবার এমন আচরণের হেতু জানে না নয়ন্তীকা। তার দোষটাও সে জানে না। তার ভাগ্যে কেন যে বাবার ভালোবাসা নেই নয়ন্তীকার জানতে বড্ড ইচ্ছা হয়। তার বাবাকে খুব করে বলতে ইচ্ছে করে— তুমি আমার সাথে এই রকম ব্যবহার কেন করো বাবা। নয়ন্তীকা বোবা কান্নায় ভেঙে পড়লো তৎক্ষণাৎ। যার সাক্ষী রইলো ইঁট পাথরে গড়া বদ্ধ ঘর আর নির্জন-নিস্তবদ্ধ রাএি।
চলবে,,,,,,,,